📘 জীবন দর্পণ > 📄 দারিদ্র্য ও অভাব

📄 দারিদ্র্য ও অভাব


এ জীবনে দারিদ্র্য একটি অভিশাপ। তবে যারা অভিশাপকে বররূপে বরণ করতে পারে, তাদের জন্য তা বড় মর্যাদাপূর্ণ বর।
'গরীব রাস্তায় চলে, প্রত্যেক বস্তু যেন তার বিপক্ষে। লোকেরা তাকে দেখে নিজ নিজ দরজা সশব্দে বন্ধ করে নেয়। লোকেরা তাকে ঘৃণা করে, অথচ সে কোন অপরাধী নয়। সকলকে দেখে তার শত্রু মনে হয়, অথচ শত্রুতার কোন কারণ নেই। এমনকি কুকুরদলও যখন কোন ধনীকে দেখে তখন তার নিকট বিনয় প্রকাশ করে এবং লেজ দুলিয়ে থাকে। অথচ কোন গরীব মানুষকে পার হতে দেখলে তাকে লক্ষ্য করে ভেকাতে শুরু করে এবং দাঁত দেখায়!'
'দরজা দিয়ে অভাব প্রবেশ করলে জানালা দিয়ে ভালোবাসা গোপনে পলায়ন করে। পয়সা থাকলে বন্ধু অনেক হয়, স্ত্রীও ভালোবাসে বেশী।'
'অভাব যখন তুফান হয়ে এসে ঘরের জানালায় আঘাত করে, তখন ভালবাসার ফুলদানি পড়ে গিয়ে ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যায়।' 'দারিদ্র্যের ঝড়ে ভালবাসার প্রদীপ নিভে যায়।'
অভাব মানুষের জাত, ধর্ম ও সভ্যতা পাল্টে দেয়। অভাব থাকলে মানুষের মানুষত্বও লোপ পায়। যেহেতু অভাবে মানুষের স্বভাব নষ্ট ক'রে ফেলে। 'খিদে পেলে হিংস্র জন্তুরা নিজের ছেলেও খেয়ে ফেলে।'
আবু যার বলেছেন, 'দারিদ্র্য কোন দেশে গেলে কুফরী তাকে বলে, আমাকে তোমার সাথে নিয়ে চলো।'
উমার বলেছেন, 'দারিদ্র্য যদি মানুষ হতো, তাহলে আমি তাকে খুন করতাম।'
আমার নবী দারিদ্র্য থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করতেন। দারিদ্র্য এক প্রকার বিপর্যয়, যা দিয়ে মহান আল্লাহ তাঁর বান্দাদেরকে পরীক্ষা ক'রে থাকেন।
একজন অভিজ্ঞ দরিদ্র বলেছেন, 'সকল সুস্বাদু জিনিসের আস্বাদ গ্রহণ করেছি, কিন্তু অধিক সুস্বাদুরূপে নিরাপত্তার মত কোন অন্য জিনিস পাইনি। সমস্ত রকম তিক্ত বস্তুর স্বাদ গ্রহণ করেছি, কিন্তু অভাব ও পরমুখাপেক্ষিতার মত অধিক তিক্ত বস্তু আর অন্য কিছু পাইনি। আর আমি লোহা ও পাথর বহনও করেছি, কিন্তু ঋণকে তা থেকেও বেশী ভারী অনুভব করেছি।'
অন্য একজন বলেছেন, 'নিমফল খেয়েছি এবং মাকালফলও চেখেছি, কিন্তু দারিদ্রের চেয়ে অধিক তিক্ত জিনিস অন্য কিছু চাখিনি।'
যদি তুমি গরীব হয়ে যাও, তাহলে সে কথা যেন কাউকে বলো না, নচেৎ তারা তোমাকে ছোট ভাবতে শুরু করবে। পক্ষান্তরে তোমার ধন আছে এমন ভাবও প্রকাশ করো না। গুপ্ত থেকো, গোপনে সুখ আছে। অতি সংগোপনে মনের কথা কেবল মহান আল্লাহকে জানায়ো।
'দরিদ্রতা কোন ত্রুটি নয়; তবুও তা গোপন রাখাই ভালো।' যাতে নিজের মান বজায় থাকে। যেহেতু গরীব মানুষকে লোকে তুচ্ছজ্ঞান করে। অভাব মানুষকে সুস্বাস্থ্যের সম্পদ থেকেও বঞ্চিত করে। বঞ্চিত করে শিক্ষার দীপ্তিময় আলো থেকেও।
'অর্থ অপ্রতুলে কত দীন বাছাধন, অজ্ঞান আঁধারে বসি কাটিছে জীবন।'
'খালি পেটে কোন মানুষ বিচক্ষণ হতে পারে না।' এ কথা যেমন সত্য, তেমনি 'জীবনে কষ্ট না পেলে, জ্ঞানের পরিধি বিস্তার লাভ করে না। জীবনে যারা বিজ্ঞ হয়েছে, তাদের জীবনে দুঃখ কষ্ট বেশী ছিল।'---এটাও বাস্তব। কবি বলেছেন, 'হে দারিদ্র্য! তুমি মোরে করেছ মহান, তুমি মোরে দানিয়াছ খ্রীষ্টের সমান- কন্টক-মুকুট শোভা।'
'দরিদ্রতার গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য এই যে, তা তোমাকে অনেক লোকের বন্ধুত্ব থেকে রক্ষা করবে।' যেহেতু গরীব বন্ধুর কাছে স্বার্থপরদের কোন সিদ্ধিলাভ হয় না। পক্ষান্তরে ধনী হলে তোমার বন্ধু বেশি হবে। সেই ব্যক্তির নিকট থেকে অভিবাদন পাবে, যার সালামেরও আশা করতে পারতে না। হ্যাঁ, তোমার অর্থ না হলে ওরা কেউই তোমাকে সালাম জানাতো না।
দীন-হীন বন্ধু আমার! ধৈর্য ধারণ কর। অভাবী হয়ে নবাবী আচরণ বর্জন কর। গরীব লোকদের পেটে বেশি খিদে থাকা ভাল নয় বন্ধু! গরীব হলেও আত্মমর্যাদা বজায় রেখো। তবে তা যেন অহংকারে পরিণত না হয়ে যায়। যেহেতু রাসূলুল্লাহ বলেছেন, "আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিন তিন প্রকার লোকের সাথে কথা বলবেন না, তাদেরকে পবিত্র করবেন না, তাদের দিকে (অনুগ্রহের দৃষ্টিতে) তাকাবেন না এবং তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি, (১) ব্যভিচারী বৃদ্ধ, (২) মিথ্যাবাদী বাদশাহ এবং (৩) অহংকারী গরীব।” (মুসলিম)
তবে নিশ্চয় তুমি ধনীদের খেলার পুতুল নও। তুমি তাদের নিকট জিওল মাছের মতো নও যে, তারা তোমােেক পানিতে জিইয়ে রাখবে। আর প্রয়োজন মতো মেরে খাবে।
তাদের জেনে রাখা উচিত, 'বড় লোকদের দৌলতে গরীবরা রুটি পায় বলেই বড় লোকেরা পোলাও খেতে পায়।' সুতরাং গরীবদের প্রতি আসলে তারা কোন করুণা করে না। দান করলেও সে আসলে আল্লাহর দেওয়া ধন দান করে, যা তাঁর প্রাপ্য অধিকার। গরীবকে কৃতজ্ঞ হতে হলেও তার মানে এই নয় যে, তার মাধ্যমে তাকে দাসে পরিণত করবে। কবি বলেছেন, 'দেখিনু সেদিন রেলে, কুলি ব'লে এক বাবুসা'ব তারে ঠেলে দিল নীচে ফেলে। চোখ ফেটে এল জল, এমনি ক'রে কি জগৎ জুড়িয়া মার খাবে দুর্বল? যে দধীচিদের হাড় দিয়ে ঐ বাষ্প-শকট চলে, বাবুসা'ব এসে চড়িল তাহাতে, কুলিরা পড়িল তলে। বেতন দিয়াছ?---চুপ্রও যত মিথ্যাবাদীর দল; কত পাই দিয়ে কুলিদের তুই কত ক্রোর পেলি বল! রাজ-পথে-তব চলিছে মোটর, সাগরে জাহাজ চলে, রেলপথে চলে বাষ্প-শকট, দেশ ছেয়ে গেল কলে, বল'ত এ সব কাহাদের দান! তোমার অট্টালিকা কার খুনে রাঙা? ঠুলি খুলে দেখ, প্রতি ইটে আছে লিখা! তুমি জান না ক' কিন্তু পথের প্রতি ধূলিকণা জানে, ঐ পথ, ঐ জাহাজ, শকট, অট্টালিকার মানে!'
