📄 দুঃখী মানুষ
অনেক মানুষ দুঃখ পায়, বরং সংসারের অধিকাংশ মানুষ কোন না কোনভাবে দুঃখ-কষ্ট পেয়ে থাকে। অবশ্য সবাই যে সে দুঃখ পাওয়ার উপযুক্ত---তা নয়।
কারণ বহু মানুষ স্বকৃত ভুল বা পাপের প্রতিফল স্বরূপ দুঃখ ভোগ করলেও অনেক মানুষকে আল্লাহ দুঃখ দিয়ে পরীক্ষা করেন। আগুনে পুড়লে সোনা খাঁটি কি না বোঝা যায়। আর দুঃখ-কষ্টে পড়লে মানুষ সাহসী কি না, তা বোঝা যায়। বুঝা যায় ঈমানের মজবুতি। সোনার খাঁটিত্ব যাচাই করার জন্য যেমন পাথরে ঘসা হয় অথবা আগুনে জ্বালানো হয়, তেমনি বিশেষ বিশেষ বান্দাকে প্রতিপালক যাচাই-বাছাই ক'রে নেন। দুঃখ-কষ্ট দিয়ে তার গোনাহ ঝরিয়ে দেন।
আল্লাহর রসূল বলেছেন, "কোন মুমিনকে যখনই কোন রোগ অথবা অন্য কিছুর মাধ্যমে কষ্ট পৌছে, তখনই আল্লাহ তার বিনিময়ে তার পাপরাশিকে ঝরিয়ে দেন; যেমন বৃক্ষ তার পত্রাবলীকে ঝরিয়ে থাকে।” (বুখারী ৫৬৪৮নং মুসলিম ২৫৭ ১নং)
মহানবী বলেছেন, "সকল মানুষ অপেক্ষা নবীগণই অধিকতর কঠিন বিপদের সম্মুখীন হন। অতঃপর তাঁদের চেয়ে নিম্নমানের ব্যক্তি এবং তারপর তাদের চেয়ে নিম্নমানের ব্যক্তিগণ অপেক্ষাকৃত হাল্কা বিপদে আক্রান্ত হন। মানুষকে তার দ্বীনের (পূর্ণতার) পরিমাণ অনুযায়ী বিপদগ্রস্ত করা হয়; সুতরাং তার দ্বীনে যদি মজবুতি থাকে, তবে (যে পরিমাণ মজবুতি আছে) ঠিক সেই পরিমাণ তার বিপদও কঠিন হয়ে থাকে। আর যদি তার দ্বীনে দুর্বলতা থাকে, তবে তার দ্বীন অনুযায়ী তার বিপদও (হাল্কা) হয়। পরন্ত বিপদ এসে এসে বান্দার শেষে এই অবস্থা হয় যে, সে জমীনে চলা ফেরা করে অথচ তার কোন পাপ অবশিষ্ট থাকে না।” (তিরমিযী, ইবনে মাজাহ, ইবনে হিব্বান, সহীহুল জামে' ৯৯২ নং)
দুঃখ আসে মুমিন বান্দার মর্যাদাবর্ধনের জন্য। মহানবী বলেন, “আল্লাহর তরফ থেকে যখন বান্দার জন্য কোন মর্যাদা নির্ধারিত থাকে, কিন্তু সে তার নিজ আমল দ্বারা তাতে পৌঁছতে অক্ষম হয়, তখন আল্লাহ তার দেহ, সম্পদ বা সন্তান-সন্ততিতে বালা-মসীবত দিয়ে তাকে বিপদগ্রস্ত করেন। অতঃপর তাকে এতে ধৈর্য ধারণ করারও প্রেরণা দান করেন। (এইভাবে সে ততক্ষণ পর্যন্ত বিপদগ্রস্ত থাকে) যতক্ষণ পর্যন্ত না সে আল্লাহ আয্যা অজাল্লার তরফ থেকে নির্ধারিত ঐ মর্যাদায় উন্নীত হয়ে যায়!” (আহমদ, সহীহ আবু দাউদ ২৬৪৯ নং)
দুঃখ আসে আমাদেরকে শিক্ষা দেওয়ার জন্য। দুঃখ যেমন আমাদেরকে কাঁদায়, তেমনি আমাদেরকে শিক্ষাও দিয়ে যায়। সুতরাং জ্ঞানী হল সেই ব্যক্তি, যে মসীবতের সময় ধৈর্য ধারণ করে এবং সেই মসীবত থেকে উপদেশ গ্রহণ করে।
জ্ঞানী হল সেই ব্যক্তি, যে নিজের বিপদ থেকে শিক্ষা নেয়। কিন্তু তার থেকেও বড় জ্ঞানী হল সেই ব্যক্তি, যে নিজের ও পরের বিপদ দেখেও শিক্ষা নেয়।
কিছু মানুষ আছে, যারা খামোখা দুঃখ ভোগ করে। নিজের মন থেকে দুঃখ সৃষ্টি ক'রে দুঃখ বহন করে। সুতরাং তাদের অদৃষ্টে কোনদিন শান্তি লেখা থাকে না।
কোন কোন শ্বশুর-শাশুড়ী তাদের বউয়ের নিকট অতিরিক্ত খিদমত পাওয়ার আশা রাখে। অতঃপর তাদের আকাঙ্ক্ষিত খিদমত না পেলে বউয়ের প্রতি রাগ ও দুঃখ হয়।
কোন কোন স্ত্রী স্বামীর কাছে অতিরিক্ত ভালবাসা পেতে চায়। সেই চাহিদায় স্বামীর কাছে সংসারের মেয়েলি কাজও পেতে পছন্দ করে। অতঃপর স্বামী তা না করলে অন্য মহিলার স্ত্রৈণ স্বামীর সে কাজ করা দেখে নিজের প্রতি ধিক্কার এনে কষ্ট পায়।
কোন কোন স্বামীও অনুরূপ স্ত্রীর কাছে অতিরিক্ত ভালবাসা পাওয়ার কামনা রাখে। অনেক সময় নাটক-সিনেমায় অভিনীত অথবা উপন্যাস-রূপকথায় কল্পিত প্রেম-ব্যবহার পেতে চায় তার নিকট থেকে। অতঃপর তা না পেয়ে মনে মনে বড় দুঃখ পায়।
অনেক পিতামাতাও নিজেদের সন্তানদের নিকট থেকে অতিরিক্ত আনুগত্য না পেয়ে অনুরূপ দুঃখ ভোগ করতে থাকে।
পক্ষান্তরে তারা যদি বাস্তবকে মেনে নিয়ে উক্ত আশা না করত এবং সে আশা পূরণ না হওয়াটাকে স্বাভাবিক বলে স্বীকার ক'রে নিতো, তাহলে মনে দুঃখ এসে বাসা বাঁধত না এবং কষ্ট তাদের হৃদয়-দ্বারে আঘাত হানত না।
কিন্তু অনেক মানুষ আছে, যারা অসম্ভবকে সম্ভব ক'রে পেতে চেয়ে মনে কষ্ট পায়। অবাস্তব কল্পণাপ্রসূত সুখ কামনা ক'রে নিজের জীবনকে বিষময় ক'রে তোলে। অথচ আকাশ-কুসুম কল্পিত অলীক সুখ পাওয়ার আশা ক'রে সামান্য সুখ থেকেও নিজেকে বঞ্চিত করা উচিত নয়। কবি বলেছেন, 'সব ব্যথারই ওষুধ আছে, হয়তো বা তা নেই, থাকে যদি হাত পেতে নাও, চেয়ো না অলীককেই।'
বহু আবেগময় মানুষ আছে, যারা পরের দুঃখ দেখে কাঁদে। কোন দুঃখময় ঘটনা শুনে অথবা পড়ে চোখ দিয়ে অশ্রুধারা প্রবাহিত করে। পরের দুঃখে দুঃখী হয় ও কষ্ট পায়। অবশ্য এ কথা সত্য যে, পরের দুঃখ দেখে এমনি কান্না আসে না, যদি না নিজের দুঃখের সাথে তার কোন মিল থাকে। ভুক্তভোগী মানুষ অপরের ভোগান্তি দেখে দুঃখ পায়। বঞ্চিত মানুষ অপরের বঞ্চনা দেখে মনে ব্যথা পায়। অত্যাচারিত মানুষ অপরের প্রতি অত্যাচার হতে শুনে বা দেখে হৃদয়ে বেদনা অনুভব করে। যার যেখানে ব্যথা, সেখানে ঘা লাগলে ব্যথা তো অবশ্যই বাড়বে।
বহু মানুষ আছে, যারা অতিরিক্ত সুখ কামনা করে। সুখের সাথে সখ্য বেশি বলে তাতে সামান্য ত্রুটি হলেই দুঃখ অনুভব করে। কবি বলেছেন, 'সুখ-দুঃখ দু'টি ভাই--- সুখের লাগিয়া যে করে পিরীতি দুখ যায় তারই ঠাঁই।'
অতিরিক্ত সুখের আশা, অতিরিক্ত সম্ভোগের ইচ্ছা মানুষকে অস্থির ও উদ্বেগাকুল ক'রে তোলে। তার মনের উদ্যানে শান্তি ও আনন্দের পুষ্পরাজি শুষ্ক হয়ে ঝরে পড়ে। অতিরিক্তি সুখের আশায় মনের স্বস্তিও হারিয়ে ফেলে।
কবি বলেছেন, 'সুখেতে আসক্তি যার, আনন্দ তাহারে করে ঘৃণা, কঠিন বীর্যের তারে, বাঁধা আছে সম্ভোগের বীণা।'
যে চালক গাড়ি কোথায় থামাতে হয় জানে না, সে অবশ্যই দুর্ঘটনাগ্রস্ত হয়। জীবনের চলার পথে যে মানুষ কোথায় থামতে হয় জানে না, তার বড় দুঃখ ও কষ্ট হয়। যে মানুষ প্রেম-প্রীতি-ভালবাসা, স্নেহ-শ্রদ্ধা, ভয়-ভক্তি-লজ্জা, রাগ-বিতৃষ্ণা ইত্যাদির সঠিক পরিমাণ-মাত্রা জানে না, সে অবশ্যই দুঃখ পায়।
অনেক মানুষ আছে, যারা হারিয়ে যাওয়া স্মৃতিকে জড়িয়ে ধরে থেকে জীবনের বর্তমান সুখকে বরবাদ করে। পুরনো প্রেম, পূর্বেকার স্বামী অথবা স্ত্রী, পূর্বেকার দেশ, ছেড়ে যাওয়া সন্তান, পুরনো পদ, খ্যাতি ও বংশমর্যাদা ইত্যাদি মনের আধারে সযত্নে সংরক্ষণ ক'রে প্রাত্যহিক স্মরণে নিজেকে কষ্ট দেয়। অবশ্য বর্তমানের তুলনায় অতীতের সুখ যদি বেশি ছিল বলে মনে হয়, তাহলে তাতে দুঃখের পরিমাণ বেশি বৃদ্ধি পায়।
যেখানে খুব ভালোর আশা থাকে, সেখানে ভালোও মন্দ হয়ে দেখা দিলে মনে বড় দুঃখ হয়। যাকে সোনা বলে জ্ঞান ছিল, ঘষার পর পিতল প্রমাণিত হলে বড় দুঃখ হয়। যিনি বড় বড় আদর্শের কথা বলেন, তিনিই আদর্শচ্যুত প্রমাণিত হলে মনে বড় কষ্ট হয়। মিষ্টি মিষ্টি কথা শুনে নিঃস্বার্থ মনে হওয়ার পর স্বার্থ উদ্ধার হলে সে কেটে পড়লে বড় দুঃখ হয়। রক্ষককে ভক্ষকরূপে দেখলে, আলেমের ঘরে আমলহীনতা দেখলে, ইমামের বাড়িতে ঈমানহীনতা পরিদৃষ্ট হলে মনে বড় আঘাত লাগে। আঘাত আরো বেশি লাগে তখন, যখন তাদেরকে নিয়ে পথ চলতে হয়, সংসার করতে হয়, আত্মীয়তা বজায় রাখতে হয়। 'যাকে করি ছি, সেই ভাতের পাশে ঘি' হয়ে যখন সামনে আসে, তখনকার ঘৃণা ও দুঃখ কি সহজ মনে করতে পার? 'যার নামে উপবাস, তারই সঙ্গে বনবাস' হলে কত দুঃখজনক হয় কল্পনা কর। যার ছোঁয়া-জল খেতে মন সায় দেয় না, তার বাড়া-ভাত খেতে হলে কত কষ্ট হয় বল? অভিশপ্তের সাথে সুদীর্ঘ সফরে কাল কাটানো কত বড় যন্ত্রণাদায়ক অনুমান কর!
