📘 জীবন দর্পণ > 📄 পার্থিব জীবনের প্রকৃতত্ত্ব

📄 পার্থিব জীবনের প্রকৃতত্ত্ব


পার্থিব জীবনের প্রকৃতত্ত্ব এই যে, তা ক্ষণস্থায়ী। কখনও সুখের কখনও দুঃখের। অধিকাংশ মানুষ এ জীবনে কোন না কোনভাবে কষ্টই পেয়ে থাকে। আর মু'মিনের জীবন তো আরও দুঃখে ভরা। যেহেতু তার প্রতিপালক তাকে পরীক্ষায় ফেলেন। তিনি বলেছেন,
{وَلَنَبْلُوَنَّكُمْ بِشَيْءٍ مِّنَ الْخَوفٌ وَالْجُوعِ وَنَقْصٍ مِّنَ الأَمْوَالِ وَالْأَنفُسِ وَالثَّمَرَاتِ وَبَشِّرِ الصابرين } (১৫৫) সূরা বাক্বারা
অর্থাৎ, নিশ্চয়ই আমি তোমাদেরকে কিছু ভয় ও ক্ষুধা দ্বারা এবং কিছু ধনপ্রাণ এবং ফলের (ফসলের) নোকসান দ্বারা পরীক্ষা করব; আর তুমি ধৈর্যশীলদেরকে সুসংবাদ দাও। (বাক্বারাহঃ ১৫৫)
সুতরাং জীবন যতক্ষণ আছে, বিপদ ততক্ষণ থাকবেই। কান্না ছাড়া জীবন হয় না। জীবন যেন একটি পিঁয়াজের মত। একটির পর একটি খোসা কেবল। আর তাতে শুধু অশ্রুধারা।
ব্যথা দেওয়া, ব্যথা পাওয়া এই তো জীবনের রহস্য। 'জীবনে যে ব্যথা দিলও না, পেলও না, সে জীবনের আর কী পেল?'
প্রত্যেকের জীবনে সমস্যা আছে। তাই 'জীবনের সমস্যাকে এড়িয়ে যাওয়ার অর্থই হচ্ছে, জীবনকে অস্বীকার করা।'
'জীবনে সমস্যা সৃষ্টি না হলে বাঁচার আনন্দ অর্ধেক হয়তো নষ্ট হত। দুঃখ আছে, চিন্তা আছে, দৈন্য আছে বলেই তো জীবন কখনো একঘেয়ে হয়ে উঠে না।'
শান্তি-কষ্ট, ভালো-মন্দ, সুন্দর-অসুন্দর দুই নিয়েই জীবন। কাউকে অবহেলা করতে নেই। হরিণের শিং কত সুন্দর। কিন্তু পা অসুন্দর। ময়ূরের পেখম সুন্দর। কিন্তু পা সুন্দর নয়।
প্রত্যেকের জীবনে দ্বন্দ্ব আছে। 'নদীতে স্রোত আছে, তাই নদী বেগবান। জীবনে দ্বন্দ্ব আছে, তাই জীবন বৈচিত্রময়।'
'মেঘ ও রৌদ্র এই দুইয়ে মিলেই তৈরি হয় রঙধনু। আমাদের জীবনও কোন ব্যতিক্রম নয়। সেখানেও আছে সুখ-দুঃখ, ভালো-মন্দ, অন্ধকার ও আলো।'
আশানুরূপ সুখ কেউ পায় না এ জীবনে। কল্পিত বা অভিনীত সুখের আশা করা বোকামি ছাড়া কিছু নয়। শায়খ সা'দী বলেছেন, 'কাব্য উপন্যাস নহে এ মম জীবন, নাট্যশালা নহে ইহা প্রকৃত ভবন।'
জীবনে যা পেয়েছ, তাই বাস্তব চোখের পানি ফেলে অরণ্যে রোদন ক'রে কোন ফল নেই বন্ধু! মনের মতো চেয়ে যা পাওনি, তা পাওয়ার আশায় রোদন ক'রে লাভ কী? নাটকীয় পরিবর্তন নাটকেই হয়। বাস্তব সংসারে সে পরিবর্তনের জীবন আশা করা ভুল বন্ধু! তবে আল্লাহ চাইলে, সে কথা ভিন্ন।
