📄 প্রতিদিনের কর্মের আত্মপর্যালোচনা করুন
সাফল্যের পেছনে ছুটে চলা প্রতিটি মানুষই জানেন সাফল্য এমন এক জিনিস যাকে অর্জন করতে প্রতিদিন প্রতি মুহূর্তে ব্যাপক লড়াই-সংগ্রামে অবতীর্ণ হতে হয়। যারা লড়াই-সংগ্রাম করে প্রতিনিয়ত সাফল্য ছিনিয়ে আনেন তারা শুধু লড়াই-সংগ্রাম করেই যে সাফল্য ছিনিয়ে আনেন তা কিন্তু নয় বরং তারা প্রতিদিন তাদের নিজ নিজ কর্মের পর্যালোচনা করেন। কারণ সাফল্য অর্জনে প্রতিদিনের কর্মের আত্মপর্যালোচনার বিকল্প নেই। আত্মপর্যালোচনা না করে সাফল্য কিংবা ভালো কিছু অর্জনের আশা করাটা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। এ প্রসঙ্গে একটি হাদিস রয়েছে, আবু ইয়ালা শাদ্দাদ ইবন আওস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "বুদ্ধিমান সে ব্যক্তি, যে তার নফসের প্রবৃত্তির হিসাব গ্রহণ তথা আত্মপর্যালোচনা করে এবং মৃত্যু-পরবর্তী জীবনের জন্য (নেক) কাজ করে। আর দুর্বল সে ব্যক্তি, যে স্বীয় নফসের কু-প্রবৃত্তির অনুসরণ করে, আবার আল্লাহর কাছেও (ভালো কিছু প্রাপ্তির) আকাঙ্ক্ষা পোষণ করে” (তিরমিজি ও ইবনে মাজাহ)।
নিজেকে নিজেই মূল্যায়ন করার প্রক্রিয়ার নাম আত্মপর্যালোচনা। আরবিতে এটাকে বলা হয় 'মুহাসাবা'। আর ইংরেজিতে বলে Self-evaluation। ইংরেজিতে আত্মপর্যালোচনাকে Time for review নামেও অভিহিত করা হয়। আত্মপর্যালোচনা হচ্ছে নিজের কাজের হিসাব নিজেই নেয়া। এটি নিজের সাথে নিজের প্রতিযোগিতাও বটে। গতকাল আমি কতটুকু কাজ করতে পেরেছি আর আজকে আমি কতটুক করতে পারলাম। আজকে যতটুক কাজ করার পরিকল্পনা আমার ছিল তার কতটুকু আমি করতে পেরেছি। আমার কাজের মধ্যে কোনো ভুল-ত্রুটি ছিল কি না, কোনো দুর্বলতা ছিল কি না। আমার আজকের দিনটি গতকালের চেয়ে ভালো হলো কি না সেসব বিষয়ের পর্যালোচনা করা। কারণ ধ্বংসের পরিবর্তে সফলতাতো তার জন্য যার আজকের দিনটি গতকালের চেয়ে ভালো হলো। এ প্রসঙ্গে একটি হাদিস রয়েছে, মানবতার মহান শিক্ষক রাসূল (সা) বলেছেন, “ধ্বংস তার জন্য, যার আজকের দিনটি গতকালের চেয়ে উত্তম হলো না” আত্মপর্যালোচনা শুধুমাত্র গতকালের হিসাব-নিকাশ তথা অতীতকেই যাচাই করে না বরং তা আমাদেরকে অতীত এবং আজকের অভিজ্ঞতা থেকে পরবর্তী প্রস্তুতির নির্দেশনাও দেয়। যেমন বলা হয়েছে, self-evaluation directs us to prepare our next performance from the past and today's experiences.
পরবর্তী প্রস্তুতির নির্দেশনা পেতে নিজের কর্মের পর্যালোচনা নিজে করার মাঝে অনেক সার্থকতা আছে। ব্যক্তি নিজেই যদি নিজের কাজের হিসাব নিতে পারে তাহলে তা তার সাফল্য অর্জনের ক্ষেত্রে অনেক বেশি তাকে সহযোগিতা করে। অন্য কেউ তার কাজের দোষ-ত্রুটি ধরিয়ে দেয়ার আগেই নিজের ত্রুটিগুলো নিজে চিহ্নিত করতে পারলে কর্মক্ষেত্রে সমালোচনার হাত থেকে বাঁচা যায়, জবাবদিহিতা সহজ হয়, অভিযোগের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয় না। একটি শ্লোগান রয়েছে "নিজের হিসাব নিজেই করি: প্রতিদান দিবসের হিসাবকে সহজ করি" প্রতিদান দিবসে তথা কাল কেয়ামতের ময়দানে প্রতিটি আদম সন্তানকে তার নিজের কর্মের হিসাব নিজেকেই পেশ করতে বলা হবে। মহাগ্রন্থ আল কুরআনে এ প্রসঙ্গে বর্ণনা করা হয়েছে, “পড় তোমার কিতাব (আমলনামা), আজ তোমার হিসাব গ্রহণের জন্য তুমি নিজেই যথেষ্ট" (সূরা বনি ইসরাইল: ১৮)। এ প্রসঙ্গে একটি হাদিস রয়েছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দ্বিতীয় খলিফা উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “তোমাদের কাছে হিসাব চাওয়ার আগে নিজেরাই নিজেদের হিসাব সম্পন্ন করে নাও, তোমাদেরকে পরিমাপ করার আগেই তোমরাই নিজেদেরকে পরিমাপ করে নাও। কিয়ামত দিবস এ পেশ হওয়ার জন্য নিজেদের প্রস্তুত করো। সুসজ্জিত হও সেদিনের জন্য, যেদিন তোমাদের সামনে কোনো কিছু অস্পষ্ট থাকবে না" (তিরমিজি)।
আমি যদি আজকেই আমার হিসাবটা নিয়ে নিতে পারি তাহলে পরবর্তী দিবসে জবাবদিহিতা করা আমার জন্য সহজ হয়ে যায়। মাঝে মাঝে আমরা এমন অনেক কাজ করি যার জন্য কারো কাছেই জবাবদিহি করতে হয় না। অথবা যিনি আমার কাছ থেকে আমার কাজের জবাবদিহিতা নেবেন তিনি কোনো কারণে জবাবদিহি করেন না এমনকি কিছু বলেনও না। অথচ আমরা জানি, যে কোন কাজে জবাবদিহিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ জবাবদিহিতা ছাড়া কাজের শতভাগ সাফল্য আশা করা যায় না। এক্ষেত্রে জবাবদিহিতা নেয়ার চমৎকার এবং তাৎপর্যপূর্ণ মাধ্যম হলো আত্মপর্যালোচনা। অর্থাৎ নিজের কর্মের পর্যালোচনা নিজে করে নেয়া। এতে কাজ কতটুকু হলো কতটুক বাকি থাকল, কাজের মধ্যে ভুল-ভ্রান্তি হলো কি না, সময়ের কাজ সময়েই সম্পন্ন হলো কি না, নিজের প্রতি অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে আদায় হলো কি না তা নিজে নিজেই পরিমাপ করার পাশাপাশি সফলতা অর্জনও নিশ্চিত করা যায়। দুনিয়াবি সফলতার পাশাপাশি পরকালীন সফলতা অর্জনে আত্মপর্যালোচনার বিকল্প নেই। কারণ উভয় জিন্দেগির সফলতা অর্জনে মুত্তাকি বা আল্লাহভীরু হওয়া প্রয়োজন। আর মুত্তাকি হতে হলেও প্রয়োজন আত্মপর্যালোচনার। মায়মুন ইবন মিহরান (রহঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “সে অবধি কোনো ব্যক্তি মুত্তাকি বা আল্লাহভীরু হতে পারবে না যে যাবৎ না সে নিজেই নিজের হিসাব নেয় বা মুহাসাবা করে। যেভাবে সে তার সঙ্গীর সঙ্গে হিসাব করে কোথায় তার আহার আর কোথায় তার পোশাক” (তিরমিজি)।
প্রতিদিনের কর্মের আত্মপর্যালোচনার কিছু পদ্ধতিও রয়েছে। সবচেয়ে প্রসিদ্ধ পদ্ধতিটি ইমাম গাযযালী (রহ) নিম্নোক্তভাবে বর্ণনা করেছেন। প্রথম কাজ হলো, 'সকালে ঘুম থেকে জেগে নফসের কাছে এ মর্মে অঙ্গীকার করা যে, আজ সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কোনো খারাপ কাজ করব না। আমার ওপর দায়িত্ব যত আছে সব ঠিকমতো আদায় করব। আমার ওপর আল্লাহর যত হক আছে, বান্দার যত হক আছে সব পুরোপুরি আদায় করব। হে নফস! মনে রেখ, ভুলক্রমে অঙ্গীকারের বিপরীত কোনো কাজ করলে তোমাকে শান্তি ভোগ করতে হবে।' পাশাপাশি এ অঙ্গীকার অনুযায়ী কাজ করার জন্য মহান আল্লাহর কাছে তাওফিক কামনা করা। এই হলো প্রথম কাজ আর এর নাম দিয়েছেন তিনি 'মুশারাতা' বা 'আত্ম অঙ্গীকার'। দ্বিতীয় কাজটি হলো পুরো দিনের কাজের মাঝে সকালে কৃত অঙ্গীকার অনুযায়ী কাজ হচ্ছে কি না তা দেখা। মানুষ যখন জীবিকার জন্য কর্মক্ষেত্রে বেরিয়ে যায়, চাকরি করলে চাকরিতে, ব্যবসা করলে ব্যবসায়, দোকান করলে দোকানে, পড়াশোনা করলে ক্যাম্পাসে চলে যায়। সেখানে প্রতিটি কাজ শুরু করার আগে একটু ভেবে দেখা, এ কাজটি প্রতিজ্ঞার খেলাফ কি না। এ আচরণ বা এ শব্দ যা উচ্চারণ করছি তা প্রতিজ্ঞা পরিপন্থী কি না। যদি প্রতিজ্ঞা পরিপন্থী মনে হয় তাহলে তা থেকে বাঁচার চেষ্টা করা এবং সে কাজটি না করা। এটাকে তিনি বলেছেন 'মুরাকাবা'। তৃতীয় কাজটি করতে হবে শোয়ার আগে, আর তা হলো 'মুহাসাবা' অর্থাৎ আত্ম-পর্যালোচনা। নফসকে বলবে, তুমি সারাদিন খারাপ কাজ করবে না বলে প্রতিজ্ঞা করেছিলে। প্রতিটি কাজ সঠিকভাবে করবে। আল্লাহর হক ও বান্দার হক ঠিকমত আদায় করবে বলে প্রতিজ্ঞা করেছিলে। এখন বলো কোন কাজ তুমি প্রতিজ্ঞামত করেছ, আর কোন কাজ প্রতিজ্ঞামত করনি? এভাবে সারাদিনের সকল কাজের হিসাব গ্রহণ করা আত্মপর্যালোচনার উত্তম পদ্ধতি। আত্মপর্যালোচনার সঠিক পদ্ধতির পাশাপাশি তা করার জন্য একটি ভালো সময়ও বেছে নেয়া আবশ্যক। সঠিক সময় হচ্ছে শোয়ার পূর্বমুহূর্ত। এর চেয়ে ভালো সময় হচ্ছে ফজর নামাজের পর। সবচেয়ে ভালো সময় এশার নামাজের পর। অর্থাৎ এ সময়গুলো থেকে যে কোন একটি সময় আত্মপর্যালোচনার জন্য বাছাই যেতে পারে।
