📄 তকদীরে ঈমান
কাজ পাওনা তুমি? উপার্জনের পথ বন্ধ তোমার? বড় দুঃখে ও দুশ্চিন্তায় কালাতিপাত করছ তুমি?
যে তকদীরে ঈমান রাখে, তার আবার দুশ্চিন্তা কীসের? যে এ কথা বিশ্বাস করে, 'আল্লাহ বান্দার জন্য যা কিছু করেন, তা তার মঙ্গলের জন্য করেন' তার আবার দুঃখ ও উৎকণ্ঠা কীসের? যে বিশ্বাস করে, 'বিধির কোন লীলা নেই', 'আল্লাহর কোন খেলা নেই', 'ভাগ্যের কোন পরিহাস নেই', তার আবার দুর্ভাবনা কীসের?
জীবনে যা কিছু ঘটে, তা সৃষ্টিকর্তার হুকুমে ঘটে। তা রদ করার ক্ষমতা নেই কারও। তিনি যা ঘটান, তাতে বান্দার মঙ্গল থাকে, যদিও বান্দা সেটাকে নিজের জন্য মন্দ ভেবে থাকে। সুতরাং দুঃখে কোন প্রকার আক্ষেপ ও হা- হুতাশ করা উচিত নয় বান্দার। যেমন উচিত নয়, সুখ পেয়ে আনন্দে গর্ব প্রকাশ করা। মহান আল্লাহ বলেছেন,
مَا أَصَابَ مِنْ مُصِيبَةٍ فِي الأَرْضِ وَلَا فِي أَنْفُسِكُمْ إِلَّا فِي كِتَابٍ مِنْ قَبْلِ أَنْ تَبْرَأَهَا إِنَّ ذَلِكَ عَلَى اللَّهِ يَسِيرٌ (۲۲) لِكَيْلَا تَأْسَوْا عَلَى مَا فَاتَكُمْ وَلَا تَفْرَحُوا بِمَا آتَاكُمْ وَاللَّهُ لَا يُحِبُّ كُلَّ مُخْتَالٍ فَخُور} (۲۳) سورة الحديد
অর্থাৎ, পৃথিবীতে অথবা ব্যক্তিগতভাবে তোমাদের উপর যে বিপর্যয় আসে, আমার তা সংঘটিত করার পূর্বেই তা লিপিবদ্ধ থাকে, নিশ্চয় আল্লাহর পক্ষে তা খুবই সহজ। এটা এ জন্য যে, তোমরা যা হারিয়েছ তাতে যেন তোমরা বিমর্ষ না হও এবং যা তিনি তোমাদেরকে দিয়েছেন তার জন্য আনন্দিত না হও। গর্বিত ও অহংকারীদেরকে আল্লাহ পছন্দ করেন না। (হাদীদঃ ২২-২৩)
বলা বাহুল্য, বিপদে তকদীরে ঈমান রেখে ধৈর্য ধরা এবং মহান আল্লাহর ফায়সালায় সন্তুষ্ট হওয়া উচিত। উদ্ধার চাইলে কেবল তাঁর কাছেই চাওয়া উচিত। আল্লাহর ফায়সালার বিরুদ্ধে কোন সৃষ্টি মানুষের কোন উপকার করতে পারে না।
ইবনে আব্বাস বলেন, আমি একদা (সওয়ারীর উপর) রাসূলুল্লাহ-এর পিছনে (বসে) ছিলাম। তিনি বললেন, "ওহে কিশোর! আমি তোমাকে কয়েকটি (গুরুত্বপূর্ণ) কথা শিক্ষা দেব (তুমি সেগুলো স্মরণ রেখো)। তুমি আল্লাহর (বিধানসমূহের) রক্ষণাবেক্ষণ কর, (তাহলে) আল্লাহও তোমার রক্ষণাবেক্ষণ করবেন। তুমি