📘 জীবন বদলে যাবে > 📄 জ্ঞানার্জন আর সাধনার বিকল্প নেই

📄 জ্ঞানার্জন আর সাধনার বিকল্প নেই


আধুনিক বিশ্বে এ কথা আজ দিবালোকের মতো সত্য যে, জ্ঞানই হচ্ছে মানুষের মূল শক্তি। জ্ঞানের শক্তিতেই মানুষ সাফল্যের স্বর্ণ শিখরে আরোহণ করতে পেরেছে। জ্ঞান মানুষকে দেখিয়েছে আলোকিত পথের সন্ধান। এ জন্য জ্ঞানকে একদিকে বলা হয় 'শক্তি' (Knowledge is Power) আবার অন্যদিকে বলা হয় 'আলো' (Knowledge is Light)। সভ্যতার উন্নতির মহাসড়কে আরোহণ করতে জ্ঞানই মানুষকে সহায়তা করছে। তবে শুধু জ্ঞানার্জনই সাফল্যের মূল চাবিকাঠি নয় বরং জ্ঞানের সাথে সাধনার সংযোগ সাফল্য অর্জনকে নিশ্চিত করেছে। সাধনাও এমন এক শক্তি যা মানুষের অর্জনকে ধরা দিতে সহজ করে দেয়। যে জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে মানুষ সাফল্য পেতে চায়, সাধনা সেই সাফল্য অর্জনে গতিশীলতা সৃষ্টি করে। জ্ঞানার্জন এবং সাধনা ব্যতীত সাফল্য অর্জনের আশা করাটা বোকামি ছাড়া আর কিছু নয়। জ্ঞানার্জন আর সাধনা একে অপরের পরিপূরক। কেউ যদি চিন্তা করে জ্ঞানার্জন আর সাধনার কোন একটি ছাড়াই সাফল্যের স্বর্ণশিখরে পৌঁছে যাবেন তাহলে তিনি বোকার স্বর্গে বাস করছেন। কারণ, জ্ঞানার্জন আর সাধনা ছাড়া সাফল্য অর্জন সম্ভব নয়। এ প্রসঙ্গে কুরআনে এসেছে- "চেষ্টা সাধনা ব্যতীত মানুষের জন্য কিছুই নেই” (সূরা নাজম : ৪০)। অপর এক আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, “মানুষের জন্য কিছুই নেই, কিন্তু শুধু সে তাই লাভ করবে, যার জন্য সে চেষ্টা সাধনা করেছে" (সূরা ত্বা-হা: ১৫)। জ্ঞানার্জন আর সাধনা মানুষকে সাফল্যের পথ চিনিয়েছে। মহান আল্লাহ বিজ্ঞানময় গ্রন্থ আল কুরআনে উল্লেখ করেছেন, "যারা আমাদের পথে চেষ্টা-সাধনা করবে, আমরা তাদেরকে আমাদের পথ দেখাব। নিশ্চয়ই আল্লাহ সৎকর্মশীলদের সাথে আছেন” (সূরা আনকাবুত : ৬৯)।

জ্ঞানার্জন মানুষকে ভালো-মন্দ, ন্যায়-অন্যায়, সুন্দর-অসুন্দর, সাফল্য-ব্যর্থতাকে চিনতে এবং জানতে সাহায্য করে। মানুষ কিসে সাফল্য অর্জন করবে তার পথ দেখায় মূলত জ্ঞানার্জন বা শিক্ষা। জ্ঞানার্জনকে আবর্তন করেই মানুষ বাকি সব বিষয়কে সাথে নিয়ে সাফল্যের শিখরে পৌঁছায়। যার জ্ঞান নেই তার বিবেক-বুদ্ধি কোন কাজে আসে না। সাদা-কালো, ছোট-বড়, ধনী-গরিব এগুলো মানুষের মাঝে ব্যবধানের মূল উপাদ্য বিষয় নয় বরং মানুষে মানুষে ব্যবধান গড়ে তোলে জ্ঞানার্জন। জ্ঞানী আর জ্ঞানহীন ব্যক্তি কখনো সমান হতে পারে না। মহাগ্রন্থ আল কুরআনে মহান আল্লাহ বলেন, "যারা জানে আর যারা জানে না তারা কি সমান হতে পারে?” (সূরা যুমার: ৯)। শুধু তাই নয়, প্রকৃত শিক্ষা বা জ্ঞানার্জনের মাধ্যমে মানুষ নিজের চরিত্রকে সুন্দর করে গড়ে তুলতে পারে। নিজের রুটি-রুজির ব্যবস্থা করতে পারে। সত্য-মিথ্যার পার্থক্য নির্ণয় করতে পারে। কল্যাণ-অকল্যাণের পথ খুঁজে নিতে পারে, আলো আর অন্ধকারের পার্থক্য বুঝতে পারে, সর্বোপরি নিজেকে একজন সফল সত্যিকারের মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে পারে। আর নিজেকে মানুষের মতো মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে পারাটাই গোটা জীবনের মূল সাফল্য, বিরাট সার্থকতা।

