📘 জীবন বদলে যাবে > 📄 শৃঙ্খলা ও পরিচ্ছন্নতা জীবন-সৌন্দর্যের নান্দনিক প্রতিচ্ছবি

📄 শৃঙ্খলা ও পরিচ্ছন্নতা জীবন-সৌন্দর্যের নান্দনিক প্রতিচ্ছবি


চলতে ফিরতে বিভিন্ন স্থানে 'শৃঙ্খলা বজায় রাখুন' বাক্যটি কত শত বার যে দেখেছি তার কোনো হিসাব নেই। অফিস আদালত টার্মিনাল যানবাহন কোথায় দেখিনি। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে এত শতবার দেখার পরও কখনো সেভাবে একবারও ভাবার চেষ্টা করিনি এই বাক্যটির গুরুত্ব কতটুকু, কেনইবা সব জায়গায় এই বাক্যটি সবাই ব্যবহার করছে। প্রচলিত একটি কথা আছে শৃঙ্খলাই জীবন। বিশ্বব্যাপী ডায়াবেটিস আক্রান্ত রোগীদের সচেতনতার লক্ষ্যে 'শৃঙ্খলাই জীবন' স্লোগানটি প্রতিপাদ্য হিসেবে ব্যবহার করা হয়। সে হিসেবে জীবনের আরেক নাম শৃঙ্খলা। শৃঙ্খলা জীবনের এক অতুলনীয় সৌন্দর্যের নাম। তার পাশাপাশি জীবন-সৌন্দর্যের আরেক নাম পরিচ্ছন্নতা। শৃঙ্খলা ও পরিচ্ছন্নতা জীবন-সৌন্দর্যের নান্দনিক প্রতিচ্ছবি।

জীবন যখন এক যুদ্ধের নাম তখন এ যুদ্ধে বিজয়ী হওয়ার জন্য সবাই মুখিয়ে থাকে। অংশ নেয় তীব্র প্রতিযোগিতায়। তীব্র এ প্রতিযোগিতায় শৃঙ্খলা যদি না থাকে তাহলে বিজয়ী হওয়াতো দূরের কথা ছিটকে পড়ার আশঙ্কাই থাকে বেশি। একজন ব্যক্তির জীবনে বহু ধাপ আছে। বহু ধাপ অতিক্রম করেই ব্যক্তিকে সাফল্যের মঞ্জিলে পৌঁছতে হয়। তখন প্রতিটি ধাপেই তাকে অতি সন্তর্পণে এগোতে হয়। কোন এক ধাপে যদি ব্যক্তি হোঁচট খায় তাহলে সাফল্যের মঞ্জিলে পৌঁছা ব্যক্তির পক্ষে দুঃসাধ্য হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় ব্যক্তিজীবনের প্রতিটি ধাপে সফলতার সাথে অগ্রসর হওয়ার জন্য শৃঙ্খলা প্রয়োজন। শৃঙ্খলা ছাড়া ব্যক্তিজীবনে কেউ কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে কখনো পৌঁছতে পারে না।

জীবনের সর্বাবস্থায় প্রতিটি পদক্ষেপে শৃঙ্খলা প্রয়োজন। ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক জীবনের পরিমন্ডলে শৃঙ্খলিত না হলে সমাজ ভেঙে পড়তে বাধ্য। ব্যক্তি যেখানে নিজেকে গড়ে তোলে আগামীর জন্য, সেখানে তার মধ্যে যদি শৃঙ্খলা না থাকে তাহলে গড়াতো দূরের কথা প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করা থেকেই তার ছিটকে পড়ার আশঙ্কা বেশি। ছাত্রজীবনে, পরিবারে, সমাজে, সংগঠনে, ক্যাম্পাসে, পাঠাভ্যাসে যদি শৃঙ্খলার চর্চা না হয় তাহলে বৃহত্তর কর্মক্ষেত্রে যখন পা বাড়াবে তখন তা হবে জীবনের জন্য দুর্বোধ্য দেয়াল। আগে শৃঙ্খলার চর্চা না থাকায় কর্মজীবনকে বেশি কষ্টসাধ্য এমনকি কঠিন আজাবের মত মনে হবে। এ কথা সর্বজনবিদিত যে, শৃঙ্খলাহীন জীবন হালহীন তরী আর কূলকিনারাহীন নদীর মত।

পৃথিবীর সকল সৃষ্টিই শৃঙ্খলার অধীন। যদি তা-ই না হতো তাহলে সব ধ্বংস হয়ে যেত। এই বিশাল পৃথিবী, গ্রহ, নক্ষত্র সব কিছুই তার নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে চলছে। আল্লাহ তায়ালা মহাগ্রন্থ আল কুরআনে বলেন, "আর প্রত্যেকেই তার আপন কক্ষপথে পরিভ্রমণ করছে" (সূরা ইয়াসিন : ৪০)। যুদ্ধক্ষেত্রে শৃঙ্খলা ছাড়া কেউ জয়লাভ করতে পারে না। জীবনে সাফল্য লাভের প্রতিযোগিতায় উত্তীর্ণ হয়ে সাফল্য ছিনিয়ে আনা এক বিশাল যুদ্ধের নাম। এই সাফল্য অর্জনে শৃঙ্খলার কোনো বিকল্প নেই। ওয়াটার লুর যুদ্ধে নেলসন বীরবিক্রমে যুদ্ধ করে শক্তিশালী নেপোলিয়ানের বিরুদ্ধে জয়লাভ করেছিল। পরে পর্যালোচনা করে দেখা গেল যে, কী এমন শক্তি ছিল নেলসনের যা তাকে নেপোলিয়ানের বিরুদ্ধে বিজয়ী হতে সাহায্য করেছিল। জানা গেল, শৃঙ্খলাই তাকে বিজয়ী করেছিল। স্যার উইনস্টন চার্চিলের মতে, যুদ্ধক্ষেত্র এমনকি সর্বক্ষেত্রেই শৃঙ্খলাই সাফল্য অর্জনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ হাতিয়ার।

যে ছাত্র নিয়মিত পড়াশোনা করে না, ক্লাসে অংশগ্রহণ করে না, প্রতিদিনের পড়া প্রতিদিন আদায় করে না, পড়ার সময় পড়া আর খেলার সময় খেলাকে গুরুত্ব দেয় না, নিয়মিত যথাসময়ে ঘুম থেকে ওঠে না, ইবাদত করে না আবার নিয়মিত যথাসময়ে ঘুমাতেও যায় না, তার জীবনকে প্রকৃত ছাত্রজীবন না বলে এক কথায় নিয়ম-নীতিহীন উচ্ছৃঙ্খল জীবন ছাড়া আর কী বলা চলে। এ সকল ছাত্রই জীবনের গতি হারিয়ে ফেলে, স্বাস্থ্য হারায়, রোগ বালাইয়ে আক্রান্ত হয়, আর বছর শেষে তাদের সাফল্যের খাতায় অর্জন শূন্য। তারা সফলতার দেখা কোনো দিনই পায় না। গোল্ডেন এ+ তো দূরের কথা, পাস করে কোনো রকম সাফল্য ছিনিয়ে আনাই তাদের জন্য দুষ্কর হয়ে পড়ে। কারণ, তারা ছাত্রজীবনে শৃঙ্খলাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়েছে।

শৃঙ্খলার পাশাপাশি পরিচ্ছন্ন জীবন ব্যক্তিকে সাফল্য অর্জনে সহায়তা করে। পরিচ্ছন্নতাই জীবনের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য। ব্যক্তিজীবনের পরিচ্ছন্নতা, নিজের পরিবেশের পরিচ্ছন্নতা এবং মনমানসিকতা ও চিন্তার পরিচ্ছন্নতা জীবন-সৌন্দর্যের গুরুত্বপূর্ণ দিক। শুধু সফলতা অর্জন করলেই ব্যক্তি বিজয়ী হয় না বরং জীবনের পরিচ্ছন্নতা সফলতাকে পূর্ণতা দান করে। মহাগ্রন্থ আল কুরআনে মহান আল্লাহ পরিচ্ছন্নতা অর্জনকারীকেই সফল বলে অভিহিত করেছেন। আল্লাহ বলেন, “সে-ই সফলকাম হয়েছে যে পরিচ্ছন্নতা অর্জন করেছে” (সুরা আ'লা : ১৪)।