'মানুষের মন একটি অতল দীঘির মতো। কখনো তাতে মানুষ ডুবে যায়, আবার কখনো তাতে পদ্ম ফোটে।' 'মানুষের মনটা জঙ্গলের মতো, তাতে আছে নানা রকমের গাছ, নানা ধরনের ফুল-ফল, আছে বাঘ-ভালুক, সাপ ইত্যাদি।' সুতরাং যার মন পেয়েছ, তার মনের ব্যাপারে সতর্ক থেকো বন্ধু। এমনও হতে পারে যে, তোমার ফুল-বাগিচায় বাঘ এসে পড়বে।
'জীবন পথে চলার জন্য একটু উদাসীনতা চাইই।' জীবনের সব কিছু মনোমতো চলে না। যা কিছু মনের প্রতিকূলে ঘটে, তাকেও অনেক সময় মেনে নিতে হয়। তাছাড়া জীবন অচল হয়ে যায়। নিখুঁত কোন জীবন নেই, অনাবিল কোন সুখ নেই, ত্রুটিহীন কোন সংসার নেই।
পুরোটা জীবন এক রকম হয় না। কোনদিন মধু, কোনদিন কদু আসে জীবনে। 'সূর্য প্রত্যেক দিন পূর্ব দিকে ওঠে ও পশ্চিম দিকে ডোবে ঠিকই, কিন্তু একই জায়গা থেকে ওঠে না। জীবনটাও অনুরূপ।' 'জীবনটা নাগরদোলার খেলার মত, কখনো উপরে ওঠে, কখনো নিচে নামে।'
এক দম্পতি মাংস দিয়ে খানা খাচ্ছিল। দরজায় এক ভিক্ষুক এল। স্বামীর হুকুমে স্ত্রী উঠে গিয়ে ভিক্ষা না দিয়ে ভিক্ষুককে তাড়িয়ে এল। কিছু দিন পর মনোমালিন্য হয়ে এই স্বামী-স্ত্রীর মাঝে বিচ্ছেদ ঘটল।
অতঃপর ঐ মহিলার পুনর্বিবাহ হল। একদিন মাংস নিয়ে স্বামীর সাথে খানা খেতে বসেছে, এমন সময় দরজায় ভিখারীর শব্দ এল। স্বামী হুকুম করল, এই মাংস সহ খানা ভিক্ষুককে দিয়ে এস। স্ত্রী তা দিয়ে এসে স্বামীর সামনে কান্না আর রোধ করতে পারল না। স্বামী বলল, 'কাঁদছ কেন? আমরা তো আল্লাহর দেওয়া রুযী থেকে আল্লাহরই পথে ব্যয় করলাম।' স্ত্রী বলল, 'ভিক্ষুকটা কে জানো? আমার প্রথমকার স্বামী! ঐ একদিন এক ভিক্ষুককে ধমক দিয়ে তাড়িয়ে দিতে বলেছিল। কিন্তু আজ সে নিজেই ভিখারী!'
স্বামী বলল, 'ও, তাই বুঝি? আর ঐ বিতাড়িত ভিক্ষুক কে ছিল তা জানো? তোমার বর্তমান স্বামী, আমিই! আল্লাহ যাকে যখন ইচ্ছা ধনী-গরীব ক'রে থাকেন।'
জীবনে আজ যা আছে, কাল তা নাও থাকতে পারে। আজ যে বন্ধু আছে, কাল সে শত্রু হয়ে যেতে পারে। আজ যে আপন আছে, কাল সে পর হয়ে যেতে পারে। কবি বলেছেন, 'জীবন-চাকা কলের মত ঘুরল জীবনভর, সকাল-দুপুর আপন সবাই সাঁঝের বেলায় পর।'
আর আপন যখন পর হয়, মায়ার বন্ধন যখন ছিন্ন হতে লাগে, তখন বড় কষ্ট হয় বন্ধু। স্বার্থের আকর্ষণে যখন বাঁধন ছিঁড়ে যায়, তুমি যার অবলম্বন ছিলে, তার পায়ের তলায় যখন মাটি হয়, অতঃপর সে যখন তোমাকে বর্জন ক'রে স্বাধীনতা ও স্বয়ংসম্পূর্ণতার বড়াই দেখায়, তখন কষ্ট হয়, না হয় না বল?