জানো কি বন্ধু! আসল দরিদ্র কে? মনের দারিদ্র্য বা দীনতাই সবচেয়ে বড় বালাই। 'যার সব আছে কিন্তু ধন নেই, সে দরিদ্র। কিন্তু তার থেকে বেশী দরিদ্র সেই ব্যক্তি, যার ধন ছাড়া অন্য কিছুই নেই।' অভাবী বন্ধু আমার! কোন কিছুকে ভালোবেসো না, তাহলে তার অনুপস্থিতিতে তুমি কষ্ট পাবে না। আর অর্থ-লালসা হৃদয়ে রেখো না, তাহলে নিজেকে কখনো গরীব ভাববে না। যথাসাধ্য প্রয়াসে দীনতা দূর কর। হীনতা বরণ করো না। অভাবে স্বভাব নষ্ট করো না। 'যদি দীন সহ অহরহ রহ মতি তব হীন হইবে, সমানের সনে থাক একমনে মতি সমভাবে রইবে।'

📘 জীবন দর্পণ > 📄 প্রেম-ভালোবাসা

📄 প্রেম-ভালোবাসা


প্রেম-ভালোবাসা নিয়ে পৃথিবীর অভিজ্ঞজনেরা নানা কথা বলেছেন। প্রেমের সৃষ্টিকর্তা মহান আল্লাহ বলেছেন,
{وَمِنْ آيَاتِهِ أَنْ خَلَقَ لَكُم مِّنْ أَنفُسِكُمْ أَزْوَاجًا لِّتَسْكُنُوا إِلَيْهَا وَجَعَلَ بَيْنَكُم مَّوَدَّةً وَرَحْمَةً إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآيَاتٍ لِّقَوْمٍ يَتَفَكَّرُونَ} (۲۱) سورة الروم
অর্থাৎ, আর তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে আর একটি নিদর্শন এই যে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য হতেই তোমাদের সঙ্গিনীদেরকে সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা ওদের নিকট শান্তি পাও এবং তোমাদের মধ্যে পারস্পরিক ভালোবাসা ও মায়া-মমতা সৃষ্টি করেছেন। চিন্তাশীল সম্প্রদায়ের জন্য এতে অবশ্যই বহু নিদর্শন রয়েছে। (রুমঃ ২১)
পবিত্র প্রেমের পরশে সংসার হয়ে ওঠে বেহেস্তী বাগান। দুনিয়া থেকে দূরীভূত হয় হিংসা ও বিদ্বেষের জ্বালা-যন্ত্রণা।
'স্নেহ আর ভালোবাসা বড়ই পবিত্র। স্নেহ আর ভালোবাসা দিয়ে বনের পশু-পাখিকেও পোষ মানানো যায়।'
'প্রেম আছে বলে পৃথিবী এত সুন্দর!' প্রীতির রীতি আছে বলেই ধরনী এত মনোরম।
'পিরীতি নগরে বসতি করিব পিরীতে বাঁধিব ঘর, পিরীতই আপন পিরীতই স্বজন তা ভিন সকলই পর।'
ভালোবাসার অভিজ্ঞতা যাদের আছে, তারা জানে ভালোবাসা হারানোর মর্ম। 'যাকে সত্যিকার ভালোবাসা যায়, সে অতি অপমান-আঘাত করলে, হাজার ব্যথা দিলেও তাকে ভোলা যায় না।' 'মন যাকে চায়, তাকে কোন দিনও ঘৃণা করা যায় না।' 'যাকে ভাল লাগে, তাকে ভোলা যায় না।'
মজনু বলেছিল, 'হে মন তুমি তো ওয়াদা দিয়েছিলে যে, আমি লায়লা থেকে তওবা করলে তুমিও তওবা করবে। আমি তো তওবা করেছি, তাহলে লায়লা নাম শুনে তুমি গলে যাও কেন?!' (শায়খ সা'দী)
পবিত্র ভালোবাসায় আছে উৎসাহ, উদ্দীপনা, আনন্দ। 'যাকে ভালোবাসা হয়, সে যদি বড় হয়, তাহলে তার চেয়ে বড় আনন্দ আর কিছু নেই।' 'ভক্তির আলো নিয়ে যারা পথ চলে, ভয়ের অন্ধকার তাদের পথ থেকে সরে যায়।' 'পিরীতের নৌকা পাহাড়ে চলে।'
অজানা-অচেনা সাথীও ভালোবাসায় একাত্মতা প্রকাশ করে। ভালোবাসা এত মধুর! এত স্নিগ্ধময়!
'সমাদরে বুকে তারে লইলাম টানি, সেই সে ফুলের তোড়া আমি ফুলদানি।'
হৃদয়-বিনিময়ের মধ্যে স্বামী-স্ত্রীর মধুসম দাম্পত্য গড়ে ওঠে। 'হৃদয়ের বিনিময়ে হৃদয় পাওয়া যায়। হৃদয় না দিয়ে হৃদয় পাওয়ার আশা করা ভুল।' মুশকিল হল, একতরফা ভালোবাসা। তবুও চেষ্টা কর। 'একটা পাখীকে ধরতে হলে, তাকে ভয় দেখানো চলবে না। তাকে আদর কর, ভালোবাসা দাও, একদিন সে তোমার পোষ মানবেই।'
'ভালোবাসা প্রজাপতির মতো, যদি শক্ত ক'রে ধর, মরে যাবে। হাল্কা করে ধর, উড়ে যাবে। তবে যদি যত্ন ক'রে ধর, তাহলে কাছে রবে।'
জোর ক'রে ভালোবাসা যায় না, ভালোবাসা পাওয়াও যায় না। 'প্রতাপশালী লোককে সবাই ভয় করে, কিন্তু শ্রদ্ধা করে না।' 'গায়ের জোরে সব হওয়া যায়, কিন্তু গুরু হওয়া যায় না।' 'জোর ক'রে দশ-বিশ জনকে নেতা বানানো যায়, কিন্তু নেতাজী বানানো যায় না।' 'জলাশয়ের ধারে একটা ঘোড়াকে জোর ক'রে নিয়ে যাওয়া যায়। কিন্তু তাকে জোর ক'রে জল খাওয়ানো যায় না।' গানের কবি বলেছেন, 'গায়ের জোরে সবকিছু কেড়ে নেওয়া যায়, সোনা-দানা গয়না-পাতি ভালোবাসা নয়।'
ভয় দেখিয়ে পোষ মানানো যায়, নিজের বাধ্য করা যায়, ভক্ত বানানো যায় না। 'ভয়ে প্রাণ যে করিবে দান প্রেম সে তো সঁপিবে না, টাকা দিয়ে শুধু মাথা কেনা যায়, হৃদয় যায় না কেনা।'
'টাকা দিয়ে দামী খাবার কেনা যায়, কিন্তু খিদে কেনা যায় না। টাকা দিয়ে দামী বিছানা কেনা যায়, কিন্তু ঘুম কেনা যায় না। টাকা দিয়ে বই কেনা যায়, কিন্তু জ্ঞান কেনা যায় না। টাকা দিয়ে ওষুধ কেনা যায়, কিন্তু স্বাস্থ্য কেনা যায় না। টাকা দিয়ে একটা স্বামী অথবা স্ত্রী কেনা যায়, কিন্তু ভালবাসা কেনা যায় না। টাকা দিয়ে সুখসামগ্রী কেনা যায়, কিন্তু সুখ কেনা যায় না।'
'টাকা না থাকার ফলে ভালোবাসা চলে যায়। কিন্তু টাকা দিয়ে ভালোবাসা কিনতে পাওয়া যায় না।' 'দরজা দিয়ে অভাব প্রবেশ করলে জানালা দিয়ে ভালোবাসা গোপনে পলায়ন করে। পয়সা থাকলে বন্ধু অনেক হয়, স্ত্রীও ভালোবাসে বেশী।' 'অভাব যখন তুফান হয়ে এসে ঘরের জানালায় আঘাত করে, তখন ভালবাসার ফুলদানি পড়ে গিয়ে ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যায়।' 'দারিদ্রের ঝড়ে ভালবাসার প্রদীপ নিভে যায়।' তবুও ধন দিয়ে মন কিনতে পাওয়া যায় না।
'দয়া দাক্ষিণ্য আনতে পারে, কিন্তু প্রীতি আনতে পারে না।' 'কাউকে আশ্রয় দিলেই সে আপনার হয় না।' আপন করতে মনের অতিরিক্ত আকর্ষণের প্রয়োজন আছে।
পবিত্র প্রেম বড় সুশৃঙ্খল হয়। 'অন্তঃসলিলা ফল্গু নদীর মত নিঃশব্দে ধীরে-ধীরে হৃদয়ের অন্তরতম প্রদেশে লুকাইয়া বহিতে থাকে; কিন্তু উচ্ছৃঙ্খল হইতে পায় না।' 'প্রকৃতিগত ভালোবাসাই একমাত্র ভালোবাসা, যা মানসিক আশা-আকাঙ্ক্ষাকে প্রতারিত করে না।' 'পবিত্র প্রেম একমাত্র মায়ের হয়ে থাকে তার শিশুর সাথে। বাকী প্রত্যেকের প্রেমে কোন না কোন স্বার্থ অথবা কামনা থাকে।'
বিবাহ-বহির্ভূত প্রেম পবিত্র ততক্ষণ থাকে, যতক্ষণ তা হৃদয়-গোলাপের মাঝে সৌরভের মতো লুক্কায়িত থাকে। হৃদয় ছাপিয়ে বাইরে এলেই তা অপবিত্র হয়ে যায়। অনেক পবিত্র প্রেম অজানা-অচেনা ভাবেই বৃদ্ধি পেতে থাকে। গোপন সে প্রেমের কথা জানতে পারে না প্রেমিক, আর না প্রেমিকা। অচেনা আকর্ষণে পূর্ণিমার রাতে জোয়ার আসে, রাতে রাতে হাসুহানা ফুল ফুটে গোপনে গোপনে সুবাস বিতরণ করে। তখন তারা বলে, 'নাই-বা চিনলে আমায় তুমি রইলে অর্ধ চেনা, চাঁদ কি জানে কখন ফোটে চাঁদনী রাতের হেনা?'
