📄 সাফল্য অর্জনে প্রয়োজন অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কাজ করা
মানুষ সামাজিক জীব। সামাজিক জীব হিসেবে অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ মৌলিক সকল কাজই প্রাত্যহিক জীবনে মানুষকে করতে হয়। মৌলিক কাজের পাশাপাশি চাহিদা পূরণে মানুষকে ছোট থেকে বড় অনেক কাজেই ব্যস্ত থাকতে হয়। ছোট কিংবা বড় হোক অনেক কাজ একদিনেই করা হয় না। আবার কোন কাজ প্রতিদিনই করা হয় না। দৈনন্দিন জীবনে কয়টি কাজ করবেন তা নির্ভর করবে কয়টি কাজ করা সম্ভব তার ওপর। মানুষের জীবনে ব্যস্ততা চিরন্তন। অবসর সময়ে চুপ করে বসে থাকাও সময়ের বিচারে একটি ব্যস্ততা। কিন্তু এই নির্দিষ্ট সময়ের জীবনে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সবসময় কাজ করাই হলো ব্যক্তিজীবনের মূল সফলতা। যদি প্রশ্ন করা হয়, অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কাজ করা বিষয়টি ব্যক্তিজীবনের সফলতার সাথে কতটুকু সম্পৃক্ত। উত্তর একটাই, নির্দিষ্ট সময়ে অসীম চাহিদা পূরণ করতে হলে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কাজের কোন বিকল্প নেই। আমাদের মাঝে অনেককেই পাওয়া যাবে সময় নির্দিষ্ট অর্থাৎ দিনে ২৪ ঘণ্টা এটি জানার পরও সারাদিন কাজ করছেন অথচ কাজ শেষ করতে পারছেন না। তারা আকাঙ্ক্ষা করেন, ইস! ২৪ ঘণ্টার পরিবর্তে যদি দিনটি আরো কয়েক ঘণ্টা বেশি হতো।
যারা কাজ করেন না অলস সময় কাটান তাদের জন্য হিসাবটা ভিন্ন। কিন্তু যারা কাজের সফলতা চান, যারা চান নির্দিষ্ট সময়ে কাজ শেষ করতে। যারা প্রতিদিনই বিরামহীন কাজ করতে করতে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে কাজে সফলতা চান তাদের যথাসময়ে কাজে অসফল হওয়ার বিষয় পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে যে তারা গুছিয়ে কাজ করেননি। অর্থাৎ অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কাজ করেননি। সময় যে বছর মাস, সপ্তাহ, দিন, ঘণ্টা, সেকেন্ডের মাপকাঠি তা অনেকেই ভুলে যান। অনেকেই ভুলে যান দিন ২৪ ঘণ্টার বেশি হওয়া সম্ভব নয় কিংবা মিনিটও ৬০ সেকেন্ডের বেশি হওয়া সম্ভব নয়। সেকেন্ড মিনিট ঘণ্টার এই সময়গুলো সুনির্দিষ্ট কালের বিচারে আগামীকাল বলতে কোনো শব্দ বাস্তবিকই সময়ের খাতায় অর্থহীন। কারণ আগামীকাল বলে আপনি যে সময়কে চিন্তা করছেন সে সময়ের মুখোমুখি যখন আপনি হবেন তখন সেই সময়টিই আপনার নিকট আগামীকালের পরিবর্তে বর্তমান তথা আজে পরিণত হবে সময়কে গুরুত্ব দিতে হবে। সঠিক দিকনির্দেশনা ও সাফল্যের প্রয়োজনেই আমরা কখনো সময়ের অপচয় বা অপব্যবহার করতে পারি না। হজরত ইবনে আব্বাস (রা) বর্ণনা করেছেন, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, "মানুষের জন্য দু'টি আশীর্বাদ রয়েছে, যা অনেকেই হারিয়ে ফেলে। এগুলো হলো ভালো কাজের জন্য স্বাস্থ্য ও সময়" (বোখারি)। মহাগ্রন্থ আল কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন, "কালের কসম, নিশ্চয়ই মানুষ ক্ষতির মধ্যে, তারা ছাড়া যারা ঈমানদার, সৎকর্মশীল পরস্পকে সত্যনিষ্ঠার নির্দেশ প্রদানকারী এবং ধৈর্যধারণকারী ও অবিচল" (সূরা আসর: ১-৩)। মহান আল্লাহ তায়ালা এ সূরার শুরুতেই সময়ের শপথ নিয়ে বলেছেন, কারা ক্ষতিগ্রস্ত আর কারা নয়। সুতরাং সময়ের গুরুত্ব উপলব্ধি করেই যারা কাজ করবে তারাই ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারবে, তারাই সফলকাম হবে।
সফল হতে হলে প্রতিটি মুহূর্ত, প্রতিটি দিন, প্রতিটি সময়কে আমরা যেন প্রজ্ঞার সাথে কাজে লাগাই। একটা দিন মানে ২৪ ঘণ্টা বা ১৪৪০ মিনিট বা ৮৬৪০০ সেকেন্ড। প্রতিদিন এই সময়টুকু আমাদের জন্য নির্দিষ্ট করা। আমরা চাইলেই এর কম বেশি করা সম্ভব নয়। আমি চাইলে সব কিছু কমাতে বা বাড়াতে পারি কিন্তু চাইলেই কি সময়কে কমাতে বা বাড়াতে পারি? কখনোই না। অনেককে পাওয়া যাবে যারা সারাদিনই কাজ করছেন অথচ কাজ শেষ করতে পারছেন না। তারা ভাবেন যদি দিনটির পরিধি ৪৮ ঘণ্টা হতো অথবা ঘণ্টাটা ৬০ মিনিটের স্থলে ১০০ মিনিট করে হতো। প্রকৃতপক্ষে অনেক ক্ষেত্রেই তারা কাজের চাপে ন্যুজ হয়ে পড়েন। সমাজে এমনও কেউ আছেন যারা সময়কে কাজে লাগাতে পারেন না। তারা সময় নষ্ট করে থাকেন বিভিন্ন পদ্ধতিতে। এরা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সময় নষ্ট করেন ঘুমিয়ে, আড্ডা দিয়ে আর অবহেলায়। ঘুমের ব্যাপারে বর্তমানে কোথায়ও কোথায়ও একটা নিয়ম প্রচলিত হয়ে পড়েছে প্রায়। তা হলো সকালে ফজরের নামাজের পরে দ্বিতীয় বার ঘুম এবং দুপুরে খাওয়ার পরে কিছুক্ষণ বিশ্রাম করার নাম দিয়ে তৃতীয়বার ঘুম। তাদের অনেকেই ভেবে থাকেন সময় তাদের নিজস্ব সম্পদ (personal property)। প্রকৃতপক্ষে সময় আমাদের নিজেদের নয়। সময় সম্পর্কে আমাদের সজাগ থাকতে হবে। কারণ সময়ইতো গিলে খেয়েছে অতীতের কত বিশাল সংখ্যক মানবগোষ্ঠীকে। বিগত হয়েছে তারা সকলে খালি হাতে। ইতিহাস তাদেরকে গ্রহণ করেনি সঙ্গত কারণেই। করেছে মাত্র অল্প কিছু মহামানবকে। ব্যর্থ লোকেরা যা করতে অনিচ্ছুক সফল লোকেরা তা করে তাদের সময়ের সদ্ব্যবহার করে। সফলতার জন্যে প্রয়োজনীয় ত্যাগ-তিতিক্ষার সাথে খাপ খাইয়ে সময় ব্যয় করার চেয়ে ব্যর্থতার গ্লানির সাথে খাপ খাইয়ে নেয়াকে সাধারণ ব্যক্তিরা সহজতর মনে করে। যারা এরূপ মনে করে তারা সফলতার পরিবর্তে ব্যর্থতার অতল গহ্বরে তলিয়ে যায়।
