📘 জীবন দর্পণ > 📄 প্রচেষ্টা ও সফলতা

📄 প্রচেষ্টা ও সফলতা


তকদীরে তোমার পরিপূর্ণ বিশ্বাস আছে, তদবীরও পরিপূর্ণরূপে ক'রে যাওয়া চাই। যেহেতু মহান আল্লাহ বলেছেন, {وَأَن لَّيْسَ لِلْإِنسَانِ إِلَّا مَا سَعَى} (৩৯) সূরাহ্ আন্-নাজম অর্থাৎ, আর এই যে, মানুষ তাই পায়, যা সে চেষ্টা করে। (নাজমঃ ৩৯) আখেরাতের সুখের জন্য আমল চাই। দুনিয়ার সুখের জন্যও চেষ্টা ও শ্রম চাই। 'সুখ চাই, সুখ চাই' বললেই চলবে না। সুখ অর্জনের জন্য চেষ্টার প্রয়োজন আছে। বসে থেকে তো সুখলাভ হয় না।
চাষী, ছাত্র, ব্যবসায়ী অথবা চাকরিজীবী প্রত্যেকের সফলতা আছে নিজ নিজ প্রচেষ্টা ও পরিশ্রমে। এমনকি সেই গৃহকত্রী, যে সংসারের হাল ধরে, তারও নিজস্ব প্রচেষ্টা ও পরিশ্রমের ফলে সংসার সুখের হয়। সফলতা এক চলমান গাড়ি, যে তা চালিয়ে নিয়ে যেতে পারে, সে যতদূর ইচ্ছা ততদূর পৌঁছতে পারে। 'সফলতার পথে কোন ট্রাফিক-সিগন্যাল নেই, যা তার গতি নির্দিষ্ট করতে পারে।'
'সফলতা এক বিরামহীন সফরের নাম। সফলতা কোন গন্তব্যস্থল নয়। সফলতা গন্তবে পৌঁছনোর একটি পথ।'
জানই তো, 'সাফল্যের পথ কুসুমাস্তীর্ণ নয়, ব্যর্থতা অতিক্রমের পরই আসে সফলতা।' 'ফুল-বিছানো পথ তোমাকে মর্যাদার উচ্চ শিখরে পৌঁছাতে পারে না।'
'সফলতার পথ মইয়ের মত, যা পকেটে হাত রেখে চড়া যায় না।' 'পিঠ বাঁকানো ছাড়া পাহাড়ে ওঠা সম্ভবই নয়।'
'প্রচেষ্টা ও ধৈর্য সফলতার জনক-জননী।' আর 'যে শুইয়া থাকে, তাহার ভাগ্যও শুইয়া থাকে।'
সুখ সবাই চায়, আরামের জীবন কে না চায়? 'সুন্দর দিন সবার জন্য অপেক্ষা করে। কেউ চেষ্টা করে তা আনে, কেউ আনে না।' সুখের পথে শ্রম না দিলে সুখ কাউকে 'ভালবাসা' দেয় না। অবিরাম পরিশ্রমই পারে সেই 'ভালবাসা'কে জয় করতে। 'জীবন হল সাইকেল চালানোর মত। তুমি যতক্ষণ প্যাডেলে পা রেখে চালাতে থাকবে, ততক্ষণ সাইকেল হতে পড়ে যাবে না। কিন্তু প্যাডেল থামালেই পড়ে যাবে।'
চেষ্টার গতি সীমিত হলেও তা নিরন্তর হওয়া চাই। নচেৎ গতি থামিয়ে দিলে সাফল্যের নাগাল পাওয়া মুশকিল হবে। আব্রাহাম লিঙ্কন বলেন, 'আমি ধীরে চলি ঠিকই; কিন্তু আমি কোনদিন একটি পাও পিছন দিকে ফেলিনি।'
অবশ্য বিশ্রামের প্রয়োজনীয়তার কথা ভিন্ন। যেমন 'পথ চলতে শুধু সামনেই তাকালে হয় না, প্রয়োজনে পিছন ফিরে দেখতেও হয়।'
এ সংসারে যে অকর্মণ্য, সুখের অধিকার তার নেই। যে কর্মঠ, তারই আছে সুখলাভের অধিকার। কর্মকুণ্ঠ বৈকুণ্ঠভোগের উপযুক্ত নয়। 'যে মরিতে জানে, সুখের অধিকার তাহারই। যে জয় করে, ভোগ করিবার অধিকার তাহাকেই সাজে।'
তুমি হয়তো বলবে, 'জীবন তো কয় দিনের মাত্র। তার জন্য এত শ্রম-পরিশ্রমের কী প্রয়োজন?'
আমি বলি, যে ক'দিনই তোমার জীবন, সে ক'দিনই ভালোভাবে থাকতে চেষ্টা কর। মরতে তো একদিন সবাইকেই হবে, তা বলে কি বেঁচে থাকাটা থামিয়ে দেওয়া যাবে? আর তুমি তো এ পৃথিবীতে একা নও, তোমার জীবনের সাথে বাঁধা আছে আরো অনেক জীবন। সুতরাং তাদের জন্যও তোমাকে কাজ ক'রে যেতে হবে।
চাকরি না পেয়ে নিরাশ হয়ে বসে যেয়ো না, কিছু একটা কর। শিক্ষিত হয়ে ছোট কাজ করা দোষের নয়। বরং কর্মহীনতাই বড় দোষের। পছন্দনীয় কাজ পাওয়া ও করাও আবশ্যকীয় নয়। 'জীবনের রহস্য এই নয় যে, তুমি তোমার পছন্দনীয় কাজটি করবে; বরং যে কাজই করবে, তা পছন্দ করবে।'
'আমরা বাতাসের গতিপথ বদলাতে পারি না; কিন্তু আমরা জীবনের পালকে কীভাবে লাগাব---যাতে বাতাসের গতির সুবিধা নিতে পারি, তা নির্ধারণ করতে পারি। আমরা পছন্দমত পারিপার্শ্বিক অবস্থার সৃষ্টি করতে পারি না; কিন্তু আমাদের মনোভাবকে আমাদের পছন্দমত কাজের উপযোগী ক'রে নিতে পারি। আর তখন হতে পারি আমরা বিজয়ী।'
'জীবন কুমোরের কারখানার মত, মাটি থেকে অনেক আকারের হাঁড়ি, কলসী ও পাত্র তৈরী করতে পারা যায়। একইভাবে আমরা যেভাবে চাই, সেভাবেই জীবন গড়ে তুলতে পারি। কিন্তু বিভিন্ন পাত্র তৈরির জন্য ভিন্ন ভিন্ন ধরনের কৌশল প্রয়োজন।'
অনেক কাজ তোমাকে কঠিন লাগতে পারে। কিন্তু যে কাজ তোমাকে করতেই হবে, তা শুরু করার আগে মাথা চুলকিয়ে লাভ নেই। শুরুতে প্রত্যেক কাজই কঠিন লাগে। 'কাজ শুরু করার আগে ভালোভাবে প্রস্তুত হলে দেখা যাবে, কাজ অর্ধেক শেষ হয়ে গেছে।'
সুখ-সন্ধানী বন্ধু আমার! জেনে রেখো যে, 'জীবন হচ্ছে কর্ম এবং কর্ম করতে না চাওয়া মরণ।' 'দুঃখ, ব্যথা, বেদনা থেকে বাঁচতে হলে, কাজের ভিতর দিয়ে বাঁচতে হবে।' দুঃখ ভুলতে হলে জীবনে ব্যস্ততা আনতে হবে। জীবন মানেই সমস্যা। মানুষ সমস্যাকে এড়িয়ে চলতে পারে না। তোমার দ্বারা যদি কোন সমস্যার সমাধান না হয়, তাহলে তুমি নিজেই একটি সমস্যা। এমন পলায়নবাদী মানুষ জীবন থেকে পলায়ন করতে পারে না। পক্ষান্তরে যে আত্মহত্যা ক'রে পলায়ন করতে চাইবে, সে আরো বড় সমস্যার সম্মুখীন হবে। সমস্যার সমাধানের জন্য কৃচ্ছসাধনের প্রয়োজন আছে। প্রত্যেক আয়েশের জন্য আয়াসের দরকার আছে। পরিশ্রম সৌভাগ্যের প্রসূতি।
কম-বেশি মেহনত ছাড়া কি কাজ আছে? দুঃখ ছাড়া কি সুখলাভের উপায় আছে? শরীরকে আরাম দিয়ে কি সাফল্য আছে? 'ডাঙায় বসে কুমীর দর্শন হয়, শিকার হয় না।' ঘুমিয়ে থাকলে সকালের আলো পাওয়া যায় না। সুতরাং তোমার স্বপ্ন বাস্তবায়নের সবচেয়ে সুন্দর উপায় হল, আরামের ঘুম ছেড়ে জেগে ওঠা। 'জীবনটাই কষ্ট দিয়ে ঘেরা। আশা তা চাপা রাখে। আর কর্ম আশা পূরণ করে।'
আর এ কথা বলো না যে, 'ছুঁচের মতো ছোট্ট যন্ত্র দিয়ে দারিদ্রের মতো দৈত্যের সাথে লড়াই করা যায় না।' বড় যন্ত্র না পাওয়া পর্যন্ত তো তোমাকে তাই দিয়ে লড়াই চালিয়ে যেতে হবে। নচেৎ দৈত্য যে তোমাকে ধ্বংস ক'রে ছাড়বে। অতএব শ্রমবিমুখতা ও অলসতা বর্জন কর এবং সুখের জন্য কোন কাজ কর। আর জেনে রাখ, 'পরিশ্রমে ধন আনে পুণ্যে আনে সুখ, আলস্যে দারিদ্র আনে পাপে আনে দুখ।'
তুমি সেই অদম্য মানুষ হবে, যে 'আসুক যত বাধা পথে, হারবে না সে কোন মতে।'
তুমি শ্রমবিমুখ হলেও ভেবে দেখ, আমরা যা কিছু ভোগ করি, তা কারো না কারোর কঠিন পরিশ্রমের ফল।
'অন্নের লাগি মাঠে, লাঙলে মানুষ মাটিতে আঁচড় কাটে। কলমের মুখে আঁচড় কাটিয়া খাতার পাতার তলে মনের ফসল ফলে।'
'কল্লোলমুখর দিন ধায় রাত্রি-পানে, উচ্ছল নির্ঝর চলে সিন্ধুর সন্ধানে। বসন্তে অশান্ত ফুল পেতে চায় ফল, স্তব্ধ পূর্ণতার পানে চলিছে চঞ্চল।'
সবাই ব্যস্ত, সবাই কর্মমুখী। সবাই সফল হওয়ার প্রয়াসে দুর্বার গতিশীল। আর তুমি? কুসুমের মাসেও নির্মুকুল?
