📘 জীবন দর্পণ > 📄 অল্পে তুষ্টি

📄 অল্পে তুষ্টি


সংসারে সে মানুষ কখনও দুঃখ অনুভব করে না, যে মানুষ তার যা আছে তাই নিয়ে তুষ্ট থাকে এবং অতিরিক্ত কিছু না পেলে আক্ষেপ করে না। এমন মানুষ সবার চাইতে বড় ধনী। যেহেতু ধনী হওয়ার ব্যাপারটা মনের ব্যাপার। মহানবী বলেছেন, "বিষয় সম্পদের আধিক্য ধনবত্তা নয়, প্রকৃত ধনবত্তা হল অন্তরের ধনবত্তা।” (বুখারী ও মুসলিম)
নিজের ভাগ্য ও ভাগ নিয়ে তুষ্ট হলে সুখী হওয়া যায়, সবচেয়ে বড় ধনী হওয়া যায়। এ ব্যাপারে আল্লাহর রসূল বলেছেন,
اتَّقِ الْمَحَارِمَ تَكُنْ أَعْبَدَ النَّاسِ وَارْضَ بِمَا قَسَمَ اللَّهُ لَكَ تَكُنْ أَغْنَى النَّاسِ وَأَحْسِنْ إِلَى جَارِكَ تَكُنْ مُؤْمِنًا وَأَحِبَّ لِلنَّاسِ مَا تُحِبُّ لِنَفْسِكَ تَكُنْ مُسْلِمًا وَلَا تُكْثِرُ الضَّحِكَ (فَإِنَّ كَثْرَةَ الضَّحِكِ تُمِيتُ الْقَلْبَ).
অর্থাৎ, নিষিদ্ধ ও হারাম জিনিস থেকে বেঁচে থাক, তাহলে তুমি মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বড় আ'বেদ (ইবাদতকারী) গণ্য হবে। আল্লাহ যা তোমাকে দিয়েছেন, তাতেই পরিতুষ্ট থাক, তবে তুমিই মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বড় ধনী হবে। প্রতিবেশীর প্রতি অনুগ্রহ কর, তাহলে তুমি একজন (খাঁটি) মু'মিন বিবেচিত হবে। মানুষের জন্যও তা-ই পছন্দ কর, যা তুমি নিজের জন্য পছন্দ কর, তাহলে তুমি একজন (খাঁটি) মুসলিম গণ্য হবে। আর খুব বেশী হাসবে না, কারণ, অধিক হাসি অন্তরকে মেরে দেয়। (আহমাদ, তিরমিযী) ২৩০৫, সঃ জামে ১০০নং) তিনি আরো বলেছেন,
( (قَدْ أَفْلَحَ مَنْ أَسْلَمَ ، وَكَانَ رِزْقُهُ كَفَافاً ، وَقَنَّعَهُ اللَّهُ بِمَا آتَاهُ)). رواه مسلم "সে ব্যক্তি সফলকাম, যে ইসলাম গ্রহণ করেছে, তাকে পরিমিত রুযী দেওয়া হয়েছে এবং আল্লাহ তাকে যা দিয়েছেন তাতে তাকে তুষ্ট করেছেন।” (মুসলিম) তিনি আরো বলেছেন,
( (طُوبَى لِمَنْ هُدِيَ لِلإِسْلَامِ ، وَكَانَ عَيْشُهُ كَفَافاً وَقَنِعَ)). رواه الترمذي "তার জন্য শুভ সংবাদ যাকে ইসলামের পথ দেখানো হয়েছে, পরিমিত জীবিকা দেওয়া হয়েছে এবং সে (যা পেয়েছে তাতে) পরিতুষ্ট আছে।” (তিরমিযী)
একটা জীবনে সব কিছু এক সাথে পাওয়া যায় না। প্রত্যেকের জীবনে কোন না কোন অভাব আছেই আছে। কিন্তু 'আমাদের যা আছে, তার কথা আমরা কদাচিতই ভেবে থাকি, বরং অধিকাংশ সময় চিন্তা করি, যা আমাদের নেই তার কথা।'
সুখ-সন্ধানী বন্ধু আমার! 'তোমার কী নেই, তা নিয়ে দুশ্চিন্তা করো না; বরং তোমার যা আছে, তা নিয়ে চিন্তা কর। হয়তো দেখবে, তোমার যা আছে তা, যা নেই তার তুলনায় অনেক বেশী।' 'জীবনে যা পেয়েছ, তারই হিসাব কর, যা পাওনি তার নয়।'
সেই হিসাবের অঙ্কে দেখবে তোমার কিছু না থাকলে অনেক কিছু আছে। আর তা নিয়ে তুষ্ট হলে, তুমিই সুখী মানুষ। একজন জ্ঞানী বলেন, 'একদিন আমার জুতো ছিল না বলে মন খারাপ ছিল, সে দুঃখ দূর হয়ে গেল রাস্তায় যখন দেখলাম, একজন মানুষের দুটো পা-ই নেই।'
এইভাবে কত কিছু লক্ষ্য করবে কত মানুষের মধ্যে। অতঃপর তুমি অবশ্যই কৃতজ্ঞ হবে মহান প্রভুর। যিনি তোমাকে কিছু থেকে বঞ্চিত রাখলেও বহু কিছু দান করেছেন।
সফলতার ক্ষেত্রেও তাই। তুমি যতটা সফল আছ, ততটা অনেকে নেই। সুতরাং তাদের বিফলতা দেখে তুমি সান্ত্বনা নিতে পার। জ্ঞানিগণ বলেন, 'সাফল্য এবং সুখ পরস্পরের হাত ধরাধরি করে চলে। আপনি যা চেয়েছেন তা পাওয়াই সাফল্য। আর সুখ হচ্ছে আপনি যা পেয়েছেন তার মধ্যেই পাওয়ার ইচ্ছাকে সীমাবদ্ধ রাখা। শুধু টিকে থাকাই সাফল্য নয়। এটি তার চেয়েও বেশি।'
সুতরাং বন্ধু আমার! 'জীবনে যেটা চেয়েছ, সেটা যদি না পেয়ে থাক, তাহলে যেটা পেয়েছ, সেটাকেই জীবনের চাহিদা বানিয়ে নাও।' তাহলেই তুমি সুখী হবে। তা না হলে আজীবন হা-হুতাশ ক'রে দুঃখের বোঝা বয়ে ফিরবে।
আর দুনিয়ার ব্যাপারে উপরের দিকে তাকাবে না। উপরের দিকে তাকালে তুমি সুখী হতে পারবে না। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, “(দুনিয়ার ধন-দৌলত ইত্যাদির দিক দিয়ে) তোমাদের মধ্যে যে নীচে তোমরা তার দিকে তাকাও এবং যে তোমাদের উপরে তার দিকে তাকায়ো না। যেহেতু সেটাই হবে উৎকৃষ্ট পন্থা যে, তোমাদের প্রতি যে আল্লাহর নিয়ামত রয়েছে তা তুচ্ছ মনে করবে না।” (বুখারী ৬৪৯০, মুসলিম ২৯৬৩নং, শব্দগুলি মুসলিমের)