আত্মপর্যালোচনার সময় নিম্নোক্ত বিষয়ে আরো গভীরভাবে ভাবার সুযোগ রয়েছে। তাহলো, প্রথম পর্যায়ে আল্লাহকে হাজির-নাজির জেনে জায়নামাজে বসে মনে মনে এ চিন্তার উদ্রক করা যে আল্লাহ আমাকে দেখছেন। আমি সেই রাব্বুল আলামিনের সামনে বসে আছি: যিনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন। তাঁর হাতেই আমার জীবন ও মৃত্যু। তিনি রহমান, রহিম ও কাহহার। আমার অন্তরের নিভৃত কোণের খবরও তিনি রাখেন। মস্তিষ্ক দিয়ে আমি কি চিন্তা করছি তা তিনি ভালোভাবে জানেন। তিনি ইনসাফগার। আমার ওপর তিনি কখনও জুলুম করেন না। দ্বিতীয় পর্যায়ে নিজের সারাদিনের কর্মব্যস্ততা স্মরণ করা। যে সমস্ত ভালো কাজ করা হয়েছে তার জন্য শুকরিয়া আদায় করা এবং যা ভুল হয়েছে তার জন্য তওবা করা। তৃতীয় পর্যায়ে আজকের দিবসে আদায়কৃত ফরজ ওয়াজিবসমূহ নিয়ে চিন্তা করা। এসব আদায়কালে আন্তরিকতা এবং মনোযোগ যথার্থই ছিলো কি না ভেবে দেখা। চতুর্থ পর্যায়ে আমার ওপর যে দায়িত্ব অর্পিত ছিল তা পালন করেছি কি না? এজন্য আমার সময় ও সামর্থ্য যা ছিল তা পুরাপুরি ব্যয় করেছি কি না? পঞ্চম পর্যায়ে আজকের ব্যবহারিক জীবন (মুয়ামেলাত) সম্পর্কে চিন্তা করা। শেষ পর্যায়ে আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করা।
এভাবে প্রতিদিন কিছু সময় বের করে নিজের আত্মপর্যালোচনা করতে হবে। ভাবতে হবে সময়তো ফুরিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু যে কাজটুকু করার আমি কি তা সম্পন্ন করতে পেরেছি? পরিকল্পনার কতটুকু কাজ করতে পারিনি অথচ আমার কতটুকু কাজ করার কথা ছিল। প্রচলিত একটি প্রসিদ্ধ উদ্ধৃতি আছে, 'If you think each day the last day of your life, then one day you really will be successful' অর্থাৎ "তুমি যদি প্রতিটি দিনকেই তোমার জীবনের শেষ দিন ভাব, তাহলে একদিন তুমি সত্যি সত্যিই সফল হবে" তাই প্রতিদিন ভোরে উঠেই আমাদের প্রতিজ্ঞা করা উচিত- আজকের দিনটাকে আমি সফল ও সার্থক করে তুলবো। আমার আজকের কাজ যেন কল্যাণের পথে হয়। প্রতিটি মুহূর্তে যেন সত্য ও সুন্দরের সাথে অতিবাহিত হয়। আমাদের আত্মপর্যালোচনায় এ উপলব্ধি জাগ্রত হওয়া উচিত যে, প্রতিদিন কত পাপ, অন্যায় পঙ্কিলতা আমাদের দৈনন্দিন জীবনকে অপবিত্র করে, আত্মাকে মলিন করে। আত্মপক্ষ সমর্থন করতে গিয়ে আমরা কত না মিথ্যার আশ্রয় গ্রহণ করি। হিংসা, প্রতিহিংসা, কিংবা প্রতিশোধের কত বীজ আমরা প্রতিদিন বপন করি। এসব অকল্যাণের বিষয় নিজের পর্যালোচনায় নিয়ে এসে এসবের মধ্যে আর নিজেকে না জড়ানোর প্রতিশ্রুতি নেয়াটাই আমাদের পরবর্তী দিনকে সুন্দর ও সার্থক করে তুলবে আর কাজের মধ্যে গতিশীলতা এনে সাফল্যকে নাগালের মধ্যে এনে দেয়ার চেষ্টা করবে। হযরত ওমর (রা.) বলেন, প্রকৃত কর্মী সেই ব্যক্তি যে দিবসের কাজ পরদিনের জন্য মুলতবি করে রাখে না। প্রতিটি দিনের, প্রতিটি কাজের অভিজ্ঞতাকে পর্যালোচনার মাধ্যমে কাজে লাগিয়ে ভুল ভ্রান্তি দূর করে নিজেকে দক্ষ করে গড়ে তুলতে হবে। মহাগ্রন্থ আল কুরআনে এসেছে, “প্রত্যেকই (খতিয়ে) দেখা উচিত যে আগামী কালের (প্রতিদান দিবসের) জন্য সে কী প্রেরণ করেছে” (সূরা আল হাশর-১৮)।
কিছু নেতিবাচক কাজ পরিত্যাগ করতে আমরা আপ্রাণ চেষ্টা করি, কিন্তু পারি না। বার বার করে ফেলি, অনুতপ্ত হই, কিন্তু আবার করি। নিজের ভেতরটাকে শোধরানোর চেষ্টা করি কিন্তু সফল হই না। এ ক্ষেত্রে আত্মপর্যালোচনার মাধ্যমেই আমাদের প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। যতবার ভুল হবে, ততবারই চেষ্টা করতে হবে। সেজন্য আমাদের প্রতিদিনের কর্মতৎপরতার আত্মপর্যালোচনাপত্র পূরণ করা আবশ্যক। প্রত্যেকদিন আত্মপর্যালোচনাপত্র নিজে পূরণ করে নিজের কাছে রাখা এবং নিজের হিসাব নিজেই যাচাই করা। নিজের সাথে নিজের প্রতিযোগিতা এই মর্মে করা যে, গতকাল আমি কতটুকু করতে পেরেছি আর আজকে আমি কতটুকু করতে পারলাম। এই আত্মপর্যালোচনা বা আত্মমূল্যায়নপত্র যদি নিয়মিত রাখা যায় তাহলে নিজের সম্পর্কে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হবে এবং সাফল্যের দ্বার উন্মোচিত হবে।
প্রকৃতপক্ষে, আত্মপর্যালোচনা মানে নিজের কাছে নিজ কাজের সামগ্রিক খতিয়ান দেয়া। কোন ব্যক্তি যদি প্রতিদিন নিজকর্মের পর্যালোচনা নিজে করেন তার জীবন ক্রমাগত উন্নত না হয়ে পারে না। কারণ এভাবে পর্যালোচনার মাধ্যমে নিজের প্রতি আস্থা-নির্ভরতা এবং কনফিডেন্স তৈরি হয়। বিশেষ করে যারা আল্লাহকে হাজির-নাজির জেনে নিজ নিজ কাজের পর্যালোচনা করেন, তারা কোনো অবস্থাতেও তাদের প্রতি অর্পিত দায়িত্ব পালনে শৈথিল্য দেখাতে পারে না। আখেরাতের সাফল্য যাদের একমাত্র কাম্য, খোদার সন্তুষ্টির আশা এবং অসন্তোষের ভীতির মাঝপথে যারা দন্ডায়মান, তাদের জীবনে প্রতিদিনের কর্মের আত্ম-পর্যালোচনার জন্য নির্দিষ্ট সময় ঠিক করে নেয়া ভালো। আত্ম-পর্যালোচনার সময় নিজের মনে এ অনুভূতি সৃষ্টি করতে হবে যেন রোজ কেয়ামতে পরম পরাক্রমশালী হাকিমের সামনে নিজের কাজের (আমলের) পর্যালোচনা করা হচ্ছে। প্রতিদিনের কর্মের আত্মপর্যালোচনার মাধ্যমে একটি পরিশুদ্ধ ও সুন্দর জীবন গঠন করার প্রচেষ্টা চালানো আমাদের প্রত্যেকেরই উচিত।
📄 আল্লাহকে যারা বেসেছে ভালো দুঃখ কি আর তাদের থাকতে পারে
২০১৭ সালের জুনের প্রথম সপ্তাহে পাবনার সাঁথিয়ার মনমথপুরে শহীদ মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী (রহ)-এর কবর জিয়ারত করে এলাম। জিয়ারত শেষে সেখানে রাখা সংরক্ষিত শোকবইয়ে কিছু কথা লিখেছিলাম। আবেগের তাড়নায় সেদিন শোকবইয়ে কী লিখেছি বাসায় বসে সে কথাগুলো ভাবছিলাম আর আমার মনের ভেতর থেকে একটি প্রেরণাদায়ক গান উচ্চারিত হচ্ছিল। আমাদের প্রেরণার জন্য অনেক গান রয়েছে, যেগুলো গুনগুন করে গেয়ে আমরা মনে প্রশান্তি পাই।
সেদিন বিশিষ্ট গীতিকার ও সুরকার চৌধুরী গোলাম মাওলা রচিত 'আল্লাহকে যারা বেসেছে ভালো দুঃখ কি আর তাদের থাকতে পারে, হতাশা কি আর তাদের থাকতে পারে'- গানটি গুনগুন করে গাইছিলাম আর শহীদ মাওলানার শোকবইয়ে কী লিখেছি তা স্মরণ করার চেষ্টা করছিলাম। ভাবনায় গানের কথাগুলোর সাথে সংরক্ষিত শোকবইয়ে লেখা আমার কথাগুলোর মিল খুঁজে পাচ্ছিলাম। সেদিন আবেগ দিয়ে যে কথাগুলো লিখেছিলাম বাস্তবে আমার মনে হচ্ছিল আমি যথার্থই লিখেছি। শোকবইয়ে আমি লিখেছিলাম- 'শহীদ মাওলানাকে আওয়ামী জুলুমবাজ সরকার পরিকল্পিত ষড়যন্ত্রে জুডিশিয়াল কিলিংয়ের মাধ্যমে যে হত্যা করেছে, এটি আজ দেশ ও বিশ্ববাসীর কাছে দিবালোকের মতো স্পষ্ট। আমরা ব্যথিত, ভারাক্রান্ত এবং শোকাহত। তবে স্পষ্ট বলে দিতে চাই, আমরা হতাশ নই। আমাদের দৃঢ়বিশ্বাস, শহীদের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে বাংলার এই সবুজ জমিনে একদিন কালেমার পতাকা পতপত করে উড়বে ইনশাআল্লাহ। সেই প্রত্যাশায় রইলাম...।'