কিন্তু সেটাই এ জীবনের বাস্তবতা বন্ধু! সেটাই সকলকে মাথা পেতে মেনে নিতে হবে। চিরদিন কাউকে বুকে জড়িয়ে ধরে রাখতে পারো না। চিরদিন কাউকে মায়ার বাঁধনে বেঁধে রাখতে পারো না। কুঁড়ি হয়ে যে বুকে ফুলকে সযত্নে ধরে রেখেছ, সে ফুল একদিন ফুটবেই ফুটবে। ফুল হয়ে যে ফলকে তুমি নিজের অন্তরে লুকিয়ে রেখেছ, সে ফল একদিন ফলবেই ফলবে। ফুল ঝরবে, ফল পড়বে---এই তো জীবনের প্রকৃত রহস্য বন্ধু!
যে যেতে চায়, তাকে যেতে দাও। তার মুখে হাসির ঝিলিক চমকাতে দাও। তোমার বিগলিত অশ্রুধারা গন্ডে-বক্ষে প্রবাহিত হতে দাও। তার চলে যাওয়ার ব্যথাও বুকে ধরে রেখো না। কারণ 'আঘাতকে যে পুষে রাখে, ব্যথার শাস্তি তার চিরদিনের।'
কী করবে বলো? যে চলে যেতে চায়, তাকে কি ধরে রাখতে পারবে? যে প্রিয়জন তোমাকে ছেড়ে অনত্র সুখের বাসা বাঁধতে চায়, তাকে কি পারবে বাধা দিতে? যে এ পৃথিবী ছেড়ে চলে যায়, তাকেও কি পারবে তোমার পর্ণকুঠিরে চিরসাথী ক'রে রাখতে?
'ভেবে দেখ ওরে মন, এ সংসারের পান্থশালা, একদল আসে হয়, অন্য দল চলে যায়, স্বার্থপূর্ণ এ জীবনে দু'দিনের খেলা।' সে যায়, ও যাচ্ছে, তুমিও যাবে, আমিও যাব। যে আসবে, সেও যাবে। কারো ঠাঁই হবে না এ ক্ষণস্থায়ী জীবনে।
'কিন্তু চিরস্থায়ী কিছু নহে এ সংসারে, এক যায় আর আসে, জগতের রীতি, সাগরতরঙ্গ যথা।'
মায়াময় বন্ধু আমার! 'প্রতি বছর তোমার জীবন-বৃক্ষ থেকে একটি ক'রে পাতা খসে পড়ে। সুতরাং তোমার জীবনে কেবল পাতা ঝরার মৌসমই আছে। তুমি বসন্তের জন্য এ পৃথিবীতে জন্মলাভ করনি। যদিও প্রত্যেক বছরে একবার ক'রে বসন্ত আসে ও যায়।' সুতরাং যে জীবন গড়লে চিরস্থায়ী জীবন লাভ হয়, সেই জীবন গড়তে প্রয়াসী হও।
নদীতে ডুবে যেতে যেতে একটি বালক সাহায্য প্রার্থনা করল। এক ভদ্রলোক তা শুনে ঝাঁপ দিয়ে তাকে বাঁচালেন। বালকটি তাঁকে ধন্যবাদ দিল। ভদ্রলোক বললেন, 'কীসের জন্য ধন্যবাদ?; বালকটি বলল, 'আমার জীবন রক্ষা করার জন্য।' লোকটি বললেন, 'বাছা তুমি যখন বড় হবে, তখন তোমার জীবনকে এমনভাবে গড়ে তুলবে, যেন মনে হয়, তোমার জীবন বাঁচাবার উপযুক্ত ছিল।'
'ফুলের জীবন কত স্বল্প। কিন্তু সেই স্বল্প জীবনের পরিধি কত মহিমাময়।' ফুল আপনার জন্য ফোটে না। তোমার জীবনকেও ফুলের মত পরের জন্য প্রস্ফুটিত কর। কবির মতো নানা স্মৃতিসৌধ ও অমর কীর্তি রেখে তুমিও বল, 'মরিতে চাহি না আমি এ সুন্দর ভুবনে,
মানবের মাঝে আমি বাঁচিবারে চাই। এই সূর্যকরে এই পুষ্পিত কাননে জীবন্ত হৃদয়-মাঝে যদি স্থান পাই।'

📘 জীবন দর্পণ > 📄 কাজের প্রতি আন্তরিকতা