পরিচ্ছন্নতা ব্যক্তিত্বের প্রকাশ ঘটায়। আমাদের অনেকেই আছেন যারা পোশাকের চাকচিক্যেই পরিচ্ছন্নতার ভাব দেখান। বাস্তবে পরিচ্ছন্নতা থেকে তাদের অবস্থান অনেক দূরে। এরা যখন কোনো মজলিশে হাজির হন তখন এদের শরীর থেকে নিঃসৃত ঘামের দুর্গন্ধ উপস্থিতিকে অস্বস্তিতে ফেলে। অনেকে আছেন যখন কথা বলেন, তখন মুখ থেকে এমন দুর্গন্ধ বের হয় যে শ্রোতার বমি হওয়ার অবস্থা হয়। এরা কবে যে দাঁতে ব্রাশ ব্যবহার করেছে তারাই ভালো বলতে পারেন। কেউ এমন আছেন যাদের দিকে তাকালে মনে হবে শার্ট প্যান্টে দুনিয়ার সবার চাইতে তাদের সুন্দর এবং স্মার্ট লাগছে। কিন্তু যখন এরা জুতা থেকে পা বা পায়ের মোজা বের করেন তখন দুর্গন্ধে উপস্থিত সবাইকে নাক ধরতে বাধ্য করেন। পোশাক পরিচ্ছন্ন রাখার ব্যাপারে আল্লাহ কুরআনে বলেন, “তোমরা তোমাদের পোশাক পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখ” (সূরা মুদ্দাচ্ছির : ৪)। পরিচ্ছন্নতা অর্জনকারীকে আল্লাহ ভালোবাসেন। এ প্রসঙ্গে মহাগ্রন্থ আল কুরআনে এসেছে, "অবশ্যই আল্লাহ তওবাকারী ও পবিত্রতা অবলম্বনকারীদেরকে ভালোবাসেন" (সূরা বাকারা : ২২২)। হজরত আবু মালেক আশআরী (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা) বলেছেন: “পবিত্রতা ও পরিচ্ছন্নতা ঈমানের অংশ” (মুসলিম)। পরিচ্ছন্ন জীবনের পাশাপাশি মনমানসিকতাকে প্রফুল্ল রেখে সাফল্য অর্জনে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে নিজের পরিবেশেরও পরিচ্ছন্নতা প্রয়োজন। হাদিসে কুদসিতে বর্ণিত হয়েছে, "আল্লাহ পবিত্র, তিনি পবিত্রতা ভালোবাসেন। তিনি পরিচ্ছন্ন, অতএব তিনি পরিচ্ছন্নতা পছন্দ করেন" (তিরমিজি শরিফ)।

পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার সাথে শরীরের সুস্থতা নিবিড়ভাবে জড়িত। আমরা অনেকে আছি ব্যস্ততার কারণে কিংবা আলসেমি করে যথাসময়ে নিজেদের কাপড় পরিষ্কার করি না। মাসে কোনো একদিন কখনো বা সপ্তাহে অনেকগুলো কাপড় আমরা একসাথে ধোয়ার চেষ্টা করি। ছাত্রজীবনে এ প্রবণতা অনেক বেশি। এক্ষেত্রে আমি আমার সেজ ভাই নুর মুহাম্মদ ভাইয়ের শিখিয়ে দেয়া একটি পদ্ধতি এখনো অনুসরণ করার চেষ্টা করি। সেটা হলো ধোয়ার উপযুক্ত থাকলে প্রতিদিন কমপক্ষে একটি কাপড় ধোয়া। প্রতিদিন গোসলে যাওয়ার আগে ধোয়ার জন্য অন্তত একটি কাপড় নিয়ে গোসল করতে যাওয়া। তাহলে সপ্তাহ কিংবা মাস শেষে আর অনেকগুলো কাপড় একসাথে ধোয়ার কষ্ট সইতে হবে না। কাপড়ও নোংরা অবস্থায় পড়ে থাকবে না। কাপড় গুছিয়ে রাখা, নিয়মিত পরিষ্কার রাখা, যথাসময়ে চুল কাটা, নখ কাটা, নিজের বিছানা গোছগাছ করে রাখা, পড়ার টেবিল সুন্দর করে গুছিয়ে সাজিয়ে রাখা- এসব কাজ খুবই নগণ্য হলেও এগুলো ব্যক্তিত্বের প্রকাশ ঘটায়।

পোশাক পরিধানের সময় একটি বিষয়ে আমাদের অনেক বেশি সতর্কতা জরুরি। তা হলো টাখনুর নিচে প্যান্ট বা পায়জামা পরিধান না করা। এ ব্যাপারে আমরা অনেকেই বিষয়টি জানি না, আবার জেনেও সতর্কতা অবলম্বন করি না। এ প্রসঙ্গে দু'টি হাদিস উল্লেখ করছি- হজরত আবু যর (রা) বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “কিয়ামতের দিন আল্লাহ তায়ালা তিন ব্যক্তির সাথে কথা তো বলবেনই না বরং তাদের দিকে তাকিয়েও দেখবেন না। এমনকি তিনি তাদেরকে গুনাহ থেকে পবিত্র করবেন না বরং তাদের জন্য রয়েছে কষ্টদায়ক শান্তি। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, তারা কারা? তবে এরা তো ধ্বংস, তাদের বাঁচার কোনো রাস্তা নেই। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ কথা তিনবার বলেছেন। তারা হলো- ১. যে ব্যক্তি টাখনুর নিচে ঝুলিয়ে কাপড় পরে। ২. যে ব্যক্তি মিথ্যা কসম খেয়ে ব্যবসার পণ্য বিক্রি করে। ৩. যে ব্যক্তি কারো উপকার করে আবার খোঁটা দেয়। (মুসলিম, তিরমিজি, আবু দাউদ ও ইবনে মাজাহ)। এ প্রসঙ্গে হজরত আবু হুরায়রা (রা) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করে বলেন, “কাপড়ের যে অংশ টাখনুর নিচে থাকবে তা জাহান্নামের আগুনে প্রজ্বলিত হবে” (সহিহ বুখারি)।

শৃঙ্খলা এবং পরিচ্ছন্নতা মানবজীবন পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ দু'টি উপাদান। এ দু'টি উপাদান জীবনকে সুন্দর করে, পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখে, সুশৃঙ্খল রাখে, পবিত্র রাখে। সুন্দর এবং কল্যাণময় শান্তিপূর্ণ জীবনের জন্য যেমন শৃঙ্খলা প্রয়োজন তেমনি সুস্থভাবে বেঁচে থাকার জন্যও প্রয়োজন পরিচ্ছন্নতা। প্রচলিত একটি কথা আছে তাহলো শৃঙ্খলাই শৃঙ্খলমুক্তির পথ। আরেকটি কথাও বর্তমানে খুব প্রচলিত, শৃঙ্খলাই জীবন। আমাদের উচিত সুশৃঙ্খল জীবনের অধিকারী হওয়া। পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন নান্দনিক সুন্দর এক জীবন গড়া।

📘 জীবন বদলে যাবে > 📄 পরাভূত হতে না চাইলে রাগ নিয়ন্ত্রণ ও ক্রোধ দমন করুন

📄 পরাভূত হতে না চাইলে রাগ নিয়ন্ত্রণ ও ক্রোধ দমন করুন


জীবন চলার পথে মানুষকে অনেক নেতিবাচক আচরণ নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। কেউ নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন, কেউ পারেন না। যারা পারেন তারা কাজের সফলতা নিয়ে ঘরে ফিরেন। আর যারা পারেন না তারা জীবনযুদ্ধে পরাভূত হন। মানুষের যেসব নেতিবাচক বিষয় নিয়ন্ত্রণ করা আবশ্যক তার মধ্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলো রাগ নিয়ন্ত্রণ ও ক্রোধকে দমন করা। কিন্তু বাস্তব অবস্থা হচ্ছে অনেক মানুষই এই রাগ ও ক্রোধ নামক বিধ্বংসী ব্যাধিকে নিয়ন্ত্রণ কিংবা দমন করতে পারেন না। 'রেগে গেলেন তো হেরে গেলেন'- যারা প্রসিদ্ধ এই স্লোগানে বিশ্বাস করেন তারাও রাগ করেন। হেরে যাওয়ার পরিবেশ তৈরি করেন। তারা যেমন রাগকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন না, তেমনি পারেন না ক্রোধকে দমন করতে। ছাত্রজীবন কি চাকুরিজীবন, একাডেমিক ব্যস্ততা কি পারিবারিক, সামাজিক কিংবা সাংগঠনিক ব্যস্ততা- এসবের মাঝে যারা রাগ ও ক্রোধের মতো মারাত্মক ব্যাধিতে আক্রান্ত তারা কোনোভাবেই সফল হন না কিংবা সফলতার কাছে গিয়েও তাদের অর্জন ফসকে যায়। মানবতার মহান শিক্ষক রাসূলে আকরাম (সা)-ও রাগ বর্জন করার নসিহত করেছেন। হজরত আবু হুরায়রা (রা:) থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি নবী করিম (সা)-এর নিকট এসে বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাকে অল্প কথায় কিছু নসিহত করুন। রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন, রাগ বর্জন করো। সাহাবি কয়েকবার বললেন, আরও নসিহত করুন। প্রত্যেকবারই রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন, রাগ বর্জন করো। (বোখারি)

