📄 কুরআনের বাণী- সময়ের কসম, নিশ্চয় মানুষ ক্ষতির মধ্যে নিমজ্জিত
মহাগ্রন্থ আল কুরআনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূরা হচ্ছে আল আসর। এই সূরাটির আয়াত তিনটি। এটি কুরআনের ছোট সূরাগুলোর অন্যতম। এই সূরাটি ছোট হলেও এর তাৎপর্য ব্যাপকতর। লেখার শিরোনামটি এই সূরারই প্রথম অংশের অর্থ। মহাগ্রন্থ আল কুরআনে আল্লাহ তায়ালা এই সূরাতে সময়ের শপথ নিয়ে মানুষ যে ক্ষতির মধ্যে নিমজ্জিত তা তুলে ধরেছেন তার পাশাপাশি কারা ক্ষতির কবল থেকে মুক্ত থাকবে তার কথাও গুরুত্ব সহকারে তুলে ধরেছেন। সূরাটির পুরো অর্থ নিম্নে তুলে ধরা হলো- “সময়ের কসম। নিশ্চয় মানুষ ক্ষতির মধ্যে নিমজ্জিত। তবে তারা ছাড়া যারা ঈমান এনেছে ও সৎকাজ করতে থেকেছে এবং পরস্পরকে হক কথার ও সবর করার উপদেশ দিতে থেকেছে” (সূরা আসর)।
ছোট্ট এই মাক্কী সূরাটিতে মহান আল্লাহ তায়ালা স্পষ্ট ভাষায়, মানুষের সাফল্য-ব্যর্থতা, কল্যাণ-অকল্যাণ এবং ধ্বংসের পথ বর্ণনা করেছেন। মানুষের জীবনের প্রতিটি সময়কে গুরুত্ব দিয়ে কাজে লাগিয়ে জীবনটাকে বদলে দেয়ার জন্য এই সূরার অনুসরণই যথেষ্ঠ। এই সূরার তাৎপর্য উপলব্ধি করে কাজ করতে পারলে সাফল্য অনিবার্য। ইমাম শাফেয়ী (রহ) বলেন- "মানুষ যদি এই একটি সূরা অর্থাৎ সূরা আসর নিয়ে চিন্তা ভাবনা করে তাহলে এটিই তাদের হেদায়েত তথা সফলতার জন্য যথেষ্ট" হাদিসে বর্ণিত হয়েছে হযরত ওবাইদুল্লাহ বিন হিসন (রা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, "রাসূলুল্লাহ (সা) এর সাহাবীদের মধ্য থেকে যখন দুই ব্যক্তি মিলিত হতেন তখন তারা একজন অপরজনকে সূরা আসর না শোনানো পর্যন্ত বিচ্ছিন্ন হতেন না" (তাবারানি)।
মহান আল্লাহ এখানে সময়ের কসম করার যথার্থ যুক্তি আছে। আল্লাহ সৃষ্টিকুলের কোন বস্তুর শ্রেষ্ঠত্ব, অভিনবত্ব প্রকাশের জন্য কখনও কসম বা শপথ করেননি বরং যে বিষয়টি অকাট্যভাবে প্রমাণ করতে চেয়েছেন তার ক্ষেত্রেই তিনি সত্যতা প্রমাণ করতে কসম খেয়েছেন। সময় অতি মূল্যবান একটি বিষয়। সময় বলতে অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎকে বুঝায়। এটি কোন দীর্ঘ সময় এর অর্থে নয়। ভবিষ্যতের গর্ভ থেকে বের হয়ে আসা বর্তমান অতীতে নিপতিত সময়কে বুঝানো হয়েছে। অতীতের কসম হলো ইতিহাসের সাক্ষ্য। বর্তমানের কসম হলো বর্তমানের অতিবাহিত সময়। মানুষকে কাজের জন্য সময় দেয়া হচ্ছে। সময় এক ধরনের মূলধন। মূলধন নামক মানুষের এই সময় দ্রুতই অতিবাহিত হচ্ছে। এর উদাহরণ দিতে গিয়ে ইমাম রাযী (রহ:) একজন মনীষীর উক্তি উল্লেখ করে বলেছেন; তাহলো- "একজন বরফ বিক্রেতার কথা হতেই আমি সূরা আল আসরের অর্থ বুঝতে পেরেছি যে বাজারে জোর গলায় চিৎকার করে বলছিল- দয়া করো এমন এক ব্যক্তির প্রতি যার পুঁজি (বরফ) গলে যাচ্ছে। দয়া করো এমন ব্যক্তির প্রতি যার পুঁজি (বরফ) গলে যাচ্ছে। তার এ কথা শুনে আমি বললাম এইটিই হচ্ছে আসলে 'নিশ্চয় মানুষ ক্ষতির মধ্যে নিমজ্জিত' বাক্যের প্রকৃত অর্থ।
