📄 অভিমান, অভিযোগ নয় সহানুভূতির দৃষ্টি প্রসারিত করুন
মানুষ একা চলতে পারে না। সামাজিক জীব হিসেবে জীবন পরিচালনায় মানুষকে একে অপরের প্রতি নির্ভরশীল হতে হয়। সমাজে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করতে হলেও গড়ে তুলতে হয় পারস্পরিক সেতুবন্ধ। ব্যক্তিগতভাবেও সফলতার জন্য মানুষকে একে অপরের প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়াতে হয়। যেকোন ক্ষেত্রে বসবাসরত মানুষের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা তাদের যে কোন সাফল্য অর্জন পথে সহায়ক হয়। ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা মানুষের একটি বিশাল শক্তি। এই শক্তি সকল বাধাকে তুচ্ছ করে সাফল্য ছিনিয়ে আনতে মানুষকে সহায়তা করে। মানুষের এই পারস্পরিক সেতুবন্ধন তথা শক্তিশালী সম্পর্কের মাঝেও বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন কারণে ফাটল দেখা দেয়, বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। সম্পর্কের চিড় ধরে। ফলে মানুষ ঐক্যবদ্ধ সেতুবন্ধনের পরিবর্তে পারস্পরিক কিংবা দলগত বিভেদে জড়িয়ে পড়ে, একতা শৃঙ্খলার পরিবর্তে বিশৃঙ্খল পরিবেশ তৈরি করে। সাফল্য ছিনিয়ে আনার পরিবর্তে বিভাজন ডেকে আনে। কিছু অর্জনের পরিবর্তে অনেক কিছু হারিয়ে ফেলে। সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির পরিবর্তে পরস্পরের মাঝে বিভেদ বিভাজনের দেয়াল তৈরি হয়।
সেতুবন্ধনের পরিবর্তে পারস্পরিক বিভেদ বিভাজনের দেয়াল তৈরিতে যে কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে তার মধ্যে অন্যতম হলো অভিমান কিংবা অভিযোগ দাঁড় করানো। পারস্পরিক কথাবার্তা, চলাফেরা, লেনদেন, আচার-আচরণ এবং আনুগত্যে যখন অভিমান কিংবা অভিযোগ একে অপরের প্রতি দাঁড় করানো শুরু হয়ে যায় তখন সেখানে সহনশীল ও সহানুভূতির পরিবেশের পরিবর্তে একটি অসহনশীল পরিবেশ তৈরি হয়। ফলে পারস্পরিক সম্পর্ক ছিন্ন হয়। বিভেদ ও বিভাজনের নানা উপসর্গও নতুন নতুন করে তৈরি হয়। সম্প্রীতি ও ভালোবাসার পরিবর্তে হিংসা ও বিদ্বেষ স্থান করে নেয়। আনুগত্যপরায়ণতার পরিবর্তে আনুগত্যহীন আচরণ শুরু হয়ে যায়। গিবত বা পরনিন্দার চর্চাও শুরু হয়ে যায়। ফলে পারস্পরিক সম্পর্কের সেতুবন্ধনে সামগ্রিক এক বিপর্যয় নেমে আসে।
পারস্পরিক সম্পর্কের বিপর্যয় শুরু হয় কিন্তু সামান্য ভুল দিয়ে, তুচ্ছ ঘটনা দিয়ে। মানুষ যখন কাজ করে তখন কাজের সময় মানুষের ভুল-ভ্রান্তি হতে পারে। ভুল-ভ্রান্তি হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। অস্বাভাবিক হলো, কাজের সময় ঘটে যাওয়া ছোটখাটো ভুল কিংবা ভ্রান্তিগুলোকে স্বাভাবিকভাবে না নেয়া। আমাদের মাঝে অনেকেই আছেন যারা তার সহকর্মী কিংবা অধস্তনের ছোটখাটো ভুলগুলোকেও একদম সহ্য