কিছু মানুষ এমন আছেন যাকে আজ একটি কাজ দিলে কাল করব বলে যদি রেখে দেন, আর এই কাজটিই যদি তাকে আগামীকাল দেয়া হয় তবে তা পরবর্তী দিনের জন্যই রেখে দেন। মূলত এভাবেই আমরা সময়ক্ষেপণ করে থাকি, আর সেই সাথে সময় নামক সুযোগকে হাতছাড়া করি। শেষ পর্যন্ত এভাবেই আমরা ভাগ্যের বিড়ম্বনার শিকার হই। অপর দিকে যারা আগামী কালের জন্য বসে থাকেন না কখনও, আজকের দিনটুকুকেই যারা কাজে লাগাতে উদগ্রীব থাকেন, তারাইতো সময়কে কাজে লাগাতে পারেন পরিপূর্ণভাবে। তাইতো জগতে বিস্ময়কর কিছু করার এখতিয়ার শুধুমাত্র তাদেরই। প্রতিদিন সকালে যখন আমরা ঘুম থেকে উঠি তখন আমাদের আসন্ন দিনটির জন্য ২৪ ঘণ্টা সময় বরাদ্দ থাকে। যে প্রতিদিনের ২৪টি ঘণ্টা সুচারুরূপে কাজে লাগাতে পারে সেই শেষ হাসি হাসতে পারে। অর্থাৎ শেষ পর্যন্ত তিনিই সাফল্য অর্জন করেন। কারণ এই সময়তো আর কখনো ফিরে আসবে না। রাসূলে করীম (সা) বলেছেন, দু'জন ফেরেশতার নিম্নরূপ আহবান ব্যতীত একটি প্রভাতও আসে না- "হে আদম সন্তান! আমি একটি নতুন দিন এবং আমি তোমার কাজের সাক্ষী! সুতরাং আমার সর্বোত্তম ব্যবহার কর। শেষ বিচার দিনের আগে আমি আর কখনও ফিরে আসব না"। মানবতার মহান শিক্ষক রাসূল (সা)-এর উপর্যুক্ত বাণীতে সময়ের পক্ষ হতে একটি উদাত্ত আহবান রয়েছে, আমার সর্বোত্তম ব্যবহার কর। আর পাশাপাশি রয়েছে এক ধরনের সতর্কীকরণ। আজকের। আগামীকাল বলতে কোন দিন নেই। দিন নামক শব্দটি শুধু আজকের জন্য- তাই আজকের সর্বোত্তম ব্যবহার করা প্রয়োজন। আর সর্বোত্তম ব্যবহারের নিশ্চয়তা দেবে দৈনন্দিন কাজগুলোকে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে বিন্যাস করা। কাজের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে একটি তালিকা তৈরি করে চিন্তা ও বুদ্ধির সমন্বয়ে কাজগুলো সম্পন্ন করতে পারলে তবেই ধরা দেবে সফলতা।
ব্যক্তি হিসেবে প্রত্যেকের কাজেরই ভিন্ন ভিন্ন ধরন রয়েছে। কিন্তু চাহিদা সবারই সমান। যেমন নামাজ, অজু, গোসল, দাঁত ব্রাশ, নাস্তা, ঘুম, এগুলো সকলেরই মৌলিক কাজ। কিন্তু এর বাইরেও ব্যক্তিকেন্দ্রিক কিছু নির্দিষ্ট কাজ রয়েছে। প্রত্যেক ব্যক্তির তাই অগ্রাধিকারের তালিকাও হবে ভিন্ন ভিন্ন। একজন ছাত্রের অগ্রাধিকারভিত্তিক তালিকা যখন সামনে আসবে তখন তার অগ্রাধিকারের তালিকায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হবে পড়া, পড়া এবং পড়া। আবার এই পড়ার ক্ষেত্রেও আরেকটি বিষয় অগ্রাধিকার পাবে তা হলো, কোন বিষয়ে কতটুকু পড়া হবে। কোন সময় কোন বিষয় পড়া হবে। প্রতিদিন সময় যেহেতু নির্দিষ্ট অর্থাৎ ২৪ ঘণ্টার। এই ২৪ ঘণ্টার ভেতরেই কাজ সম্পাদনের জন্য একটি অগ্রাধিকারভিত্তিক তালিকা থাকবে। তালিকার ক্ষেত্রে যদি ধরা যাক একজন ছাত্রকে প্রতিদিন ১০টি বিষয়ের পড়া তৈরি করতে হবে তাহলে তাকে কোন বিষয় কতটুকু সময় দিয়ে পড়তে হবে তা আগে ঠিক করে নিতে হবে। ১০টি বিষয় একজন ছাত্র সমান পারদর্শী না-ও হতে পারে। 'ইংরেজি'তে দুর্বল হলে তার জন্য সময় একটু বেশিই বরাদ্দ থাকতে হবে। আবার 'বাংলা'য় ভালো হলে একটু কম সময় বরাদ্দ রাখতে হবে।
এভাবে প্রত্যেক ব্যক্তি তার সফলতার জন্য অগ্রাধিকারভিত্তিক প্ল্যান তৈরি করে সময়কে কাজে লাগাতে হবে। যিনি ব্যবসায়ী তারও একটা অগ্রাধিকারভিত্তিক প্ল্যান থাকতে হবে, তার প্ল্যানে ব্যবসায়িক খুঁটিনাটি বিষয়টিই হবে তার অগ্রাধিকারের বিষয়। একজন ব্যবসায়ী যদি তার দোকানে বিক্রির জন্য অগ্রাধিকারভিত্তিক তালিকা প্রণয়ন না করে পণ্য মজুদ করেন তাহলে যে চিত্রটি দেখা যাবে তা ব্যবসাবান্ধব চিত্র নয়। যেমন একটি মুদির দোকানে যদি ক্রেতার সর্বাধিক চাহিদা থাকে আটা, ময়দা, সুজির। এই তিনটি পণ্য দোকানে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয়। এখন ঐ বিক্রেতা যদি অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে পণ্য মজুদ না করে লবণ চিনি বেশি মজুদ করেন তাহলে অর্থকরী সম্পদ হওয়ার পরও তার এই সম্পদ ব্যবসা সমৃদ্ধিতে বেশি কাজে লাগবে না। বরং তাকে আটা ময়দা সুজিই বেশি মজুদ রাখতে হবে। কারণ ক্রেতা আটা ময়দা সুজি ক্রয়ের জন্যই বেশি আসবে। তেমনিভাবে একজন ছাত্রকে জ্ঞান আহরণের জন্য, ক্লাসের পড়া তৈরি করার জন্য, দুর্বল সাবজেক্ট হিসেবে ইংরেজি, গণিতে বেশি সময় দিতে হবে। কিন্তু সে যদি পারদর্শী হওয়ার পরও বাংলায়ই বেশি সময় দেয় তাহলে বিষয়টি হবে আটা ময়দা সুজিতে বিনিয়োগ বেশি না করার মতো। লবণ চিনির মতো বাংলায়ও জ্ঞান অর্জন হবে কিন্তু পূর্ণাঙ্গ মেধা অর্জনে ইংরেজি গণিতের চাহিদা পূরণ করতে না পারার কারণে কাঙ্ক্ষিত ভালো রেজাল্ট আসবে না।
আবার যিনি সংগঠক, সমাজসংস্কারক তার অগ্রাধিকারে সংগঠন পরিচালনার মূল বিষয়টিই প্রাধান্য পাবে। ছাত্রজীবনে যিনি সংগঠকের ভূমিকা পালন করেন অথবা যিনি সমাজ সংস্কারকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়ার চর্চা করেন, তাকেও অগ্রাধিকারভিত্তিক একটি প্ল্যান প্রতিদিনই তৈরি করতে হবে। তবে তার ব্যস্ততা প্রতিদিনের মত সমান না-ও হতে পারে। এ জন্য সার্বিক ভারসাম্যের জন্য তাকে কিছু সময় টেবিল ওয়ার্ক করা উচিত। অর্থাৎ প্রতিদিন কয়েক মিনিট সময় টেবিলে বসে দিনের সুনির্দিষ্ট একটি পরিকল্পনা নেয়া উচিত। যাতে তিনি প্রণয়ন করবেন কোন সময় কোন কাজ করবেন, কোন কাজকে বেশি দিনের ২৪ ঘণ্টার কর্মকাণ্ডের ব্যাপারে সাক্ষ্য প্রদান করবে শেষ বিচারের দিন। অর্থাৎ শেষ বিচারের দিনে বিচারের মুখোমুখি হওয়ার আগেই সময়ের ব্যবহারের ব্যাপারে সংযত হতে হবে আমাদেরকে- এটা একটা কঠিন সতর্কীকরণই বটে।
আজকের কাজ আগামীকালের জন্য ফেলে রাখবেন না। যদি আপনি কাজ শুরু করতে বিলম্ব করেন, তবে কাজ স্তুপীকৃত হতে থাকবে। কাল কি হবে তা আপনি জানেন না। গতকালের অসমাপ্ত কোনো কাজ নেই, এমন অবস্থায় যদি আপনি দিন শুরু করতে পারেন, তবে তা হবে এক বড় স্বস্তি। আজকের কাজ আগামীকালের জন্য ফেলে রাখলে আপনি কাজ সম্পন্ন করার ব্যাপারে ঝুঁকিতে পড়ে যাবেন। আজকের কাজ আজই সম্পন্ন করতে পারলেন না তাহলে আগামীকাল কিভাবে ফেলে রাখা কাজসহ দিনের নির্ধারিত কাজ সম্পন্ন করবেন? সুতরাং আজকের কাজ আগামীকালের জন্য ফেলে রাখবেন না। বরং আজকের কাজ শেষ করে আগামী কালের ব্যাপারে চিন্তা করুন। মহাগ্রন্থ আল কুরআনে এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন, "হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর। প্রত্যেক ব্যক্তির উচিত আগামীকালের জন্য সে কি প্রেরণ করে, তা চিন্তা করা। আল্লাহ তায়ালাকে ভয় করতে থাক। তোমরা যা কর আল্লাহ তায়ালা সে সম্পর্কে খবর রাখেন" (সূরা হাশর-১৮)। মহান রাব্বুল আলামিন সময়ের ব্যবহারের ব্যাপারে আমাদের হিসাব নেবেন হাশরের দিন। আর সেদিন মানুষের অবস্থা কেমন হবে সে সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে ব্যক্ত হয়েছে, "প্রত্যেক ব্যক্তির নির্ধারিত সময় যখন উপস্থিত হবে তখন আল্লাহ কাউকে অবকাশ দেবেন না। তোমরা যা কর, আল্লাহ সে বিষয়ে খবর রাখেন” (সূরা মুনাফিক ১১)। মহান আল্লাহ তায়ালা কুরআনে আরো বলেন, "সেখানে তারা আর্তচিৎকার করে বলবে, হে আমাদের রব বের করুন আমাদেরকে। আমরা সৎকাজ করব। পূর্বে যা করতাম তা করব না। (আল্লাহ বলবেন) আমি কি তোমাদেরকে এতোটা সময় দেইনি, যাতে যা চিন্তা করার সে বিষয়ে চিন্তা করতে পারতে? উপরন্তু তোমাদের কাছে সতর্ককারীও আগমন করেছিল। অতএব আস্বাদন কর। জালেমদের জন্য কোনো সাহায্যকারী নাই” (সূরা ফাতির ৩৭)।
