📄 বন্ধুত্ব
সমাজবদ্ধভাবে বসবাসকারী জীব হিসাবের মানুষের একটা বৈশিষ্ট্য হল সদ্ভাব ও সৌহার্দ্য। তার থেকেও বেশি কিছু বন্ধুত্ব ও সখ্য। এ ছাড়া মানুষ চলতে পারে না, বাঁচতে পারে না। কোন মানুষই স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়। কোন মানুষ জীবনে একাকী জয়ী হতে পারে না। আম্বিয়াগণও পারেননি। মানুষের জীবনে সাফল্যের জন্য বন্ধু চাই, ভক্ত চাই, সহমর্মী চাই। সুন্দর ব্যবহারের ফলে যথাসময়ে তা পাওয়া যায়। জীবনের পথে চলতে চলতে কোনও এক স্বার্থে লাভ হয়। কেউ বন্ধুত্বের হাত বাড়ায় দ্বীনের খাতিরে, কেউ দুনিয়ার খাতিরে। কিন্তু মু'মিনরা বন্ধুত্ব স্থাপন করে কেবল আল্লাহর ওয়াস্তে। যে মানুষকে আল্লাহ ভালোবাসেন অথবা যে মানুষ আল্লাহকে ভালোবাসে, তারা তাকে ভালোবাসে। আর তারাই হয় ইহ-পরকালে সফলকাম।
এমন ভক্তের প্রয়োজন আছে, যে ভক্তিভাজনের পক্ষ থেকে প্রতিবাদ করবে, তার প্রতি আরোপিত অপবাদ খন্ডন করবে, তার হয়ে কথা বলবে, তার কৃতিত্ব বর্ণনা করবে ইত্যাদি। তা না হলে মহতের মহত্ত্বের বহিঃপ্রকাশ ঘটে না।
দুনিয়াদার বন্ধুরা বলে, 'বন্ধুত্বের হিসাব অঙ্ক কষে হয় না।' 'বাবা-কাকা দেখে বন্ধুত্ব করা যায় না।' কিন্তু তা সত্য হলেও ঈমানের সবচেয়ে সুদৃঢ় হাতল দুর্বল হতে দেওয়া চলে না।
মহানবী বলেছেন, “ঈমানের সবচেয়ে মজবুত হাতল হল আল্লাহর ওয়াস্তে বন্ধুত্ব করা এবং আল্লাহর ওয়াস্তে শত্রুতা করা, আল্লাহর ওয়াস্তে ভালবাসা এবং আল্লাহর ওয়াস্তে ঘৃণা করা।” (ত্বাবারানী, সঃ জামে' ২৫৩৯নং)
তিনি আরো বলেছেন, ইসলামের সবচেয়ে মজবুত হাতল এই যে, তুমি আল্লাহর ওয়াস্তে সম্প্রীতি স্থাপন করবে এবং আল্লাহর ওয়াস্তে বিদ্বেষ স্থাপন করবে। (আহমাদ, বাইহাক্বীর শুআবুল ঈমান, সঃ জামে' ২০০৯নং)
বন্ধুত্বের দ্বারে করাঘাতকারী বন্ধু আমার! 'তোমার বন্ধু হল তিনজন; তোমার বন্ধু, তোমার বন্ধুর বন্ধু এবং তোমার শত্রুর শত্রু।' কিন্তু যে বন্ধু আল্লাহর বন্ধু, সেই হল তোমার উপকারী।
জানই তো, দুনিয়ার জীবনের চলার পথ বড় অন্ধকার। কিন্তু 'আলো দেখাবার লোক থাকলে অন্ধকারেও পথ চলা যায়।' তোমার বন্ধু যদি আলোকবর্তিকা হয়, তাহলে অন্ধকারে ভয় কীসের?
'যার প্রকৃত বন্ধু আছে, (ত্রুটি দেখার জন্য) তার কোন দর্পণের প্রয়োজন নেই।' সৎ পথে চলার জন্য সেই বন্ধুই তোমার শ্রেষ্ঠ সাথী। 'জ্ঞানীদের সংসর্গ হৃদয়ের আবাদ।' 'একজন বিজ্ঞ বন্ধু হল সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ।'
তবে তুমি যদি অজ্ঞ হও, তাহলে বিজ্ঞ বন্ধু তোমার যোগ্য নয় বলেই তুমি তার বন্ধুত্বলাভে ধন্য হবে না। 'চারটি জিনিস সত্বর অপসৃত হয়; মেঘের ছায়া, জ্ঞানী-অজ্ঞানীর বন্ধুত্ব, আহমকের ধন এবং মিথ্যা সুনাম।' চরিত্রবান বন্ধু তোমাকে চরিত্রবান হতে সাহায্য করবে। 'গোলাপ ফুল ধরলে তার কিছু সুগন্ধ অবশ্যই হাতে লাগবে।' একজন সৎ লোক অন্য একজনকে সৎ লোক হিসাবে গড়ে তুলতে নিশ্চয়ই সহযোগিতা করবে। কিন্তু বড় দুঃখের বিষয় যে, দরদী বন্ধুর সংখ্যা নেহাতই কম। পরার্থপর বন্ধু নগণ্য বললেই চলে। গণনায় হয়তো তোমার বন্ধু অনেক, কিন্তু মসীবতে কয়জনকে পাও? অথচ 'বিপদের সময় যে হাত বাড়িয়ে দেয়, সেই সত্যিকারের বন্ধু।'
'সুসময়ে বন্ধু বটে অনেকেই হয়, অসময়ে হায় হায় কেহ কারো নয়।'
স্বার্থপর কপট বন্ধু ছায়ার মত। সে রোদের সময় সাথে থাকে। আর মেঘের সময় অদৃশ্য হয়ে যায়। প্রয়োজনে তেমন বন্ধু কাজে আসে না। সে বন্ধু 'নানী' হয়, 'জানী' হয় না। ('নান' ফারসীতে রুটিকে বলা হয়।)
ইবনে আব্বাস বলেন, 'আমার কাছে সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ বন্ধু সেই ব্যক্তি, যে লোকের ভিড় ঠেলে এসে আমার কাছে বসে। আল্লাহর কসম! তার দেহে মাছি বসলেও আমার মনে বড় কষ্ট হয়।' এমন দরদী না হলে সে আবার বন্ধু কীসের?