জ্ঞানার্জন আর সাধনা মানুষকে সমৃদ্ধির শিখরে পৌঁছতে সাহায্য করে। পৃথিবীতে আজ পর্যন্ত যারাই সাফল্য লাভ করেছেন, খ্যাতির শিখরে আরোহণ করেছেন তারা কেউ জ্ঞানার্জন কিংবা সাধনা ব্যতীত সফল হয়েছেন এমনটি ভাবার সুযোগ নেই। বরং তাদের জীবনী পর্যালোচনা করলে দেখা যায় জ্ঞানার্জন আর সাধনাবলেই তারা সাফল্য লাভ করেছেন। সামান্য মানুষ হলেও নগণ্য পরিবারে জন্মগ্রহণ করেও শুধুমাত্র জ্ঞানার্জন আর সাধনার ফলে মানুষ সাফল্যমন্ডিত ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়েছেন। শেকসপিয়র একজন নগণ্য পরিবারের ছেলে ছিলেন, নিউটন ছিলেন চাষার ছেলে। কিন্তু জ্ঞানার্জন আর সাধনা দ্বারা তারা নিজেদেরকে আরোহণ করিয়েছেন সাফল্যের চূড়ায়। গড়ে তুলতে পেরেছেন ব্যক্তিত্ববান হিসেবে। রাজা এড্রিয়ন যখন বালক ছিলেন তখন তার অধ্যয়নের সময় আলো জ্বালানোর প্রয়োজনীয় তেলও জুটতো না। তারপরও এড্রিয়ন হাল ছাড়েননি, পরিশ্রম করে, সাধনা করে চালিয়ে গেছেন তার জ্ঞানার্জন। দিনের আলোতেই বেশি পড়া আদায় করার চেষ্টা করেছেন, আর রাতের বেলায় রাস্তার আলোতে তিনি পড়তেন। তার এই পরিশ্রম এবং সাধনাই তাকে সাফল্য এনে দিয়েছিল। বিজ্ঞানী নিউটন সাধনা আর পরিশ্রমের মাঝেই সাফল্য খুঁজেছিলেন। তিনি বলেছেন, "আমার আবিষ্কারের কারণ আমার প্রতিভা নয় বরং সাধনা আর পরিশ্রমই আমাকে সার্থক করে তুলেছে" ভলটেয়ারের মতে- "প্রতিভা বলতে মানুষের মুখ্য কোন জিনিস নেই বরং পরিশ্রম কর, সাধনা কর তাহলে সাফল্য তোমার পদচুম্বন করবেই"

জ্ঞানার্জন ও সাধনা ব্যতীত ব্যক্তি ও জাতির কোন উন্নতি হয় না। জ্ঞানার্জনের সাথে যদি সাধনা যোগ থাকে তাহলে মানুষ জীবনে অনেক সাফল্য অর্জন করতে পারে। শুধু জ্ঞান থাকলেই যেমন সাফল্য অর্জিত হয় না, তেমনি শুধু সাধনা করলেই সাফল্যের দেখা পাওয়া যায় না। দুটোর মধ্যে সমন্বয় থাকা প্রয়োজন। অর্জিত জ্ঞান দিয়ে সাফল্য বের করে আনতে সাধনার কোন বিকল্প নেই। জীবন যে অবস্থায় থাকুক না কেন, প্রতিবন্ধকতার পর প্রতিবন্ধকতা পথ আগলে রাখুক না কেন জ্ঞানের সাথে ব্যক্তিকে সম্পর্ক রাখতে হবে। কারণ, জ্ঞানের চরম সার্থকতা হলো জ্ঞান সকল প্রতিবন্ধকতার দ্বার উন্মোচন করে দেয়, জ্ঞানের সাথে যোগ থাকলে কেউ ব্যক্তিকে পরাভূত করতে পারে না।