রাগ এবং ক্রোধ দু'টি পরস্পরের পরিপূরক। বলা যায় মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। রাগ হলো ক্রোধের প্রাথমিক অবস্থা। এটি মানুষের এক সহজাত অনুভূতি। মানুষের জীবনে উত্থান-পতনের সাথে সাথে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি হয়। কোনো কোনো চাপ ক্ষণস্থায়ী, কোনটা বা একটু দীর্ঘস্থায়ী হয়। চাপ যখন দীর্ঘস্থায়ী হয়, যখন মানুষের চাওয়া পাওয়া আর তার নিজের মতো করে এগোয় না, তখন তার মধ্যে এক ধরনের নৈরাশ্য সৃষ্টি হয়। সময়ের সাথে সাথে নৈরাশ্য কেটে কিছু কিছু মানসিক ক্ষত সেরে ওঠে বা ব্যক্তি আত্মসংযমবলে ধৈর্যের মূর্তপ্রতীক হয়ে কিছু বিষয় নিজেই সামলে নেয়। তবে যখন মানুষ ব্যর্থ হয় তথা এই নৈরাশ্য কিংবা মনস্তাত্ত্বিক সমস্যা জীবনের অন্যান্য সাধারণ কর্মকাণ্ডের সাথে খাপ খাওয়াতে না পারে বা বিভিন্ন ধরনের বাধার সম্মুখীন হয় তখন তার মাঝে রাগ ও ক্রোধের বহিঃপ্রকাশ ঘটে। রাগ ও ক্রোধের বহিঃপ্রকাশের আরো কিছু কারণ আছে। মানুষ যখন হতাশা, অসন্তুষ্টি, অপছন্দ বা কোনোরূপ সমালোচনার সম্মুখীন হয় বা কোনো ভীতিকর অবস্থায় পড়ে তখনও রাগ-ক্রোধের সৃষ্টি হয়। এ ছাড়াও মানুষ যখন কোনো কারণে দুঃখ পায় কিংবা একাকিত্বে ভোগে তখন একেকজন একেকভাবে তার রাগকে প্রকাশ করে। রাগ মানুষের শরীরে এক ধরনের এডরিনালাইন হরমোন নিঃসরণ করে, যার ফলে পেশিসমূহে উত্তেজনা, হৃদস্পন্দন বৃদ্ধি ও ব্লাডপ্রেশার বেড়ে যায়। অর্থনৈতিক সমস্যা-সঙ্কট ও ঝগড়া-বিবাদ, মাদকাসক্তি, যুদ্ধ-বিগ্রহ, অন্যায়-অবিচার-জুলুম, প্রিয়জন দ্বারা কটাক্ষের শিকার, প্রতিহিংসা, আত্মসম্মানে আঘাত ইত্যাদি কারণেও ব্যক্তির মানসিক চাপ এবং ক্ষেত্রবিশেষে মনস্তাত্ত্বিক উত্তেজনা বাড়ে, যার ফলে রাগ বা ক্রোধের সৃষ্টি হয়। মুক্ত বিশ্বকোষ Wikipedia-তে রাগ বা ক্রোধ সম্পর্কে বলা হয়েছে- "Anger or wrath is an intense emotional response. It is an emotion that involves a strong uncomfortable and emotional response to a perceived provocation hurt or threat."

মানুষের জীবনে রাগ অতি স্বাভাবিক এক অনুভূতি। তবে সমস্যা তখনই যখন মানুষ তা যথাযথভাবে নিয়ন্ত্রণ ও দমন করতে না পারে। একজন ব্যক্তি ততখানি সফল যতখানি সুচারুরূপে তিনি জীবনের নানা নেতিবাচক দিকগুলো ঠাণ্ডা মাথায় নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন। আমরা যখন রেগে যাই তখন পূর্বাপর চিন্তা না করেই উদ্ভট কিছু বলে ফেলি বা করে ফেলি। এর মাশুল গুনতে হয় পরে অনুশোচনা করে বা সুযোগ হাতছাড়া করে। নিজের জীবন অনুসন্ধান করলে হয়তো দেখতে পাবো আমাদের জীবনের অনেক সুযোগ নষ্টের পেছনে রয়েছে এই রাগ ও ক্রোধ। সাফল্যের অন্তরায় হিসেবে রাগ ও ক্রোধকে সাফল্য পাওয়া শ্রেষ্ঠ মানুষেরা সবসময়ই শনাক্ত ও দায়ী করেছেন। আমাদের সব সময় মনে রাখতে হবে, রাগের মাথায় কিছু করলে তার ফল কখনই ভালো হয় না। কাজের ক্ষেত্রে নিজের পক্ষ থেকে স্বাভাবিক পরিবেশ নিশ্চিত করার জন্য ক্রোধ সংবরণ করতে হবে। আপনি যদি দায়িত্বশীল কিংবা কর্তব্যশীল হন তাহলে তা আরো বেশি জরুরি। কারণ অধস্তনকে পরিচালনা করতে গিয়ে রাগ কিংবা ক্রোধের কারণে আপনিই যদি পরিবেশ নষ্ট করে ফেলেন তাহলে পরিচালনার কেন্দ্রবিন্দুতে থেকে আপনি যেই আস্থার জায়গায় অবস্থান করছেন তা ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। ক্রোধ সংবরণ করা সম্পর্কে বিজ্ঞানময়গ্রন্থ আল কুরআনে মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন, “তারাই সংযমী যারা সচ্ছলতা ও অসচ্ছলতায় (অভাবের সময়) ব্যয় করে, যারা নিজেদের রাগ সংবরণ করে আর মানুষের প্রতি ক্ষমা প্রদর্শন করে, বস্তুত আল্লাহ সৎকর্মশীলদেরই ভালোবাসেন" (সূরা আলে ইমরান : ১৩৪)।

রাগ-ক্রোধ পারস্পরিক সম্পর্ক বিনষ্ট করে। পরিবারের সদস্য, বন্ধু, আত্মীয়, প্রতিবেশী বা যেকোনো মানুষই একজন রাগী ব্যক্তিকে এড়িয়ে চলতে চায় এবং তাকে কেউ পছন্দও করে না। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই রাগ-ক্রোধ লালনকারী ব্যক্তির সঙ্গে অন্যদের সম্পর্কের অবনতি ঘটে। কারণ রাগী ব্যক্তির সামনে কেউ মন খুলে কথা বলতে চায় না, এমনকি যুক্তিতর্কেও লিপ্ত হতে চায় না। এটা পারস্পরিক সম্পর্কের জন্য ইতিবাচক নয়। যারা কর্তৃত্বশীল বা দায়িত্বশীল তারা রাগ এবং ক্রোধের মাধ্যমে সমাজ সংগঠন পরিচালনা করতে গেলে অধীনস্থরা আস্থা হারিয়ে আশপাশ থেকে সরে যায়, ফলে তা হিতে বিপরীত হয়, সৃষ্টি হয় সম্পর্কের টানাপড়েন। ব্যক্তিকে মনে রাখতে হবে তার বয়স, যোগ্যতা, পেশা, জ্ঞান, গরিমা, পারিবারিক শিক্ষা, সাংগঠনিক স্ট্যাটাস- সবকিছুর সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে তার রাগ বহিঃপ্রকাশের মাধ্যম বা পথটি। এটি ব্যক্তির ব্যক্তিত্বকে চরমভাবে প্রভাবান্বিত করে। ক্রোধোন্মাদ ব্যক্তি বা রাগে পাগল বা অন্ধ হয়ে অপ্রকৃতিস্থ কাজকর্ম করে ফেলা মানুষটি নিজেকে যতই ভালোমানুষ দাবি করুন না কেন সমাজ, সংগঠন কিংবা পরিবারে তাকে সকলে একটু হলেও হেয় চোখেই দেখে থাকে। ব্যক্তি তার নিজের অজান্তেই আশপাশ মানুষের কাছে নেতিবাচক বা অপছন্দনীয় ব্যক্তি হিসেবে পরিগণিত হয়।

রাসূল (সা) সব মানুষকে আপন করেছিলেন রাগের পরিবর্তে কোমল হৃদয়ের অধিকারী হওয়ায়। এ প্রসঙ্গে কুরআনে মহান আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, “(হে রাসূল) আল্লাহর দয়ায় আপনি তাদের প্রতি কোমল হৃদয় হয়েছিলেন। যদি আপনি রূঢ় কঠোর-চিত্ত হতেন তবে তারা আপনার আশপাশ থেকে সরে পড়ত। সুতরাং আপনি তাদেরকে মাফ করুন আর তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করুন” (সূরা আলে ইমরান: ১৫৯)। পারস্পরিক সম্পর্কের মাঝে রাগান্বিত হওয়ার একটা ঘটনা হাদিসে বর্ণিত আছে। সোলাইমান ইবন সুরাদ (রা:) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার আমি নবী (সা)-এর সঙ্গে বসা ছিলাম। তখন দু'জন লোক পরস্পর গালমন্দ করছিল। তাদের একজন অপর জনকে এত রাগান্বিত হয়ে গালি দিচ্ছিল যে, তাদের একজনের চেহারা লাল হয়ে গিয়েছিল এবং তার রগগুলো ফুলে গিয়েছিল। তখন নবী (সা) বললেন, আমি একটি কালেমা জানি, যদি এ লোকটি তা পড়ত, তাহলে তার ক্রোধ চলে যেত। (তিনি বললেন) সে যদি 'আউজু বিল্লাহি মিনাশ শায়তনির রাজিম' পড়তো। আমি শয়তান হতে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাই। (বুখারি) এ প্রসঙ্গে আল্লাহ পাক কুরআনে বলেন, "যদি শয়তানের পক্ষ থেকে কোনো উসকানি তোমাকে পায় তাহলে আউজু বিল্লাহি মিনাশ শায়তনির রাজিম পড়ো" (সূরা হা-মিম সাজদা : ৩৬)।