বুখারীর বর্ণনায় আছে, "তোমাদের কেউ যখন এমন ব্যক্তির দিকে তাকায়, যাকে সম্পদে ও দৈহিক গঠনে তার থেকে বেশি শ্রেষ্ঠত্ব দেওয়া হয়েছে, তখন সে যেন এমন ব্যক্তির দিকে তাকায়, যে এ বিষয়ে তার চেয়ে নিম্নস্তরের।"
আমাদের সামনে যা উপস্থিত আছে, তাই নিয়ে সন্তুষ্ট হওয়া উচিত। অনুপস্থিত কিছু কল্পনা ক'রে উপস্থিত যা কিছু তা নিয়ে সুখ উপভোগ বর্জন করা উচিত নয়। 'অস্পষ্টতায় ভরা দূরের কিছুর চেয়ে কাছের স্পষ্ট কিছু দেখাই আমাদের দরকার।' 'আমরা সবাই দিগন্তপারের কোন মায়া গোলাপের স্বপ্নে আচ্ছন্ন। কিন্তু জানালার পাশে যে অসংখ্য গোলাপ ফুটে রয়েছে, তা আমরা দেখি না।' এ জন্যই আমরা সুখলাভে বঞ্চিত হই।
পক্ষান্তরে 'বুদ্ধিমান মানুষের কাছে প্রতিটি দিনই নতুন জীবন।' 'আজকের জীবনই সব কিছু, এতেই রয়েছে জীবনের পরিপূর্ণতা। কারণ গতকাল তো শুধু স্বপ্ন, আর আগামীকাল সে তো কল্পনা। শুধু আজকের মধ্যেই রয়েছে বেঁচে থাকার আনন্দ। আজ ভালো করে বেঁচে থাকলেই গতকালই সুখস্বপ্ন হয়ে ওঠে, আর আগামীকাল হয় আশায় ভরপুর। তাই আজকের দিনকেই সানন্দে গ্রহণ কর।'
অল্পে তুষ্ট হও, জীবন তোমার সুখের হবে। কিন্তু 'যাকে অল্প তুষ্ট করতে পারে না, তাকে অধিকও সন্তুষ্ট করতে পারবে না।'
'অল্পে তুষ্ট হৃদয় দরিয়া থেকেও বিশাল, ধনীর থেকেও বড় ধনী।'
'অল্প তুষ্ট হওয়া আমানতের দলীল, আমানত রক্ষা করা শুকরিয়ার দলীল, শুকরিয়া আদায় আধিক্যের দলীল, আধিক্য সম্পদ চিরস্থায়ী হওয়ার দলীল, আর লজ্জাশীলতা সর্বপ্রকার মঙ্গলের দলীল।'

📘 জীবন দর্পণ > 📄 ন্যায়পরায়ণতা

📄 ন্যায়পরায়ণতা


জীবনে মানুষের জন্য ন্যায়পরায়ণতা বড় জরুরী জিনিস। ন্যায়পরায়ণতায় কায়েম থাকে সংসার, সংসারের প্রেম-প্রীতির বন্ধন। ন্যায়পরায়ণতায় বজায় রাখে ছোট-বড় ও রাজা-প্রজার সুসম্পর্ক।
একদা শাহ সেকেন্দার আরাস্তুকে জিজ্ঞাসা করলেন, 'বাদশার জন্য কোন্ গুণটি অধিক ভালো, বীরত্ব অথবা ন্যায়পরায়ণতা?' উত্তরে তিনি বললেন, 'বাদশা ন্যায়পরায়ণ হলে তাঁর বীরত্বের প্রয়োজন নেই।'
ইবনে তাইমিয়া বলেছেন, 'কথিত আছে যে, রাজ্যে ন্যায়পরায়ণতা থাকলে আল্লাহ সেই রাজ্যকে টিকিয়ে রাখেন; যদিও তা কাফের রাজ্য হয়। পক্ষান্তরে রাজ্যে যুলম থাকলে আল্লাহ সে রাজ্যকে ধ্বংস করেন; যদিও তা মুসলিম রাজ্য হয়।' (মাঃ ফাতাওয়া ২৮/৬৩)
ন্যায়পরায়ণতায় মনে শান্তি ও দেহে নিরাপত্তা লাভ হয়। হযরত উমারের নিকট কাইসার এক দূত পাঠাল। উদ্দেশ্য ছিল, তাঁর অবস্থা, কর্ম ও রাজ্য- পরিস্থিতি পরিদর্শন করা। দূত মদীনায় প্রবেশ করে তাঁর সম্বন্ধে জিজ্ঞাসাবাদ করল, 'তোমাদের রাজা কোথায়?' লোকেরা বলল, 'আমাদের কোন রাজা নেই। অবশ্য আমাদের আমীর (নেতা) আছেন। আর তিনি এখন মদীনার উপকণ্ঠে বের হয়ে গেছেন।' দূত তাঁর খোঁজে বের হয়ে গেল। কিছু পরে তাঁকে দেখতে পেল, তিনি বালির উপর দুরাকে বালিশ বানিয়ে শুয়ে ঘুমিয়ে আছেন! তাঁর অবস্থা দর্শন করে দূতের হৃদয় নম্র হল ও মনে মনে বলল, 'এমন এক মানুষ, যাঁর আতঙ্কে সমস্ত রাজাদের কোন সিদ্ধান্ত স্থির হয় না, তাঁর অবস্থা এই? আসলে হে উমার! আপনি ন্যায় প্রতিষ্ঠা করেছেন, তাই এইভাবে ঘুমাতে পেরেছেন। আর আমাদের রাজা অন্যায় করে, যার ফলে সে সর্বদা ভীত-সন্ত্রস্ত থেকে অনিদ্রায় কাল কাটায়।'
আসলে 'যে রাজ্যের প্রাচীর ন্যায়পরায়ণতা, সে রাজ্যের নিরাপত্তার জন্য অন্য কোন লৌহ-প্রাচীরের দরকার হয় না।'
'যে রাজ্যে রাজা ও প্রজার মাঝে সখ্যতা আছে, সেটাই স্বর্গরাজ্য।' সংসার-রাজ্যও অনুরূপ।
তবে এমন কোন রাজ্য নেই, যেখানে রাজার কোন বিরোধী লোক নেই। ইবনুল অদী বলেন, 'মানুষ পর্বতচূড়ায় একাকী বাস করলেও তার বিরোধী লোক থাকবেই। আর যে বিচারক হবে তার অর্ধেক মানুষ হবে শত্রু; যদিও সে ইনসাফ করে।'
তাই যৎপরনাস্তি ন্যায়পরায়ণ হওয়া সত্ত্বেও খলীফা উমার-কে শহীদ করা হয়েছিল।