সেদিনের লেখা সংরক্ষিত শোকবইয়ের লাইনগুলো আর গানের কথাগুলো থেকে আমি হতাশার পরিবর্তে প্রেরণাদায়ক শক্তি খুঁজে পেলাম। দুঃখ-কষ্টকে লালনের পরিবর্তে দ্বীনবিজয়ের স্বপ্ন বুনার দীক্ষা পেলাম। আমাদের মাঝে অনেকেই আছেন যারা সামগ্রিক পরিস্থিতিতে ব্যথিত, ভারাক্রান্ত এবং শোকাহত হওয়ার পাশাপাশি দুঃখ-কষ্ট ও হতাশাকে লালন করেন। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এটা যে আল্লাহর পক্ষ থেকে পরীক্ষা এবং সে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার মাধ্যম ধৈর্য তা আমরা অনেকেই উপলব্ধি করতে পারি না। মহাগ্রন্থ আল কুরআনে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, “হে ঈমানদারগণ! তোমরা ধৈর্য ও নামাজের মাধ্যমে আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা কর। নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন। আর আল্লাহর পথে যারা নিহত হয়, তাদের তোমরা মৃত বল না। বরং তারা জীবিত, কিন্তু তোমরা তা উপলব্ধি করতে পার না। নিশ্চয়ই আমি তোমাদেরকে কিছু ভয় ও ক্ষুধা এবং জান, মাল ও শস্যের ক্ষতির মাধ্যমে পরীক্ষা করব। (হে নবী!) আপনি ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দিন। আর তারাই ধৈর্যশীল যারা বিপদের সময় বলে আমরা তো আল্লাহরই এবং নিশ্চিতভাবে তারই দিকে ফিরে যাবো” (সূরা বাকারা : ১৫৩-১৫৬)। আল কুরআনে আল্লাহ আরো বলেন, "তোমরা হতাশ হয়ো না, দুঃখ করো না, তোমরাই বিজয়ী হবে, যদি তোমরা সত্যিকার মুমিন হয়ে থাকো” (সূরা আলে ইমরান : ১৩৯)। "আমরা আল্লাহর ওপর ভরসা করবো না কেন? তিনিই তো আমাদেরকে পথ প্রদর্শন করেছেন। তোমরা আমাদেরকে যে পীড়া দিচ্ছো আমরা অবশ্যই তা ধৈর্যের সঙ্গে মোকাবেলা করব এবং যারা আল্লাহর ওপরই ভরসা করতে চায় তারা ভরসা করুক" (সূরা ইবরাহিম: ১২)।
যারা সত্যিকারের মুমিন এবং আল্লাহকে ভালোবাসেন তারই ওপর ভরসা করেন, দুঃখ-কষ্ট কিংবা হতাশায় তারা কখনো ভারাক্রান্ত হতে পারেন না। কারণ যারা মহান আল্লাহর পথের অনুসারী, তারই দ্বীনবিজয়ের জন্য যারা জীবন উৎসর্গ করেন, দুঃখ-কষ্ট ও যাতনাকে বরণ করে নেন, তাদের জন্যতো মহান আল্লাহই যথেষ্ট হয়ে যান। কারণ আল্লাহর ওপর ভরসা করলে তিনি মানুষের জন্য যথেষ্ট হয়ে যান। আমাদেরও উচিত মহান আল্লাহ তায়ালার ওপরই ভরসা করা। জেল-জুলুম, নির্যাতন-নিপীড়ন কিংবা রিজিক হারানোর ভয় যেন আমাদেরকে মহান আল্লাহর ওপর ভরসা থেকে বিরত না রাখে। বরং ভয় শুধু আল্লাহকেই করা উচিত, কেননা তিনিইতো রিজিকের মালিক, তিনি ইচ্ছা করলে পাখির রিজিকের মতো কিংবা ধারণাতীত জায়গা থেকেও মানুষের জন্য উত্তম রিজিকের ব্যবস্থা করেন। আল কুরআনে এসেছে, "আর যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ্ তার জন্য নিষ্কৃতির পথ করে দেবেন। এবং তাকে তার ধারণাতীত জায়গা থেকে রিজিক দেবেন। যে ব্যক্তি আল্লাহর ওপর ভরসা করে তার জন্য তিনিই যথেষ্ট” (সূরা ত্বালাক : ২-৩)। "আর আল্লাহর ওপর মুমিনগণ ভরসা করবে। ভরসা করা মুমিনদের উচিত" (সূরা ইবরাহিম: ১১)। "নিশ্চয়ই যারা নিজেদের আল্লাহকে না দেখেও ভয় করে তাদের জন্য রয়েছে ক্ষমা ও অতি বড় সাফল্য" (সূরা মুলক: ১২)। "যারা ঈমানদার, তারা এমন যে, যখন আল্লাহর নাম নেয়া হয় তখন ভীত হয়ে পড়ে তাদের অন্তর আর যখন তাদের সামনে পাঠ করা হয় কালাম, তখন তাদের ঈমান বেড়ে যায় এবং তারা স্বীয় পরওয়ারদিগারের প্রতি ভরসা পোষণ করে" (সূরা আনফল : ২)। এ প্রসঙ্গে হজরত ওমর (রা) থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে রাসুল (সা) বলেছেন, 'যদি তোমরা আল্লাহর ওপর ভরসা করার হক আদায় করতে তবে তিনি পাখিকে রিজিক দেয়ার মতোই তোমাদেরকেও রিজিক দিতেন। পাখিতো সকালে খালি পেটে বের হয়ে যায় এবং সন্ধ্যায় ভরা পেটে ফিরে আসে” (তিরমিজি)।
শুধু রিজিক কেন জীবন চলার পথে সাফল্য পেতে প্রতিটি বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে আমাদেরকে সবার আগে আল্লাহর ওপরই ভরসা করা উচিত। কারণ আল্লাহর ওপর ভরসা করলে তিনি সরাসরি বান্দাহকে সাহায্য করেন এবং ভরসাকারীদের ভালোবাসেন। সূরা আলে ইমরানের ১৫৯ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন, "তারপর আপনি কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলে আল্লাহর ওপরই ভরসা করবেন; নিশ্চয়ই আল্লাহ (তাঁর ওপর) ভরসাকারীদের ভালোবাসেন” আল্লাহর ওপর ভরসা করে সরাসরি সাহায্য পাওয়ার একটি ঐতিহাসিক ঘটনা তুলে ধরছি, যা রাসূল (সা)-এর হিজরতের সময় সাওর গুহায় ঘটেছিল। মক্কার কাফেররা যখন নবী (সা)-কে হত্যা করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে তখন তিনি শুধুমাত্র একজন সাথী হজরত আবু বকর (রা)-কে সঙ্গে নিয়ে মক্কা থেকে মদিনার উদ্দেশ্যে বের হয়ে পড়েন। পথে সাওর নামক গিরিগুহায় আশ্রয় গ্রহণ করেন। হন্যে হয়ে খুঁজতে থাকা মক্কার কাফির বাহিনী খুঁজতে খুঁজতে একপর্যায়ে যে গিরিগুহায় রাসূল (সা) ও আবু বকর (রা) আশ্রয় গ্রহণ করেছিলেন সেই সাওর গুহার মুখে পৌঁছে গেলো। হজরত আবু বকর (রা) ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়লেন। তিনি ভাবলেন, দুশমনদের একজন যদি ভেতরে ঢুকে একটুও উঁকি দেয়, তাহলে তারা রাসূল (সা)-কে দেখে ফেলবে। কিন্তু রাসূল (সা) একটুও বিচলিত হলেন না। তিনি হজরত আবু বকর (রা)-কে এই বলে সান্ত্বনা দিলেন, “চিন্তিত হয়ো না, মন খারাপ করো না, অবশ্যই আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন" এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন, "তোমরা যদি নবীকে সাহায্য না কর, তাহলে কোনো পরোয়া নেই। আল্লাহ তাকে এমন সময় সাহায্য করেছেন যখন কাফেররা তাকে বের করে দিয়েছিল, যখন সে ছিল মাত্র দু'জনের মধ্যে দ্বিতীয় জন, যখন তারা দু'জন গুহার মধ্যে ছিল, তখন সে তার সাথীকে বলেছিল, চিন্তিত হয়ো না, আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন। সে সময় আল্লাহ নিজের পক্ষ থেকে তার ওপর মানসিক প্রশান্তি নাজিল করেন এবং এমন সেনাদল পাঠিয়ে তাকে সাহায্য করেন, যা তোমরা দেখনি এবং তিনি কাফেরদের বক্তব্যকে নিচ করে দেন। আর আল্লাহর কথা তো সমুন্নত আছেই আল্লাহ পরাক্রমশালী ও প্রজ্ঞাময়" (সূরা তওবা: ৪০)।
মুসলিম জাতির পিতা হজরত ইবরাহিম (আ)-কে আগুনে নিক্ষেপ এবং আগুন হতে সম্পূর্ণ অক্ষত থাকার ঘটনা ইতিহাসসমৃদ্ধ। সে সময়ও হজরত ইবরাহিম (আ) মহান আল্লাহর ওপর ভরসা করেই আগুন থেকে রেহাই পেয়েছিলেন। এ প্রসঙ্গে ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত একটি হাদিস রয়েছে, তিনি বলেন, 'ইবরাহিম আলাইহিস সালামকে যখন আগুনে নিক্ষেপ করা হলো, তখন তিনি বললেন, হাসবুনাল্লাহ ওয়া-নি'মাল ওয়াকিল অর্থাৎ আল্লাহ আমাদের জন্য যথেষ্ট তিনিই উত্তম অভিভাবক। আর লোকেরা যখন মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তাঁর সাথীদের বলল, (শত্রু বাহিনীর) লোকেরা তোমাদের বিরুদ্ধে সমবেত হচ্ছে, তাই তোমরা তাদের ভয় কর, তখন তাদের ঈমান বেড়ে গেল এবং তারা বলল, হাসবুনাল্লাহু ওয়া-নি'মাল ওয়াকিল অর্থাৎ আল্লাহই আমাদের জন্য যথেষ্ট, তিনি উত্তম অভিভাবক” (বোখারি)। হজরত ইবনে আব্বাস (রা) থেকে বোখারির আরেকটি বর্ণনায় আছে, আগুনে নিক্ষেপকালে ইবরাহিম আলাইহিস সালামের শেষ কথা ছিল, হাসবুনাল্লাহু ওয়া- নি'মাল ওয়াকিল (আল্লাহ আমাদের জন্য যথেষ্ট, তিনিই উত্তম অভিভাবক)। চিকিৎসাবিজ্ঞানের জনক আবু আলি ইবনে সিনা যেকোনো কাজে মহান আল্লাহর ওপরই ভরসা করতেন এবং কাজে সাফল্যও পেতেন। তিনি যখনই কোনো জটিল সমস্যার সম্মুখীন হতেন তখনই আল্লাহর ওপর ভরসা করে তাঁর কাছে সাহায্য চাইতেন। জটিল বিষয় সমাধানকল্পে তিনি ছুটে যেতেন জায়নামাজে, দাঁড়িয়ে যেতেন নফল নামাজে আর দুই হাত তুলে আল্লাহর দরবারে কান্নাকাটি করে বলতেন, “হে আল্লাহ তুমি আমার জ্ঞানের দরজাকে খুলে দাও”
