📄 পরকালীন সফলতাই প্রকৃত সফলতা
সফলতা কে না চায়? সুস্থ বিবেকসম্পন্ন প্রতিটি মানুষই সফল হতে চায় আপন কর্মে আপন ক্ষেত্রে। যেখানেই সে বিচরণ করে, সেখানেই সফলতা অর্জন করতে চায়। এ সফলতা ব্যক্তি, ক্ষেত্র, লক্ষ্যভেদে ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে। সফলতা অর্জনে দু'ধরনের ভিন্নতা লক্ষ করা যায়। একটি হলো ব্যক্তিগত সফলতা আর অপরটি হলো সমষ্টিগত বা দলগত সফলতা। সফলতা অর্জনে জন্য মানুষ বহুভাবে চেষ্টা করে থাকে। মেধা, শ্রম, সময়, সম্পদ সবকিছুই মানুষ সাফল্য অর্জনে বিনিয়োগ করে। কিন্তু যে সাফল্য অর্জনের পেছনে মানুষের এতো চেষ্টা-প্রচেষ্টা সেই সফলতার ক্ষেত্রে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাপক পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। সমাজের বেশির ভাগ মানুষই সাফল্য অর্জনের সময় এবং ক্ষেত্র শুধু দুনিয়ার দৃষ্টিকোণ থেকেই বিবেচনা করে। অথচ প্রতিটি মানুষই মরণশীল, মৃত্যুর পরেও একটি জীবন আছে, যে জীবন অনন্তকালের। সে জীবন সম্পর্কে জেনেও পরকালীন সফলতার হিসাব কেউ করে না। ক্ষণস্থায়ী জিন্দেগির জন্য মানুষ যতটা না সময় শ্রম অর্থ ব্যয় করে তার সিকিভাগও যদি মানুষ পরকালীন সফলতার জন্য ব্যয় করতো তাহলে মানুষের ইহকালীন সফলতার পাশাপাশি পরকালীন সফলতাও নিশ্চিত করা যেত। কারণ পরকালীন সফলতাই প্রকৃত সফলতা।
মানুষের জন্য মৃত্যু অবধারিত এটি মহাগ্রন্থ আল কুরআনেই আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন, "প্রতিটি প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে" (সূরা আনকাবুত : আয়াত ৫৭)। আর মৃত্যুর পরেই মানুষের চূড়ান্ত ফয়সালা হবে। হিসাব করা হবে মানুষ সফল না ব্যর্থ। দুনিয়ার জীবনে বহু সফলতা অর্জনকারীও সেদিন ব্যর্থ হবে কারণ দুনিয়ার সফলতাই চূড়ান্ত সফলতা নয়। মানুষ তার জীবনকে খন্ডিত চিন্তা না করে যদি আখিরাতকে নিয়েই চিন্তা করে তাহলে প্রকৃত সাফল্য অর্জনের ক্ষেত্রে অনেক বেশি অগ্রসর হতে পারবে। মানুষের প্রকৃত সফলতা কিন্তু দুনিয়ার কর্মের ভিত্তিতেই নিরূপণ করা হবে। দুনিয়ার কর্মের ভিত্তিতেই যে চূড়ান্ত সফলতা অর্জিত হবে তার নাম জান্নাত আর ব্যর্থতার পরিণাম জাহান্নাম। দুনিয়ার জীবন যেহেতু ক্ষণস্থায়ী, তাই এর সফলতাও ক্ষণস্থায়ী। প্রকৃত সফলতা হচ্ছে আখেরাতের সফলতা। তাই কেউ যদি আখেরাতের অনন্ত অসীম জীবনে সফলতা ও মুক্তি না পায়, তাহলে দুনিয়াতে সে যতই সুখ বিলাসিতা ও আরামে কাটাক না কেন, সে সফল নয়। আর যদি কোনো মুমিন দুনিয়ার অস্থায়ী ও স্বল্পকালীন জীবনটাকে কষ্টের ভেতর দিয়েও কাটায়, কিন্তু আখেরাতে সে জান্নাতের অফুরন্ত নেয়ামতরাজি লাভ করে, তাহলে সে-ই সফল। হজরত আবু বকর (রা) বলেন, "যারা আখেরাতের অন্বেষায় দুনিয়াকে একেবারে পরিত্যাগ করে বসে তারা সফলকাম নয়; বরং দুনিয়া ও আখিরাতে যারা সমভাবে অর্জন করতে সক্ষম হয় তারাই সর্বাপেক্ষা সফলকাম মানুষ”