জ্ঞান মানুষের জীবনকে সাফল্যের শিখরে পৌছতে বিভিন্নভাবে সহায়তা করে। মানুষের ঘুমন্ত শক্তি, বিবেক, বুদ্ধি এবং মস্তিষ্কের লুকানো ক্ষমতাকে জ্ঞান জাগিয়ে তুলে প্রকৃত সফল মানুষ হিসেবে ব্যক্তিকে তৈরি করতে সুযোগ করে দেয়। জ্ঞানার্জন আর সাধনা ব্যতীত কোন কাজে সফলতা আসে না। সারা বছর বসে থেকে যারা পরীক্ষার সময় ধুমসে পড়ে রেজাল্ট অর্জন করতে চান তারা মূলত পরীক্ষার হলে গিয়ে চোখে মুখে অন্ধকার দেখেন। জ্ঞানার্জনের এটি কোন সঠিক পদ্ধতি নয়। কারণ শুধু পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারার মধ্যেই জ্ঞানার্জনের মূল সার্থকতা নেই। বরং বলা হয়েছে জ্ঞান এমন একটি জিনিস 'যেখানে যা পাবে সেখান থেকেই তা আহরণ করবে'। পড়া মুখস্থ করতে গিয়ে যেটাকে পাহাড়সম মনে হচ্ছে সেটা যদি নিয়মিত পড়া হতো, সেই ক্লাসে অংশগ্রহণ করা হতো, তাহলে এটিকে পানির মত সহজ মনে হতো। 'সকালে উঠিয়া আমি মনে মনে বলি, সারাদিন আমি যেন ভাল হয়ে চলি' কবিতার এই দু'টি লাইন জিজ্ঞেস করলে কে এমন আছে বলতে পারবে না। আসলে এই দু'টি লাইনের চর্চা এতো বেশি হয়েছে যে ব্যক্তি বুড়ো হওয়ার পরও তা ভুলে যায় না। আমরাও যদি আমাদের জ্ঞানের চর্চা এমন করে যতবেশি বাড়াতে পারবো ততবেশি আমাদের জ্ঞান সমৃদ্ধ হবে। এ জন্য আমাদের প্রয়োজন পড়ার সময় পড়া, প্রতিদিনের পড়া প্রতিদিন আদায় করা, নিয়মিত ক্লাসে অংশগ্রহণ করা। তখন আর পরীক্ষার পূর্বে পড়াকে পাহাড়সম মনে হবে না। আর পরীক্ষার হলেও চোখ মুখ অন্ধকারাচ্ছন্ন হবে না। মূলত শিক্ষা বা জ্ঞানার্জন এমন জিনিস দূর থেকে কঠিন মনে হবে কিন্তু কাছে এসে তা গ্রহণ শুরু করলে মনে হবে জ্ঞানার্জন অতি সহজ।