অনুরূপ যে ব্যক্তি হক কথা বলে, সৎ কাজের আদেশ দেয় ও মন্দ কাজে বাধা দান করে, সে ব্যক্তিও সমাজের লোকেদের চোখের বালি। লোকেরা ইনসাফ করে না তার প্রতি। 'হক' গ্রহণ করে না, হকপন্থীর কদর করে না। যেহেতু তারা তার বিপরীত।
অথচ উচিত ছিল, 'দাঁড়িপাল্লা সোনার হোক চাহে সীসার, ওজনে কোন প্রকার পার্থক্য নির্দেশ করবে না।' জাতিগত, বংশগত, দেশগত, ভাষাগত, দলগত বা মযহাবগত কোন প্রকার মতবিরোধ, বিদ্বেষ ও শত্রুতা হক গ্রহণে ও ন্যায় প্রতিষ্ঠায় বাধাদান করবে না। মহান আল্লাহ বলেন, {يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُونُوا قَوَّامِينَ لِلَّهِ شُهَدَاء بِالْقِسْطِ وَلَا يَجْرِمَنَّكُمْ شَنَآنُ قَوْمٍ عَلَى أَلا تَعْدِلُوا اعْدِلُوا هُوَ أَقْرَبُ لِلتَّقْوَى وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ خَبِيرٌ بِمَا تَعْمَلُونَ} অর্থাৎ, হে বিশ্বাসিগণ! তোমরা আল্লাহর উদ্দেশ্যে (হকের উপর) দৃঢ় প্রতিষ্ঠিত (এবং) ন্যায়পরায়ণতার সাথে সাক্ষ্যদাতা হও। কোন সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ তোমাদেরকে যেন কখনও সুবিচার না করাতে প্ররোচিত না করে। সুবিচার কর, এটা আত্মসংযমের নিকটতর এবং আল্লাহকে ভয় কর। তোমরা যা কর, আল্লাহ তার খবর রাখেন। (মায়িদাহঃ ৮)
জা'ফর সাদেক বলেন, 'মুমিন হল সেই ব্যক্তি, যে ক্রোধান্বিত হলে তার ক্রোধের তরঙ্গ তাকে হকচ্যুত করে না, আনন্দিত হলে তার আনন্দের উচ্ছ্বাস তাকে বাতিলগ্রস্ত করে না এবং শক্তিশালী হলেও তার অধিকারের বেশী কিছু অন্যের কাছ থেকে আদায় করে না।'
সুতরাং বন্ধু আমার! ইনসাফ কর স্ত্রীর সাথে, বন্ধুর সাথে। সকল ভুল ক্ষমা-সুন্দর দৃষ্টিতে দেখো। 'ফুল দেখিবার যোগ্য চক্ষু যাহার আছে, সে যেন কাঁটাও দেখে।'
সংসারে ন্যায়পরায়ণতা বজায় রাখা সুকঠিন। তার আগে ন্যায়-অন্যায় পার্থক্য করাটাও কম কঠিন নয়। পিতামাতার কাছে সব সন্তানই সমান। তাদের কাছে তাদের সম্পদে সকলের সমান অধিকার আছে। কিন্তু মহান আল্লাহ কন্যাকে পুত্রের অর্ধেক অংশ দান করেছেন, সুতরাং তাঁর বিরুদ্ধে গিয়ে পুত্র-কন্যার মাঝে ইনসাফ ও সাম্য প্রতিষ্ঠা করা ন্যায়পরায়ণতা নয়। সমান ভাগ ক'রে দেওয়াটাও ন্যায় পরায়ণতা নয়। বরং প্রত্যেককে তার ন্যায্য অধিকার পাইয়ে দেওয়াটাই হল ন্যায়পরায়ণতা।
কন্যাকে পুত্রের সমান ভাগ দেওয়া যেমন ন্যায়পরায়ণতা নয়, তেমনি এক সন্তানের ভাগ নিয়ে অন্য সন্তানকে দেওয়াও ন্যায়পরায়ণতা নয়। উপার্জনশীল ও অকর্মণ্য সমান হতে পারে না। উভয়ে পিতামাতার সম্পদে সমানাধিকার পেতে পারে। কিন্তু অকর্মণ্য উপার্জনশীলের সম্পদে ভাগ বসাতে পারে না। অবশ্য তাকে সহযোগিতা করার কথা স্বতন্ত্র। কেউ স্বেচ্ছায় দিলে সে কথা আলাদা।
অত্যাচার করলে দোষ হয় না, আর প্রতিবাদ করলে দোষ হয়? কেউ চুরি করলে দোষ হয় না, তাকে 'চোর' বললে দোষ হয়। কেউ ব্যভিচার করলে দোষ হয় না। তাকে 'ব্যভিচারী' বললে দোষ হয়ে যায়! হাগুন্তির দোষ নয়, দেখুন্তির দোষ! দুনিয়ার এ রীতি বড় চিরন্তন।
তবুও পরিশেষে অত্যাচারী মানুষ সবশেষে একা হয়ে যায়। চোরকে কেউ ভালোবাসে না। ব্যভিচারীকে কেউ শ্রদ্ধা করে না। পাপীকে কেউ আপন করতে চায় না। সমাজের যেমন এক দিকে ইনসাফ নেই, তেমনি অন্য দিকে ইনসাফের অভাব নেই। প্রকৃতপক্ষে ইনসাফ ও ন্যায়পরায়ণতা থাকে কেবল মু'মিন সমাজে।
সমাজে হাজার অন্ধকার থাকলেও সত্য ও সততার একটা নিজস্ব আলো আছে, যা অন্ধকারেও জ্বলতে থাকে। তেমনি হক ও বাতিলের মাঝে কোন সাদৃশ্য নেই, কোন সামঞ্জস্য নেই। অবশ্য যে উভয়ের মাঝে পার্থক্য বুঝে না, তার কাছে তালগোল খেয়ে যায়। তেল-পানির মতো মিশে থাকলেও সমাজে এমন বহু মানুষ আছেন, যাঁরা হক-বাতিলের মাঝে পৃথককরণ করতে না পারলেও পার্থক্য ক'রে নিতে পারেন।
তাঁরা জানেন, সত্য তিক্ত। তবুও তা ভালোবাসেন। আর যারা সত্যকে ভালোবাসে তারাই মুক্তি পায়।
তাঁরা সদা সত্য ও হক কথা বলেন। যদিও হক কথা মৌমাছির মত; তার পেটে থাকে মধু আর লেজে থাকে হুল।