📄 কাজের প্রতি আন্তরিকতা


জীবনের প্রধান অঙ্গ হল কাজ। কাজ ছাড়া মানুষ ভালোরূপে বাঁচতে পারে না। তবে সে কাজ হতে হবে মানুষের আন্তরিক। জীবনে তুমি যে কাজই কর, সেই কাজ বৈধ হলে তার প্রতি তোমার আন্তরিকতা থাকা চাই। থাকা চাই আন্তরিক ভালবাসা, আকর্ষণ ও প্রবণতা।
যদিও সে কাজে তুমি কর্তৃপক্ষের নিকট থেকে ত্রুটি না থাকা সত্ত্বেও নানা বকুনি খাও, তবুও সে কাজের প্রতি তোমার মন ভাঙ্গা উচিত নয়। আমি জানি, কাজের উপর খামোখা বকাঝকা হলে অথবা অপ্রয়োজনীয় চাপাচাপি হলে অথবা অতিরিক্ত কাজে বাধ্য করা হলে কর্মীর অন্তর থেকে কর্মের প্রতি আন্তরিকতা অনায়াসে বিলীন হয়ে যায়। তবুও চেষ্টা রাখো, যাতে আসল কর্তব্যে কোন প্রকার ত্রুটি না হয়ে বসে।
যে কাজ তুমি কর, সে কাজ যদি তোমার গৌরবের বিষয় হয়, তাহলে গৌরবলাভের পথে যে কোন প্রকারের কষ্ট হোক, সে কষ্ট বড় মিষ্ট। সে কাজে তুমি পার্থিব পারিশ্রমিক না পেলেও পারলৌকিক পারিশ্রমিকের আশা রেখো।
জ্ঞানীদের অভিজ্ঞতায় বলা হয়েছে যে, 'করণীয় কাজের জন্য গর্ববোধ থাকলে সেই কাজের উৎকর্ষ বৃদ্ধি পায়। প্রত্যেক কর্মের মধ্যে কর্মীর দক্ষতা ও মনোভাবের ছায়া থাকে---তাতে তা যে ধরনেরই কাজ হোক না কেন?'
পুরুষ যে কাজ করে, তাতে তার মর্যাদাবোধ থাকা উচিত। মহিলা যে কাজ করে, তাতেও তার মর্যাদবোধ থাকা উচিত। স্ত্রী হয়ে সংসারের কাজে, শ্বশুর-শাশুড়ীর খিদমতে, স্বামী ও সন্তানের খিদমতে নিজের বিশেষ মর্যাদাবোধ থাকা উচিত। নচেৎ হীনম্মন্যতার শিকার হয়ে বসলে মনে বড় কষ্ট হবে।
পক্ষান্তরে সংসারের কাজ-কর্ম স্বহস্তে সম্পাদন ক'রে মর্যাদাবোধ করলে এবং তাতে মহান আল্লাহর কাছে সওয়াবের আশা রাখলে মানুষকে খোশ করা যায় এবং তারই মাধ্যমে আল্লাহকেও।
তুমি ভাবতে পার, তুমি তোমার কাজের মাধ্যমে দেশের, দশের, পরিবারের অথবা দ্বীনের কোন খিদমত করছ। আর তাতে তোমার আংশিকভাবে নিজের খিদমত থাকলেও সে কাজের উৎকৃষ্টতা অধিক হবে। আর তাতেই তোমার মনে গর্ববোধ হবে। সেই কাজ ক'রে তুমি তৃপ্তি পাবে।

📘 জীবন দর্পণ > 📄 তকদীরে ঈমান

📄 তকদীরে ঈমান


কাজ পাওনা তুমি? উপার্জনের পথ বন্ধ তোমার? বড় দুঃখে ও দুশ্চিন্তায় কালাতিপাত করছ তুমি?
যে তকদীরে ঈমান রাখে, তার আবার দুশ্চিন্তা কীসের? যে এ কথা বিশ্বাস করে, 'আল্লাহ বান্দার জন্য যা কিছু করেন, তা তার মঙ্গলের জন্য করেন' তার আবার দুঃখ ও উৎকণ্ঠা কীসের? যে বিশ্বাস করে, 'বিধির কোন লীলা নেই', 'আল্লাহর কোন খেলা নেই', 'ভাগ্যের কোন পরিহাস নেই', তার আবার দুর্ভাবনা কীসের?