শুধু বৈষয়িক কল্যাণ বা সফলতাই প্রকৃত সফলতা বা কল্যাণ নয়। এমনও তো হতে পারে যে, এক ব্যক্তি চূড়ান্ত গুমরাহির ধারক-বাহক ও পথপ্রদর্শক হয়েও দুনিয়ার জীবনে নানা ধরনের অপকর্ম করে খুবই সফল জীবন উপভোগ করবে। সবাই হয়তো তাকে সবচেয়ে সফল ব্যক্তি বলেই বিবেচনা করবে। আর প্রতি মুহূর্ত ফুলে ফলে বিকশিত হবে তার যাবতীয় অপকর্ম। কিন্তু তার এ সফলতা প্রকৃত সফলতার পরিচয় বহন করে না। বরং তার যাবতীয় কর্মতৎপরতা চরম ব্যর্থতার চূড়ান্ত দলিল। নৈতিক মানদন্ডে সে একজন অপরাধী। দুনিয়াতে অপরাধীকে আল্লাহ সাময়িক কালের জন্য অবকাশ দিয়ে থাকলেও পরকালে অবশ্যই তাকে শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে। আল্লাহ্ তা'য়ালার বাণী, “আল্লাহ্ যদি মানুষকে তাদের সীমালঙ্ঘনের জন্য শাস্তি দিতেন, তাহলে ভূপৃষ্ঠে কোনো জীব-জন্তুকেই রেহাই দিতেন না; কিন্তু তিনি এক নির্দিষ্টকাল পর্যন্ত তাদেরকে অবকাশ দিয়ে থাকেন” (সূরা নাহল: ৬১)। দুনিয়ার বাহ্যিক চাকচিক্যে সফল এই ব্যক্তিটিই পরকালীন জিন্দেগিতে অপরাধী হিসেবে শাস্তি পাবে। আল কুরআনে আল্লাহ বলেন, "তুমি বল! আমি যদি আমার প্রতিপালকের নাফরমানি করি, তাহলে ভয় করছি এক বড় (ভয়াবহ) দিনে আমাকে শাস্তি ভোগ করতে হবে" (সূরা আনআম : ১৫)। তিনি আরো বলেন, "তারা কি চিন্তা করে না, একটি মহাদিবসে তাদেরকে পুনরায় উঠানো হবে? যেদিন সমস্ত মানুষ বিশ্বজাহানের প্রতিপালকের সামনে দাঁড়াবে" (সূরা মুতাফফিফিন : ৩-৪)। অর্থাৎ কিয়ামতের দিনটিকে মহাদিবস হিসেবে উপস্থাপিত করে বলা হয়েছে, সেদিন আল্লাহর আদালতে সকল জিন ও মানুষের হিসাব নেয়া হবে এবং একই সঙ্গে শাস্তি ও পুরস্কার দানের ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ ফয়সালা করা হবে অথচ এ ব্যাপারে অধিকাংশ মানুষই গাফেল। কুরআনে আল্লাহ্ তা'য়ালা বলেন, "বল! এটা এক মহা সংবাদ, যা থেকে তোমরা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছ" (সূরা সোয়াদ : ৬৭-৬৮)। কাজেই পরকাল-উদাসীন ব্যক্তির বৈষয়িক উন্নতিই সফলতার মাপকাঠি নয়। সফলতা লাভকারী সম্পর্কে আল্লাহ পাক বলেন, "সেদিন যে ব্যক্তি শাস্তি থেকে রেহাই পাবে, আল্লাহ তার ওপর বড়ই অনুগ্রহ করবেন, আর এটাই হলো সুস্পষ্ট সাফল্য" (সূরা আন'আম: ১৬)।