আল্লাহর (অধিকারসমূহ) স্মরণ রাখো, তাহলে তুমি তাঁকে তোমার সম্মুখে পাবে। যখন তুমি চাইবে, তখন আল্লাহর কাছেই চাও। আর যখন তুমি সাহায্য প্রার্থনা কর, তখন একমাত্র আল্লাহর কাছেই সাহায্য প্রার্থনা কর। আর এ কথা জেনে রাখ যে, যদি সমগ্র উম্মত তোমার উপকার করার জন্য একত্রিত হয়ে যায়, তবে ততটুকুই উপকার করতে পারবে, যতটুকু আল্লাহ তোমার (ভাগ্যে) লিখে রেখেছেন। আর তারা যদি তোমার ক্ষতি করার জন্য একত্রিত হয়ে যায়, তবে ততটুকুই ক্ষতি করতে পারবে যতটুকু আল্লাহ তোমার (ভাগ্যে) লিখে রেখেছেন। কলমসমূহ উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং খাতাসমূহ (ভাগ্যলিপি) শুকিয়ে গেছে।” (তিরমিযী ২৫১৬নং)
তিরমিযী ব্যতীত অন্য এক বর্ণনায় আছে যে, “আল্লাহর (অধিকারসমূহের) খেয়াল রাখ, তাহলে তাঁকে তোমার সম্মুখে পাবে। সুখের সময় আল্লাহকে চেনো, তবে তিনি দুঃখ ও কষ্টের সময় তোমাকে চিনবেন। আর জেনে রাখ যে, তোমার ব্যাপারে যা ভুলে যাওয়া হয়েছে (অর্থাৎ যে সুখ-দুঃখ তোমার ভাগ্যে নেই), তা তোমার নিকট পৌঁছবে না। আর যা তোমার নিকট পৌঁছবে, তাতে ভুল হবে না। আর জেনে রাখ যে, বিজয় বা সাহায্য আছে ধৈর্যের সাথে, মুক্তির উপায় আছে কষ্টের সাথে এবং কঠিনের সঙ্গে সহজ জড়িত আছে।” (সিঃ সহীহাহ ২৩৮২নং)
হাসান বাসরী বলেছেন, 'আশ্চর্য তার প্রতি, যে তকদীরে ঈমান রাখে অথচ সে চিন্তিত হয়। আশ্চর্য তার প্রতি, যে মৃত্যুকে বিশ্বাস করে অথচ সে আনন্দিত হয়। আশ্চর্য তার প্রতি, যে দুনিয়া ও তার বিবর্তনের কথা জানে অথচ সে তার প্রতি অনুরক্ত ও সন্তুষ্ট হয়।'
একদা ইব্রাহীম বিন আদহম এক দুশ্চিন্তাগ্রস্ত লোকের নিকট গিয়ে বললেন, 'আমি তোমাকে ৩টি প্রশ্ন করব, তার উত্তর দেবে কি?' লোকটি বলল, 'অবশ্যই।' তিনি বললেন, 'এ জগতে কি এমন কিছু ঘটছে, যাতে আল্লাহর ইচ্ছা নেই?'
সে বলল, 'না।' বললেন, 'তোমার রুযীর এতটুকু কি কম হবে, যা আল্লাহ তোমার জন্য নির্ধারিত ক'রে রেখেছেন?'
বলল, 'না।' বললেন, 'তোমার আয়ু থেকে কি এতটুকুও কম করা হবে, যা আল্লাহ তোমার জন্য নির্দিষ্ট করেছেন?'
বলল, 'না।' তিনি বললেন, 'তবে আবার দুশ্চিন্তা ও দুঃখ কীসের?'