করতে পারেন না। এ ধরনের মানসিকতা কখনোই কাজের সুশৃঙ্খল পরিবেশের জন্য কল্যাণকর হতে পারে না। বরং অন্যের ভুল-ভ্রান্তি ও সীমাবদ্ধতাকে সহনশীল ও সহানুভূতির দৃষ্টিতে দেখাই কল্যাণকর। ভুলগুলোকে ক্ষমা করে সংশোধনের সুযোগ করে দেয়ার মাঝেই রয়েছে বিশাল মহত্ত্ব। এ প্রসঙ্গে মহাগ্রন্থ আল কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, “অতঃপর যে ক্ষমা করে দেয় এবং সংশোধন করে নেয়, তার বিনিময় আল্লাহর নিকট রয়েছে” (সূরা শুরা : ৪০)। হযরত যাবের (রা.) থেকে বর্ণিত- রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “যখন কোন ব্যক্তি তার অপরাধের জন্য কোন মুসলমান ভাইয়ের নিকট ক্ষমা প্রার্থী হয়, যদি সে ক্ষমা না করে অথবা গ্রহণ না করে তাহলে তার অপরাধ অত্যাচারী কর আদায়কারীর মতো” (বায়হাকি)।
অভিমান, অভিযোগ পারস্পরিক সম্পর্ক ছিন্ন করার পথ তৈরি করে। হিংসা-বিদ্বেষ আর শত্রুতা বাড়ায়। সহনশীল আর সহানুভূতির দৃষ্টিই পারে এসব কিছু থেকে পরস্পরকে রক্ষা করতে। এক্ষেত্রে আল্লাহর রাসূল (সা) এবং তার সাহাবাদের মাঝে পারস্পরিক সহানুভূতির দৃষ্টান্তই শ্রেষ্ঠ উদাহরণ। মহাগ্রন্থ আল কুরআনে বলা হয়েছে, “আল্লাহর রাসূল (সা) এবং তার সাথীরা কাফেরদের প্রতি অত্যন্ত কঠোর। কিন্তু পরস্পরের প্রতি পূর্ণ অনুগ্রহশীল” (সূরা ফাতাহ : ৩৯)। অপর একটি আয়াতে এসেছে, "তারা মু'মিনদের প্রতি নম্র ও বিনয়ী হবে এবং কাফেরদের প্রতি হবে অত্যন্ত কঠোর” (সূরা মায়েদা: ৫৪)। আমাদের মাঝে এমন অনেকেই আছেন যারা সামান্য অভিমান কিংবা তুচ্ছ অভিযোগকে লালন করতে করতে তা হিংসা কিংবা বিদ্বেষে রূপান্তরিত করেন, যা আপন ভাইকেও সম্পর্ক থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। হযরত আনাস (রা) থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে এসেছে, নবী করীম (সা) বলেছেন, "তোমরা পরস্পর হিংসা-বিদ্বেষ ও শত্রুতা পোষণ করো না, দেখা-সাক্ষাৎ বর্জন করো না এবং সম্পর্ক ছিন্ন করো না, আল্লাহর বান্দারা ভাই ভাই হয়ে বসবাস কর, কোন মুসলমান তার অন্য মুসলমান ভাইয়ের সাথে তিন দিনের বেশি বিচ্ছিন্ন থাকা বৈধ নয়” (বুখারি ও মুসলিম)। কুরআনে এসেছে, "মু'মিনগণ পরস্পর ভাই ভাই। অতএব ভাইদের সম্পর্ক পুনর্গঠিত করে দাও” (সূরা হুজুরাত ১০)।
অভিমান, অভিযোগের পরিবর্তে মানুষ মানুষের জন্য ক্ষমা, দয়া, সহনশীল এবং সহানুভূতিশীল হবে এটি সৎপ্রবৃত্তির নান্দনিক দিক। মুসলিম চরিত্রের নান্দনিক বহিঃপ্রকাশ তো এমনই হওয়া উচিত। রাসূল (সা) বলেছেন, “সেই প্রকৃত মুসলিম যে নিজের জন্য যা পছন্দ করে তার ভাইয়ের জন্যও তা-ই পছন্দ করে" কেউ যেমন নিজের সাফল্যের জন্য অন্যের সহযোগিতা চাইবে তেমনি অপরের সফল্যের জন্যও তাকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিবে। কারণ ব্যক্তিগত সফলতার