জ্ঞানার্জন আর সাধনার পেছনে বিশ্বের মহামনীষীরা কিভাবে ছুটেছেন তা একটু খেয়াল করলেই কারো বুঝতে কষ্ট হবে না। জ্ঞানের পেছনে শ্রম ঢেলে, দৃষ্টিশক্তি হারিয়েও যিনি দমে যাননি তিনি হলেন দার্শনিক আল রাযী। তিনি প্রায় ২০০টি গ্রন্থ রচনা করেছিলেন। তার আল জুদারি ওয়াল- হাসানাহ নামক পুস্তিকাটি শুধু ইংরেজিতেই চল্লিশবার মুদ্রিত ও প্রকাশিত হয়। তার বিনয়ী কথায়ই প্রকাশ পায় তিনি জ্ঞানার্জনে কতটা অদম্য ছিলেন। তিনি বলেন, জ্ঞান সাধনায় আমার অদম্য উৎসাহের ফলেই মাত্র এক বছরে আমি কুড়ি হাজার পৃষ্ঠার মৌলিক রচনা লিখেছি (প্রতিদিন প্রায় ষাট পৃষ্ঠা)। দিবা-রাত এমন কঠোর পরিশ্রম করেছি যে, শেষে আমি দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলি। তবু আজও আমি অন্যকে দিয়ে বই পড়িয়ে শুনি কিংবা আমার রচনা লেখাই। প্রখ্যাত পন্ডিত আল কিন্দি একাধারে বারটি স্বতন্ত্র বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হওয়ার পরও ছয়টি ভাষাতে অসাধারণ ব্যুৎপত্তি অর্জন করেন এবং প্রায় ২৬৫টি গ্রন্থ রচনা করেন। প্রখ্যাত দার্শনিক ও বিজ্ঞানী আল ফারাবিও জ্ঞানের পেছনে ব্যাপক শ্রম দিয়েছেন। তিনি দশটি ভাষায় অনর্গল কথা বলতে পারতেন এবং ৬টি স্বতন্ত্র বিষয়ে তার অগাধ পান্ডিত্য ছিল। প্রায় ৭০টি বিরাট নোটবুকে দর্শনশাস্ত্রের সারাংশ তিনি লিপিবদ্ধ করেছিলেন। বিখ্যাত ইতিহাসবিদ ও পন্ডিত আল তাবারি ক্রমাগত চল্লিশ বছর যাবৎ দৈনিক ৪০ পৃষ্ঠা করে মৌলিক রচনা লিখতেন। যার যোগফল দাঁড়ায় প্রায় পাঁচ লক্ষ ৮৪ হাজার পৃষ্ঠা। ফারাবি এরিস্টটলের আত্মা সম্বন্ধীয় গ্রন্থটি একশতেরও বেশিবার এবং পদার্থবিদ্যা বিষয়টি ৪০ বার পাঠ করেছিলেন। ১৮৭৯ সালের ২১ অক্টোবর বিজ্ঞানী টমাস আলভা এডিসন প্রথম বৈদ্যতিক বাল্ব আবিষ্কার করেছিলেন। তার এই আবিষ্কারের পেছনের ইতিহাস অত্যন্ত কঠোর সাধনা আর পরিশ্রমের। কারণ তিনি ১০ হাজার বার চেষ্টা করে তবেই সাফল্য পেয়েছিলেন বাল্ব তৈরি করতে। আর তাইতো তিনি বলেছেন, "কাজের ক্ষেত্রে প্রতিভা প্রেরণা জোগায় মাত্র এক ভাগ আর বাকি ৯৯ ভাগ প্রেরণাই আসে পরিশ্রম ও সাধনা থেকে" জাপানিরা বিশ্বের বুকে আজ সফল জাতি, তার পেছনের কারণ তারা কঠোর পরিশ্রম ও সাধনা করে। কারো সাথে দেখা হলে জাপানিদের সম্বোধন 'কেমন ঘামছেন?' প্রমাণ করে তারা পরিশ্রমী। বিশ্বের এক নম্বর শিল্পোন্নত দেশ হিসেবে খ্যাত জাপানে প্রতি বছর প্রায় ১০ হাজার মানুষ অতিরিক্ত পরিশ্রমের কারণে মারা যায়, অথচ তার উল্টো জরিপ করলে দেখা যায়, অলসতার কারণে পৃথিবীতে অনেক মানুষ মারা যায়।

সাধনা ছাড়া দুনিয়াতে কেউ কোন কিছু অর্জন করতে পারেননি। রাসূল (সা) নবুওয়তের আগে ১৫ বছর ধ্যান করেছেন, ১৩ বছর প্রচন্ড ধৈর্যসহকারে দাওয়াত দিয়েছেন, আর ১০ বছর ধরে সংগ্রাম চালিয়ে ঘোষণা দিয়েছেন ইসলামের পূর্ণতার। রাসূল (সা)-এর এমন সাধনাই সকল মত ও পথের ওপর ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা হিসেবে সমাজে বিজয়ী হয়েছিল। ইমাম বুখারী (রহ) হাদিসের সেরা গ্রন্থ বুখারী শরিফ রচনা করতে গিয়ে একটি হাদিস সংগ্রহে ৩ শত মাইল হেঁটেছেন। স্পেলার বলেছেন, "প্রতিভা বলে কিছু নেই। সাধনা করো সিদ্ধিলাভ একদিন হবেই" নোবেল বিজয়ী লিও টলস্টয়কে বলা হয়েছিল জাতীয় উন্নয়নের জন্য আপনি যুবসমাজের প্রতি কিছু বলুন। তিনি বলেছিলেন, আমার তিনটি পরামর্শ আছে- পড়ো, পড়ো এবং পড়ো।