জীবনের যত দুঃখ-জ্বালা আছে, তকদীরের প্রতি পূর্ণ ঈমান থাকলে তা পানি হয়ে যায়। চোখে পানি এলেও সে ফায়সালা মেনে নিয়ে ভাগ্য ও ভাগ নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে হয়। তাতে কী মঙ্গল আছে, সীমিত জ্ঞানে বুঝতে না পারলেও তাতে অবশ্যই মঙ্গল আছে বলে পূর্ণ প্রত্যয় রাখতে হয়। অপ্রিয় কোন ঘটনা ঘটলে, অপছন্দনীয় কিছু বরণ করতে হলে, বিপদে আঘাত খেলেও তাতে কল্যাণ আছে জানতে হবে। কোন কোন ব্যাপারে মহান আল্লাহ বলেছেন,
{وَعَسَى أَن تَكْرَهُوا شَيْئًا وَهُوَ خَيْرٌ لَّكُمْ وَعَسَى أَن تُحِبُّوا شَيْئًا وَهُوَ شَرٌّ لَّكُمْ وَاللَّهُ يَعْلَمُ وَأَنتُمْ لَا تَعْلَمُونَ} (٢١٦) سورة البقرة অর্থাৎ, তোমরা যা পছন্দ কর না, সম্ভবতঃ তা তোমাদের জন্য কল্যাণকর এবং তোমরা যা পছন্দ কর, সম্ভবতঃ তা তোমাদের জন্য অকল্যাণকর। আল্লাহ জানেন, তোমরা জান না। (বাক্বারাহঃ ২১৬) {فَإِن كَرِهْتُمُوهُنَّ فَعَسَى أَن تَكْرَهُوا شَيْئًا وَيَجْعَلَ اللَّهُ فِيهِ خَيْرًا كَثِيرًا} (۱۹) سورة النساء অর্থাৎ, তোমরা যদি তাদেরকে ঘৃণা কর, তাহলে এমনও হতে পারে যে, আল্লাহ যাতে প্রভূত কল্যাণ রেখেছেন, তোমরা তাকে ঘৃণা করছ। (নিসাঃ ১৯)
সুতরাং তুমি যদি পরকালে বিশ্বাসী আল্লাহর বান্দা হও, তাহলে জীবনের সকল সুখে-দুঃখে আল্লাহ-অভিমুখী হও, তাহলে ঠকবে না। তখন দেখবে, অনেক নোকসানের পানির মাঝেও শত লাভের শতদল প্রস্ফুটিত আছে।
তকদীরে সুখ থাকলে মানুষ সুখ পায়, দুঃখ থাকলে দুঃখ। অবশ্য তদবীর করতে হয়, যাতে সুখ আসে এবং দুঃখ দূর হয়। কিন্তু বন্ধু আমার! তদবীর ও চেষ্টা ক'রে রুযী, অর্থ, সুখ ইত্যাদি আনয়ন করতে পার, কিন্তু তদবীর ও চেষ্টার বলে সুখের সাথী মনের মতো পিতা-মাতা, স্ত্রী-সন্তান আনতে পার না।
'স্বপ্ন পূরণের জন্য ভাগ্য থাকা দরকার।' 'যখন যা পাওয়ার, তখনই তা পাওয়া যায়; তার আগেও না, পরেও না।" ভাগ্যের সঙ্গে লড়াই চলে না, তার কাছে পরাজয় স্বীকার করতেই হয়।'
অনেকে ভাগ্যকে অবিশ্বাস ও অস্বীকার করে। কিন্তু 'মানুষ যখন হেরে যায়, তখন ভাগ্যকে বিশ্বাস করা ছাড়া আর কোন গতি থাকে না।'
📄 আল্লাহ-ভরসা
জীবনে যে কোন ভাল কাজের জন্য পরিকল্পনা থাকা চাই। আর সেই সাথে থাকা চাই দৃঢ় মনোবল তথা নিজের উপর আস্থা। তবে আত্মবিশ্বাস সমৃদ্ধ করতে আবশ্যক হল ঈমানী বল। আর তা হল মহান আল্লাহর উপর একক ভরসা।