ভালোবাসা নিয়ে অনেক কথা আছে। কিন্তু এখানে শুধু অন্ধ, অবৈধ ও অপকারী ভালোবাসার কথা উল্লেখ করব।
ফেসবুকে ভালোবাসার অর্থ দেখলাম। লেখা আছে, 'ভালোবাসার পূর্ণ অর্থ হল, ভা = ভাল-মন্দ চিন্তা না ক'রে, লো = লোকলজ্জা উপেক্ষা ক'রে, বা = বাবা-মার মুখে চুন-কালি দিয়ে, সা = সাগরে ঝাঁপ দেওয়া।
ভালোবাসার অর্থ এক এক জনের নিকট এক এক রকমেরঃ- গণিত শিক্ষক বলেন, 'যার দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও উচ্চতা নেই এবং কেবল গভীরতা আছে, তাকেই ভালোবাসা বলে।'
ডাক্তার বলেন, 'ভালোবাসা এমন এক রোগের নাম, যা ঘুম নষ্ট করে, ক্ষুধা হাস করে ও দুশ্চিন্তা বৃদ্ধি করে।'
পুলিশ বলেন, 'ভালোবাসা এমন এক জেলখানা, যেখানে হৃদয়কে বন্দি রাখা যায়।'
কবি বলেন, 'ভালোবাসা মানে কল্পনায় উদাস হয়ে যাওয়া।'
রাজনীতিবিদ বলেন, 'ভালোবাসা মানে রাজকন্যার সাথে অর্ধেক রাজত্ব লাভ করা।'
ভিক্ষুক বলে, 'ভালোবাসা মানে নিজের মন ভিক্ষা দেওয়া, অপরের মন ভিক্ষা চাওয়া। সব কিছু ছেড়ে পথের ভিখারী হওয়া।'
কুলি বলে, 'ভালোবাসা মানে দুঃখের বোঝা বহন করা।'
মাঝি বলে, 'ভালোবাসা মানে মান-অভিমান ও আবেগের দাঁড় টানা।'
ব্যবসায়ী বলে, 'ভালোবাসা মানে হৃদয়ের বেচাকেনা।'
আর ব্যর্থ প্রেমিক বলে, 'ভালোবাসার কোন অর্থ নেই। ভালোবাসা মানে সুখ কামনায় ব্যর্থতা।'
কেউ বলেছেন, 'ভালোবাসার অর্থ হল, যাকে তুমি ভালোবাসো, তার মতো জীবন-যাপন কর।'
'ভালোবাসার জন্য ভালোবাসা নয়, ভাল ক'রে ভালোবাসার জন্যই ভালোবাসা।'
'ভালো ভাষা' মানে 'ভালোবাসা' নয়। অনেক মিষ্টি কথা মিছরির ছুরি হয়। কিন্তু অনেকে ভালো ভাষাতেই মুগ্ধ হয়ে ভালোবাসতে শুরু করে।
'এখনো তারে চোখে দেখিনি শুধু বাঁশি শুনেছি, মন প্রাণ যাহা ছিল দিয়ে ফেলেছি।'
প্রেমিকের গান, গজল বা কুরআন পাঠে মুগ্ধ হয়ে তার উদ্দেশ্যে প্রেমের উপহার নিবেদন করে। সাক্ষাৎ না হলেও সেই স্মৃতি বুকে ধরে রেখে কালাতিপাত করে।
'স্মৃতি তব দিবারাত্র চিত্তে মম গাঁথা, হৃদয়ে আসীন রূপ সে মধুর কথা।'
'ভালো লাগা, তার নাম ভালোবাসা নয়। ভালোবাসা উভয়ের দিক থেকে জন্ম নেয়, কিন্তু ভালো লাগা একদিক থেকে জন্ম হয়।' সে ক্ষেত্রে অনুরাগী। বলে, 'আমি নিশিদিন তোমায় ভালোবাসি, তুমি অবসর মত বাসিও।'
কিন্তু 'যার জন্য এত চিন্তা, এত ভাবনা, সেই যদি তা জানতে না পারল, তবে চিন্তা-ভাবনা ক'রে লাভ কী?
প্রেম ভাষার অপেক্ষা করে না। অন্তরের আসীন হয়ে অন্তরে অন্তরে কথা বলতে শেখে। ভাষা-বিরোধে হয়তো ভাব প্রকাশ না হওয়ায় বিঘ্ন ঘটে, কিন্তু অন্তরের জিহ্বা পূর্ণ কাজে দেয়।
'ভালোবাসা অন্তর দিয়ে অনুভব করতে হয়, এ ক্ষেত্রে ভাষার প্রয়োজন হয় না।' কিন্তু অন্তরে স্বীকার, মুখে প্রকাশ ও আচরণে প্রমাণ ছাড়া ভালোবাসা পরিপক্ক হয় না।
'ভালোবাসার মজা শিকারীর মত। শিকার তাড়া না করলে শিকারে মজা আসে না।' এই শ্রেণীর ভালোবাসায় প্রেমিক-প্রেমিকা সিনেমার অভিনেতা-অভিনেত্রীর মতো দুঃসাহসিকতা প্রদর্শন ক'রে থাকে।
অনেকে দৈহিক মিলনটাকেই 'প্রেম' মনে করে। অথচ 'প্রেম আর কামনা হল দু'টো সম্পূর্ণ আলাদা জিনিস। প্রেম হচ্ছে ধীর, প্রশান্ত ও চিরন্তন। আর কামনা হচ্ছে সাময়িক উত্তেজনা।'
এই শ্রেণীর প্রেমে থাকে এক প্রকার চুলকানি। চুলকাতে খুব আরাম লাগে। পরিশেষে জ্বালা শুরু হয়।
'আঁখি মেলি যারে ভালো লাগে তাহারেই ভালো বলে জানি। সব প্রেম প্রেম নয় ছিল না সে সংশয় যে আমারে কাছে টানে তারে কাছে টানি।।'
'ভালো' কে? যার মনে লাগে যে। 'পিরীত না মানে ছোট জাত, ঘুম না মানে শ্মশান ঘাট, পিয়াস না মানে ধুবি ঘাট।' 'পিরীতে মজিল মন, কিবা হাঁড়ি কিবা ডোম।' 'পিরীতের পেত্নী ভালো।' 'ভালোবাসা যখন আসে, তখন কোন হিসাব না কষেই আসে।'
'আঁখি তো অনেকে হেরে, বল কারে মনে ধরে? তবে তারে মনে ধরে, যে হয় মনোরঞ্জন।'
শায়খ সা'দী বলেছেন, 'যাদের পেট পূর্ণ তাদেরকে যবের রুটি ভাল লাগবে না। আমার প্রিয়তমা আমার চোখে বড় সুন্দরী; যদিও তোমার চোখে সে কুৎসিত। বেহেস্তী হুরীকে জিজ্ঞাসা কর যে, 'আ'রাফ কী?' বলবে, 'তা একটি দোযখ।' কিন্তু কোন দোযখীকে জিজ্ঞাসা কর, সে বলবে, 'আ'রাফ একটি বেহেশ্ত।'
বাদশা হারুন রশীদ আসমায়ীকে জিজ্ঞাসা করলেন, 'প্রেমের স্বরূপ কী?' বললেন, 'তা এমন জিনিস যে, প্রেমিকার গুণ বর্ণনায় হৃদয় আপ্লুত রাখে এবং তার দোষ দর্শনে অন্ধ থাকে। সুতরাং প্রেমিকার পিঁয়াজের গন্ধও কস্তুরী লাগে।'
এমন অন্ধ প্রেমিকরাই বলে, 'ভালোবাসাতে সরি নেই, ভালোবাসাতে শুধুই ভালোবাসা।'
'নদী যখন বর্ষার জলে পরিপূর্ণ হইয়া প্রবাহিত হয়, তখন সে কি লক্ষ্য করিতে পারে জলরাশি কীভাবে আসিয়া তাহার বক্ষ পূর্ণ করিয়া দিতেছে? নব-যৌবনের হৃদয় যখন কানায় কানায় ভালোবাসায় ভরিয়া ওঠে, তখন প্রেমাস্পদের কত ত্রুটি লক্ষ্যই হয় না।'
অথচ 'ভালোবাসা ভালো, কিন্তু ভালোবাসায় অন্ধ হওয়া ভালো নয়।' কাউকে ভালোবাসলে, তাকে শাসন করতে ভুলে যাওয়া উচিত নয়।
ভালোবাসা কী, ভালোবাসা কেমন? 'ভালোবাসা সমুদ্রের মতো, কাছে টানলে দূরে ঠেলে দেয়।' 'ভালোবাসার এমনি মজা যেমন নাকি ঘি, যাবৎ hot তাবৎ good cold হলেই ছি।'
'ভালোবাসার এমনি গুণ, পানের মধ্যে যেমন চুন। অল্প হলে লাগে ঝাল, বেশি হলে পুড়ে গাল।'
'ভালোবাসা হল মুড়ির মতো, সময় গেলে মিইয়ে যায়।'
কেউ বলেছেন, 'দু'টি পাখির একটি নীড়, একটি নদীর দু'টি তীর। দু'টি মনের একটি আশা, তার নাম ভালোবাসা।'
'ভালোবাসা এমন জিনিস, যা কোন রাজা মূল্য দিয়ে কিনতে পারে না। আবার কোন ফকীর বিনামূল্যে অর্জন ক'রে থাকে।' 'ভালোবাসা কেনা যায় না, ভাগ্যবানেরা এমনিই পায়।'
অনেকে মনে করেন, ভালোবাসা এক প্রকার বৈয়াক্তিক দুর্বলতা। কেউ মনে করেন, ভালোবাসা একটি মানসিক রোগ।
কেউ বলেন, 'ভালোবাসা মনোবিকার ও এক শ্রেণীর পাগলামি।' কেউ বলেন, 'ভালোবাসা দু'টি মন নয়, হরমোনের মিল।'
ভালোবাসা মনের উদারতার নাম। প্রেমিকের ত্রুটি-বিচ্যুতিকে উপেক্ষা করার নামই প্রেম। দু'টি মনের এক হওয়ার নাম ভালোবাসা। ভালোবেসে প্রেমিকা যাই দেবে, যাই বলবে, প্রেমিক তাই ভালোবাসবে।
অনেকে বলেছেন, 'ভালোবাসা হচ্ছে প্রেমের সূর্যোদয়, আর বিবাহ হচ্ছে প্রেমের সূর্যাস্ত। আর প্রেমের দীর্ঘশ্বাস, জ্ঞানের শেষ নিশ্বাস।'
ভালোবাসার অপকারিতা
সম্পর্কের শুরুতে প্রেমিক-প্রেমিকা ভালোবাসা নিয়ে খেলা শুরু করে। কিন্তু সম্পর্ক পাকা হতেই ভালোবাসা তাদেরকে নিয়ে খেলতে শুরু করে।
পুরুষ যদিও সবকিছু নিয়ে খেলতে পারে, কিন্তু প্রেম তাকে নিয়ে আজব খেলা খেলে।
ভালোবাসার আসল পরীক্ষা হয় বিবাহের পরে।
'লোহায় লোহা কাটে বিষে কাটে বিষ, ভালোবাসা বেশী হলে হয়ে যায় রিস।'
'নূতন প্রেমে নূতন বন্ধু, আগাগোড়া কেবল মধু। পুরাতনে অম্লমধুর একটু ঝাঁঝালো।'
'নূতনেই প্রেম মিঠে থাকে, বাসি হলেই টকে।'
'প্রেমের বিয়ের প্রথম বছরে স্বামী শোনে, দ্বিতীয় বছরে স্ত্রী শোনে। আর তৃতীয় বছরে পাড়া-প্রতিবেশী সবাই শোনে!'