ওহির প্রথম বাণীই ছিল জ্ঞানার্জনের নির্দেশ দিয়ে। মহাগ্রন্থ আল কুরআনের সূরা আলাকের ১নং আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে, "পড়, তোমার প্রভুর নামে যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন" আর পৃথিবীর প্রথম মানব হযরত আদম (আ)-কেও আল্লাহ জ্ঞান শিক্ষা দিয়েছেন। কুরআনে এসেছে, "আল্লাহ তায়ালা আদম (আ)-কে সকল বস্তুর নাম শিখিয়ে দিলেন" (সূরা বাকারা: ৩১)। মানবতার মহান শিক্ষক রাসূল (সা) বলেছেন, "জ্ঞান হচ্ছে মুসলমানদের হারানো সম্পদ" জ্ঞানের শক্তিবলেই মুসলমানরা সমগ্র দুনিয়া শাসন করেছিল। রাসূল (সা) আরো বলেছেন, "জ্ঞান হচ্ছে তোমাদের হারানো সম্পদ, সুতরাং যেখানে পাও তা কুড়িয়ে নাও" হযরত আনাস (রা) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, "প্রত্যেক মুসলমানের ওপর জ্ঞান অর্জন করা ফরয" (জামেউস সগির) (ইবনে মাযাহ)। হযরত আলী (রা)- এর ব্যক্তিগত হাদিস সঙ্কলন 'সহিফা' সংরক্ষিত থাকতো সর্বদা তার তলোয়ারের খাপের ভেতর। আমেরিকার তৎকালীন সবচেয়ে জনপ্রিয় প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট অন্য লোকদের সাথে কথোপকথনের সময়ও ফাঁক দিয়ে বই পড়তেন এবং ভ্রমণের সময় প্রতিদিন প্রায় তিনটি করে বই পড়তেন। নেপোলিয়ান যুদ্ধে গেলেও সাথে থাকতো চলমান বইয়ের লাইব্রেরি এবং যুদ্ধক্ষেত্রেও তিনি বই পড়তেন। মহাত্মা গান্ধী যেখানে গোসল করতেন সেখানে প্রতিদিন একটি করে গীতার শ্লোক লিখে রাখতেন। গোসলের সময় তা গানের সুরে মুখস্থ করে ফেলতেন।

সারা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠত্ব, কর্তৃত্ব, নেতৃত্ব সব কিছুই জ্ঞানের শক্তিবলে মানুষ অর্জন করেছে। অন্ধকার থেকে আলোর পথের দিশা জ্ঞানই মানুষকে দিয়েছে। আর এ ক্ষেত্রে জ্ঞানের সাথে যুক্ত ছিল সাধনা। সাধনা আর জ্ঞান মানুষের সকল সাফল্য অর্জনের নিয়ামক শক্তি হিসেবে কাজ করেছে। তাই জ্ঞানের পাশাপাশি সাধনার কোনো বিকল্প নেই। ইমাম গাযযালী (রহ) বলেছেন, "সাফল্যের অপর নামই অধ্যবসায়"

📘 জীবন বদলে যাবে > 📄 কথা ও কাজে ভারসাম্য রাখুন, কথায় নয় কাজে বিশ্বাসী হোন

📄 কথা ও কাজে ভারসাম্য রাখুন, কথায় নয় কাজে বিশ্বাসী হোন


জীবন পরিচালনায় মানুষকে অনেক কাজ করতে হয়। মানুষের জীবনের সাথে কাজের সম্পর্ক চাকার মতো কারণ চাকা যেমনিভাবে ঘুরে তেমনি ভাবে ঘুরতে থাকে জীবন চাকা (সময়)। এ জন্য মানুষের জীবনকে চাকার সাথে তুলনা করা হয়েছে। প্রত্যহ একজন মানুষের জীবন চাকার মত ঘুরপাক খায়। ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও সাংগঠনিক কত কাজইতো মানুষকে প্রাত্যহিক জীবনে করতে হয়। এসব কাজ করার ক্ষেত্রে ভারসাম্য রক্ষা করতে পারার ওপরই নির্ভর করে সফলতা। মানুষের জীবনচলার পথে হাজারো কাজের মধ্যে এমন কিছু মৌলিক কাজ আছে যেগুলোতে ভারসাম্য রক্ষা করা অতীব জরুরি। তার মধ্যে সর্বাগ্রে প্রয়োজন কথা ও কাজের ভারসাম্য রক্ষা করা। কারণ কথা ও কাজের ভারসাম্যহীনতা গোটা জীবনটাকেই বিফল ও মর্যাদাহীন করে দেয়।