মহান আল্লাহ বলেছেন, {فَإِذَا عَزَمْتَ فَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُتَوَكِّلِينَ} (١٥٩) آل عمران অর্থাৎ, অতঃপর তুমি কোন সংকল্প গ্রহণ করলে আল্লাহর প্রতি নির্ভর কর। নিশ্চয় আল্লাহ (তাঁর উপর) নির্ভরশীলদের ভালবাসেন। (আলে ইমরানঃ ১৫৯)
জ্ঞানিগণ বলেন, 'পরিকল্পনার অসফলতা, অসফলতারই এক পরিকল্পনা।' সুতরাং কাজের আগে মনকে প্রস্তুত করা চাই। তবে 'সবচেয়ে কঠিন কাজ হল, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ।'
কিন্তু সেই কঠিনতা উল্লংঘন ক'রে সংকল্পবদ্ধ হতে হবে। নচেৎ জেনে রেখো যে, 'বিফল মানুষ দুই শ্রেণীর; এক শ্রেণীর মানুষ করার ভাবনা-চিন্তা ক'রে কাজ না ক'রে বিফল হয়। আর অন্য শ্রেণীর মানুষ চিন্তা-ভাবনা না ক'রে কাজ করার ফলে বিফল হয়।'
কাজের পরিণাম না ভেবে কাজ করলে অনেক সময় অসফল ও লাঞ্ছিত হতে হয়। সুতরাং দ্বীনের কাজ হোক অথবা দুনিয়ার কাজ, পূর্ব-পরিকল্পনা গ্রহণ ক'রে কর এবং পূর্বাপর ভরসা রাখো মহান আল্লাহর উপর। তাহলে তুমি তাঁর ইচ্ছায় সফল হবে।
📄 ত্যাগ-স্বীকার
দুনিয়ার একটি চিরন্তন নীতি, কিছু পেতে হলে কিছু দিতে হয়। বড় কিছু পেতে হলে কিছুটাও ত্যাগ স্বীকার করতে হয়। জীবনের কোন উচুতে উঠতে হলে একটু নিচুতে নামতে হয়।
তুমি কোন কোন গাড়িকে দেখবে, প্রথমবারে উঁচু জায়গায় চড়তে পারে না। সামান্য উচুতে গিয়ে গতির শক্তি হারিয়ে থেমে গিয়ে ফিরে নেমে আসে। অতঃপর পিছনে ফিরে গিয়ে যথেষ্ট গতি নিয়ে অগ্রসর হয়ে অবশেষে সেই উঁচু পথ চড়তে ও অতিক্রম করতে সক্ষম হয়।
জীবনে কোন জায়গায় আটকে গেলে, ধাক্কা খেলে, বাধা পেলে চলার গতি থামিয়ে দিয়ো না। কিছু ত্যাগ স্বীকার করতে হলেও, অনেকটা পিছিয়ে গিয়ে ছুটে আসতে হলেও বারবার চেষ্টা কর, সফল হবে।
পিপীলিকার পাল দেখেছ। নিজের দেহের চাইতে কত গুণ বেশি ওজন বহন করতে পারে। তা নিয়ে উঁচু প্রাচীরগাত্রে ওঠার সময় কতবার পড়ে যায়, কতবার পিছে হটে, তবুও নিরুদ্যম হয় না।
মহৎ কিছু করতে গেলে কখনো কখনো এক-আধটুকু আঘাত সহ্য করতে হয়। বাধা উল্লংঘন করতে গিয়ে ত্যাগ-স্বীকার করতে হয়। কিছু পাওয়ার বিনিময়ে কিছু দিতে হয়। জানই তো, এ সংসার চলছে বিনিময়-ভিত্তিক লেনদেনের সহযোগিতায়।
তা বলে কিছু পাওয়ার বিনিময়ে বেশি কিছু দিয়ে বসো না। দুনিয়ার বিনিময়ে আখেরাতকে, সম্মান বা অর্থের বিনিময়ে ঈমানকে, দৌলতের বিনিময়ে ইজ্জতকে দিয়ে ফেলো না।