জীবনে যা কিছু ঘটে, তা সৃষ্টিকর্তার হুকুমে ঘটে। তা রদ করার ক্ষমতা নেই কারও। তিনি যা ঘটান, তাতে বান্দার মঙ্গল থাকে, যদিও বান্দা সেটাকে নিজের জন্য মন্দ ভেবে থাকে। সুতরাং দুঃখে কোন প্রকার আক্ষেপ ও হা- হুতাশ করা উচিত নয় বান্দার। যেমন উচিত নয়, সুখ পেয়ে আনন্দে গর্ব প্রকাশ করা। মহান আল্লাহ বলেছেন,
مَا أَصَابَ مِنْ مُصِيبَةٍ فِي الأَرْضِ وَلَا فِي أَنْفُسِكُمْ إِلَّا فِي كِتَابٍ مِنْ قَبْلِ أَنْ تَبْرَأَهَا إِنَّ ذَلِكَ عَلَى اللَّهِ يَسِيرٌ (۲۲) لِكَيْلَا تَأْسَوْا عَلَى مَا فَاتَكُمْ وَلَا تَفْرَحُوا بِمَا آتَاكُمْ وَاللَّهُ لَا يُحِبُّ كُلَّ مُخْتَالٍ فَخُور} (۲۳) سورة الحديد
অর্থাৎ, পৃথিবীতে অথবা ব্যক্তিগতভাবে তোমাদের উপর যে বিপর্যয় আসে, আমার তা সংঘটিত করার পূর্বেই তা লিপিবদ্ধ থাকে, নিশ্চয় আল্লাহর পক্ষে তা খুবই সহজ। এটা এ জন্য যে, তোমরা যা হারিয়েছ তাতে যেন তোমরা বিমর্ষ না হও এবং যা তিনি তোমাদেরকে দিয়েছেন তার জন্য আনন্দিত না হও। গর্বিত ও অহংকারীদেরকে আল্লাহ পছন্দ করেন না। (হাদীদঃ ২২-২৩)
বলা বাহুল্য, বিপদে তকদীরে ঈমান রেখে ধৈর্য ধরা এবং মহান আল্লাহর ফায়সালায় সন্তুষ্ট হওয়া উচিত। উদ্ধার চাইলে কেবল তাঁর কাছেই চাওয়া উচিত। আল্লাহর ফায়সালার বিরুদ্ধে কোন সৃষ্টি মানুষের কোন উপকার করতে পারে না।
ইবনে আব্বাস বলেন, আমি একদা (সওয়ারীর উপর) রাসূলুল্লাহ-এর পিছনে (বসে) ছিলাম। তিনি বললেন, "ওহে কিশোর! আমি তোমাকে কয়েকটি (গুরুত্বপূর্ণ) কথা শিক্ষা দেব (তুমি সেগুলো স্মরণ রেখো)। তুমি আল্লাহর (বিধানসমূহের) রক্ষণাবেক্ষণ কর, (তাহলে) আল্লাহও তোমার রক্ষণাবেক্ষণ করবেন। তুমি আল্লাহর (অধিকারসমূহ) স্মরণ রাখো, তাহলে তুমি তাঁকে তোমার সম্মুখে পাবে। যখন তুমি চাইবে, তখন আল্লাহর কাছেই চাও। আর যখন তুমি সাহায্য প্রার্থনা কর, তখন একমাত্র আল্লাহর কাছেই সাহায্য প্রার্থনা কর। আর এ কথা জেনে রাখ যে, যদি সমগ্র উম্মত তোমার উপকার করার জন্য একত্রিত হয়ে যায়, তবে ততটুকুই উপকার করতে পারবে, যতটুকু আল্লাহ তোমার (ভাগ্যে) লিখে রেখেছেন। আর তারা যদি তোমার ক্ষতি করার জন্য একত্রিত হয়ে যায়, তবে ততটুকুই ক্ষতি করতে পারবে যতটুকু আল্লাহ তোমার (ভাগ্যে) লিখে রেখেছেন। কলমসমূহ উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং খাতাসমূহ (ভাগ্যলিপি) শুকিয়ে গেছে।” (তিরমিযী ২৫১৬নং)