কথা বলা আর কাজ করা দুটো সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়। কথা বলা মানে কাজ করা নয় বরং এ দুয়ের মাঝে পার্থক্যও অনেক বিস্তর। শুধু তা-ই নয়, কথা বলা আর কাজ করার মাধ্যমে সাফল্য অর্জন করার মধ্যেও অনেক পার্থক্য আছে। শুধু কথা বলেই কাজের সাফল্য অর্জিত হয় না। কোনো কথা বললে, কিংবা কোনো কাজের জন্য মনোভাব প্রকাশ করলেই যে কাজ হয়ে যাচ্ছে এরূপ মনে করারও কোনো কারণ নেই। আমরা অনেককেই দেখি কথায় খুব পণ্ডিত কিন্তু কাজের বেলায় আমড়া কাঠের ঢেঁকি। তাই কথার পাণ্ডিত্য দিয়ে সাফল্য অর্জিত হয় না বরং কাজের মাধ্যমেই সম্ভব সাফল্য অর্জন। আমরা যদি কথা দিয়েই সব কিছু জয় করতে চাই তাহলে ক্ষণস্থায়ী কিছু ফল হয়তো মিলতে পারে কিন্তু সাফল্য আমাদের নাগালের বাইরেই থেকে যাবে যদি কাজ করা না হয়।

সাফল্যের অন্যতম চাবিকাঠি হলো কথায় ও কাজে ভারসাম্য রক্ষা করা। কথা এবং কাজের মধ্যে যার ভারসাম্য নেই সাফল্য অর্জনের ক্ষেত্রেও তিনি থাকেন ভারসাম্যহীন। ভারসাম্যহীনতা সফলতার পরিবর্তে ব্যর্থতার ধ্বনি শোনায়। কথা-কাজসহ জীবনের বিভিন্ন মৌলিক বিষয়ের ভারসাম্যহীনতা সফলতার সম্ভাবনাকে ধূলিসাৎ করে দেয়। চাই সেটা কথা ও কাজের মধ্যে কিংবা জীবনাচরণের অন্য কোনো মৌলিক বিষয়ে হোক না কেন। পৃথিবীতে এমন অনেক ব্যক্তি আছেন যারা নিজেদেরকে সফল এবং ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মনে করেন এবং লোকজনও তাদেরকে সফল মানুষ বলেই ভাবে। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে দেখা যায় তাদের কথা ও কাজের ভারসাম্যহীনতা তাদেরকে অতিদ্রুত পতনের গহবরে নিয়ে যায়। কথা ও কাজের ভারসাম্যহীনতা যেমন একজন ব্যক্তিকে পতনের গহবরে নিক্ষেপ করে তেমনি সম্পদের ভারসাম্যহীন খরচ একজন বিত্তশালীকে দেউলিয়া করে দেয়। ঠিক তেমনিভাবে ভারসাম্যহীন খাওয়ার কারণে স্বাস্থ্যের হানি হয়, ভারসাম্যহীন আচরণের কারণে মর্যাদা ভুলুণ্ঠিত হয়। আর এটিতো সবারই জানা আমাদের সমাজে ভারসাম্যহীন কথাবার্তা যে বলে তাকে সবাই পাগল বলে। সমাজে পাগলের অবস্থান আমাদের সবার কাছেই স্পষ্ট।

আমাদের সমাজে এমন অনেকেই আছেন যারা কথার খই ফোটাতে জানেন কিন্তু প্রকৃত সত্য তার বিপরীত। এসব লোকের কথায় মনে হয় তারা যেন মানবতার কল্যাণের দূত। তারাই একমাত্র মানুষের কল্যাণকামী। তাদের কথাগুলো মনে হয় যেন বিজ্ঞজনের মতো। কিন্তু বাস্তব সত্য হচ্ছে এদের আচরণ মোনাফেকদের মতো। এরা জনসম্মুখে মানবতার কথা বলে, মনুষ্যত্বের প্রতি আবেগ আর দরদ দেখায়, বিপরীতে এরা নিজেদের স্বার্থ হাসিলে অত্যাচারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। এদের প্রসঙ্গে হজরত ওমর (রা) থেকে বর্ণিত একটি হাদিস রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, উম্মতের মধ্যে ঐ সমস্ত মোনাফেক লোকের ব্যাপারে ভয় হচ্ছে, যারা বিজ্ঞজনের মতো কথা বলে আর অত্যাচারীর মতো কাজ করে। (বায়হাকি)