পরকালে মহাদিবসে প্রতিটি মানুষকেই তার দুনিয়ার জিন্দেগির হিসাব দিতে হবে। সেদিন প্রশ্ন করা হবে না কে জিপিএ-৫, কে গোল্ডেন-৫ পেয়েছো, কে ডাক্তার হয়েছো, কে ইঞ্জিনিয়ার হয়েছো বরং সেদিন পাঁচটি প্রশ্নের উত্তর না দেয়া পর্যন্ত কোনো মানবসন্তানকে এককদমও সামনে এগোতে দেয়া হবে না। এ প্রসঙ্গে হজরত ইবনে মাসউদ (রা) থেকে বর্ণিত হাদিসে এসেছে, রাসূল (সা) বলেছেন, “কিয়ামতের দিন আদমসন্তানকে পাঁচটি প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে এককদমও স্বস্থান থেকে নড়তে দেয়া হবে না। ১) তার জীবনকাল কিভাবে অতিবাহিত করেছে, ২) যৌবনের সময়টা কিভাবে ব্যয় করেছে, ৩) ধনসম্পদ কিভাবে উপার্জন করেছে, ৪) তা (ধন সম্পদ) কিভাবে ব্যয় করেছে, ৫) সে দ্বীনের যতটুকু জ্ঞানার্জন করেছে সেই অনুযায়ী আমল করেছে কি না" অপর একটি হাদিসে এসেছে- হজরত আবু হুরাইয়রা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা) বলেছেন, “যেদিন আল্লাহর ছায়া ব্যতীত আর কোনো ছায়া থাকবে না, সেদিন মহান আল্লাহ সাত ধরনের লোককে তাঁর ছায়ায় আশ্রয় দেবেন- ১. সুবিচারক বাদশাহ, ২. ঐ যুবক যার যৌবন আল্লাহর ইবাদতে অতিবাহিত হয়েছে, ৩. সেই নামাজি ব্যক্তি যার মন সদা মসজিদে আবদ্ধ থাকে এমনকি সে মসজিদ থেকে ফিরে আসার পর পুনরায় মসজিদে প্রত্যাবর্তনের জন্য ব্যাকুল থাকে, ৪. ঐ দুই ব্যক্তি যারা পরস্পরকে আল্লাহর জন্যই ভালোবাসে অর্থাৎ যাদের একত্র হওয়া এবং বিচ্ছেদ হওয়া আল্লাহকে কেন্দ্র করেই হয়ে থাকে, ৫. যে ব্যক্তি নির্জনে আল্লাহকে স্মরণ করে অশ্রু বিসর্জন দিয়েছে, ৬. যে ব্যক্তি উচ্চমর্যাদাসম্পন্ন কোনো সুন্দরী যুবতী দ্বারা (প্রেম নিবেদনে) আহূত হয়ে এই বলে প্রত্যাখ্যান করেছে যে, আমি আল্লাহকে ভয় করি, ৭. আর যে ব্যক্তি এমন গোপনে দান করে যে তার ডান হাত কী দান করল বাম হাত তা জানে না" (বুখারি ও মুসলিম)।
মানুষ যে পথে যে উদ্দেশ্যে নিজের যাবতীয় শ্রম, মেধা, অর্থ ও যোগ্যতা, কর্মক্ষমতা নিয়োজিত করে, পরিণামে যখন জানতে পারে যে, সেই পথ তাকে সোজা ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে- যে পথে সে তার যাবতীয় মূলধন ও যোগ্যতা নিয়োজিত করেছে, এ পথে সে কোনোক্রমেই সাফল্য অর্জন করতে পারবে না বরং উল্টো তাকে মহাক্ষতির সম্মুখীন হতে হচ্ছে, তাহলে এই ধরনের ব্যক্তির তুলনায় অধিক ক্ষতিগ্রস্ত বা অধিক ব্যর্থ আর কে হতে পারে? বর্তমানে যারা আল্লাহর বিধান ত্যাগ করে কৃত্রিম সফলতা অর্জনের পথে যাবতীয়-কিছু বিনিয়োগ করছে, তাদের অবস্থাও অনুরূপ। পরকাল হবে না এবং পৃথিবীর জীবনের কোনো কর্মের হিসাব কারো কাছে কখনোই দিতে হবে না। এই