সময় সম্পর্কে কিছু প্রচলিত ও প্রসিদ্ধ কথা আছে যেগুলোর অনেকগুলোর সাথেই আমরা পরিচিত। যেমন- সময়ের এক ফোঁড় অসময়ের দশ ফোঁড়, সময় আর বহমান স্রোত কারো জন্য অপেক্ষা করে না, সময় নেবেন চিন্তা করতে, এটি সাফল্যের উৎস। সময় নেবেন পড়তে, এটি জ্ঞানের ভিত্তি। সময় নেবেন নামাজ আদায় করতে, এটি দুনিয়াতে সবচেয়ে বড় শান্তি। সময় নেবেন বন্ধু বনে যেতে, এটি সুখের সোপান। সময় নেবেন হাসতে, এটি সর্বোত্তম লুব্রিক্যান্ট। সময় নেবেন দিতে বা দান করতে, স্বার্থপর হয়ে জীবনটাকে ছোট করার কোনো অর্থ নেই। আপনার সময়ক্ষেপণ করতে পারে এমন চিন্তাশূন্য লোক এড়িয়ে চলবেন। তবে এ ব্যাপারে অবশ্যই সতর্কতা অবলম্বন করবেন যেন লোকটি আবার আপনার আচরণে প্রাধান্য দিয়ে অগ্রাধিকার তালিকায় রাখবেন। তার পাশাপাশি অধ্যয়নের সময় কোনভাবেই এ পরিকল্পনা থেকে বাদ যাবে না এই হিসাবটাও করে রাখতে হবে। যেদিন সবচেয়ে বেশি ব্যস্ততা সেদিনও কয়েক ঘণ্টা অধ্যয়নের জন্য বরাদ্দ রাখা উচিত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম সেরা মেধাবী ছাত্র শহীদ আবদুল মালেকের পড়াশোনার ক্ষেত্রে একটি মৌলিক নীতি ছিল, তিনি যত বেশি ব্যস্ততার মাঝেই দিন অতিবাহিত করেন না কেন অন্তত কম করে হলেও দু-ঘণ্টা পড়াশোনা করে তারপরই ঘুমোতে যেতেন।
একজন ছাত্রের মূল স্লোগান হলো 'ছাত্র নং অধ্যায় নং তপঃ' পড়াশোনাই হবে তার মূল প্রতিপাদ্য বিষয়। এক্ষেত্রে সফল তারাই যারা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কাজ করতে পারেন যারা বিচক্ষণতার সাথে প্রাত্যহিক কাজের প্ল্যান তৈরি করতে পারেন। এক্ষেত্রে অবশ্যই প্ল্যানটি কাগজে কলমে লিখিত থাকা উচিত, চাই সেটা ছোট এক টুকরা চিরকুট হোক না কেন। যারা কাগজে কলমে না লিখে মুখস্থ প্ল্যান নেয়ায় অভ্যস্ত তাদেরই গুরুত্বপূর্ণ কাজ অথবা দু-একটি অগ্রাধিকারের কাজ খেয়ালের ভুলে হাতছাড়া হয়ে যেতে পারার আশঙ্কা বেশি থাকে। মানব জীবনের জন্য সময় সুনির্দিষ্ট। সুনির্দিষ্ট সময়টুকুকে অগ্রাধিকারভিত্তিক প্ল্যানের আওতায় নিয়ে এসে কাজের সাথে খাপ খাওয়ানো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অনেক কাজ হাতে আসবে তার মধ্যে কোন কাজটি সবার আগে সম্পন্ন করতে হবে তা নির্ধারণ করে কাজ শুরু করতে পারাই যথার্থতা। আর আজকের কাজ আজকের মধ্যেই সম্পন্ন করাই সার্থকতা। কাউকে একটি কাজ দিলে কাল করবো বলে যদি রেখে দেয় দেখা যাবে আগামী কাল অন্য ব্যস্ততায় এই কাজটিই পরবর্তী দিনের জন্য রক্ষিত হয়ে যাবে। এভাবেই মানুষ সুযোগ হাতছাড়া করে, সময় ক্ষেপণ করে সুযোগকে নষ্ট করে, সম্ভাবনাকে হাতছাড়া করে, আর এভাবেই শেষ পর্যন্ত ভাগ্যের নির্মম বিড়ম্বনার শিকার হতে হয়।
অপর দিকে যাদের মধ্যে সময়ের জ্ঞান আছে, সময়ের কাজ সময়ে করার প্রতিজ্ঞা আছে, অগ্রাধিকারভিত্তিক কাজের প্ল্যান আছে, আজকের কাজ আজকেই সমাধান করার উদগ্রীব ব্যাকুলতা আছে, তারাই তো জীবনে প্রকৃত সফলকাম হন। তারা কখনো আগামীকালের জন্য বসে থাকেন না বলেই বিজয়ীর হাসি তারাই হাসেন। প্রকৃতপক্ষে সময় হচ্ছে একটি সুযোগ মাত্র। এই সুযোগ সকল সময় আসে না, আসলেও স্থায়ী থাকে না। কারণ পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি দ্রুতগামী বিষয় হচ্ছে সময়। যারা সময়ের গুরুত্ব বুঝে জীবনের কাজগুলোকে অগ্রাধিকার প্ল্যানের মধ্যে নিয়ে এসে সুযোগ কাজে লাগানোর চেষ্টা করেন তারা সফলতার জন্য জীবনের সকল বিষয় এমনকি জটিল বিষয়গুলোকেই সহজ করে নেন। আর এর ফলে সফলতা তাদের হাতের মুঠোয় সহজেই ধরা দেয়। সময় হচ্ছে মূল্যবান সুযোগ। আর তা শেষ হওয়ার পর কষ্ট না পায়। মনে রাখবেন, সময় নেবেন কাজ করতে কারণ এটি সফলতার মূল্য (price), কিন্তু সময়ক্ষেপণের জন্য কখনও সময় নেবেন না। সময় সম্পর্কে এ সকল প্রচলিত ও প্রসিদ্ধ কথা আমাদের জানা থাকলেও আমরা অনেকেই তা থেকে শিক্ষা নিই না। বরং আমাদের প্রতিটা দিনই একই রকম যায়, জীবনে আসে না কোনো সাফল্য, হয় না কোনো পরিবর্তন। স্মরণ রাখবেন, রাসূলে করীম (সা) বলেছেন, "যার দু’টি দিন একই রকম যায় নিঃসন্দেহে সে ক্ষতিগ্রস্ত"।
আমাদের জীবনে সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হচ্ছে সময়। সময়ের ওপর ভর করেই জীবনের উন্নতি ত্বরান্বিত হয় এবং সময়কে যথাযথ ব্যবহার করতে ব্যর্থ হলে জীবনের অবনতি হয়। ইংরেজিতে একটি প্রবাদ আছে Time is all the best of money. অর্থাৎ সময়-ই হচ্ছে সব সম্পদের শ্রেষ্ঠ সম্পদ। মানবজীবনের সীমাবদ্ধ গণ্ডিকে সমৃদ্ধির পথে পরিচালিত করার ক্ষেত্রে সময় একমাত্র উপজীব্য। সময় জ্ঞান না থাকলে জীবনে কখনও উন্নতির আশা পূরণ হয় না। পক্ষান্তরে সময়ই মানব জীবনের উন্নতি, সুখ-সমৃদ্ধি ও প্রতিপত্তি অর্জনের শ্রেষ্ঠ উপাদেয়। জীবনের গতি সময়ের গতির মতোই নির্মম। কারণ জীবন মানুষের সামনে আর কোন অবকাশ থাকে না। সময়ের ব্যাপারে সার্বজনীন মূলনীতি হচ্ছে প্রতিদিন আমাদের জন্য সমপরিমাণ ঘণ্টা ও মিনিট বরাদ্দ রয়েছে। এই ঘণ্টা ও মিনিটগুলোকে আপনি জমা করে রাখতে পারবেন না আবার কারো সাথে বিনিময়ও করতে পারবেন না। এ ব্যাপারে মহাগ্রন্থ আল কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন, "প্রত্যেক ব্যক্তির নির্ধারিত সময় যখন উপস্থিত হবে তখন আল্লাহ কাউকে অবকাশ দেবেন না। তোমরা যা কর আল্লাহ সে বিষয়ে খবর রাখেন” (সূরা মুনাফিকুন-১১)। নির্দিষ্ট সময় চলে যাওয়ার পর আর অবকাশ পাওয়া যায় না। পরীক্ষার আগে প্রস্তুতির যে সময় পাওয়া যায় সেটি যখন শেষ হয় পরীক্ষা সমাগত হয় তখন ইচ্ছা করলেও আগের সময় ফিরে পাওয়ার কোন অবকাশ নেই। দুনিয়ার জীবনে হয়তো আন্দোলন বিক্ষোভ করে পরীক্ষা পেছানো যেতে পারে কিন্তু পরকালীন জীবনে মানুষ আর্তচিৎকার করেও সময়ের অবকাশ পাবে না। এ ব্যাপারে মহান আল্লাহ বলেন, "সেখানে তারা আর্তচিৎকার করে বলবে, হে আমাদের রব বের করুন আমাদেরকে। আমরা সৎ কাজ করব। আগে যা খারাপ কাজ করতাম তা আর করব না। (আল্লাহ বলবেন) আমি কি তোমাদেরকে এতটা বয়স দিইনি যাতে যা চিন্তা করার সে বিষয় চিন্তা করতে পারতে? উপরন্তু তোমাদের কাছে সতর্ককারীও আগমন করেছিল। অতএব আস্বাদন কর। জালেমদের জন্য কোন সাহায্যকারী নেই” (সূরা ফাতির-৩৭)। সত্যিকার অর্থে তারাই সময় সম্পর্কে উদাসীন, যারা অবচেতন মনে সময় নষ্ট করেন। তারা জীবনে সফলতার মুখ দেখেন না। সম্মুখীন হন চরম ক্ষতির। সময় নষ্ট করা মানেই জীবনকে ক্ষতির সম্মুখীন করে ধ্বংসের অতল বয়স তথা সময়ের ফ্রেমে বাঁধা। তাই জীবনের কোনো মূল্য নেই সময় ছাড়া। মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত যে সময়টুকু থাকে, তাকে যিনি যথাযথভাবে কাজে লাগিয়ে সাফল্যের দ্বারপ্রান্তে পৌছে গেছেন, প্রতিভার বিকাশ ঘটিয়েছেন, কেবল তার জীবনই মূল্যবান। এবার নিজেরাই একটু ভাবুন কী করছেন। নিজের পায়ে নিজে কুড়াল মারছেন না তো? সময় হারিয়ে যাচ্ছে সময়েরই অন্ধকারে। সমাধান কী? সমাধান আপনার হাতের কাছেই, সময়ের গুরুত্ব দিন, সময় নামক সুযোগটাকে কাজে লাগান।