'ধনবত্তা বন্ধুত্ব সৃষ্টি করে, আর বিপদ করে তাদেরকে পরীক্ষা।' আগুনে দিলে যেমন খাঁটি সোনা জানা যায়, বিপদে পড়লে তেমনি খাঁটি বন্ধু চেনা যায়। নচেৎ জবানের ও দস্তরখানের বন্ধুর অভাব নেই।
হযরত আলী-কে তাঁর বন্ধুর সংখ্যা সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি উত্তরে বললেন, 'বর্তমানে সে সংখ্যা নির্ণয় করা মুশকিল। কারণ, এখন আমার নিকট পার্থিব ধন-সম্পদ আছে, তাই সকল মানুষই আমার বন্ধু। সঠিক সংখ্যা তখনই বলতে পারব, যখন এ ধন-সম্পদ আমার হাত-ছাড়া হবে। আর শ্রেষ্ঠ বন্ধু তো সেই, যে তোমার অভাব ও মসীবতের সময় বন্ধু।'
'চলার পথে অনেক বন্ধু আসে-যায়। কিন্তু যারা অন্তরের নিভৃতে স্থায়ী আসন পাততে পারে, তারাই প্রকৃত বন্ধু।'
'মানুষের পরিচয় জানতে তার বন্ধুদের পরিচয় দেখ। কারণ, সাধারণতঃ বন্ধু বন্ধুর অনুকরণ ক'রে থাকে।' ভালোবাসার রীতিই এই যে, যাকে ভালোবাসা হয়, তার সকল আচরণকে ভালো লাগে বলেই ভালোবাসা হয়।
'চারটি জিনিস ভালোবাসা সৃষ্টি ক'রে থাকে; হাসি মুখে সাক্ষাৎ, উপকার সাধন, সহমত অবলম্বন এবং কপটতা বর্জন।'
'সবচেয়ে নিকৃষ্ট হল সেই বন্ধু, যে কপটতার সাথে পথ চলে; যে অত্যাচারিতের কাছে কাঁদে এবং অত্যাচারীর কাছে হাসে।'
'তোমার বন্ধু যদি ৩টি কর্ম না করে, তাহলে তার নামে হাত ধুয়ে নাওঃ অঙ্গীকার পালন, সম্পদ ব্যয় এবং রহস্য গোপন।'
'কেউ বন্ধুত্ব করার জন্য যদি শর্ত মানতে প্রস্তুত হয়, তাহলে এই শর্ত আরোপ করো যে, সে কোন দিন মিথ্যা বলবে না।'
স্বার্থত্যাগ ও বিসর্জন ছাড়া ভালোবাসা হয় না। সুতরাং বন্ধুত্ব করার পূর্বেই ভেবে নিয়ো, বন্ধুত্বে কুরবানী চাই।
দুই বন্ধুর মাঝে যদি অহংকার আসে অথবা স্বার্থপরতার প্রাচীর খাড়া হয় এবং একজন যদি অপরজনের মতোই ব্যবহার শুরু ক'রে দেয়, তাহলে তো পৃথিবী থেকে বন্ধুত্বই নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। বন্ধুত্বের প্রকৃতি হল, বন্ধুত্বে খেয়ানত না করা। বন্ধুর প্রকৃতি এ নয় যে, যেখানে স্বার্থ সেখানে আছে।
পশুবধকারী শিকারীর সাথে সঙ্গীরূপে একটি কুকুর থাকে। বন্ধুরা কিন্তু সেরকম হয় না। বরং উভয়ের উচিত, বন্ধুর বন্ধুত্বের কদর করা। বন্ধুর পদস্খলন ক্ষমা করা এবং গোপনীয় বিষয়কে গোপন রাখা।
বন্ধুত্ব বজায় ও বহাল রাখার একটি উপায় এই যে, তোমার সাথী রেগে গিয়ে যখন অসমীচীন কথা বলতে শুরু করে, তখন তুমি চুপ হয়ে যাও। কারণ তার অবস্থা তখন মাতালের মতো হয়, যা বলে তা নিজেই বুঝতে পারে না। পরবর্তীতে সে ঠান্ডা হলে নিজেই লজ্জিত হবে এবং তার ভুল বুঝতে পারবে।
বন্ধুত্ব বজায় রাখতে ধৈর্যধারণ কর এবং বল, 'তুমি যতই আমার প্রতি সন্দেহমূলক ব্যবহার কর, বন্ধু আমি সব সয়ে নিই, এই আশঙ্কায় যে, হয়তো বা আর কোন বন্ধু আমার ভাগ্যে জুটবে না।'
মুআয বিন জাবাল বলেছেন, 'যখন তুমি আল্লাহর ওয়াস্তে কাউকে ভালোবেসেছ, তখন তার সাথে তর্ক করো না, তার দোষ ধরো না এবং তার ব্যাপারে কাউকে জিজ্ঞাসাবাদ করো না। কারণ, হতে পারে যে, জিজ্ঞাসিত ব্যক্তি তোমাকে তার ব্যাপারে এমন কথা বলবে, যা তার মধ্যে নেই এবং তার ফলে তোমাদের ভ্রাতৃত্ব নষ্ট হয়ে যাবে।'