যার ভালবাসা দেওয়ার কথা ছিল, সে যদি ভর্ৎসনা দেয়, যার পুরস্কার দেওয়ার কথা ছিল, সে যদি তিরস্কার দেয়, যার পিতা হওয়ার কথা ছিল, সে যদি চিতা হয়ে যায়, যার মাতা হওয়ার কথা ছিল, সে যদি যাঁতা হয়ে যায়, যার জীবন-সঙ্গী হওয়ার কথা ছিল, সে যদি জীবন-জঙ্গী হয়, যার বাধ্য ছেলে হওয়ার কথা ছিল, সে যদি কেলে-সাপ হয়ে যায়, তাহলে দুঃখ রাখার ঠাঁই পাওয়া যাবে কি? ভেবে দেখ সেই সময়কার অস্বস্তিকর পরিস্থিতির কথা, যখন কোন খাবার গিলতেও পার না, ফেলতেও পার না, কাঁটা গলায় আটকে গিয়ে নিচেও যায় না, বেরিয়েও আসে না!
বল তো ভাইটি, যার জন্য চুরি কর, সেই যদি তোমাকে চোর বলে, যার জন্য বনবাসী, সেই যদি তোমার গলায় ফাঁসি দেয়, যার জন্য বুক ফাটে, সে যদি তোমাকে এঁকে কাটে, যাকে আনতে দিলে কড়ি, সে যদি দেয় তোমার গলে দড়ি, যার জন্য সাজন-ভাবন, সেই যদি তোমার দিকে চোখ তুলে না দেখে, তাহলে তোমার মনে কত দুঃখ, কত কষ্ট হয়?
উপকার করার পর উপকৃত ব্যক্তি যদি কৃতজ্ঞ না হয়, তাহলে উপকারীকে বড় দুঃখ লাগে। অকৃতজ্ঞ হওয়ার পরেও যদি শত্রুতা করে, তাহলে দুঃখ লাগে আরো বেশি। নদী পার হয়ে যদি মাঝিকে 'শালা' বলে কেউ গালি দেয়, তাহলে সে গali নিশ্চয়ই গুলি হয়ে হৃদয় ঝাঁঝরা ক'রে দেয়! এই জন্য আরবী প্রবাদে বলা হয়,
اتَّقِ شَرَّ مَنْ أَحْسَنْتَ إِلَيْهِ.
অর্থাৎ, তুমি যার প্রতি অনুগ্রহ করেছ, তার মন্দ থেকে সাবধান থেকো।
সুতরাং উপকার ক'রে তার বিনিময়ে প্রত্যুপকার বা কৃতজ্ঞতার আশা করো না, তাহলে দুঃখ পাবে না। বরং উপকার করার পর অন্নদানকারীদের মতো বলো,
{إِنَّمَا نُطْعِمُكُمْ لِوَجْهِ اللَّهِ لَا تُرِيدُ مِنكُمْ جَزَاء وَلَا شُكُورًا } (۹) سورة الإنسان
অর্থাৎ, (তারা বলে,) 'শুধু আল্লাহর মুখমণ্ডল (দর্শন বা সন্তুষ্টি) লাভের উদ্দেশ্যে আমরা তোমাদেরকে অন্নদান করি, আমরা তোমাদের নিকট হতে প্রতিদান চাই না, কৃতজ্ঞতাও নয়। (দাহর: ৯)
জ্ঞানিগণ বলেন, 'কৃতজ্ঞতা বোধ অনেক কষ্টেই জাগ্রত হয়। সাধারণ মানুষের মধ্যে সেটা আশা করা বাতুলতা।'
'এ পৃথিবীতে ভালোবাসা পাওয়ার একটাই পথ আছে, আর তা হল প্রতিদান পাওয়ার আশা না ক'রে কেবল ভালোবেসে যাওয়া।'
'আমরা যদি সুখী হতে চাই, তাহলে কৃতজ্ঞতা বা অকৃতজ্ঞতার কথা ভুলে যাওয়া ভালো। আর দান করার আনন্দেই দান করা উচিত।'
পক্ষান্তরে সে কৃতঘ্ন যদি আপন কেউ হয়, তাহলে তো গোদের উপর বিষফোঁড়া। 'সময় গুণে আপন পর, খোঁড়া গাধার ঘোড়ার দর' যখন হয়, তখন তোমার দুঃখের পরিধি আরো বর্ধিত হয়। আপন ছেলে যদি পরের ছেলে হয়, সে যদি মায়ের বেটা নয়, শাশুড়ীর জামাই হয়, তাহলে সে দুঃখের কথা আর বলবে কাকে? 'যে সন্তান অকৃতজ্ঞ, তার দাঁতের ধার সাপের চেয়েও বেশী।' আর সে ছেলের ছোবলের দংশন-জ্বালা সহ্য করা কি তত সহজ?
যুবক বয়সে নিজ অর্ধাঙ্গিনীর সাথে তোমার মা-বাপের বনিবনাও না হলে বাপুত্তি ঘর ছাড়তে বাধ্য হলে, তোমাদের ছেলে-মেয়ে তোমাদের অবাধ্য হলে অথবা বউমায়ের সাথে তোমাদের বনিবনাও না হলে তোমরা নিজের বানানো-সাজানো-গুছানো সুখের বাসা ত্যাগ করতে বাধ্য হলে পারবে কি সামাল দিতে?
তবে হ্যাঁ, মসীবতে অনেক সময় মানুষের জন্য আযাবের লেবাসে রহমত থাকে। দুঃখ-কষ্ট অনেক সময় তুচ্ছ মানুষকে বড় মানুষ ক'রে তোলে।
জ্ঞানিগণ বলেন, 'যে আঘাত তোমাকে শেষ করতে পারে না, সে আঘাত তোমাকে শক্তিশালী করবে।' 'দুঃখের মত এত বড় পরশপাথর আর নেই।' হয়তো বা তোমার দুঃখ সেই জাতীয়। তুমি হয়তো পড়ে থাকা মলিন স্বর্ণ। তাই তোমাকে আগুনে দিয়ে হাতুড়ির আঘাত দ্বারা পিটিয়ে পিটিয়ে নতুন কোন অলঙ্কার প্রস্তুত করা হচ্ছে। হয়তো বা তুমি শোভা পাবে কোন বিলাসিনীর দেহে।
প্রত্যেক মানুষের জীবনে মূলতঃ দুটো দুঃখ থাকে; একটি হল ইচ্ছা অপূর্ণ থাকা। অন্যটি হল ইচ্ছা পূরণ হলে অন্যটির প্রত্যাশা করা। যা আছে, তা নিয়ে সন্তুষ্ট না হওয়ার দুঃখ, অল্পে তুষ্ট না হওয়ার দুঃখ, অনেক বেশি কিছু পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা পূরণ না হওয়ার দুঃখ মানুষকে অতিষ্ঠ ক'রে তোলে।
যত খাই, তত খেতে চায় আরো মন মেটে না মনের আশা, লোভী এ জীবন।
লোভী আদম সন্তানের এ আশা বড় দুর্দমনীয়।
আল্লাহর রসূল বলেছেন, "যদি আদম সন্তানের সোনার একটি উপত্যকা হয়, তবুও সে চাইবে যে, তার কাছে দুটি উপত্যকা হোক। একমাত্র মাটিই তার মুখ পূর্ণ করতে পারবে। আর যে তওবা করে, আল্লাহ তার তওবা গ্রহণ করেন।” (বুখারী-মুসলিম)
যে মানুষ নিরাশাবাদী হয়, তার দুশ্চিন্তা আসে। মরার আগে সে মরতে বসে, আঘাতপ্রাপ্ত হওয়ার আগে সে ব্যথা পায়। তাকে কেবল আজকের কথা ভাবতে বললে বলে, 'আজকের মধ্যে আজ শেষ নয়। কাল বলেও একটা কথা আছে।'
কিন্তু ভাইটি আমার! কোন সেতু না আসা পর্যন্ত সেটা অতিক্রম করার চেষ্টা করো না। নদী আসার আগে কাপড় তুলো না। আগামী কালের দুশ্চিন্তাকে মনে স্থান দিয়ে আজকের খুশীকে নষ্ট ক'রে দিয়ো না। কারণ এমনও হতে পারে যে, কালকের দুশ্চিন্তা দূর হয়ে যাবে অথচ আজকের খুশী থেকেও তুমি বঞ্চিত রয়ে যাবে।
গুলির আওয়াজ শুনতে পাও? ভয় পাওয়ার কোন কারণ নেই। কারণ, যে গুলি তোমাকে হত্যা করবে, তার আওয়াজ তুমি শুনতেই পাবে না।
যা ঘটে, তাতে মানুষ যতটা না আঘাত পায়, তার চেয়ে বেশী আঘাত পায় সেই ঘটনা সম্পর্কে তার সমালোচনা ও অভিমতের ফলে। ঘরে-ঘরে ঝগড়া হলে, পিতা-মাতার সাথে মতোবিরোধ বাধলে, স্বামী-স্ত্রীর মাঝে মনোমালিন্য সৃষ্টি হলে বাইরের লোককে খুব দাপাদাপি করতে দেখা যায়। যখন 'মায়ের পোড়ে না মাসীর পোড়ে, পাড়া-পড়শীর ধবলা ওড়ে', 'যার গরু সে বলে বাঁঝা, পাড়া-পড়শী বলে সাত-বিয়েন', তখন মনে বড় দুঃখ হয়, বড় কষ্ট হয়।
আর এক দুঃখ বিরোধীদেরকে নিয়ে। যে তোমার প্রতি হিংসুটে, পরশ্রীকাতর, বিদ্বেষী বা প্রতিদ্বন্দ্বী, তাদের কথা চিন্তা করলে, তাদের বিরোধিতার কথা মাথায় রাখলে তোমার সুখ হরণ হয়ে যাবে। সুতরাং সে ক্ষেত্রে তুমি জ্ঞানিদের উপদেশ মেনে চল, 'স্বার্থপরেরা যদি তোমার উপর টেক্কা দিতে চায়, তাহলে তা তুচ্ছজ্ঞান ক'রে বাতিল কর। শোধ নেওয়ার দরকার নেই। যখন শোধ নেওয়ার চেষ্টা করবে, তখন জানবে, তার ক্ষতি করার চাইতে তুমি নিজেরই ক্ষতি ক'রে বসবে।'
সেই গাড়ি চালকের মতো নিজের ক্ষতি করবে, যাকে পিছন অথবা পাশ থেকে অন্য এক গাড়ি টেক্কা দিতে চেয়েছিল। অতঃপর তাকে জিততে দেবে না সংকল্প ক'রে তার প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুরু করল। পরিশেষে এক সময় দুর্ঘটনাগ্রস্ত হল তার গাড়ি।
তুমি যদি কাউকে টেক্কা দিয়ে কারো উপকার করতে যাও অথবা উপহার দিতে যাও, তবুও পারবে না। ক্ষতিগ্রস্ত হবে অথবা বিষাদগ্রস্ত হবে। তুমি অন্যান্যের তুলনায় কম দিলে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় হেরে যাবে ঠিকই কিন্তু বেশি দিলে বলবে, 'দানের জিনিস দিয়েছে, যাকাত থেকে দিয়েছে' ইত্যাদি। হীন মনের মানুষদের সাথে টেক্কায় তুমি পেরে উঠবে না।
সুতরাং উচিত হল, যে ব্যক্তি তোমার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চায়, যে ব্যক্তি তোমাকে গুরুত্ব না দিয়ে ঘোড়া ডিঙিয়ে ঘাস খেতে চায়, তাকে উপেক্ষা করে চল। নচেৎ দুঃখ পাবে। একজন বিদ্যান বলেছেন, 'যাদেরকে পছন্দ করি না, তাদেরকে নিয়ে এক মিনিটও ভেবে আমি সময় নষ্ট করি না।'
অনেক মানুষ হয় হিংসুটে, ঈর্ষাবান। ফলে তারা মনে মনে জ্বলে-পুড়ে ছারখার হয়। পরশ্রীকাতরতার যন্ত্রণায় নিজেকে অসুখী ক'রে রাখে। পরের সুখের মতো সুখ পেতে চায়, পরের প্রতিভার মতো নিজের প্রতিভা দাবী করে, রূপে ও গুণে অন্যের মতো হতে চাওয়া কি সহজ ব্যাপার?