মানুষকে যে সময় (আয়ুষ্কাল) দেওয়া হয়েছে তা বরফ গলে যাওয়ার মতো দ্রুত অতিবাহিত হয়ে যাচ্ছে। একে যদি নষ্ট করে দেওয়া হয় অথবা ভুল কাজে ব্যয় করা হয় তাহলে সেটিই মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় ক্ষতি। কাজেই চলমান সময়ের কসম খেয়ে এই সূরায় যা বলা হয়েছে তার অর্থ এই যে, এই দ্রুত গতিশীল সময় সাক্ষ্য দিচ্ছে, সূরা আসরে বর্ণিতশ্রমে সেই সাফল্যকে নিজের করে নেয়। নিজের অর্জিত সাফল্যের পথপরিক্রমা পর্যালোচনা করলে দেখা যায় তাতে ধৈর্যের রয়েছে বিশাল অবদান। কাজের ক্ষেত্রে কেউ যদি ধৈর্যশীল হয় তাহলে তার সফলতা অর্জনের সম্ভাবনা থাকে শতভাগ। ধৈর্য হারালে ফল হয় তার বিপরীত। সমাজে এমনও মানুষ আছেন যারা ধৈর্যধারণের অভাবে কাঙ্ক্ষিত সাফল্যের সিডিতেই আরোহণ করতে পারেন না। আবার কেউ এমনও আছেন যারা সাফল্যের চূড়ায় গিয়েও সামান্য ধৈর্যের অভাবে হোঁচট খেয়ে সাফল্য হাতছাড়া করে ফেলেন। তাই এটি অনস্বীকার্য সত্য যে ধৈর্য সাফল্য লাভের অন্যতম চাবিকাঠি। সাফল্যের অন্যতম চাবিকাঠি হওয়ায় ধৈর্যের প্রতিযোগিতায়ও আমাদের উত্তীর্ণ হতে হবে। মহান আল্লাহ বিজ্ঞানময় কুরআনে এ ব্যাপারে বলেন, "হে ঈমানদারগণ (বিশ্বাসীগণ)! তোমরা সবর কর এবং সবরের প্রতিযোগিতা কর" (সূরা আলে ইমরান-২০০)।
মানুষের জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপই একেকটি পরীক্ষাক্ষেত্র। পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েই মানুষকে পথ চলতে হয়। মানুষের এই পথচলায় ধৈর্য একজন সাহসী সঙ্গীর মতো। পরীক্ষার চরম মুহূর্তে পরম বন্ধুর মতো যিনি ধৈর্যকে সত্যিকারের সঙ্গী বানাতে পারেন সাফল্য তিনিই ছিনিয়ে আনতে পারেন। আর যিনি ধৈর্য নামক সঙ্গীকে হারিয়ে ফেলেন তিনি সাফল্য অর্জন তো দূরের কথা সাফল্যের দেখাও পান না। প্রতিনিয়ত পরীক্ষার সম্মুখীন মানুষদের মধ্যে শুধু ধৈর্যশীলদের জন্যই রয়েছে সাফল্য লাভের সুসংবাদ। এ ব্যাপারে মহাগ্রন্থ আল কুরআনে মহান আল্লাহ বলেন, “অবশ্যই তোমাদেরকে ভয় ও ক্ষুধা দিয়ে পরীক্ষা করব। আর তোমাদের জান, মাল ও শস্যের ক্ষতি সাধন করেও পরীক্ষা করব আর ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দাও” (সূরা বাকারা-১৫৫)। এ প্রসঙ্গে হযরত আনাস (রা) থেকে একটি হাদিস বর্ণিত রয়েছে। তিনি বলেন, রাসূল (সা) বলেছেন, "বিপদ ও পরীক্ষা যত কঠিন হবে, তার প্রতিদানও তত মূল্যবান। আর আল্লাহ যখন কোন জাতিকে ভালবাসেন, তখন অধিক যাচাই ও সংশোধনের জন্য তাদেরকে বিপদ ও পরীক্ষার সম্মুখীন করেন। অতঃপর যারা আল্লাহর সিদ্ধান্তকে খুশি মনে মেনে নেয় এবং ধৈর্য ধারণ করে, আল্লাহ তাদের ওপর সন্তুষ্ট হন। আর যারা এ বিপদ ও পরীক্ষায় আল্লাহর ওপর অসন্তুষ্ট হয়, আল্লাহও তাদের প্রতি অসন্তুষ্ট হন" (তিরমিযি)।