অনেকে বলে, 'বন্ধুত্বের একটি নীতি হল, নো স-রি, নো থ্যাঙ্ক ইউ।' কিন্তু তার মানে এই নয় যে, তা বলা যাবে না। বরং বললে বন্ধুত্বের গাঢ়তা বৃদ্ধিলাভ করবে।
বন্ধুর কোন দোষ হলে তাকে নির্জনে ভর্ৎসনা কর, কিন্তু লোকালয়ে তার প্রশংসা কর। কারণ লোকালয়ে তার ভুল ধরলে অথবা লাঞ্ছিত করলে বন্ধুত্বের সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যাবে।
বন্ধুত্বে সমতা থাকা বাঞ্ছনীয়। 'তোমার চেয়ে যে নিচে, তার সাহচর্য গ্রহণ করো না। কারণ, হয়তো তুমি তার মূর্খতায় কষ্ট পাবে এবং তোমার চেয়ে যে উচ্চে, তারও সাহচর্য গ্রহণ করো না। কারণ, সম্ভবতঃ সে তোমার প্রতি গর্ব ও অহংকার প্রকাশ করবে। তুমি যেমন, ঠিক তেমন সমমানের বন্ধু, সঙ্গী ও জীবন-সঙ্গিনী গ্রহণ করো, তাতে তোমার মন ব্যথিত হবে না।'
ইবরাহীম বিন আদহামকে জিজ্ঞাসা করা হল, 'আপনি লোকেদের সঙ্গে মিশেন না কেন? উত্তরে তিনি বললেন, 'কারণ, যদি আমার চেয়ে নিচু মানের লোকের সাথে মিশি, তাহলে সে তার মূর্খতায় আমাকে কষ্ট দেয়। যদি আমার চেয়ে উঁচু মানের লোকের সাথে মিশি, তাহলে সে আমাকে অহংকার দেখায়। আর যদি আমি আমার সমতুল কোন লোকের সাথে মিশি, তাহলে সে আমার প্রতি হিংসা করে। তাই আমি তাঁর সংসর্গে নিরত থাকি, যাঁর সংসর্গে কোন বিরক্তি নেই, যাঁর বন্ধুত্বের কোন বিচ্ছিন্নতা নেই এবং যাঁর সংসর্গে কোন বিচ্ছিন্নতাবোধ নেই।'
উমার বিন খাত্তাব বলেন, 'নির্জনতায় মন্দ সাথী থেকে নিরাপত্তা আছে।'
আওন বিন আব্দুল্লাহ বলেন, 'আমি ধনীদের সাথে উঠা-বসা করতাম। তাতে আমি মনে মনে দুঃখিত হতাম, যখন দেখতাম তাদের পোশাক আমার পোশাক থেকে উত্তম এবং তাদের সওয়ারী আমার সওয়ারী অপেক্ষা উত্তম। অতঃপর গরীবদের সাথে উঠা-বসা শুরু করলাম। আর তাতে পেলাম মানসিক শান্তি।'
শায়খ সা'দী বলেছেন, 'হাতি-ওয়ালার সাথে বন্ধুত্ব করো না। নচেৎ, আগে হাতি রাখার ঘর তৈরী কর।'
আর 'খারাপ লোকের সাথে বসো না; যদিও তুমি ভালো লোক হও। কারণ, শারাবখানায় নামায পড়লেও লোকে তোমাকে শারাবী বলে জানবে।'
'মন্দলোকের সাহচর্য ভালো লোকেদের প্রতি কুধারণা রাখতে উদ্বুদ্ধ করে।'
'উত্তম নিশ্চিন্তে চলে অধমের সাথে, তিনিই মধ্যম যিনি চলেন তফাতে।'
'কাছাকাছি আগুন লাগলে আঁচ তো গায়ে লাগবেই।' পচা আপেলের পাশাপাশি আপেলে পচন অবশ্যই ধরবে।
বন্ধুত্বের খাঁটিত্ব পরীক্ষা করতে পারো। আম্র বিন আলা' বলেন, 'যদি তুমি জানতে চাও যে, তোমার বন্ধুর নিকট তোমার কী মান রয়েছে, তাহলে তোমার পূর্বে ওর কোন বন্ধুর মান জানার চেষ্টা কর।'
সুফিয়ান সওরী বলেন, 'যদি তুমি বন্ধুর কাছে তোমার মান কতটা তা জানতে চাও, তাহলে তাকে রাগিয়ে দিয়ে পরীক্ষা কর। রাগে যদি সে তোমার প্রতি ইনসাফ করে, তাহলে সে তোমার বন্ধু, নচেৎ তুমি তার সাহচর্য থেকে দূরে থেকো।'
'তিন তিনবার রাগান্বিত করার পরেও যে মানুষ তোমার বিরুদ্ধে কোন কটু কথা বলেনি, তাকে তোমার বন্ধু বানিয়ে নাও।'
এক ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসা করা হল যে, তোমার চোখে তোমার বন্ধু কেমন? বলল, 'সে আমার চোখে ছোট। কারণ তার চোখে দুনিয়া অনেক বড়।' বলা বাহুল্য, বন্ধুকে দুনিয়াদারি দিকে ঝুঁকতে দেখলে তোমার চোখে সে ছোট হয়ে যাবে। অনুরূপ তুমিও দুনিয়াদার হলে তার চোখে তুমি ছোট হয়ে যাবে।