আল্লাহর প্রতি ভরসা ছাড়া কোনো বান্দাই একটি মুহূর্তও অতিবাহিত করতে পারে না। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদতও বটে। কেননা এর মাধ্যমে আল্লাহর সাথে সম্পর্ক গাঢ় ও গভীর হয়। আল্লাহ্ বলেন, "আর ভরসা কর সেই জীবিত সত্তার (আল্লাহর) ওপর, যিনি কখনো মৃত্যু বরণ করবেন না” (সূরা ফুরকান: ৫৮)। আল্লাহ বলেন, "তোমরা যদি মুমিন হয়ে থাক তবে আল্লাহর ওপরই ভরসা কর" (সূরা মায়েদা : ২৩)। তিনি আরও বলেন, "মুমিনগণ যেন একমাত্র আল্লাহর ওপরই ভরসা করে" (সূরা তওবা: ৫১)। এ প্রসঙ্গে হজরত আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত একটি হাদিস রয়েছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "যখন কোনো ব্যক্তি নিজ ঘর থেকে বের হওয়ার সময় বলে, আল্লাহর নামে (বের হচ্ছি), আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল (ভরসা) করলাম। খারাপ বিষয় থেকে ফিরে থাকা আর ভালো বিষয়ে সামর্থ্য রাখা আল্লাহর সাহায্য ব্যতীত সম্ভব নয়- তাহলে তাকে বলা হয়, তোমাকে সঠিক পথ দেখানো হলো, (আল্লাহই) তোমার জন্য যথেষ্ট হলো, তোমাকে রক্ষা করা হলো। আর তখন শয়তান তার থেকে দূরে সরে যায়” (আবু দাউদ, তিরমিজি ও নাসায়ি)। অপর একটি হাদিস উম্মুল মুমিনিন হজরত উম্মে সালামা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত (তার মূল নাম হিন্দ বিনতে আবু উমাইয়া হুযায়ফা আল মাখযুমিয়্যাহ) (তিনি বলেন), নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন নিজ ঘর থেকে বের হতেন, তখন বলতেন, "আল্লাহর নামে বের হলাম, তাঁর ওপর তাওয়াক্কুল (ভরসা) করলাম। হে আল্লাহ! আমি আপনার আশ্রয় নিচ্ছি যেন আমি পথভ্রষ্ট না হই আর আমাকে যেন পথভ্রষ্ট করা না হয়। আমার যেন পদস্খলন না হয় বা পদস্খলন করা না হয়। আমি যেন কারো ওপর অত্যাচার না করি বা কারো দ্বারা অত্যাচারিত না হই। আমি যেন মুর্খতা অবলম্বন না করি বা আমার সাথে মূর্খতা সুলভ আচরণ না করা হয়"
তাওয়াক্কুল তথা আল্লাহর ওপর ভরসার নীতি অবলম্বনকারী ব্যক্তি কখনো হতাশ হয় না, দুঃখকে লালন করে না। আশা ভঙ্গ হলে মুষড়ে পড়ে না। বিপদ-মুসিবত, লড়াই-সংগ্রাম-সঙ্কটে ঘাবড়ে যায় না। যে কোনো দুর্বিপাক, দুর্যোগ, সঙ্কট, বিপদ-মুসিবতে আল্লাহ তাআলার ওপরই দৃঢ় আস্থা রাখে। ঘোর অমানিশার অন্ধকারেও আশা করে উজ্জ্বল সুবহে সাদিকের। যত জুলুম, অত্যাচার, নির্যাতন-নিপীড়নের ঝড়-তুফানই আসুক না কেন, কোনো অবস্থাতেই সে আল্লাহ ব্যতীত কাউকে ভয় করে না। যেকোন পরিস্থিতিতে আল্লাহর ওপর ভরসাই আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পাথেয়। আল্লাহর ওপর ভরসা করে, ধৈর্য ও সাহসিকতার সাথে যদি দৃঢ় কদমে আমরা লক্ষ্যপানের দিকে এগোতে পারি তাহলে নিশ্চয় আমাদের জন্য উজ্জ্বল সুবহে সাদিক অবশ্যম্ভাবী।
📄 সর্বশ্রেষ্ঠ সফল ব্যক্তিত্ব রাসূল (সা)-এর অনুসরণ করুন
সফলতা অর্জনের জন্য মানুষ বহু পদ্ধতি, বহু কৌশল অবলম্বন করে। তার মধ্যে একটি হচ্ছে সফল ব্যক্তিত্বদের অনুসরণ করা। সফল মানুষদের সবাই অনুসরণ করতে চায়। সফলতা যেখানে যে পদ্ধতিতে, মানুষ ছুটে চলে সেখানে, ধাবিত হয় সেই পদ্ধতি অনুসরণে। সফলতা মানুষের তীব্র আকাঙ্ক্ষিত বিষয়। মানুষের সামগ্রিক কর্মতৎপরতাই সাফল্যের পেছনে ছুটে চলাকে কেন্দ্র করে হয়ে থাকে। তাইতো মানুষ খুঁজতে থাকেন সফল মানুষদের। পৃথিবীতে যারা সফলতার স্বাক্ষর রেখেছেন তারা সকলের কাছেই গ্রহণীয়, বরণীয় এবং অনুসরণযোগ্য হয়েছেন। মানুষ অনুসরণ করতে চায় এমন ব্যক্তিত্বদের যাদের অনুসরণ করে সাফল্যের স্বর্ণশিখরে পৌঁছা যায়।
সাফল্যের স্বর্ণশিখরে পৌঁছার জন্য আমরা কতই না সফল ব্যক্তিত্বকে অনুসরণ করি। কত শত সফল ব্যক্তির জীবনী পড়ি। নিজে পড়ি অন্যকেও তা পড়তে, অনুসরণ করতে বলি। মাঝে মধ্যে আমাদের পিতা-মাতাও এমন সফল ব্যক্তিদের কথা শুনিয়ে সে অনুযায়ী আমাদের পথ চলতে বলেন। আমরা আমাদের শিক্ষকদের কাছ থেকে এমন অনেক ব্যক্তিত্বের লেকচার শুনেছি যাদের অনুসরণে এগিয়ে যাওয়ার জন্য তাদের জীবনী আলোচনা করে আমাদের মোটিভেশন চালানো হয়েছে। আমরাও হরহামেশা লেখনীতে, বক্তব্য বিবৃতিতে বহু সফল ব্যক্তিত্বের উদাহরণ টেনে অন্যকে উপদেশ দিই অনুসরণের। এই সকল উপদেশ, মোটিভেশন সফলতার পানে ছুটে চলা ব্যক্তির জন্য আশাব্যঞ্জক। কিন্তু নিরাশার দিক হলো, আমরা যাদের জীবনী পড়ে, যাদের সফলতার উদাহরণ টেনে সাফল্যের মোটিভেশন চালাই তাদের সফলতা জীবনের পূর্ণাঙ্গ দিকে না হয়ে কোন না কোন একটা দিকে তারা সফলতার স্বাক্ষর রাখলেও তারাই আমাদের গোটা জিন্দেগির অনুসরণীয় সফল ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিগণিত হয়ে যান।
আমাদের অনেকেরই টেবিলে এ ধরনের অনেক সফল ব্যক্তিত্বের বইয়ের সমাহার থাকে। একবার আমি আমার এক বন্ধুর টেবিলে সফল ব্যক্তিদের জীবনীমূলক অনেক বইয়ের স্তূপ দেখে কৌতূহলবশত সবগুলো বই হাতে নিয়ে দেখলাম। বিশ্বের নামী-দামী অনেক সফল ব্যক্তিত্বের বই ছিল সেখানে। বন্ধুকে জিজ্ঞেস করলাম সফল ব্যক্তিত্ব এবং মনীষীদের এত্তসব বই সংগ্রহের উদ্দেশ্য কী? প্রত্যাশিত উত্তরই পেলাম তার কাছে, এসব সফল ব্যক্তিত্বের অনুসরণে জীবনটাকে সফল করতে, জীবনটাকে বদলে দিতে চায় সে। আমার বন্ধুটির কাছে জানতে চাইলাম আচ্ছা বন্ধু, সর্বশ্রেষ্ঠ সফল ব্যক্তিত্ব কে? যার জীবনে কোনো ব্যর্থতা ছিল না, যিনি সর্বক্ষেত্রেই সফল ছিলেন, যিনি সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব, যাকে নির্দ্বিধায় অনুসরণ করা যায়? আমার বন্ধুটি কিছুক্ষণ চিন্তা করেই জবাব দিল এমন সফল ব্যক্তিত্বতো একজনই-তিনি হলেন সর্বশেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (সা)। বন্ধুকে শেষ প্রশ্নটি করলাম সত্যিই যদি তাই হয়ে থাকে তাহলে টেবিলে রাখা সফল ব্যক্তিদের বইয়ের সারিতে হযরত মুহাম্মদ (সা)-এর সিরাতগ্রন্থ বা জীবনীমূলক বই নেই কেন? আমার বন্ধুটি এ প্রশ্নে খানিকটা বিব্রত হলো, মাথা নিচু করে বলল, আসলে বিষয়টিতো সেভাবে ভাবিনি।
যিনি জীবনের সব দিকেই ছিলেন সফল, সব বিভাগেই ছিলেন শ্রেষ্ঠ। যিনি তাঁর শৈশব, কৈশোর, যৌবন-বৃদ্ধ- সব বয়সেই অনুকরণীয়। তিনি সর্বশ্রেষ্ঠ সফল ব্যক্তিত্ব এবং সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব। আমরা বিষয়টি শতভাগ মুখে স্বীকার এবং অন্তরে বিশ্বাস করলেও তাঁকে অনুসরণ করতে আমরা অনেকে ভুলেই যাই। তাঁর জীবনালেখ্য দিয়ে সফল জীবনের চিত্র অঙ্কন করতে আমরা অনেকেই পিছপা হই। আমাদের বক্তব্য বিবৃতি লেখনীতে আমরা তাঁর উদাহরণ টেনে আনতে শঙ্কোচ বোধ করি। কী দুর্ভাগ্য আমাদের! আমাদের পিতা-মাতাও তাঁর জীবনী থেকে উদাহরণ আমাদের কমই দেন। শিক্ষকরা ক্লাসে যত বেশি পারেন বিভিন্ন সফল ব্যক্তিত্বের উদাহরণ দেন কিন্তু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা)-এর উদাহরণ খুব কমই সামনে আনেন। তাহলে যাকে আমরা সর্বশ্রেষ্ঠ সফল ব্যক্তিত্ব হিসেবে স্বীকার করি তাকে অনুসরণ না করে কিভাবে আমরা সফল হওয়ার কিংবা জীবন বদলে দেয়ার স্বপ্ন দেখি!
জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত মানুষের জীবন। মানুষের জীবনের ব্যাপ্তি খুবই ছোট এবং সংক্ষিপ্ত সময়ের। পৃথিবীর বয়স যত বাড়ছে মানুষের গড় আয়ু তত কমছে। ক্ষুদ্র জীবনেও সফল হওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা আর সুন্দর স্বপ্ন আমাদের। ক্ষুদ্র এই জীবনে মানুষকে সফলতার সিংহাসনে আরোহণ করতে হলে বহু বাধা অতিক্রম করতে হয়। পার হতে হয় নানা সময়ে নানা সঙ্কট। জন্মের পর থেকেই মানুষকে প্রতিবন্ধকতা টপকাতে হয়। শিশু-কৈশোর, তরুণ-যুবক, বৃদ্ধ- এই সব বয়সের গণ্ডিতে নানা বাধা প্রতিবন্ধকতা মাড়িয়েই মানুষকে সফলতার স্বাদ গ্রহণ করতে হয়। একটি কথা আছে, মানুষের জীবনের যত বাঁক, বাধা প্রতিবন্ধকতার তত হাঁক। এই বাধা প্রতিবন্ধকতার হাঁক-ডাক মাড়িয়েই মানুষকে সফলতার মঞ্জিলে পৌঁছতে হয়। কিন্তু যদি বলা হয় শিশু, কিশোর, তরুণ, যুবক, বিবাহিত জীবন, বৃদ্ধ এবং মৃত্যু পর্যন্ত জীবনের প্রতিটি ধাপেই সফল ছিলেন শ্রেষ্ঠ ছিলেন এমন একজন ব্যক্তিত্বের নাম বলো। হিসাব করে বললে দেখা যায়, সচরাচর আমরা যাদের নাম বলি তারা কোনো একটি সময়ে কোনো একটি বয়সে কোনো এক বিষয়ে সফল ছিলেন। কিন্তু সব বয়সে সব সময়ে যিনি সফল ছিলেন, সবদিক থেকেই যিনি সর্বশ্রেষ্ঠ সফল ব্যক্তিত্বের অধিকারী তিনি হলেন সর্বশেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (সা)।
পৃথিবী সৃষ্টির শুরু থেকে এ পর্যন্ত যত বীর-মহাবীর, নেতা-মহানেতা, রাজা-মহারাজা, সমাজসংস্কারক ও সফল ব্যক্তিত্বের আগমন ঘটেছে, এঁদের সবাই সভ্যতার বিভিন্ন অংশে অসামান্য অবদান রেখেছেন। পৃথিবীতে তাদের বহু অমর কীর্তি স্থাপিত হয়েছে তা অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। এসব ব্যক্তি বহু জীবনদর্শন দিয়ে মানবজাতির উন্নয়নের জন্য কাজ করেছেন। এসব সফল ব্যক্তি অনুসরণ করেও অনেকেই সফলতার স্বর্ণশিখরে আরোহণ করেছেন। কিন্তু সফল এসব ব্যক্তিত্বের অবদান, চেষ্টা-সাধনা ও কৃতিত্ব অনেকাংশেই পূর্ণতা পায়নি। বরং তা ছিল আংশিক, অপরিপূর্ণ, জীবনের কোনো একটি বিষয়ে, কোনো একটি সময়ে বা ক্ষণস্থায়ী। কিন্তু ইতিহাসে হযরত মুহাম্মদ (সা) এমনই একজন মাত্র ব্যক্তি ছিলেন যিনি জীবনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সর্বত্র সফলতা ও কৃতিত্ব দিয়ে মানবজীবনের জন্য আদর্শ হয়ে রয়েছেন। তাঁর সফলতার এ অবদান শুধু ব্যক্তিজীবনেই সীমাবদ্ধ ছিল না বরং ব্যক্তিজীবন, সমাজজীবন, রাষ্ট্রীয়জীবন তথা সর্বক্ষেত্রেই তিনি ছিলেন সফল ব্যক্তিত্ব। একটি সুন্দর বসুন্ধরা বিনির্মাণে, একটি সফল ব্যক্তিত্বপূর্ণ জীবনগঠনে, পরিপূর্ণ অবদান, কীর্তি এবং দর্শন রয়েছে শুধুমাত্র তাঁর জীবনেই।
অসংখ্য সফল ব্যক্তিত্বের জীবনী আমাদের সামনে রয়েছে। তাদের বহু সাফল্যের নজিরও রয়েছে আমাদের সামনে। কিন্তু এর কোনো একটিই মানুষের পরিপূর্ণ জীবনটাকে বদলায়নি। এর কোনো একটিই কোন ব্যক্তির জীবনে পূর্ণাঙ্গ সফলতা এনে দেয়নি। বরং প্রতিটি ঘটনাই আংশিক বা কিয়দংশ সফলতার মুখ দেখেছে। সফল ব্যক্তিদের প্রতিটি সাফল্যই ব্যক্তিকে পুরো না বদলিয়ে বা ভেতর থেকে না বদলে শুধু বাইরের পরিবেশটা বদলানোর চেষ্টা করেছে। বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা)-এর সাফল্যের সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক হলো, মানুষ ভেতর থেকে বদলে গিয়েছিল। শুধু বদলে যায়নি বরং তাদের পূর্ণাঙ্গ জীবনে সংঘটিত হয়েছিল আমূল পরিবর্তন। রাসূলের অনুসরণে একটি জাহেলি সমাজ আমূল পরিবর্তন হয়ে কল্যাণমুখী সমাজে পরিণত হলো। হযরত ওমর (রা)-এর মত দোর্দণ্ড-প্রতাপশালী দাম্ভিক মানুষটি হয়ে গেলেন বিনয়ী সত্যনিষ্ঠ মানুষ। আওস এবং খাজরাজ গোত্রের দীর্ঘ ৪০ বছরের 'খুনকা বদলা খুনে'র নীতি পরিবর্তন হয়ে তারা হয়ে গেলেন পরস্পরের কল্যাণকামী। উচ্ছৃঙ্খল, মদখোর, হতাশ, যুবকেরা রাসূল (সা)-এর মত ব্যক্তিত্বের অনুসরণে বিলাসী জীবনের মুখে পদাঘাত করে আদর্শিক জীবনযাপন করতে শুরু করলেন। একটি বিধ্বস্ত ধ্বংসস্তূপ থেকে বেরিয়ে এলো আলোকিত একটি সমাজ। এমন সর্বশ্রেষ্ঠ সফল ব্যক্তিত্ব মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা) ছাড়া আর কে হতে পারেন?
মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা) জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই সফল এবং শ্রেষ্ঠ ছিলেন। ছোটবেলা থেকে শুরু করে মৃত্যু পর্যন্ত রাসূল (সা)-এর জীবনের প্রতিটি ধাপই আমাদের জন্য অনুকরণীয় এবং অনুসরণীয়। ছোটবেলায় শিশুদের মধ্যে রাসূল (সা) ছিলেন আদর্শ শিশু। কারণ তিনি কখনো খেলার ছলেও শিশুদের আঘাত করেননি। রাসূল (সা) যখন কিশোর বয়সে উপনীত হন তখন তিনি আরবের জাহেলি সমাজের চিত্র দেখে ব্যথিত হন। সে সময়কার গোত্রে গোত্রে দ্বন্দ্ব, যুদ্ধ বিগ্রহসহ বিধ্বস্ত সমাজের করুণ চিত্র রাসূল (সা) উপলব্ধি করেন। কিশোর হওয়ার সত্বেও তিনি সবাইকে সাথে নিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন। কিশোর হয়েও সফল হন তিনি। যুক্ত হন হিলফুল ফুজুল সংগঠনের সাথে। ২৫ বছর বয়সে আরবের ধনাঢ্য মহিলা হযরত খাদিজা (রা)- এর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। হজরত খাদিজা (রা) ব্যবসার সকল দায়িত্ব রাসূল (সা)-এর ওপর অর্পণ করেন। রাসূল (সা) দক্ষতার সাথে সে দায়িত্ পালন করেন। রাসূল (সা)-এর হাত ধরে ব্যবসার ব্যাপক উন্নতি হয়। সে হিসেবে রাসূল (সা) একজন সফল ব্যবসায়ীও ছিলেন বটে। ৪০ বছর ধরে চলা আওস এবং খাজরাজ গোত্রের দ্বন্দ্বের অবসান ঘটান রাসূল (সা)। কাবাঘর মেরামতের সময় হাজরে আসওয়াদ কারা স্থাপন করবে এ নিয়ে সৃষ্ট সংঘাত ও উত্তেজনা রাসূল (সা) সফলতার সাথেই সমাধান করেন।
৪০ বছর বয়সে নবুওয়ত লাভের মাধ্যমে রাসূল (সা)-এর শ্রেষ্ঠত্ব আরো বেশি উদ্ভাসিত হয়। ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র প্রতিটি জীবনেই রাসূল (সা) একজন শ্রেষ্ঠ সফল ব্যক্তিত্ব। ব্যক্তিজীবনে তিনি মহানুভব, পরোপকারী, দয়ালু, দানশীল ও হৃদয়বান। পারিবারিক জীবনে তিনি শ্রেষ্ঠ শিশু, শ্রেষ্ঠ কিশোর, শ্রেষ্ঠ যুবক, শ্রেষ্ঠ স্বামী, শ্রেষ্ঠ পিতা। সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে একাধারে তিনি শ্রেষ্ঠ সফল রাষ্ট্রনায়ক, শ্রেষ্ঠ সমাজসংস্কারক, শ্রেষ্ঠ সেনাপতি, শ্রেষ্ঠ সমরবিদ, শ্রেষ্ঠ কৌশলী, শ্রেষ্ঠ দার্শনিক, শ্রেষ্ঠ মানবতাবাদী। মদিনায় রাষ্ট্রগঠনে রাসূল (সা)-এর শ্রেষ্ঠত্ব রয়েছে। মদিনা সনদ প্রণয়ন করে রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা রক্ষায় তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব রয়েছে। যুদ্ধ-বিগ্রহে বিজয়ী হয়ে ইসলামের প্রচার ও প্রসারে তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব রয়েছে। হুদাইবিয়ার সন্ধির মাধ্যমে তিনি সাফল্যের নব দিগন্ত উন্মোচিত করেছেন। মক্কা বিজয়ের মাধ্যমে তিনি সাফল্যের ষোলোকলা পূর্ণ করেছেন। এভাবে তাঁর জিন্দেগির প্রতিটি ধাপের শ্রেষ্ঠত্ব ও সফলতা বর্ণনা করে সহজেই শেষ করা যাবে না।