কী করবে তুমি? নাই-বা থাকল চাকরি? তোমার অর্থকে কাজে লাগাও। 'সেই সময় কাজের সময়, যখন তুমি বেকার এবং পকেটে প্রয়োজনীয় পয়সা আছে।'
আর পর-ভরসায় ব্যবসায়ী হয়ো না। লোক রাখো, কিন্তু তুমি নিজে স্বনির্ভর হও। যেহেতু 'শিকার শিকারীর চাইতে বেশি জোরে দৌড় দেয়। কারণ শিকারী দৌড়ে খাদ্যের প্রয়োজনে। আর শিকার দৌড়ে প্রাণ বাঁচানোর তাগিদে।'
অপরের নিকটে তোমার পূর্ণ পারিশ্রমিক দাবী করার আগে দেখে নাও, তোমার পরিশ্রম যথার্থ ছিল কি না?
জীবনের প্রতি ক্ষেত্রে কী পেলাম সেটাই বড় প্রশ্ন নয়, বরং কী করেছি সেটাই মুখ্য প্রশ্ন।
কর্মী সে, যে কাজ করে তৃপ্ত হয়। কাজ ক'রে সে কতটুকু লাভবান হল, সেটা তার কাছে বড় নয়।
কাজের লোকের কাছে দিনগুলি ছোট আর রাতগুলি বড় মনে হয়।
তুমি কাজের লোক হও। কোন সময়ই অকেজো হয়ে থেকো না। অবসরপ্রাপ্ত হলেও কাজে ফাঁকি দিয়ো না। যেহেতু তোমার প্রতিপালক বলেন, {فَإِذَا فَرَغْتَ فَانصَبْ} (۷) سورة الشرح
অর্থাৎ, অতএব যখনই অবসর পাও, তখনই সচেষ্ট হও। (আলাম নাগ্রাহঃ ৭)
কাজের লোক হও, পরিশ্রম ও ব্যস্ততার পাথর-গর্ভে তোমার দুঃখকে কবর দিয়ে দাও। বৈধ পথে অর্থোপার্জন কর। পয়সা উড়ে বেড়াচ্ছে ধরে নাও। ওড়ার স্থান চেনো, ধরে নিতে পারবে।
সাঈদ বিন মুসাইয়েব বলেন, 'সেই ব্যক্তির মধ্যে কোন মঙ্গল নেই, যে নিজের মান-সম্ভ্রম বজায় রাখার জন্য এবং আমানত রক্ষা করার জন্য অর্থ উপার্জন করে না।'
একদা হযরত উমার মসজিদে এক ব্যক্তিকে ই'তিকাফে বসে থাকতে দেখে বললেন, 'তোমার খাওয়ার ব্যবস্থা কোথেকে হয়? বলল, 'আমার ভাই তার নিজের জন্য, তার পরিবারের জন্য এবং আমার জন্য রোযগার করে।' উমার বললেন, 'তাহলে তোমার ভাইই তোমার চেয়ে বড় আবেদ।'
মামুন বলেন, 'মানুষ তার জীবনে চার শ্রেণীর একটি হয়ে থাকে। তা না হলে সে পরের মুখাপেক্ষী হয়। আর তা হল, নেতৃত্ব, ব্যবসা, চাষ এবং কারিগরি।
হযরত উমার বলেন, 'কোন কোন লোক দেখে আমি মুগ্ধ হই। কিন্তু যখনই শুনি যে, ওর কোন ব্যবসায় নেই, তখনই সে আমার চোখ থেকে পড়ে যায়।'

📘 জীবন দর্পণ > 📄 সুখী মানুষ

📄 সুখী মানুষ


সুখ বাইরের বস্তু নয়, সুখ হল অন্তরের বস্তু। মনের সুখই বড় সুখ, মনের ধনবত্তা হল আসল ধনবত্তা। যে মনের মাঝে ধনের কোন অভাব অনুভব করে না, সেই প্রকৃত ধনী। মহানবী বলেছেন, "বিষয় সম্পদের আধিক্য ধনবত্তা নয়, প্রকৃত ধনবত্তা হল অন্তরের ধনবত্তা।” (বুখারী ও মুসলিম)
অধিকাংশ মানুষই যতখানি খুশী হতে চায়, তাদের মন অনুযায়ী তাই হয়। যেহেতু মনের মাঝেই খুশির বাগান আছে। সেই বাগানকে পরিপাটি ক'রে যে ফুল-গাছ রোপণ করবে, তারই মনে খুশির ফুল প্রস্ফুটিত হবে। অন্যথা মনকে মরুভূমি ক'রে রাখলে সুখ-বসন্তের কোন সাক্ষাৎ হবে না।
বাহ্যিক বিলাসিতা বিলাসীর সুখের চিহ্ন নয়। আভ্যন্তরিক সুখ মনের মাঝে পরশ না আনতে পারলে মানুষ সুখী হতে পারে না। আসলে 'মানুষের ভিতর-বাহির এক হলে দুনিয়ায় কোন দুঃখ থাকে না।'
সুখ লাভ করতে ত্যাগ স্বীকার করতে হয়। সাময়িক দুঃখ-কষ্টকে বরণ ক'রে সুখ আনয়ন করতে হয়। কাঁটার ঘা খেয়ে গোলাপ-পদ্ম তুলে আনতে হয়। 'সুখ' বলতে দুটি অক্ষর। কিন্তু তা অর্জন করতে অনেক সময় শত দুঃখ বরণ করতে হয়।
শায়খ সা'দী বলেছেন, 'সমুদ্র-গর্ভে মূল্যবান রত্ন বর্তমান। কিন্তু আরাম ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা চাইলে সমুদ্র-তীরে বসে থাক।'
সুখের মূল বিষয় হল, নিরাপত্তা; যেহেতু ভীত-সন্ত্রস্ত ব্যক্তি সুখী হতে পারে না। অতঃপর সুস্থতা; যেহেতু অসুস্থ ও রোগী ব্যক্তি সুখী হতে পারে না। অতঃপর যৌবন; যেহেতু যৌবনহীন ব্যক্তি সুখী হতে পারে না। অতঃপর ধনবত্তা; যেহেতু দরিদ্র ও অভাবী ব্যক্তি সুখী হতে পারে না।
সুখ তিন শ্রেণীর : মনের সুখ আছে হিকমত, পবিত্রতা ও বীরত্বে। দৈহিক সুখ আছে সুস্থতা, সৌন্দর্য, যৌবন ও শক্তিমত্তায়। আর এ দুইয়ের বাইরের সুখ আছে ধনবত্তা, যশ ও কুলীনত্বে।
বলা বাহুল্য, 'সবচেয়ে বড় সুখভোগ মানুষের খোঁজা উচিত নয়, উচিত হল সবচেয়ে পবিত্র সুখভোগ খোঁজা।' যেহেতু সেটাই হল মনের সুখ ও প্রকৃত সুখ।
জ্ঞানিগণ বলেন, সাতটি গুণ তোমার মধ্যে তৈরী কর, তোমার দেহ-মন শান্তি পাবে এবং তোমার দ্বীন ও ইয্যত রক্ষা পাবে:-
১। যা হয়ে গেছে বয়ে গেছে, গত হওয়া বিষয় নিয়ে আর দুর্ভাবনা ভেবো না।
২। যে অমঙ্গল আসার আশঙ্কা আছে, তা আসার পূর্বে দুশ্চিন্তা করো না।
৩। যে দোষ তোমার মাঝেও আছে, সে দোষ নিয়ে অপরকে ভর্ৎসনা করো না।
৪। যে পরোপকারের কাজ তুমি করেছ, সে কাজের উপর প্রতিদান আশা করো না।
৫। যে জিনিস তোমার নয়, সে জিনিসের দিকে লোভনীয় দৃষ্টিতে দৃক্কাত করো না।
৬। যার রাগ তোমার কোন ক্ষতি করতে পারবে না, তার প্রতি তুমি রুষ্ট হয়ো না। আর
৭। সেই ব্যক্তির প্রশংসা করো না, যে আত্মপ্রশংসা পছন্দ করে।
ছয়টি বিষয় স্মরণ করলে তোমার জন্য প্রত্যেক মসীবত হাল্কা হয়ে যাবে, মনে শান্তি পাবে এবং দুঃখ-শোক বিদূরিত হবেঃ-
১। স্মরণ কর যে, প্রত্যেক বিষয় আল্লাহর লিখিত তকদীর অনুসারে ঘটে থাকে।
২। তোমার বিলাপ তকদীর রদ্দ করতে পারবে না।
৩। তোমার যে মসীবত এসেছে, সে মসীবত অন্যান্য মসীবত থেকে অনেক ছোট।
৪। তোমার যা হারিয়ে গেছে তার তুলনায় আছে অনেক বেশী।
৫। প্রত্যেক মসীবতের পিছনে কোন না কোন মঙ্গল আছে; এ কথা জানলে তুমি প্রত্যেক মসীবতকে বিলক্ষণ নেয়ামত মনে করবে। আর
৬। মুমিনের জন্য প্রত্যেক মসীবত তার সওয়াব বৃদ্ধি, আল্লাহর ক্ষমা-লাভ, পাপ-স্থলন, মর্যাদা বর্ধন, এবং তুলনামূলক অধিক বড় মসীবত থেকে মুক্তিলাভের কারণ। আর আল্লাহর নিকট যা আছে তা অধিক উত্তম ও চিরস্থায়ী।
যে অল্পে তুষ্ট, সে বড় সুখী। যেহেতু 'সুখ আছে স্বল্প কামনার মাঝে, অধিক ধনসম্পদে নয়।' বর্তমানে যা আছে, তাই নিয়ে সন্তুষ্ট হলে মানুষ সুখী হয়। অপরের কম দেখে নিজের বেশির কথা খেয়াল করলে মানুষ সুখী হয়। হাকীম ফারেসী বলেন, 'আমি কখনো যুগের দোষ দিইনি এবং কখনো আসমানী ফায়সালায় অসন্তুষ্ট হইনি। তবে একবার আমার পায়ের জুতা নষ্ট হয়ে গেল। খালি পায়ে চলতে হল। খরিদ ক'রে ব্যবহার করার মত কোন অর্থও ছিল না আমার। একদা মনে বড় সংকীর্ণতা অনুভব করার সাথে কুফার মসজিদে প্রবেশ করলাম। সেখানে একটি লোক দেখলাম, যার দুটি পা-ই নেই। তা দেখে আমি আল্লাহর প্রশংসা করলাম এবং যে নেয়ামত তিনি আমার বর্তমান রেখেছেন তার শুকরিয়া আদায় করলাম।' মহানবী বলেন,
انْظُرُوا إِلَى مَنْ أَسْفَلَ مِنْكُمْ وَلَا تَنْظُرُوا إِلَى مَنْ هُوَ فَوْقَكُمْ فَهُوَ أَجْدَرُ أَنْ لَا تَزْدَرُوا نِعْمَةَ اللَّهِ عَلَيْكُمْ ..