তিরমিযী ব্যতীত অন্য এক বর্ণনায় আছে যে, “আল্লাহর (অধিকারসমূহের) খেয়াল রাখ, তাহলে তাঁকে তোমার সম্মুখে পাবে। সুখের সময় আল্লাহকে চেনো, তবে তিনি দুঃখ ও কষ্টের সময় তোমাকে চিনবেন। আর জেনে রাখ যে, তোমার ব্যাপারে যা ভুলে যাওয়া হয়েছে (অর্থাৎ যে সুখ-দুঃখ তোমার ভাগ্যে নেই), তা তোমার নিকট পৌঁছবে না। আর যা তোমার নিকট পৌঁছবে, তাতে ভুল হবে না। আর জেনে রাখ যে, বিজয় বা সাহায্য আছে ধৈর্যের সাথে, মুক্তির উপায় আছে কষ্টের সাথে এবং কঠিনের সঙ্গে সহজ জড়িত আছে।” (সিঃ সহীহাহ ২৩৮২নং)
হাসান বাসরী বলেছেন, 'আশ্চর্য তার প্রতি, যে তকদীরে ঈমান রাখে অথচ সে চিন্তিত হয়। আশ্চর্য তার প্রতি, যে মৃত্যুকে বিশ্বাস করে অথচ সে আনন্দিত হয়। আশ্চর্য তার প্রতি, যে দুনিয়া ও তার বিবর্তনের কথা জানে অথচ সে তার প্রতি অনুরক্ত ও সন্তুষ্ট হয়।'
একদা ইব্রাহীম বিন আদহম এক দুশ্চিন্তাগ্রস্ত লোকের নিকট গিয়ে বললেন, 'আমি তোমাকে ৩টি প্রশ্ন করব, তার উত্তর দেবে কি?' লোকটি বলল, 'অবশ্যই।' তিনি বললেন, 'এ জগতে কি এমন কিছু ঘটছে, যাতে আল্লাহর ইচ্ছা নেই?'
সে বলল, 'না।' বললেন, 'তোমার রুযীর এতটুকু কি কম হবে, যা আল্লাহ তোমার জন্য নির্ধারিত ক'রে রেখেছেন?'
বলল, 'না।' বললেন, 'তোমার আয়ু থেকে কি এতটুকুও কম করা হবে, যা আল্লাহ তোমার জন্য নির্দিষ্ট করেছেন?'
বলল, 'না।' তিনি বললেন, 'তবে আবার দুশ্চিন্তা ও দুঃখ কীসের?'
জীবনের যত দুঃখ-জ্বালা আছে, তকদীরের প্রতি পূর্ণ ঈমান থাকলে তা পানি হয়ে যায়। চোখে পানি এলেও সে ফায়সালা মেনে নিয়ে ভাগ্য ও ভাগ নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে হয়। তাতে কী মঙ্গল আছে, সীমিত জ্ঞানে বুঝতে না পারলেও তাতে অবশ্যই মঙ্গল আছে বলে পূর্ণ প্রত্যয় রাখতে হয়। অপ্রিয় কোন ঘটনা ঘটলে, অপছন্দনীয় কিছু বরণ করতে হলে, বিপদে আঘাত খেলেও তাতে কল্যাণ আছে জানতে হবে। কোন কোন ব্যাপারে মহান আল্লাহ বলেছেন,
{وَعَسَى أَن تَكْرَهُوا شَيْئًا وَهُوَ خَيْرٌ لَّكُمْ وَعَسَى أَن تُحِبُّوا شَيْئًا وَهُوَ شَرٌّ لَّكُمْ وَاللَّهُ يَعْلَمُ وَأَنتُمْ لَا تَعْلَمُونَ} (٢١٦) سورة البقرة অর্থাৎ, তোমরা যা পছন্দ কর না, সম্ভবতঃ তা তোমাদের জন্য কল্যাণকর এবং তোমরা যা পছন্দ কর, সম্ভবতঃ তা তোমাদের জন্য অকল্যাণকর। আল্লাহ জানেন, তোমরা জান না। (বাক্বারাহঃ ২১৬) {فَإِن كَرِهْتُمُوهُنَّ فَعَسَى أَن تَكْرَهُوا شَيْئًا وَيَجْعَلَ اللَّهُ فِيهِ خَيْرًا كَثِيرًا} (۱۹) سورة النساء অর্থাৎ, তোমরা যদি তাদেরকে ঘৃণা কর, তাহলে এমনও হতে পারে যে, আল্লাহ যাতে প্রভূত কল্যাণ রেখেছেন, তোমরা তাকে ঘৃণা করছ। (নিসাঃ ১৯)