সাফল্য অর্জনের জন্য সকল কাজে ধৈর্য ধারণ করা প্রয়োজন। কাজ শুরু করে ধৈর্যসহকারে এগোতে থাকলে ফল আসবেই। সামান্য ধৈর্যচ্যুতিই বিপর্যয় ঘটাতে পারে সাফল্যে। ধৈর্য ধারণ করে কাজ করলে সেই কাজের ফল অবশ্যই পাওয়া যাবে। কারণ মহান আল্লাহ তায়ালা সূরা হুদের ১১৫ নম্বর আয়াতে বলেন, "সবর অবলম্বন কর। আল্লাহ মুহসিনদের কর্মফল বিনষ্ট করেন না" ধৈর্যশীলরা যেমন সাফল্য লাভ করেন তেমনি তারা বেশি লোকের ওপর বিজয়ী হন। সূরা আনফালের ৬৫ নম্বর আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে- "তোমাদের মধ্যে যদি ২০ জন ধৈর্যশীল থাকে তবে ২০০ জনের ওপর বিজয়ী হবে"
ধৈর্য ধারণ করে ধীরে ধীরে নিজেকে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছানো সম্ভব। এ ক্ষেত্রে তাড়াহুড়োর কোনো সুযোগ নেই। যেকোনো কাজেই তাড়াহুড়ো সমস্যার কারণ হতে বাধ্য। কারণ কোনো বিষয়ে রাতারাতি কিংবা এক-দু'দিনেই সাফল্যের শিখরে পৌঁছা যাবে এটা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। আবার মাসের পর মাস চলে গেছে টার্গেট অনুযায়ী কাজ হচ্ছে না ভেবে কাজ ছেড়ে পালানোতেও কোনো কল্যাণ নেই। তাড়াহুড়োয় যেমন সাফল্য অর্জিত হয় না তেমনি ধৈর্যচ্যুতিতেও সাফল্য ধরা দেয় না। বরং সামনের সময়টুকু কিংবা সামনের দিনগুলোতেই সাফল্যের দেখা মিলবে এরূপ চিন্তা করে ধৈর্য নিয়ে কাজ করে যেতে পারলে ফলাফল আসবেই। হজরত আলী (রা) বলেন, সব বিষয়ে তাড়াহুড়ো করা এক ধরনের পাগলামি। সাধারণত এ ধরনের লোক পদে পদে লাঞ্ছিত হয়।
ধৈর্য একটি মহৎ গুণ। হজরত আবু চারটি গুণাবলী শূন্য হয়ে যে মানুষ যে কাজেই নিজের জীবনকাল অতিবাহিত করে- তার সবটুকুই ক্ষতির পরিবর্তে অন্য কাজে সময় নষ্ট করেছে, তাকে পরীক্ষার হলে টানানো ঘড়ির কাঁটা বলে দিচ্ছে তুমি নিজের ক্ষতি করছো। যে ছাত্র এই সময়ের প্রতিটি মুহূর্ত নিজের প্রশ্নপত্রের জবাব দেবার কাজে ব্যয় করেছে একমাত্র সেই লাভবান হচ্ছে। আর রেজাল্টের দিন সেই ছেলেটিই সফলতা অর্জন করবে।