"তোমাদের মধ্যে যে নীচে তোমরা তার দিকে তাকাও এবং যে তোমাদের উপরে তার দিকে তাকায়ো না। যেহেতু সেটাই হবে উৎকৃষ্ট পন্থা যে, তোমাদের প্রতি যে আল্লাহর নিয়ামত রয়েছে তা তুচ্ছ মনে করবে না।” (বুখারী ৬৪৯০, মুসলিম ২৯৬৩নং) মহানবী আরো বলেন, وارض بما قَسَمَ اللهُ لَكَ تَكُنْ أَغْنى النَّاسِ)...
"আল্লাহ তোমার ভাগে যা ভাগ ক'রে দিয়েছেন তা নিয়ে তুষ্ট হও, তুমি সবার চাইতে বড় ধনী হয়ে যাবে---।” (সহীহুল জামে' ৪৫৮০, ৭৮-৩৩নং)
বলা বাহুল্য, সেই প্রকৃত সুখী, যে প্রয়োজনের তুলনায় বেশী আশা করে না। আর 'জ্ঞানী লোক কখনো সুখের সন্ধান করে না, তারা কামনা করে দুঃখ-কষ্ট থেকে অব্যাহতি।'
সেই সুখ শ্রেষ্ঠ সুখ, যা অব্যাহত থাকে। যা মানুষের জীবনে মেঘের ছায়ার মতো এসে অকস্মাৎ সরে যায় না। কিন্তু বহু মানুষ আছে, যারা অতিরিক্ত সুখভোগে উন্মত্ত হয়ে পরবর্তীর কথা ভুলে যায়। সেই সাময়িক সুখভোগের ফলে যে দুঃখ-কষ্ট আসতে পারে, সে কথা তারা মাথায় রেখে সুখভোগে লিপ্ত হয় না। অনেক সময় জেনেশুনে উন্নাসিকতার সাথে সুখভোগ করে। যার প্রতিফল স্বরূপ তাদেরকে লাঞ্ছনা, গঞ্জনা, হাজতবাস ইত্যাদি বরণ করতে হয়। সামান্য সুখ ভোগ করতে গিয়ে আজীবন লাঞ্ছনার বোঝা মাথায় বহন ক'রে ফিরতে হয়। অবশ্য নির্লজ্জদের কাছে সে বোঝা ভারী বোধ হয় না।
কিন্তু বিদ্যানগণ বলেন, 'সেই খুশীর জন্য কোন স্বাগতম নয়, যার পশ্চাতে রয়েছে কষ্ট। সেই সুখে উন্মত্ত হয়ে কী লাভ, যার পর দুঃখের অন্ধকার আসে? কষ্টের পর যদি সুখ লাভ হয়, তবে সেটাই হল কাম্য।'
'চিরদিন কাহারো সমান না যায়, চির-সুখ এ ভবেতে কাহারো না রয়।'
সুতরাং সুখ পেয়ে দুখের দিনগুলিকে ভুলে যেয়ো না। মনে রেখো, পুনরায় কালই তোমার দুখের দিন আসতে পারে। আরো মনে রেখো যে,
'যে জন চেতনামুখী সেই সদা সুখী, যে জন অচেত-চিত্ত সেই সদা দুঃখী।'
সুখী বন্ধু আমার! তুমি হয়তো জানো না, দুঃখ কী জিনিস। যেহেতু সুখের সাগরে ডুব দিয়ে দুঃখকে উপলব্ধি করা যায় না। নচেৎ সে উপলব্ধি থাকলে তুমি সুখের অপচয় ঘটাতে না। অপরের দুঃখের ভাগী হওয়ার চেষ্টা করতে। আর জানতে যে, পরের মনে খুশী আনয়ন করা কোন কর্তব্য পালন করা নয়, এ হল একটি আনন্দ। এতে মানুষের স্বাস্থ্য ও সুখ বর্ধিত হয়।
মহানবী বলেছেন, "আল্লাহর নিকট সবচেয়ে প্রিয়তম মানুষ সেই ব্যক্তি, যে মানুষের জন্য সবচেয়ে বেশী উপকারী এবং আল্লাহর নিকট সবচেয়ে প্রিয়তম আমল সেই আমল, যা ক'রে একজন মুসলিমকে আনন্দ দেওয়া যায়।” (সহীহুল জামে' ১৭৬নং)
তিনি আরো বলেছেন, إِنَّ أَحَبَّ الاعْمَالِ إِلَى اللَّهِ تَعَالَى بَعْدَ الفَرَائِضِ إِدْخَالُ السُّرُورِ عَلَى الْمُسْلِمِ».
অর্থাৎ, ফরয আমলসমূহের পর মহান আল্লাহর নিকট সবচেয়ে বেশি প্রিয় আমল হল, মুসলিমের মনে আনন্দ ভরে দেওয়া। (ত্বাবারানী, সিঃ সহীহাহ ৯০৬নং)
সুখ গ্রহণে নয়, সুখ আছে দানে। যে শুধু নিজের কথা ভাবে, যে আত্মসুখ নিয়ে বিভোর থাকে, সে জীবনে কিছুই পায় না; সে আসলে বড় দুঃখী। পক্ষান্তরে অন্যের উপকার যে করে, সে জীবনকে পরিপূর্ণ উপভোগ করতে পারে। সুখ বড় ছোঁয়াচে। দিলেই কিছু পাওয়াও যায়। সুখ ভাগ করলে বেড়ে যায়, কিন্তু দুঃখ ভাগ করলে কমে যায়। সুখকে সুখ তখনই বলা হবে, যখন তাতে একাধিক ব্যক্তি শরীক হবে। আর কষ্টকে কষ্ট তখনই মনে হবে, যখন তা কাউকে একাই সহ্য করতে হবে।
সুখ হল চুম্বনের মত, যা অংশীদার ছাড়া বাস্তবায়ন হয় না।
সবচেয়ে বড় সুখানুभूति হয় তখন, যখন কোন ভালো কাজ গোপনে করি, অতঃপর তা অকস্মাৎ প্রকাশ পায়। ---এ সকল কথা বলেছেন, এ সংসারের সুখী বহু অভিজ্ঞ মানুষ।
আঘাত ভুলার অভ্যাস থাকলে সুখলাভ সহজ। দুঃখ হজম করার শক্তি থাকলে সুখানুভব সহজ। মনের অভাবকে দূর করতে পারলে সুখানুভূতি সহজ। কেবল অভাবকে সহ্য করা নয়, অভাব এসে গেলে তাকে ভালোবাসারও ক্ষমতা থাকা চাই। অবশ্য অভাব যাতে না আসে, তার জন্য প্রার্থনা করা কর্তব্য। আমাদের মহানবী অভাব থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করতেন।
সুখ লাভের দুটি উপায় এও আছে যে, তুমি তাকে ক্ষমা ক'রে দেবে, যাকে তুমি ভুলতে পারবে না। অথবা তাকে ভুলে যাবে, যাকে তুমি ক্ষমা করতে পারবে না।
সুখী মানুষের নিদর্শন এই যে, তার আয়ু লম্বা হলে লালসা কমে যায়, তার ধন যত বেশী হয়, তত সে দান করে। যত তার মর্যাদা বৃদ্ধি হয়, তত সে বিনয়ী হয়। পক্ষান্তরে দুঃখী মানুষের চিহ্ন এই যে, তার আয়ু যত লম্বা হয়, তার লালসা তত বৃদ্ধি পায়। তার ধন যত বৃদ্ধি পায়, তত সে বেশী কৃপণ হয়। আর যত তার মর্যাদা বৃদ্ধি পায়, ততই সে বেশী অহংকারী হয়ে ওঠে।
সুখ লাভের একটা পথ এও আছে যে, আমাদের নাগাল ও ক্ষমতার বাইরে যা আছে, তার প্রাপ্তি নিয়ে দুশ্চিন্তা না করা। অসম্ভব কিছু কামনা ও আকাঙ্ক্ষা না করা।
যেটা অবশ্যম্ভাবী, যাকে প্রতিহত করা যায় না, তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হয়ে উঠলে সুখ থাকে না। মহান সৃষ্টিকর্তার অটল ফায়সালাকে মেনে নেওয়া ছাড়া বান্দার কোন উপায় থাকে না। আর তা ঘাড় পেতে মেনে নিতে পারলে মনে দুঃখ আসে না।
জ্ঞানিগণ বলেন, 'আমরা যখন অবশ্যম্ভাবীর সঙ্গে লড়াই করা ছেড়ে দিই, তখন নতুন শক্তির জন্ম হয়ে আমাদের জীবন পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে।'
'কোন লোকই এমন শক্তিশালী হতে পারে না, যে অবশ্যম্ভাবীর সঙ্গে যুদ্ধ করতে পারে এবং বাকি ক্ষমতায় নতুন জীবন গড়ে তুলতে পারে। যে কোন একটাকেই গ্রহণ করতে হবে। অবশ্যম্ভাবী ঝড়, শিলাবৃষ্টি মেনে আপনি বেঁকে পড়তে পারেন। কিন্তু তাকে প্রতিরোধ করতে গেলে একেবারে ভেঙ্গে পড়বেন.....