জ্ঞানিগণ বলেন, 'যারা অন্যের মত হওয়ার চেষ্টা করে, তাদের মত হতভাগ্য আর কেউ নেই। যদি সে নিজে শারীরিক ও মানসিক দিক দিয়ে অন্যরকম কিছু হয়।'
সুতরাং সুখী হতে হলে নিজের স্বতন্ত্রতা ও স্বকীয়তা বজায় রেখে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। নচেৎ পরের অনুকরণ ও নকল করতে গিয়ে নিজেকে মনঃকষ্টের আগুনে পড়ে থাকতে হবে।
অনুরূপ অহংকারীরাও সুখী হয় না। যে নিজেকে বড় মনে করে, অথচ পরে তাকে ছোটই ভাবে, সে তখন মনে মনে অস্বস্তি ও কষ্টবোধ করে। মানুষকে তুচ্ছজ্ঞান করলে মানুষও তাকে তুচ্ছজ্ঞান করে, ফলে তার মনে সুখের বাসা বাঁধে না। 'গাঁ মানে না আপনি মোড়ল' হলে মনে সুখ থাকে না। যে রাজা ভক্তির বলে প্রজাদের মন জয় না ক'রে শক্তির বলে তাদের ভূমি জয় ক'রে রাজত্ব করে, সে রাজা আর যা পাক, রাজসুখ পায় না। প্রত্যেক সংসারের সুখ অনুরূপই।
তাছাড়া ধন থাকলেই মনে সুখ পাওয়া যায় না। বরং ধন থাকলে উৎকণ্ঠা ও দুশ্চিন্তা বাড়ে। তাছাড়া ধন অনেক ধনীকে উচ্ছৃঙ্খলতায় উদ্বুদ্ধ করে। আর তাতে তাদের বাহ্যিক সুখ অনেক দুঃখ বয়ে আনে। আফলাতুন হাকীম বলেছেন, 'ধনীরা সাধারণতঃ ভালো লোক হয় না, আর তার জন্যই তারা সুখী নয়।'
অধিকাংশ মানুষের দুঃখ ও মনঃকষ্ট সেই জিনিস প্রকাশ করার চেষ্টারই ফল, যা তাদের নেই। অথচ তারা এ কথাও জানে না যে, মিথ্যা ঠাটবাট সত্বর বিলীয়মান। তাছাড়া মিথ্যা ঠাটবাট বজায় রাখতে যেমন বেগ পেতে হয়, তেমনি তা প্রকাশ পেলে মানুষের কাছে লাঞ্ছিত হতে হয়। মিথ্যা বংশগৌরব, আভিজাত্য-গর্ব বা পদমর্যাদার সাময়িক অহংকার মানুষকে সর্বদা মনঃকষ্টে জর্জরিত রাখে।
দুঃখী ভাই ও বোনটি আমার! তুমি নিজ মন থেকে দুঃখকে দূরীভূত করবে কীভাবে? বাঁচতে তো হবেই। জীবনে দুঃখ এসেছে বলে জীবনকে থামিয়ে দেওয়া যায় না। সমুদ্রে ঢেউ উঠেছে দেখে ডোবার আগেই লা ডুবিয়ে দেওয়া যায় না। সুতরাং বাঁচার তাকীদে প্রয়াস চালাতে হবে। দুঃখ-দুর্দশা মুছে ফেলার চেষ্টা করতে হবে।
দুঃখময় বন্ধু আমার! 'মনের চিন্তাকে রোখার ক্ষমতা নেই, মুখ চুপ থাকতে পারে না এবং অঙ্গ-প্রত্যঙ্গও সঞ্চালন বিনা স্থির থাকতে পারে না। এ সবগুলিকে তুমি যদি মহান কাজে লাগাতে না পার, তাহলে অবশ্যই ছোট কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়বে। যদি সেগুলিকে ভালো কাজে ব্যবহার না করতে পারো, তাহলে অবশ্যই খারাপ কাজে লিপ্ত হয়ে পড়বে। সুতরাং তোমার সকল চিন্তা ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে উঁচু আকাশে উড়তে শিখাও, নীচের আকাশে উড়তে অপছন্দ করবে। এ সবকে উচ্চতায় অভ্যস্ত কর, হীনতা অপছন্দ করবে।'
অবশ্য ভাবনার সময় থাকলে, তুমি ভাবতেই পার। কিন্তু কোন কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকলে ভাবনা ভুলতে পার। নচেৎ, দুশ্চিন্তা হল বেকারত্বের বন্ধু। কর্ম ও জ্ঞান-চর্চাকারী মানুষের কোন দুশ্চিন্তা হয় না, মানসিক রোগ হয় না। কারণ তাদের কোন অবসরই নেই। জ্ঞান-গবেষকরা বলেন, 'গবেষণাগার আর পাঠাগারেই শান্তি থাকে।'
'দুঃখী হয়ে ওঠার রহস্য হল, আপনি সুখী না দুঃখী ভাবতে পারার মত সময় থাকা।'
নিজের অসুখী জীবনের দিকে সর্বদা নজর দিলে মোটেও কেউ সুখী হতে পারে না। বিগত জীবনের দুঃখ ও স্মৃতিকে নিয়ে মন খারাপ রাখলে, সুখী জীবনও তিক্তময় হয়ে ওঠে। 'আল্লাহর রাজত্বে একটা মাত্র পথেই গঠনমূলকভাবে অতীতকে গ্রহণ করা যেতে পারে। আর তা হল অতীতের ভুলকে শান্তভাবে বিশ্লেষণ ক'রে তা থেকে উপকার লাভ করা। নচেৎ সঙ্গে সঙ্গেই অতীতকে ভুলে যাওয়া প্রয়োজন।'
বল তো বন্ধু! করাত দিয়ে কাঠের গুঁড়া কাটলে কী লাভ? অতীত নিয়ে দুশ্চিন্তা করা করাত দিয়ে কাঠের গুঁড়া কাটার মতোই। জীবন যে গতিতে চলছে, তাকে তুমি ফিরাতে পারবে না। পারবে না অবশ্যম্ভাবী প্রতিহত করতে চিন্তার মাধ্যমে। বার্ধক্যকে আটকে দিতে পার না। পার না নিজের যৌবন ফিরিয়ে আনতে। 'জীবন-প্রবাহ বহে কাল-সিন্ধু পানে ধায়, ফিরাব কেমনে?' লাভ কী সে কেমনত্বের কথা ভেবে? অবশ্য যতদিন জীবন থাকে, ততদিন ভালোরূপে রাখার চেষ্টা করতে হবে। আর সেই চেষ্টার একটি হল এই যে, তুমি দুশ্চিন্তা করবে না।
জ্ঞানিগণ বলেন, 'চেষ্টা করো দুধ যাতে না পড়ে যায়। তবে পড়ে গেলে তা নিয়ে যেন অনুশোচনা করো না।'
'বুদ্ধিমান মানুষরা কখনো তাঁদের ক্ষতি নিয়ে ভাবতে চান না; বরং খুশী মনে সেই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে চেষ্টা করেন।'
সুতরাং জীবনের কোন নিঝুম রাতে দুরন্ত দুষ্টু শিশুর মতো দুশ্চিন্তা ঘুমিয়ে গেলে তাকে জাগিয়ে দিয়ো না। তাকে আরামের সাথে ঘুমাতে দাও। তুমিও আরাম পাবে।
নচেৎ, 'যে ব্যক্তি অতীতের দুশ্চিন্তার কারাগারে নিজেকে বন্দী রাখে, সে ব্যক্তির ভবিষ্যৎও গড়ে ওঠে না।' তবে এ কথাও সত্য যে, 'এমন অনেক দুঃখ আছে, যাকে ভুলার মত দুঃখ আর নেই।'
অনুরূপ যে বিপদ আসার আশঙ্কা আছে, তা আসার পূর্বেই তুমি শঙ্কিত ও আতঙ্কিত হয়ো না। কারণ, মসীবতের আশঙ্কাটাই মসীবত এসে পড়ার চেয়ে অধিক ভয়ঙ্কর।
'মানুষ স্বপ্নে সুখ দেখলে সকালে তা দেখা যায় না, কিন্তু দুঃখ দেখলে তা সকাল হওয়ার আগেই মনের ভিতরে প্রকাশ পায়।' এটাই মানুষের প্রকৃতি। কিন্তু তা হলে অবাস্তব দুঃখ দেখে নিজের সুখকে নষ্ট করা হবে। সুতরাং মনোরোগী হয়ে মনের সুখকে বরবাদ করো না। যেহেতু 'ব্যাধির চেয়ে আধিই (মানসিক পীড়া) হল বড়।' দেহের আঘাতের চেয়ে মনের আঘাতের বেদনা অনেক বেশী।
দুঃখ ও দুশ্চিন্তা তোমার বাকী সব কিছু কেড়ে নিতে পারে। দুশ্চিন্তা মানুষের মনোযোগ দেবার ক্ষমতা নষ্ট ক'রে দেয়। কিন্তু বাস্তব এই যে, যে যত বেশী জ্ঞানী হয়, তার দুঃখও তত বৃদ্ধি পায়। জীবনে কষ্ট না পেলে, জ্ঞানের পরিধি বিস্তার লাভ করে না। জীবনে যাঁরা বিজ্ঞ হয়েছেন, তাঁদের জীবনে দুঃখ-কষ্ট বেশী ছিল।' মনীষী ও বিজ্ঞজন তথা বিখ্যাত কৃতি মানুষদের জীবনী পড়লে তা সহজে বুঝতে পারবে। বুঝতে পারবে যে, 'যাঁরা জীবনে বাধা পেয়েছেন, তাঁরা ততই উদ্বুদ্ধ হয়েছেন, সে বাধা কাটিয়ে জীবনে উন্নতি করতে।'