মানুষ সামাজিক জীব। সামাজিক জীব হিসেবে অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ মৌলিক সকল কাজই প্রাত্যহিক জীবনে মানুষকে করতে হয়। মৌলিক কাজের পাশাপাশি চাহিদা পূরণে মানুষকে ছোট থেকে বড় অনেক কাজেই ব্যস্ত থাকতে হয়। ছোট কিংবা বড় হোক অনেক কাজ একদিনেই করা হয় না। আবার কোন কাজ প্রতিদিনই করা হয় না। দৈনন্দিন জীবনে কয়টি কাজ করবেন তা নির্ভর করবে কয়টি কাজ করা সম্ভব তার ওপর। মানুষের জীবনে ব্যস্ততা চিরন্তন। অবসর সময়ে চুপ করে বসে থাকাও সময়ের বিচারে একটি ব্যস্ততা। কিন্তু এই নির্দিষ্ট সময়ের জীবনে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সবসময় কাজ করাই হলো ব্যক্তিজীবনের মূল সফলতা। যদি প্রশ্ন করা হয়, অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কাজ করা বিষয়টি ব্যক্তিজীবনের সফলতার সাথে কতটুকু সম্পৃক্ত। উত্তর একটাই, নির্দিষ্ট সময়ে অসীম চাহিদা পূরণ করতে হলে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কাজের কোন বিকল্প নেই। আমাদের মাঝে অনেককেই পাওয়া যাবে সময় নির্দিষ্ট অর্থাৎ দিনে ২৪ ঘণ্টা এটি জানার পরও সারাদিন কাজ করছেন অথচ কাজ শেষ করতে পারছেন না। তারা আকাঙ্ক্ষা করেন, ইস! ২৪ ঘণ্টার পরিবর্তে যদি দিনটি আরো কয়েক ঘণ্টা বেশি হতো।
যারা কাজ করেন না অলস সময় কাটান তাদের জন্য হিসাবটা ভিন্ন। কিন্তু যারা কাজের সফলতা চান, যারা চান নির্দিষ্ট সময়ে কাজ শেষ করতে। যারা প্রতিদিনই বিরামহীন কাজ করতে করতে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে কাজে সফলতা চান তাদের যথাসময়ে কাজে অসফল হওয়ার বিষয় পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে যে তারা গুছিয়ে কাজ করেননি। অর্থাৎ অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কাজ করেননি। সময় যে বছর মাস, সপ্তাহ, দিন, ঘন্টা, সেকেন্ডের মাপকাঠি তা অনেকেই ভুলে যান। অনেকেই ভুলে যান দিন ২৪ ঘণ্টার বেশি হওয়া সম্ভব নয় কিংবা মিনিটও ৬০ সেকেন্ডের বেশি হওয়া সম্ভব নয়। সেকেন্ড মিনিট ঘণ্টার এই সময়গুলো সুনির্দিষ্ট কালের বিচারে আগামীকাল বলতে কোনো শব্দ বাস্তবিকই সময়ের খাতায় অর্থহীন। কারণ আগামীকাল বলে আপনি যে সময়কে চিন্তা করছেন সে সময়ের মুখোমুখি যখন আপনি হবেন তখন সেই সময়টিই আপনার নিকট আগামীকালের পরিবর্তে বর্তমান তথা আজে পরিণত হবে। আগামীকাল বলতে কোন দিন নেই। দিন নামক শব্দটি শুধু আজকের জন্য- তাই আজকের সর্বোত্তম ব্যবহার করা প্রয়োজন। আর সর্বোত্তম ব্যবহারের নিশ্চয়তা দেবে দৈনন্দিন কাজগুলোকে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে বিন্যাস করা। কাজের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে একটি তালিকা তৈরি করে চিন্তা ও বুদ্ধির সমন্বয়ে কাজগুলো সম্পন্ন করতে পারলে তবেই ধরা দেবে সফলতা।
ব্যক্তি হিসেবে প্রত্যেকের কাজেরই ভিন্ন ভিন্ন ধরন রয়েছে। কিন্তু চাহিদা সবারই সমান। যেমন নামাজ, অজু, গোসল, দাঁত ব্রাশ, নাস্তা, ঘুম, এগুলো সকলেরই মৌলিক কাজ। কিন্তু এর বাইরেও ব্যক্তিকেন্দ্রিক কিছু নির্দিষ্ট কাজ রয়েছে। প্রত্যেক ব্যক্তির তাই অগ্রাধিকারের তালিকাও হবে ভিন্ন ভিন্ন। একজন ছাত্রের অগ্রাধিকারভিত্তিক তালিকা যখন সামনে আসবে তখন তার অগ্রাধিকারের তালিকায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হবে পড়া, পড়া এবং পড়া। আবার এই পড়ার ক্ষেত্রেও আরেকটি বিষয় অগ্রাধিকার পাবে তা হলো, কোন বিষয়ে কতটুকু পড়া হবে। কোন সময় কোন বিষয় পড়া হবে। প্রতিদিন সময় যেহেতু নির্দিষ্ট অর্থাৎ ২৪ ঘণ্টার। এই ২৪ ঘণ্টার ভেতরেই কাজ সম্পাদনের জন্য একটি অগ্রাধিকারভিত্তিক তালিকা থাকবে। তালিকার ক্ষেত্রে যদি ধরা যাক একজন ছাত্রকে প্রতিদিন ১০টি বিষয়ের পড়া তৈরি করতে হবে তাহলে তাকে কোন বিষয় কতটুকু সময় দিয়ে পড়তে হবে তা আগে ঠিক করে নিতে হবে। ১০টি বিষয় একজন ছাত্র সমান পারদর্শী না-ও হতে পারে। 'ইংরেজি'তে দুর্বল হলে তার জন্য সময় একটু বেশিই বরাদ্দ থাকতে হবে। আবার 'বাংলা'য় ভালো হলে একটু কম সময় বরাদ্দ রাখতে হবে।
এভাবে প্রত্যেক ব্যক্তি তার সফলতার জন্য অগ্রাধিকারভিত্তিক প্ল্যান তৈরি করে সময়কে কাজে লাগাতে হবে। যিনি ব্যবসায়ী তারও একটা অগ্রাধিকারভিত্তিক প্ল্যান থাকতে হবে, তার প্ল্যানে ব্যবসায়িক খুঁটিনাটি বিষয়টিই হবে তার অগ্রাধিকারের বিষয়। একজন ব্যবসায়ী যদি তার দোকানে বিক্রির জন্য অগ্রাধিকারভিত্তিক তালিকা প্রণয়ন না করে পণ্য মজুদ করেন তাহলে যে চিত্রটি দেখা যাবে তা ব্যবসাবান্ধব চিত্র নয়। যেমন একটি মুদির দোকানে যদি ক্রেতার সর্বাধিক চাহিদা থাকে আটা, ময়দা, সুজির। এই তিনটি পণ্য দোকানে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয়। এখন ঐ বিক্রেতা যদি অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে পণ্য মজুদ না করে লবণ চিনি বেশি মজুদ করেন তাহলে অর্থকরী সম্পদ হওয়ার পরও তার এই সম্পদ ব্যবসা সমৃদ্ধিতে বেশি কাজে লাগবে না। বরং তাকে আটা ময়দা সুজিই বেশি মজুদ রাখতে হবে। কারণ ক্রেতা আটা ময়দা সুজি ক্রয়ের জন্যই বেশি আসবে। তেমনিভাবে একজন ছাত্রকে জ্ঞান আহরণের জন্য, ক্লাসের পড়া তৈরি করার জন্য, দুর্বল সাবজেক্ট হিসেবে ইংরেজি, গণিতে বেশি সময় দিতে হবে। কিন্তু সে যদি পারদর্শী হওয়ার পরও বাংলায়ই বেশি সময় দেয় তাহলে বিষয়টি হবে আটা ময়দা সুজিতে বিনিয়োগ বেশি না করার মতো। লবণ চিনির মতো বাংলায়ও জ্ঞান অর্জন হবে কিন্তু পূর্ণাঙ্গ মেধা অর্জনে ইংরেজি গণিতের চাহিদা পূরণ করতে না পারার কারণে কাঙ্ক্ষিত ভালো রেজাল্ট আসবে না।