বন্ধুত্বের জন্য নিজের হৃদয়-দ্বার সম্পূর্ণ উন্মুক্ত করা উচিত নয়। ইমাম শাফেয়ী বলেন, 'লোকের সাথে একেবারে না মিশলে শত্রুতা সৃষ্টি হয়, আর অধিক অধিক (যার-তার সাথে) মিশলে অসৎ বন্ধু এসে পড়ে। সুতরাং এই দুয়ের মধ্যবর্তী পথ অবলম্বন কর।' ফেসবুকের বন্ধুদের এ অভিজ্ঞতা অবশ্যই আছে।
এই জন্য 'সবার সঙ্গে ভদ্র আচরণ কর। কিন্তু অন্তরঙ্গ কর কয়েকজনের সাথে।'
'মানুষ প্রত্যেকের নিকট বন্ধু অথবা প্রত্যেকের নিকট শত্রু হতে পারে না। সুনাম করার যেমন বন্ধু থাকে, তেমনি দুর্নাম করার শত্রুও থাকে। তোষামদের বলেও সকলের নিকট বন্ধু হওয়া অসম্ভব।'
তবুও 'যে সব মানুষের বন্ধু হয়, সে আসলে কারো বন্ধু নয়। সে একজন জনদরদী।'
বন্ধুত্বের প্রয়োজন হয় সময়ে-অসময়ে মনের কথা খুলে বলার জন্য। 'মনের মত সঙ্গীর সাথে কথা বলে যতটা আনন্দ পাওয়া যায়, ততটা আর নয়।' ‘কোন কাজে পাওয়া যায় না।’
জীবনে ৩ ধরনের সহচর প্রয়োজন; (পুরুষের জন্য পুরুষ) বন্ধু, স্ত্রী ও বই। (মহিলার জন্য মহিলা) বন্ধু, স্বামী ও বই।
‘একটি ভাল বই হল বর্তমান ও চিরদিনের জন্য সবচেয়ে উৎকৃষ্ট বন্ধু।’
মানুষের সাথী ৩ প্রকার:- প্রথম সাথী মরণ পর্যন্ত সাথে থাকে; আর সে হল তার ধন-সম্পদ। দ্বিতীয় সাথী কবরে প্রবেশ হওয়া পর্যন্ত তার সাথে থাকে; আর তা হল তার আত্মীয়-স্বজন। আর তৃতীয় সাথী তার ইহ-পরকালে চিরদিনের জন্য সাথে থাকে; আর তা হল তার আমল। সুতরাং মধ্য জগতে ভালো বন্ধু পেতে হলে ভালো আমলের প্রয়োজন খুব বেশি।
পৃথিবীর বন্ধুর পথে বন্ধুর একান্ত প্রয়োজন। তবে প্রত্যেক বন্ধুই যে উপকারী হবে, তার কোন নিশ্চয়তা নেই। কারণ, ‘বন্ধু বন্ধুর উপকার যতখানি করতে পারে, ক্ষতিও করতে পারে ততখানি।’ বন্ধু বন্দুক হয়ে গেলে তার আঘাতে ধরাশায়ী হতে হবে অসময়ে। আর জানই তো, ‘শত্রু প্রকাশ্য হলে তার দ্বারা যত ক্ষতি হয়, বন্ধু শত্রু হলে ফল হয় আরো মারাত্মক।’
‘বন্ধু অপেক্ষা শত্রুকে পাহারা দেওয়া সহজ।’ বন্ধু যদি বন্ধ ঘরে বন্ধুত্বের সুযোগ নিয়ে তোমার স্ত্রীকেও বন্ধু মনে করে, তাহলে তার কুফল কতটা তিক্ত হতে পারে, তা অনুমান করতে পারো। অবশ্য তুমি যদি তথাকথিত ‘উদারপন্থী’ হও, তাহলে সে কথা আলাদা।
তবে কেবল সন্দেহবশে কারো প্রতি অন্যায়াচরণ করো না। যেমন কোন ক্ষুদ্র ত্রুটির কারণে বন্ধুত্বের মূলে কুঠারাঘাত করা ন্যায়পরায়ণ মানুষের উচিত নয়। ‘যার সাথে চিরদিনের মিতালি, এক মুহূর্তে তাকে জীবন থেকে দূর করে দেওয়া সমীচীন নয়।’
হযরত উমার বলেন, ‘যখন তোমাদের মধ্যে কেউ কোন ভাইয়ের তরফ থেকে ভালোবাসা পায়, তখন সে যেন তা বজায় রাখতে যত্নবান হয়। কারণ, এমন ভালোবাসা বড় দুর্লভ।’
প্রকৃত বন্ধু যাকে বলা হয়, তা বড় দুর্লভ। ‘প্রকৃত বন্ধু হল সেই, যে ছায়ার ন্যায় তোমার সঙ্গে থাকে, নিজের ক্ষতি ক'রে তোমার উপকার করে। তোমাকে অক্ষত রাখার জন্য সে নিজেকে ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন করে ফেলে।’ আছে কি তেমন বন্ধু কেউ?