জন্যও একে অন্যের সহযোগিতা প্রয়োজন। পরস্পর সহযোগিতা না থাকলে কেউ কোন দিন সাফল্য অর্জন করতে পারে না, সমাজও লাভবান হতে পারে না। সহনশীলতা ও সহানুভূতি মানবজীবনের শ্রেষ্ঠ গুণ। যিনি ভদ্র, মর্যাদাবান তিনি সহানুভূতিসম্পন্ন মানুষ হবেন এটাই স্বাভাবিক। তিনি অন্যের মন জয় করতে চান তারতো সহনশীল আচরণ না করে উপায় নেই। সহনশীলতা ও সহানুভূতি যারা দেখাতে পারে না তাদেরকে সফল ব্যক্তিত্ব কিংবা মর্যাদাবান মানুষ বলার কোনো সুযোগ নেই। আমরা যদি পরস্পরের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করি তাহলে সমাজ থেকে অনেক দুঃখ, অনেক কষ্ট দূর হয়ে যাবে। প্রত্যেক মুসলমান ভাই ভাই, সুতরাং প্রত্যেকের সাথে আচরণের ক্ষেত্রে এটি মূল প্রতিপাদ্য হওয়া উচিত। যেমন আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা) বর্ণিত হাদিসে রাসূল (সা) বলেছেন, "মুসলমান পরস্পর ভাই, সুতরাং সে তার ভাইয়ের ওপরে কোন প্রকার জুলুমও করতে পারে না এবং তাকে অসহায় অবস্থায়ও ফেলতে পারে না। আর যে তার মুসলমান ভাইয়ের অভাব পূরণ করবে, আল্লাহ তার অভাব পূরণ করবেন। অনুরূপভাবে যে কোন মুসলমানের দুঃখ দূর করে দিবে আল্লাহ কিয়ামতের দিন তার দুঃখ দূর করে দিবেন। আর যে ব্যক্তি কোন মুসলমানের ত্রুটি গোপন করে রাখবে, আল্লাহ হাশরের দিন তার ত্রুটিও গোপন করে রাখবেন" (বোখারি ও মুসলিম)।
অপর ভাইয়ের ত্রুটি তাকেই সংস্কারের উদ্দেশ্যে ধরিয়ে না দিয়ে কিংবা গোপন না রেখে তার অগোচরে বলে বেড়ানোই গিবত। গিবত পারস্পরিক সম্পর্কের ভিত্তিকে ধ্বংস করে সামাজিক পরিবেশকে মারাত্মকভাবে নষ্ট করে তোলে। অভিমান, অভিযোগের জায়গা থেকেই গিবতের জন্ম নেয়। সহানুভূতির পরিবেশ নষ্ট করে সম্পর্কের অবনতি ঘটায়। গিবত ব্যভিচারের চাইতেও মারাত্মক। হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রা) হতে বর্ণিত, রাসূল (সা) বলেছেন, "গিবত হলো ব্যভিচারের চেয়েও মারাত্মক। সাহাবাগণ বললেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা) গিবত কি করে ব্যভিচারের চেয়েও মারাত্মক? হুজুর (সা) বললেন, কোন ব্যক্তি জেনা করার পর যখন তওবা করে আল্লাহ তার তওবা কবুল করেন। কিন্তু গিবতকারীকে যার গিবত করা হয়েছে সে যদি মাফ না করে আল্লাহ মাফ করবেন না" (বায়হাকি ও মেশকাত)। হযরত আবু হুরাইরা (রা) হতে বর্ণিত, একদা নবী করীম (সা) বললেন, "গিবত হলো তুমি তোমার মুসলমান ভাইয়ের বর্ণনা (তার অনুপস্থিতিতেই) এমনভাবে করবে যে, সে তা শুনলে অসন্তুষ্ট হবে। অতঃপর হুজুর (সা)-কে প্রশ্ন করা হলো- হে আল্লাহর নবী! আমি যা কিছু বলব তা যদি আমার ভাইয়ের মধ্যে পাওয়া যায়। সেক্ষেত্রেও কি গিবত হবে? হুজুর (সা) জবাব দিলেন, “তুমি যা বলছ তা যদি তার মধ্যে পাওয়া যায় তাহলেও সেটা গিবত হবে। আর যদি না পাওয়া যায় তাহলে তা হবে বোহতান "(মুসলিম)। আর বোহতান করা মারাত্মক অপরাধ। অপর হাদিসে এসেছে একের কথা অপরের কাছে বলে বেড়ানো হচ্ছে চোগলখুরি আর রাসূল (সা) এ জঘন্য পাপটি পরিহার করার নির্দেশ দিয়ে বলেছেন, চোগলখোর বেহেস্তে প্রবেশ করতে পারবে না।