তখন দম্পতি বলে, 'দিয়েছিলে হৃদয় যখন পেয়েছিলে প্রাণমন দেহ,
আজ সে হৃদয় নাই যতই সোহাগ পাই শুধু তাই অবিশ্বাস বিষাদ সন্দেহ।'
'যেখানে ভালোবাসা, সেখানেই বেশি ভয়।' অনুপযুক্ত হয়ে প্রেম-ভিক্ষা করলে ঝুলিতে ভর্ৎসনা ছাড়া আর কী পড়তে পারে?
'ভাঙ্গা ঘর থেকে চাঁদ দেখা যায়, কিন্তু তা ধরা যায় না।'
'বামুন হয়ে চাঁদের দিকে হাত বাড়ানো যায়, কিন্তু সেই হাত দিয়ে চাঁদকে ছোঁয়া যায় না।'
'চাঁদের আলো গরীবের কুটিরে পড়তে পারে, কিন্তু চাঁদকে ধরা যায় না।'
'ভালোবাসা দিয়ে মন জয় করা যায়, অবস্থার বৈষম্যকে জয় করা যায় না।'
একদা এক ইঁদুর একটি উটকে দেখে ভালোবেসে ফেলে তার লাগাম ধরে নিজের বাসার দিকে টানতে শুরু করলে উটও তার অনুসরণ করল। গর্তের সামনে দাঁড়িয়ে ইঁদুর মনে মনে বলতে লাগল, 'এমন ঘর বানাও, যা তোমার প্রেমিকের জন্য উপযুক্ত। নচেৎ এমন প্রেমিক কর, যার জন্য তোমার এ ঘর উপযুক্ত হয়।'
'বড়র পিরীত বালির বাঁধ, ক্ষণে হাতে দড়ি ক্ষণে চাঁদ।'
'উপর দিকে তাকিয়ে পথ চললে হোঁচট খেতে হয়।' বড়লোকের মেয়েকে ভালোবাসতে আঘাত খেতে হয়। তখন গাইতে হয় অনুতাপের গান, 'আমি বৃথায় স্বপন করেছি বপন আকাশে, তাই আকাশ-কুসুম করেছি চয়ন হতাশে।'
দূরবর্তী অবস্থানে থেকে বড়কে ভালোবাসলে কান্না ছাড়া আর কী লাভ হতে পারে? আকাশ সাগরকে ভালোবাসে। তাই তো সে তাকে না পেয়ে বৃষ্টির কান্না কেঁদে পৃথিবী ভাসিয়ে দেয়।
আসলে 'যা ভুল ক'রে চাওয়া হয়, তা পেতে কূল যায়।' আর সমতাহীন ভালোবাসাই জীবনে সবচেয়ে বড় ভুল।
'মেয়ে মানুষের ভালোবাসা, সে সবুর করতে পারে না, বিধাতা তার হাতে সে অবসর দেননি। পুরুষ মানুষ অনেক ঠেকে, অনেক ঘা খেয়ে, তারপরে ভালবাসতে শেখে।'
আসলে প্রিয়ের হৃদয়ে ধৈর্য স্থির থাকে না, যেমন চালুনে স্থির থাকে না পানি।
'রাত্রি যত গভীর হয়, প্রভাত তত এগিয়ে আসে। বেদনা যত নিবিড় হয়ে আসে, প্রেম তত কাছে আসে।' আর ধৈর্যচ্যুতি ঘটলেই অঘটন ঘটে।
কপট প্রেমে একে-অন্যকে ধোঁকা দেয় প্রেমিক-প্রেমিকা। একাধিক প্রেমে পড়ে অনেক সময় ধন্দে পড়ে 'দু লায়ে দু পা, মধ্যখানে ডুবে যা'-এর মতো অবস্থা হয়। অনেকে একটা ছেড়ে অন্যকে ধরে। 'প্রেমের লাইন আর ফোনের লাইন একই রকম। একবার কেটে গেলে বিজি হয়ে যায়।'
অনেকে এককে ছেড়ে অন্যকে ধরেও ঠকে এবং তখন বলে, 'ঐহিকের সুখ হবে না বলে দিলাম না এ প্রাণ তোমায়, আমার এ সংসারের সুখ তাও তো হলো না দু'কুল হারালাম হায়।'
অনেকে কোন লোভে পড়ে প্রেম করে। তখন আসলে তারা অর্থকে ভালোবাসে। অথচ 'প্রেমের অধিকার প্রেমিকার ওপর ফলোনো চলে, তার ধনের ওপর নয়।'
'তুমি তাকে ভালোবাসো, যে তোমার কাছে ভালোবাসা ছাড়া অন্য কিছু চাইবে না। আর তাকে উপেক্ষা কর, যে ভালোবাসার নামে অনেক কিছু চায়।'
'যারা দেহ (রূপ-সৌন্দর্য) পছন্দ করে, তাদের যে কোন একটা দেহ হলেই চলে। কিন্তু যারা মন পছন্দ করে, তাদের সেই মন না হলে চলে না, যা তারা পছন্দ করে।'
অবৈধ ভালোবাসা এক প্রকার আযাব। ইবনুল কাইয়েম বলেন, 'যে ব্যক্তি আল্লাহ ছাড়া অন্য কিছুকে ভালোবাসবে, সে তদ্দ্বারা আযাব ভোগ করবে।'
'মরমে লুকানো কত দুখ ঢাকিয়া রয়েছি মানমুখ, কাঁদিবার নাই অবসর কথা নাই শুধু ফাটে বুক।'
'যতনে যাতনা বাড়ে ভালোবাসা এ কেমন, অনিত্য সে অনুরাগ অশান্তির নিকেতন।'
অনেক ভালোবাসা এক প্রকার বোকামি। 'মানুষ তার জীবনের দু'টি সময়ে বড় বোকা হয়, যখন সে ভালোবাসে এবং যখন সে বৃদ্ধ হয়।'
প্রেমের মেঘমালা মনের আকাশে তুফান সৃষ্টি করলে দেহ ও আচরণে পরিবর্তন সূচিত হয়।
'আসক্তির ছয় চিহ্ন জেনো হে তনয়!
দীর্ঘশ্বাস, ম্লানমুখ, সিক্ত অক্ষিদ্বয়। জিজ্ঞাসিলে, অন্য তিন লক্ষণ কোথায়? স্বল্পাহার, স্বল্পাভাষ, বঞ্চিত নিদ্রায়।'
যাকে ভালবাসা হয়, তাকে ভাল থাকতে দেওয়া উচিত। কিন্তু অধিক আকর্ষণে উচ্ছৃঙ্খল হয়ে অনেক ভালোবাসা প্রেমিককে 'মজনু' বা পাগল ক'রে তোলে। তার ফলে তার স্বাস্থ্য নষ্ট হয়, সামাজিক মর্যাদা নষ্ট হয়।
'প্রেমে যার প্রাণ টানে না, ছলনা তার প্রেম কামনা।'
'চেনে তাহা প্রেম, জানে শুধু প্রাণ, কোথা হতে আসে এত অকারণে প্রাণে প্রাণে বেদনার টান।'
'মদে নেশা হয়, কিন্তু প্রেমের নেশা আরো ঘোর।' নেশার ঘোরে কোন আঘাতের কথা যথাসময়ে বুঝতে পারে না। অবশ্য নেশা কেটে গেলে সে ব্যথা অনুভূত হয়।
প্রেমের জিনিস যত দূরে থাকে প্রেম তত বেড়ে চলে। মিলনের সময় যত কাছে হয় ধৈর্যের বাঁধ তত বেশী হারাতে চলে। আর মিলন ঘটে গেলে প্রেমের দশ ভাগের নয় ভাগ নেশা কেটে যায়।
'কাহাকেও যাদু করিয়া বশ করা সত্য হইলেও প্রেম-যাদু মিথ্যা নহে। বরং ইহা আরো অতি ভয়ঙ্কর। কারণ যাদু কোন প্রকারে কাটানো যায়, কিন্তু প্রেম দূর করা যায় না। পাথরে নক্সা কাটার মতন মনে দাগ কাটা যায়।'
'ভালোবাসা ও যুদ্ধে কোন সম্মান নেই।' তাই অবৈধ প্রণয়ী-প্রণয়িণীদের কোন সম্মান থাকে না। সম্মান থাকে না তাদের মা-বাবাদের। ব্যর্থ প্রেমিক- প্রেমিকা বলে,
'প্রেম ক'রে পর সনে পাইতেছি এ যাতনা, প্রাণসম ভাবি পরে পর আপন হল না। না বুঝে মজিলাম পরে না ভাবি কী হবে পরে, এখন না জানি পরে কতই হবে লাঞ্ছনা।'
এমন যাদু ও নেশাগ্রস্ত প্রেমিক তার প্রেমিকের উদ্দেশ্যে বলে, 'আমি আকাশ ছুঁয়েছি, চন্দ্র ছুঁয়েছি, ছুঁয়েছি গ্রহতারা, শুধু তোমার হৃদয় ছুঁয়ে আমি হয়েছি দিশেহারা।'
আর তখন উদ্ভ্রান্ত মনে লজ্জা-শরম কিছুই অবশিষ্ট থাকে না। তখন তাদের বুলি হয়, 'পিয়ার কিয়া তো ডরনা কিয়া?' 'কিসের লজ্জা কিসের ভয়, প্রেম-পিরীতে সবই সয়।' ভয় হয় না সমাজকে। ভয় হয় না পিতামাতার ভালোবাসার কুরবানীকে।
'প্রণয়ের পাত্র যথা যার মন চায়, মাতা-পিতা ক্রোধে তারে যদিচ তাকায়।' এরা প্রেমের জন্য মরতেও প্রস্তুত হয়। প্রেমিকাকে প্রাণ উপহার দিতেও কুণ্ঠাবোধ করে না। এরা প্রেম সার্থক করার লক্ষ্যে নিঃস্ব ও সর্বহারা হতে পারে। এরা বলে,
'প্রাণ যদি চাহ মিত্র দিতে পারি প্রাণ, প্রাণ চেয়ে কিবা প্রিয় বল করি দান।'
'ওগো কাঙাল! আমায় কাঙাল করেছ আরো কি তোমায় চাই? ওগো ভিখারী! আমার ভিখারী--- পলকে সকলি সঁপেছি চরণে আর তো কিছুই নাই।'
ভালোবাসায় ব্যর্থ হয়ে অনেকে কষ্টভোগ করে প্রেমিক-প্রেমিকা। 'কপট প্রেম লুকোচুরি, মুখে মধু হৃদে ছুরি।' 'জলের রেখা, খলের পিরীত' হলে রিক্ততা ছাড়া আর কী পাওয়া যায়?