চিন্তা-বিশ্বাস অনুসারে পৃথিবীতে জীবন পরিচালিত করেছেন, বৈধ-অবৈধের কোনো সীমা এরা মানেনি, যেকোনো পথে ধনসম্পদ অর্জন ও ব্যয় করেছে, জীবন-যৌবনকে দ্বিধাহীনচিত্তে আকণ্ঠ ভোগ করেছে, এসব লোকই পরকালীন জীবনে ভয়াবহ ক্ষতির সম্মুখীন হবে। মহান আল্লাহ বলেন, “প্রকৃতপক্ষে বড়ই ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে সেসব লোক, যারা আল্লাহর সাক্ষাৎ সম্ভাবনাকে মিথ্যা মনে করে অমান্য করেছে” (সূরা ইউনুস: ৪৫)।
এই পৃথিবীতে মানুষ পরকালভিত্তিক জীবন পরিচালনা করতে সক্ষম হলেই কেবলমাত্র সফলতা অর্জন করতে সক্ষম হবে। কারণ একমাত্র পরকালের ভয় তথা পৃথিবীর যাবতীয় কর্মের ব্যাপারে আদালতে আখিরাতে আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে, এই অনুভূতিসম্পন্ন লোকদের পক্ষেই এই পৃথিবীকে একটি শান্তির নীড় হিসেবে গড়া সম্ভব। আর যাদের ভেতরে সেই অনুভূতিই নেই, তারাই মানবসমাজের বিভিন্ন স্তরে নেতৃত্বের আসনে আসীন হয়ে বিপর্যয় সৃষ্টি করে এবং এরাই হলো সব থেকে ক্ষতিগ্রস্ত এবং ব্যর্থ। আল্লাহ তা'য়ালা বলেন, "ক্ষতিগ্রস্ত হলো সেসব লোক, যারা আল্লাহর সাথে তাদের সাক্ষাৎ হওয়ার খবরকে মিথ্যা মনে করেছে” (সূরা আনআ'ম: ৩১)। আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের দৃষ্টিতে ঐ ব্যক্তিই সব থেকে সফলতা অর্জন করলো, যে ব্যক্তি তার গোটা জীবনকালব্যাপী আপন স্রষ্টা মহান আল্লাহর অনুগত হয়ে নিজের জীবন পরিচালিত করলো তথা সূরা আসরে বর্ণিত চারটি গুণ নিজের জীবনে বাস্তবায়িত করলো। যদিও সে ব্যক্তি পৃথিবীতে চরম অভাবের ভেতরে জীবন অতিবাহিত করেছে তবুও সে তার স্রষ্টা মহান আল্লাহর দৃষ্টিতে সফলতা ও কল্যাণ অর্জন করেছে। আল্লাহ তায়ালা সূরা আসরে উল্লেখ করেন, "সময়ের কসম, নিশ্চয় মানুষ ক্ষতির মধ্যে নিমজ্জিত। তবে তারা ছাড়া যারা ঈমান এনেছে ও সৎকাজ করতে থেকেছে এবং পরস্পরকে হক কথা ও সবর করার উপদেশ দিতে থেকেছে"।
কারুন ছিল অত্যন্ত ধনাঢ্য ব্যক্তি। হযরত মুসা (আ)-এর সময় তার ধনসম্পদ ও বিত্তবৈভবের কথা প্রবাদের মতো ছিল। আল্লাহ পৃথিবীতেই তা দিয়ে দেন। সফলতা ও ব্যর্থতার প্রকৃত মানদণ্ড যাদের জানা ছিল না বা যারা পৃথিবীর জীবনে সম্মান-মর্যাদা ও বিপুল ধন-ঐশ্বর্যের অধিপতি হওয়াকেই প্রকৃত সফলতা বলে বিশ্বাস করতো, তারা ধারণা করতো, লোকটি বড়ই সফল ব্যক্তি- লোকটি জীবনে সফলতা অর্জন করেছে। তারা আক্ষেপ করে বলতো, আমরাও যদি লোকটির অনুরূপ সফলতা অর্জন করতে পারতাম! ভ্রান্তিতে নিমজ্জিত এই মূর্খ লোকগুলোর মূর্খতা দেখে হকপন্থীরা তাদেরকে বলতো, "তোমরা যাকে সফলতা বলে ধারণা করছো তা সফলতা