সুতরাং তুমি যদি পরকালে বিশ্বাসী আল্লাহর বান্দা হও, তাহলে জীবনের সকল সুখে-দুঃখে আল্লাহ-অভিমুখী হও, তাহলে ঠকবে না। তখন দেখবে, অনেক নোকসানের পানির মাঝেও শত লাভের শতদল প্রস্ফুটিত আছে।
তকদীরে সুখ থাকলে মানুষ সুখ পায়, দুঃখ থাকলে দুঃখ। অবশ্য তদবীর করতে হয়, যাতে সুখ আসে এবং দুঃখ দূর হয়। কিন্তু বন্ধু আমার! তদবীর ও চেষ্টা ক'রে রুযী, অর্থ, সুখ ইত্যাদি আনয়ন করতে পার, কিন্তু তদবীর ও চেষ্টার বলে সুখের সাথী মনের মতো পিতা-মাতা, স্ত্রী-সন্তান আনতে পার না।
'স্বপ্ন পূরণের জন্য ভাগ্য থাকা দরকার।' 'যখন যা পাওয়ার, তখনই তা পাওয়া যায়; তার আগেও না, পরেও না।" ভাগ্যের সঙ্গে লড়াই চলে না, তার কাছে পরাজয় স্বীকার করতেই হয়।'
অনেকে ভাগ্যকে অবিশ্বাস ও অস্বীকার করে। কিন্তু 'মানুষ যখন হেরে যায়, তখন ভাগ্যকে বিশ্বাস করা ছাড়া আর কোন গতি থাকে না।'

📘 জীবন দর্পণ > 📄 আল্লাহ-ভরসা

📄 আল্লাহ-ভরসা


জীবনে যে কোন ভাল কাজের জন্য পরিকল্পনা থাকা চাই। আর সেই সাথে থাকা চাই দৃঢ় মনোবল তথা নিজের উপর আস্থা। তবে আত্মবিশ্বাস সমৃদ্ধ করতে আবশ্যক হল ঈমানী বল। আর তা হল মহান আল্লাহর উপর একক ভরসা।
মহান আল্লাহ বলেছেন, {فَإِذَا عَزَمْتَ فَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُتَوَكِّلِينَ} (١٥٩) آل عمران অর্থাৎ, অতঃপর তুমি কোন সংকল্প গ্রহণ করলে আল্লাহর প্রতি নির্ভর কর। নিশ্চয় আল্লাহ (তাঁর উপর) নির্ভরশীলদের ভালবাসেন। (আলে ইমরানঃ ১৫৯)
জ্ঞানিগণ বলেন, 'পরিকল্পনার অসফলতা, অসফলতারই এক পরিকল্পনা।' সুতরাং কাজের আগে মনকে প্রস্তুত করা চাই। তবে 'সবচেয়ে কঠিন কাজ হল, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ।'
কিন্তু সেই কঠিনতা উল্লংঘন ক'রে সংকল্পবদ্ধ হতে হবে। নচেৎ জেনে রেখো যে, 'বিফল মানুষ দুই শ্রেণীর; এক শ্রেণীর মানুষ করার ভাবনা-চিন্তা ক'রে কাজ না ক'রে বিফল হয়। আর অন্য শ্রেণীর মানুষ চিন্তা-ভাবনা না ক'রে কাজ করার ফলে বিফল হয়।'
কাজের পরিণাম না ভেবে কাজ করলে অনেক সময় অসফল ও লাঞ্ছিত হতে হয়। সুতরাং দ্বীনের কাজ হোক অথবা দুনিয়ার কাজ, পূর্ব-পরিকল্পনা গ্রহণ ক'রে কর এবং পূর্বাপর ভরসা রাখো মহান আল্লাহর উপর। তাহলে তুমি তাঁর ইচ্ছায় সফল হবে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00