প্রবঞ্চিতা প্রেমিকা তখন গাইতে থাকে, 'কেন তবে কেড়ে নিলে লাজ-আবরণ! হৃদয়ের দ্বার হেনে বাহিরে আনিলে টেনে, শেষে কি পথের মাঝে করিবে বর্জন? ভালোবাসা তাও যদি ফিরে নেবে শেষে কেন লজ্জা কেড়ে নিলে, একাকিনী ছেড়ে দিলে বিশাল ভবের মাঝে বিবসনাবেশে।।'
আসলে 'ভালোবাসা যা দেয়, তার চেয়ে কেড়ে নেয় বেশী।'
'ভালোবাসা সুখকে হত্যা করে, আর সুখ ভালোবাসাকে হত্যা করে।'
'প্রেম মানুষকে শান্তি দেয়, কিন্তু স্বস্তি দেয় না।'
'প্রেম হল জ্বলন্ত ধূপের মত, যার শুরু হল আগুন দিয়ে, আর শেষ পরিণতি ছাই দিয়ে। তারই মাঝে সুবাস হল প্রেম-জীবনের মাঝে মাঝে কিছু আনন্দ।'
'প্রেমের আনন্দ থাকে শুধু স্বল্পক্ষণ, প্রেমের বেদনা থাকে সমস্ত জীবন।'
'ভালোবাসা আচ্ছাদন নয়, বরং চোখের পানি।'
'ভালোবাসা মহাপাপ, প্রেম তার অভিশাপ। ভালোবাসার শেষফল, বুকে ব্যথা চোখে জল।'
এই জন্য জ্ঞানিগণ উপদেশ দিয়ে বলেন, 'গোলাপ ফুল ফুটে আছে মধুপ হোতা যাসনে, ফুলের মধু লুটিতে গিয়ে কাঁটার ঘা খাসনে।'
প্রেমে বিফল হয়ে প্রেমিক-প্রেমিকা পরিশেষে বলতে বাধ্য হয়, 'বিচ্ছেদের বিচ্ছেদের আশার আশায়, জীবনের খেলা বুঝি শেষ হয়ে যায়।'
'ভুল করেছি বারে বারে তোমায় ভুলে ভুলে, তোমার স্নেহের বাঁধন তবু নাওনি তুমি খুলে।'
'শুনতে যে পাই আমি তোমার পায়ের নুপুর-ধ্বনি তাই তো অনুক্ষণ, তোমার পথের পানে চেয়ে চেয়ে কাঁদে আমার মন।'
'পেরেছি যতেক কুড়ায়ে লয়েছি দুই হাতে ভালোবাসা, বাধ্য আজিকে করিতে সাঙ্গ জীবনের কাঁদা-হাসা।'
'মোরা একই বাগের জোড়া বুলবুলি, যৌবন বসন্তে হর্ষে সদা ফুল তুলি। হেন কালে আসি ঝড় কাঁপি থরথর, দুইধার হই মোরা, আমি তার পর।'
'দেখাতাম আমি হৃদয় খুলে হলে দেখানোর মতো, চিরদিন ধরে তোমায় আমি ভালোবেসেছি কতো।'
'ফুল কেন ফুটেছিলে যদি ঝরে যাবে, ভালো কেন বেসেছিলে যদি ব্যথা দেবে?' 'অভাব যেমন চোর তৈরী করে, তেমনি প্রেম তৈরী করে কবি।' 'প্রেমে যে পড়েনি সে প্রেমের কবিতা লিখতে পারে না।' 'প্রেমের ক্ষেত্রে জয়ী হয়ে কেউ শিল্পী হতে পারে না, বড় জোর বিয়ে করতে পারে। তবে প্রেমের ব্যর্থতায় অনেকে কবি ও শিল্পী হয়েছে।' তুমি হয়তো আমাকে প্রশ্ন করতে পার, আপনিও কি কারো প্রেমে পড়েছিলেন? তাহলে আমি তার জবাবে বলি, 'জাল হাতে জলে আছি জেলে কিন্তু নই, মাছ খেলেই মাছরাঙা প্রমাণ তার কই? ডোরাকাটা দাগ হলেই হয় নাকো বাঘ, বিড়াল হইতে পারে, ভয় নাই ছাগ! গুঁড়িশাল অভিমুখে সুঁড়িঘর পথে চলিলেই মাতাল নহি শুধু অভিমতে। তুমি যা বলিতে চাহ আমি তাহা মানি, নদীর কিনারায় শুধু দিই হাতছানি। দিলামই বা ক্ষতি কী আর নাহি ডরি, বড় ভাসা মাছ নিয়ে যদি খেলা করি। কিংবা প্রিয়ারে ডাকি অপেক্ষায় রই, কিন্তু তুমি ভাব যাহা আমি তাহা নই।' শায়খ সা'দীর ভাষায় বলি, 'মালী আমি, কিন্তু আমার বাগান নেই। প্রেমিক আমি, কিন্তু নির্দিষ্ট কোন প্রেমিকা নেই।'

📘 জীবন দর্পণ > 📄 বন্ধুত্ব

📄 বন্ধুত্ব


সমাজবদ্ধভাবে বসবাসকারী জীব হিসাবের মানুষের একটা বৈশিষ্ট্য হল সদ্ভাব ও সৌহার্দ্য। তার থেকেও বেশি কিছু বন্ধুত্ব ও সখ্য। এ ছাড়া মানুষ চলতে পারে না, বাঁচতে পারে না। কোন মানুষই স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়। কোন মানুষ জীবনে একাকী জয়ী হতে পারে না। আম্বিয়াগণও পারেননি। মানুষের জীবনে সাফল্যের জন্য বন্ধু চাই, ভক্ত চাই, সহমর্মী চাই। সুন্দর ব্যবহারের ফলে যথাসময়ে তা পাওয়া যায়। জীবনের পথে চলতে চলতে কোনও এক স্বার্থে লাভ হয়। কেউ বন্ধুত্বের হাত বাড়ায় দ্বীনের খাতিরে, কেউ দুনিয়ার খাতিরে। কিন্তু মু'মিনরা বন্ধুত্ব স্থাপন করে কেবল আল্লাহর ওয়াস্তে। যে মানুষকে আল্লাহ ভালোবাসেন অথবা যে মানুষ আল্লাহকে ভালোবাসে, তারা তাকে ভালোবাসে। আর তারাই হয় ইহ-পরকালে সফলকাম।
এমন ভক্তের প্রয়োজন আছে, যে ভক্তিভাজনের পক্ষ থেকে প্রতিবাদ করবে, তার প্রতি আরোপিত অপবাদ খন্ডন করবে, তার হয়ে কথা বলবে, তার কৃতিত্ব বর্ণনা করবে ইত্যাদি। তা না হলে মহতের মহত্ত্বের বহিঃপ্রকাশ ঘটে না।
দুনিয়াদার বন্ধুরা বলে, 'বন্ধুত্বের হিসাব অঙ্ক কষে হয় না।' 'বাবা-কাকা দেখে বন্ধুত্ব করা যায় না।' কিন্তু তা সত্য হলেও ঈমানের সবচেয়ে সুদৃঢ় হাতল দুর্বল হতে দেওয়া চলে না।
মহানবী বলেছেন, “ঈমানের সবচেয়ে মজবুত হাতল হল আল্লাহর ওয়াস্তে বন্ধুত্ব করা এবং আল্লাহর ওয়াস্তে শত্রুতা করা, আল্লাহর ওয়াস্তে ভালবাসা এবং আল্লাহর ওয়াস্তে ঘৃণা করা।” (ত্বাবারানী, সঃ জামে' ২৫৩৯নং)
তিনি আরো বলেছেন, ইসলামের সবচেয়ে মজবুত হাতল এই যে, তুমি আল্লাহর ওয়াস্তে সম্প্রীতি স্থাপন করবে এবং আল্লাহর ওয়াস্তে বিদ্বেষ স্থাপন করবে। (আহমাদ, বাইহাক্বীর শুআবুল ঈমান, সঃ জামে' ২০০৯নং)
বন্ধুত্বের দ্বারে করাঘাতকারী বন্ধু আমার! 'তোমার বন্ধু হল তিনজন; তোমার বন্ধু, তোমার বন্ধুর বন্ধু এবং তোমার শত্রুর শত্রু।' কিন্তু যে বন্ধু আল্লাহর বন্ধু, সেই হল তোমার উপকারী।
জানই তো, দুনিয়ার জীবনের চলার পথ বড় অন্ধকার। কিন্তু 'আলো দেখাবার লোক থাকলে অন্ধকারেও পথ চলা যায়।' তোমার বন্ধু যদি আলোকবর্তিকা হয়, তাহলে অন্ধকারে ভয় কীসের?