রাসূল (সা)-এর সিরাত বা জিন্দেগি আমরা যে উদ্দেশ্য নিয়ে পড়ি তাতে শুধু আবেগতাড়িত হই। কারো ক্ষেত্রে এ আবেগ রাসূল (সা)-কে জানতে উদ্বুদ্ধ করে মানতে নয়। এমন মুসলমানদের সংখ্যা নেহাত কম নয় যারা শুধু সওয়াব হাসিল করার জন্যই সিরাত তথা রাসূল (সা)-এর জীবনীচর্চার আগ্রহ পোষণ করে থাকে। কোথাও কোথাও খুবই ধুমধামের সাথে মিলাদ মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে, কোথাও মিষ্টি মন্ডা বিতরণ, কোথাও ফুলের ছড়াছড়ি, কোথাও আগরবাতি ও আতর-লোবানের মাত্রাতিরিক্ত ছড়াছড়ি এবং কোথাও বিচিত্র আলোকসজ্জা দ্বারা উক্ত বিশ্বাসেরই অভিব্যক্তি ঘটে। দুর্ভাগ্যবশত, এরূপ দৃষ্টিভঙ্গি ও প্রেরণা নিয়ে রাসূল (সা)-এর জীবনী অধ্যয়ন করাতে আমরা খুব কমই সফল হচ্ছি। রাসূলের জীবনী থেকে জীবনের প্রতিটি ধাপের অনুসরণ করে তদনুসারে জীবনকে গড়ে তুলতে হবে- এরূপ মনোভাব দ্বারা আমরা উদ্বুদ্ধ হচ্ছি না। ফলে জীবনে প্রতিটি ক্ষেত্রে আমরা সাফল্যও পাচ্ছি না। এ কথা অনস্বীকার্য যে, মানুষ হয়েও তিনি এমন অতুলনীয় সাফল্যমণ্ডিত জীবনের নমুনা পেশ করেছেন যা সমগ্র মানবজাতির জন্য অনুকরণীয় আদর্শ। তাঁর জীবনে ছিল অনেক গুণের সমাহার। তাঁর শ্রেষ্ঠত্বের কারণ এই যে, তাঁর দৃঢ়তা-সাহসিকতা, নীতি-আদর্শ, কোরবানি-আত্মত্যাগ, দায়িত্বসচেতনতা, মানবতার সেবাসহ সামগ্রিক কাজই ছিল মানবতার কল্যাণে। তাইতো তিনি সফল হয়েছেন সর্বক্ষেত্রে, গড়েছেন এক পুণ্যময় জীবন যা আমাদের জন্য অনুকরণীয় হয়ে রয়েছে এবং তাঁর মধ্যে আমাদের জন্য শিক্ষণীয় আদর্শ রয়েছে।
আপনার প্রিয় ব্যক্তিত্ব কে? এমন প্রশ্নের জবাবে বহু লোককেই দেখেছি যারা তাদের প্রিয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে হযরত মুহাম্মদ (সা)-কেই বেছে নেন। কিন্তু সামগ্রিক জীবনে হযরত মুহাম্মদ (সা)-এর আদর্শ তারা অনুসরণ করেন না। তাদের জীবনাচরণ দেখলে সামান্যটুকুও বলার সুযোগ নেই যে, অমুকের প্রিয় ব্যক্তিত্ব হযরত মুহাম্মদ (সা)। এ সকল ব্যক্তি প্রিয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে রাসূলকে মনোনীত করেন ঠিকই কিন্তু তার জীবনাদর্শ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করেন না। অথচ হযরত মুহাম্মদ (সা)-এর জীবনাদর্শ থেকে সমভাবে শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে একজন রাষ্ট্রনায়ক, একজন প্রশাসক, একজন শাসনকর্তা, একজন মন্ত্রী, একজন কর্মকর্তা, একজন মনিব, একজন চাকুরীজীবি, একজন ব্যবসায়ী, একজন শ্রমিক, একজন বিচারক, একজন শিক্ষক, একজন সেনাপতি, একজন বক্তা, একজন নেতা, একজন সংস্কারক, একজন দার্শনিক এবং একজন সাহিত্যিকও। সেখানে একজন পিতা, একজন সহযাত্রী ও একজন প্রতিবেশীর জন্য একই রকম অনুকরণীয় আদর্শ রয়েছে। মানুষ তার জীবনটিকে সাফল্যমণ্ডিত করতে যে সর্বোচ্চ ও সর্বোত্তম উৎকর্ষ অর্জন করা প্রয়োজন তার সবই আছে রাসূল (সা)- এর ব্যক্তিত্বে। এ জন্যই তিনি সর্বশ্রেষ্ঠ সফল ব্যক্তিত্ব। সমগ্র মানবেতিহাসে অনুসরণীয় 'শ্রেষ্ঠমানুষ' কেবল এই একজনই।
রাসূল (সা) যে অনুকরণীয় অনুসরণীয় সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব তার ঘোষণা মহাগ্রন্থ আল কুরআনে মহান আল্লাহ তায়ালা দিয়েছেন। প্রজ্ঞাময় মহান আল্লাহ বলেন, "নিশ্চয় তোমাদের জন্য রাসূল (সা)-এর জীবনেই রয়েছে সর্বোত্তম আদর্শ” (সূরা আহজাব: ২১)। রাসূল (সা) যে সর্বশ্রেষ্ঠ সফল ব্যক্তিত্ব ছিলেন তা সবসময়ই আলোচিত এবং স্বীকৃত। আল্লাহ মানুষের হেদায়েতের জন্য পৃথিবীতে যত নবী- রাসূল প্রেরণ করেছেন, তিনি ছিলেন তাদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ এবং তিনিই পৃথিবীর ইতিহাসে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সফল ব্যক্তিত্ব, সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব। মুসলমানতো বটেই, দুনিয়ার প্রায় সব অমুসলিম মনীষী, সাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক, ঐতিহাসিক, গবেষক সকলেই সর্বশ্রেষ্ঠ সফল ব্যক্তি হিসেবে সাইয়েদুল মুরসালিন মুহাম্মদুর রাসূলুল্লাহ (সা)-কে শ্রেষ্ঠত্বের স্বীকৃতি দিয়েছেন তাদের বক্তব্য বিবৃতি লেখনীতে। বিশ্বের অন্যতম বিখ্যাত দার্শনিক জজ বার্নার্ড শ রাসুল (সা) এর শ্রেষ্ঠত্বের স্বীকৃতি দিয়ে বলেছেন, I believe that if a man like Mohammad (peace be upon him) was to assume the dictatorship of the modern world, he would succeed in solving its problems in a way that would bring it the much needed peace and happiness, অর্থাৎ- আমার বিশ্বাস নবী মুহাম্মদ (সা) এর মতো কোন ব্যক্তি যদি বর্তমান বিশ্বের একনায়কের পদে আসীন হতেন, তাহলে তিনিই বর্তমান বিশ্বের সমস্যাবলীর এমন সমাধান দিতে পারতেন, যার ফলে বিশ্বে কাঙ্ক্ষিত শান্তি ও সুখ-সমৃদ্ধি নেমে আসত। আজকের এই অন্ধকারাচ্ছন্ন সমাজে সফল জীবন গঠন করার জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ সফল ব্যক্তিত্ব হযরত মুহাম্মদ (সা)-এর প্রকৃত অনুসরণের বিকল্প নেই।
📄 পরকালীন সফলতাই প্রকৃত সফলতা
সফলতা কে না চায়? সুস্থ বিবেকসম্পন্ন প্রতিটি মানুষই সফল হতে চায় আপন কর্মে আপন ক্ষেত্রে। যেখানেই সে বিচরণ করে, সেখানেই সফলতা অর্জন করতে চায়। এ সফলতা ব্যক্তি, ক্ষেত্র, লক্ষ্যভেদে ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে। সফলতা অর্জনে দু'ধরনের ভিন্নতা লক্ষ করা যায়। একটি হলো ব্যক্তিগত সফলতা আর অপরটি হলো সমষ্টিগত বা দলগত সফলতা। সফলতা অর্জনে জন্য মানুষ বহুভাবে চেষ্টা করে থাকে। মেধা, শ্রম, সময়, সম্পদ সবকিছুই মানুষ সাফল্য অর্জনে বিনিয়োগ করে। কিন্তু যে সাফল্য অর্জনের পেছনে মানুষের এতো চেষ্টা-প্রচেষ্টা সেই সফলতার ক্ষেত্রে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাপক পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। সমাজের বেশির ভাগ মানুষই সাফল্য অর্জনের সময় এবং ক্ষেত্র শুধু দুনিয়ার দৃষ্টিকোণ থেকেই বিবেচনা করে। অথচ প্রতিটি মানুষই মরণশীল, মৃত্যুর পরেও একটি জীবন আছে, যে জীবন অনন্তকালের। সে জীবন সম্পর্কে জেনেও পরকালীন সফলতার হিসাব কেউ করে না। ক্ষণস্থায়ী জিন্দেগির জন্য মানুষ যতটা না সময় শ্রম অর্থ ব্যয় করে তার সিকিভাগও যদি মানুষ পরকালীন সফলতার জন্য ব্যয় করতো তাহলে মানুষের ইহকালীন সফলতার পাশাপাশি পরকালীন সফলতাও নিশ্চিত করা যেত। কারণ পরকালীন সফলতাই প্রকৃত সফলতা।