'সত্য রূঢ় হলেও তা প্রিয়; সত্য তার প্রেমিককে মুক্ত করে।' 'সত্য চিরকালই কঠোর, রূঢ় এবং তিক্ত; কিন্তু শাশ্বত ও চিরন্তন।' তাই নানা বাধা-বিপত্তির মাঝেও হকপন্থীরা বলেন,
'মনেরে আজি কহ যে, ভাল-মন্দ যাহাই আসুক, সত্যরে লহ সহজে।'
বাতিলের দাপট যতই হোক, সব আওয়াজের উপর হকের আওয়াজই উঁচু।
সত্য কোনদিন ধামাচাপা দিয়ে রাখা যায় না। আজ হোক, কাল হোক, সত্য একদিন উদ্‌ঘাটিত হবেই।
'হকপন্থী হলে, হক প্রকাশের জন্য শব্দ উঁচু করার প্রয়োজন নেই। হক আত্মপ্রকাশের ক্ষমতা রাখে।'
'সূর্যের যেমন তাপ আছে, তেমনি সৎ লোকের মধ্যে নির্ভীক দীপ্তি আছে।' হক চির-সুন্দর। আর 'সৌন্দর্য যতই লুক্কায়িত থাকুক না কেন, একদিন তা অন্যের দৃষ্টি আকর্ষণ করবেই।'
'একটি গোলাপ-ফুল, তার রঙ যাই হোক না কেন, তার সৌন্দর্য বড় রোমাঞ্চকর।' তার নাম বিকৃত বা পরিবর্তিত ক'রে যে নামেই ডাকা হোক না কেন, তার সৌন্দর্য ও সৌরভ মানুষকে আকর্ষণ করবে। সুন্দরীকে 'নেড়ি' নামে ডাকলে কি তার সৌন্দর্য মান হয়ে যায়?
'নেড়ি তোর নেড়ি নামে কী-বা পরিতাপ, গোলাপে যে নামে ডাকে তবু সে গোলাপ।'
ইমাম মালেক বলেন, 'যখনই হকের উপর বাতিল জয়লাভ করবে, তখনই পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি হবে।'
সুন্দরের কাছে অসুন্দর, আলোর কাছে অন্ধকার কোনদিন জয়লাভ করতে পারে না। 'সততার নিকট দুর্নীতি কোনদিন জয়ী হতে পারে না।' 'অশুভ শক্তির সাময়িক জয় নজরে এলেও শেষ জয় হয় শুভ শক্তিরই।'
সুতরাং জীবন-যুদ্ধে বিজয়লোভী বন্ধু আমার! 'হক'কে চিনতে শিখো এবং হকপন্থীদের দলে শামিল হয়ে যাও, তবেই তুমি পথপ্রাপ্ত হবে, তবেই তুমি বুদ্ধিমান ও জ্ঞানী প্রমাণিত হবে। আর তোমার জন্যই রয়েছে শুভ- সংবাদ। মহান আল্লাহ বলেছেন,
{وَالَّذِينَ اجْتَنَّبُوا الطَّاغُوتَ أَن يَعْبُدُوهَا وَأَنَابُوا إِلَى اللَّهِ لَهُمُ الْبُشْرَى فَبَشِّرْ عِبَادِ (۱۷) الَّذِينَ يَسْتَمِعُونَ الْقَوْلَ فَيَتَّبِعُونَ أَحْسَنَهُ أُوْلَئِكَ الَّذِينَ هَدَاهُمُ اللَّهُ وَأُوْلَئِكَ هُمْ أُولُوا الْأَلْبَابِ} (۱۸) سورة الزمر
অর্থাৎ, যারা তাগুতের পূজা হতে দূরে থাকে এবং আল্লাহর অনুরাগী হয়, তাদের জন্য আছে সুসংবাদ। অতএব সুসংবাদ দাও আমার দাসদেরকে--- যারা মনোযোগ সহকারে কথা শোনে এবং যা উত্তম তার অনুসরণ করে। ওরাই তারা, যাদেরকে আল্লাহ সৎপথে পরিচালিত করেন এবং ওরাই বুদ্ধিমান। (যুমার: ১৮)
তবে হ্যাঁ, কোন ব্যক্তি দেখে 'হক' চেনার চেষ্টা করো না, 'হক' পাবে না। বরং আগে 'হক'কে চিনতে শিখো, হকপন্থী ব্যক্তি বা দল চিনতে সহজ হয়ে যাবে।
আর মনে রেখো যে, 'সত্যের জন্য সব কিছুকে ত্যাগ করা যায়, কিন্তু কোন কিছুর জন্য সত্যকে ত্যাগ করা যায় না।' 'ন্যায়ের জন্য যারা যুদ্ধ করে, তারা অন্যায়কে সাহায্য করে না।'
জীবনের উত্থান-পতনে যে থাকে পাহাড়ের মতো অটল, সেই আবার কোন স্বার্থে পালকের মতো হাল্কা হয়ে যায়। কিন্তু পৃথিবী বদলে যাক, নদী-সাগর মরুভূমি হোক, মরুভূমি সাগরে পরিণত হোক, তবুও সত্যের ধারক ও বাহক থাকে অটল ও নিশ্চল।
'মরে না মরে না কভু সত্য যাহা শত শতাব্দীর বিস্মৃতির তলে, নাহি মরে উপেক্ষায়, অপমানে হয় না চঞ্চল আঘাতে না টলে।'
হক হয়তো বলা সহজ, তার উপর আমল সহজ। কিন্তু হক গ্রহণ করা কঠিন। মনের বিরুদ্ধে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা বড় কঠিন হয়ে যায়। পরিবেশ ও চিরাচরিত প্রথার বিরুদ্ধে কোন কথাকে 'হক' বলে মেনে নেওয়া বড় মুশকিল হয়ে দাঁড়ায়। আবুদ দারদা বলেন, 'যে হক বলে ও তার উপর আমল করে, সে তার থেকে উত্তম নয়, যে হক শোনে ও তা গ্রহণ করে।'
হক বলেই হক গ্রহণযোগ্য। হক গ্রহণ করতে না পারলে তুমি একজন অহংকারী। মহানবী ﷺ বলেছেন, "যার অন্তরে অণু পরিমাণ অহঙ্কার থাকবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না।" একটি লোক বলল, 'মানুষ তো ভালবাসে যে, তার পোশাক সুন্দর হোক ও তার জুতো সুন্দর হোক, (তাহলে)?' তিনি বললেন, "আল্লাহ সুন্দর, তিনি সৌন্দর্যকে ভালবাসেন। (সুন্দর পোশাক ও সুন্দর জুতো ব্যবহার অহংকার নয়, বরং) অহংকার হল, সত্য প্রত্যাখ্যান করা এবং মানুষকে তুচ্ছজ্ঞান করা।” (মুসলিম)