প্রয়োজনে স্বার্থ ত্যাগ কর, আরাম, বিলাস ও সুনিদ্রা ত্যাগ কর, মোহ ও মমতা ত্যাগ কর, আর সেই ত্যাগের মাধ্যমে সফলতার উচ্চ শিখরে পৌঁছতে সচেষ্ট হও।
📄 আশাবাদী হও
এ জীবনে সবল মন আছে যার, সেই সাধনায় সিদ্ধিলাভ করতে পারে, সাফল্যের চূড়া জয় করতে পারে। পক্ষান্তরে মনের দিক দিয়ে যে দুর্বল, কর্মক্ষেত্রেও সে দুর্বল।
কোন কাজে নিরাশ হওয়া সঙ্গত নয়। বিপদে-আপদে, দুঃখে-শোকে হতাশ হওয়া একজন মু'মিনের কাজ নয়। মহান আল্লাহর করুণা থেকে নিরাশ হওয়া মোটেই বৈধ নয়। বিপদ আসার মুখে আশঙ্কায় পড়েও আশায় বুক বেঁধে রাখতে হয়। জ্ঞানিগণ বলেন, 'মঙ্গল-অমঙ্গল, শুভ-অশুভ ও লাভ-নোকসানের টানাপোড়েনের সময় মানুষের মনে যখন ক্ষতির দিকটাই স্থান পায়, তখনই সে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়। পক্ষান্তরে যে মানুষ আশাবাদী হয়, তার দুশ্চিন্তা আসে না।' আর দুশ্চিন্তা না এলে মরার আগে সে মরতে বসে না।
পক্ষান্তরে আশাবাদী মানুষ বড় স্বপ্ন দেখে। পৃথিবীর সকল শ্রেষ্ঠ মনীষীই ছোট বালকের মতো হাতে চাঁদ পেতে চান। অসম্ভবকে সম্ভব করতে চান বলেই তাঁরা সফল হন। তাঁরা বলেন, 'চাঁদ যেন তোমার লক্ষ্য হয়, তাহলে তোমার নিশানা ব্যর্থ হলেও তুমি তারকায় গিয়ে পৌঁছবে।'
সুতরাং আশার সাথে নিজের উপর আস্থা থাকলে মন শক্ত হয়। আর 'আত্মবিশ্বাসই প্রত্যেক সফলতার প্রধান কারণ।' পক্ষান্তরে নিরাশাবাদিতা ও আত্মবিশ্বাসহীনতা বিফলতার ডাকঘর। যেহেতু নিজের কাছে হেরে যাওয়ার চেয়ে বড় হার আর কিছু হয় না।
'সাফল্য আরো সাফল্যের জন্ম দেয়, ব্যর্থতা জন্ম দেয় আরো ব্যর্থতা।'--- এ কথা সর্বক্ষেত্রে সঠিক নয়। কারণ কোন কোন ব্যর্থতাও সফলতার দ্বার উন্মুক্ত করে। এই জন্য জ্ঞানিগণ বলেন, 'যদি সফল হতে চাও, তবে ব্যর্থতার হার দ্বিগুণ ক'রে দাও।' যেহেতু 'পরাজয় মানেই সমাপ্তি নয়, যাত্রা একটু দীর্ঘ হওয়া মাত্র।'
তাঁরা আরো বলেন, 'পরাজয়কে মেনে নিলে তুমি পরাজিত। মনে যদি তোমার সাহস না থাকে, তবে জেতার আশা করো না। যদি মনে দ্বিধা থাকে-- -তুমি পারবে কি না, তাহলে মনে রেখো তুমি হেরেই গেছ। হারবে ভাবলে, হার তোমার হবেই। কারণ সাফল্য থাকে মনের ইচ্ছা শক্তিতে, মনের কাঠামোতে। যদি ভাব, অন্যদের তুলনায় তোমার কাজের মান নিচু, তাহলে তুমি নিচেই থাকবে। যদি তুমি ওপরে উঠতে চাও, তাহলে নিজের মনে সংশয় রেখো না। জীবন-যুদ্ধে সব সময় বলবান ও দ্রুতগামীরা জেতে না, যে আত্মবিশ্বাসে অটল, সে আজ হোক, কাল হোক, জিতবেই।'