মানুষের জন্য মৃত্যু অবধারিত এটি মহাগ্রন্থ আল কুরআনেই আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন, "প্রতিটি প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে" (সূরা আনকাবুত : আয়াত ৫৭)। আর মৃত্যুর পরেই মানুষের চূড়ান্ত ফয়সালা হবে। হিসাব করা হবে মানুষ সফল না ব্যর্থ। দুনিয়ার জীবনে বহু সফলতা অর্জনকারীও সেদিন ব্যর্থ হবে কারণ দুনিয়ার সফলতাই চূড়ান্ত সফলতা নয়। মানুষ তার জীবনকে খন্ডিত চিন্তা না করে যদি আখিরাতকে নিয়েই চিন্তা করে তাহলে প্রকৃত সাফল্য অর্জনের ক্ষেত্রে অনেক বেশি অগ্রসর হতে পারবে। মানুষের প্রকৃত সফলতা কিন্তু দুনিয়ার কর্মের ভিত্তিতেই নিরূপণ করা হবে। দুনিয়ার কর্মের ভিত্তিতেই যে চূড়ান্ত সফলতা অর্জিত হবে তার নাম জান্নাত আর ব্যর্থতার পরিণাম জাহান্নাম। দুনিয়ার জীবন যেহেতু ক্ষণস্থায়ী, তাই এর সফলতাও ক্ষণস্থায়ী। প্রকৃত সফলতা হচ্ছে আখেরাতের সফলতা। তাই কেউ যদি আখেরাতের অনন্ত অসীম জীবনে সফলতা ও মুক্তি না পায়, তাহলে দুনিয়াতে সে যতই সুখ বিলাসিতা ও আরামে কাটাক না কেন, সে সফল নয়। আর যদি কোনো মুমিন দুনিয়ার অস্থায়ী ও স্বল্পকালীন জীবনটাকে কষ্টের ভেতর দিয়েও কাটায়, কিন্তু আখেরাতে সে জান্নাতের অফুরন্ত নেয়ামতরাজি লাভ করে, তাহলে সে-ই সফল। হজরত আবু বকর (রা) বলেন, "যারা আখেরাতের অন্বেষায় দুনিয়াকে একেবারে পরিত্যাগ করে বসে তারা সফলকাম নয়; বরং দুনিয়া ও আখিরাতে যারা সমভাবে অর্জন করতে সক্ষম হয় তারাই সর্বাপেক্ষা সফলকাম মানুষ”
শুধু বৈষয়িক কল্যাণ বা সফলতাই প্রকৃত সফলতা বা কল্যাণ নয়। এমনও তো হতে পারে যে, এক ব্যক্তি চূড়ান্ত গুমরাহির ধারক-বাহক ও পথপ্রদর্শক হয়েও দুনিয়ার জীবনে নানা ধরনের অপকর্ম করে খুবই সফল জীবন উপভোগ করবে। সবাই হয়তো তাকে সবচেয়ে সফল ব্যক্তি বলেই বিবেচনা করবে। আর প্রতি মুহূর্ত ফুলে ফলে বিকশিত হবে তার যাবতীয় অপকর্ম। কিন্তু তার এ সফলতা প্রকৃত সফলতার পরিচয় বহন করে না। বরং তার যাবতীয় কর্মতৎপরতা চরম ব্যর্থতার চূড়ান্ত দলিল। নৈতিক মানদন্ডে সে একজন অপরাধী। দুনিয়াতে অপরাধীকে আল্লাহ সাময়িক কালের জন্য অবকাশ দিয়ে থাকলেও পরকালে অবশ্যই তাকে শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে। আল্লাহ্ তা'য়ালার বাণী, “আল্লাহ্ যদি মানুষকে তাদের সীমালঙ্ঘনের জন্য শাস্তি দিতেন, তাহলে ভূপৃষ্ঠে কোনো জীব-জন্তুকেই রেহাই দিতেন না; কিন্তু তিনি এক নির্দিষ্টকাল পর্যন্ত তাদেরকে অবকাশ দিয়ে থাকেন” (সূরা নাহল: ৬১)। দুনিয়ার বাহ্যিক চাকচিক্যে সফল এই ব্যক্তিটিই পরকালীন জিন্দেগিতে অপরাধী হিসেবে শাস্তি পাবে। আল কুরআনে আল্লাহ বলেন, "তুমি বল! আমি যদি আমার প্রতিপালকের নাফরমানি করি, তাহলে ভয় করছি এক বড় (ভয়াবহ) দিনে আমাকে শাস্তি ভোগ করতে হবে" (সূরা আনআম : ১৫)। তিনি আরো বলেন, "তারা কি চিন্তা করে না, একটি মহাদিবসে তাদেরকে পুনরায় উঠানো হবে? যেদিন সমস্ত মানুষ বিশ্বজাহানের প্রতিপালকের সামনে দাঁড়াবে" (সূরা মুতাফফিফিন : ৩-৪)। অর্থাৎ কিয়ামতের দিনটিকে মহাদিবস হিসেবে উপস্থাপিত করে বলা হয়েছে, সেদিন আল্লাহর আদালতে সকল জিন ও মানুষের হিসাব নেয়া হবে এবং একই সঙ্গে শাস্তি ও পুরস্কার দানের ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ ফয়সালা করা হবে অথচ এ ব্যাপারে অধিকাংশ মানুষই গাফেল। কুরআনে আল্লাহ্ তা'য়ালা বলেন, "বল! এটা এক মহা সংবাদ, যা থেকে তোমরা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছ" (সূরা সোয়াদ : ৬৭-৬৮)। কাজেই পরকাল-উদাসীন ব্যক্তির বৈষয়িক উন্নতিই সফলতার মাপকাঠি নয়। সফলতা লাভকারী সম্পর্কে আল্লাহ পাক বলেন, "সেদিন যে ব্যক্তি শাস্তি থেকে রেহাই পাবে, আল্লাহ তার ওপর বড়ই অনুগ্রহ করবেন, আর এটাই হলো সুস্পষ্ট সাফল্য" (সূরা আন'আম: ১৬)।
পরকালে মহাদিবসে প্রতিটি মানুষকেই তার দুনিয়ার জিন্দেগির হিসাব দিতে হবে। সেদিন প্রশ্ন করা হবে না কে জিপিএ-৫, কে গোল্ডেন-৫ পেয়েছো, কে ডাক্তার হয়েছো, কে ইঞ্জিনিয়ার হয়েছো বরং সেদিন পাঁচটি প্রশ্নের উত্তর না দেয়া পর্যন্ত কোনো মানবসন্তানকে এককদমও সামনে এগোতে দেয়া হবে না। এ প্রসঙ্গে হজরত ইবনে মাসউদ (রা) থেকে বর্ণিত হাদিসে এসেছে, রাসূল (সা) বলেছেন, “কিয়ামতের দিন আদমসন্তানকে পাঁচটি প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে এককদমও স্বস্থান থেকে নড়তে দেয়া হবে না। ১) তার জীবনকাল কিভাবে অতিবাহিত করেছে, ২) যৌবনের সময়টা কিভাবে ব্যয় করেছে, ৩) ধনসম্পদ কিভাবে উপার্জন করেছে, ৪) তা (ধন সম্পদ) কিভাবে ব্যয় করেছে, ৫) সে দ্বীনের যতটুকু জ্ঞানার্জন করেছে সেই অনুযায়ী আমল করেছে কি না" অপর একটি হাদিসে এসেছে- হজরত আবু হুরাইয়রা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা) বলেছেন, “যেদিন আল্লাহর ছায়া ব্যতীত আর কোনো ছায়া থাকবে না, সেদিন মহান আল্লাহ সাত ধরনের লোককে তাঁর ছায়ায় আশ্রয় দেবেন- ১. সুবিচারক বাদশাহ, ২. ঐ যুবক যার যৌবন আল্লাহর ইবাদতে অতিবাহিত হয়েছে, ৩. সেই নামাজি ব্যক্তি যার মন সদা মসজিদে আবদ্ধ থাকে এমনকি সে মসজিদ থেকে ফিরে আসার পর পুনরায় মসজিদে প্রত্যাবর্তনের জন্য ব্যাকুল থাকে, ৪. ঐ দুই ব্যক্তি যারা পরস্পরকে আল্লাহর জন্যই ভালোবাসে অর্থাৎ যাদের একত্র হওয়া এবং বিচ্ছেদ হওয়া আল্লাহকে কেন্দ্র করেই হয়ে থাকে, ৫. যে ব্যক্তি নির্জনে আল্লাহকে স্মরণ করে অশ্রু বিসর্জন দিয়েছে, ৬. যে ব্যক্তি উচ্চমর্যাদাসম্পন্ন কোনো সুন্দরী যুবতী দ্বারা (প্রেম নিবেদনে) আহূত হয়ে এই বলে প্রত্যাখ্যান করেছে যে, আমি আল্লাহকে ভয় করি, ৭. আর যে ব্যক্তি এমন গোপনে দান করে যে তার ডান হাত কী দান করল বাম হাত তা জানে না" (বুখারি ও মুসলিম)।
মানুষ যে পথে যে উদ্দেশ্যে নিজের যাবতীয় শ্রম, মেধা, অর্থ ও যোগ্যতা, কর্মক্ষমতা নিয়োজিত করে, পরিণামে যখন জানতে পারে যে, সেই পথ তাকে সোজা ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে- যে পথে সে তার যাবতীয় মূলধন ও যোগ্যতা নিয়োজিত করেছে, এ পথে সে কোনোক্রমেই সাফল্য অর্জন করতে পারবে না বরং উল্টো তাকে মহাক্ষতির সম্মুখীন হতে হচ্ছে, তাহলে এই ধরনের ব্যক্তির তুলনায় অধিক ক্ষতিগ্রস্ত বা অধিক ব্যর্থ আর কে হতে পারে? বর্তমানে যারা আল্লাহর বিধান ত্যাগ করে কৃত্রিম সফলতা অর্জনের পথে যাবতীয়-কিছু বিনিয়োগ করছে, তাদের অবস্থাও অনুরূপ। পরকাল হবে না এবং পৃথিবীর জীবনের কোনো কর্মের হিসাব কারো কাছে কখনোই দিতে হবে না। এই চিন্তা-বিশ্বাস অনুসারে পৃথিবীতে জীবন পরিচালিত করেছেন, বৈধ-অবৈধের কোনো সীমা এরা মানেনি, যেকোনো পথে ধনসম্পদ অর্জন ও ব্যয় করেছে, জীবন-যৌবনকে দ্বিধাহীনচিত্তে আকণ্ঠ ভোগ করেছে, এসব লোকই পরকালীন জীবনে ভয়াবহ ক্ষতির সম্মুখীন হবে। মহান আল্লাহ বলেন, “প্রকৃতপক্ষে বড়ই ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে সেসব লোক, যারা আল্লাহর সাক্ষাৎ সম্ভাবনাকে মিথ্যা মনে করে অমান্য করেছে” (সূরা ইউনুস: ৪৫)।