ইসলাম একটি ভারসাম্যপূর্ণ জীবনব্যবস্থার নাম। মুসলিম জাতিকে আল্লাহ পাক ভারসাম্যপূর্ণ জাতি (উম্মাতান ওয়াসাতান) হিসেবে সৃষ্টি করেছেন। মহাগ্রন্থ আল কুরআনে এ প্রসঙ্গে এসেছে, "আর এভাবেই আমরা তোমাদের একটি মধ্যমপন্থী উম্মত বানিয়েছি, যাতে তোমরা দুনিয়ার লোকদের জন্য সাক্ষী হতে পার। আর রাসূল সাক্ষী হবেন তোমাদের ওপর” (সূরা বাকারা:১৪৩)। মানবতার ধর্ম ইসলামের বিধানে তাই কথা দিয়ে তা ভঙ্গ করা তথা কথা ও কাজে ভারসাম্যহীনতার কোনো সুযোগ নেই। শুধু ইসলাম কেন, পৃথিবীর কোনো ধর্মই কথা ও কাজের মিল না থাকাকে সমর্থন করে না। ওয়াদা বরখেলাপ, প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ এবং কথা দিয়ে কথা না রাখা প্রতারকের কাজ। আর প্রতারণা কোনো ধরনের ধর্মই সমর্থন করে না। পবিত্র কুরআনে ওয়াদা পালনের বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। কুরআনে এসেছে, "আর সত্যপরায়ণ তারাই যারা ওয়াদা দিয়ে তা পূর্ণ করে" (সূরা বাকারা: ১৭৭)। কুরআনে আরো এসেছে, "এবং প্রতিশ্রুতি পালন করবে, প্রতিশ্রুতির ব্যাপারে কিয়ামতের দিন অবশ্যই কৈফিয়ত তলব করা হবে" (সূরা বনি ইসরাইল: ৩৪)।

কথা ও কাজে ভারসাম্যহীনতাকে সরাসরি মিথ্যাই বলা চলে। ইসলামের দৃষ্টিতে মিথ্যা একটি মারাত্মক অপরাধ বা কবিরা গুনাহ। আর মিথ্যা মোনাফেকিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ আলামত। সমাজে যিনি সাফল্য পেতে চান তার চরিত্রের পাশে যদি মোনাফিক শব্দটি থাকে তাহলে তার অর্জিত সাফল্যও ধ্বংস হয়ে যেতে বাধ্য। হাদিসে রাসূলে (সা) মোনাফিকের ৩টি লক্ষণ উল্লেখ করা হয়েছে- ১. যখন সে কথা বলে মিথ্যা বলে ২. ওয়াদা করলে বরখেলাপ করে এবং ৩. আমানতের খিয়ানত করে। (বোখারি শরিফ)

সমাজে এ রকম কিছু ব্যক্তি আছেন যারা কথা ও কাজে ভারসাম্য রাখেন না এবং হরহামেশা মিথ্যা বলেন। আবার কেউ তাকে মোনাফেক উপাধিও দেয় না। তখন এরা অট্টহাসিতে ফেটে পড়েন আর ভাবেন তাদের থেকে চালাক দুনিয়াতে আর কেউ নেই। তারা ভাবেন তাদের কথা ও কাজের ভারসাম্যহীন এই আচরণ কেউ কখনো ধরতে পারবে না। কিন্তু এসব লোকের জেনে রাখা উচিত তাদের সম্পর্কে সবাই বেখবর নন। তাদের ব্যাপারে অনেক মানুষই জানেন। মানুষের মন থেকে কখনো তাদের প্রতি ভালোবাসা কিংবা শ্রদ্ধাবোধ জাগ্রত হয় না। আর দুনিয়ার জীবনে পার পেলেও পরকালীন জীবনে তাদের শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে। কারণ আর কেউ তাদের আচরণ না বুঝুক কিন্তু মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তো তাদের ঠিকই দেখছেন। যারা নিজে যা বলে তা করে না, তাদের প্রতি আল্লাহর রয়েছে প্রচণ্ড ক্রোধ। এ প্রসঙ্গে মহাগ্রন্থ আল কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন, "হে ঈমানদারগণ, তোমরা যা বল তা নিজে কর না কেন? আল্লাহর নিকট অত্যন্ত ক্রোধ উদ্রেককারী ব্যাপার এই যে, তোমরা যা বল তা বাস্তবে কর না” (সূরা সফ: ২)।