সুতরাং যা প্রতিহত করতে পারবেন না, তা মেনে নেওয়ার শক্তি থাকা চাই। আর যা প্রতিহত করতে পারবেন, তা করার সাহস চাই। অবশ্য উভয়ের মাঝে পার্থক্য করার ক্ষমতাও আপনার মাঝে থাকা চাই।'
বলা বাহুল্য, প্রতিহত করার ক্ষমতা থাকলে 'ঘুসির জন্য গাল পেতে দিলেও মাটিতে পড়ে যেয়ো না।'
সুখের একটি পথ হল, 'গতস্য শোচনা নাস্তি।' যা ঘটে গেছে তা নিয়ে দুশ্চিন্তা না করা। যে ক্ষতি হয়ে গেছে, তা নিয়ে অনুশোচনা না করা। বিদ্যানগণ বলেন, 'বুদ্ধিমান মানুষরা কখনো তাঁদের ক্ষতি নিয়ে ভাবতে চান না; বরং খুশী মনে সেই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে চেষ্টা করেন।'
আর আমাদের নবী বলেন, “তোমার উপকারী বিষয়ে তুমি যত্নবান হও। আল্লাহর নিকট সাহায্য ভিক্ষা কর এবং অক্ষম হয়ে যেও না। তোমার কোন বিপদ এলে বলো না যে, 'যদি আমি এই করতাম, তাহলে এই হত।' বরং বলো, 'আল্লাহ যা ভাগ্যে লিখেছিলেন এবং যা চেয়েছেন, তাই হয়েছে।' কারণ 'যদি' শয়তানের কর্ম উদ্ঘাটন করে।” (মুসলিম)
নিজের অসুখী জীবনের দিকে সর্বদা নজর দিলে মোটেও কেউ সুখী হতে পারে না। জীবনে কী পেলাম, আর কী পেলাম না, অমুক কত কী পেল, আর আমি পেলাম না---এরূপ হিংসামূলক হিসাব-নিকাশও মানুষকে সুখ থেকে বঞ্চিত করে।
পৃথিবীর এ সংসার চলছে পারস্পরিক স্বার্থভিত্তিক লেনদেনের উপর। লেনদেন ঠিক রাখলে পৃথিবীর মানুষ সুখে হাবুডুবু খেতো। কিন্তু বিনিময় দানে ভারসাম্য নেই বলেই অনেক মানুষ সুখী নয়। সুতরাং যদি কেউ তোমার নেমকহারামি করে, কৃতঘ্ন হয়, তাহলে তার পরোয়া করো না। বরং পরোপকার ক'রে ভুলে যেয়ো। লিখলেও বালির উপর লিখে রেখো। তবেই সুখী হতে পারবে। নচেৎ দানের বদলে প্রতিদানের এবং উপকারের বিনিময়ে প্রত্যুপকারের আশায় অপেক্ষা করলে সুখী হতে পারবে না।
জ্ঞানিগণ বলেন, 'আমরা যদি সুখী হতে চাই, তাহলে কৃতজ্ঞতা বা অকৃতজ্ঞতার কথা ভুলে যাওয়া ভালো। আর দান করার আনন্দেই দান করা উচিত।'
তদনুরূপ বড় সুখী তারা, যারা লোকেদের অমূলক সমালোচনা উপেক্ষা ক'রে চলে। যারা সমালোচকদের সমালোচনায় থেমে যায় না, বিচলিত হয় না। বরং হকপন্থী হলে 'কুত্তা ভুঁকতা রহেগা আওর হাথী চলতা রহেগা'র নীতি অবলম্বন করে।
জীবন একটি যুদ্ধের নাম। আর 'সুখ শুধু আনন্দের নয়; এ হল অধিকাংশ ক্ষেত্রেই জয়লাভ।' পরন্ত মু'মিনের আসল জয়লাভ পরকালে।
'জীবনের উদ্দেশ্য কেবল লাভ নিয়ে নয়; যে কোন বোকাই তা পারে। আসল প্রয়োজন ক্ষতি থেকে লাভ করা।' যে কমলা লেবুর জায়গায় কাগজি লেবু পায়, তার উচিত তা দিয়ে শরবত বানিয়ে পান করা। পার্থিব যে ক্ষতি হয়, সেই ক্ষতিকে পরকালের সওয়াব বানিয়ে নিলে সুখের হিসাব বজায় থাকে। অবশ্য তাতে সবর ও সওয়াবের নিয়ত আবশ্যক।
সুখের পিছনে দৌড় দিয়ে লাভ নেই। ভাগ্যে থাকলে সুখ আপনা-আপনি এসে যাবে। তবে তার মানে এই নয় যে, সুখের জন্য তদবীর করতে হবে না। তবে অনেক সময় 'সুখ প্রজাপতির মতো; ধরতে যান, উড়ে বেড়াবে, স্থির হয়ে দাঁড়ান, প্রজাপতি উড়ে এসে আপনার উপর বসবে।'
'সুখ হল বলের মতো, যখন তা গড়িয়ে যায়, তখন আমরা তার পিছনে ছুটি এবং যখন তা থেমে যায়, তখন আমরা তাকে লাথি মারি।'
অনেক সময় মানুষ অতিরিক্ত ও অযথা সুখ আশা করে। সৃষ্টির কাছে কোন সুখ পাওয়ার আশা করে, যা পাওয়ার নয়। সে ক্ষেত্রে নিরাশা এক প্রকার স্বস্তি।
নেশার মধ্যে সুখ ও স্বস্তি পেতে চেয়ো না বন্ধু! তাতে সাময়িকভাবে দুঃখ বিস্মৃত হলেও অধঃপতন বেশি। আর তাতে যে দ্বীন-দুনিয়ার ক্ষতি আছে, তা তোমার অজানা নয়।
অনেক সময় পরের জীবনকে বড় সুখী বলে মনে হয়। 'নদীর অপর পারের ঘাসকে অনেক বেশী সবুজ মনে হয়। দূরবর্তী সম্ভাবনাকে মানুষ অনেক বেশী উজ্জ্বল মনে করে।'
'নদীর এ পার কহে ছাড়িয়া নিশ্বাস, ও পারেতে সর্বসুখ আমার বিশ্বাস। নদীর ও পার বসি দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে--- কহে, যাহা-কিছু সুখ সকলই ও পারে।'
ইমাম আহমাদকে জিজ্ঞাসা করা হল, 'সুখলাভ কখন হবে?' বা 'আরাম কখন পাওয়া যাবে?' তিনি বললেন, 'বেহেশে পা রাখলে।'

📘 জীবন দর্পণ > 📄 দুঃখী মানুষ

📄 দুঃখী মানুষ


অনেক মানুষ দুঃখ পায়, বরং সংসারের অধিকাংশ মানুষ কোন না কোনভাবে দুঃখ-কষ্ট পেয়ে থাকে। অবশ্য সবাই যে সে দুঃখ পাওয়ার উপযুক্ত---তা নয়।
কারণ বহু মানুষ স্বকৃত ভুল বা পাপের প্রতিফল স্বরূপ দুঃখ ভোগ করলেও অনেক মানুষকে আল্লাহ দুঃখ দিয়ে পরীক্ষা করেন। আগুনে পুড়লে সোনা খাঁটি কি না বোঝা যায়। আর দুঃখ-কষ্টে পড়লে মানুষ সাহসী কি না, তা বোঝা যায়। বুঝা যায় ঈমানের মজবুতি। সোনার খাঁটিত্ব যাচাই করার জন্য যেমন পাথরে ঘসা হয় অথবা আগুনে জ্বালানো হয়, তেমনি বিশেষ বিশেষ বান্দাকে প্রতিপালক যাচাই-বাছাই ক'রে নেন। দুঃখ-কষ্ট দিয়ে তার গোনাহ ঝরিয়ে দেন।
আল্লাহর রসূল বলেছেন, "কোন মুমিনকে যখনই কোন রোগ অথবা অন্য কিছুর মাধ্যমে কষ্ট পৌছে, তখনই আল্লাহ তার বিনিময়ে তার পাপরাশিকে ঝরিয়ে দেন; যেমন বৃক্ষ তার পত্রাবলীকে ঝরিয়ে থাকে।” (বুখারী ৫৬৪৮নং মুসলিম ২৫৭ ১নং)
মহানবী বলেছেন, "সকল মানুষ অপেক্ষা নবীগণই অধিকতর কঠিন বিপদের সম্মুখীন হন। অতঃপর তাঁদের চেয়ে নিম্নমানের ব্যক্তি এবং তারপর তাদের চেয়ে নিম্নমানের ব্যক্তিগণ অপেক্ষাকৃত হাল্কা বিপদে আক্রান্ত হন। মানুষকে তার দ্বীনের (পূর্ণতার) পরিমাণ অনুযায়ী বিপদগ্রস্ত করা হয়; সুতরাং তার দ্বীনে যদি মজবুতি থাকে, তবে (যে পরিমাণ মজবুতি আছে) ঠিক সেই পরিমাণ তার বিপদও কঠিন হয়ে থাকে। আর যদি তার দ্বীনে দুর্বলতা থাকে, তবে তার দ্বীন অনুযায়ী তার বিপদও (হাল্কা) হয়। পরন্ত বিপদ এসে এসে বান্দার শেষে এই অবস্থা হয় যে, সে জমীনে চলা ফেরা করে অথচ তার কোন পাপ অবশিষ্ট থাকে না।” (তিরমিযী, ইবনে মাজাহ, ইবনে হিব্বান, সহীহুল জামে' ৯৯২ নং)