বাদশা মামুনের নিকট মুখারেক নামক ব্যক্তি আবুল আতশিয়ার একটি কবিতা ছত্র আবৃতি করলেন, যার অর্থ হল, "আমি মুখাপেক্ষী এমন এক বন্ধুর ছায়ার, যে নির্মল ও পরিচ্ছন্ন হবে, যখন আমি তাকে নোংরা ক'রে ফেলব।”
মামুন তাঁকে বললেন, 'কবিতাটি পুনরায় আবৃতি কর।' তিনি আবার আবৃতি করলেন। এইভাবে ৭ বার পাঠ করার পর বাদশা তাঁকে বললেন, 'ওহে মুখারেক! আমার এই খেলাফত তুমি নিয়ে নাও। আর তার বিনিময়ে ঐ রকম একটি বন্ধু আমাকে এনে দাও।'
বন্ধুত্বের জন্য কিছু দান করতেও হয়। যেহেতু দানে বন্ধু আনে। আত্মা বিন আবী রাবাহ এক ব্যক্তিকে বলতে শুনলেন, 'আমি ত্রিশ বছর ধরে একটি বন্ধুর খোঁজে আছি, কিন্তু আজও তার সন্ধান মেলেনি। তিনি তাকে বললেন, সম্ভবতঃ তুমি এমন বন্ধুর খোঁজে আছ, যার কাছে কিছু পেতে চাও? তুমি যদি এমন বন্ধু খোঁজ করতে, যাকে কিছু দিতে চাও, তাহলে অনেক বন্ধুই পেতে।'
অবশ্য দানের বিনিময়ে প্রতিদানের আশা রেখো না। তুমি অপরের বন্ধু হও, আর এ লোভ রেখো না যে, কেউ তোমার বন্ধু হবে। আর তুমি যদি চাও যে, এমন বন্ধু গ্রহণ করবে, যার কোন ত্রুটি নেই, তাহলে জীবনে তুমি কোন বন্ধুই পাবে না।
এক দার্শনিককে জিজ্ঞাসা করা হল, 'সবচেয়ে লম্বা সফর কার?' উত্তরে তিনি বললেন, 'যে একটি বন্ধুর খোঁজে সফর করে।'
'সত্যিকারের বন্ধুত্ব এমন একটি চারাগাছ যা ধীরে ধীরে বাড়ে।'
'বন্ধুর জন্য তুমি কুরবানী দেবে এটা তো সহজ; কিন্তু কঠিন হল এমন বন্ধু পাওয়া, যে সেই কুরবানী পাওয়ার যোগ্যতা রাখে।'
'বন্ধুত্ব করা মাটি দিয়ে মাটির উপর 'মাটি' লেখার মতো সহজ। কিন্তু বন্ধুত্ব রক্ষা করা পানি দ্বারা পানির উপর 'পানি' লেখার মতো কঠিন।'
'মিত্র লাভ অতি সুলভ, কিন্তু মৈত্রী রক্ষা করাই কঠিন।'
'সবচেয়ে অক্ষম ব্যক্তি হল সেই, যে বন্ধুত্ব করতে অক্ষম। আর তার চেয়েও অক্ষম হল সেই ব্যক্তি, যে বন্ধুত্ব ক'রে তা হারিয়ে ফেলে।'
'এমন দুই হারানো জিনিস; যার তরে কেঁদে কেঁদে চক্ষু হতে রক্তধারা প্রবাহিত হয়, তবুও তার এক দশমাংশ হক আদায় হয় না। প্রথম হল যৌবন এবং দ্বিতীয় হল বন্ধু।' স্ত্রী-বিয়োগ অথবা তার প্রেম-বিয়োগও একই জিনিস। বরং থেকেও যে না থাকার মতো থাকে, তার যন্ত্রণা আরও বেশি, আরও বেশি বেদনাময়। যার মন মারা যায়, কিন্তু দেহ থাকে কাছে, তার বিকল রোবটের মতো আচরণ সত্যই দুর্ভাগ্যজনক।
বন্ধু আমার! ভালো বন্ধুর সন্ধানে থাকো। আর দুআ করো, 'হে আল্লাহ! নিশ্চয় আমি তোমার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি মন্দ প্রতিবেশী থেকে। এমন স্ত্রী থেকে, যে বৃদ্ধ হওয়ার আগেই আমাকে বৃদ্ধ বানাবে। এমন সন্তান থেকে, যে আমার প্রভু হতে চাইবে। এমন মাল থেকে, যা আমার জন্য আযাব হবে। এবং এমন ধূর্ত বন্ধু থেকে, যার চোখ আমাকে দেখে এবং তার হৃদয় আমার প্রতি লক্ষ্য রাখে, অতঃপর ভাল কিছু দেখলে তা পুঁতে ফেলে এবং খারাপ কিছু দেখলে তা প্রচার করে।' (ত্বাবারানী, সিঃ সহীহাহ ৩ ১৩৭নং)
📄 জীবনে স্বামী, স্ত্রী ও বন্ধুর গুরুত্ব
জীবন একটি সফরের নাম। যে সফরে আছে মরু-প্রান্তর, জল-জঙ্গল, সাগর-তরঙ্গ। সফরের সাথী না হলে একাকী বড় কঠিন পথ চলা। এমন সাথী, যে শোকে সান্ত্বনা দেবে, দুঃখে সঙ্গ দেবে, চোখের পানি মুছে দেবে, যথাস্থলে সাহায্য করবে, ভাল কাজে উৎসাহিত করবে, মন্দ কাজে বাধা দেবে, অন্ধকারে পথ দেখাবে, অন্ধের যষ্টি হবে, আল্লাহর ওয়াস্তে ভালবাসবে, আল্লাহর আনুগত্যে সহযোগিতা করবে।
সে জীবনের সুখ কোথায়? যে জীবনে সব কিছু আছে, কিন্তু মনের মানুষটি নেই। এমন দুনিয়া বৃtha, যে দুনিয়ায় মনের মতো একটি সাথী নেই। জীবনের সবচেয়ে বড় দুঃখ হল, দুঃখের কথা বলবার বা শুনবার কেউ না থাকা।
'সুখ ভাগ করলে বেড়ে যায়, কিন্তু দুঃখ ভাগ করলে কমে যায়।' কিন্তু ভাগ দেওয়া ও নেওয়ার মতো কেউ না থাকলে জীবনের শ্রীর ঋদ্ধি-বৃদ্ধির আর উপায় কী বল?