অধিকাংশ কবি, কবি হয়েছেন মনের আঘাত খেয়ে। যে কখনো মনে আঘাত খায়নি, সে কখনো ছন্দ ও সুর খুঁজে পায় না। 'শান্ত সমুদ্রে কখনো সুদক্ষ নাবিক হওয়া যায় না।'
দুঃখ দেয় মানসিক যাতনা। আর দৈহিক বেদনার চেয়ে আন্তরিক বেদনা অত্যন্ত কঠিন, যার কোন ওষুধ নেই। এই জন্য অভিজ্ঞজনেরা বলেছেন, 'যে ব্যবসায়ীরা জানে না দুশ্চিন্তা কী ক'রে জয় করতে হয়, তাদের অল্প বয়সেই মৃত্যু হয়।'
'আপনি যা খান, তাতে আলসার হয় না, আপনাকে যা কুরে কুরে খায়, তাতেই আলসার হয়।'
'চিকিৎসকরা যে ভুল করেন তা হল, তাঁরা মনের চিকিৎসা না করে শরীর সারাতে চান, যদিও মন আর শরীর অবিচ্ছেদ্য। তাই আলাদা করে চিকিৎসা উচিত নয়।'
সুতরাং জেনে রাখা উচিত যে, 'দেহ থেকে টিউমার বা পুঁজ বের ক'রে দেওয়ার চাইতে বদ-চিন্তা তাড়ানো অনেক বেশী প্রয়োজন।'
দুঃখ-কষ্ট এমন জিনিস, সেটা কষ্ট ক'রে বুকের মধ্যে লুকিয়ে রাখা গেলেও, চোখের মধ্যে লুকিয়ে রাখা যায় না। পরিবেশের মানুষ---বিশেষ ক'রে কাছের মানুষ তা বুঝতে পারে। অতঃপর তারা সান্ত্বনা দিলে দুঃখ কমে যায়, আর কাটা ঘায়ে নুনের ছিটান দিলে তা আরো বেড়ে যায়। পরন্ত সুখ ভাগ করলে বেড়ে যায়, কিন্তু দুঃখ ভাগ করলে কমে যায়। কিন্তু মানুষের এমন অনেক দুঃখ আছে, যা কেউ কাছে এসে মিটিয়ে দিতে চাইলেও তা পারে না। অনেক কাছে থেকেও অনেকে একান্ত আপন হতে পারে না।
তবে অপরের দেখে সান্ত্বনা নাও। যা নেই, তার মোকাবেলায় যা আছে, তা স্মরণ করিয়ে মনকে প্রবোধ দান কর। তুমি গরীব হলেও দুঃখ গরীবদের একা নয়। বড় লোকদেরও অনেক দুঃখ থাকতে পারে।
📄 দুঃখী জীবনে ধৈর্যের গুরুত্ব
জীবনের সৃষ্টিকর্তা সুখ-দুঃখ সৃজন করেছেন। আর তিনিই দিয়েছেন ধৈর্যের আদেশ। তিনি বলেছেন,
{لَتُبْلَوُنَّ فِي أَمْوَالِكُمْ وَأَنفُسِكُمْ وَلَتَسْمَعُنَّ مِنَ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ مِن قَبْلِكُمْ وَمِنَ الَّذِينَ أَشْرَكُوا أَذَى كَثِيرًا وَإِن تَصْبِرُوا وَتَتَّقُوا فَإِنَّ ذَلِكَ مِنْ عَزْمِ الْأُمُورِ} (١٨٦) سورة آل عمران
অর্থাৎ, (হে বিশ্বাসিগণ!) নিশ্চয় তোমাদের ধনৈশ্বর্য ও জীবন সম্বন্ধে পরীক্ষা করা হবে। আর তোমাদের পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেওয়া হয়েছিল তাদের এবং অংশীবাদী (মুশরিক)দের কাছ থেকে অবশ্যই তোমরা অনেক কষ্টদায়ক কথা শুনতে পাবে। সুতরাং যদি তোমরা ধৈর্য ধারণ কর এবং সংযমী হও, তাহলে তা হবে দৃঢ়সংকল্পের কাজ। (আলে ইমরানঃ ১৮৬) {يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اصْبِرُوا وَصَابِرُوا وَرَابِطُوا وَاتَّقُوا اللَّهَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ}
অর্থাৎ, হে বিশ্বাসিগণ! তোমরা ধৈর্য ধারণ কর। ধৈর্য ধারণে প্রতিযোগিতা কর এবং (শত্রুর বিপক্ষে) সদা প্রস্তুত থাক; আর আল্লাহকে ভয় কর, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার। (আলে ইমরান: ২০০)
ধৈর্য সাধারণতঃ দুই প্রকার : বাঞ্ছিত জিনিস না পাওয়ার বা হাতছাড়া হওয়ার অনুতাপে ধৈর্য এবং অবাঞ্ছিত জিনিস গ্রহণ করতে বাধ্য হওয়ার অনুতাপে ধৈর্য।
আল্লাহর লিখিত ভাগ্য মেনে নিতে ধৈর্য, তাঁর আদেশ পালনে ধৈর্য এবং তাঁর নিষেধ পালনে ধৈর্য ধরতে হয় মানুষকে। যেহেতু ধৈর্যের তরবারি দ্বারা কেটে ফেলা ছাড়া দুঃখের আর কোন ওষুধ নেই। 'ভগ্ন হৃদয়ের সর্বোত্তম চিকিৎসা হল, তা পুনর্বার ভেঙ্গে ফেলা।' 'বিপদের বিশাল প্রতাপ আছে, তুমি তার সম্মুখে বিনয়ীর বেশে বসে যাও।' ধৈর্যশীলতার পরিচয় দিয়ে তাকে বরণ কর। তাহলেই তুমি নিশ্চিহ্ন হবে না।
'দুঃখ সহ্য করার ক্ষমতা যাদের আছে, তাদের কাছে দুঃখ বড় হয়ে দেখা দেয় না।'
'অন্ধ হওয়া দুঃখের নয়, দুঃখের হল তা সহ্য করার ক্ষমতা না থাকা।' 'যে তার পালঙ্গের কষ্ট সহ্য করতে পারে, সে আরামে ঘুমায়।' 'যে মানুষ দিনের পর দিন আঘাত খেয়ে অপমান সহ্য ক'রে নিঃশেষ হয়ে যায়, অসম্ভবকে সম্ভব সেই করতে পারে।'
সহ্য না করলে সফল হওয়া যায় না। ধৈর্য না ধরলে কর্মে সিদ্ধিলাভ হয় না। 'মধু পেতে হলে মৌমাছির হুল খেতে হয়।' 'যারা মধুচোর, তারা মৌমাছিকে বশ করেই মধু আহরণ করে।' অথবা তার বিঁধুনিতে ধৈর্যধারণ করে।
সুতরাং দুঃখে ধৈর্য ধর বন্ধু আমার! ধৈর্য ছাড়া গতি কী বল? দুঃখ একাধিক হলেও ভেঙ্গে পড়ো না। আমরা জানি, 'নতুন শোক একলা আসে না, কত পুরানো শোককে টানিয়া আনে। কিছু না পাওয়াতে দুঃখ আছে; কিছু পাইয়া কিছু হারাইলে মন অসুখী হয়। কিন্তু সব পাইয়া সব হারাইবার যে দুঃখ, তাহা অতি ভীষণ, অতি মর্মান্তিক।' দুঃখ তখন তার দলবল নিয়ে দুর্ধর্ষ ডাকাতদলের মতো দুঃখী মানুষের হৃদয়-দ্বারে আঘাত করে। কত তান্ডব চালায়! নিষ্ঠুর হয়ে তার সব কিছু ছিনিয়ে নিয়ে যায়। আর তখন ধৈর্য ছাড়া উপায় কী বল?
'মায়া-কান্নার তুফান কারাগারের দেওয়াল ভাঙ্গতে পারে না।' তবে তুমি নিরাশ হোয়ো না। ধৈর্য ধারণ কর। ধীর পানিতে পাথর কাটে। তোমার ধৈর্যও বিপদের পাথর ক্ষয় করবে। আর তুমি যদি চিরদুঃখী হও, তাহলে সৎ সাহস রেখে বলবে, 'দুঃখেই যাদের জীবন গড়া তাদের আবার দুঃখ কী রে?'
📄 দারিদ্র্য ও অভাব
এ জীবনে দারিদ্র্য একটি অভিশাপ। তবে যারা অভিশাপকে বররূপে বরণ করতে পারে, তাদের জন্য তা বড় মর্যাদাপূর্ণ বর।
'গরীব রাস্তায় চলে, প্রত্যেক বস্তু যেন তার বিপক্ষে। লোকেরা তাকে দেখে নিজ নিজ দরজা সশব্দে বন্ধ করে নেয়। লোকেরা তাকে ঘৃণা করে, অথচ সে কোন অপরাধী নয়। সকলকে দেখে তার শত্রু মনে হয়, অথচ শত্রুতার কোন কারণ নেই। এমনকি কুকুরদলও যখন কোন ধনীকে দেখে তখন তার নিকট বিনয় প্রকাশ করে এবং লেজ দুলিয়ে থাকে। অথচ কোন গরীব মানুষকে পার হতে দেখলে তাকে লক্ষ্য করে ভেকাতে শুরু করে এবং দাঁত দেখায়!'