দুঃখ আসে মুমিন বান্দার মর্যাদাবর্ধনের জন্য। মহানবী বলেন, “আল্লাহর তরফ থেকে যখন বান্দার জন্য কোন মর্যাদা নির্ধারিত থাকে, কিন্তু সে তার নিজ আমল দ্বারা তাতে পৌঁছতে অক্ষম হয়, তখন আল্লাহ তার দেহ, সম্পদ বা সন্তান-সন্ততিতে বালা-মসীবত দিয়ে তাকে বিপদগ্রস্ত করেন। অতঃপর তাকে এতে ধৈর্য ধারণ করারও প্রেরণা দান করেন। (এইভাবে সে ততক্ষণ পর্যন্ত বিপদগ্রস্ত থাকে) যতক্ষণ পর্যন্ত না সে আল্লাহ আয্যা অজাল্লার তরফ থেকে নির্ধারিত ঐ মর্যাদায় উন্নীত হয়ে যায়!” (আহমদ, সহীহ আবু দাউদ ২৬৪৯ নং)
দুঃখ আসে আমাদেরকে শিক্ষা দেওয়ার জন্য। দুঃখ যেমন আমাদেরকে কাঁদায়, তেমনি আমাদেরকে শিক্ষাও দিয়ে যায়। সুতরাং জ্ঞানী হল সেই ব্যক্তি, যে মসীবতের সময় ধৈর্য ধারণ করে এবং সেই মসীবত থেকে উপদেশ গ্রহণ করে।
জ্ঞানী হল সেই ব্যক্তি, যে নিজের বিপদ থেকে শিক্ষা নেয়। কিন্তু তার থেকেও বড় জ্ঞানী হল সেই ব্যক্তি, যে নিজের ও পরের বিপদ দেখেও শিক্ষা নেয়।
কিছু মানুষ আছে, যারা খামোখা দুঃখ ভোগ করে। নিজের মন থেকে দুঃখ সৃষ্টি ক'রে দুঃখ বহন করে। সুতরাং তাদের অদৃষ্টে কোনদিন শান্তি লেখা থাকে না।
কোন কোন শ্বশুর-শাশুড়ী তাদের বউয়ের নিকট অতিরিক্ত খিদমত পাওয়ার আশা রাখে। অতঃপর তাদের আকাঙ্ক্ষিত খিদমত না পেলে বউয়ের প্রতি রাগ ও দুঃখ হয়।
কোন কোন স্ত্রী স্বামীর কাছে অতিরিক্ত ভালবাসা পেতে চায়। সেই চাহিদায় স্বামীর কাছে সংসারের মেয়েলি কাজও পেতে পছন্দ করে। অতঃপর স্বামী তা না করলে অন্য মহিলার স্ত্রৈণ স্বামীর সে কাজ করা দেখে নিজের প্রতি ধিক্কার এনে কষ্ট পায়।
কোন কোন স্বামীও অনুরূপ স্ত্রীর কাছে অতিরিক্ত ভালবাসা পাওয়ার কামনা রাখে। অনেক সময় নাটক-সিনেমায় অভিনীত অথবা উপন্যাস-রূপকথায় কল্পিত প্রেম-ব্যবহার পেতে চায় তার নিকট থেকে। অতঃপর তা না পেয়ে মনে মনে বড় দুঃখ পায়।
অনেক পিতামাতাও নিজেদের সন্তানদের নিকট থেকে অতিরিক্ত আনুগত্য না পেয়ে অনুরূপ দুঃখ ভোগ করতে থাকে।
পক্ষান্তরে তারা যদি বাস্তবকে মেনে নিয়ে উক্ত আশা না করত এবং সে আশা পূরণ না হওয়াটাকে স্বাভাবিক বলে স্বীকার ক'রে নিতো, তাহলে মনে দুঃখ এসে বাসা বাঁধত না এবং কষ্ট তাদের হৃদয়-দ্বারে আঘাত হানত না।
কিন্তু অনেক মানুষ আছে, যারা অসম্ভবকে সম্ভব ক'রে পেতে চেয়ে মনে কষ্ট পায়। অবাস্তব কল্পণাপ্রসূত সুখ কামনা ক'রে নিজের জীবনকে বিষময় ক'রে তোলে। অথচ আকাশ-কুসুম কল্পিত অলীক সুখ পাওয়ার আশা ক'রে সামান্য সুখ থেকেও নিজেকে বঞ্চিত করা উচিত নয়। কবি বলেছেন, 'সব ব্যথারই ওষুধ আছে, হয়তো বা তা নেই, থাকে যদি হাত পেতে নাও, চেয়ো না অলীককেই।'
বহু আবেগময় মানুষ আছে, যারা পরের দুঃখ দেখে কাঁদে। কোন দুঃখময় ঘটনা শুনে অথবা পড়ে চোখ দিয়ে অশ্রুধারা প্রবাহিত করে। পরের দুঃখে দুঃখী হয় ও কষ্ট পায়। অবশ্য এ কথা সত্য যে, পরের দুঃখ দেখে এমনি কান্না আসে না, যদি না নিজের দুঃখের সাথে তার কোন মিল থাকে। ভুক্তভোগী মানুষ অপরের ভোগান্তি দেখে দুঃখ পায়। বঞ্চিত মানুষ অপরের বঞ্চনা দেখে মনে ব্যথা পায়। অত্যাচারিত মানুষ অপরের প্রতি অত্যাচার হতে শুনে বা দেখে হৃদয়ে বেদনা অনুভব করে। যার যেখানে ব্যথা, সেখানে ঘা লাগলে ব্যথা তো অবশ্যই বাড়বে।
বহু মানুষ আছে, যারা অতিরিক্ত সুখ কামনা করে। সুখের সাথে সখ্য বেশি বলে তাতে সামান্য ত্রুটি হলেই দুঃখ অনুভব করে। কবি বলেছেন, 'সুখ-দুঃখ দু'টি ভাই--- সুখের লাগিয়া যে করে পিরীতি দুখ যায় তারই ঠাঁই।'
অতিরিক্ত সুখের আশা, অতিরিক্ত সম্ভোগের ইচ্ছা মানুষকে অস্থির ও উদ্বেগাকুল ক'রে তোলে। তার মনের উদ্যানে শান্তি ও আনন্দের পুষ্পরাজি শুষ্ক হয়ে ঝরে পড়ে। অতিরিক্তি সুখের আশায় মনের স্বস্তিও হারিয়ে ফেলে।
কবি বলেছেন, 'সুখেতে আসক্তি যার, আনন্দ তাহারে করে ঘৃণা, কঠিন বীর্যের তারে, বাঁধা আছে সম্ভোগের বীণা।'
যে চালক গাড়ি কোথায় থামাতে হয় জানে না, সে অবশ্যই দুর্ঘটনাগ্রস্ত হয়। জীবনের চলার পথে যে মানুষ কোথায় থামতে হয় জানে না, তার বড় দুঃখ ও কষ্ট হয়। যে মানুষ প্রেম-প্রীতি-ভালবাসা, স্নেহ-শ্রদ্ধা, ভয়-ভক্তি-লজ্জা, রাগ-বিতৃষ্ণা ইত্যাদির সঠিক পরিমাণ-মাত্রা জানে না, সে অবশ্যই দুঃখ পায়।
অনেক মানুষ আছে, যারা হারিয়ে যাওয়া স্মৃতিকে জড়িয়ে ধরে থেকে জীবনের বর্তমান সুখকে বরবাদ করে। পুরনো প্রেম, পূর্বেকার স্বামী অথবা স্ত্রী, পূর্বেকার দেশ, ছেড়ে যাওয়া সন্তান, পুরনো পদ, খ্যাতি ও বংশমর্যাদা ইত্যাদি মনের আধারে সযত্নে সংরক্ষণ ক'রে প্রাত্যহিক স্মরণে নিজেকে কষ্ট দেয়। অবশ্য বর্তমানের তুলনায় অতীতের সুখ যদি বেশি ছিল বলে মনে হয়, তাহলে তাতে দুঃখের পরিমাণ বেশি বৃদ্ধি পায়।
যেখানে খুব ভালোর আশা থাকে, সেখানে ভালোও মন্দ হয়ে দেখা দিলে মনে বড় দুঃখ হয়। যাকে সোনা বলে জ্ঞান ছিল, ঘষার পর পিতল প্রমাণিত হলে বড় দুঃখ হয়। যিনি বড় বড় আদর্শের কথা বলেন, তিনিই আদর্শচ্যুত প্রমাণিত হলে মনে বড় কষ্ট হয়। মিষ্টি মিষ্টি কথা শুনে নিঃস্বার্থ মনে হওয়ার পর স্বার্থ উদ্ধার হলে সে কেটে পড়লে বড় দুঃখ হয়। রক্ষককে ভক্ষকরূপে দেখলে, আলেমের ঘরে আমলহীনতা দেখলে, ইমামের বাড়িতে ঈমানহীনতা পরিদৃষ্ট হলে মনে বড় আঘাত লাগে। আঘাত আরো বেশি লাগে তখন, যখন তাদেরকে নিয়ে পথ চলতে হয়, সংসার করতে হয়, আত্মীয়তা বজায় রাখতে হয়। 'যাকে করি ছি, সেই ভাতের পাশে ঘি' হয়ে যখন সামনে আসে, তখনকার ঘৃণা ও দুঃখ কি সহজ মনে করতে পার? 'যার নামে উপবাস, তারই সঙ্গে বনবাস' হলে কত দুঃখজনক হয় কল্পনা কর। যার ছোঁয়া-জল খেতে মন সায় দেয় না, তার বাড়া-ভাত খেতে হলে কত কষ্ট হয় বল? অভিশপ্তের সাথে সুদীর্ঘ সফরে কাল কাটানো কত বড় যন্ত্রণাদায়ক অনুমান কর!