মুন্সিফ বন্ধু আমার! হক গ্রহণেও ন্যায়পরায়ণতা বজায় রাখো, তুমি সুপথ পাবে, সফল হবে, দুনিয়াতে ও আখেরাতে। মহান আল্লাহ বলেছেন, {وَأَقْسِطُوا إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُقْسِطِينَ } (৯) سورة الحجرات
অর্থাৎ, তোমরা সুবিচার কর। নিশ্চয়ই আল্লাহ সুবিচারকারীদেরকে ভালবাসেন। (হুজুরাতঃ ৯)
ইনসাফ কর লেনদেন ও আদান-প্রদানে, আচার-ব্যবহার ও আচরণ- বিচরণে। 'তুমি অপরের সেইরূপ উপকারে ব্রতী হও, যেরূপ তুমি অপরের কাছ থেকে পেতে আগ্রহী।' তুমি যেমন অপরের নিকট থেকে ন্যায় পেতে চাও, তেমনি অপরকেও তার ন্যায্য অধিকার প্রদান কর।
জেনে রেখো, কারো ভদ্রতাকে দুর্বলতা মনে করা ন্যায়পরায়ণ মানুষের কাজ নয়।
কারো সামান্য ত্রুটি দেখে তার অন্যান্য বহু গুণগ্রামকে দৃষ্টিচ্যুত করা বিবেকবান মুন্সিফ মানুষের আচরণ নয়।
একটি মানুষ কারো ক্ষতি করলে পৃথিবীর সমস্ত মানুষকে শাস্তি দেওয়া যায় না। একটি মেয়ে কোন পুরুষকে ধোঁকা দিলে পৃথিবীর সমস্ত মেয়েকে ভুল বুঝা ভুল। একটি পুরুষ কোন মেয়েকে প্রবঞ্চিত করলে পৃথিবীর সমস্ত পুরুষকে এক ভাবা ভুল।
এক বেদুঈন কোন এক অপরাধের অভিযোগে কাযীর দরবারে আনীত হল। সেখান থেকে গভর্নরের নিকট তার অপরাধ বিষয়ক এক রিপোর্টবুক পাঠানো হল। লোকটি বিচার-সভায় বলল, 'তোমরা সকলে এসো, আমার আমলনামা পাঠ কর।' গভর্নর বললেন, 'এ কথা তো কিয়ামতে বলা হবে।' লোকটি বলল, 'কিন্তু আল্লাহর কসম! আজকের দিন তো কিয়ামত থেকেও নিকৃষ্টতর।' বললেন, 'কেন?' বলল, কারণ কিয়ামতের দিন আমার পাপ ও পুণ্য উভয়ই পেশ করা হবে। কিন্তু আজ আপনারা তো আমার কেবল পাপ ও অপরাধই পেশ করেছেন এবং আমার পুণ্য ও নেক আমল দৃষ্টিচ্যুত করেছেন!'
মুন্সিফ বন্ধু আমার! জীবন-প্রবাহের বিচ্ছিন্ন কোন একটা ঘটনা দেখে মানব-চরিত্রের ভাল-মন্দ নির্ণয় করা ভুল। কাউকে কাছে থেকে না দেখে, তার সাথে কোন সফর না ক'রে, কোন লেনদেনে জড়িত না হয়ে মসজিদে বসে মাথা হিলাতে দেখে 'ভালো লোক' রূপে বরণ করা মারাত্মক ভুল। তেমনি কোন ভালো লোককে কোন এক খারাপ বিষয়ে যুক্ত দেখে এবং তার কোন ওজর-আপত্তি বিশ্লেষণ না ক'রে তাকে 'মন্দ লোক' বলে আখ্যায়ন করা ন্যায়পরায়ণতা নয়।

📘 জীবন দর্পণ > 📄 ভুল-ভ্রান্তি

📄 ভুল-ভ্রান্তি


মানুষের জীবনে ভুল হয়ে যাওয়া একটি স্বাভাবিক জিনিস। অনেকে 'ইনসান' শব্দের মৌলিক অর্থ 'ভুল' মনে করেন। তাই মানুষ মাত্রেই ভুল আছে। আদি পিতা আদম ভুল করেছেন, তাই তাঁর সন্তানেরাও ভুল ক'রে থাকে।
ভুলমুক্ত মানুষ নেই। সুতরাং ভুল হয়ে যাওয়াটা বিস্ময়ের নয়, বরং ভুল না হওয়াটা বড় বিস্ময়ের।
মানুষ ভুল না করলে আইন-আদালতের প্রয়োজন হতো না। মানুষের ভুল না হলে মহান সৃষ্টিকর্তা তাকে সৃষ্টিই করতেন না। বলা বাহুল্য, কোন না কোন ভুল প্রতিটি রক্ত-মাংসের মানুষই ক'রে থাকে।
পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি ভুল করে না, বস্তুতঃ সে কিছুই করে না। অর্থাৎ কিছু করতে গেলে ভুল হতেই পারে। আর যদি কেউ নির্ভুল থাকতে চায়, তাহলে সে যেন কিছু না করে। কিন্তু সেটা অসম্ভব।
ভুল জেনে করলে অথবা না জেনে করলে ক্ষতি অবশ্যই আছে। না জেনে হাত দিলেও আগুনে হাত পুড়ে। ভুল ক'রে বিষ খেলেও প্রাণনাশ ঘটে। 'জীবনে কিছু কিছু ভুল এমন আছে, যার মাসুল দিতে হয় সারা জীবন।' 'একটা ভুল সিদ্ধান্ত নিতে সময় খুব কম লাগে। কিন্তু তার জন্য ভুগতে হয় সারা জীবন।'
তবে 'একটা ভুলের মাসুল দিতে গিয়ে অন্য একটা ভুল করা জ্ঞানীর কাজ নয়।' আসলে 'যখন মানুষ তার ভুল বুঝতে পারে, তখন তার অর্ধেক মাসূল হয়েই যায়।' সুতরাং সেই ভুল মারাত্মক না হলে ফুল হওয়া উচিত। যার প্রতি ভুল করা হয়, তাকে ক্ষমা করা উচিত।
'ভুল-ভ্রান্তি নিয়েই জীবন। অতএব সেই ভুলকে প্রাধান্য দিয়ে বাকী জীবনে অশান্তি ডেকে আনার কোন যুক্তি নেই।' ভুল বিস্মৃত হয়ে নতুনভাবে সংসার করা প্রত্যেক সংসারীর কর্তব্য। কবি বলেন, 'আছে এমন পূর্বাপর সকল ঘরে কথান্তর, তাতে কি কেউ হয় গো পর? নিত্যি কিত্যি নিত্যি লেঠা গৃহধর্মের ধর্ম সেটা, ভালোমন্দ হয় কথাটা--- তা শুনলে কি চলে ঘর?'