এ সূরায় চারটি গুণাবলীর অধিকারী ব্যক্তির কথা বলা হয়েছে যারা সময়ের বহমান স্রোতে ক্ষতির মধ্যে নিমজ্জিত হওয়া থেকে রক্ষা পাবে-১. যারা ঈমান এনেছে ২. যারা সৎ কাজ করতে থেকেছে ৩. যারা পরস্পরকে হকের উপদেশ দিতে থেকেছে এবং ৪. যারা পরস্পরকে সবর বা ধৈর্য ধারণের উপদেশ দিতে থেকেছে। প্রথম কাজ হলো ঈমান আনা। শুধুমাত্র মুখে স্বীকার করলেই তাকে ঈমান আনা বলা হয় না বা ঈমানের দাবি পূরণ হয় না। বরং ঈমানের তিনটি ধাপ রয়েছে। তা হলো অন্তরে দৃঢ় বিশ্বাস স্থাপন করা, তারপর মুখে স্বীকৃতি তথা বিশ্বাস অনুযায়ী মুখে প্রকাশ করা, তৃতীয়ত বাস্তবে কাজে পরিণত করা। আল্লাহ বলেন- আসলে তারাই প্রকৃত মুমিন যারা আল্লাহ ও রাসূলের (সা) প্রতি ঈমান এনেছে এরপর কোনরূপ সন্দেহে পতিত হয়নি। (সূরা হুজুরাত : ১৫)
দ্বিতীয়ত, ক্ষতির মধ্যে নিমজ্জিত হওয়া থেকে রক্ষা পাবে তারা যারা আমলে সালেহ তথা সৎ কাজ করতে থেকেছে। কুরআনের পরিভাষায় সালেহাত সমস্ত সৎকাজ এর অন্তর্ভুক্ত। কুরআনের দৃষ্টিতে, যে কাজের মূলে ঈমান আছে এবং যা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সা) প্রদত্ত হেদায়াতের ভিত্তিতে সম্পাদিত হয়েছে তা সৎকাজ। ঈমানের পর সৎকাজের বর্ণনার অর্থ হলো ঈমান বিহীন কোন সৎকাজের পুরস্কার পাওয়ার সুযোগ নেই। সৎকাজবিহীন ঈমান একটি দাবি ছাড়া আর কিছুই নয়। ঈমান ও সৎকাজ বীজ আর বৃক্ষের মতো। আল্লাহ এবং বান্দার হক আদায়, মা বাবার খেদমত করা, বড়দের সম্মান করা ছোটদের স্নেহ করা, আত্মীয় স্বজন এবং প্রতিবেশীর হক আদায় করা, অপরকে কষ্ট দেয়া থেকে বিরত থাকা প্রভৃতি গুরুত্বপূর্ণ সৎ কাজ।
ক্ষতির মধ্যে নিমজ্জিত হওয়া থেকে রক্ষা পাওয়ার পরবর্তী দু’টি গুণ হলো- যারা ঈমান আনে ও সৎকাজ করে তারা পরস্পরকে হক কথা বলা, হক কাজ করা এবং ধৈর্য ধারণের উপদেশ দিতে হবে। এর প্রাথমিক অর্থ হচ্ছে ঈমানদার ও সৎকর্মশীলদের পৃথক না থেকে সম্মিলিতভাবে একটি সৎ সমাজ গড়ে তুলতে হবে। যেখানে নিজে হকের উপর অবিচল থাকার পাশাপাশি অন্যকেও এ পথে আহবান করতে হবে। মনে রাখতে হবে সমাজে একা একা ভালো থাকা যায় না। কেউ যদি মনে করেন তিনি ভালো থাকবেন ঘরে বসে থাকলেই হবে, তার পক্ষে তা সম্ভব হবে না। কারণ সমাজের ক্ষতির প্রভাব চরিত্রের ওপর কোনো না কোনো ভাবে পড়বেই। ফলে একা একা হকের পথে থেকেও ফিরে আসলেই ভালো থাকতে পারবেন না। সবাইকে ভাল পথে হকের পথে সত্যের পথে নিয়ে আসার চেষ্টা অব্যাহত রাখার মাধ্যমেই ভাল থাকা সম্ভব।
চতুর্থ গুণটি হলো সবর বা ধৈর্য। হকের নসিহত করতে গিয়ে বা হকের সমর্থন করতে গিয়ে যে সব সমস্যা ও বাধার মুখে নিপতিত হতে হয় তার মোকাবেলায় তারা পরস্পরকে অবিচল ও দৃঢ় থাকার উপদেশ দিতে থাকবে। হক এবং বাতিলের দ্বন্দ্ব চিরন্তন। যেখানেই হক সেখানেই বাতিল আঘাত হানার চেষ্টা করে। হক তথা সত্য পথে থেকে সফলতা অর্জন করতে গেলে বাধা বিপত্তি আসবেই। ধৈর্যের সাথে তার মোকাবেলা করতে হবে। আর ধৈর্যশীলদের জন্যই আল্লাহর পুরস্কার নির্ধারিত।