যার ভালবাসা দেওয়ার কথা ছিল, সে যদি ভর্ৎসনা দেয়, যার পুরস্কার দেওয়ার কথা ছিল, সে যদি তিরস্কার দেয়, যার পিতা হওয়ার কথা ছিল, সে যদি চিতা হয়ে যায়, যার মাতা হওয়ার কথা ছিল, সে যদি যাঁতা হয়ে যায়, যার জীবন-সঙ্গী হওয়ার কথা ছিল, সে যদি জীবন-জঙ্গী হয়, যার বাধ্য ছেলে হওয়ার কথা ছিল, সে যদি কেলে-সাপ হয়ে যায়, তাহলে দুঃখ রাখার ঠাঁই পাওয়া যাবে কি? ভেবে দেখ সেই সময়কার অস্বস্তিকর পরিস্থিতির কথা, যখন কোন খাবার গিলতেও পার না, ফেলতেও পার না, কাঁটা গলায় আটকে গিয়ে নিচেও যায় না, বেরিয়েও আসে না!
বল তো ভাইটি, যার জন্য চুরি কর, সেই যদি তোমাকে চোর বলে, যার জন্য বনবাসী, সেই যদি তোমার গলায় ফাঁসি দেয়, যার জন্য বুক ফাটে, সে যদি তোমাকে এঁকে কাটে, যাকে আনতে দিলে কড়ি, সে যদি দেয় তোমার গলে দড়ি, যার জন্য সাজন-ভাবন, সেই যদি তোমার দিকে চোখ তুলে না দেখে, তাহলে তোমার মনে কত দুঃখ, কত কষ্ট হয়?
উপকার করার পর উপকৃত ব্যক্তি যদি কৃতজ্ঞ না হয়, তাহলে উপকারীকে বড় দুঃখ লাগে। অকৃতজ্ঞ হওয়ার পরেও যদি শত্রুতা করে, তাহলে দুঃখ লাগে আরো বেশি। নদী পার হয়ে যদি মাঝিকে 'শালা' বলে কেউ গালি দেয়, তাহলে সে গali নিশ্চয়ই গুলি হয়ে হৃদয় ঝাঁঝরা ক'রে দেয়! এই জন্য আরবী প্রবাদে বলা হয়,
اتَّقِ شَرَّ مَنْ أَحْسَنْتَ إِلَيْهِ.
অর্থাৎ, তুমি যার প্রতি অনুগ্রহ করেছ, তার মন্দ থেকে সাবধান থেকো।
সুতরাং উপকার ক'রে তার বিনিময়ে প্রত্যুপকার বা কৃতজ্ঞতার আশা করো না, তাহলে দুঃখ পাবে না। বরং উপকার করার পর অন্নদানকারীদের মতো বলো,
{إِنَّمَا نُطْعِمُكُمْ لِوَجْهِ اللَّهِ لَا تُرِيدُ مِنكُمْ جَزَاء وَلَا شُكُورًا } (۹) سورة الإنسان
অর্থাৎ, (তারা বলে,) 'শুধু আল্লাহর মুখমণ্ডল (দর্শন বা সন্তুষ্টি) লাভের উদ্দেশ্যে আমরা তোমাদেরকে অন্নদান করি, আমরা তোমাদের নিকট হতে প্রতিদান চাই না, কৃতজ্ঞতাও নয়। (দাহর: ৯)
জ্ঞানিগণ বলেন, 'কৃতজ্ঞতা বোধ অনেক কষ্টেই জাগ্রত হয়। সাধারণ মানুষের মধ্যে সেটা আশা করা বাতুলতা।'
'এ পৃথিবীতে ভালোবাসা পাওয়ার একটাই পথ আছে, আর তা হল প্রতিদান পাওয়ার আশা না ক'রে কেবল ভালোবেসে যাওয়া।'
'আমরা যদি সুখী হতে চাই, তাহলে কৃতজ্ঞতা বা অকৃতজ্ঞতার কথা ভুলে যাওয়া ভালো। আর দান করার আনন্দেই দান করা উচিত।'
পক্ষান্তরে সে কৃতঘ্ন যদি আপন কেউ হয়, তাহলে তো গোদের উপর বিষফোঁড়া। 'সময় গুণে আপন পর, খোঁড়া গাধার ঘোড়ার দর' যখন হয়, তখন তোমার দুঃখের পরিধি আরো বর্ধিত হয়। আপন ছেলে যদি পরের ছেলে হয়, সে যদি মায়ের বেটা নয়, শাশুড়ীর জামাই হয়, তাহলে সে দুঃখের কথা আর বলবে কাকে? 'যে সন্তান অকৃতজ্ঞ, তার দাঁতের ধার সাপের চেয়েও বেশী।' আর সে ছেলের ছোবলের দংশন-জ্বালা সহ্য করা কি তত সহজ?
যুবক বয়সে নিজ অর্ধাঙ্গিনীর সাথে তোমার মা-বাপের বনিবনাও না হলে বাপুত্তি ঘর ছাড়তে বাধ্য হলে, তোমাদের ছেলে-মেয়ে তোমাদের অবাধ্য হলে অথবা বউমায়ের সাথে তোমাদের বনিবনাও না হলে তোমরা নিজের বানানো-সাজানো-গুছানো সুখের বাসা ত্যাগ করতে বাধ্য হলে পারবে কি সামাল দিতে?
তবে হ্যাঁ, মসীবতে অনেক সময় মানুষের জন্য আযাবের লেবাসে রহমত থাকে। দুঃখ-কষ্ট অনেক সময় তুচ্ছ মানুষকে বড় মানুষ ক'রে তোলে।
জ্ঞানিগণ বলেন, 'যে আঘাত তোমাকে শেষ করতে পারে না, সে আঘাত তোমাকে শক্তিশালী করবে।' 'দুঃখের মত এত বড় পরশপাথর আর নেই।' হয়তো বা তোমার দুঃখ সেই জাতীয়। তুমি হয়তো পড়ে থাকা মলিন স্বর্ণ। তাই তোমাকে আগুনে দিয়ে হাতুড়ির আঘাত দ্বারা পিটিয়ে পিটিয়ে নতুন কোন অলঙ্কার প্রস্তুত করা হচ্ছে। হয়তো বা তুমি শোভা পাবে কোন বিলাসিনীর দেহে।
প্রত্যেক মানুষের জীবনে মূলতঃ দুটো দুঃখ থাকে; একটি হল ইচ্ছা অপূর্ণ থাকা। অন্যটি হল ইচ্ছা পূরণ হলে অন্যটির প্রত্যাশা করা। যা আছে, তা নিয়ে সন্তুষ্ট না হওয়ার দুঃখ, অল্পে তুষ্ট না হওয়ার দুঃখ, অনেক বেশি কিছু পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা পূরণ না হওয়ার দুঃখ মানুষকে অতিষ্ঠ ক'রে তোলে।
যত খাই, তত খেতে চায় আরো মন মেটে না মনের আশা, লোভী এ জীবন।
লোভী আদম সন্তানের এ আশা বড় দুর্দমনীয়।
আল্লাহর রসূল বলেছেন, "যদি আদম সন্তানের সোনার একটি উপত্যকা হয়, তবুও সে চাইবে যে, তার কাছে দুটি উপত্যকা হোক। একমাত্র মাটিই তার মুখ পূর্ণ করতে পারবে। আর যে তওবা করে, আল্লাহ তার তওবা গ্রহণ করেন।” (বুখারী-মুসলিম)
যে মানুষ নিরাশাবাদী হয়, তার দুশ্চিন্তা আসে। মরার আগে সে মরতে বসে, আঘাতপ্রাপ্ত হওয়ার আগে সে ব্যথা পায়। তাকে কেবল আজকের কথা ভাবতে বললে বলে, 'আজকের মধ্যে আজ শেষ নয়। কাল বলেও একটা কথা আছে।'
কিন্তু ভাইটি আমার! কোন সেতু না আসা পর্যন্ত সেটা অতিক্রম করার চেষ্টা করো না। নদী আসার আগে কাপড় তুলো না। আগামী কালের দুশ্চিন্তাকে মনে স্থান দিয়ে আজকের খুশীকে নষ্ট ক'রে দিয়ো না। কারণ এমনও হতে পারে যে, কালকের দুশ্চিন্তা দূর হয়ে যাবে অথচ আজকের খুশী থেকেও তুমি বঞ্চিত রয়ে যাবে।
গুলির আওয়াজ শুনতে পাও? ভয় পাওয়ার কোন কারণ নেই। কারণ, যে গুলি তোমাকে হত্যা করবে, তার আওয়াজ তুমি শুনতেই পাবে না।
যা ঘটে, তাতে মানুষ যতটা না আঘাত পায়, তার চেয়ে বেশী আঘাত পায় সেই ঘটনা সম্পর্কে তার সমালোচনা ও অভিমতের ফলে। ঘরে-ঘরে ঝগড়া হলে, পিতা-মাতার সাথে মতোবিরোধ বাধলে, স্বামী-স্ত্রীর মাঝে মনোমালিন্য সৃষ্টি হলে বাইরের লোককে খুব দাপাদাপি করতে দেখা যায়। যখন 'মায়ের পোড়ে না মাসীর পোড়ে, পাড়া-পড়শীর ধবলা ওড়ে', 'যার গরু সে বলে বাঁঝা, পাড়া-পড়শী বলে সাত-বিয়েন', তখন মনে বড় দুঃখ হয়, বড় কষ্ট হয়।
আর এক দুঃখ বিরোধীদেরকে নিয়ে। যে তোমার প্রতি হিংসুটে, পরশ্রীকাতর, বিদ্বেষী বা প্রতিদ্বন্দ্বী, তাদের কথা চিন্তা করলে, তাদের বিরোধিতার কথা মাথায় রাখলে তোমার সুখ হরণ হয়ে যাবে। সুতরাং সে ক্ষেত্রে তুমি জ্ঞানিদের উপদেশ মেনে চল, 'স্বার্থপরেরা যদি তোমার উপর টেক্কা দিতে চায়, তাহলে তা তুচ্ছজ্ঞান ক'রে বাতিল কর। শোধ নেওয়ার দরকার নেই। যখন শোধ নেওয়ার চেষ্টা করবে, তখন জানবে, তার ক্ষতি করার চাইতে তুমি নিজেরই ক্ষতি ক'রে বসবে।'
সেই গাড়ি চালকের মতো নিজের ক্ষতি করবে, যাকে পিছন অথবা পাশ থেকে অন্য এক গাড়ি টেক্কা দিতে চেয়েছিল। অতঃপর তাকে জিততে দেবে না সংকল্প ক'রে তার প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুরু করল। পরিশেষে এক সময় দুর্ঘটনাগ্রস্ত হল তার গাড়ি।
তুমি যদি কাউকে টেক্কা দিয়ে কারো উপকার করতে যাও অথবা উপহার দিতে যাও, তবুও পারবে না। ক্ষতিগ্রস্ত হবে অথবা বিষাদগ্রস্ত হবে। তুমি অন্যান্যের তুলনায় কম দিলে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় হেরে যাবে ঠিকই কিন্তু বেশি দিলে বলবে, 'দানের জিনিস দিয়েছে, যাকাত থেকে দিয়েছে' ইত্যাদি। হীন মনের মানুষদের সাথে টেক্কায় তুমি পেরে উঠবে না।
সুতরাং উচিত হল, যে ব্যক্তি তোমার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চায়, যে ব্যক্তি তোমাকে গুরুত্ব না দিয়ে ঘোড়া ডিঙিয়ে ঘাস খেতে চায়, তাকে উপেক্ষা করে চল। নচেৎ দুঃখ পাবে। একজন বিদ্যান বলেছেন, 'যাদেরকে পছন্দ করি না, তাদেরকে নিয়ে এক মিনিটও ভেবে আমি সময় নষ্ট করি না।'
অনেক মানুষ হয় হিংসুটে, ঈর্ষাবান। ফলে তারা মনে মনে জ্বলে-পুড়ে ছারখার হয়। পরশ্রীকাতরতার যন্ত্রণায় নিজেকে অসুখী ক'রে রাখে। পরের সুখের মতো সুখ পেতে চায়, পরের প্রতিভার মতো নিজের প্রতিভা দাবী করে, রূপে ও গুণে অন্যের মতো হতে চাওয়া কি সহজ ব্যাপার?