'দরজা দিয়ে অভাব প্রবেশ করলে জানালা দিয়ে ভালোবাসা গোপনে পলায়ন করে। পয়সা থাকলে বন্ধু অনেক হয়, স্ত্রীও ভালোবাসে বেশী।'
'অভাব যখন তুফান হয়ে এসে ঘরের জানালায় আঘাত করে, তখন ভালবাসার ফুলদানি পড়ে গিয়ে ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যায়।' 'দারিদ্র্যের ঝড়ে ভালবাসার প্রদীপ নিভে যায়।'
অভাব মানুষের জাত, ধর্ম ও সভ্যতা পাল্টে দেয়। অভাব থাকলে মানুষের মানুষত্বও লোপ পায়। যেহেতু অভাবে মানুষের স্বভাব নষ্ট ক'রে ফেলে। 'খিদে পেলে হিংস্র জন্তুরা নিজের ছেলেও খেয়ে ফেলে।'
আবু যার বলেছেন, 'দারিদ্র্য কোন দেশে গেলে কুফরী তাকে বলে, আমাকে তোমার সাথে নিয়ে চলো।'
উমার বলেছেন, 'দারিদ্র্য যদি মানুষ হতো, তাহলে আমি তাকে খুন করতাম।'
আমার নবী দারিদ্র্য থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করতেন। দারিদ্র্য এক প্রকার বিপর্যয়, যা দিয়ে মহান আল্লাহ তাঁর বান্দাদেরকে পরীক্ষা ক'রে থাকেন।
একজন অভিজ্ঞ দরিদ্র বলেছেন, 'সকল সুস্বাদু জিনিসের আস্বাদ গ্রহণ করেছি, কিন্তু অধিক সুস্বাদুরূপে নিরাপত্তার মত কোন অন্য জিনিস পাইনি। সমস্ত রকম তিক্ত বস্তুর স্বাদ গ্রহণ করেছি, কিন্তু অভাব ও পরমুখাপেক্ষিতার মত অধিক তিক্ত বস্তু আর অন্য কিছু পাইনি। আর আমি লোহা ও পাথর বহনও করেছি, কিন্তু ঋণকে তা থেকেও বেশী ভারী অনুভব করেছি।'
অন্য একজন বলেছেন, 'নিমফল খেয়েছি এবং মাকালফলও চেখেছি, কিন্তু দারিদ্রের চেয়ে অধিক তিক্ত জিনিস অন্য কিছু চাখিনি।'
যদি তুমি গরীব হয়ে যাও, তাহলে সে কথা যেন কাউকে বলো না, নচেৎ তারা তোমাকে ছোট ভাবতে শুরু করবে। পক্ষান্তরে তোমার ধন আছে এমন ভাবও প্রকাশ করো না। গুপ্ত থেকো, গোপনে সুখ আছে। অতি সংগোপনে মনের কথা কেবল মহান আল্লাহকে জানায়ো।
'দরিদ্রতা কোন ত্রুটি নয়; তবুও তা গোপন রাখাই ভালো।' যাতে নিজের মান বজায় থাকে। যেহেতু গরীব মানুষকে লোকে তুচ্ছজ্ঞান করে। অভাব মানুষকে সুস্বাস্থ্যের সম্পদ থেকেও বঞ্চিত করে। বঞ্চিত করে শিক্ষার দীপ্তিময় আলো থেকেও।
'অর্থ অপ্রতুলে কত দীন বাছাধন, অজ্ঞান আঁধারে বসি কাটিছে জীবন।'
'খালি পেটে কোন মানুষ বিচক্ষণ হতে পারে না।' এ কথা যেমন সত্য, তেমনি 'জীবনে কষ্ট না পেলে, জ্ঞানের পরিধি বিস্তার লাভ করে না। জীবনে যারা বিজ্ঞ হয়েছে, তাদের জীবনে দুঃখ কষ্ট বেশী ছিল।'---এটাও বাস্তব। কবি বলেছেন, 'হে দারিদ্র্য! তুমি মোরে করেছ মহান, তুমি মোরে দানিয়াছ খ্রীষ্টের সমান- কন্টক-মুকুট শোভা।'
'দরিদ্রতার গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য এই যে, তা তোমাকে অনেক লোকের বন্ধুত্ব থেকে রক্ষা করবে।' যেহেতু গরীব বন্ধুর কাছে স্বার্থপরদের কোন সিদ্ধিলাভ হয় না। পক্ষান্তরে ধনী হলে তোমার বন্ধু বেশি হবে। সেই ব্যক্তির নিকট থেকে অভিবাদন পাবে, যার সালামেরও আশা করতে পারতে না। হ্যাঁ, তোমার অর্থ না হলে ওরা কেউই তোমাকে সালাম জানাতো না।
দীন-হীন বন্ধু আমার! ধৈর্য ধারণ কর। অভাবী হয়ে নবাবী আচরণ বর্জন কর। গরীব লোকদের পেটে বেশি খিদে থাকা ভাল নয় বন্ধু! গরীব হলেও আত্মমর্যাদা বজায় রেখো। তবে তা যেন অহংকারে পরিণত না হয়ে যায়। যেহেতু রাসূলুল্লাহ বলেছেন, "আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিন তিন প্রকার লোকের সাথে কথা বলবেন না, তাদেরকে পবিত্র করবেন না, তাদের দিকে (অনুগ্রহের দৃষ্টিতে) তাকাবেন না এবং তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি, (১) ব্যভিচারী বৃদ্ধ, (২) মিথ্যাবাদী বাদশাহ এবং (৩) অহংকারী গরীব।” (মুসলিম)
তবে নিশ্চয় তুমি ধনীদের খেলার পুতুল নও। তুমি তাদের নিকট জিওল মাছের মতো নও যে, তারা তোমােেক পানিতে জিইয়ে রাখবে। আর প্রয়োজন মতো মেরে খাবে।
তাদের জেনে রাখা উচিত, 'বড় লোকদের দৌলতে গরীবরা রুটি পায় বলেই বড় লোকেরা পোলাও খেতে পায়।' সুতরাং গরীবদের প্রতি আসলে তারা কোন করুণা করে না। দান করলেও সে আসলে আল্লাহর দেওয়া ধন দান করে, যা তাঁর প্রাপ্য অধিকার। গরীবকে কৃতজ্ঞ হতে হলেও তার মানে এই নয় যে, তার মাধ্যমে তাকে দাসে পরিণত করবে। কবি বলেছেন, 'দেখিনু সেদিন রেলে, কুলি ব'লে এক বাবুসা'ব তারে ঠেলে দিল নীচে ফেলে। চোখ ফেটে এল জল, এমনি ক'রে কি জগৎ জুড়িয়া মার খাবে দুর্বল? যে দধীচিদের হাড় দিয়ে ঐ বাষ্প-শকট চলে, বাবুসা'ব এসে চড়িল তাহাতে, কুলিরা পড়িল তলে। বেতন দিয়াছ?---চুপ্রও যত মিথ্যাবাদীর দল; কত পাই দিয়ে কুলিদের তুই কত ক্রোর পেলি বল! রাজ-পথে-তব চলিছে মোটর, সাগরে জাহাজ চলে, রেলপথে চলে বাষ্প-শকট, দেশ ছেয়ে গেল কলে, বল'ত এ সব কাহাদের দান! তোমার অট্টালিকা কার খুনে রাঙা? ঠুলি খুলে দেখ, প্রতি ইটে আছে লিখা! তুমি জান না ক' কিন্তু পথের প্রতি ধূলিকণা জানে, ঐ পথ, ঐ জাহাজ, শকট, অট্টালিকার মানে!'
জানো কি বন্ধু! আসল দরিদ্র কে? মনের দারিদ্র্য বা দীনতাই সবচেয়ে বড় বালাই। 'যার সব আছে কিন্তু ধন নেই, সে দরিদ্র। কিন্তু তার থেকে বেশী দরিদ্র সেই ব্যক্তি, যার ধন ছাড়া অন্য কিছুই নেই।' অভাবী বন্ধু আমার! কোন কিছুকে ভালোবেসো না, তাহলে তার অনুপস্থিতিতে তুমি কষ্ট পাবে না। আর অর্থ-লালসা হৃদয়ে রেখো না, তাহলে নিজেকে কখনো গরীব ভাববে না। যথাসাধ্য প্রয়াসে দীনতা দূর কর। হীনতা বরণ করো না। অভাবে স্বভাব নষ্ট করো না। 'যদি দীন সহ অহরহ রহ মতি তব হীন হইবে, সমানের সনে থাক একমনে মতি সমভাবে রইবে।'
📄 প্রেম-ভালোবাসা
প্রেম-ভালোবাসা নিয়ে পৃথিবীর অভিজ্ঞজনেরা নানা কথা বলেছেন। প্রেমের সৃষ্টিকর্তা মহান আল্লাহ বলেছেন,
{وَمِنْ آيَاتِهِ أَنْ خَلَقَ لَكُم مِّنْ أَنفُسِكُمْ أَزْوَاجًا لِّتَسْكُنُوا إِلَيْهَا وَجَعَلَ بَيْنَكُم مَّوَدَّةً وَرَحْمَةً إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآيَاتٍ لِّقَوْمٍ يَتَفَكَّرُونَ} (۲۱) سورة الروم
অর্থাৎ, আর তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে আর একটি নিদর্শন এই যে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য হতেই তোমাদের সঙ্গিনীদেরকে সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা ওদের নিকট শান্তি পাও এবং তোমাদের মধ্যে পারস্পরিক ভালোবাসা ও মায়া-মমতা সৃষ্টি করেছেন। চিন্তাশীল সম্প্রদায়ের জন্য এতে অবশ্যই বহু নিদর্শন রয়েছে। (রুমঃ ২১)
পবিত্র প্রেমের পরশে সংসার হয়ে ওঠে বেহেস্তী বাগান। দুনিয়া থেকে দূরীভূত হয় হিংসা ও বিদ্বেষের জ্বালা-যন্ত্রণা।
'স্নেহ আর ভালোবাসা বড়ই পবিত্র। স্নেহ আর ভালোবাসা দিয়ে বনের পশু-পাখিকেও পোষ মানানো যায়।'
'প্রেম আছে বলে পৃথিবী এত সুন্দর!' প্রীতির রীতি আছে বলেই ধরনী এত মনোরম।
'পিরীতি নগরে বসতি করিব পিরীতে বাঁধিব ঘর, পিরীতই আপন পিরীতই স্বজন তা ভিন সকলই পর।'
ভালোবাসার অভিজ্ঞতা যাদের আছে, তারা জানে ভালোবাসা হারানোর মর্ম। 'যাকে সত্যিকার ভালোবাসা যায়, সে অতি অপমান-আঘাত করলে, হাজার ব্যথা দিলেও তাকে ভোলা যায় না।' 'মন যাকে চায়, তাকে কোন দিনও ঘৃণা করা যায় না।' 'যাকে ভাল লাগে, তাকে ভোলা যায় না।'
মজনু বলেছিল, 'হে মন তুমি তো ওয়াদা দিয়েছিলে যে, আমি লায়লা থেকে তওবা করলে তুমিও তওবা করবে। আমি তো তওবা করেছি, তাহলে লায়লা নাম শুনে তুমি গলে যাও কেন?!' (শায়খ সা'দী)
পবিত্র ভালোবাসায় আছে উৎসাহ, উদ্দীপনা, আনন্দ। 'যাকে ভালোবাসা হয়, সে যদি বড় হয়, তাহলে তার চেয়ে বড় আনন্দ আর কিছু নেই।' 'ভক্তির আলো নিয়ে যারা পথ চলে, ভয়ের অন্ধকার তাদের পথ থেকে সরে যায়।' 'পিরীতের নৌকা পাহাড়ে চলে।'
অজানা-অচেনা সাথীও ভালোবাসায় একাত্মতা প্রকাশ করে। ভালোবাসা এত মধুর! এত স্নিগ্ধময়!