অধিক রাগ মানুষকে পাপের পথে পরিচালিত করে। এটি ব্যক্তিগঠন, আত্মশুদ্ধি চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ও শৃঙ্খলা অর্জনের ক্ষেত্রে এক বিরাট অন্তরায়। এটি একজন সত্যিকার মুমিনের বৈশিষ্ট্য নয়। কারণ ক্রোধ আসে শয়তানের পক্ষ থেকে মন্ত্রণার অংশ হিসেবে। আপনাকে একটু রাগিয়ে দিতে পারলে, আপনার ক্রোধকে একট উথলে দিতে পারলেই শয়তান দূর থেকে দেখে এই ভেবে হাসে যে, আপনাকে অন্তত সে বিপথে নেয়ার জন্য সফল হয়েছে। রাগ বা ক্রোধকে দমন করে সহনশীলতা, কোমলতা, ক্ষমা ও দয়া প্রদর্শনের মাধ্যমে পরিবেশ নিয়ন্ত্রণ করতে পারাটা ব্যক্তির এক মহৎ গুণ। রাগ বা ক্রোধ ধারণ করে কখন পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ বা পরিবেশের শৃঙ্খলা আনয়ন করা যায় না। মহান আল্লাহ তায়ালা মুত্তাকি লোকদের প্রশংসা করে তাদের গুণ তুলে ধরে বলেছেন, "(মুত্তাকিতো তারাই) যখন তারা ক্রোধান্বিত হয় তখন তারা মাফ করে দেয়" (সূরা শুয়া'রা : ৩৭)। অধিক রাগ মানুষকে পাপের পথে পরিচালিত করে বলেই রাসূল (সা) রাগ বা ক্রোধ নিয়ন্ত্রণের পদ্ধতি শিখিয়ে দিয়েছেন।

রাসূল (সা) বলেছেন, "ক্রোধের সর্বোচ্চ চিকিৎসা হলো অজু করা। কারণ রাগ আসে শয়তানের পক্ষ থেকে। আর শয়তানকে সৃষ্টি করা হয়েছে আগুন দ্বারা। আর আগুনকে পানি দিয়েই নিভানো যায়, শীতল করা যায়। তাই আমাদের কেউ যদি রাগান্বিত হয়ে পড়ে তখন যেন সে অজু করে নেয়" (আবু দাউদ)। রাগ নিয়ন্ত্রণের আরো একটি পদ্ধতি রাসূল (সা) বর্ণনা করেছেন। রাসূল (সা) বলেছেন, "তোমাদের কারো যখন রাগ আসে তখন সে দাঁড়ানো থাকলে যেন বসে পড়ে। এভাবে যদি তার রাগ প্রশমিত হয়ে যায় তাহলে ভালো। অন্যথায় সে যেন শুয়ে পড়ে” (আহমদ)। রাগ নিয়ন্ত্রণের জন্য নিম্নোক্ত কিছু পদ্ধতিও অনুসরণ করা যেতে পারে। রাগের উৎস থেকে কিছুক্ষণের জন্য দূরে সরে থাকা। অযথা রেগে না গিয়ে চিন্তা করা কিভাবে সমস্যাটাকে সমাধান করা যায়। যার কারণে রাগ সৃষ্টি হয়ে দ্রোহের আগুন জ্বলছে তাকে ক্ষমা করে দেয়া। এটা দু'জনের জন্যই ভালো ফল নিয়ে আসবে। যুক্তি দিয়ে নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করা যে রেগে গেলে শুধু নিজেরই ক্ষতি হবে, তার কোনো ক্ষতি হবে না। এতে আপনা আপনি রাগ কমে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। এছাড়াও অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায় রাগের আসল কারণ অন্তর্গত হীনম্মন্যতা। নিজের দুর্বলতাকেই মানুষ ঢাকার চেষ্টা করে দুর্ব্যবহার বা রাগারাগির মধ্য দিয়ে। তাই খুঁজে দেখুন আপনার মধ্যে কোনো হীনম্মন্যতা আছে কি না।

রাগ বা ক্রোধ ঈমানের বড় শত্রু। আবার ক্রোধ যেমনিভাবে মানুষের ঈমান ও আত্মার শত্রু তেমনিভাবে অনিয়ন্ত্রিত ক্রোধ জীবনেরও বড় শত্রু। ক্রোধের কারণে মানুষের পশুসুলভ আত্মা সক্রিয় হয়। চেহারা বিবর্ণ হয়, মানুষ আত্মনিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। যার কারণে অনায়াসে মুখে অশ্লীল কথা, অঙ্গে অশ্লীল ভঙ্গি প্রকাশ পায়। রাসূল (সা) বলেছেন, “ঈমান পূর্ণ করার চারটা আমল, যা কিছু মানুষকে দেবো আল্লাহকে রাজি-খুশি করার জন্য যা কিছু নেবো আল্লাহকে রাজি-খুশি করার জন্য। যাকে ভালোবাসব আল্লাহর উদ্দেশ্যে ভালোবাসব। যার প্রতি রাগ করব তাও আল্লাহকে খুশি করার জন্য" (তিরমিজি)। “যুদ্ধে তুমুল লড়াই চলছে। বীরকেশরী হজরত আলী (রা) কাফের এক সৈন্যকে কাবু করে তার বুকের ওপর চড়ে বসলেন। তরবারির আঘাতে যখনই তাকে হত্যা করতে যাবেন তখনই কাফের সৈন্যটি হজরত আলী (রা)-এর মুখে থুতু মারল। তৎক্ষণাৎ হজরত আলী (রা) তার বুকের ওপর থেকে সরে গিয়ে তাকে ছেড়ে দিলেন। আশ্চর্য হয়ে কাফের জিজ্ঞাসা করল, হাতের মুঠোয় পেয়েও কেন তাকে হত্যা করা হলো না। হজরত আলী (রা) বললেন, আমি যখন তোমাকে হত্যা করতে যাচ্ছিলাম তখন তা ছিল স্রেফ ইসলামের খাতিরে। কিন্তু যখন তুমি আমাকে থুতু নিক্ষেপ করলে তখন তোমার ব্যবহারে আমি ক্রুদ্ধ হয়েছি। তখন তোমাকে হত্যা করা হলে তা আমার ক্রোধের কারণেই হত্যা করা হতো। তাই আমি তোমাকে ছেড়ে দিলাম। আলীর এই মহানুভবতার কথায় সৈন্যটি তৎক্ষণাৎ ইসলাম গ্রহণ করল। হাদিস শরিফে বর্ণিত আছে, “রাগ ঈমানকে এমনভাবে ধ্বংস করে যেমন পিপুল গাছের তিক্ত রস মধুকে বিনষ্ট করে" রাসূল (সা) আরো বলেছেন, "যে ক্রোধকে বাধা দেয় আল্লাহ তায়ালা কেয়ামতের দিন তার আজাবকে বাধা দেবেন” হজরত ইবনে ওমর (রা) বলেন, আমি রাসূল (সা)-কে জিজ্ঞেস করলাম, আমাকে আমার রাগ থেকে কিসে রক্ষা করবে? তিনি বললেন, তুমি নিজে রাগান্বিত হয়ো না।

মানুষের জীবনে রাগ থাকতে পারবে না বিষয়টি কিন্তু এমন নয় বরং রাগ বা ক্রোধকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে এটিই হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তা ছাড়া যার মধ্যে রাগ বলতে কিছু নেই তার মধ্যে তেজস্বিতাও নেই। রাগ বা ক্রোধ মানুষের মাঝে থাকবেই, তাকে শুধু নিয়ন্ত্রণ করতে পারাই মূল সার্থকতা ও সফলতা। হাসতে সবাই পছন্দ করে। হাসা যেমন একটি মানবিক আচরণ, রাগ তার বিপরীত হলেও এটাকে অমানবিক আচরণ বলার সুযোগ নেই, এটিও মানবিক আচরণের মধ্যে পড়ে। বরং এটি মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি। তবে রাগ যদি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়ে ক্রোধে পরিণত হয় তখনই কেবল তাকে অমানবিক আচরণ বলা হয়ে থাকে। কারণ তা মারাত্মক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। আমাদের মাঝে এমনও কেউ আছেন যারা কারণে অকারণে হঠাৎ রেগে যান। হঠাৎ রেগে যাওয়া একটি মানসিক সমস্যাও বটে। মানসিক সমস্যা বর্তমান আধুনিক সমাজের একটি অন্যতম প্রধান সমস্যা। আমাদের সমাজ যত উন্নত হচ্ছে, মানসিক সমস্যার পরিমাণও তত বাড়ছে। রাগ এমন একটি মানসিক সমস্যা যা কারো কারো বেলায় প্রকট আকার ধারণ করে। তখন রাগকে শুধুমাত্র রাগ কিংবা ক্রোধের মধ্যেই চিহ্নিত করা যায় না, তখন সেটাকে পাগলামি হিসেবেই আমরা ধরে নিই। এই পাগলামি থেকে বেঁচে থাকার জন্যও আমাদের রাগ নিয়ন্ত্রণ জরুরি। ক্রোধ যিনি দমন করতে পারেন, রাগ যিনি নিয়ন্ত্রণ করে চেপে যেতে পারেন, তিনিই আসলে প্রকৃত বীর। রাগ কিংবা ক্রোধ সংবরণ করতে পারা সহজ কোনো বিষয় নয়। এটিকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারা বিজয়ী বীরের বীরত্বের চেয়েও শ্রেষ্ঠ। হজরত আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা) বলেছেন, "ঐ ব্যক্তি বীর নয় যে অন্যকে ধরাশায়ী করে বরং সে-ই প্রকৃত বীর যে রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে” (বোখারি ও মুসলিম)।