'আকাশে যেমন তারা আছে, জীবনে তেমনি সম্ভাবনা আছে। তবে সচেষ্ট হয়ে তাকে জাগিয়ে তুলতে হয়।'
দ্বীন-দুনিয়ার যে কোন কাজের প্রতি আন্তরিকতা থাকা চাই। বিজয়ের হার্দিক ইচ্ছা থাকা চাই। যে ইচ্ছা কামনা ও আকাঙ্ক্ষাতে পরিণত হয়। আর 'যে কর্তব্য আকাঙ্ক্ষায় পরিণত হয়, তা শেষ পর্যন্ত আনন্দের উৎস হয়।' সেটাই দৃঢ় সংকল্পরূপে প্রকাশলাভ ক'রে সাফল্য আনয়ন করে কর্মজীবনে।
'কোন কাজ শুরু করতে হলে শুরু করতে হয় একটি জ্বলন্ত আকাঙ্ক্ষা দিয়ে। অল্প আগুন যেমন অনেক উত্তাপ দিতে পারে না, তেমনি দুর্বল ইচ্ছাশক্তি কোন মহৎ সিদ্ধিলাভ করতে পারে না।' দুর্বল ঈমান ও ক্ষীণ বিশ্বাস মানুষের মনকে দুর্বল ক'রে তোলে। আর তখনই সে পরাজিত হয়।
আশাবাদী মানুষ জানে যে, 'অতীত আছে বলে বর্তমান আছে, আর বর্তমান আছে বলে ভবিষ্যৎ আছে।' সুতরাং সেই আশাতেই বর্তমানকে অবলম্বন ক'রে ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে চেষ্ট করে।
আশাবাদী মানুষ কোন কাজ দেখে তা 'অসম্ভব' মনে ক'রে নিরাশ হয় না। যেহেতু জ্ঞানীরা বলেন, 'যা প্রয়োজনীয় কাজ তা শুরু কর, তারপর যা সম্ভবপর তা শুরু কর, অবশেষে দেখা যাবে যে, অসম্ভব কাজও সম্ভব হচ্ছে।'
'বিফলতা দুর্বলদের পথ-সমাপ্তি, কিন্তু সবলদের পথের শুরু।' এ কথা জেনে আশাবাদী কোন অসফলতায় নিরাশ হয় না। যেহেতু 'ফল পাওয়ার জন্য শেষ সময় পর্যন্ত প্রতীক্ষাই হল সফলতার রহস্য।' 'চীনে এক ধরনের বাঁশ আছে, যা লাগানোর পর প্রথম চার বছর পানি, সার দেওয়ার পরও বাড়ে না। কিন্তু পঞ্চম বছরে বাঁশ গাছটি হঠাৎ ছয় সপ্তাহে ৯০ ফুট লম্বা হয়ে যায়। আমাদেরও কোন কোন কাজের ফল দেরীতে এবং পূর্ণমাত্রায় লাভ হয়।'
'হৃদয়ে প্রশান্তি ও সুখলাভের একমাত্র মাধ্যম হল আশাবাদিতা।' নিরাশ মনে তো কেবল আশঙ্কা ও দুশ্চিন্তা প্রবল প্রতাপে বসবাস করে। আশাহীন হৃদয়ে সুখ-পাখি বাসা বাঁধে না।
'আশাবাদী মানুষ চারিদিক অন্ধকারের মাঝে আলো দেখতে পায়। পক্ষান্তরে যে আশাবাদী নয়, সে চারিদিক আলোর মাঝে অন্ধকার দেখতে পায়।'
'নিরাশাবাদিতা বুদ্ধির ক্ষয়রোগ।' নিরাশ মনে-মগজে বিবেক-বুদ্ধি কাজ করে না। সুতরাং তুমি বিদ্যার্থী হলে মনে বড় আশা রেখো, বিত্তার্থী হলেও আশা রাখা চাই। আর পরকাল-প্রার্থী হলে তো মহান আল্লাহর কাছে সবচেয়ে বড় আশা রাখতে হয়। সে ক্ষেত্রে আল্লাহর করুণা থেকে কেউ নিরাশ হয় না। যেমন তাঁর শাস্তির ভয়ও তার মন ও মগজকে সতর্ক রাখে।