জ্ঞানিগণ বলেন, 'যারা অন্যের মত হওয়ার চেষ্টা করে, তাদের মত হতভাগ্য আর কেউ নেই। যদি সে নিজে শারীরিক ও মানসিক দিক দিয়ে অন্যরকম কিছু হয়।'
সুতরাং সুখী হতে হলে নিজের স্বতন্ত্রতা ও স্বকীয়তা বজায় রেখে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। নচেৎ পরের অনুকরণ ও নকল করতে গিয়ে নিজেকে মনঃকষ্টের আগুনে পড়ে থাকতে হবে।
অনুরূপ অহংকারীরাও সুখী হয় না। যে নিজেকে বড় মনে করে, অথচ পরে তাকে ছোটই ভাবে, সে তখন মনে মনে অস্বস্তি ও কষ্টবোধ করে। মানুষকে তুচ্ছজ্ঞান করলে মানুষও তাকে তুচ্ছজ্ঞান করে, ফলে তার মনে সুখের বাসা বাঁধে না। 'গাঁ মানে না আপনি মোড়ল' হলে মনে সুখ থাকে না। যে রাজা ভক্তির বলে প্রজাদের মন জয় না ক'রে শক্তির বলে তাদের ভূমি জয় ক'রে রাজত্ব করে, সে রাজা আর যা পাক, রাজসুখ পায় না। প্রত্যেক সংসারের সুখ অনুরূপই।
তাছাড়া ধন থাকলেই মনে সুখ পাওয়া যায় না। বরং ধন থাকলে উৎকণ্ঠা ও দুশ্চিন্তা বাড়ে। তাছাড়া ধন অনেক ধনীকে উচ্ছৃঙ্খলতায় উদ্বুদ্ধ করে। আর তাতে তাদের বাহ্যিক সুখ অনেক দুঃখ বয়ে আনে। আফলাতুন হাকীম বলেছেন, 'ধনীরা সাধারণতঃ ভালো লোক হয় না, আর তার জন্যই তারা সুখী নয়।'
অধিকাংশ মানুষের দুঃখ ও মনঃকষ্ট সেই জিনিস প্রকাশ করার চেষ্টারই ফল, যা তাদের নেই। অথচ তারা এ কথাও জানে না যে, মিথ্যা ঠাটবাট সত্বর বিলীয়মান। তাছাড়া মিথ্যা ঠাটবাট বজায় রাখতে যেমন বেগ পেতে হয়, তেমনি তা প্রকাশ পেলে মানুষের কাছে লাঞ্ছিত হতে হয়। মিথ্যা বংশগৌরব, আভিজাত্য-গর্ব বা পদমর্যাদার সাময়িক অহংকার মানুষকে সর্বদা মনঃকষ্টে জর্জরিত রাখে।
দুঃখী ভাই ও বোনটি আমার! তুমি নিজ মন থেকে দুঃখকে দূরীভূত করবে কীভাবে? বাঁচতে তো হবেই। জীবনে দুঃখ এসেছে বলে জীবনকে থামিয়ে দেওয়া যায় না। সমুদ্রে ঢেউ উঠেছে দেখে ডোবার আগেই লা ডুবিয়ে দেওয়া যায় না। সুতরাং বাঁচার তাকীদে প্রয়াস চালাতে হবে। দুঃখ-দুর্দশা মুছে ফেলার চেষ্টা করতে হবে।
দুঃখময় বন্ধু আমার! 'মনের চিন্তাকে রোখার ক্ষমতা নেই, মুখ চুপ থাকতে পারে না এবং অঙ্গ-প্রত্যঙ্গও সঞ্চালন বিনা স্থির থাকতে পারে না। এ সবগুলিকে তুমি যদি মহান কাজে লাগাতে না পার, তাহলে অবশ্যই ছোট কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়বে। যদি সেগুলিকে ভালো কাজে ব্যবহার না করতে পারো, তাহলে অবশ্যই খারাপ কাজে লিপ্ত হয়ে পড়বে। সুতরাং তোমার সকল চিন্তা ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে উঁচু আকাশে উড়তে শিখাও, নীচের আকাশে উড়তে অপছন্দ করবে। এ সবকে উচ্চতায় অভ্যস্ত কর, হীনতা অপছন্দ করবে।'
অবশ্য ভাবনার সময় থাকলে, তুমি ভাবতেই পার। কিন্তু কোন কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকলে ভাবনা ভুলতে পার। নচেৎ, দুশ্চিন্তা হল বেকারত্বের বন্ধু। কর্ম ও জ্ঞান-চর্চাকারী মানুষের কোন দুশ্চিন্তা হয় না, মানসিক রোগ হয় না। কারণ তাদের কোন অবসরই নেই। জ্ঞান-গবেষকরা বলেন, 'গবেষণাগার আর পাঠাগারেই শান্তি থাকে।'
'দুঃখী হয়ে ওঠার রহস্য হল, আপনি সুখী না দুঃখী ভাবতে পারার মত সময় থাকা।'
নিজের অসুখী জীবনের দিকে সর্বদা নজর দিলে মোটেও কেউ সুখী হতে পারে না। বিগত জীবনের দুঃখ ও স্মৃতিকে নিয়ে মন খারাপ রাখলে, সুখী জীবনও তিক্তময় হয়ে ওঠে। 'আল্লাহর রাজত্বে একটা মাত্র পথেই গঠনমূলকভাবে অতীতকে গ্রহণ করা যেতে পারে। আর তা হল অতীতের ভুলকে শান্তভাবে বিশ্লেষণ ক'রে তা থেকে উপকার লাভ করা। নচেৎ সঙ্গে সঙ্গেই অতীতকে ভুলে যাওয়া প্রয়োজন।'
বল তো বন্ধু! করাত দিয়ে কাঠের গুঁড়া কাটলে কী লাভ? অতীত নিয়ে দুশ্চিন্তা করা করাত দিয়ে কাঠের গুঁড়া কাটার মতোই। জীবন যে গতিতে চলছে, তাকে তুমি ফিরাতে পারবে না। পারবে না অবশ্যম্ভাবী প্রতিহত করতে চিন্তার মাধ্যমে। বার্ধক্যকে আটকে দিতে পার না। পার না নিজের যৌবন ফিরিয়ে আনতে। 'জীবন-প্রবাহ বহে কাল-সিন্ধু পানে ধায়, ফিরাব কেমনে?' লাভ কী সে কেমনত্বের কথা ভেবে? অবশ্য যতদিন জীবন থাকে, ততদিন ভালোরূপে রাখার চেষ্টা করতে হবে। আর সেই চেষ্টার একটি হল এই যে, তুমি দুশ্চিন্তা করবে না।
জ্ঞানিগণ বলেন, 'চেষ্টা করো দুধ যাতে না পড়ে যায়। তবে পড়ে গেলে তা নিয়ে যেন অনুশোচনা করো না।'
'বুদ্ধিমান মানুষরা কখনো তাঁদের ক্ষতি নিয়ে ভাবতে চান না; বরং খুশী মনে সেই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে চেষ্টা করেন।'
সুতরাং জীবনের কোন নিঝুম রাতে দুরন্ত দুষ্টু শিশুর মতো দুশ্চিন্তা ঘুমিয়ে গেলে তাকে জাগিয়ে দিয়ো না। তাকে আরামের সাথে ঘুমাতে দাও। তুমিও আরাম পাবে।
নচেৎ, 'যে ব্যক্তি অতীতের দুশ্চিন্তার কারাগারে নিজেকে বন্দী রাখে, সে ব্যক্তির ভবিষ্যৎও গড়ে ওঠে না।' তবে এ কথাও সত্য যে, 'এমন অনেক দুঃখ আছে, যাকে ভুলার মত দুঃখ আর নেই।'
অনুরূপ যে বিপদ আসার আশঙ্কা আছে, তা আসার পূর্বেই তুমি শঙ্কিত ও আতঙ্কিত হয়ো না। কারণ, মসীবতের আশঙ্কাটাই মসীবত এসে পড়ার চেয়ে অধিক ভয়ঙ্কর।
'মানুষ স্বপ্নে সুখ দেখলে সকালে তা দেখা যায় না, কিন্তু দুঃখ দেখলে তা সকাল হওয়ার আগেই মনের ভিতরে প্রকাশ পায়।' এটাই মানুষের প্রকৃতি। কিন্তু তা হলে অবাস্তব দুঃখ দেখে নিজের সুখকে নষ্ট করা হবে। সুতরাং মনোরোগী হয়ে মনের সুখকে বরবাদ করো না। যেহেতু 'ব্যাধির চেয়ে আধিই (মানসিক পীড়া) হল বড়।' দেহের আঘাতের চেয়ে মনের আঘাতের বেদনা অনেক বেশী।