কারো মনে প্রশ্ন জাগতে পারে সবসময়ই কি রাগ না করে থাকা যায়? অথবা কেউ যদি বলেন, আমি না হয় রাগ না করে ক্রোধকে দমন করেই থাকলাম কিন্তু কেউ যদি আমাকে উদ্দেশ করে অহেতুক গালিগালাজ করে, মা-বাবা তুলে গালি দেয়, তখনও কি সত্যিই নিজের রাগকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব? হ্যাঁ আসলেই সম্ভব। এরকম উদ্ভট পরিস্থিতিতেও রাগ নিয়ন্ত্রণ করে থাকা যায়। ধরুন কেউ আপনার বিরুদ্ধে অহেতুক ভীষণ ক্ষুব্ধ হয়ে উঠল। অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ করল। আপনার বাবা-মা-বোনকে নিয়ে যাচ্ছেতাই বলল। আপনি চুপচাপ শুনে গেলেন, কিছুই বললেন না। অনেকক্ষণ গালিগালাজ করা ব্যক্তিটির কী অবস্থা হবে একট ভাবুনতো। গালিবাজ লোকটি আপনাকে উত্তেজিত ও রাগান্বিত করতে চেয়েছিল। সে চাইছিল আপনার মাঝে ক্রোধের বিচ্ছুরণ ঘটুক। কিন্তু আপনি কিছুই বললেন না। ফলে তার উদ্দেশ্যই নস্যাৎ হয়ে গেল। সে আপনাকে যে গালিগুলো দিলো আপনি তার কিছুই নিলেন না, গায়েও মাখলেন না। ফলে তার নোংরা গালিগুলো তার দিকেই ফিরে গেল, তার গায়ে মাখামাখি হয়ে তার কাছেই থাকল। বস্তুত আপনার মা-বাবা-বোনকে গালি দিয়ে সে নিজেকেই অপমানিত করল। সে গালিগালাজ করে আপনার শান্তি নষ্ট করতে এসেছিল, আপনি গালির জবাব দেয়ার অর্থই হচ্ছে তার উদ্দেশ্যকে সফল করা। তারচেয়ে কিছুক্ষণ তার গালিগালাজ শোনার পর আপনি যদি বিনয়ের সাথে বলেন, ভাই আপনি অনেক দয়ালু। অনেক পরিশ্রম করে কিছু আমাকে দিলেন। কিন্তু এগুলো রাখার কোনো জায়গা আমার কাছে নেই। আমি কিছুই নিলাম না। এগুলো আপনারই থাক এ কথা বলার পর দেখবেন, গালিবাজটি দাঁত কামড়ে চলে যাচ্ছে। তার গালিগালাজ যে আপনার ওপর কোনো প্রভাব বিস্তার করতে পারলো না, এটাই তার পরাজয়। আর এ পরাজয়ের যন্ত্রণা হয়তো অনেক দিন সে বয়ে বেড়াবে। সে এসেছিল আপনার শান্তি নষ্ট করতে, কিন্তু শান্ত থেকে ক্রোধ দমন করে আপনি তাকেই পরাভূত করলেন। রাগান্বিত অবস্থায় চারটি কাজ থেকে বিরত থাকতে হজরত আলী (রা) নিষেধ করেছেন। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, রাগান্বিত অবস্থায় চারটি কাজ থেকে বিরত থাকো: ১. সিদ্ধান্ত গ্রহণ ২. শপথ গ্রহণ ৩. শাস্তি প্রদান ও ৪. আদেশ প্রদান।

রাগ করে কি আসলে কোনো উদ্দেশ্য হাসিল হয়? না হয় না। বরং কিছু কৌশল অবলম্বন করলে রাগ থেকেও বাঁচা যায়, উদ্দেশ্যও হাসিল হয় এবং সফলতাও ধরা দেয়। যেমন কেউ যদি আপনাকে ঠকানোর চেষ্টা করে। রেগে না গিয়ে ঘটনা থেকে আপনি শিক্ষা গ্রহণ করুন এবং ভবিষ্যতের জন্য সাবধান হয়ে যান। আপনার ওপর যদি অন্যায় অবিচার করে। মনে রাখুন, একা প্রতিবাদ করা অর্থহীন। সকলের অন্যায়ের মুখে দুর্বল এভাবেই প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে। অন্যায়ের প্রতিকার করার মতো শক্তি এবং সঙ্ঘবদ্ধতা অর্জন করা পর্যন্ত অপেক্ষা করুন, ধৈর্য ধারণ করুন। কোনো কাজের স্বীকৃতি না পেলে স্বীকৃতির প্রত্যাশা না করে কাজ করে যান। কাজই তার প্রতিদান দেবে। বিদ্রূপ করলে, রেগে গিয়ে আপনি কি তার উদ্দেশ্যকেই সার্থক করছেন না? নিজের নিয়ন্ত্রণ অন্যের হাতে তুলে দিয়ে কেন হাসির পাত্র হবেন? উল্টো আপনি স্বাভাবিক থাকুন, স্মিত হাসুন। সে ভড়কে যাবে। মানসিক চাপ থাকলে, রেগে গেলে চাপ বাড়বে বৈ কমবে না। তাতে কাজের মান আরো খারাপ হবে। সময় লাগবে বেশি। বরং এই চাপকে দেখুন সুযোগ হিসেবে নিজের দক্ষতাকে আরো বাড়িয়ে নেয়া এবং আরো যোগ্য হওয়ার জন্য। পরিস্থিতি নাজুক হলে আসল কৌশল হলো মাথা ঠাণ্ডা রাখা। পরিস্থিতি বুঝে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারা। আপনার বিরুদ্ধে মিথ্যাচার করলে, যৌক্তিক জবাব তুলে ধরুন। যুক্তিসঙ্গত কথা বুঝতে না চাইলে, উত্তেজিত না হয়ে ঠাণ্ডা মাথায় ভাবুন। যে ভাষায় বললে অপরপক্ষ বুঝবে তাকে সে ভাষায়ই বোঝান। প্রয়োজনে সময় নিন।

📘 জীবন বদলে যাবে > 📄 অভিমান, অভিযোগ নয় সহানুভূতির দৃষ্টি প্রসারিত করুন

📄 অভিমান, অভিযোগ নয় সহানুভূতির দৃষ্টি প্রসারিত করুন


মানুষ একা চলতে পারে না। সামাজিক জীব হিসেবে জীবন পরিচালনায় মানুষকে একে অপরের প্রতি নির্ভরশীল হতে হয়। সমাজে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করতে হলেও গড়ে তুলতে হয় পারস্পরিক সেতুবন্ধ। ব্যক্তিগতভাবেও সফলতার জন্য মানুষকে একে অপরের প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়াতে হয়। যেকোন ক্ষেত্রে বসবাসরত মানুষের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা তাদের যে কোন সাফল্য অর্জন পথে সহায়ক হয়। ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা মানুষের একটি বিশাল শক্তি। এই শক্তি সকল বাধাকে তুচ্ছ করে সাফল্য ছিনিয়ে আনতে মানুষকে সহায়তা করে। মানুষের এই পারস্পরিক সেতুবন্ধন তথা শক্তিশালী সম্পর্কের মাঝেও বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন কারণে ফাটল দেখা দেয়, বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। সম্পর্কের চিড় ধরে। ফলে মানুষ ঐক্যবদ্ধ সেতুবন্ধনের পরিবর্তে পারস্পরিক কিংবা দলগত বিভেদে জড়িয়ে পড়ে, একতা শৃঙ্খলার পরিবর্তে বিশৃঙ্খল পরিবেশ তৈরি করে। সাফল্য ছিনিয়ে আনার পরিবর্তে বিভাজন ডেকে আনে। কিছু অর্জনের পরিবর্তে অনেক কিছু হারিয়ে ফেলে। সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির পরিবর্তে পরস্পরের মাঝে বিভেদ বিভাজনের দেয়াল তৈরি হয়।