অভিযোগ সমালোচনা করলে এগুলো ব্যক্তির আত্মসম্মানে আঘাত লাগে। তাই বলে এর অর্থ এই নয় যে, কখনো কারোর সমালোচনা করা যাবে না, কিংবা অভিযোগ করা যাবে না। বিষয়টি আসলে তা নয় বরং এহতেসাব তথা সংস্কারের উদ্দেশ্যে সমালোচনার পদ্ধতিতে পরিশুদ্ধতা করা যেতে পারে। অভিযোগ কিংবা সমালোচনা হবে সংশোধন করার দৃষ্টিভঙ্গিতে, হেয় কিংবা কষ্ট দেয়ার উদ্দেশ্যে নয়। অভিযোগের পাশাপাশি ব্যক্তির প্রতি সহানুভূতি ও সহনশীলতার দৃষ্টিও রাখতে হবে। জনসম্মুখে অভিযোগ না দিয়ে নিজেদের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে উপস্থাপন করতে হবে। ভালো কাজের প্রশংসা করে সমাধানের পথ খুঁজে পেতে নিজ থেকেই যথাযথ সহযোগিতার হাত আন্তরিকভাবে বাড়িয়ে দিতে হবে। কিছু লোক আছে যাদের স্বভাবই হলো শুধুই অভিযোগ করা, প্রতিটি দিনকেই তারা সমস্যাগ্রস্ত দেখেন, প্রতিটি মানুষকেই তারা কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে চান। অথচ অভিযোগের ভালো পদ্ধতি হচ্ছে অভিযুক্তকে সংশোধন করার নিয়তে সুযোগ দেয়া, নিজের আন্তরিকতার প্রকাশ ঘটানো। ইমাম রাযী বলেছেন, “ক্ষমা করে দেয়াটাই সর্বোত্তম প্রতিশোধ। অভিমান অভিযোগের পরিবর্তে একে অপরের প্রতি সহানুভূতির দৃষ্টি প্রসারিত করা কর্তব্য। কারণ বোকা ও দুর্বলরাই অভিমান এবং অভিযোগ করে, এক্ষেত্রে বুদ্ধিমান হওয়াই শ্রেয়"
📄 সদা হাস্যোজ্জ্বল থেকে আচরণে আন্তরিক হোন
মানুষ সামাজিক জীব। সামাজিক জীব হিসেবেই প্রতিনিয়ত তাকে সমাজের অন্যান্য মানুষের সাথে চলতে ফিরতে হয়, কথা বলতে হয়। এটি মানুষের জীবনাচরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় সুশৃঙ্খল পরিবেশ বজায় রাখার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। গুরুত্বপূর্ণ এ অধ্যায়ে, শুধুমাত্র আচরণের কারণেই একজন আরেকজনের বন্ধু হয়, একজন আরেকজনের শত্রু হয়, একজন আরেকজনকে কাছে টেনে নেয়, একজন আরেকজনকে দূরে ঠেলে দেয়। আচরণের এই ভিন্নতার কারণেই মানুষের পরিচয়ও ভিন্নভাবে ফুটে ওঠে। ফুটে ওঠে মানুষের রুচিবোধের বৈশিষ্ট্য। মানুষ যা করে তা করতে গিয়ে যদি ভদ্র, মার্জিত ও সুন্দর আচরণের আশ্রয় নেয় তবে তাতেই বিকশিত হয় তার রুচিবোধ। কারণ, মানুষের আচরণই তার অন্তরের অনুভূতির প্রকাশ, মানুষের মধ্যে কে ভালো, কে মন্দ তা নির্ভর করে তার অন্তরের অনুভূতি থেকে প্রকাশিতব্য আচরণের ওপর। আমার আর আপনার মূল পরিচয় শুধুমাত্র বাহ্যিক আচরণে ফুটে ওঠে না, এটা হয়তো সাময়িক কোনো খ্যাতি দিতে পারে। কিন্তু আমার আপনার ভেতরকার মানুষটির প্রকৃত আচরণই মূল পরিচয় বহন করে। সর্বোত্তম চরিত্রের অধিকারী মহামানব রাসূল (সা) তার বক্ষের দিকে ইঙ্গিত করে বলেছেন, "আত্তাকওয়া হাহুনা" অর্থাৎ মুত্তাকির পরিচয় এখানে (অন্তরে), তার বাহ্যিক চাল-চলন বা আচরণে নয় বরং তার ভেতরকার বিষয় ফুটে ওঠার মাধ্যমে প্রকাশ হয়।