'ভুল করার সময় ভুল বুঝতে না পারাটাই বড় ভুল।' কিন্তু 'মেঘ ভাঙলে রোদ বেরিয়ে আসে, আর ভুল ভাঙলে সত্য।'
অভিজ্ঞজনেরা বলেন, 'ভুল হয়ে গেলে ভুলের মোকাবিলা করার শ্রেষ্ঠ উপায় হল, (ক) দ্রুত ভুল স্বীকার করা। (খ) ভুলের জন্য অনুতপ্ত হওয়া। (গ) ভুল থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা (ঘ) ভুলের পুনরাবৃত্তি না করা (ঙ) ভুলের জন্য কাউকে দোষ না দেওয়া বা অজুহাত সৃষ্টি না করা।'
ভুল করে ভুল স্বীকার না করা দ্বিতীয় ভুল। সবচেয়ে বড় ভুল এই যে, ভুল করেও মনে করা যে, আমি ভুল করিনি। এতে থাকে অহংকার ও ঔদ্ধত্য। এতে মানুষ বেশি ছোট হয়ে যায়। পক্ষান্তরে ভুল স্বীকার ক'রে নিলে সম্মানবর্ধন হয়।
সুতরাং ভুল ক'রে ফেললে তা সংশোধনের জন্য বিলম্ব ও লজ্জাবোধ করা আদৌ উচিত নয়। তা করলে ভুলের মাসূল বৃদ্ধি পেতে থাকে। পরিণাম অপেক্ষাকৃত মন্দ হতে থাকে।
ভুল হয়ে গেলে তার সংশোধনের সাথে সাথে তা হতে শিক্ষা গ্রহণ করা উচিত। ভুলের মাঝে অসাফল্য ও ব্যর্থতা থাকতে পারে। তা বলে তার ফলশ্রুতিতে পিছে হটা উচিত নয়। 'ব্যর্থতা একটু ঘুর-পথ। পথের শেষ নয়। এর ফলে সাফল্যে বিলম্ব ঘটে, কিন্তু পরাজয় ঘটে না। আমাদের ভুলগুলি আমাদের অভিজ্ঞতাকেই সমৃদ্ধ করে।'
'জ্ঞানীরা নিজের ভুল থেকে শিক্ষা গ্রহণ ক'রে থাকেন। বিজ্ঞরা অপরের ভুল থেকেও শিক্ষা নেন। জীবন এত দীর্ঘ নয় যে, কেবলমাত্র নিজের ভুল থেকে শিক্ষা গ্রহণ করলেই চলে, অপরের ভুল থেকেও শিক্ষা নিতে হয়।' 'ভুল হলে আমরা তিনটি জিনিস করতে পারি:- (ক) ভুলগুলিকে অগ্রাহ্য করতে পারি। (খ) ভুল অস্বীকার করতে পারি। (গ) ভুল মেনে নিয়ে তা থেকে শিক্ষা নিতে পারি। তৃতীয় বিকল্পটি অনুসরণ করার জন্য সাহস দরকার। এর মধ্যে ঝুঁকি আছে, কিন্তু এটি সুফলপ্রদও।
যদি আমরা ভুল স্বীকার না করি, তাহলে যে দুর্বলতার জন্য ভুল হয়েছে সেই দুর্বলতাগুলিকেই আমরা সমর্থন করব এবং শেষ পর্যন্ত সেই দুর্বলতাগুলোই বড় হয়ে আমাদের সমস্ত জীবনকে প্রভাবিত করবে। এই দুর্বলতাগুলোকে শুধরাবার আর কোন সুযোগ থাকবে না।' 'ভুল বুঝা বড় সহজ, কিন্তু ভুলটা বয়ে বেড়ানো বড় কঠিন।' সুতরাং ভুলের প্রায়শ্চিত্ত হওয়া উচিত।
ভোলা বন্ধু আমার! 'ভুল করে বসা এক অভিজ্ঞতা, কিন্তু দ্বিতীয়বার করা আহমকী।'

📘 জীবন দর্পণ > 📄 প্রচেষ্টা ও সফলতা

📄 প্রচেষ্টা ও সফলতা


তকদীরে তোমার পরিপূর্ণ বিশ্বাস আছে, তদবীরও পরিপূর্ণরূপে ক'রে যাওয়া চাই। যেহেতু মহান আল্লাহ বলেছেন, {وَأَن لَّيْسَ لِلْإِنسَانِ إِلَّا مَا سَعَى} (৩৯) সূরাহ্ আন্-নাজম অর্থাৎ, আর এই যে, মানুষ তাই পায়, যা সে চেষ্টা করে। (নাজমঃ ৩৯) আখেরাতের সুখের জন্য আমল চাই। দুনিয়ার সুখের জন্যও চেষ্টা ও শ্রম চাই। 'সুখ চাই, সুখ চাই' বললেই চলবে না। সুখ অর্জনের জন্য চেষ্টার প্রয়োজন আছে। বসে থেকে তো সুখলাভ হয় না।
চাষী, ছাত্র, ব্যবসায়ী অথবা চাকরিজীবী প্রত্যেকের সফলতা আছে নিজ নিজ প্রচেষ্টা ও পরিশ্রমে। এমনকি সেই গৃহকত্রী, যে সংসারের হাল ধরে, তারও নিজস্ব প্রচেষ্টা ও পরিশ্রমের ফলে সংসার সুখের হয়। সফলতা এক চলমান গাড়ি, যে তা চালিয়ে নিয়ে যেতে পারে, সে যতদূর ইচ্ছা ততদূর পৌঁছতে পারে। 'সফলতার পথে কোন ট্রাফিক-সিগন্যাল নেই, যা তার গতি নির্দিষ্ট করতে পারে।'
'সফলতা এক বিরামহীন সফরের নাম। সফলতা কোন গন্তব্যস্থল নয়। সফলতা গন্তবে পৌঁছনোর একটি পথ।'
জানই তো, 'সাফল্যের পথ কুসুমাস্তীর্ণ নয়, ব্যর্থতা অতিক্রমের পরই আসে সফলতা।' 'ফুল-বিছানো পথ তোমাকে মর্যাদার উচ্চ শিখরে পৌঁছাতে পারে না।'