এই পৃথিবীতে মানুষ পরকালভিত্তিক জীবন পরিচালনা করতে সক্ষম হলেই কেবলমাত্র সফলতা অর্জন করতে সক্ষম হবে। কারণ একমাত্র পরকালের ভয় তথা পৃথিবীর যাবতীয় কর্মের ব্যাপারে আদালতে আখিরাতে আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে, এই অনুভূতিসম্পন্ন লোকদের পক্ষেই এই পৃথিবীকে একটি শান্তির নীড় হিসেবে গড়া সম্ভব। আর যাদের ভেতরে সেই অনুভূতিই নেই, তারাই মানবসমাজের বিভিন্ন স্তরে নেতৃত্বের আসনে আসীন হয়ে বিপর্যয় সৃষ্টি করে এবং এরাই হলো সব থেকে ক্ষতিগ্রস্ত এবং ব্যর্থ। আল্লাহ তা'য়ালা বলেন, "ক্ষতিগ্রস্ত হলো সেসব লোক, যারা আল্লাহর সাথে তাদের সাক্ষাৎ হওয়ার খবরকে মিথ্যা মনে করেছে” (সূরা আনআ'ম: ৩১)। আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের দৃষ্টিতে ঐ ব্যক্তিই সব থেকে সফলতা অর্জন করলো, যে ব্যক্তি তার গোটা জীবনকালব্যাপী আপন স্রষ্টা মহান আল্লাহর অনুগত হয়ে নিজের জীবন পরিচালিত করলো তথা সূরা আসরে বর্ণিত চারটি গুণ নিজের জীবনে বাস্তবায়িত করলো। যদিও সে ব্যক্তি পৃথিবীতে চরম অভাবের ভেতরে জীবন অতিবাহিত করেছে তবুও সে তার স্রষ্টা মহান আল্লাহর দৃষ্টিতে সফলতা ও কল্যাণ অর্জন করেছে। আল্লাহ তায়ালা সূরা আসরে উল্লেখ করেন, "সময়ের কসম, নিশ্চয় মানুষ ক্ষতির মধ্যে নিমজ্জিত। তবে তারা ছাড়া যারা ঈমান এনেছে ও সৎকাজ করতে থেকেছে এবং পরস্পরকে হক কথা ও সবর করার উপদেশ দিতে থেকেছে"।
কারুন ছিল অত্যন্ত ধনাঢ্য ব্যক্তি। হযরত মুসা (আ)-এর সময় তার ধনসম্পদ ও বিত্তবৈভবের কথা প্রবাদের মতো ছিল। আল্লাহ পৃথিবীতেই তা দিয়ে দেন। সফলতা ও ব্যর্থতার প্রকৃত মানদণ্ড যাদের জানা ছিল না বা যারা পৃথিবীর জীবনে সম্মান-মর্যাদা ও বিপুল ধন-ঐশ্বর্যের অধিপতি হওয়াকেই প্রকৃত সফলতা বলে বিশ্বাস করতো, তারা ধারণা করতো, লোকটি বড়ই সফল ব্যক্তি- লোকটি জীবনে সফলতা অর্জন করেছে। তারা আক্ষেপ করে বলতো, আমরাও যদি লোকটির অনুরূপ সফলতা অর্জন করতে পারতাম! ভ্রান্তিতে নিমজ্জিত এই মূর্খ লোকগুলোর মূর্খতা দেখে হকপন্থীরা তাদেরকে বলতো, "তোমরা যাকে সফলতা বলে ধারণা করছো তা সফলতা নয়। প্রকৃত সফলতা হলো মহান আল্লাহর প্রতি ঈমান আনা এবং আমলে সালেহ করা। আর ঈমান আনা ও আমলে সালেহ করা কেবলমাত্র তাদের পক্ষেই সম্ভব, যারা ধৈর্যশীল" হকপন্থীরা কিভাবে 'হক'-এর দাওয়াত দিয়েছিল, মহান আল্লাহ তা'য়ালা এ প্রসঙ্গে কুরআনে বলেন, "কিন্তু যাদেরকে জ্ঞান দেয়া হয়েছিল তারা বলতে লাগলো, তোমাদের অবস্থা দেখে আফসোস হয়। আল্লাহর সওয়াব তার জন্য ভালো যে ঈমান আনে ও সৎকাজ করে, আর এ সম্পদ সবরকারীরা ব্যতীত আর কেউ লাভ করতে পারে না" (সূরা কাসাস: ৮০)।
মানুষের ভেতরে যে ধারণা প্রচলিত রয়েছে, অর্থসম্পদ ও বিত্তবৈভবের অধিকারী ব্যক্তি মাত্রই সম্মান ও মর্যাদার অধিকারী, অর্থসম্পদ ও প্রভাব-প্রতিপত্তিই হলো সম্মান এবং মর্যাদার মানদণ্ড- এই ভ্রান্ত ধারণার তীব প্রতিবাদ করা হয়েছে সূরা আল ফজর-এর ১৭ থেকে ২০ নম্বর আয়াতসমূহে। ১৭ নম্বর আয়াতের প্রথম শব্দটিতেই বলা হয়েছে, 'কাল্লা' অর্থাৎ কখনো নয় বা এমনটি নয়। অর্থাৎ তোমরা যে ধারণা অনুসারে অর্থসম্পদ ও প্রভাব-প্রতিপত্তিকেই সম্মান ও মর্যাদা লাভের একমাত্র মানদণ্ড বানিয়ে নিয়েছো, তা সত্য নয়। এসব বিষয় সম্মান ও অসম্মানের মানদণ্ড কখনো হতে পারে না। কোন ব্যক্তির চরিত্র উন্নত না নিকৃষ্ট, তা বিবেচনা না করেই এবং এর মধ্যে যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে তা বিচার-বিবেচনায় না এনে একমাত্র অর্থসম্পদ ও প্রভাব-প্রতিপত্তিকেই সম্মান-মর্যাদা ও অপমানের মানদণ্ড বানিয়ে নিয়েছো, এটা তোমাদের মারাত্মক ভুল ধারণা আর বুদ্ধির দৈন্যতা ব্যতীত আর কিছুই নয়। দুনিয়াতে যেসব ছাত্র পরীক্ষা দেয় তারা পরীক্ষার রেজাল্ট পায়। মার্কশিটে প্রত্যেক বিষয়ের নাম্বার লেখা থাকে। সার্টিফিকেটে লেখা থাকে সে কোন গ্রেডে পাস করেছে। আখিরাতেও প্রত্যেকে নিজের আমলনামায় সবকিছু লেখা পাবে। আল্লাহ তায়ালা এ সম্পর্কে বলেন, "আমি প্রত্যেক মানুষের কর্মকে তার গ্রীবালগ্ন করে রেখেছি। কেয়ামতের দিন বের করে দেখাব তাকে একটি কিতাব, যা সে খোলা অবস্থায় পাবে। (এবং তাকে বলা হবে) পাঠ কর তোমার কিতাব! আজ তোমার হিসাব গ্রহণের জন্য তুমিই যথেষ্ট” (সূরা বনি ইসরাইল: ১৩-১৪)।
সেদিন প্রত্যেকে নিজ নিজ আমলনামা দেখবে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা বলেন, "নিশ্চয়ই সেদিন প্রত্যেক ব্যক্তি নিজের কৃতকর্মের ফল পাবে। চাই তা ভালো হোক বা মন্দ। সেদিন তারা কামনা করবে যে, এ দিনটি যদি তাদের নিকট হতে অনেক দূরে অবস্থান করতো; তবে কতোই না ভালো হতো" (সূরা আলে ইমরান : ৩০)। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ আরও বলেন, "সেদিন তোমাদেরকে উপস্থিত করা হবে। তোমাদের কোনো কিছু গোপন থাকবে না” (সূরা আল হাক্কাহ: ১৮)। মানুষ আমলনামা দেখে অবাক হয়ে যাবে। কারণ আমলনামায় ছোট বড় সব কিছু লেখা থাকবে। কে কখন কাকে সামান্য উপকার বা ক্ষতি করেছে, কে কখন সামান্য নেকি বা বদির কাজ করেছে সব কিছুই দেখতে পাবে। নিজের আমলনামা দেখে অপরাধীরা বলার চেষ্টা করবে, এসব অপরাধ আমি করিনি। ফেরেশতারা অতিরিক্ত লিখেছে। তখন আল্লাহ তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে বলবে, তোমরা সাক্ষী দাও। তখন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সাক্ষ্য দিবে এবং সবকিছু খুলে বলবে। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ তা'য়ালা বলেন, “আজ আমি তাদের মুখে মোহর এঁটে দেবো আর তাদের হাত আমার সাথে কথা বলবে এবং তাদের পা তাদের কৃতকর্মের সাক্ষ্য দেবে” (সূরা ইয়াসিন : ৬৫)।
ব্যক্তির ক্ষেত্রে তার ঘাম, শ্রম, ত্যাগেরই হিসাব বিশ্লেষণ করে সফলতার মাপকাঠি নিরূপণ করা হয়। কিন্তু সমষ্টিগত সফলতা অর্জনে দলের প্রত্যেকেরই প্রচেষ্টার খতিয়ান পর্যালোচনা করে সফলতা নিরূপণ করা হয়। সমষ্টিগত কোনো সাফল্য অর্জনে দলের সবারই প্রচেষ্টা কম বেশি থাকে। যখন সমষ্টির কোনো একজন দলগত সাফল্যে যথেষ্ট ভূমিকা না রাখেন তখন তার ব্যর্থতা সাফল্যের হাওয়ায় ঢাকা পড়ে যায়। কিন্তু তার মানে এই নয় যে সমষ্টিগত প্রচেষ্টায় কম প্রচেষ্টাকারী ব্যক্তিটিও সফল। বিপরীত দিকে সমষ্টিগত প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলেও দলের কোনো ব্যক্তি যদি তার সর্বোচ্চ উজাড় করে দিয়ে চেষ্টা করেন তাহলে ব্যক্তি হিসেবে সমষ্টির ভেতর তিনি অবশ্যই সফল। যারা দ্বীন বিজয়ের সাফল্য অর্জনের লক্ষ্যে কাজ করেন তারা যদি তাদের সর্বোচ্চ উজাড় করে দিয়ে দ্বীন বিজয়ের জন্য ভূমিকা রাখেন তাহলে দ্বীন বিজয়ের সাফল্য অর্জিত হোক বা না হোক ব্যক্তি হিসেবে নিশ্চিতভাবে তিনি সফল। কারণ দ্বীন বিজয়ের সাফল্য অর্জনের কর্মপ্রচেষ্টার অংশ হিসেবে তিনি সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন। তার এই প্রচেষ্টার ফলাফল হচ্ছে তিনি পরকালীন জিন্দেগিতে জান্নাতের অধিকারী হবেন। আবার দ্বীন বিজয় হয়ে গেল কিন্তু ব্যক্তি দলের সাথে থেকেও তার জান্নাত অর্জন নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হলেন তাহলে তার গোটা জিন্দেগিটাই ব্যর্থ। কারণ আখিরাতের ব্যর্থতাই চূড়ান্ত ব্যর্থতা আর আখিরাতের সফলতাই চূড়ান্ত সফলতা। মহান আল্লাহ আমাদেরকে পরকালীন সফলতা তথা জান্নাত-উপযোগী মানুষ হিসেবে নিজেদের প্রস্তুত করার তাওফিক দিন, আমিন।