'সমাদরে বুকে তারে লইলাম টানি, সেই সে ফুলের তোড়া আমি ফুলদানি।'
হৃদয়-বিনিময়ের মধ্যে স্বামী-স্ত্রীর মধুসম দাম্পত্য গড়ে ওঠে। 'হৃদয়ের বিনিময়ে হৃদয় পাওয়া যায়। হৃদয় না দিয়ে হৃদয় পাওয়ার আশা করা ভুল।' মুশকিল হল, একতরফা ভালোবাসা। তবুও চেষ্টা কর। 'একটা পাখীকে ধরতে হলে, তাকে ভয় দেখানো চলবে না। তাকে আদর কর, ভালোবাসা দাও, একদিন সে তোমার পোষ মানবেই।'
'ভালোবাসা প্রজাপতির মতো, যদি শক্ত ক'রে ধর, মরে যাবে। হাল্কা করে ধর, উড়ে যাবে। তবে যদি যত্ন ক'রে ধর, তাহলে কাছে রবে।'
জোর ক'রে ভালোবাসা যায় না, ভালোবাসা পাওয়াও যায় না। 'প্রতাপশালী লোককে সবাই ভয় করে, কিন্তু শ্রদ্ধা করে না।' 'গায়ের জোরে সব হওয়া যায়, কিন্তু গুরু হওয়া যায় না।' 'জোর ক'রে দশ-বিশ জনকে নেতা বানানো যায়, কিন্তু নেতাজী বানানো যায় না।' 'জলাশয়ের ধারে একটা ঘোড়াকে জোর ক'রে নিয়ে যাওয়া যায়। কিন্তু তাকে জোর ক'রে জল খাওয়ানো যায় না।' গানের কবি বলেছেন, 'গায়ের জোরে সবকিছু কেড়ে নেওয়া যায়, সোনা-দানা গয়না-পাতি ভালোবাসা নয়।'
ভয় দেখিয়ে পোষ মানানো যায়, নিজের বাধ্য করা যায়, ভক্ত বানানো যায় না। 'ভয়ে প্রাণ যে করিবে দান প্রেম সে তো সঁপিবে না, টাকা দিয়ে শুধু মাথা কেনা যায়, হৃদয় যায় না কেনা।'
'টাকা দিয়ে দামী খাবার কেনা যায়, কিন্তু খিদে কেনা যায় না। টাকা দিয়ে দামী বিছানা কেনা যায়, কিন্তু ঘুম কেনা যায় না। টাকা দিয়ে বই কেনা যায়, কিন্তু জ্ঞান কেনা যায় না। টাকা দিয়ে ওষুধ কেনা যায়, কিন্তু স্বাস্থ্য কেনা যায় না। টাকা দিয়ে একটা স্বামী অথবা স্ত্রী কেনা যায়, কিন্তু ভালবাসা কেনা যায় না। টাকা দিয়ে সুখসামগ্রী কেনা যায়, কিন্তু সুখ কেনা যায় না।'
'টাকা না থাকার ফলে ভালোবাসা চলে যায়। কিন্তু টাকা দিয়ে ভালোবাসা কিনতে পাওয়া যায় না।' 'দরজা দিয়ে অভাব প্রবেশ করলে জানালা দিয়ে ভালোবাসা গোপনে পলায়ন করে। পয়সা থাকলে বন্ধু অনেক হয়, স্ত্রীও ভালোবাসে বেশী।' 'অভাব যখন তুফান হয়ে এসে ঘরের জানালায় আঘাত করে, তখন ভালবাসার ফুলদানি পড়ে গিয়ে ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যায়।' 'দারিদ্রের ঝড়ে ভালবাসার প্রদীপ নিভে যায়।' তবুও ধন দিয়ে মন কিনতে পাওয়া যায় না।
'দয়া দাক্ষিণ্য আনতে পারে, কিন্তু প্রীতি আনতে পারে না।' 'কাউকে আশ্রয় দিলেই সে আপনার হয় না।' আপন করতে মনের অতিরিক্ত আকর্ষণের প্রয়োজন আছে।
পবিত্র প্রেম বড় সুশৃঙ্খল হয়। 'অন্তঃসলিলা ফল্গু নদীর মত নিঃশব্দে ধীরে-ধীরে হৃদয়ের অন্তরতম প্রদেশে লুকাইয়া বহিতে থাকে; কিন্তু উচ্ছৃঙ্খল হইতে পায় না।' 'প্রকৃতিগত ভালোবাসাই একমাত্র ভালোবাসা, যা মানসিক আশা-আকাঙ্ক্ষাকে প্রতারিত করে না।' 'পবিত্র প্রেম একমাত্র মায়ের হয়ে থাকে তার শিশুর সাথে। বাকী প্রত্যেকের প্রেমে কোন না কোন স্বার্থ অথবা কামনা থাকে।'
বিবাহ-বহির্ভূত প্রেম পবিত্র ততক্ষণ থাকে, যতক্ষণ তা হৃদয়-গোলাপের মাঝে সৌরভের মতো লুক্কায়িত থাকে। হৃদয় ছাপিয়ে বাইরে এলেই তা অপবিত্র হয়ে যায়। অনেক পবিত্র প্রেম অজানা-অচেনা ভাবেই বৃদ্ধি পেতে থাকে। গোপন সে প্রেমের কথা জানতে পারে না প্রেমিক, আর না প্রেমিকা। অচেনা আকর্ষণে পূর্ণিমার রাতে জোয়ার আসে, রাতে রাতে হাসুহানা ফুল ফুটে গোপনে গোপনে সুবাস বিতরণ করে। তখন তারা বলে, 'নাই-বা চিনলে আমায় তুমি রইলে অর্ধ চেনা, চাঁদ কি জানে কখন ফোটে চাঁদনী রাতের হেনা?'
ভালোবাসা নিয়ে অনেক কথা আছে। কিন্তু এখানে শুধু অন্ধ, অবৈধ ও অপকারী ভালোবাসার কথা উল্লেখ করব।
ফেসবুকে ভালোবাসার অর্থ দেখলাম। লেখা আছে, 'ভালোবাসার পূর্ণ অর্থ হল, ভা = ভাল-মন্দ চিন্তা না ক'রে, লো = লোকলজ্জা উপেক্ষা ক'রে, বা = বাবা-মার মুখে চুন-কালি দিয়ে, সা = সাগরে ঝাঁপ দেওয়া।
ভালোবাসার অর্থ এক এক জনের নিকট এক এক রকমেরঃ- গণিত শিক্ষক বলেন, 'যার দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও উচ্চতা নেই এবং কেবল গভীরতা আছে, তাকেই ভালোবাসা বলে।'
ডাক্তার বলেন, 'ভালোবাসা এমন এক রোগের নাম, যা ঘুম নষ্ট করে, ক্ষুধা হাস করে ও দুশ্চিন্তা বৃদ্ধি করে।'
পুলিশ বলেন, 'ভালোবাসা এমন এক জেলখানা, যেখানে হৃদয়কে বন্দি রাখা যায়।'
কবি বলেন, 'ভালোবাসা মানে কল্পনায় উদাস হয়ে যাওয়া।'
রাজনীতিবিদ বলেন, 'ভালোবাসা মানে রাজকন্যার সাথে অর্ধেক রাজত্ব লাভ করা।'
ভিক্ষুক বলে, 'ভালোবাসা মানে নিজের মন ভিক্ষা দেওয়া, অপরের মন ভিক্ষা চাওয়া। সব কিছু ছেড়ে পথের ভিখারী হওয়া।'
কুলি বলে, 'ভালোবাসা মানে দুঃখের বোঝা বহন করা।'
মাঝি বলে, 'ভালোবাসা মানে মান-অভিমান ও আবেগের দাঁড় টানা।'
ব্যবসায়ী বলে, 'ভালোবাসা মানে হৃদয়ের বেচাকেনা।'
আর ব্যর্থ প্রেমিক বলে, 'ভালোবাসার কোন অর্থ নেই। ভালোবাসা মানে সুখ কামনায় ব্যর্থতা।'
কেউ বলেছেন, 'ভালোবাসার অর্থ হল, যাকে তুমি ভালোবাসো, তার মতো জীবন-যাপন কর।'
'ভালোবাসার জন্য ভালোবাসা নয়, ভাল ক'রে ভালোবাসার জন্যই ভালোবাসা।'
'ভালো ভাষা' মানে 'ভালোবাসা' নয়। অনেক মিষ্টি কথা মিছরির ছুরি হয়। কিন্তু অনেকে ভালো ভাষাতেই মুগ্ধ হয়ে ভালোবাসতে শুরু করে।
'এখনো তারে চোখে দেখিনি শুধু বাঁশি শুনেছি, মন প্রাণ যাহা ছিল দিয়ে ফেলেছি।'
প্রেমিকের গান, গজল বা কুরআন পাঠে মুগ্ধ হয়ে তার উদ্দেশ্যে প্রেমের উপহার নিবেদন করে। সাক্ষাৎ না হলেও সেই স্মৃতি বুকে ধরে রেখে কালাতিপাত করে।
'স্মৃতি তব দিবারাত্র চিত্তে মম গাঁথা, হৃদয়ে আসীন রূপ সে মধুর কথা।'
'ভালো লাগা, তার নাম ভালোবাসা নয়। ভালোবাসা উভয়ের দিক থেকে জন্ম নেয়, কিন্তু ভালো লাগা একদিক থেকে জন্ম হয়।' সে ক্ষেত্রে অনুরাগী। বলে, 'আমি নিশিদিন তোমায় ভালোবাসি, তুমি অবসর মত বাসিও।'
কিন্তু 'যার জন্য এত চিন্তা, এত ভাবনা, সেই যদি তা জানতে না পারল, তবে চিন্তা-ভাবনা ক'রে লাভ কী?