'সফলতার পথ মইয়ের মত, যা পকেটে হাত রেখে চড়া যায় না।' 'পিঠ বাঁকানো ছাড়া পাহাড়ে ওঠা সম্ভবই নয়।'
'প্রচেষ্টা ও ধৈর্য সফলতার জনক-জননী।' আর 'যে শুইয়া থাকে, তাহার ভাগ্যও শুইয়া থাকে।'
সুখ সবাই চায়, আরামের জীবন কে না চায়? 'সুন্দর দিন সবার জন্য অপেক্ষা করে। কেউ চেষ্টা করে তা আনে, কেউ আনে না।' সুখের পথে শ্রম না দিলে সুখ কাউকে 'ভালবাসা' দেয় না। অবিরাম পরিশ্রমই পারে সেই 'ভালবাসা'কে জয় করতে। 'জীবন হল সাইকেল চালানোর মত। তুমি যতক্ষণ প্যাডেলে পা রেখে চালাতে থাকবে, ততক্ষণ সাইকেল হতে পড়ে যাবে না। কিন্তু প্যাডেল থামালেই পড়ে যাবে।'
চেষ্টার গতি সীমিত হলেও তা নিরন্তর হওয়া চাই। নচেৎ গতি থামিয়ে দিলে সাফল্যের নাগাল পাওয়া মুশকিল হবে। আব্রাহাম লিঙ্কন বলেন, 'আমি ধীরে চলি ঠিকই; কিন্তু আমি কোনদিন একটি পাও পিছন দিকে ফেলিনি।'
অবশ্য বিশ্রামের প্রয়োজনীয়তার কথা ভিন্ন। যেমন 'পথ চলতে শুধু সামনেই তাকালে হয় না, প্রয়োজনে পিছন ফিরে দেখতেও হয়।'
এ সংসারে যে অকর্মণ্য, সুখের অধিকার তার নেই। যে কর্মঠ, তারই আছে সুখলাভের অধিকার। কর্মকুণ্ঠ বৈকুণ্ঠভোগের উপযুক্ত নয়। 'যে মরিতে জানে, সুখের অধিকার তাহারই। যে জয় করে, ভোগ করিবার অধিকার তাহাকেই সাজে।'
তুমি হয়তো বলবে, 'জীবন তো কয় দিনের মাত্র। তার জন্য এত শ্রম-পরিশ্রমের কী প্রয়োজন?'
আমি বলি, যে ক'দিনই তোমার জীবন, সে ক'দিনই ভালোভাবে থাকতে চেষ্টা কর। মরতে তো একদিন সবাইকেই হবে, তা বলে কি বেঁচে থাকাটা থামিয়ে দেওয়া যাবে? আর তুমি তো এ পৃথিবীতে একা নও, তোমার জীবনের সাথে বাঁধা আছে আরো অনেক জীবন। সুতরাং তাদের জন্যও তোমাকে কাজ ক'রে যেতে হবে।
চাকরি না পেয়ে নিরাশ হয়ে বসে যেয়ো না, কিছু একটা কর। শিক্ষিত হয়ে ছোট কাজ করা দোষের নয়। বরং কর্মহীনতাই বড় দোষের। পছন্দনীয় কাজ পাওয়া ও করাও আবশ্যকীয় নয়। 'জীবনের রহস্য এই নয় যে, তুমি তোমার পছন্দনীয় কাজটি করবে; বরং যে কাজই করবে, তা পছন্দ করবে।'
'আমরা বাতাসের গতিপথ বদলাতে পারি না; কিন্তু আমরা জীবনের পালকে কীভাবে লাগাব---যাতে বাতাসের গতির সুবিধা নিতে পারি, তা নির্ধারণ করতে পারি। আমরা পছন্দমত পারিপার্শ্বিক অবস্থার সৃষ্টি করতে পারি না; কিন্তু আমাদের মনোভাবকে আমাদের পছন্দমত কাজের উপযোগী ক'রে নিতে পারি। আর তখন হতে পারি আমরা বিজয়ী।'
'জীবন কুমোরের কারখানার মত, মাটি থেকে অনেক আকারের হাঁড়ি, কলসী ও পাত্র তৈরী করতে পারা যায়। একইভাবে আমরা যেভাবে চাই, সেভাবেই জীবন গড়ে তুলতে পারি। কিন্তু বিভিন্ন পাত্র তৈরির জন্য ভিন্ন ভিন্ন ধরনের কৌশল প্রয়োজন।'
অনেক কাজ তোমাকে কঠিন লাগতে পারে। কিন্তু যে কাজ তোমাকে করতেই হবে, তা শুরু করার আগে মাথা চুলকিয়ে লাভ নেই। শুরুতে প্রত্যেক কাজই কঠিন লাগে। 'কাজ শুরু করার আগে ভালোভাবে প্রস্তুত হলে দেখা যাবে, কাজ অর্ধেক শেষ হয়ে গেছে।'
সুখ-সন্ধানী বন্ধু আমার! জেনে রেখো যে, 'জীবন হচ্ছে কর্ম এবং কর্ম করতে না চাওয়া মরণ।' 'দুঃখ, ব্যথা, বেদনা থেকে বাঁচতে হলে, কাজের ভিতর দিয়ে বাঁচতে হবে।' দুঃখ ভুলতে হলে জীবনে ব্যস্ততা আনতে হবে। জীবন মানেই সমস্যা। মানুষ সমস্যাকে এড়িয়ে চলতে পারে না। তোমার দ্বারা যদি কোন সমস্যার সমাধান না হয়, তাহলে তুমি নিজেই একটি সমস্যা। এমন পলায়নবাদী মানুষ জীবন থেকে পলায়ন করতে পারে না। পক্ষান্তরে যে আত্মহত্যা ক'রে পলায়ন করতে চাইবে, সে আরো বড় সমস্যার সম্মুখীন হবে। সমস্যার সমাধানের জন্য কৃচ্ছসাধনের প্রয়োজন আছে। প্রত্যেক আয়েশের জন্য আয়াসের দরকার আছে। পরিশ্রম সৌভাগ্যের প্রসূতি।