আবার যিনি সংগঠক, সমাজসংস্কারক তার অগ্রাধিকারে সংগঠন পরিচালনার মূল বিষয়টিই প্রাধান্য পাবে। ছাত্রজীবনে যিনি সংগঠকের ভূমিকা পালন করেন অথবা যিনি সমাজ সংস্কারকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়ার চর্চা করেন, তাকেও অগ্রাধিকারভিত্তিক একটি প্ল্যান প্রতিদিনই তৈরি করতে হবে। তবে তার ব্যস্ততা প্রতিদিনের মত সমান না-ও হতে পারে। এ জন্য সার্বিক ভারসাম্যের জন্য তাকে কিছু সময় টেবিল ওয়ার্ক করা উচিত। অর্থাৎ প্রতিদিন কয়েক মিনিট সময় টেবিলে বসে দিনের সুনির্দিষ্ট একটি পরিকল্পনা নেয়া উচিত। যাতে তিনি প্রণয়ন করবেন কোন সময় কোন কাজ করবেন, কোন কাজকে বেশি প্রাধান্য দিয়ে অগ্রাধিকার তালিকায় রাখবেন। তার পাশাপাশি অধ্যয়নের গহ্বরে তলিয়ে দেয়া। মহান আল্লাহ সূরা আসরের মধ্যে এ ব্যাপারে উল্লেখ করেছেন, "সময়ের কসম নিশ্চয়ই মানুষ ক্ষতির মধ্যে নিমজ্জিত। তবে তারা ছাড়া যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে এবং পরস্পরকে সত্য ও ধৈর্যের উপদেশ দেয়” সুতরাং সময়ের সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করে আমাদেরকে সফলতার স্বর্ণ শিখরে পৌঁছাতে হবে। সময় ও কাজকে ভাগ করে নেয়া যায় এভাবে- ১. অবশ্যই করণীয় ২. করণীয় ৩. করা দরকার ৪. সময় থাকলে করা ভালো। অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে কাজ না করলে কাঙ্ক্ষিত সফলতা অর্জন করা সম্ভব নয়। এ জন্য সফলতার মূল চাবিকাঠি হলো অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কাজ করা।
📄 সাফল্য অর্জনের অন্যতম চাবিকাঠি ধৈর্য
সাফল্যের চূড়ায় উত্তীর্ণ হতে মানুষ নানা ধরনের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়। অনেক কষ্টে, ঘামে শ্রমে পরিশ্রমে সেই সাফল্যকে নিজের করে নেয়। নিজের অর্জিত সাফল্যের পথপরিক্রমা পর্যালোচনা করলে দেখা যায় তাতে ধৈর্যের রয়েছে বিশাল অবদান। কাজের ক্ষেত্রে কেউ যদি ধৈর্যশীল হয় তাহলে তার সফলতা অর্জনের সম্ভাবনা থাকে শতভাগ। ধৈর্য হারালে ফল হয় তার বিপরীত। সমাজে এমনও মানুষ আছেন যারা ধৈর্যধারণের অভাবে কাঙ্ক্ষিত সাফল্যের সিডিতেই আরোহণ করতে পারেন না। আবার কেউ এমনও আছেন যারা সাফল্যের চূড়ায় গিয়েও সামান্য ধৈর্যের অভাবে হোঁচট খেয়ে সাফল্য হাতছাড়া করে ফেলেন। তাই এটি অনস্বীকার্য সত্য যে ধৈর্য সাফল্য লাভের অন্যতম চাবিকাঠি। সাফল্যের অন্যতম চাবিকাঠি হওয়ায় ধৈর্যের প্রতিযোগিতায়ও আমাদের উত্তীর্ণ হতে হবে। মহান আল্লাহ বিজ্ঞানময় কুরআনে এ ব্যাপারে বলেন, "হে ঈমানদারগণ (বিশ্বাসীগণ)! তোমরা সবর কর এবং সবরের প্রতিযোগিতা কর" (সূরা আলে ইমরান-২০০)।
মানুষের জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপই একেকটি পরীক্ষাক্ষেত্র। পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েই মানুষকে পথ চলতে হয়। মানুষের এই পথচলায় ধৈর্য একজন সাহসী সঙ্গীর মতো। পরীক্ষার চরম মুহূর্তে পরম বন্ধুর মতো যিনি ধৈর্যকে সত্যিকারের সঙ্গী বানাতে পারেন সাফল্য তিনিই ছিনিয়ে আনতে পারেন। আর যিনি ধৈর্য নামক সঙ্গীকে হারিয়ে ফেলেন তিনি সাফল্য অর্জন তো দূরের কথা সাফল্যের দেখাও পান না। প্রতিনিয়ত পরীক্ষার সম্মুখীন মানুষদের মধ্যে শুধু ধৈর্যশীলদের জন্যই রয়েছে সাফল্য লাভের সুসংবাদ। এ ব্যাপারে মহাগ্রন্থ আল কুরআনে মহান আল্লাহ বলেন, “অবশ্যই তোমাদেরকে ভয় ও ক্ষুধা দিয়ে পরীক্ষা করব। আর তোমাদের জান, মাল ও শস্যের ক্ষতি সাধন করেও পরীক্ষা করব আর ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দাও” (সূরা বাকারা-১৫৫)। এ প্রসঙ্গে হযরত আনাস (রা) থেকে একটি হাদিস বর্ণিত রয়েছে। তিনি বলেন, রাসূল (সা) বলেছেন, "বিপদ ও পরীক্ষা যত কঠিন হবে, তার প্রতিদানও তত মূল্যবান। আর আল্লাহ যখন কোন জাতিকে ভালবাসেন, তখন অধিক যাচাই ও সংশোধনের জন্য তাদেরকে বিপদ ও পরীক্ষার সম্মুখীন করেন। অতঃপর যারা আল্লাহর সিদ্ধান্তকে খুশি মনে মেনে নেয় এবং ধৈর্য ধারণ করে, আল্লাহ তাদের ওপর সন্তুষ্ট হন। আর যারা এ বিপদ ও পরীক্ষায় আল্লাহর ওপর অসন্তুষ্ট হয়, আল্লাহও তাদের প্রতি অসন্তুষ্ট হন" (তিরমিযি)।
সাফল্য অর্জনের জন্য সকল কাজেই ধৈর্য ধারণ করা প্রয়োজন। কাজ শুরু করে ধৈর্যসহকারে এগোতে থাকলে ফল আসবেই। সামান্য ধৈর্যচ্যুতিই বিপর্যয় ঘটাতে পারে সাফল্যে। ধৈর্য ধারণ করে কাজ করলে সেই কাজের ফল অবশ্যই পাওয়া যাবে। কারণ মহান আল্লাহ তায়ালা সূরা হুদের ১১৫ নম্বর আয়াতে বলেন, "সবর অবলম্বন কর। আল্লাহ মুহসিনদের কর্মফল বিনষ্ট করেন না" ধৈর্যশীলরা যেমন সাফল্য লাভ করেন তেমনি তারা বেশি লোকের ওপর বিজয়ী হন। সূরা আনফালের ৬৫ নম্বর আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে- "তোমাদের মধ্যে যদি ২০ জন ধৈর্যশীল থাকে তবে ২০০ জনের ওপর বিজয়ী হবে"
ধৈর্য ধারণ করে ধীরে ধীরে নিজেকে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছানো সম্ভব। এ ক্ষেত্রে তাড়াহুড়োর কোনো সুযোগ নেই। যেকোনো কাজেই তাড়াহুড়ো সমস্যার কারণ হতে বাধ্য। কারণ কোনো বিষয়ে রাতারাতি কিংবা এক-দু'দিনেই সাফল্যের শিখরে পৌঁছা যাবে এটা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। আবার মাসের পর মাস চলে গেছে টার্গেট অনুযায়ী কাজ হচ্ছে না ভেবে কাজ ছেড়ে পালানোতেও কোনো কল্যাণ নেই। তাড়াহুড়োয় যেমন সাফল্য অর্জিত হয় না তেমনি ধৈর্যচ্যুতিতেও সাফল্য ধরা দেয় না। বরং সামনের সময়টুকু কিংবা সামনের দিনগুলোতেই সাফল্যের দেখা মিলবে এরূপ চিন্তা করে ধৈর্য নিয়ে কাজ করে যেতে পারলে ফলাফল আসবেই। হজরত আলী (রা) বলেন, সব বিষয়ে তাড়াহুড়ো করা এক ধরনের পাগলামি। সাধারণত এ ধরনের লোক পদে পদে লাঞ্ছিত হয়।