প্রেম ভাষার অপেক্ষা করে না। অন্তরের আসীন হয়ে অন্তরে অন্তরে কথা বলতে শেখে। ভাষা-বিরোধে হয়তো ভাব প্রকাশ না হওয়ায় বিঘ্ন ঘটে, কিন্তু অন্তরের জিহ্বা পূর্ণ কাজে দেয়।
'ভালোবাসা অন্তর দিয়ে অনুভব করতে হয়, এ ক্ষেত্রে ভাষার প্রয়োজন হয় না।' কিন্তু অন্তরে স্বীকার, মুখে প্রকাশ ও আচরণে প্রমাণ ছাড়া ভালোবাসা পরিপক্ক হয় না।
'ভালোবাসার মজা শিকারীর মত। শিকার তাড়া না করলে শিকারে মজা আসে না।' এই শ্রেণীর ভালোবাসায় প্রেমিক-প্রেমিকা সিনেমার অভিনেতা-অভিনেত্রীর মতো দুঃসাহসিকতা প্রদর্শন ক'রে থাকে।
অনেকে দৈহিক মিলনটাকেই 'প্রেম' মনে করে। অথচ 'প্রেম আর কামনা হল দু'টো সম্পূর্ণ আলাদা জিনিস। প্রেম হচ্ছে ধীর, প্রশান্ত ও চিরন্তন। আর কামনা হচ্ছে সাময়িক উত্তেজনা।'
এই শ্রেণীর প্রেমে থাকে এক প্রকার চুলকানি। চুলকাতে খুব আরাম লাগে। পরিশেষে জ্বালা শুরু হয়।
'আঁখি মেলি যারে ভালো লাগে তাহারেই ভালো বলে জানি। সব প্রেম প্রেম নয় ছিল না সে সংশয় যে আমারে কাছে টানে তারে কাছে টানি।।'
'ভালো' কে? যার মনে লাগে যে। 'পিরীত না মানে ছোট জাত, ঘুম না মানে শ্মশান ঘাট, পিয়াস না মানে ধুবি ঘাট।' 'পিরীতে মজিল মন, কিবা হাঁড়ি কিবা ডোম।' 'পিরীতের পেত্নী ভালো।' 'ভালোবাসা যখন আসে, তখন কোন হিসাব না কষেই আসে।'
'আঁখি তো অনেকে হেরে, বল কারে মনে ধরে? তবে তারে মনে ধরে, যে হয় মনোরঞ্জন।'
শায়খ সা'দী বলেছেন, 'যাদের পেট পূর্ণ তাদেরকে যবের রুটি ভাল লাগবে না। আমার প্রিয়তমা আমার চোখে বড় সুন্দরী; যদিও তোমার চোখে সে কুৎসিত। বেহেস্তী হুরীকে জিজ্ঞাসা কর যে, 'আ'রাফ কী?' বলবে, 'তা একটি দোযখ।' কিন্তু কোন দোযখীকে জিজ্ঞাসা কর, সে বলবে, 'আ'রাফ একটি বেহেশ্ত।'
বাদশা হারুন রশীদ আসমায়ীকে জিজ্ঞাসা করলেন, 'প্রেমের স্বরূপ কী?' বললেন, 'তা এমন জিনিস যে, প্রেমিকার গুণ বর্ণনায় হৃদয় আপ্লুত রাখে এবং তার দোষ দর্শনে অন্ধ থাকে। সুতরাং প্রেমিকার পিঁয়াজের গন্ধও কস্তুরী লাগে।'
এমন অন্ধ প্রেমিকরাই বলে, 'ভালোবাসাতে সরি নেই, ভালোবাসাতে শুধুই ভালোবাসা।'
'নদী যখন বর্ষার জলে পরিপূর্ণ হইয়া প্রবাহিত হয়, তখন সে কি লক্ষ্য করিতে পারে জলরাশি কীভাবে আসিয়া তাহার বক্ষ পূর্ণ করিয়া দিতেছে? নব-যৌবনের হৃদয় যখন কানায় কানায় ভালোবাসায় ভরিয়া ওঠে, তখন প্রেমাস্পদের কত ত্রুটি লক্ষ্যই হয় না।'
অথচ 'ভালোবাসা ভালো, কিন্তু ভালোবাসায় অন্ধ হওয়া ভালো নয়।' কাউকে ভালোবাসলে, তাকে শাসন করতে ভুলে যাওয়া উচিত নয়।
ভালোবাসা কী, ভালোবাসা কেমন? 'ভালোবাসা সমুদ্রের মতো, কাছে টানলে দূরে ঠেলে দেয়।' 'ভালোবাসার এমনি মজা যেমন নাকি ঘি, যাবৎ hot তাবৎ good cold হলেই ছি।'
'ভালোবাসার এমনি গুণ, পানের মধ্যে যেমন চুন। অল্প হলে লাগে ঝাল, বেশি হলে পুড়ে গাল।'
'ভালোবাসা হল মুড়ির মতো, সময় গেলে মিইয়ে যায়।'
কেউ বলেছেন, 'দু'টি পাখির একটি নীড়, একটি নদীর দু'টি তীর। দু'টি মনের একটি আশা, তার নাম ভালোবাসা।'
'ভালোবাসা এমন জিনিস, যা কোন রাজা মূল্য দিয়ে কিনতে পারে না। আবার কোন ফকীর বিনামূল্যে অর্জন ক'রে থাকে।' 'ভালোবাসা কেনা যায় না, ভাগ্যবানেরা এমনিই পায়।'
অনেকে মনে করেন, ভালোবাসা এক প্রকার বৈয়াক্তিক দুর্বলতা। কেউ মনে করেন, ভালোবাসা একটি মানসিক রোগ।
কেউ বলেন, 'ভালোবাসা মনোবিকার ও এক শ্রেণীর পাগলামি।' কেউ বলেন, 'ভালোবাসা দু'টি মন নয়, হরমোনের মিল।'
ভালোবাসা মনের উদারতার নাম। প্রেমিকের ত্রুটি-বিচ্যুতিকে উপেক্ষা করার নামই প্রেম। দু'টি মনের এক হওয়ার নাম ভালোবাসা। ভালোবেসে প্রেমিকা যাই দেবে, যাই বলবে, প্রেমিক তাই ভালোবাসবে।
অনেকে বলেছেন, 'ভালোবাসা হচ্ছে প্রেমের সূর্যোদয়, আর বিবাহ হচ্ছে প্রেমের সূর্যাস্ত। আর প্রেমের দীর্ঘশ্বাস, জ্ঞানের শেষ নিশ্বাস।'
ভালোবাসার অপকারিতা
সম্পর্কের শুরুতে প্রেমিক-প্রেমিকা ভালোবাসা নিয়ে খেলা শুরু করে। কিন্তু সম্পর্ক পাকা হতেই ভালোবাসা তাদেরকে নিয়ে খেলতে শুরু করে।
পুরুষ যদিও সবকিছু নিয়ে খেলতে পারে, কিন্তু প্রেম তাকে নিয়ে আজব খেলা খেলে।
ভালোবাসার আসল পরীক্ষা হয় বিবাহের পরে।
'লোহায় লোহা কাটে বিষে কাটে বিষ, ভালোবাসা বেশী হলে হয়ে যায় রিস।'
'নূতন প্রেমে নূতন বন্ধু, আগাগোড়া কেবল মধু। পুরাতনে অম্লমধুর একটু ঝাঁঝালো।'
'নূতনেই প্রেম মিঠে থাকে, বাসি হলেই টকে।'
'প্রেমের বিয়ের প্রথম বছরে স্বামী শোনে, দ্বিতীয় বছরে স্ত্রী শোনে। আর তৃতীয় বছরে পাড়া-প্রতিবেশী সবাই শোনে!'
তখন দম্পতি বলে, 'দিয়েছিলে হৃদয় যখন পেয়েছিলে প্রাণমন দেহ,
আজ সে হৃদয় নাই যতই সোহাগ পাই শুধু তাই অবিশ্বাস বিষাদ সন্দেহ।'
'যেখানে ভালোবাসা, সেখানেই বেশি ভয়।' অনুপযুক্ত হয়ে প্রেম-ভিক্ষা করলে ঝুলিতে ভর্ৎসনা ছাড়া আর কী পড়তে পারে?
'ভাঙ্গা ঘর থেকে চাঁদ দেখা যায়, কিন্তু তা ধরা যায় না।'
'বামুন হয়ে চাঁদের দিকে হাত বাড়ানো যায়, কিন্তু সেই হাত দিয়ে চাঁদকে ছোঁয়া যায় না।'
'চাঁদের আলো গরীবের কুটিরে পড়তে পারে, কিন্তু চাঁদকে ধরা যায় না।'
'ভালোবাসা দিয়ে মন জয় করা যায়, অবস্থার বৈষম্যকে জয় করা যায় না।'
একদা এক ইঁদুর একটি উটকে দেখে ভালোবেসে ফেলে তার লাগাম ধরে নিজের বাসার দিকে টানতে শুরু করলে উটও তার অনুসরণ করল। গর্তের সামনে দাঁড়িয়ে ইঁদুর মনে মনে বলতে লাগল, 'এমন ঘর বানাও, যা তোমার প্রেমিকের জন্য উপযুক্ত। নচেৎ এমন প্রেমিক কর, যার জন্য তোমার এ ঘর উপযুক্ত হয়।'
'বড়র পিরীত বালির বাঁধ, ক্ষণে হাতে দড়ি ক্ষণে চাঁদ।'
'উপর দিকে তাকিয়ে পথ চললে হোঁচট খেতে হয়।' বড়লোকের মেয়েকে ভালোবাসতে আঘাত খেতে হয়। তখন গাইতে হয় অনুতাপের গান, 'আমি বৃথায় স্বপন করেছি বপন আকাশে, তাই আকাশ-কুসুম করেছি চয়ন হতাশে।'
দূরবর্তী অবস্থানে থেকে বড়কে ভালোবাসলে কান্না ছাড়া আর কী লাভ হতে পারে? আকাশ সাগরকে ভালোবাসে। তাই তো সে তাকে না পেয়ে বৃষ্টির কান্না কেঁদে পৃথিবী ভাসিয়ে দেয়।
আসলে 'যা ভুল ক'রে চাওয়া হয়, তা পেতে কূল যায়।' আর সমতাহীন ভালোবাসাই জীবনে সবচেয়ে বড় ভুল।
'মেয়ে মানুষের ভালোবাসা, সে সবুর করতে পারে না, বিধাতা তার হাতে সে অবসর দেননি। পুরুষ মানুষ অনেক ঠেকে, অনেক ঘা খেয়ে, তারপরে ভালবাসতে শেখে।'
আসলে প্রিয়ের হৃদয়ে ধৈর্য স্থির থাকে না, যেমন চালুনে স্থির থাকে না পানি।
'রাত্রি যত গভীর হয়, প্রভাত তত এগিয়ে আসে। বেদনা যত নিবিড় হয়ে আসে, প্রেম তত কাছে আসে।' আর ধৈর্যচ্যুতি ঘটলেই অঘটন ঘটে।
কপট প্রেমে একে-অন্যকে ধোঁকা দেয় প্রেমিক-প্রেমিকা। একাধিক প্রেমে পড়ে অনেক সময় ধন্দে পড়ে 'দু লায়ে দু পা, মধ্যখানে ডুবে যা'-এর মতো অবস্থা হয়। অনেকে একটা ছেড়ে অন্যকে ধরে। 'প্রেমের লাইন আর ফোনের লাইন একই রকম। একবার কেটে গেলে বিজি হয়ে যায়।'
অনেকে এককে ছেড়ে অন্যকে ধরেও ঠকে এবং তখন বলে, 'ঐহিকের সুখ হবে না বলে দিলাম না এ প্রাণ তোমায়, আমার এ সংসারের সুখ তাও তো হলো না দু'কুল হারালাম হায়।'
অনেকে কোন লোভে পড়ে প্রেম করে। তখন আসলে তারা অর্থকে ভালোবাসে। অথচ 'প্রেমের অধিকার প্রেমিকার ওপর ফলোনো চলে, তার ধনের ওপর নয়।'
'তুমি তাকে ভালোবাসো, যে তোমার কাছে ভালোবাসা ছাড়া অন্য কিছু চাইবে না। আর তাকে উপেক্ষা কর, যে ভালোবাসার নামে অনেক কিছু চায়।'
'যারা দেহ (রূপ-সৌন্দর্য) পছন্দ করে, তাদের যে কোন একটা দেহ হলেই চলে। কিন্তু যারা মন পছন্দ করে, তাদের সেই মন না হলে চলে না, যা তারা পছন্দ করে।'
অবৈধ ভালোবাসা এক প্রকার আযাব। ইবনুল কাইয়েম বলেন, 'যে ব্যক্তি আল্লাহ ছাড়া অন্য কিছুকে ভালোবাসবে, সে তদ্দ্বারা আযাব ভোগ করবে।'
'মরমে লুকানো কত দুখ ঢাকিয়া রয়েছি মানমুখ, কাঁদিবার নাই অবসর কথা নাই শুধু ফাটে বুক।'
'যতনে যাতনা বাড়ে ভালোবাসা এ কেমন, অনিত্য সে অনুরাগ অশান্তির নিকেতন।'
অনেক ভালোবাসা এক প্রকার বোকামি। 'মানুষ তার জীবনের দু'টি সময়ে বড় বোকা হয়, যখন সে ভালোবাসে এবং যখন সে বৃদ্ধ হয়।'
প্রেমের মেঘমালা মনের আকাশে তুফান সৃষ্টি করলে দেহ ও আচরণে পরিবর্তন সূচিত হয়।
'আসক্তির ছয় চিহ্ন জেনো হে তনয়!