'যার প্রকৃত বন্ধু আছে, (ত্রুটি দেখার জন্য) তার কোন দর্পণের প্রয়োজন নেই।' সৎ পথে চলার জন্য সেই বন্ধুই তোমার শ্রেষ্ঠ সাথী। 'জ্ঞানীদের সংসর্গ হৃদয়ের আবাদ।' 'একজন বিজ্ঞ বন্ধু হল সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ।'
তবে তুমি যদি অজ্ঞ হও, তাহলে বিজ্ঞ বন্ধু তোমার যোগ্য নয় বলেই তুমি তার বন্ধুত্বলাভে ধন্য হবে না। 'চারটি জিনিস সত্বর অপসৃত হয়; মেঘের ছায়া, জ্ঞানী-অজ্ঞানীর বন্ধুত্ব, আহমকের ধন এবং মিথ্যা সুনাম।' চরিত্রবান বন্ধু তোমাকে চরিত্রবান হতে সাহায্য করবে। 'গোলাপ ফুল ধরলে তার কিছু সুগন্ধ অবশ্যই হাতে লাগবে।' একজন সৎ লোক অন্য একজনকে সৎ লোক হিসাবে গড়ে তুলতে নিশ্চয়ই সহযোগিতা করবে। কিন্তু বড় দুঃখের বিষয় যে, দরদী বন্ধুর সংখ্যা নেহাতই কম। পরার্থপর বন্ধু নগণ্য বললেই চলে। গণনায় হয়তো তোমার বন্ধু অনেক, কিন্তু মসীবতে কয়জনকে পাও? অথচ 'বিপদের সময় যে হাত বাড়িয়ে দেয়, সেই সত্যিকারের বন্ধু।'
'সুসময়ে বন্ধু বটে অনেকেই হয়, অসময়ে হায় হায় কেহ কারো নয়।'
স্বার্থপর কপট বন্ধু ছায়ার মত। সে রোদের সময় সাথে থাকে। আর মেঘের সময় অদৃশ্য হয়ে যায়। প্রয়োজনে তেমন বন্ধু কাজে আসে না। সে বন্ধু 'নানী' হয়, 'জানী' হয় না। ('নান' ফারসীতে রুটিকে বলা হয়।)
ইবনে আব্বাস বলেন, 'আমার কাছে সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ বন্ধু সেই ব্যক্তি, যে লোকের ভিড় ঠেলে এসে আমার কাছে বসে। আল্লাহর কসম! তার দেহে মাছি বসলেও আমার মনে বড় কষ্ট হয়।' এমন দরদী না হলে সে আবার বন্ধু কীসের?
'ধনবত্তা বন্ধুত্ব সৃষ্টি করে, আর বিপদ করে তাদেরকে পরীক্ষা।' আগুনে দিলে যেমন খাঁটি সোনা জানা যায়, বিপদে পড়লে তেমনি খাঁটি বন্ধু চেনা যায়। নচেৎ জবানের ও দস্তরখানের বন্ধুর অভাব নেই।
হযরত আলী-কে তাঁর বন্ধুর সংখ্যা সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি উত্তরে বললেন, 'বর্তমানে সে সংখ্যা নির্ণয় করা মুশকিল। কারণ, এখন আমার নিকট পার্থিব ধন-সম্পদ আছে, তাই সকল মানুষই আমার বন্ধু। সঠিক সংখ্যা তখনই বলতে পারব, যখন এ ধন-সম্পদ আমার হাত-ছাড়া হবে। আর শ্রেষ্ঠ বন্ধু তো সেই, যে তোমার অভাব ও মসীবতের সময় বন্ধু।'
'চলার পথে অনেক বন্ধু আসে-যায়। কিন্তু যারা অন্তরের নিভৃতে স্থায়ী আসন পাততে পারে, তারাই প্রকৃত বন্ধু।'
'মানুষের পরিচয় জানতে তার বন্ধুদের পরিচয় দেখ। কারণ, সাধারণতঃ বন্ধু বন্ধুর অনুকরণ ক'রে থাকে।' ভালোবাসার রীতিই এই যে, যাকে ভালোবাসা হয়, তার সকল আচরণকে ভালো লাগে বলেই ভালোবাসা হয়।
'চারটি জিনিস ভালোবাসা সৃষ্টি ক'রে থাকে; হাসি মুখে সাক্ষাৎ, উপকার সাধন, সহমত অবলম্বন এবং কপটতা বর্জন।'
'সবচেয়ে নিকৃষ্ট হল সেই বন্ধু, যে কপটতার সাথে পথ চলে; যে অত্যাচারিতের কাছে কাঁদে এবং অত্যাচারীর কাছে হাসে।'
'তোমার বন্ধু যদি ৩টি কর্ম না করে, তাহলে তার নামে হাত ধুয়ে নাওঃ অঙ্গীকার পালন, সম্পদ ব্যয় এবং রহস্য গোপন।'
'কেউ বন্ধুত্ব করার জন্য যদি শর্ত মানতে প্রস্তুত হয়, তাহলে এই শর্ত আরোপ করো যে, সে কোন দিন মিথ্যা বলবে না।'
স্বার্থত্যাগ ও বিসর্জন ছাড়া ভালোবাসা হয় না। সুতরাং বন্ধুত্ব করার পূর্বেই ভেবে নিয়ো, বন্ধুত্বে কুরবানী চাই।
দুই বন্ধুর মাঝে যদি অহংকার আসে অথবা স্বার্থপরতার প্রাচীর খাড়া হয় এবং একজন যদি অপরজনের মতোই ব্যবহার শুরু ক'রে দেয়, তাহলে তো পৃথিবী থেকে বন্ধুত্বই নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। বন্ধুত্বের প্রকৃতি হল, বন্ধুত্বে খেয়ানত না করা। বন্ধুর প্রকৃতি এ নয় যে, যেখানে স্বার্থ সেখানে আছে।
পশুবধকারী শিকারীর সাথে সঙ্গীরূপে একটি কুকুর থাকে। বন্ধুরা কিন্তু সেরকম হয় না। বরং উভয়ের উচিত, বন্ধুর বন্ধুত্বের কদর করা। বন্ধুর পদস্খলন ক্ষমা করা এবং গোপনীয় বিষয়কে গোপন রাখা।
বন্ধুত্ব বজায় ও বহাল রাখার একটি উপায় এই যে, তোমার সাথী রেগে গিয়ে যখন অসমীচীন কথা বলতে শুরু করে, তখন তুমি চুপ হয়ে যাও। কারণ তার অবস্থা তখন মাতালের মতো হয়, যা বলে তা নিজেই বুঝতে পারে না। পরবর্তীতে সে ঠান্ডা হলে নিজেই লজ্জিত হবে এবং তার ভুল বুঝতে পারবে।
বন্ধুত্ব বজায় রাখতে ধৈর্যধারণ কর এবং বল, 'তুমি যতই আমার প্রতি সন্দেহমূলক ব্যবহার কর, বন্ধু আমি সব সয়ে নিই, এই আশঙ্কায় যে, হয়তো বা আর কোন বন্ধু আমার ভাগ্যে জুটবে না।'
মুআয বিন জাবাল বলেছেন, 'যখন তুমি আল্লাহর ওয়াস্তে কাউকে ভালোবেসেছ, তখন তার সাথে তর্ক করো না, তার দোষ ধরো না এবং তার ব্যাপারে কাউকে জিজ্ঞাসাবাদ করো না। কারণ, হতে পারে যে, জিজ্ঞাসিত ব্যক্তি তোমাকে তার ব্যাপারে এমন কথা বলবে, যা তার মধ্যে নেই এবং তার ফলে তোমাদের ভ্রাতৃত্ব নষ্ট হয়ে যাবে।'
অনেকে বলে, 'বন্ধুত্বের একটি নীতি হল, নো স-রি, নো থ্যাঙ্ক ইউ।' কিন্তু তার মানে এই নয় যে, তা বলা যাবে না। বরং বললে বন্ধুত্বের গাঢ়তা বৃদ্ধিলাভ করবে।
বন্ধুর কোন দোষ হলে তাকে নির্জনে ভর্ৎসনা কর, কিন্তু লোকালয়ে তার প্রশংসা কর। কারণ লোকালয়ে তার ভুল ধরলে অথবা লাঞ্ছিত করলে বন্ধুত্বের সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যাবে।
বন্ধুত্বে সমতা থাকা বাঞ্ছনীয়। 'তোমার চেয়ে যে নিচে, তার সাহচর্য গ্রহণ করো না। কারণ, হয়তো তুমি তার মূর্খতায় কষ্ট পাবে এবং তোমার চেয়ে যে উচ্চে, তারও সাহচর্য গ্রহণ করো না। কারণ, সম্ভবতঃ সে তোমার প্রতি গর্ব ও অহংকার প্রকাশ করবে। তুমি যেমন, ঠিক তেমন সমমানের বন্ধু, সঙ্গী ও জীবন-সঙ্গিনী গ্রহণ করো, তাতে তোমার মন ব্যথিত হবে না।'