মানুষের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় আচরণগত দিকের সৌন্দর্য ফুটে ওঠে সদা হাস্যোজ্জ্বল থাকার মাধ্যমে। যিনি সদা হাস্যোজ্জ্বল থেকে আচরণে আন্তরিক হতে পারেন তিনিই সবার হৃদয় জয় করতে পারেন, সবাইকে কাছে টানতে পারেন। আচরণের সাথে সদা হাস্যোজ্জ্বল থাকার ঘনিষ্ঠ যোগসূত্র রয়েছে। একজন দায়িত্বশীল মানুষ তার অধীনস্থদের কাছে টানার ক্ষেত্রে কতটুক সফল হবেন তা নির্ভর করবে তার সদা হাস্যোজ্জ্বল আচরণের ওপর। সদা হাস্যোজ্জ্বল থেকে যদি আচরণে আন্তরিক হওয়া যায় তাহলে সবার সাথে ঘনিষ্ঠ হওয়া সম্ভব এবং সবাইকে কাছে টানাও সম্ভব। যিনি সবাইকে কাছে টানতে পারেন তিনি সহজেই সবার প্রিয়ভাজন হতে পারেন।
মানুষ স্বীয় চরিত্রে পরস্পরকে আপন করে নেয়। সদগুণাবলি অলঙ্কারস্বরূপ। নিজের মাঝে লুকিয়ে থাকা সদগুণাবলিগুলোকে সদা হাস্যোজ্জ্বল থেকে আচরণে বিকশিত হওয়ার সুযোগ দেয়া উচিত। কারণ, সদালাপ, সদগুণাবলি বিকাশেই কল্যাণ নিহিত। বদগুণাবলি তথা বদঅভ্যাস বিকাশে কোনো গৌরব নেই। কারো সাথে যখন সাক্ষাৎ হয় এবং কথা বলার সুযোগ সৃষ্টি হয় তখন হাস্যোজ্জ্বল থেকে আন্তরিকভাবে কথা বলার সুযোগ হাতছাড়া করা উচিত নয়। সাক্ষাৎদাতা এবং সাক্ষাৎপ্রত্যাশী উভয়েই আন্তরিক সম্ভাষণ কামনা করেন। আন্তরিক সম্ভাষণ আর হাসিমুখে কথা বলা অন্যের সাথে ঘনিষ্ঠতা বাড়ায়। সাক্ষাৎকে ফলপ্রসূ করতে হলে একটি বিষয় স্মরণ রাখতে হবে, তা হলো সাক্ষাতের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় হবে হাসিমুখে আন্তরিকতা বিনিময় করা।
কথার যেমন মূল্য আছে তেমনি কথার মাধ্যমে মানুষের যে আচরণ প্রকাশ পায় তার মূল্যও অনেক বেশি। কারণ যথার্থ আচরণ ছাড়া মূল্যবান কথাও অর্থহীন হয়ে যায়। একজনের সাথে সাক্ষাৎ করার সময় গুরুত্বপূর্ণ কথা বলতে গিয়ে যদি গুরুত্বহীন তথা মূল্যহীন ও অমূলক আচরণ করা হয় তখন গুরুত্বপূর্ণ কথাটাই বলার আর সুযোগ থাকে না। বাচালতা, মিথ্যা আর মলিনতার আশ্রয় নিয়ে কথা বলার চেয়ে চুপ থাকাই ভালো। যারা এসবের আশ্রয় নেয় তারা রাসূল (সা) এর কাছে সবচেয়ে ঘৃণিত হিসেবে বিবেচিত হন। এ প্রসঙ্গে হযরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রা) থেকে একটি হাদিস বর্ণিত হয়েছে, রাসূল (সা) বলেছেন, "তোমাদের মধ্যে যেসব লোক বাচাল, দুর্বোধ্য ভাষায় এবং অহঙ্কারের সাথে কথা বলে তারা আমার কাছে সবচেয়ে ঘৃণিত এবং কিয়ামতের দিন তারা আমার থেকে অনেক দূরে থাকবে” (তিরমিজি)।