দুঃখের কথা অপরকে বললে দুঃখ অনেকটা হাল্কা হয়ে যায়। কিন্তু মানুষের এমন কিছু দুঃখ আছে, যার কথা সে কাউকে বলতে পারে না। আর তখন সে তা মনের মধ্যে চাপা রেখে সীমাহীন কষ্টাগ্নিতে দগ্ধ হতে থাকে।
এমনও মানুষ আছে, যে মনের মতো কোন বন্ধু পায় না। স্ত্রীরূপে একজনকে পেলেও সে একটা নারী পায়, মনের মানুষ পায় না। অথবা স্বামীরূপে একজনকে পেলেও সে একটা পুরুষ পায়, একটা অবলম্বন পায়, কিন্তু মনের মানুষ পায় না। মনের কথা সে তাকে খুলে বলতে পারে না। বললেও যে কান খুলে শ্রবণ করে না, শুনলেও গ্রাহ্য করে না। চোখ তুলে তাকিয়ে দর্শন করে না। অথবা যে অবজ্ঞা ও ঘৃণার দৃষ্টিতে তাকায়। যার সাথে মনের মিল হয় না। মত-অভিমতে ভিন্নতার পূর্ব-পশ্চিমের ব্যবধান। পছন্দ- অপছন্দে আকাশ-পাতাল তফাত!
এমনও সন্তান আছে, যার বাপ অথবা মা দ্বিতীয় বিয়ে ক'রে নতুন সংসার পেতেছে। সন্তান অবলম্বনহীন হয়ে অকূল দুঃখ-পাথারে তলিয়ে গেছে। কেউ মুক্ত আকাশে ভাসমান মেঘের মতো বাতাসের গতিবেগের সাথে ঘুরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। দুয়ারে-দুয়ারে ফিরে আঘাত খাচ্ছে। স্নেহহারা হয়ে সর্বহারা হয়েছে সে সন্তান।
'ছিল যারা অনুকূল, তারা হয়ে প্রতিকূল যায় চলে অকূলে ফেলিয়া।' জীবনে যখন দুঃখের তুফান নেমে আসবে, তখন কেউ তোমার সঙ্গ দেবে না। 'কেউ তোমার অমৃতময় পানীয় প্রত্যাখ্যান করবে না, কিন্তু জীবনের গরল তোমাকে একাই পান করতে হবে।' যদি তাই হয়, তাহলে অনুমান কর সেই অবস্থার অন্তর্জালা।
প্রাণের স্বামী যদি পরদারিক হয়, প্রিয়তমা যদি অন্যাসক্তা হয়, পতির যদি দুর্মতি হয়, স্ত্রী যদি ইস্ত্রি হয়ে যায় এবং বন্ধু যদি বন্দুক হয়ে যায়, তাহলে দুঃখের কথা আন্দাজ করতে পার।
'সুখ-দুঃখ মাঝে দোলে নিবিড় আঁধারে, অকূলে না কূল পায় দারুণ শৃঙ্খল পায় নিরানন্দ নিরুপায় পলাইতে নারে।'
এত প্রশস্ত এ দুনিয়ার পুষ্পোদ্যানের প্রমোদ-বিহারে সুখ কীসের, যদি পায়ের জুতাই সংকীর্ণ হয়? স্বামী যদি মনের মতো না হয়, স্ত্রী যদি মনের কথা না বোঝে, তাহলে সংসারে শান্তি কোথায়?
যে তোমার কাঁদনে কাঁদে না, তোমার হাসিতে হাসে না, তোমার মনের কথা বুঝে না, তোমার অভিমান মানায় না, তোমার মনের অনুকূলে থাকে না, তাকে নিয়ে কি শান্তি পাবে কখনও?