কম-বেশি মেহনত ছাড়া কি কাজ আছে? দুঃখ ছাড়া কি সুখলাভের উপায় আছে? শরীরকে আরাম দিয়ে কি সাফল্য আছে? 'ডাঙায় বসে কুমীর দর্শন হয়, শিকার হয় না।' ঘুমিয়ে থাকলে সকালের আলো পাওয়া যায় না। সুতরাং তোমার স্বপ্ন বাস্তবায়নের সবচেয়ে সুন্দর উপায় হল, আরামের ঘুম ছেড়ে জেগে ওঠা। 'জীবনটাই কষ্ট দিয়ে ঘেরা। আশা তা চাপা রাখে। আর কর্ম আশা পূরণ করে।'
আর এ কথা বলো না যে, 'ছুঁচের মতো ছোট্ট যন্ত্র দিয়ে দারিদ্রের মতো দৈত্যের সাথে লড়াই করা যায় না।' বড় যন্ত্র না পাওয়া পর্যন্ত তো তোমাকে তাই দিয়ে লড়াই চালিয়ে যেতে হবে। নচেৎ দৈত্য যে তোমাকে ধ্বংস ক'রে ছাড়বে। অতএব শ্রমবিমুখতা ও অলসতা বর্জন কর এবং সুখের জন্য কোন কাজ কর। আর জেনে রাখ, 'পরিশ্রমে ধন আনে পুণ্যে আনে সুখ, আলস্যে দারিদ্র আনে পাপে আনে দুখ।'
তুমি সেই অদম্য মানুষ হবে, যে 'আসুক যত বাধা পথে, হারবে না সে কোন মতে।'
তুমি শ্রমবিমুখ হলেও ভেবে দেখ, আমরা যা কিছু ভোগ করি, তা কারো না কারোর কঠিন পরিশ্রমের ফল।
'অন্নের লাগি মাঠে, লাঙলে মানুষ মাটিতে আঁচড় কাটে। কলমের মুখে আঁচড় কাটিয়া খাতার পাতার তলে মনের ফসল ফলে।'
'কল্লোলমুখর দিন ধায় রাত্রি-পানে, উচ্ছল নির্ঝর চলে সিন্ধুর সন্ধানে। বসন্তে অশান্ত ফুল পেতে চায় ফল, স্তব্ধ পূর্ণতার পানে চলিছে চঞ্চল।'
সবাই ব্যস্ত, সবাই কর্মমুখী। সবাই সফল হওয়ার প্রয়াসে দুর্বার গতিশীল। আর তুমি? কুসুমের মাসেও নির্মুকুল?
কী করবে তুমি? নাই-বা থাকল চাকরি? তোমার অর্থকে কাজে লাগাও। 'সেই সময় কাজের সময়, যখন তুমি বেকার এবং পকেটে প্রয়োজনীয় পয়সা আছে।'
আর পর-ভরসায় ব্যবসায়ী হয়ো না। লোক রাখো, কিন্তু তুমি নিজে স্বনির্ভর হও। যেহেতু 'শিকার শিকারীর চাইতে বেশি জোরে দৌড় দেয়। কারণ শিকারী দৌড়ে খাদ্যের প্রয়োজনে। আর শিকার দৌড়ে প্রাণ বাঁচানোর তাগিদে।'
অপরের নিকটে তোমার পূর্ণ পারিশ্রমিক দাবী করার আগে দেখে নাও, তোমার পরিশ্রম যথার্থ ছিল কি না?
জীবনের প্রতি ক্ষেত্রে কী পেলাম সেটাই বড় প্রশ্ন নয়, বরং কী করেছি সেটাই মুখ্য প্রশ্ন।
কর্মী সে, যে কাজ করে তৃপ্ত হয়। কাজ ক'রে সে কতটুকু লাভবান হল, সেটা তার কাছে বড় নয়।
কাজের লোকের কাছে দিনগুলি ছোট আর রাতগুলি বড় মনে হয়।
তুমি কাজের লোক হও। কোন সময়ই অকেজো হয়ে থেকো না। অবসরপ্রাপ্ত হলেও কাজে ফাঁকি দিয়ো না। যেহেতু তোমার প্রতিপালক বলেন, {فَإِذَا فَرَغْتَ فَانصَبْ} (۷) سورة الشرح
অর্থাৎ, অতএব যখনই অবসর পাও, তখনই সচেষ্ট হও। (আলাম নাগ্রাহঃ ৭)
কাজের লোক হও, পরিশ্রম ও ব্যস্ততার পাথর-গর্ভে তোমার দুঃখকে কবর দিয়ে দাও। বৈধ পথে অর্থোপার্জন কর। পয়সা উড়ে বেড়াচ্ছে ধরে নাও। ওড়ার স্থান চেনো, ধরে নিতে পারবে।
সাঈদ বিন মুসাইয়েব বলেন, 'সেই ব্যক্তির মধ্যে কোন মঙ্গল নেই, যে নিজের মান-সম্ভ্রম বজায় রাখার জন্য এবং আমানত রক্ষা করার জন্য অর্থ উপার্জন করে না।'
একদা হযরত উমার মসজিদে এক ব্যক্তিকে ই'তিকাফে বসে থাকতে দেখে বললেন, 'তোমার খাওয়ার ব্যবস্থা কোথেকে হয়? বলল, 'আমার ভাই তার নিজের জন্য, তার পরিবারের জন্য এবং আমার জন্য রোযগার করে।' উমার বললেন, 'তাহলে তোমার ভাইই তোমার চেয়ে বড় আবেদ।'
মামুন বলেন, 'মানুষ তার জীবনে চার শ্রেণীর একটি হয়ে থাকে। তা না হলে সে পরের মুখাপেক্ষী হয়। আর তা হল, নেতৃত্ব, ব্যবসা, চাষ এবং কারিগরি।
হযরত উমার বলেন, 'কোন কোন লোক দেখে আমি মুগ্ধ হই। কিন্তু যখনই শুনি যে, ওর কোন ব্যবসায় নেই, তখনই সে আমার চোখ থেকে পড়ে যায়।'

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00