সেতুবন্ধনের পরিবর্তে পারস্পরিক বিভেদ বিভাজনের দেয়াল তৈরিতে যে কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে তার মধ্যে অন্যতম হলো অভিমান কিংবা অভিযোগ দাঁড় করানো। পারস্পরিক কথাবার্তা, চলাফেরা, লেনদেন, আচার-আচরণ এবং আনুগত্যে যখন অভিমান কিংবা অভিযোগ একে অপরের প্রতি দাঁড় করানো শুরু হয়ে যায় তখন সেখানে সহনশীল ও সহানুভূতির পরিবেশের পরিবর্তে একটি অসহনশীল পরিবেশ তৈরি হয়। ফলে পারস্পরিক সম্পর্ক ছিন্ন হয়। বিভেদ ও বিভাজনের নানা উপসর্গও নতুন নতুন করে তৈরি হয়। সম্প্রীতি ও ভালোবাসার পরিবর্তে হিংসা ও বিদ্বেষ স্থান করে নেয়। আনুগত্যপরায়ণতার পরিবর্তে আনুগত্যহীন আচরণ শুরু হয়ে যায়। গিবত বা পরনিন্দার চর্চাও শুরু হয়ে যায়। ফলে পারস্পরিক সম্পর্কের সেতুবন্ধনে সামগ্রিক এক বিপর্যয় নেমে আসে।

পারস্পরিক সম্পর্কের বিপর্যয় শুরু হয় কিন্তু সামান্য ভুল দিয়ে, তুচ্ছ ঘটনা দিয়ে। মানুষ যখন কাজ করে তখন কাজের সময় মানুষের ভুল-ভ্রান্তি হতে পারে। ভুল-ভ্রান্তি হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। অস্বাভাবিক হলো, কাজের সময় ঘটে যাওয়া ছোটখাটো ভুল কিংবা ভ্রান্তিগুলোকে স্বাভাবিকভাবে না নেয়া। আমাদের মাঝে অনেকেই আছেন যারা তার সহকর্মী কিংবা অধস্তনের ছোটখাটো ভুলগুলোকেও একদম সহ্য করতে পারেন না। এ ধরনের মানসিকতা কখনোই কাজের সুশৃঙ্খল পরিবেশের জন্য কল্যাণকর হতে পারে না। বরং অন্যের ভুল-ভ্রান্তি ও সীমাবদ্ধতাকে সহনশীল ও সহানুভূতির দৃষ্টিতে দেখাই কল্যাণকর। ভুলগুলোকে ক্ষমা করে সংশোধনের সুযোগ করে দেয়ার মাঝেই রয়েছে বিশাল মহত্ত্ব। এ প্রসঙ্গে মহাগ্রন্থ আল কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, “অতঃপর যে ক্ষমা করে দেয় এবং সংশোধন করে নেয়, তার বিনিময় আল্লাহর নিকট রয়েছে” (সূরা শুরা : ৪০)। হযরত যাবের (রা.) থেকে বর্ণিত- রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “যখন কোন ব্যক্তি তার অপরাধের জন্য কোন মুসলমান ভাইয়ের নিকট ক্ষমা প্রার্থী হয়, যদি সে ক্ষমা না করে অথবা গ্রহণ না করে তাহলে তার অপরাধ অত্যাচারী কর আদায়কারীর মতো” (বায়হাকি)।

অভিমান, অভিযোগ পারস্পরিক সম্পর্ক ছিন্ন করার পথ তৈরি করে। হিংসা-বিদ্বেষ আর শত্রুতা বাড়ায়। সহনশীল আর সহানুভূতির দৃষ্টিই পারে এসব কিছু থেকে পরস্পরকে রক্ষা করতে। এক্ষেত্রে আল্লাহর রাসূল (সা) এবং তার সাহাবাদের মাঝে পারস্পরিক সহানুভূতির দৃষ্টান্তই শ্রেষ্ঠ উদাহরণ। মহাগ্রন্থ আল কুরআনে বলা হয়েছে, “আল্লাহর রাসূল (সা) এবং তার সাথীরা কাফেরদের প্রতি অত্যন্ত কঠোর। কিন্তু পরস্পরের প্রতি পূর্ণ অনুগ্রহশীল” (সূরা ফাতাহ : ৩৯)। অপর একটি আয়াতে এসেছে, "তারা মু'মিনদের প্রতি নম্র ও বিনয়ী হবে এবং কাফেরদের প্রতি হবে অত্যন্ত কঠোর” (সূরা মায়েদা: ৫৪)। আমাদের মাঝে এমন অনেকেই আছেন যারা সামান্য অভিমান কিংবা তুচ্ছ অভিযোগকে লালন করতে করতে তা হিংসা কিংবা বিদ্বেষে রূপান্তরিত করেন, যা আপন ভাইকেও সম্পর্ক থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। হযরত আনাস (রা) থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে এসেছে, নবী করীম (সা) বলেছেন, "তোমরা পরস্পর হিংসা-বিদ্বেষ ও শত্রুতা পোষণ করো না, দেখা-সাক্ষাৎ বর্জন করো না এবং সম্পর্ক ছিন্ন করো না, আল্লাহর বান্দারা ভাই ভাই হয়ে বসবাস কর, কোন মুসলমান তার অন্য মুসলমান ভাইয়ের সাথে তিন দিনের বেশি বিচ্ছিন্ন থাকা বৈধ নয়” (বুখারি ও মুসলিম)। কুরআনে এসেছে, "মু'মিনগণ পরস্পর ভাই ভাই। অতএব ভাইদের সম্পর্ক পুনর্গঠিত করে দাও” (সূরা হুজুরাত ১০)।

অভিমান, অভিযোগের পরিবর্তে মানুষ মানুষের জন্য ক্ষমা, দয়া, সহনশীল এবং সহানুভূতিশীল হবে এটি সৎপ্রবৃত্তির নান্দনিক দিক। মুসলিম চরিত্রের নান্দনিক বহিঃপ্রকাশ তো এমনই হওয়া উচিত। রাসূল (সা) বলেছেন, “সেই প্রকৃত মুসলিম যে নিজের জন্য যা পছন্দ করে তার ভাইয়ের জন্যও তা-ই পছন্দ করে" কেউ যেমন নিজের সাফল্যের জন্য অন্যের সহযোগিতা চাইবে তেমনি অপরের সফল্যের জন্যও তাকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিবে। কারণ ব্যক্তিগত সফলতার জন্যও একে অন্যের সহযোগিতা প্রয়োজন। পরস্পর সহযোগিতা না থাকলে কেউ কোন দিন সাফল্য অর্জন করতে পারে না, সমাজও লাভবান হতে পারে না। সহনশীলতা ও সহানুভূতি মানবজীবনের শ্রেষ্ঠ গুণ। যিনি ভদ্র, মর্যাদাবান তিনি সহানুভূতিসম্পন্ন মানুষ হবেন এটাই স্বাভাবিক। তিনি অন্যের মন জয় করতে চান তারতো সহনশীল আচরণ না করে উপায় নেই। সহনশীলতা ও সহানুভূতি যারা দেখাতে পারে না তাদেরকে সফল ব্যক্তিত্ব কিংবা মর্যাদাবান মানুষ বলার কোনো সুযোগ নেই। আমরা যদি পরস্পরের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করি তাহলে সমাজ থেকে অনেক দুঃখ, অনেক কষ্ট দূর হয়ে যাবে। প্রত্যেক মুসলমান ভাই ভাই, সুতরাং প্রত্যেকের সাথে আচরণের ক্ষেত্রে এটি মূল প্রতিপাদ্য হওয়া উচিত। যেমন আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা) বর্ণিত হাদিসে রাসূল (সা) বলেছেন, "মুসলমান পরস্পর ভাই, সুতরাং সে তার ভাইয়ের ওপরে কোন প্রকার জুলুমও করতে পারে না এবং তাকে অসহায় অবস্থায়ও ফেলতে পারে না। আর যে তার মুসলমান ভাইয়ের অভাব পূরণ করবে, আল্লাহ তার অভাব পূরণ করবেন। অনুরূপভাবে যে কোন মুসলমানের দুঃখ দূর করে দিবে আল্লাহ কিয়ামতের দিন তার দুঃখ দূর করে দিবেন। আর যে ব্যক্তি কোন মুসলমানের ত্রুটি গোপন করে রাখবে, আল্লাহ হাশরের দিন তার ত্রুটিও গোপন করে রাখবেন" (বোখারি ও মুসলিম)।