'যা কিছু আমাদের ব্যক্তিগত ইচ্ছার সাথে মিল খায়, তাই আমরা বিশ্বাস করি। যা মেলে না, তার জন্য আমাদের রাগ হয়।' স্বামী-স্ত্রীর জীবনেও এমন অনেক সমস্যা আছে, যেগুলির সমাধান প্রত্যেকে নিজ নিজ খেয়াল-খুশি অনুসারে করতে চায়। ফলে সমস্যা আরো বৃদ্ধি পায়।
এ জীবন কোন যাত্রা-সিনেমা নয়। তবুও অনেক মানুষ আছে, যারা যাত্রা- সিনেমার মতো অবাস্তব ব্যবহার চায়। বিধায় বাস্তব জীবনে সমস্যার সমাধান মিলে না।
'আমাদের সমস্যার উত্তর পাওয়া এতো কঠিন, এতে অবাক হওয়ার কিছু আছে? একটা অঙ্কের সমাধান কি সম্ভব, যদি আগেই ভেবে নিই দুই আর দুইয়ে পাঁচ হয়? তবুও এমন ঢের লোক আছে যারা দুই আর দুয়ে পাঁচ বা পাঁচশো হয় ভেবে নিজের আর অন্যের জীবন অতিষ্ঠ ক'রে তোলে।'
সংসারের ভেলা নদীর জোয়ারে ভাসমান তরির মতো বয়ে চলে না। বরং অধিকাংশ সংসারের গাড়ি চাকাহীন গাড়ির মতো, যা চলে বা চলতে বাধ্য হয় টানে অথবা ঠেলায়। যাদের ভাগ্য ভাল, তারা পায় চাকাবিশিষ্ট গাড়ি। আর যাদের ভাগ্য মন্দ, তারা চাকাহীন গাড়ি পায় অথবা চাকাবিশিষ্ট পেলেও পথ পায় বন্ধুর।
স্ত্রী তোমার অর্ধাঙ্গিনী। কিন্তু মনের মতো না হলে তোমার অর্ধেক অঙ্গ বিশ্বস্ত। যেমন একাধিক স্ত্রীর মাঝে ইনসাফ না করতে পারলে কিয়ামতেও তোমার অর্ধাঙ্গ বিশ্বস্ত থাকবে। ফাল্লাহুল মুস্তাআন।
'বক্ষ হইতে বাহির হইয়া আপন বাসনা মম ফিরে মরীচিকাসম। বাহু মেলি তারে বক্ষে লইতে বক্ষে ফিরিয়া পাই না, যাহা চাই তাহা ভুল করে চাই, যাহা পাই তাহা চাই না।'
📄 শত্রুতা
কোন্ মানুষের শত্রু নেই? যে মানুষের নিকট থেকে কোন উপকারিতা অথবা অপকারিতা প্রকাশ পায় না, তার কোন শত্রু নেই। যেহেতু যার উপকারিতা আছে তাকে মন্দ লোকেরা এবং যার অপকারিতা আছে তাকে ভালো লোকেরা পছন্দ করে না। সুতরাং তোমার যে শত্রু নেই, তা হতেই পারে না।
চারটি জিনিস শত্রুতা সৃষ্টি করে; অহংকার, হিংসা, মিথ্যাবাদিতা ও চুগলখোরি। ভেবে দেখো, এরই মাধ্যমে সংসারে কত ভয়াবহ অগ্নিকান্ড ঘটে। থাকে। 'যে হাওয়ায় আনে হাসি, সেই তো আবার ঝড় হয়ে যায়।'
'যে ফুলে আনে হাসি, সে ফুলেই দেয় হে ফাঁসি।' শত্রু হয়ে দাঁড়িয়ে দেখে খুশির সাথে বাজায় বাঁশি।
দুনিয়ার এ নীতিও বড় নিমকহারাম। কাল নুন পাচ্ছিল, তাই গুণ গাচ্ছিল। আজ নুন পায় না, তাই গুণ গায় না। তা না গাইলেও ক্ষতি নেই। কিন্তু ক্ষতি হয় তখন, যখন নুন না পেয়ে দোষকীর্তন করে। নতুন নুন না পেয়ে পুরনো নুনের কথাও ভুলে যায়। আর তখন দাতার গুণও সহ্য হয় না বলে তার দোষ গেয়ে বেড়ায়। তার শত্রুর হাতে হাত মিলায়!
জেনে রেখো বন্ধু! তোমার শত্রু হল তিনজন; তোমার শত্রু, তোমার বন্ধুর শত্রু এবং তোমার শত্রুর বন্ধু। কোন শত্রুকেই তুচ্ছজ্ঞান করতে হয় না। 'বিরোধীকে কখনই দুর্বল ভাবতে হয় না।'
সুতরাং শত্রু যখন তোমার প্রতি শত্রুতার হাত বাড়ায়, তখন পারলে তা কেটে ফেল। তা না পারলে তা চুম্বন কর। দুশমন যদি দুশমনি দিয়ে তোমার সম্মুখীন হয়, তাহলে তুমি হিকমত দিয়ে তার মোকাবিলা কর। দরকার হলে সময় ক্ষেত্রে শত্রুর সাথে বন্ধুসুলভ আচরণ করতে পার।
শায়খ সা'দী বলেছেন, 'শত্রু যখন চারিদিক থেকে নিরাশ হয়ে যায়, তখন দায়ে পড়ে তোমার বন্ধুত্বের দরজার কড়া নাড়ে এবং সে তোমার সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ ব্যবহার শুরু ক'রে দেয়। কিন্তু তোমার উচিত, তার হাত দ্বারা সাপের মাথা টিপে গলিয়ে দেওয়া। এতে তার বিষ না থাকলে তুমি সাপ মারবে। আর বিষ থাকলে তুমি শত্রুর হাত থেকে নিস্তার পাবে।'
'শত্রুর অসময়ের অনুনয়-বিনয়ে তুমি নরম হয়ো না। কারণ, সে সুযোগ পেলে তোমাকে যে ছেড়ে দেবে, তা নয়।'