নয়। প্রকৃত সফলতা হলো মহান আল্লাহর প্রতি ঈমান আনা এবং আমলে সালেহ করা। আর ঈমান আনা ও আমলে সালেহ করা কেবলমাত্র তাদের পক্ষেই সম্ভব, যারা ধৈর্যশীল" হকপন্থীরা কিভাবে 'হক'-এর দাওয়াত দিয়েছিল, মহান আল্লাহ তা'য়ালা এ প্রসঙ্গে কুরআনে বলেন, "কিন্তু যাদেরকে জ্ঞান দেয়া হয়েছিল তারা বলতে লাগলো, তোমাদের অবস্থা দেখে আফসোস হয়। আল্লাহর সওয়াব তার জন্য ভালো যে ঈমান আনে ও সৎকাজ করে, আর এ সম্পদ সবরকারীরা ব্যতীত আর কেউ লাভ করতে পারে না" (সূরা কাসাস: ৮০)।
মানুষের ভেতরে যে ধারণা প্রচলিত রয়েছে, অর্থসম্পদ ও বিত্তবৈভবের অধিকারী ব্যক্তি মাত্রই সম্মান ও মর্যাদার অধিকারী, অর্থসম্পদ ও প্রভাব-প্রতিপত্তিই হলো সম্মান এবং মর্যাদার মানদণ্ড- এই ভ্রান্ত ধারণার তীব প্রতিবাদ করা হয়েছে সূরা আল ফজর-এর ১৭ থেকে ২০ নম্বর আয়াতসমূহে। ১৭ নম্বর আয়াতের প্রথম শব্দটিতেই বলা হয়েছে, 'কাল্লা' অর্থাৎ কখনো নয় বা এমনটি নয়। অর্থাৎ তোমরা যে ধারণা অনুসারে অর্থসম্পদ ও প্রভাব-প্রতিপত্তিকেই সম্মান ও মর্যাদা লাভের একমাত্র মানদণ্ড বানিয়ে নিয়েছো, তা সত্য নয়। এসব বিষয় সম্মান ও অসম্মানের মানদণ্ড কখনো হতে পারে না। কোন ব্যক্তির চরিত্র উন্নত না নিকৃষ্ট, তা বিবেচনা না করেই এবং এর মধ্যে যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে তা বিচার-বিবেচনায় না এনে একমাত্র অর্থসম্পদ ও প্রভাব-প্রতিপত্তিকেই সম্মান-মর্যাদা ও অপমানের মানদণ্ড বানিয়ে নিয়েছো, এটা তোমাদের মারাত্মক ভুল ধারণা আর বুদ্ধির দৈন্যতা ব্যতীত আর কিছুই নয়। দুনিয়াতে যেসব ছাত্র পরীক্ষা দেয় তারা পরীক্ষার রেজাল্ট পায়। মার্কশিটে প্রত্যেক বিষয়ের নাম্বার লেখা থাকে। সার্টিফিকেটে লেখা থাকে সে কোন গ্রেডে পাস করেছে। আখিরাতেও প্রত্যেকে নিজের আমলনামায় সবকিছু লেখা পাবে। আল্লাহ তায়ালা এ সম্পর্কে বলেন, "আমি প্রত্যেক মানুষের কর্মকে তার গ্রীবালগ্ন করে রেখেছি। কেয়ামতের দিন বের করে দেখাব তাকে একটি কিতাব, যা সে খোলা অবস্থায় পাবে। (এবং তাকে বলা হবে) পাঠ কর তোমার কিতাব! আজ তোমার হিসাব গ্রহণের জন্য তুমিই যথেষ্ট” (সূরা বনি ইসরাইল: ১৩-১৪)।
সেদিন প্রত্যেকে নিজ নিজ আমলনামা দেখবে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা বলেন, "নিশ্চয়ই সেদিন প্রত্যেক ব্যক্তি নিজের কৃতকর্মের ফল পাবে। চাই তা ভালো হোক বা মন্দ। সেদিন তারা কামনা করবে যে, এ দিনটি যদি তাদের নিকট হতে অনেক দূরে অবস্থান করতো; তবে কতোই না ভালো হতো" (সূরা আলে ইমরান : ৩০)। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ আরও বলেন, "সেদিন তোমাদেরকে উপস্থিত করা হবে। তোমাদের কোনো কিছু গোপন থাকবে না” (সূরা আল হাক্কাহ: ১৮)। মানুষ আমলনামা দেখে অবাক হয়ে যাবে। কারণ আমলনামায় ছোট বড় সব কিছু লেখা থাকবে। কে কখন কাকে সামান্য উপকার বা ক্ষতি করেছে, কে কখন সামান্য নেকি বা বদির কাজ করেছে সব কিছুই দেখতে পাবে। নিজের আমলনামা দেখে অপরাধীরা বলার চেষ্টা করবে, এসব অপরাধ আমি করিনি। ফেরেশতারা অতিরিক্ত লিখেছে। তখন আল্লাহ তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে বলবে, তোমরা সাক্ষী দাও। তখন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সাক্ষ্য দিবে এবং সবকিছু খুলে বলবে। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ তা'য়ালা বলেন, “আজ আমি তাদের মুখে মোহর এঁটে দেবো আর তাদের হাত আমার সাথে কথা বলবে এবং তাদের পা তাদের কৃতকর্মের সাক্ষ্য দেবে” (সূরা ইয়াসিন : ৬৫)।
ব্যক্তির ক্ষেত্রে তার ঘাম, শ্রম, ত্যাগেরই হিসাব বিশ্লেষণ করে সফলতার মাপকাঠি নিরূপণ করা হয়। কিন্তু সমষ্টিগত সফলতা অর্জনে দলের প্রত্যেকেরই প্রচেষ্টার খতিয়ান পর্যালোচনা করে সফলতা নিরূপণ করা হয়। সমষ্টিগত কোনো সাফল্য অর্জনে দলের সবারই প্রচেষ্টা কম বেশি থাকে। যখন সমষ্টির কোনো একজন দলগত সাফল্যে যথেষ্ট ভূমিকা না রাখেন তখন তার ব্যর্থতা সাফল্যের হাওয়ায় ঢাকা পড়ে যায়। কিন্তু তার মানে এই নয় যে সমষ্টিগত প্রচেষ্টায় কম প্রচেষ্টাকারী ব্যক্তিটিও সফল। বিপরীত দিকে সমষ্টিগত প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলেও দলের কোনো ব্যক্তি যদি তার সর্বোচ্চ উজাড় করে দিয়ে চেষ্টা করেন তাহলে ব্যক্তি হিসেবে সমষ্টির ভেতর তিনি অবশ্যই সফল। যারা দ্বীন বিজয়ের সাফল্য অর্জনের লক্ষ্যে কাজ করেন তারা যদি তাদের সর্বোচ্চ উজাড় করে দিয়ে দ্বীন বিজয়ের জন্য ভূমিকা রাখেন তাহলে দ্বীন বিজয়ের সাফল্য অর্জিত হোক বা না হোক ব্যক্তি হিসেবে নিশ্চিতভাবে তিনি সফল। কারণ দ্বীন বিজয়ের সাফল্য অর্জনের কর্মপ্রচেষ্টার অংশ হিসেবে তিনি সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন। তার এই প্রচেষ্টার ফলাফল হচ্ছে তিনি পরকালীন জিন্দেগিতে জান্নাতের অধিকারী হবেন। আবার দ্বীন বিজয় হয়ে গেল কিন্তু ব্যক্তি দলের সাথে থেকেও তার জান্নাত অর্জন নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হলেন তাহলে তার গোটা জিন্দেগিটাই ব্যর্থ। কারণ আখিরাতের ব্যর্থতাই চূড়ান্ত ব্যর্থতা আর আখিরাতের সফলতাই চূড়ান্ত সফলতা। মহান আল্লাহ আমাদেরকে পরকালীন সফলতা তথা জান্নাত-উপযোগী মানুষ হিসেবে নিজেদের প্রস্তুত করার তাওফিক দিন, আমিন।