অপর ভাইয়ের ত্রুটি তাকেই সংস্কারের উদ্দেশ্যে ধরিয়ে না দিয়ে কিংবা গোপন না রেখে তার অগোচরে বলে বেড়ানোই গিবত। গিবত পারস্পরিক সম্পর্কের ভিত্তিকে ধ্বংস করে সামাজিক পরিবেশকে মারাত্মকভাবে নষ্ট করে তোলে। অভিমান, অভিযোগের জায়গা থেকেই গিবতের জন্ম নেয়। সহানুভূতির পরিবেশ নষ্ট করে সম্পর্কের অবনতি ঘটায়। গিবত ব্যভিচারের চাইতেও মারাত্মক। হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রা) হতে বর্ণিত, রাসূল (সা) বলেছেন, "গিবত হলো ব্যভিচারের চেয়েও মারাত্মক। সাহাবাগণ বললেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা) গিবত কি করে ব্যভিচারের চেয়েও মারাত্মক? হুজুর (সা) বললেন, কোন ব্যক্তি জেনা করার পর যখন তওবা করে আল্লাহ তার তওবা কবুল করেন। কিন্তু গিবতকারীকে যার গিবত করা হয়েছে সে যদি মাফ না করে আল্লাহ মাফ করবেন না" (বায়হাকি ও মেশকাত)। হযরত আবু হুরাইরা (রা) হতে বর্ণিত, একদা নবী করীম (সা) বললেন, "গিবত হলো তুমি তোমার মুসলমান ভাইয়ের বর্ণনা (তার অনুপস্থিতিতেই) এমনভাবে করবে যে, সে তা শুনলে অসন্তুষ্ট হবে। অতঃপর হুজুর (সা)-কে প্রশ্ন করা হলো- হে আল্লাহর নবী! আমি যা কিছু বলব তা যদি আমার ভাইয়ের মধ্যে পাওয়া যায়। সেক্ষেত্রেও কি গিবত হবে? হুজুর (সা) জবাব দিলেন, “তুমি যা বলছ তা যদি তার মধ্যে পাওয়া যায় তাহলেও সেটা গিবত হবে। আর যদি না পাওয়া যায় তাহলে তা হবে বোহতান "(মুসলিম)। আর বোহতান করা মারাত্মক অপরাধ। অপর হাদিসে এসেছে একের কথা অপরের কাছে বলে বেড়ানো হচ্ছে চোগলখুরি আর রাসূল (সা) এ জঘন্য পাপটি পরিহার করার নির্দেশ দিয়ে বলেছেন, চোগলখোর বেহেস্তে প্রবেশ করতে পারবে না।

অভিযোগ সমালোচনা করলে এগুলো ব্যক্তির আত্মসম্মানে আঘাত লাগে। তাই বলে এর অর্থ এই নয় যে, কখনো কারোর সমালোচনা করা যাবে না, কিংবা অভিযোগ করা যাবে না। বিষয়টি আসলে তা নয় বরং এহতেসাব তথা সংস্কারের উদ্দেশ্যে সমালোচনার পদ্ধতিতে পরিশুদ্ধতা করা যেতে পারে। অভিযোগ কিংবা সমালোচনা হবে সংশোধন করার দৃষ্টিভঙ্গিতে, হেয় কিংবা কষ্ট দেয়ার উদ্দেশ্যে নয়। অভিযোগের পাশাপাশি ব্যক্তির প্রতি সহানুভূতি ও সহনশীলতার দৃষ্টিও রাখতে হবে। জনসম্মুখে অভিযোগ না দিয়ে নিজেদের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে উপস্থাপন করতে হবে। ভালো কাজের প্রশংসা করে সমাধানের পথ খুঁজে পেতে নিজ থেকেই যথাযথ সহযোগিতার হাত আন্তরিকভাবে বাড়িয়ে দিতে হবে। কিছু লোক আছে যাদের স্বভাবই হলো শুধুই অভিযোগ করা, প্রতিটি দিনকেই তারা সমস্যাগ্রস্ত দেখেন, প্রতিটি মানুষকেই তারা কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে চান। অথচ অভিযোগের ভালো পদ্ধতি হচ্ছে অভিযুক্তকে সংশোধন করার নিয়তে সুযোগ দেয়া, নিজের আন্তরিকতার প্রকাশ ঘটানো। ইমাম রাযী বলেছেন, “ক্ষমা করে দেয়াটাই সর্বোত্তম প্রতিশোধ। অভিমান অভিযোগের পরিবর্তে একে অপরের প্রতি সহানুভূতির দৃষ্টি প্রসারিত করা কর্তব্য। কারণ বোকা ও দুর্বলরাই অভিমান এবং অভিযোগ করে, এক্ষেত্রে বুদ্ধিমান হওয়াই শ্রেয়"

📘 জীবন বদলে যাবে > 📄 সদা হাস্যোজ্জ্বল থেকে আচরণে আন্তরিক হোন

📄 সদা হাস্যোজ্জ্বল থেকে আচরণে আন্তরিক হোন


মানুষ সামাজিক জীব। সামাজিক জীব হিসেবেই প্রতিনিয়ত তাকে সমাজের অন্যান্য মানুষের সাথে চলতে ফিরতে হয়, কথা বলতে হয়। এটি মানুষের জীবনাচরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় সুশৃঙ্খল পরিবেশ বজায় রাখার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। গুরুত্বপূর্ণ এ অধ্যায়ে, শুধুমাত্র আচরণের কারণেই একজন আরেকজনের বন্ধু হয়, একজন আরেকজনের শত্রু হয়, একজন আরেকজনকে কাছে টেনে নেয়, একজন আরেকজনকে দূরে ঠেলে দেয়। আচরণের এই ভিন্নতার কারণেই মানুষের পরিচয়ও ভিন্নভাবে ফুটে ওঠে। ফুটে ওঠে মানুষের রুচিবোধের বৈশিষ্ট্য। মানুষ যা করে তা করতে গিয়ে যদি ভদ্র, মার্জিত ও সুন্দর আচরণের আশ্রয় নেয় তবে তাতেই বিকশিত হয় তার রুচিবোধ। কারণ, মানুষের আচরণই তার অন্তরের অনুভূতির প্রকাশ, মানুষের মধ্যে কে ভালো, কে মন্দ তা নির্ভর করে তার অন্তরের অনুভূতি থেকে প্রকাশিতব্য আচরণের ওপর। আমার আর আপনার মূল পরিচয় শুধুমাত্র বাহ্যিক আচরণে ফুটে ওঠে না, এটা হয়তো সাময়িক কোনো খ্যাতি দিতে পারে। কিন্তু আমার আপনার ভেতরকার মানুষটির প্রকৃত আচরণই মূল পরিচয় বহন করে। সর্বোত্তম চরিত্রের অধিকারী মহামানব রাসূল (সা) তার বক্ষের দিকে ইঙ্গিত করে বলেছেন, "আত্তাকওয়া হাহুনা" অর্থাৎ মুত্তাকির পরিচয় এখানে (অন্তরে), তার বাহ্যিক চাল-চলন বা আচরণে নয় বরং তার ভেতরকার বিষয় ফুটে ওঠার মাধ্যমে প্রকাশ হয়।

মানুষের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় আচরণগত দিকের সৌন্দর্য ফুটে ওঠে সদা হাস্যোজ্জ্বল থাকার মাধ্যমে। যিনি সদা হাস্যোজ্জ্বল থেকে আচরণে আন্তরিক হতে পারেন তিনিই সবার হৃদয় জয় করতে পারেন, সবাইকে কাছে টানতে পারেন। আচরণের সাথে সদা হাস্যোজ্জ্বল থাকার ঘনিষ্ঠ যোগসূত্র রয়েছে। একজন দায়িত্বশীল মানুষ তার অধীনস্থদের কাছে টানার ক্ষেত্রে কতটুক সফল হবেন তা নির্ভর করবে তার সদা হাস্যোজ্জ্বল আচরণের ওপর। সদা হাস্যোজ্জ্বল থেকে যদি আচরণে আন্তরিক হওয়া যায় তাহলে সবার সাথে ঘনিষ্ঠ হওয়া সম্ভব এবং সবাইকে কাছে টানাও সম্ভব। যিনি সবাইকে কাছে টানতে পারেন তিনি সহজেই সবার প্রিয়ভাজন হতে পারেন।

মানুষ স্বীয় চরিত্রে পরস্পরকে আপন করে নেয়। সদগুণাবলি অলঙ্কারস্বরূপ। নিজের মাঝে লুকিয়ে থাকা সদগুণাবলিগুলোকে সদা হাস্যোজ্জ্বল থেকে আচরণে বিকশিত হওয়ার সুযোগ দেয়া উচিত। কারণ, সদালাপ, সদগুণাবলি বিকাশেই কল্যাণ নিহিত। বদগুণাবলি তথা বদঅভ্যাস বিকাশে কোনো গৌরব নেই। কারো সাথে যখন সাক্ষাৎ হয় এবং কথা বলার সুযোগ সৃষ্টি হয় তখন হাস্যোজ্জ্বল থেকে আন্তরিকভাবে কথা বলার সুযোগ হাতছাড়া করা উচিত নয়। সাক্ষাৎদাতা এবং সাক্ষাৎপ্রত্যাশী উভয়েই আন্তরিক সম্ভাষণ কামনা করেন। আন্তরিক সম্ভাষণ আর হাসিমুখে কথা বলা অন্যের সাথে ঘনিষ্ঠতা বাড়ায়। সাক্ষাৎকে ফলপ্রসূ করতে হলে একটি বিষয় স্মরণ রাখতে হবে, তা হলো সাক্ষাতের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় হবে হাসিমুখে আন্তরিকতা বিনিময় করা।

কথার যেমন মূল্য আছে তেমনি কথার মাধ্যমে মানুষের যে আচরণ প্রকাশ পায় তার মূল্যও অনেক বেশি। কারণ যথার্থ আচরণ ছাড়া মূল্যবান কথাও অর্থহীন হয়ে যায়। একজনের সাথে সাক্ষাৎ করার সময় গুরুত্বপূর্ণ কথা বলতে গিয়ে যদি গুরুত্বহীন তথা মূল্যহীন ও অমূলক আচরণ করা হয় তখন গুরুত্বপূর্ণ কথাটাই বলার আর সুযোগ থাকে না। বাচালতা, মিথ্যা আর মলিনতার আশ্রয় নিয়ে কথা বলার চেয়ে চুপ থাকাই ভালো। যারা এসবের আশ্রয় নেয় তারা রাসূল (সা) এর কাছে সবচেয়ে ঘৃণিত হিসেবে বিবেচিত হন। এ প্রসঙ্গে হযরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রা) থেকে একটি হাদিস বর্ণিত হয়েছে, রাসূল (সা) বলেছেন, "তোমাদের মধ্যে যেসব লোক বাচাল, দুর্বোধ্য ভাষায় এবং অহঙ্কারের সাথে কথা বলে তারা আমার কাছে সবচেয়ে ঘৃণিত এবং কিয়ামতের দিন তারা আমার থেকে অনেক দূরে থাকবে” (তিরমিজি)।