হ্যাঁ, 'সাপের লেজে পা দিলে সাপ তো ছোবল মারবেই, চাহে তা ঘরেই হোক অথবা বনে।' কারো কায়েমী স্বার্থে কুঠারাঘাত করলে প্রতিঘাত তো সইতেই হবে। সুতরাং তার জন্য তুমি প্রস্তুত থেকো। 'তুমি তোমার শত্রুর বিরুদ্ধে সেই অস্ত্র দ্বারা লড়াই কর, যে অস্ত্রকে সে ভয় করে। তুমি যে অস্ত্রকে ভয় কর, সে অস্ত্র দ্বারা নয়।'
'মানুষ অনেক বড় বড় কষ্ট সহ্য করে নেয়, কিন্তু দুশমন-হাসি অনেক ক্ষেত্রে সহ্য ক'রে উঠতে পারে না।' তুমিও পারবে না। তবে যদি পারো, তাহলে সে হাসি বন্ধ ক'রে দাও। অবশ্য সে হাসির কারণ তুমি না হয়ে তোমার কাছের কোন লোকও হতে পারে। সে ক্ষেত্রে তুমি নিরুপায়।
যে ব্যক্তি হীন লোকের শত্রুতা-দৃষ্টিতে পড়ে, সে ব্যক্তির মান মাঠে-ঘাটে যায়। কথায় কথায় তার ত্রুটি প্রচার করে। অনেক সময় মিথ্যা বদনাম রটিয়ে তাকে হেয় প্রতিপন্ন করে। অন্যের প্রতিভার প্রতিভাত হতে দেখে তার পেটের ভাত হজম হয় না। তখন চেষ্টা করে তার প্রতিভাতে আঘাত হানতে, তার পেটের ভাতেও লাথি মারতে। নীচমনা অহংকারী হিংসুটে বৈরিতার ফলে যেমন নিজে সুখ পায় না, তেমনি তার আচরণে অন্যকেও সুখে বসবাস করতে দেয় না। এমনই শত্রু সে, যার সাথে ইবলীসের বড় সুসাদৃশ্য আছে। অহংকার ও হিংসাই সর্বপ্রথম পাপ, যার ফলে ইবলীস অভিশপ্ত হয়েছে এবং তার ফলে আদম-হাওয়া জান্নাত থেকে পৃথিবীতে অবতারিত হয়েছেন। ইবলীসেরই পরামর্শক্রমে তাঁরা জান্নাতে নিষিদ্ধ গাছ ভক্ষণ ক'রে আল্লাহর অবাধ্যতা করেন এবং তার শাস্তিস্বরূপ পৃথিবীতে নির্বাসিত হন।
অতএব শত্রু যদিও জ্ঞানী হয়, তবুও তার পরামর্শ নিয়ো না। শায়খ সা'দী বলেছেন, 'শত্রু যদি তীরের মত সোজা পথ দেখিয়ে দেয়, তবুও তুমি বাম দিকে যেয়ো।'
তিনি আরো বলেছেন, 'দুই শত্রুর মধ্যস্থলে এরূপ কথাবার্তা বলবে না; যাতে ওদের মধ্যে কেউ পরে তোমার বন্ধু হলে তোমাকে যেন লজ্জিত হতে না হয়।'
আর আমাদের নবী ﷺ বলেছেন, "তোমার বন্ধুকে মধ্যমভাবে ভালোবাস (অর্থাৎ, তার ভালোবাসাতে তুমি অতিরঞ্জন করো না)। কারণ, একদিন সে তোমার শত্রুতে পরিণত হতে পারে। আর তোমার শত্রুকে তুমি মধ্যমভাবে শত্রু ভেবো। (অর্থাৎ, তাকে শত্রু ভাবাতে বাড়াবাড়ি করো না।) কারণ, একদিন সে তোমার বন্ধুতে পরিণত হতে পারে।” (সুতরাং তখন তোমাকে লজ্জায় পড়তে হবে।) (তিরমিযী ১৯৯৭, সহীহুল জামে' ১৭৮ নং)
📄 আবেগ
একজন মানুষের ভিতরে আবেগ থাকতেই পারে। কিন্তু তার গতিবেগ লাগামছাড়া হওয়া মোটেই উচিত নয়। জোশ ও আবেগ ছাড়া মানুষের বড় কাজে স্পৃহা জন্মে না। কর্তব্যকর্মে অনীহা যায় না। কিন্তু আবেগ যেন বেশি না হয়। কারণ, 'হৃদয়ের দরজায় যখন ক্রোধ অথবা আবেগ প্রবেশ করে, তখন বিবেক-বুদ্ধি তার জানালা দিয়ে পলায়ন করে।'
আবেগ মানুষকে অন্ধ ক'রে তোলে। অন্ধানুকরণ তথা ভক্তির আতিশয্য তখন 'হক' গ্রহণ করতে বাধাদান করে।
আবেগময় মানুষ কোন কর্মে যত তাড়াতাড়ি সম্মত হয়, তত তাড়াতাড়ি সামান্য ত্রুটি দর্শনে মত পরিবর্তন করে। এদের মন যত শীঘ্র গড়ে, তত শীঘ্র ভাঙ্গে।
সুতরাং 'আবেগ নিয়ন্ত্রণ ক'রে বিবেক প্রয়োগ করা জ্ঞানীর কাজ। যেহেতু বিবেক মানুষকে সত্যের পথ দেখায় আর আবেগ পথভ্রষ্ট করে।'
মুসলিম যুবসমাজের মাঝে আজ আবেগ নয়, গতিবেগ চাই। 'আবেগ দিয়ে নাটক-উপন্যাস হয়; জীবন-যুদ্ধ হয় না।'
আবেগের টানে সাজা দিতে ভুলে যাওয়া উচিত নয়, উচিত নয় কাউকে সেই স্থান দান করা, যে স্থানের সে উপযুক্ত নয়। নচেৎ লাগামহীন আবেগের মেঘমালা তোমার হৃদয় আকাশে তুফান সৃষ্টি করবে এবং নিমিষে তোমার সব কিছু তছনছ ক'রে ছাড়বে।