ধৈর্য একটি মহৎ গুণ। হজরত আবু বকর (রা) ধৈর্যকে অপরিসীম পুণ্য হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, "সব পুণ্যেরই একটা সীমা আছে, কিন্তু ধৈর্য এমন একটা পুণ্য, যার কোনো সীমা-পরিসীমা নেই" প্রখ্যাত চিন্তাবিদ সাইয়্যেদ আবুল আ'লা মওদুদী (রহ.) ইসলামী আন্দোলনঃ সাফল্যের শর্তাবলি বইয়ে ধৈর্যকে পূর্ণতাদানকারী একটি গুণ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি ধৈর্যের কয়েকটি অর্থ তথা বৈশিষ্ট্যও বর্ণনা করেছেন। বৈশিষ্ট্যগুলো হচ্ছে- তাড়াহুড়ো না করা, ত্বরিত ফল লাভের জন্য অস্থির না হওয়া, সিদ্ধান্তে অটল থাকা, যাবতীয় দুঃখ-কষ্ট বরদাশত করা, বিরোধিতায় হিম্মত হারা হয়ে না পড়া, দুঃখ বেদনা ভারাক্রান্ত ও ক্রোধান্বিত না হওয়া, সহিষ্ণু হওয়া, ভয়-ভীতি ও লোভ-লালসা থেকে দূরে থাকা, একাগ্র ইচ্ছা ও সঙ্কল্পের পূর্ণ শক্তি নিয়ে অগ্রসর হওয়া। উপরোক্ত বৈশিষ্ট্যগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে এগুলো যার মাঝে থাকবে তিনিই সাফল্য ছিনিয়ে নিয়ে আসতে সক্ষম হবেন।
ধৈর্যের একটি চরম মুহূর্ত আছে। প্রকৃত অর্থে সেই চরম মুহূর্তে নিজেকে কর্তব্যপালনে স্থির রাখাই হলো ধৈর্য। অনেকে চরম মুহূর্তে এসে নিজেকে আর স্থির রাখতে পারেন না। হুদাইবিয়ার সন্ধির সময় চরম মুহূর্তে হজরত আবু জান্দাল (রা)-এর ধৈর্যধারণের ঘটনাটি ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে অলঙ্কিত হয়ে আছে। কাফিরদের নির্মম নির্যাতনের হাত থেকে বাঁচতে, ক্ষত-বিক্ষত শরীর নিয়ে শিকলপরা অবস্থাতেই পালিয়ে হুদাইবিয়া নামক স্থানে রাসূল (সা) এর নিকট হাজির হয়েছিলেন হজরত আবু জান্দাল (রা)। সময় কোনভাবেই এ পরিকল্পনা থেকে বাদ যাবে না এই হিসাবটাও করে রাখতে হবে। যেদিন সবচেয়ে বেশি ব্যস্ততা সেদিনও কয়েক ঘণ্টা অধ্যয়নের জন্য বরাদ্দ রাখা উচিত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম সেরা মেধাবী ছাত্র শহীদ আবদুল মালেকের পড়াশোনার ক্ষেত্রে একটি মৌলিক নীতি ছিল, তিনি যত বেশি ব্যস্ততার মাঝেই দিন অতিবাহিত করেন না কেন অন্তত কম করে হলেও দু-ঘণ্টা পড়াশোনা করে তারপরই ঘুমোতে যেতেন।
একজন ছাত্রের মূল স্লোগান হলো 'ছাত্র নং অধ্যায় নং তপঃ' পড়াশোনাই হবে তার মূল প্রতিপাদ্য বিষয়। এক্ষেত্রে সফল তারাই যারা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কাজ করতে পারেন যারা বিচক্ষণতার সাথে প্রাত্যহিক কাজের প্ল্যান তৈরি করতে পারেন। এক্ষেত্রে অবশ্যই প্ল্যানটি কাগজে কলমে লিখিত থাকা উচিত, চাই সেটা ছোট এক টুকরা চিরকুট হোক না কেন। যারা কাগজে কলমে না লিখে মুখস্থ প্ল্যান নেয়ায় অভ্যস্ত তাদেরই গুরুত্বপূর্ণ কাজ অথবা দু-একটি অগ্রাধিকারের কাজ খেয়ালের ভুলে হাতছাড়া হয়ে যেতে পারার আশঙ্কা বেশি থাকে। মানব জীবনের জন্য সময় সুনির্দিষ্ট সুনির্দিষ্ট সময় টুকুকে অগ্রাধিকারভিত্তিক প্ল্যানের আওতায় নিয়ে এসে কাজের সাথে খাপ খাওয়ানো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অনেক কাজ হাতে আসবে তার মধ্যে কোন কাজটি সবার আগে সম্পন্ন করতে হবে তা নির্ধারণ করে কাজ শুরু করতে পারাই যথার্থতা। আর আজকের কাজ আজকের মধ্যেই সম্পন্ন করাই সার্থকতা। কাউকে একটি কাজ দিলে কাল করবো বলে যদি রেখে দেয় দেখা যাবে আগামী কাল অন্য ব্যস্ততায় এই কাজটিই পরবর্তী দিনের জন্য রক্ষিত হয়ে যাবে। এভাবেই মানুষ সুযোগ হাতছাড়া করে, সময় ক্ষেপণ করে সুযোগকে নষ্ট করে, সম্ভাবনাকে হাতছাড়া করে, আর এভাবেই শেষ পর্যন্ত ভাগ্যের নির্মম বিড়ম্বনার শিকার হতে হয়।
অপর দিকে যাদের মধ্যে সময়ের জ্ঞান আছে, সময়ের কাজ সময়ে করার প্রতিজ্ঞা আছে, অগ্রাধিকারভিত্তিক কাজের প্ল্যান আছে, আজকের কাজ আজকেই সমাধান করার উদগ্রীব ব্যাকুলতা আছে, তারাই তো জীবনে প্রকৃত সফলকাম হন। তারা কখনো আগামীকালের জন্য বসে থাকেন না বলেই বিজয়ীর হাসি তারাই হাসেন। প্রকৃতপক্ষে সময় হচ্ছে একটি সুযোগ মাত্র। এই সুযোগ সকল সময় আসে না, আসলেও স্থায়ী থাকে না। কারণ পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি দ্রুতগামী বিষয় হচ্ছে সময়। যারা সময়ের গুরুত্ব বুঝে জীবনের কাজগুলোকে অগ্রাধিকার প্ল্যানের মধ্যে নিয়ে এসে সুযোগ কাজে লাগানোর চেষ্টা করেন তারা সফলতার জন্য জীবনের সকল বিষয় এমনকি জটিল বিষয়গুলোকেই সহজ করে নেন। আর এর ফলে সফলতা তাদের হাতের মুঠোয় সহজেই ধরা দেয়। সময় হচ্ছে মূল্যবান সুযোগ। আর তা শেষ হওয়ার পর মানুষের সামনে আর কোন অবকাশ থাকে না। সময়ের ব্যাপারে সার্বজনীন মূলনীতি হচ্ছে প্রতিদিন আমাদের জন্য সমপরিমাণ ঘণ্টা ও মিনিট বরাদ্দ রয়েছে। এই ঘণ্টা ও মিনিটগুলোকে আপনি জমা করে রাখতে পারবেন না আবার কারো সাথে বিনিময়ও করতে পারবেন না। এ ব্যাপারে মহাগ্রন্থ আল কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন, "প্রত্যেক ব্যক্তির নির্ধারিত সময় যখন উপস্থিত হবে তখন আল্লাহ কাউকে অবকাশ দেবেন না। তোমরা যা কর আল্লাহ সে বিষয়ে খবর রাখেন” (সূরা মুনাফিকুন-১১)। নির্দিষ্ট সময় চলে যাওয়ার পর আর অবকাশ পাওয়া যায় না। পরীক্ষার আগে প্রস্তুতির যে সময় পাওয়া যায় সেটি যখন শেষ হয় পরীক্ষা সমাগত হয় তখন ইচ্ছা করলেও আগের সময় ফিরে পাওয়ার কোন অবকাশ নেই। দুনিয়ার জীবনে হয়তো আন্দোলন বিক্ষোভ করে পরীক্ষা পেছানো যেতে পারে কিন্তু পরকালীন জীবনে মানুষ আর্তচিৎকার করেও সময়ের অবকাশ পাবে না। এ ব্যাপারে মহান আল্লাহ বলেন, "সেখানে তারা আর্তচিৎকার করে বলবে, হে আমাদের রব বের করুন আমাদেরকে। আমরা সৎ কাজ করব। আগে যা খারাপ কাজ করতাম তা আর করব না। (আল্লাহ বলবেন) আমি কি তোমাদেরকে এতটা বয়স দিইনি যাতে যা চিন্তা করার সে বিষয় চিন্তা করতে পারতে? উপরন্তু তোমাদের কাছে সতর্ককারীও আগমন করেছিল। অতএব আস্বাদন কর। জালেমদের জন্য কোন সাহায্যকারী নেই” (সূরা ফাতির-৩৭)। সত্যিকার অর্থে তারাই সময় সম্পর্কে উদাসীন, যারা অবচেতন মনে সময় নষ্ট করেন। তারা জীবনে সফলতার মুখ দেখেন না। সম্মুখীন হন চরম ক্ষতির। সময় নষ্ট করা মানেই জীবনকে ক্ষতির সম্মুখীন করে ধ্বংসের অতল গহ্বরে তলিয়ে দেয়া। মহান আল্লাহ সূরা আসরের মধ্যে এ ব্যাপারে উল্লেখ করেছেন, "সময়ের কসম নিশ্চয়ই মানুষ ক্ষতির মধ্যে নিমজ্জিত। তবে তারা ছাড়া যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে এবং পরস্পরকে সত্য ও ধৈর্যের উপদেশ দেয়” সুতরাং সময়ের সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করে আমাদেরকে সফলতার স্বর্ণ শিখরে পৌঁছাতে হবে। সময় ও কাজকে ভাগ করে নেয়া যায় এভাবে- ১. অবশ্যই করণীয় ২. করণীয় ৩. করা দরকার ৪. সময় থাকলে করা ভালো। অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে কাজ না করলে কাঙ্ক্ষিত সফলতা অর্জন করা সম্ভব নয়। এ জন্য সফলতার মূল চাবিকাঠি হলো অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কাজ করা।