অসহিষ্ণু হয়ে কথা বলা, প্রশ্নের উত্তর দেয়া, সামান্য কারণেই তেতে ওঠা এসবই সৌন্দর্য, শৃঙ্খলা ও আন্তরিকতার বিপরীত। এগুলো সাফল্য অর্জনের ক্ষেত্রে বড় অন্তরায়। কারণ, এতে পারস্পরিক আস্থা ও সম্পর্কের ভিত নড়বড়ে করে দেয়। সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশকেও মুহূর্তে বিশৃঙ্খল করে দেয়। সদা হাস্যোজ্জ্বল চেহারায় কথা বলতে পারাটা মার্জিত রুচির পরিচয় বহন করে। ভদ্রতার পরিবেশ বজায় রাখে। বিরুদ্ধবাদীদের বিরুদ্ধে কথা কিংবা গালি শোনা মাত্রই উগ্র হয়ে ওঠা কিংবা ক্রোধ নিয়ে জবাব দেয়ার মধ্যে কোনো সফলতা নেই। সামান্য একটু অপমান কিংবা অবহেলায় উত্তপ্ত না হয়ে একটু অপেক্ষা করা, ধৈর্য ধারণ করা উচিত। এ বিষয়ে মহান আল্লাহ তায়ালা সূরা ফুরকানের ৬ নম্বর আয়াতে বলেন, আর তাদেরকে যখন অজ্ঞ ব্যক্তিরা সম্বোধন করে তখন তারা বলে সালাম (তোমাদের ওপর শান্তি বর্ষিত হোক)।

যদি কারো সাথে বিতর্কও করতে হয় তবে তা করতে হবে উত্তম পন্থায়। কেননা মানুষের মধ্যে সর্বোত্তম তারাই যারা উত্তম পন্থা অবলম্বন করে। সূরা নাহলের ১২৫ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেন, "আর লোকদের সাথে পরস্পর বিতর্ক কর উত্তম পন্থায়” তর্ক করার অর্থ হলো হেরে যাওয়া যুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাওয়া। তর্কে আসলে জেতা যায় না শুধু মনের তুষ্টি অর্জন করা যায়। এখানে জিতলেও আপনি হারবেন আর হারলে তো কথাই নেই। যত তর্কে জিতবেন তত আপনার কাছ থেকে লোক দূরে সরে যাবে, দিন দিন আপনি বন্ধু হারাবেন। সূরা আনকাবুতের ৪৬ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, "তোমরা সুন্দর পন্থা ব্যতীত আহলে কিতাবদের সাথে বিতর্ক করো না” মুজাদ্দেদ-ই-আল ফেসানি (রহ) বলেছেন, "ভালো কথা বন্ধুদের পর্যন্ত পৌঁছাতে চেষ্টা কর। বিরুদ্ধবাদীদের সাথে বিতর্কে অবতীর্ণ হয়ো না" সূরা লোকমানের ১৮ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, "আর লোকদের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে কথা বলো না" মানবতার মহান শিক্ষক রাসূল (সা)-এর আচরণেও ছিল বদমেজাজ ও কাঠিন্যতা পরিহার। তাইতো তিনি সবাইকে কাছে টেনে নিয়েছেন, আপন করে নিতে পেরেছেন। এ প্রসঙ্গে সূরা আলে ইমরানের ১৫৯ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ রাসূল (সা)-কে উদ্দেশ করে বলেন, "আল্লাহর রহমতেই আপনি তাদের জন্য নরম দিল ও সুহৃদয় হয়েছেন। যদি বদমেজাজি ও কঠিন হৃদয়ের হতেন তবে লোকেরা আপনার কাছ থেকে দূরে সরে যেতো"

অনেক সময় আপনার আমার অহঙ্কার আর আত্মম্ভরিতাপূর্ণ আচরণের কারণে লোকেরা দূরে সরে যায়। আপনার জ্ঞান-গরিমা, সম্মান-মর্যাদা, বুদ্ধি-বিবেক বেশি বলে নিজেকে আলাদাভাবে উপস্থাপন করবেন তা হতে পারে না। বরং তা আপনাকে আরো ছোট করে তুলবে। মেধাহীন দুর্বলের সাথে রূঢ় আচরণ করবেন তা হতে পারে না বরং সেটা আপনার অর্জনকে ধ্বংস করে দেবে। আপনি বড় মানুষ বলে অন্যের সাথে 'দেমাগ' দেখিয়ে কথা বলবেন, নিজেকে অন্য উচ্চতায় রাখার চেষ্টা করবেন! এমন হলে আপনার কাছ থেকে সবাই দূরে সরে যাবে। জ্ঞান-গরিমাই সবকিছু নয় বরং আচরণ দেখেই বোঝা যায় ব্যক্তিটি কতটা সম্মানিত আর কতটা সুন্দর মনের অধিকারী। হাদিসে এসেছে, একবার হযরত জাবির ইবনে সুলাইম (রা) রাসূল (সা)-এর কাছে উপদেশ চাইলে রাসূল (সা) বললেন- কাউকে কখনো গালিগালাজ করো না। জাবির বলেন, এরপর আমি কখনো আজাদ, গোলাম এমনকি উট, বকরিকেও গালি দেইনি। রাসূল (সা) আরো বললেন- ভালো ও নেকির কোনো কাজকে তুচ্ছজ্ঞান করো না, তোমার ভাইয়ের সাথে হাসিমুখে কথা বলবে, প্রতিদিনের ছোট ছোট কথা, ছোট ছোট ব্যবহার, একটুখানি সৌহার্দ্যপূর্ণ আচরণে ব্যক্তির মর্যাদা, মনুষ্যত্ব ও ব্যক্তিত্বের বহিঃপ্রকাশ ঘটে।

যিনি তার জীবনের পথচলায় মিথ্যা কথা, নিষ্ঠুর বাক্য ও প্রতারণা থেকে মুক্ত থেকে অন্যের সাথে আচরণ করতে পারেন তার জীবনটা সত্যিই সার্থকজীবন। হাস্যোজ্জ্বল আচরণে যদি আপনি দোষশূন্য নির্মল ও মহৎ আচরণ করেন তাহলে দেখবেন দুরাচার, দুষ্ট লোকও লজ্জায় আপনার সামনে বিনয়ী থাকবে। যিনি এমন উত্তম গুণের অধিকারী তার পক্ষেই সমাজ সংগঠনে পরিবারে সকল পথের মানুষকে নিয়ে নির্মল সুন্দর একটি সুশৃঙ্খল পরিবেশ উপহার দেয়া সম্ভব।

যখন মনে যা আসে তাই না বলে কথায়, কাজে, ব্যবহারে, শব্দ চয়নে কৌশলী হওয়া প্রয়োজন। কখন কী বলা দরকার, কতটা বলা প্রয়োজন তা নির্ধারণ করা আবশ্যক। কী বলতে হবে, কী না বললে ভালো হয় তাও আগেই অনুধাবন করা প্রয়োজন, এমন কথা পরিহার করা উচিত যা মানুষকে আঘাত দেয়। তিক্ত মনোভাব নিয়ে কথা বললে পারস্পরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে অপূরণীয় ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। কারণ, কথা একবার বলে অপরের মনে আঘাত দিয়ে ফেললে তা আর ফিরিয়ে নেয়া যায় না।

হাসিমুখে কথা বলে আন্তরিক আচরণ দিয়ে মানুষের হৃদয় জয় করা বর্তমান প্রেক্ষাপটে এক কঠিন চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জে উত্তীর্ণ হতে পারাই সার্থকতা। সদা হাস্যোজ্জ্বল থেকে আচরণে আন্তরিক হওয়ার মাধ্যমে শুধুমাত্র অন্যের হৃদয় জয় করাই হয় না, শুধুমাত্র মানুষকে কাছে টানাই হয় না, বরং এটি একটি ইবাদতও বটে। এ প্রসঙ্গে হযরত আলী (রা) বলেছেন- মানুষের সাথে হাসিমুখে কথা বলাটাও একটা ইবাদত। আলী (রা) আরো বলেন- মুমিনের চেহারায় প্রস্ফুটিত থাকে একটি হাস্যোজ্জ্বল আনন্দের রেখা। দুঃখ সমাহিত থাকে তার অন্তরের গভীরে, তার আত্মা হয় প্রশস্ত। জীবনে সফলতা পাওয়ার জন্য সকলেরই উচিত সদা হাস্যোজ্জ্বল থেকে আচরণে আন্তরিক হওয়া।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00