ইবরাহীম বিন আদহামকে জিজ্ঞাসা করা হল, 'আপনি লোকেদের সঙ্গে মিশেন না কেন? উত্তরে তিনি বললেন, 'কারণ, যদি আমার চেয়ে নিচু মানের লোকের সাথে মিশি, তাহলে সে তার মূর্খতায় আমাকে কষ্ট দেয়। যদি আমার চেয়ে উঁচু মানের লোকের সাথে মিশি, তাহলে সে আমাকে অহংকার দেখায়। আর যদি আমি আমার সমতুল কোন লোকের সাথে মিশি, তাহলে সে আমার প্রতি হিংসা করে। তাই আমি তাঁর সংসর্গে নিরত থাকি, যাঁর সংসর্গে কোন বিরক্তি নেই, যাঁর বন্ধুত্বের কোন বিচ্ছিন্নতা নেই এবং যাঁর সংসর্গে কোন বিচ্ছিন্নতাবোধ নেই।'
উমার বিন খাত্তাব বলেন, 'নির্জনতায় মন্দ সাথী থেকে নিরাপত্তা আছে।'
আওন বিন আব্দুল্লাহ বলেন, 'আমি ধনীদের সাথে উঠা-বসা করতাম। তাতে আমি মনে মনে দুঃখিত হতাম, যখন দেখতাম তাদের পোশাক আমার পোশাক থেকে উত্তম এবং তাদের সওয়ারী আমার সওয়ারী অপেক্ষা উত্তম। অতঃপর গরীবদের সাথে উঠা-বসা শুরু করলাম। আর তাতে পেলাম মানসিক শান্তি।'
শায়খ সা'দী বলেছেন, 'হাতি-ওয়ালার সাথে বন্ধুত্ব করো না। নচেৎ, আগে হাতি রাখার ঘর তৈরী কর।'
আর 'খারাপ লোকের সাথে বসো না; যদিও তুমি ভালো লোক হও। কারণ, শারাবখানায় নামায পড়লেও লোকে তোমাকে শারাবী বলে জানবে।'
'মন্দলোকের সাহচর্য ভালো লোকেদের প্রতি কুধারণা রাখতে উদ্বুদ্ধ করে।'
'উত্তম নিশ্চিন্তে চলে অধমের সাথে, তিনিই মধ্যম যিনি চলেন তফাতে।'
'কাছাকাছি আগুন লাগলে আঁচ তো গায়ে লাগবেই।' পচা আপেলের পাশাপাশি আপেলে পচন অবশ্যই ধরবে।
বন্ধুত্বের খাঁটিত্ব পরীক্ষা করতে পারো। আম্র বিন আলা' বলেন, 'যদি তুমি জানতে চাও যে, তোমার বন্ধুর নিকট তোমার কী মান রয়েছে, তাহলে তোমার পূর্বে ওর কোন বন্ধুর মান জানার চেষ্টা কর।'
সুফিয়ান সওরী বলেন, 'যদি তুমি বন্ধুর কাছে তোমার মান কতটা তা জানতে চাও, তাহলে তাকে রাগিয়ে দিয়ে পরীক্ষা কর। রাগে যদি সে তোমার প্রতি ইনসাফ করে, তাহলে সে তোমার বন্ধু, নচেৎ তুমি তার সাহচর্য থেকে দূরে থেকো।'
'তিন তিনবার রাগান্বিত করার পরেও যে মানুষ তোমার বিরুদ্ধে কোন কটু কথা বলেনি, তাকে তোমার বন্ধু বানিয়ে নাও।'
এক ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসা করা হল যে, তোমার চোখে তোমার বন্ধু কেমন? বলল, 'সে আমার চোখে ছোট। কারণ তার চোখে দুনিয়া অনেক বড়।' বলা বাহুল্য, বন্ধুকে দুনিয়াদারি দিকে ঝুঁকতে দেখলে তোমার চোখে সে ছোট হয়ে যাবে। অনুরূপ তুমিও দুনিয়াদার হলে তার চোখে তুমি ছোট হয়ে যাবে।
বন্ধুত্বের জন্য নিজের হৃদয়-দ্বার সম্পূর্ণ উন্মুক্ত করা উচিত নয়। ইমাম শাফেয়ী বলেন, 'লোকের সাথে একেবারে না মিশলে শত্রুতা সৃষ্টি হয়, আর অধিক অধিক (যার-তার সাথে) মিশলে অসৎ বন্ধু এসে পড়ে। সুতরাং এই দুয়ের মধ্যবর্তী পথ অবলম্বন কর।' ফেসবুকের বন্ধুদের এ অভিজ্ঞতা অবশ্যই আছে।
এই জন্য 'সবার সঙ্গে ভদ্র আচরণ কর। কিন্তু অন্তরঙ্গ কর কয়েকজনের সাথে।'
'মানুষ প্রত্যেকের নিকট বন্ধু অথবা প্রত্যেকের নিকট শত্রু হতে পারে না। সুনাম করার যেমন বন্ধু থাকে, তেমনি দুর্নাম করার শত্রুও থাকে। তোষামদের বলেও সকলের নিকট বন্ধু হওয়া অসম্ভব।'
তবুও 'যে সব মানুষের বন্ধু হয়, সে আসলে কারো বন্ধু নয়। সে একজন জনদরদী।'
বন্ধুত্বের প্রয়োজন হয় সময়ে-অসময়ে মনের কথা খুলে বলার জন্য। 'মনের মত সঙ্গীর সাথে কথা বলে যতটা আনন্দ পাওয়া যায়, ততটা আর নয়।' ‘কোন কাজে পাওয়া যায় না।’
জীবনে ৩ ধরনের সহচর প্রয়োজন; (পুরুষের জন্য পুরুষ) বন্ধু, স্ত্রী ও বই। (মহিলার জন্য মহিলা) বন্ধু, স্বামী ও বই।
‘একটি ভাল বই হল বর্তমান ও চিরদিনের জন্য সবচেয়ে উৎকৃষ্ট বন্ধু।’
মানুষের সাথী ৩ প্রকার:- প্রথম সাথী মরণ পর্যন্ত সাথে থাকে; আর সে হল তার ধন-সম্পদ। দ্বিতীয় সাথী কবরে প্রবেশ হওয়া পর্যন্ত তার সাথে থাকে; আর তা হল তার আত্মীয়-স্বজন। আর তৃতীয় সাথী তার ইহ-পরকালে চিরদিনের জন্য সাথে থাকে; আর তা হল তার আমল। সুতরাং মধ্য জগতে ভালো বন্ধু পেতে হলে ভালো আমলের প্রয়োজন খুব বেশি।
পৃথিবীর বন্ধুর পথে বন্ধুর একান্ত প্রয়োজন। তবে প্রত্যেক বন্ধুই যে উপকারী হবে, তার কোন নিশ্চয়তা নেই। কারণ, ‘বন্ধু বন্ধুর উপকার যতখানি করতে পারে, ক্ষতিও করতে পারে ততখানি।’ বন্ধু বন্দুক হয়ে গেলে তার আঘাতে ধরাশায়ী হতে হবে অসময়ে। আর জানই তো, ‘শত্রু প্রকাশ্য হলে তার দ্বারা যত ক্ষতি হয়, বন্ধু শত্রু হলে ফল হয় আরো মারাত্মক।’
‘বন্ধু অপেক্ষা শত্রুকে পাহারা দেওয়া সহজ।’ বন্ধু যদি বন্ধ ঘরে বন্ধুত্বের সুযোগ নিয়ে তোমার স্ত্রীকেও বন্ধু মনে করে, তাহলে তার কুফল কতটা তিক্ত হতে পারে, তা অনুমান করতে পারো। অবশ্য তুমি যদি তথাকথিত ‘উদারপন্থী’ হও, তাহলে সে কথা আলাদা।
তবে কেবল সন্দেহবশে কারো প্রতি অন্যায়াচরণ করো না। যেমন কোন ক্ষুদ্র ত্রুটির কারণে বন্ধুত্বের মূলে কুঠারাঘাত করা ন্যায়পরায়ণ মানুষের উচিত নয়। ‘যার সাথে চিরদিনের মিতালি, এক মুহূর্তে তাকে জীবন থেকে দূর করে দেওয়া সমীচীন নয়।’
হযরত উমার বলেন, ‘যখন তোমাদের মধ্যে কেউ কোন ভাইয়ের তরফ থেকে ভালোবাসা পায়, তখন সে যেন তা বজায় রাখতে যত্নবান হয়। কারণ, এমন ভালোবাসা বড় দুর্লভ।’
প্রকৃত বন্ধু যাকে বলা হয়, তা বড় দুর্লভ। ‘প্রকৃত বন্ধু হল সেই, যে ছায়ার ন্যায় তোমার সঙ্গে থাকে, নিজের ক্ষতি ক'রে তোমার উপকার করে। তোমাকে অক্ষত রাখার জন্য সে নিজেকে ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন করে ফেলে।’ আছে কি তেমন বন্ধু কেউ?