অসহিষ্ণু হয়ে কথা বলা, প্রশ্নের উত্তর দেয়া, সামান্য কারণেই তেতে ওঠা এসবই সৌন্দর্য, শৃঙ্খলা ও আন্তরিকতার বিপরীত। এগুলো সাফল্য অর্জনের ক্ষেত্রে বড় অন্তরায়। কারণ, এতে পারস্পরিক আস্থা ও সম্পর্কের ভিত নড়বড়ে করে দেয়। সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশকেও মুহূর্তে বিশৃঙ্খল করে দেয়। সদা হাস্যোজ্জ্বল চেহারায় কথা বলতে পারাটা মার্জিত রুচির পরিচয় বহন করে। ভদ্রতার পরিবেশ বজায় রাখে। বিরুদ্ধবাদীদের বিরুদ্ধে কথা কিংবা গালি শোনা মাত্রই উগ্র হয়ে ওঠা কিংবা ক্রোধ নিয়ে জবাব দেয়ার মধ্যে কোনো সফলতা নেই। সামান্য একটু অপমান কিংবা অবহেলায় উত্তপ্ত না হয়ে একটু অপেক্ষা করা, ধৈর্য ধারণ করা উচিত। এ বিষয়ে মহান আল্লাহ তায়ালা সূরা ফুরকানের ৬ নম্বর আয়াতে বলেন, আর তাদেরকে যখন অজ্ঞ ব্যক্তিরা সম্বোধন করে তখন তারা বলে সালাম (তোমাদের ওপর শান্তি বর্ষিত হোক)।
যদি কারো সাথে বিতর্কও করতে হয় তবে তা করতে হবে উত্তম পন্থায়। কেননা মানুষের মধ্যে সর্বোত্তম তারাই যারা উত্তম পন্থা অবলম্বন করে। সূরা নাহলের ১২৫ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেন, "আর লোকদের সাথে পরস্পর বিতর্ক কর উত্তম পন্থায়” তর্ক করার অর্থ হলো হেরে যাওয়া যুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাওয়া। তর্কে আসলে জেতা যায় না শুধু মনের তুষ্টি অর্জন করা যায়। এখানে জিতলেও আপনি হারবেন আর হারলে তো কথাই নেই। যত তর্কে জিতবেন তত আপনার কাছ থেকে লোক দূরে সরে যাবে, দিন দিন আপনি বন্ধু হারাবেন। সূরা আনকাবুতের ৪৬ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, "তোমরা সুন্দর পন্থা ব্যতীত আহলে কিতাবদের সাথে বিতর্ক করো না” মুজাদ্দেদ-ই-আল ফেসানি (রহ) বলেছেন, "ভালো কথা বন্ধুদের পর্যন্ত পৌঁছাতে চেষ্টা কর। বিরুদ্ধবাদীদের সাথে বিতর্কে অবতীর্ণ হয়ো না" সূরা লোকমানের ১৮ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, "আর লোকদের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে কথা বলো না" মানবতার মহান শিক্ষক রাসূল (সা)-এর আচরণেও ছিল বদমেজাজ ও কাঠিন্যতা পরিহার। তাইতো তিনি সবাইকে কাছে টেনে নিয়েছেন, আপন করে নিতে পেরেছেন। এ প্রসঙ্গে সূরা আলে ইমরানের ১৫৯ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ রাসূল (সা)-কে উদ্দেশ করে বলেন, "আল্লাহর রহমতেই আপনি তাদের জন্য নরম দিল ও সুহৃদয় হয়েছেন। যদি বদমেজাজি ও কঠিন হৃদয়ের হতেন তবে লোকেরা আপনার কাছ থেকে দূরে সরে যেতো"