সাফল্যের চূড়ায় উত্তীর্ণ হতে মানুষ নানা ধরনের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়। অনেক কষ্টে, ঘামে শ্রমে পরি রাসূল (সা) তখন মক্কার কোরাইশদের সাথে চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে যাচ্ছিলেন। যার মধ্যে একটি চুক্তি ছিল-মক্কার কেউ পালিয়ে এলে তাকে ফেরত দিতে হবে। ঠিক সেই মুহূর্তে হাজির আবু জান্দাল (রা)। বর্ণনা দিলেন তার ওপর কোরাইশদের নির্মম নির্যাতনের। আকুতি জানালেন তাকে উদ্ধারের। ক্রান্তিলগ্ন সেই মুহূর্তে রাসূল (সা) আবু জান্দালের উদ্দেশে বললেন- হে আবু জান্দাল, ধৈর্য ও সংযমের সাথে অপেক্ষা কর। আল্লাহ তোমার ও অন্যান্য মজলুমের জন্য কোনো রাস্তা বের করে দিবেনই। সন্ধিচুক্তি হয়ে গেছে, কাজেই আমরা বিশ্বাস ভঙ্গ করতে পারি না। সেই দিন হজরত আবু জান্দাল (রা) পরম ধৈর্য ধারণ করে নির্যাতনের ক্ষত-বিক্ষত শরীর নিয়েই ফিরে গিয়েছিলেন। ইতিহাস সাক্ষী, আবু জান্দাল (রা) তার ধৈর্যের পুরস্কার পেয়েছিলেন, মুক্তি পেয়েছিলেন জুলুমবাজদের নির্মমতা থেকে। শুধু তাই নয়, মদিনাবাসী তথা রাসূল (সা) এবং তার সাহাবীরাও পেয়েছিলেন সুস্পষ্ট বিজয়।
আজকের সমস্যাসঙ্কুল নির্যাতিতদের জন্যও সেখান থেকে শিক্ষা নেয়ার আছে। বর্তমান জুলম-নির্যাতনের জগদ্দল পাথর থেকে মুক্তির জন্য আমরা প্রত্যেকে যদি হজরত আবু জান্দাল (রা)-এর ধৈর্য থেকে শিক্ষা নিয়ে এই কঠিন মুহূর্তে পরম ধৈর্য ধারণ করতে পারি তাহলে সাফল্য ও বিজয় আমাদের জন্যও সুনিশ্চিত।
📄 কুরআনের বাণী- সময়ের কসম, নিশ্চয় মানুষ ক্ষতির মধ্যে নিমজ্জিত
মহাগ্রন্থ আল কুরআনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূরা হচ্ছে আল আসর। এই সূরাটির আয়াত তিনটি। এটি কুরআনের ছোট সূরাগুলোর অন্যতম। এই সূরাটি ছোট হলেও এর তাৎপর্য ব্যাপকতর। লেখার শিরোনামটি এই সূরারই প্রথম অংশের অর্থ। মহাগ্রন্থ আল কুরআনে আল্লাহ তায়ালা এই সূরাতে সময়ের শপথ নিয়ে মানুষ যে ক্ষতির মধ্যে নিমজ্জিত তা তুলে ধরেছেন তার পাশাপাশি কারা ক্ষতির কবল থেকে মুক্ত থাকবে তার কথাও গুরুত্ব সহকারে তুলে ধরেছেন। সূরাটির পুরো অর্থ নিম্নে তুলে ধরা হলো- “সময়ের কসম। নিশ্চয় মানুষ ক্ষতির মধ্যে নিমজ্জিত। তবে তারা ছাড়া যারা ঈমান এনেছে ও সৎকাজ করতে থেকেছে এবং পরস্পরকে হক কথার ও সবর করার উপদেশ দিতে থেকেছে” (সূরা আসর)।
ছোট্ট এই মাক্কী সূরাটিতে মহান আল্লাহ তায়ালা স্পষ্ট ভাষায়, মানুষের সাফল্য-ব্যর্থতা, কল্যাণ-অকল্যাণ এবং ধ্বংসের পথ বর্ণনা করেছেন। মানুষের জীবনের প্রতিটি সময়কে গুরুত্ব দিয়ে কাজে লাগিয়ে জীবনটাকে বদলে দেয়ার জন্য এই সূরার অনুসরণই যথেষ্ঠ। এই সূরার তাৎপর্য উপলব্ধি করে কাজ করতে পারলে সাফল্য অনিবার্য। ইমাম শাফেয়ী (রহ) বলেন- "মানুষ যদি এই একটি সূরা অর্থাৎ সূরা আসর নিয়ে চিন্তা ভাবনা করে তাহলে এটিই তাদের হেদায়েত তথা সফলতার জন্য যথেষ্ট" হাদিসে বর্ণিত হয়েছে হযরত ওবাইদুল্লাহ বিন হিসন (রা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, "রাসূলুল্লাহ (সা) এর সাহাবীদের মধ্য থেকে যখন দুই ব্যক্তি মিলিত হতেন তখন তারা একজন অপরজনকে সূরা আসর না শোনানো পর্যন্ত বিচ্ছিন্ন হতেন না" (তাবারানি)।
মহান আল্লাহ এখানে সময়ের কসম করার যথার্থ যুক্তি আছে। আল্লাহ সৃষ্টিকুলের কোন বস্তুর শ্রেষ্ঠত্ব, অভিনবত্ব প্রকাশের জন্য কখনও কসম বা শপথ করেননি বরং যে বিষয়টি অকাট্যভাবে প্রমাণ করতে চেয়েছেন তার ক্ষেত্রেই তিনি সত্যতা প্রমাণ করতে কসম খেয়েছেন। সময় অতি মূল্যবান একটি বিষয়। সময় বলতে অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎকে বুঝায়। এটি কোন দীর্ঘ সময় এর অর্থে নয়। ভবিষ্যতের গর্ভ থেকে বের হয়ে আসা বর্তমান অতীতে নিপতিত সময়কে বুঝানো হয়েছে। অতীতের কসম হলো ইতিহাসের সাক্ষ্য। বর্তমানের কসম হলো বর্তমানের অতিবাহিত সময়। মানুষকে কাজের জন্য সময় দেয়া হচ্ছে। সময় এক ধরনের মূলধন। মূলধন নামক মানুষের এই সময় দ্রুতই অতিবাহিত হচ্ছে। এর উদাহরণ দিতে গিয়ে ইমাম রাযী (রহ:) একজন মনীষীর উক্তি উল্লেখ করে বলেছেন; তাহলো- "একজন বরফ বিক্রেতার কথা হতেই আমি সূরা আল আসরের অর্থ বুঝতে পেরেছি যে বাজারে জোর গলায় চিৎকার করে বলছিল- দয়া করো এমন এক ব্যক্তির প্রতি যার পুঁজি (বরফ) গলে যাচ্ছে। দয়া করো এমন ব্যক্তির প্রতি যার পুঁজি (বরফ) গলে যাচ্ছে। তার এ কথা শুনে আমি বললাম এইটিই হচ্ছে আসলে 'নিশ্চয় মানুষ ক্ষতির মধ্যে নিমজ্জিত' বাক্যের প্রকৃত অর্থ।
মানুষকে যে সময় (আয়ুষ্কাল) দেওয়া হয়েছে তা বরফ গলে যাওয়ার মতো দ্রুত অতিবাহিত হয়ে যাচ্ছে। একে যদি নষ্ট করে দেওয়া হয় অথবা ভুল কাজে ব্যয় করা হয় তাহলে সেটিই মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় ক্ষতি। কাজেই চলমান সময়ের কসম খেয়ে এই সূরায় যা বলা হয়েছে তার অর্থ এই যে, এই দ্রুত গতিশীল সময় সাক্ষ্য দিচ্ছে, সূরা আসরে বর্ণিতশ্রমে সেই সাফল্যকে নিজের করে নেয়। নিজের অর্জিত সাফল্যের পথপরিক্রমা পর্যালোচনা করলে দেখা যায় তাতে ধৈর্যের রয়েছে বিশাল অবদান। কাজের ক্ষেত্রে কেউ যদি ধৈর্যশীল হয় তাহলে তার সফলতা অর্জনের সম্ভাবনা থাকে শতভাগ। ধৈর্য হারালে ফল হয় তার বিপরীত। সমাজে এমনও মানুষ আছেন যারা ধৈর্যধারণের অভাবে কাঙ্ক্ষিত সাফল্যের সিডিতেই আরোহণ করতে পারেন না। আবার কেউ এমনও আছেন যারা সাফল্যের চূড়ায় গিয়েও সামান্য ধৈর্যের অভাবে হোঁচট খেয়ে সাফল্য হাতছাড়া করে ফেলেন। তাই এটি অনস্বীকার্য সত্য যে ধৈর্য সাফল্য লাভের অন্যতম চাবিকাঠি। সাফল্যের অন্যতম চাবিকাঠি হওয়ায় ধৈর্যের প্রতিযোগিতায়ও আমাদের উত্তীর্ণ হতে হবে। মহান আল্লাহ বিজ্ঞানময় কুরআনে এ ব্যাপারে বলেন, "হে ঈমানদারগণ (বিশ্বাসীগণ)! তোমরা সবর কর এবং সবরের প্রতিযোগিতা কর" (সূরা আলে ইমরান-২০০)।