দীর্ঘশ্বাস, ম্লানমুখ, সিক্ত অক্ষিদ্বয়। জিজ্ঞাসিলে, অন্য তিন লক্ষণ কোথায়? স্বল্পাহার, স্বল্পাভাষ, বঞ্চিত নিদ্রায়।'
যাকে ভালবাসা হয়, তাকে ভাল থাকতে দেওয়া উচিত। কিন্তু অধিক আকর্ষণে উচ্ছৃঙ্খল হয়ে অনেক ভালোবাসা প্রেমিককে 'মজনু' বা পাগল ক'রে তোলে। তার ফলে তার স্বাস্থ্য নষ্ট হয়, সামাজিক মর্যাদা নষ্ট হয়।
'প্রেমে যার প্রাণ টানে না, ছলনা তার প্রেম কামনা।'
'চেনে তাহা প্রেম, জানে শুধু প্রাণ, কোথা হতে আসে এত অকারণে প্রাণে প্রাণে বেদনার টান।'
'মদে নেশা হয়, কিন্তু প্রেমের নেশা আরো ঘোর।' নেশার ঘোরে কোন আঘাতের কথা যথাসময়ে বুঝতে পারে না। অবশ্য নেশা কেটে গেলে সে ব্যথা অনুভূত হয়।
প্রেমের জিনিস যত দূরে থাকে প্রেম তত বেড়ে চলে। মিলনের সময় যত কাছে হয় ধৈর্যের বাঁধ তত বেশী হারাতে চলে। আর মিলন ঘটে গেলে প্রেমের দশ ভাগের নয় ভাগ নেশা কেটে যায়।
'কাহাকেও যাদু করিয়া বশ করা সত্য হইলেও প্রেম-যাদু মিথ্যা নহে। বরং ইহা আরো অতি ভয়ঙ্কর। কারণ যাদু কোন প্রকারে কাটানো যায়, কিন্তু প্রেম দূর করা যায় না। পাথরে নক্সা কাটার মতন মনে দাগ কাটা যায়।'
'ভালোবাসা ও যুদ্ধে কোন সম্মান নেই।' তাই অবৈধ প্রণয়ী-প্রণয়িণীদের কোন সম্মান থাকে না। সম্মান থাকে না তাদের মা-বাবাদের। ব্যর্থ প্রেমিক- প্রেমিকা বলে,
'প্রেম ক'রে পর সনে পাইতেছি এ যাতনা, প্রাণসম ভাবি পরে পর আপন হল না। না বুঝে মজিলাম পরে না ভাবি কী হবে পরে, এখন না জানি পরে কতই হবে লাঞ্ছনা।'
এমন যাদু ও নেশাগ্রস্ত প্রেমিক তার প্রেমিকের উদ্দেশ্যে বলে, 'আমি আকাশ ছুঁয়েছি, চন্দ্র ছুঁয়েছি, ছুঁয়েছি গ্রহতারা, শুধু তোমার হৃদয় ছুঁয়ে আমি হয়েছি দিশেহারা।'
আর তখন উদ্ভ্রান্ত মনে লজ্জা-শরম কিছুই অবশিষ্ট থাকে না। তখন তাদের বুলি হয়, 'পিয়ার কিয়া তো ডরনা কিয়া?' 'কিসের লজ্জা কিসের ভয়, প্রেম-পিরীতে সবই সয়।' ভয় হয় না সমাজকে। ভয় হয় না পিতামাতার ভালোবাসার কুরবানীকে।
'প্রণয়ের পাত্র যথা যার মন চায়, মাতা-পিতা ক্রোধে তারে যদিচ তাকায়।' এরা প্রেমের জন্য মরতেও প্রস্তুত হয়। প্রেমিকাকে প্রাণ উপহার দিতেও কুণ্ঠাবোধ করে না। এরা প্রেম সার্থক করার লক্ষ্যে নিঃস্ব ও সর্বহারা হতে পারে। এরা বলে,
'প্রাণ যদি চাহ মিত্র দিতে পারি প্রাণ, প্রাণ চেয়ে কিবা প্রিয় বল করি দান।'
'ওগো কাঙাল! আমায় কাঙাল করেছ আরো কি তোমায় চাই? ওগো ভিখারী! আমার ভিখারী--- পলকে সকলি সঁপেছি চরণে আর তো কিছুই নাই।'
ভালোবাসায় ব্যর্থ হয়ে অনেকে কষ্টভোগ করে প্রেমিক-প্রেমিকা। 'কপট প্রেম লুকোচুরি, মুখে মধু হৃদে ছুরি।' 'জলের রেখা, খলের পিরীত' হলে রিক্ততা ছাড়া আর কী পাওয়া যায়?
প্রবঞ্চিতা প্রেমিকা তখন গাইতে থাকে, 'কেন তবে কেড়ে নিলে লাজ-আবরণ! হৃদয়ের দ্বার হেনে বাহিরে আনিলে টেনে, শেষে কি পথের মাঝে করিবে বর্জন? ভালোবাসা তাও যদি ফিরে নেবে শেষে কেন লজ্জা কেড়ে নিলে, একাকিনী ছেড়ে দিলে বিশাল ভবের মাঝে বিবসনাবেশে।।'
আসলে 'ভালোবাসা যা দেয়, তার চেয়ে কেড়ে নেয় বেশী।'
'ভালোবাসা সুখকে হত্যা করে, আর সুখ ভালোবাসাকে হত্যা করে।'
'প্রেম মানুষকে শান্তি দেয়, কিন্তু স্বস্তি দেয় না।'
'প্রেম হল জ্বলন্ত ধূপের মত, যার শুরু হল আগুন দিয়ে, আর শেষ পরিণতি ছাই দিয়ে। তারই মাঝে সুবাস হল প্রেম-জীবনের মাঝে মাঝে কিছু আনন্দ।'
'প্রেমের আনন্দ থাকে শুধু স্বল্পক্ষণ, প্রেমের বেদনা থাকে সমস্ত জীবন।'
'ভালোবাসা আচ্ছাদন নয়, বরং চোখের পানি।'
'ভালোবাসা মহাপাপ, প্রেম তার অভিশাপ। ভালোবাসার শেষফল, বুকে ব্যথা চোখে জল।'
এই জন্য জ্ঞানিগণ উপদেশ দিয়ে বলেন, 'গোলাপ ফুল ফুটে আছে মধুপ হোতা যাসনে, ফুলের মধু লুটিতে গিয়ে কাঁটার ঘা খাসনে।'
প্রেমে বিফল হয়ে প্রেমিক-প্রেমিকা পরিশেষে বলতে বাধ্য হয়, 'বিচ্ছেদের বিচ্ছেদের আশার আশায়, জীবনের খেলা বুঝি শেষ হয়ে যায়।'
'ভুল করেছি বারে বারে তোমায় ভুলে ভুলে, তোমার স্নেহের বাঁধন তবু নাওনি তুমি খুলে।'
'শুনতে যে পাই আমি তোমার পায়ের নুপুর-ধ্বনি তাই তো অনুক্ষণ, তোমার পথের পানে চেয়ে চেয়ে কাঁদে আমার মন।'
'পেরেছি যতেক কুড়ায়ে লয়েছি দুই হাতে ভালোবাসা, বাধ্য আজিকে করিতে সাঙ্গ জীবনের কাঁদা-হাসা।'
'মোরা একই বাগের জোড়া বুলবুলি, যৌবন বসন্তে হর্ষে সদা ফুল তুলি। হেন কালে আসি ঝড় কাঁপি থরথর, দুইধার হই মোরা, আমি তার পর।'
'দেখাতাম আমি হৃদয় খুলে হলে দেখানোর মতো, চিরদিন ধরে তোমায় আমি ভালোবেসেছি কতো।'
'ফুল কেন ফুটেছিলে যদি ঝরে যাবে, ভালো কেন বেসেছিলে যদি ব্যথা দেবে?' 'অভাব যেমন চোর তৈরী করে, তেমনি প্রেম তৈরী করে কবি।' 'প্রেমে যে পড়েনি সে প্রেমের কবিতা লিখতে পারে না।' 'প্রেমের ক্ষেত্রে জয়ী হয়ে কেউ শিল্পী হতে পারে না, বড় জোর বিয়ে করতে পারে। তবে প্রেমের ব্যর্থতায় অনেকে কবি ও শিল্পী হয়েছে।' তুমি হয়তো আমাকে প্রশ্ন করতে পার, আপনিও কি কারো প্রেমে পড়েছিলেন? তাহলে আমি তার জবাবে বলি, 'জাল হাতে জলে আছি জেলে কিন্তু নই, মাছ খেলেই মাছরাঙা প্রমাণ তার কই? ডোরাকাটা দাগ হলেই হয় নাকো বাঘ, বিড়াল হইতে পারে, ভয় নাই ছাগ! গুঁড়িশাল অভিমুখে সুঁড়িঘর পথে চলিলেই মাতাল নহি শুধু অভিমতে। তুমি যা বলিতে চাহ আমি তাহা মানি, নদীর কিনারায় শুধু দিই হাতছানি। দিলামই বা ক্ষতি কী আর নাহি ডরি, বড় ভাসা মাছ নিয়ে যদি খেলা করি। কিংবা প্রিয়ারে ডাকি অপেক্ষায় রই, কিন্তু তুমি ভাব যাহা আমি তাহা নই।' শায়খ সা'দীর ভাষায় বলি, 'মালী আমি, কিন্তু আমার বাগান নেই। প্রেমিক আমি, কিন্তু নির্দিষ্ট কোন প্রেমিকা নেই।'