অনেক সময় আপনার আমার অহঙ্কার আর আত্মম্ভরিতাপূর্ণ আচরণের কারণে লোকেরা দূরে সরে যায়। আপনার জ্ঞান-গরিমা, সম্মান-মর্যাদা, বুদ্ধি-বিবেক বেশি বলে নিজেকে আলাদাভাবে উপস্থাপন করবেন তা হতে পারে না। বরং তা আপনাকে আরো ছোট করে তুলবে। মেধাহীন দুর্বলের সাথে রূঢ় আচরণ করবেন তা হতে পারে না বরং সেটা আপনার অর্জনকে ধ্বংস করে দেবে। আপনি বড় মানুষ বলে অন্যের সাথে 'দেমাগ' দেখিয়ে কথা বলবেন, নিজেকে অন্য উচ্চতায় রাখার চেষ্টা করবেন! এমন হলে আপনার কাছ থেকে সবাই দূরে সরে যাবে। জ্ঞান-গরিমাই সবকিছু নয় বরং আচরণ দেখেই বোঝা যায় ব্যক্তিটি কতটা সম্মানিত আর কতটা সুন্দর মনের অধিকারী। হাদিসে এসেছে, একবার হযরত জাবির ইবনে সুলাইম (রা) রাসূল (সা)-এর কাছে উপদেশ চাইলে রাসূল (সা) বললেন- কাউকে কখনো গালিগালাজ করো না। জাবির বলেন, এরপর আমি কখনো আজাদ, গোলাম এমনকি উট, বকরিকেও গালি দেইনি। রাসূল (সা) আরো বললেন- ভালো ও নেকির কোনো কাজকে তুচ্ছজ্ঞান করো না, তোমার ভাইয়ের সাথে হাসিমুখে কথা বলবে, প্রতিদিনের ছোট ছোট কথা, ছোট ছোট ব্যবহার, একটুখানি সৌহার্দ্যপূর্ণ আচরণে ব্যক্তির মর্যাদা, মনুষ্যত্ব ও ব্যক্তিত্বের বহিঃপ্রকাশ ঘটে।
যিনি তার জীবনের পথচলায় মিথ্যা কথা, নিষ্ঠুর বাক্য ও প্রতারণা থেকে মুক্ত থেকে অন্যের সাথে আচরণ করতে পারেন তার জীবনটা সত্যিই সার্থকজীবন। হাস্যোজ্জ্বল আচরণে যদি আপনি দোষশূন্য নির্মল ও মহৎ আচরণ করেন তাহলে দেখবেন দুরাচার, দুষ্ট লোকও লজ্জায় আপনার সামনে বিনয়ী থাকবে। যিনি এমন উত্তম গুণের অধিকারী তার পক্ষেই সমাজ সংগঠনে পরিবারে সকল পথের মানুষকে নিয়ে নির্মল সুন্দর একটি সুশৃঙ্খল পরিবেশ উপহার দেয়া সম্ভব।
যখন মনে যা আসে তাই না বলে কথায়, কাজে, ব্যবহারে, শব্দ চয়নে কৌশলী হওয়া প্রয়োজন। কখন কী বলা দরকার, কতটা বলা প্রয়োজন তা নির্ধারণ করা আবশ্যক। কী বলতে হবে, কী না বললে ভালো হয় তাও আগেই অনুধাবন করা প্রয়োজন, এমন কথা পরিহার করা উচিত যা মানুষকে আঘাত দেয়। তিক্ত মনোভাব নিয়ে কথা বললে পারস্পরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে অপূরণীয় ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। কারণ, কথা একবার বলে অপরের মনে আঘাত দিয়ে ফেললে তা আর ফিরিয়ে নেয়া যায় না।
হাসিমুখে কথা বলে আন্তরিক আচরণ দিয়ে মানুষের হৃদয় জয় করা বর্তমান প্রেক্ষাপটে এক কঠিন চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জে উত্তীর্ণ হতে পারাই সার্থকতা। সদা হাস্যোজ্জ্বল থেকে আচরণে আন্তরিক হওয়ার মাধ্যমে শুধুমাত্র অন্যের হৃদয় জয় করাই হয় না, শুধুমাত্র মানুষকে কাছে টানাই হয় না, বরং এটি একটি ইবাদতও বটে। এ প্রসঙ্গে হযরত আলী (রা) বলেছেন- মানুষের সাথে হাসিমুখে কথা বলাটাও একটা ইবাদত। আলী (রা) আরো বলেন- মুমিনের চেহারায় প্রস্ফুটিত থাকে একটি হাস্যোজ্জ্বল আনন্দের রেখা। দুঃখ সমাহিত থাকে তার অন্তরের গভীরে, তার আত্মা হয় প্রশস্ত। জীবনে সফলতা পাওয়ার জন্য সকলেরই উচিত সদা হাস্যোজ্জ্বল থেকে আচরণে আন্তরিক হওয়া।