মানুষের জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপই একেকটি পরীক্ষাক্ষেত্র। পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েই মানুষকে পথ চলতে হয়। মানুষের এই পথচলায় ধৈর্য একজন সাহসী সঙ্গীর মতো। পরীক্ষার চরম মুহূর্তে পরম বন্ধুর মতো যিনি ধৈর্যকে সত্যিকারের সঙ্গী বানাতে পারেন সাফল্য তিনিই ছিনিয়ে আনতে পারেন। আর যিনি ধৈর্য নামক সঙ্গীকে হারিয়ে ফেলেন তিনি সাফল্য অর্জন তো দূরের কথা সাফল্যের দেখাও পান না। প্রতিনিয়ত পরীক্ষার সম্মুখীন মানুষদের মধ্যে শুধু ধৈর্যশীলদের জন্যই রয়েছে সাফল্য লাভের সুসংবাদ। এ ব্যাপারে মহাগ্রন্থ আল কুরআনে মহান আল্লাহ বলেন, “অবশ্যই তোমাদেরকে ভয় ও ক্ষুধা দিয়ে পরীক্ষা করব। আর তোমাদের জান, মাল ও শস্যের ক্ষতি সাধন করেও পরীক্ষা করব আর ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দাও” (সূরা বাকারা-১৫৫)। এ প্রসঙ্গে হযরত আনাস (রা) থেকে একটি হাদিস বর্ণিত রয়েছে। তিনি বলেন, রাসূল (সা) বলেছেন, "বিপদ ও পরীক্ষা যত কঠিন হবে, তার প্রতিদানও তত মূল্যবান। আর আল্লাহ যখন কোন জাতিকে ভালবাসেন, তখন অধিক যাচাই ও সংশোধনের জন্য তাদেরকে বিপদ ও পরীক্ষার সম্মুখীন করেন। অতঃপর যারা আল্লাহর সিদ্ধান্তকে খুশি মনে মেনে নেয় এবং ধৈর্য ধারণ করে, আল্লাহ তাদের ওপর সন্তুষ্ট হন। আর যারা এ বিপদ ও পরীক্ষায় আল্লাহর ওপর অসন্তুষ্ট হয়, আল্লাহও তাদের প্রতি অসন্তুষ্ট হন" (তিরমিযি)।
সাফল্য অর্জনের জন্য সকল কাজে ধৈর্য ধারণ করা প্রয়োজন। কাজ শুরু করে ধৈর্যসহকারে এগোতে থাকলে ফল আসবেই। সামান্য ধৈর্যচ্যুতিই বিপর্যয় ঘটাতে পারে সাফল্যে। ধৈর্য ধারণ করে কাজ করলে সেই কাজের ফল অবশ্যই পাওয়া যাবে। কারণ মহান আল্লাহ তায়ালা সূরা হুদের ১১৫ নম্বর আয়াতে বলেন, "সবর অবলম্বন কর। আল্লাহ মুহসিনদের কর্মফল বিনষ্ট করেন না" ধৈর্যশীলরা যেমন সাফল্য লাভ করেন তেমনি তারা বেশি লোকের ওপর বিজয়ী হন। সূরা আনফালের ৬৫ নম্বর আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে- "তোমাদের মধ্যে যদি ২০ জন ধৈর্যশীল থাকে তবে ২০০ জনের ওপর বিজয়ী হবে"
ধৈর্য ধারণ করে ধীরে ধীরে নিজেকে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছানো সম্ভব। এ ক্ষেত্রে তাড়াহুড়োর কোনো সুযোগ নেই। যেকোনো কাজেই তাড়াহুড়ো সমস্যার কারণ হতে বাধ্য। কারণ কোনো বিষয়ে রাতারাতি কিংবা এক-দু'দিনেই সাফল্যের শিখরে পৌঁছা যাবে এটা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। আবার মাসের পর মাস চলে গেছে টার্গেট অনুযায়ী কাজ হচ্ছে না ভেবে কাজ ছেড়ে পালানোতেও কোনো কল্যাণ নেই। তাড়াহুড়োয় যেমন সাফল্য অর্জিত হয় না তেমনি ধৈর্যচ্যুতিতেও সাফল্য ধরা দেয় না। বরং সামনের সময়টুকু কিংবা সামনের দিনগুলোতেই সাফল্যের দেখা মিলবে এরূপ চিন্তা করে ধৈর্য নিয়ে কাজ করে যেতে পারলে ফলাফল আসবেই। হজরত আলী (রা) বলেন, সব বিষয়ে তাড়াহুড়ো করা এক ধরনের পাগলামি। সাধারণত এ ধরনের লোক পদে পদে লাঞ্ছিত হয়।
ধৈর্য একটি মহৎ গুণ। হজরত আবু চারটি গুণাবলী শূন্য হয়ে যে মানুষ যে কাজেই নিজের জীবনকাল অতিবাহিত করে- তার সবটুকুই ক্ষতির পরিবর্তে অন্য কাজে সময় নষ্ট করেছে, তাকে পরীক্ষার হলে টানানো ঘড়ির কাঁটা বলে দিচ্ছে তুমি নিজের ক্ষতি করছো। যে ছাত্র এই সময়ের প্রতিটি মুহূর্ত নিজের প্রশ্নপত্রের জবাব দেবার কাজে ব্যয় করেছে একমাত্র সেই লাভবান হচ্ছে। আর রেজাল্টের দিন সেই ছেলেটিই সফলতা অর্জন করবে।
এ সূরায় চারটি গুণাবলীর অধিকারী ব্যক্তির কথা বলা হয়েছে যারা সময়ের বহমান স্রোতে ক্ষতির মধ্যে নিমজ্জিত হওয়া থেকে রক্ষা পাবে-১. যারা ঈমান এনেছে ২. যারা সৎ কাজ করতে থেকেছে ৩. যারা পরস্পরকে হকের উপদেশ দিতে থেকেছে এবং ৪. যারা পরস্পরকে সবর বা ধৈর্য ধারণের উপদেশ দিতে থেকেছে। প্রথম কাজ হলো ঈমান আনা। শুধুমাত্র মুখে স্বীকার করলেই তাকে ঈমান আনা বলা হয় না বা ঈমানের দাবি পূরণ হয় না। বরং ঈমানের তিনটি ধাপ রয়েছে। তা হলো অন্তরে দৃঢ় বিশ্বাস স্থাপন করা, তারপর মুখে স্বীকৃতি তথা বিশ্বাস অনুযায়ী মুখে প্রকাশ করা, তৃতীয়ত বাস্তবে কাজে পরিণত করা। আল্লাহ বলেন- আসলে তারাই প্রকৃত মুমিন যারা আল্লাহ ও রাসূলের (সা) প্রতি ঈমান এনেছে এরপর কোনরূপ সন্দেহে পতিত হয়নি। (সূরা হুজুরাত : ১৫)
দ্বিতীয়ত, ক্ষতির মধ্যে নিমজ্জিত হওয়া থেকে রক্ষা পাবে তারা যারা আমলে সালেহ তথা সৎ কাজ করতে থেকেছে। কুরআনের পরিভাষায় সালেহাত সমস্ত সৎকাজ এর অন্তর্ভুক্ত। কুরআনের দৃষ্টিতে, যে কাজের মূলে ঈমান আছে এবং যা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সা) প্রদত্ত হেদায়াতের ভিত্তিতে সম্পাদিত হয়েছে তা সৎকাজ। ঈমানের পর সৎকাজের বর্ণনার অর্থ হলো ঈমান বিহীন কোন সৎকাজের পুরস্কার পাওয়ার সুযোগ নেই। সৎকাজবিহীন ঈমান একটি দাবি ছাড়া আর কিছুই নয়। ঈমান ও সৎকাজ বীজ আর বৃক্ষের মতো। আল্লাহ এবং বান্দার হক আদায়, মা বাবার খেদমত করা, বড়দের সম্মান করা ছোটদের স্নেহ করা, আত্মীয় স্বজন এবং প্রতিবেশীর হক আদায় করা, অপরকে কষ্ট দেয়া থেকে বিরত থাকা প্রভৃতি গুরুত্বপূর্ণ সৎ কাজ।
ক্ষতির মধ্যে নিমজ্জিত হওয়া থেকে রক্ষা পাওয়ার পরবর্তী দু’টি গুণ হলো- যারা ঈমান আনে ও সৎকাজ করে তারা পরস্পরকে হক কথা বলা, হক কাজ করা এবং ধৈর্য ধারণের উপদেশ দিতে হবে। এর প্রাথমিক অর্থ হচ্ছে ঈমানদার ও সৎকর্মশীলদের পৃথক না থেকে সম্মিলিতভাবে একটি সৎ সমাজ গড়ে তুলতে হবে। যেখানে নিজে হকের উপর অবিচল থাকার পাশাপাশি অন্যকেও এ পথে আহবান করতে হবে। মনে রাখতে হবে সমাজে একা একা ভালো থাকা যায় না। কেউ যদি মনে করেন তিনি ভালো থাকবেন ঘরে বসে থাকলেই হবে, তার পক্ষে তা সম্ভব হবে না। কারণ সমাজের ক্ষতির প্রভাব চরিত্রের ওপর কোনো না কোনো ভাবে পড়বেই। ফলে একা একা হকের পথে থেকেও ফিরে আসলেই ভালো থাকতে পারবেন না। সবাইকে ভাল পথে হকের পথে সত্যের পথে নিয়ে আসার চেষ্টা অব্যাহত রাখার মাধ্যমেই ভাল থাকা সম্ভব।
চতুর্থ গুণটি হলো সবর বা ধৈর্য। হকের নসিহত করতে গিয়ে বা হকের সমর্থন করতে গিয়ে যে সব সমস্যা ও বাধার মুখে নিপতিত হতে হয় তার মোকাবেলায় তারা পরস্পরকে অবিচল ও দৃঢ় থাকার উপদেশ দিতে থাকবে। হক এবং বাতিলের দ্বন্দ্ব চিরন্তন। যেখানেই হক সেখানেই বাতিল আঘাত হানার চেষ্টা করে। হক তথা সত্য পথে থেকে সফলতা অর্জন করতে গেলে বাধা বিপত্তি আসবেই। ধৈর্যের সাথে তার মোকাবেলা করতে হবে। আর ধৈর্যশীলদের জন্যই আল্লাহর পুরস্কার নির্ধারিত।