হতাশ মনের বন্ধু আমার! 'দুঃখ-কষ্ট নিয়েই মানুষের জীবন। কিন্তু দুঃখের পর সুখ আসবে এটাই ধ্রুব সত্য।'
'সময়ের স্রোতে আসে জোয়ার-ভাটা, সুখের ফুলেও থাকে ব্যথার কাঁটা। দুঃখের পরে জানি দেখা দেবে সুখ, মনে যদি আশা থাকে ভাঙ্গবে না বুক।'
আশা রেখে দুঃখ দূর কর। চিরদিন কারো সমান যায় না, চিরদুঃখ কারো থাকে না।
'কিসের দুঃখ ভেবো না বন্ধু আসিবে সেদিন পুনো, এ নিশা তখন আবার তিমিরে ও পারে গিয়াছে শুনো। আলোক ও ছায়া হাসি ও অশ্রু বিধাতার দুটি দিক, কাঙাল কখনো রাজ্য লভিছে রাজায় মাগিছে ভিক।'
ভবিষ্যতের রঙিন স্বপ্ন দেখে বর্তমানের দুঃখের কালিমাকে ভুলে যাও। 'মা যখন সন্তানের জন্ম দেয়, তখন ভাবে, জীবনটা গেল বুঝি। কিন্তু তার পরে আসে খুশীর জীবন।'
পরিশেষে জেনে রেখো, 'আশাবাদিতার মানে এই নয় যে, তুমি বাস্তবকে অগ্রাহ্য ও অস্বীকার করবে; বরং আশাবাদিতা হল হতাশার অন্ধকার অগ্রাহ্য ক'রে আশার আলো জ্বালিয়ে তুমি কাজের পথে অগ্রসর হবে।' তবে এ কথাও জেনে রেখো যে, সকল আশা এ সংসারে পুরা হওয়ার নয়। 'সাধ থাকলেও সংসারের সব কুঁড়ি ফুল হয়ে ফুটতে পারে না।' 'মানুষের আশা পূরণ হওয়া খুশীর বিষয়, কিন্তু সব আশা পূরণ হওয়া অসম্ভব ব্যাপার।'
আশাময় মনের বন্ধু আমার! 'তুমি যদি চাও যে, তোমার সকল আশাই পূরণ হোক, তাহলে অসম্ভব আশা করো না।' হ্যাঁ, 'মানুষের মনে আশা থাকলে উদ্যম জন্মে এবং সৎ হলে তা সফল হয়।' 'সবচেয়ে বেশী নিঃস্ব সেই, যার কোন আশা নেই।' আশা নিয়েই মানুষ বেঁচে থাকে। আশা-নিরাশার রৌদ্র-ছায়াই মানুষের জীবনকে বৈচিত্রময় ক'রে তোলে। 'মানুষের সর্বস্ব চলে গেলেও তার আশাটুকু যায় না। মানুষ চলে গেলেও তার আশা থাকে। আবার আশা ফুরিয়ে গেলে মানুষ ফুরিয়ে যায়।' 'প্রত্যাশা ফলাফল নিয়ন্ত্রণ করে।'
'জীবন মানেই আশায় আশায় বেঁচে থাকা। আশা এমন একটা জিনিস, যাকে কোনদিন স্পর্শ করা যায় না। কিন্তু মানুষকে বেঁচে থাকার জন্য অনুপ্রেরণা দেয়।'
'মানুষ দুঃসময়ের মাঝে আশা-নিরাশার কূল-কিনারা যখন দেখিতে পায় না, তখন দুর্বল মন বড় ভয়ে ভয়ে আশার দিকটাই চাপিয়া ধরে। যেটা হইলে তাহার মঙ্গল সেইটাই আশা করে। ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় সেই দিক পানেই নিতান্ত উৎসুক নয়নে চাহিয়া দেখিতে চাহে।' 'সংসার সাগরে দুঃখ-তরঙ্গের খেলা, আশা তার একমাত্র ভেলা।'