বাদশা মামুনের নিকট মুখারেক নামক ব্যক্তি আবুল আতশিয়ার একটি কবিতা ছত্র আবৃতি করলেন, যার অর্থ হল, "আমি মুখাপেক্ষী এমন এক বন্ধুর ছায়ার, যে নির্মল ও পরিচ্ছন্ন হবে, যখন আমি তাকে নোংরা ক'রে ফেলব।”
মামুন তাঁকে বললেন, 'কবিতাটি পুনরায় আবৃতি কর।' তিনি আবার আবৃতি করলেন। এইভাবে ৭ বার পাঠ করার পর বাদশা তাঁকে বললেন, 'ওহে মুখারেক! আমার এই খেলাফত তুমি নিয়ে নাও। আর তার বিনিময়ে ঐ রকম একটি বন্ধু আমাকে এনে দাও।'
বন্ধুত্বের জন্য কিছু দান করতেও হয়। যেহেতু দানে বন্ধু আনে। আত্মা বিন আবী রাবাহ এক ব্যক্তিকে বলতে শুনলেন, 'আমি ত্রিশ বছর ধরে একটি বন্ধুর খোঁজে আছি, কিন্তু আজও তার সন্ধান মেলেনি। তিনি তাকে বললেন, সম্ভবতঃ তুমি এমন বন্ধুর খোঁজে আছ, যার কাছে কিছু পেতে চাও? তুমি যদি এমন বন্ধু খোঁজ করতে, যাকে কিছু দিতে চাও, তাহলে অনেক বন্ধুই পেতে।'
অবশ্য দানের বিনিময়ে প্রতিদানের আশা রেখো না। তুমি অপরের বন্ধু হও, আর এ লোভ রেখো না যে, কেউ তোমার বন্ধু হবে। আর তুমি যদি চাও যে, এমন বন্ধু গ্রহণ করবে, যার কোন ত্রুটি নেই, তাহলে জীবনে তুমি কোন বন্ধুই পাবে না।
এক দার্শনিককে জিজ্ঞাসা করা হল, 'সবচেয়ে লম্বা সফর কার?' উত্তরে তিনি বললেন, 'যে একটি বন্ধুর খোঁজে সফর করে।'
'সত্যিকারের বন্ধুত্ব এমন একটি চারাগাছ যা ধীরে ধীরে বাড়ে।'
'বন্ধুর জন্য তুমি কুরবানী দেবে এটা তো সহজ; কিন্তু কঠিন হল এমন বন্ধু পাওয়া, যে সেই কুরবানী পাওয়ার যোগ্যতা রাখে।'
'বন্ধুত্ব করা মাটি দিয়ে মাটির উপর 'মাটি' লেখার মতো সহজ। কিন্তু বন্ধুত্ব রক্ষা করা পানি দ্বারা পানির উপর 'পানি' লেখার মতো কঠিন।'
'মিত্র লাভ অতি সুলভ, কিন্তু মৈত্রী রক্ষা করাই কঠিন।'
'সবচেয়ে অক্ষম ব্যক্তি হল সেই, যে বন্ধুত্ব করতে অক্ষম। আর তার চেয়েও অক্ষম হল সেই ব্যক্তি, যে বন্ধুত্ব ক'রে তা হারিয়ে ফেলে।'
'এমন দুই হারানো জিনিস; যার তরে কেঁদে কেঁদে চক্ষু হতে রক্তধারা প্রবাহিত হয়, তবুও তার এক দশমাংশ হক আদায় হয় না। প্রথম হল যৌবন এবং দ্বিতীয় হল বন্ধু।' স্ত্রী-বিয়োগ অথবা তার প্রেম-বিয়োগও একই জিনিস। বরং থেকেও যে না থাকার মতো থাকে, তার যন্ত্রণা আরও বেশি, আরও বেশি বেদনাময়। যার মন মারা যায়, কিন্তু দেহ থাকে কাছে, তার বিকল রোবটের মতো আচরণ সত্যই দুর্ভাগ্যজনক।
বন্ধু আমার! ভালো বন্ধুর সন্ধানে থাকো। আর দুআ করো, 'হে আল্লাহ! নিশ্চয় আমি তোমার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি মন্দ প্রতিবেশী থেকে। এমন স্ত্রী থেকে, যে বৃদ্ধ হওয়ার আগেই আমাকে বৃদ্ধ বানাবে। এমন সন্তান থেকে, যে আমার প্রভু হতে চাইবে। এমন মাল থেকে, যা আমার জন্য আযাব হবে। এবং এমন ধূর্ত বন্ধু থেকে, যার চোখ আমাকে দেখে এবং তার হৃদয় আমার প্রতি লক্ষ্য রাখে, অতঃপর ভাল কিছু দেখলে তা পুঁতে ফেলে এবং খারাপ কিছু দেখলে তা প্রচার করে।' (ত্বাবারানী, সিঃ সহীহাহ ৩ ১৩৭নং)

📘 জীবন দর্পণ > 📄 জীবনে স্বামী, স্ত্রী ও বন্ধুর গুরুত্ব

📄 জীবনে স্বামী, স্ত্রী ও বন্ধুর গুরুত্ব


জীবন একটি সফরের নাম। যে সফরে আছে মরু-প্রান্তর, জল-জঙ্গল, সাগর-তরঙ্গ। সফরের সাথী না হলে একাকী বড় কঠিন পথ চলা। এমন সাথী, যে শোকে সান্ত্বনা দেবে, দুঃখে সঙ্গ দেবে, চোখের পানি মুছে দেবে, যথাস্থলে সাহায্য করবে, ভাল কাজে উৎসাহিত করবে, মন্দ কাজে বাধা দেবে, অন্ধকারে পথ দেখাবে, অন্ধের যষ্টি হবে, আল্লাহর ওয়াস্তে ভালবাসবে, আল্লাহর আনুগত্যে সহযোগিতা করবে।
সে জীবনের সুখ কোথায়? যে জীবনে সব কিছু আছে, কিন্তু মনের মানুষটি নেই। এমন দুনিয়া বৃtha, যে দুনিয়ায় মনের মতো একটি সাথী নেই। জীবনের সবচেয়ে বড় দুঃখ হল, দুঃখের কথা বলবার বা শুনবার কেউ না থাকা।
'সুখ ভাগ করলে বেড়ে যায়, কিন্তু দুঃখ ভাগ করলে কমে যায়।' কিন্তু ভাগ দেওয়া ও নেওয়ার মতো কেউ না থাকলে জীবনের শ্রীর ঋদ্ধি-বৃদ্ধির আর উপায় কী বল?
দুঃখের কথা অপরকে বললে দুঃখ অনেকটা হাল্কা হয়ে যায়। কিন্তু মানুষের এমন কিছু দুঃখ আছে, যার কথা সে কাউকে বলতে পারে না। আর তখন সে তা মনের মধ্যে চাপা রেখে সীমাহীন কষ্টাগ্নিতে দগ্ধ হতে থাকে।
এমনও মানুষ আছে, যে মনের মতো কোন বন্ধু পায় না। স্ত্রীরূপে একজনকে পেলেও সে একটা নারী পায়, মনের মানুষ পায় না। অথবা স্বামীরূপে একজনকে পেলেও সে একটা পুরুষ পায়, একটা অবলম্বন পায়, কিন্তু মনের মানুষ পায় না। মনের কথা সে তাকে খুলে বলতে পারে না। বললেও যে কান খুলে শ্রবণ করে না, শুনলেও গ্রাহ্য করে না। চোখ তুলে তাকিয়ে দর্শন করে না। অথবা যে অবজ্ঞা ও ঘৃণার দৃষ্টিতে তাকায়। যার সাথে মনের মিল হয় না। মত-অভিমতে ভিন্নতার পূর্ব-পশ্চিমের ব্যবধান। পছন্দ- অপছন্দে আকাশ-পাতাল তফাত!
এমনও সন্তান আছে, যার বাপ অথবা মা দ্বিতীয় বিয়ে ক'রে নতুন সংসার পেতেছে। সন্তান অবলম্বনহীন হয়ে অকূল দুঃখ-পাথারে তলিয়ে গেছে। কেউ মুক্ত আকাশে ভাসমান মেঘের মতো বাতাসের গতিবেগের সাথে ঘুরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। দুয়ারে-দুয়ারে ফিরে আঘাত খাচ্ছে। স্নেহহারা হয়ে সর্বহারা হয়েছে সে সন্তান।
'ছিল যারা অনুকূল, তারা হয়ে প্রতিকূল যায় চলে অকূলে ফেলিয়া।' জীবনে যখন দুঃখের তুফান নেমে আসবে, তখন কেউ তোমার সঙ্গ দেবে না। 'কেউ তোমার অমৃতময় পানীয় প্রত্যাখ্যান করবে না, কিন্তু জীবনের গরল তোমাকে একাই পান করতে হবে।' যদি তাই হয়, তাহলে অনুমান কর সেই অবস্থার অন্তর্জালা।
প্রাণের স্বামী যদি পরদারিক হয়, প্রিয়তমা যদি অন্যাসক্তা হয়, পতির যদি দুর্মতি হয়, স্ত্রী যদি ইস্ত্রি হয়ে যায় এবং বন্ধু যদি বন্দুক হয়ে যায়, তাহলে দুঃখের কথা আন্দাজ করতে পার।
'সুখ-দুঃখ মাঝে দোলে নিবিড় আঁধারে, অকূলে না কূল পায় দারুণ শৃঙ্খল পায় নিরানন্দ নিরুপায় পলাইতে নারে।'
এত প্রশস্ত এ দুনিয়ার পুষ্পোদ্যানের প্রমোদ-বিহারে সুখ কীসের, যদি পায়ের জুতাই সংকীর্ণ হয়? স্বামী যদি মনের মতো না হয়, স্ত্রী যদি মনের কথা না বোঝে, তাহলে সংসারে শান্তি কোথায়?
যে তোমার কাঁদনে কাঁদে না, তোমার হাসিতে হাসে না, তোমার মনের কথা বুঝে না, তোমার অভিমান মানায় না, তোমার মনের অনুকূলে থাকে না, তাকে নিয়ে কি শান্তি পাবে কখনও?
'যা কিছু আমাদের ব্যক্তিগত ইচ্ছার সাথে মিল খায়, তাই আমরা বিশ্বাস করি। যা মেলে না, তার জন্য আমাদের রাগ হয়।' স্বামী-স্ত্রীর জীবনেও এমন অনেক সমস্যা আছে, যেগুলির সমাধান প্রত্যেকে নিজ নিজ খেয়াল-খুশি অনুসারে করতে চায়। ফলে সমস্যা আরো বৃদ্ধি পায়।
এ জীবন কোন যাত্রা-সিনেমা নয়। তবুও অনেক মানুষ আছে, যারা যাত্রা- সিনেমার মতো অবাস্তব ব্যবহার চায়। বিধায় বাস্তব জীবনে সমস্যার সমাধান মিলে না।
'আমাদের সমস্যার উত্তর পাওয়া এতো কঠিন, এতে অবাক হওয়ার কিছু আছে? একটা অঙ্কের সমাধান কি সম্ভব, যদি আগেই ভেবে নিই দুই আর দুইয়ে পাঁচ হয়? তবুও এমন ঢের লোক আছে যারা দুই আর দুয়ে পাঁচ বা পাঁচশো হয় ভেবে নিজের আর অন্যের জীবন অতিষ্ঠ ক'রে তোলে।'
সংসারের ভেলা নদীর জোয়ারে ভাসমান তরির মতো বয়ে চলে না। বরং অধিকাংশ সংসারের গাড়ি চাকাহীন গাড়ির মতো, যা চলে বা চলতে বাধ্য হয় টানে অথবা ঠেলায়। যাদের ভাগ্য ভাল, তারা পায় চাকাবিশিষ্ট গাড়ি। আর যাদের ভাগ্য মন্দ, তারা চাকাহীন গাড়ি পায় অথবা চাকাবিশিষ্ট পেলেও পথ পায় বন্ধুর।
স্ত্রী তোমার অর্ধাঙ্গিনী। কিন্তু মনের মতো না হলে তোমার অর্ধেক অঙ্গ বিশ্বস্ত। যেমন একাধিক স্ত্রীর মাঝে ইনসাফ না করতে পারলে কিয়ামতেও তোমার অর্ধাঙ্গ বিশ্বস্ত থাকবে। ফাল্লাহুল মুস্তাআন।
'বক্ষ হইতে বাহির হইয়া আপন বাসনা মম ফিরে মরীচিকাসম। বাহু মেলি তারে বক্ষে লইতে বক্ষে ফিরিয়া পাই না, যাহা চাই তাহা ভুল করে চাই, যাহা পাই তাহা চাই না।'

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00