দুঃখ ও দুশ্চিন্তা তোমার বাকী সব কিছু কেড়ে নিতে পারে। দুশ্চিন্তা মানুষের মনোযোগ দেবার ক্ষমতা নষ্ট ক'রে দেয়। কিন্তু বাস্তব এই যে, যে যত বেশী জ্ঞানী হয়, তার দুঃখও তত বৃদ্ধি পায়। জীবনে কষ্ট না পেলে, জ্ঞানের পরিধি বিস্তার লাভ করে না। জীবনে যাঁরা বিজ্ঞ হয়েছেন, তাঁদের জীবনে দুঃখ-কষ্ট বেশী ছিল।' মনীষী ও বিজ্ঞজন তথা বিখ্যাত কৃতি মানুষদের জীবনী পড়লে তা সহজে বুঝতে পারবে। বুঝতে পারবে যে, 'যাঁরা জীবনে বাধা পেয়েছেন, তাঁরা ততই উদ্বুদ্ধ হয়েছেন, সে বাধা কাটিয়ে জীবনে উন্নতি করতে।'
অধিকাংশ কবি, কবি হয়েছেন মনের আঘাত খেয়ে। যে কখনো মনে আঘাত খায়নি, সে কখনো ছন্দ ও সুর খুঁজে পায় না। 'শান্ত সমুদ্রে কখনো সুদক্ষ নাবিক হওয়া যায় না।'
দুঃখ দেয় মানসিক যাতনা। আর দৈহিক বেদনার চেয়ে আন্তরিক বেদনা অত্যন্ত কঠিন, যার কোন ওষুধ নেই। এই জন্য অভিজ্ঞজনেরা বলেছেন, 'যে ব্যবসায়ীরা জানে না দুশ্চিন্তা কী ক'রে জয় করতে হয়, তাদের অল্প বয়সেই মৃত্যু হয়।'
'আপনি যা খান, তাতে আলসার হয় না, আপনাকে যা কুরে কুরে খায়, তাতেই আলসার হয়।'
'চিকিৎসকরা যে ভুল করেন তা হল, তাঁরা মনের চিকিৎসা না করে শরীর সারাতে চান, যদিও মন আর শরীর অবিচ্ছেদ্য। তাই আলাদা করে চিকিৎসা উচিত নয়।'
সুতরাং জেনে রাখা উচিত যে, 'দেহ থেকে টিউমার বা পুঁজ বের ক'রে দেওয়ার চাইতে বদ-চিন্তা তাড়ানো অনেক বেশী প্রয়োজন।'
দুঃখ-কষ্ট এমন জিনিস, সেটা কষ্ট ক'রে বুকের মধ্যে লুকিয়ে রাখা গেলেও, চোখের মধ্যে লুকিয়ে রাখা যায় না। পরিবেশের মানুষ---বিশেষ ক'রে কাছের মানুষ তা বুঝতে পারে। অতঃপর তারা সান্ত্বনা দিলে দুঃখ কমে যায়, আর কাটা ঘায়ে নুনের ছিটান দিলে তা আরো বেড়ে যায়। পরন্ত সুখ ভাগ করলে বেড়ে যায়, কিন্তু দুঃখ ভাগ করলে কমে যায়। কিন্তু মানুষের এমন অনেক দুঃখ আছে, যা কেউ কাছে এসে মিটিয়ে দিতে চাইলেও তা পারে না। অনেক কাছে থেকেও অনেকে একান্ত আপন হতে পারে না।
তবে অপরের দেখে সান্ত্বনা নাও। যা নেই, তার মোকাবেলায় যা আছে, তা স্মরণ করিয়ে মনকে প্রবোধ দান কর। তুমি গরীব হলেও দুঃখ গরীবদের একা নয়। বড় লোকদেরও অনেক দুঃখ থাকতে পারে।

📘 জীবন দর্পণ > 📄 দুঃখী জীবনে ধৈর্যের গুরুত্ব

📄 দুঃখী জীবনে ধৈর্যের গুরুত্ব


জীবনের সৃষ্টিকর্তা সুখ-দুঃখ সৃজন করেছেন। আর তিনিই দিয়েছেন ধৈর্যের আদেশ। তিনি বলেছেন,
{لَتُبْلَوُنَّ فِي أَمْوَالِكُمْ وَأَنفُسِكُمْ وَلَتَسْمَعُنَّ مِنَ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ مِن قَبْلِكُمْ وَمِنَ الَّذِينَ أَشْرَكُوا أَذَى كَثِيرًا وَإِن تَصْبِرُوا وَتَتَّقُوا فَإِنَّ ذَلِكَ مِنْ عَزْمِ الْأُمُورِ} (١٨٦) سورة آل عمران
অর্থাৎ, (হে বিশ্বাসিগণ!) নিশ্চয় তোমাদের ধনৈশ্বর্য ও জীবন সম্বন্ধে পরীক্ষা করা হবে। আর তোমাদের পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেওয়া হয়েছিল তাদের এবং অংশীবাদী (মুশরিক)দের কাছ থেকে অবশ্যই তোমরা অনেক কষ্টদায়ক কথা শুনতে পাবে। সুতরাং যদি তোমরা ধৈর্য ধারণ কর এবং সংযমী হও, তাহলে তা হবে দৃঢ়সংকল্পের কাজ। (আলে ইমরানঃ ১৮৬) {يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اصْبِرُوا وَصَابِرُوا وَرَابِطُوا وَاتَّقُوا اللَّهَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ}
অর্থাৎ, হে বিশ্বাসিগণ! তোমরা ধৈর্য ধারণ কর। ধৈর্য ধারণে প্রতিযোগিতা কর এবং (শত্রুর বিপক্ষে) সদা প্রস্তুত থাক; আর আল্লাহকে ভয় কর, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার। (আলে ইমরান: ২০০)
ধৈর্য সাধারণতঃ দুই প্রকার : বাঞ্ছিত জিনিস না পাওয়ার বা হাতছাড়া হওয়ার অনুতাপে ধৈর্য এবং অবাঞ্ছিত জিনিস গ্রহণ করতে বাধ্য হওয়ার অনুতাপে ধৈর্য।
আল্লাহর লিখিত ভাগ্য মেনে নিতে ধৈর্য, তাঁর আদেশ পালনে ধৈর্য এবং তাঁর নিষেধ পালনে ধৈর্য ধরতে হয় মানুষকে। যেহেতু ধৈর্যের তরবারি দ্বারা কেটে ফেলা ছাড়া দুঃখের আর কোন ওষুধ নেই। 'ভগ্ন হৃদয়ের সর্বোত্তম চিকিৎসা হল, তা পুনর্বার ভেঙ্গে ফেলা।' 'বিপদের বিশাল প্রতাপ আছে, তুমি তার সম্মুখে বিনয়ীর বেশে বসে যাও।' ধৈর্যশীলতার পরিচয় দিয়ে তাকে বরণ কর। তাহলেই তুমি নিশ্চিহ্ন হবে না।
'দুঃখ সহ্য করার ক্ষমতা যাদের আছে, তাদের কাছে দুঃখ বড় হয়ে দেখা দেয় না।'
'অন্ধ হওয়া দুঃখের নয়, দুঃখের হল তা সহ্য করার ক্ষমতা না থাকা।' 'যে তার পালঙ্গের কষ্ট সহ্য করতে পারে, সে আরামে ঘুমায়।' 'যে মানুষ দিনের পর দিন আঘাত খেয়ে অপমান সহ্য ক'রে নিঃশেষ হয়ে যায়, অসম্ভবকে সম্ভব সেই করতে পারে।'
সহ্য না করলে সফল হওয়া যায় না। ধৈর্য না ধরলে কর্মে সিদ্ধিলাভ হয় না। 'মধু পেতে হলে মৌমাছির হুল খেতে হয়।' 'যারা মধুচোর, তারা মৌমাছিকে বশ করেই মধু আহরণ করে।' অথবা তার বিঁধুনিতে ধৈর্যধারণ করে।
সুতরাং দুঃখে ধৈর্য ধর বন্ধু আমার! ধৈর্য ছাড়া গতি কী বল? দুঃখ একাধিক হলেও ভেঙ্গে পড়ো না। আমরা জানি, 'নতুন শোক একলা আসে না, কত পুরানো শোককে টানিয়া আনে। কিছু না পাওয়াতে দুঃখ আছে; কিছু পাইয়া কিছু হারাইলে মন অসুখী হয়। কিন্তু সব পাইয়া সব হারাইবার যে দুঃখ, তাহা অতি ভীষণ, অতি মর্মান্তিক।' দুঃখ তখন তার দলবল নিয়ে দুর্ধর্ষ ডাকাতদলের মতো দুঃখী মানুষের হৃদয়-দ্বারে আঘাত করে। কত তান্ডব চালায়! নিষ্ঠুর হয়ে তার সব কিছু ছিনিয়ে নিয়ে যায়। আর তখন ধৈর্য ছাড়া উপায় কী বল?
'মায়া-কান্নার তুফান কারাগারের দেওয়াল ভাঙ্গতে পারে না।' তবে তুমি নিরাশ হোয়ো না। ধৈর্য ধারণ কর। ধীর পানিতে পাথর কাটে। তোমার ধৈর্যও বিপদের পাথর ক্ষয় করবে। আর তুমি যদি চিরদুঃখী হও, তাহলে সৎ সাহস রেখে বলবে, 'দুঃখেই যাদের জীবন গড়া তাদের আবার দুঃখ কী রে?'

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00