অগনতি শ্রোতার সামনে খুব সহজেই শ্রুতিমধুর বক্তব্য উপস্থাপন করা যায়। কখনো জ্বালাময়ী বক্তব্য দিয়ে অগনতি শ্রোতাকে উদ্বেলিত করা যায়। আবার কখনো মনোমুগ্ধকর যুক্তিনির্ভর বক্তব্য দিয়ে উপস্থিত শ্রোতাকে বিমোহিত করা সহজ। কিন্তু নিজের জীবনে তা বাস্তবায়ন করাটাই আসল বিষয়। শ্রোতাদের উদ্দেশ্যে যে নসিহত বা বক্তব্য উপস্থাপন করা হলো তা কতটুকু বক্তা তার নিজের জীবনে বাস্তবায়ন করতে পেরেছেন। যিনি বক্তা তিনি যে কথাগুলো শ্রোতাদের সামনে উপস্থাপন করলেন তা যদি বক্তার বাস্তব জীবনেই অনুপস্থিত থাকে তাহলে এ বক্তব্যের সার্থকতা কোথায়। বরং কাল কিয়ামতের ময়দানে এসব বক্তাকে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে। হজরত আনাস (রা) থেকে বর্ণিত একটি হাদিস রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, আমি মিরাজের রাত্রে কিছু লোক দেখেছি যাদের ঠোঁট আগুনের কাঁচি দ্বারা কাটা হচ্ছে। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, হে জিবরাইল, এসব লোক কারা? তিনি বললেন, আপনার উম্মতের ঐ সব বক্তা, যারা মানুষকে সৎ কাজের নির্দেশ দিত এবং নিজেরা সে কাজ করতে ভুলে যেত (মেশকাত)। এ প্রসঙ্গে মহাগ্রন্থ আল কুরআনে বলা হয়েছে, "তোমরা লোকদের যে কাজ করার নির্দেশ দাও, তা তোমরা নিজেরা করতে ভুলে যাও" (সূরা বাকারা: আয়াত ৪৪)।

পৃথিবীতে যারা সফল, ব্যক্তিত্বসম্পন্ন এবং মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত তারা কখনো কথার খই ফুটিয়েই এ পর্যায়ে উপনীত হননি। বরং তারা কথার চেয়েও কাজ করেছেন বেশি। কথা ও কাজের মধ্যে ভারসাম্য রেখে জীবন পরিচালনা করেছেন। কথা বলে অন্যকে দিয়ে কাজ করানোর চাইতে নিজেদের কাজ নিজেরা করাই বেশি শ্রেয়। সমাজসংগঠনে তিনিই শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্বে পরিণত হন যিনি তার অধীনস্তকে কাজের নির্দেশ দেয়ার আগে নিজেই কাজে নেমে পড়েন এবং অন্যদের জন্য অনুপ্রেরণার দৃষ্টান্ত হন। এসব ব্যক্তি সবার ভালোবাসার পাত্রে পরিণত হন। আসুন আমরাও কথা ও কাজে ভারসাম্য রক্ষা করি, কথায় নয় কাজে বিশ্বাসী হই।

📘 জীবন বদলে যাবে > 📄 সাহস আছে যার সাফল্যের বিজয়মুকুট তার

📄 সাহস আছে যার সাফল্যের বিজয়মুকুট তার


পৃথিবীটা সত্যিই সাহসী মানুষের জন্য। ভিতু কাপুরুষের জন্য পৃথিবীটা আজাবের কারাগার। সাহস নিয়ে হিম্মতের সাথে পথ চলতে পারলে সফলতা সুনিশ্চিত। আর ভয়ে ভিত হয়ে চলার মধ্যে কোনো কল্যাণ নেই। যারা সাহস নিয়ে পথ চলেছে তারাই পথিবীকে জয় করতে পেরেছে। যুদ্ধজয় থেকে শুরু করে সমুদ্রজয়, পর্বতারোহণ কিংবা বিশ্বজয়- সকল ক্ষেত্রেই সাহসী মানুষ সুখের হাসি হেসেছে। আর ভিতুরা পলায়নপর হয়ে নিজেদের মধ্যেই নিজেরা হারিয়ে গেছে। সাহস যে শুধু যুদ্ধ কিংবা বিশ্বজয়ের জন্য প্রয়োজন তেমনটিই শুধু নয় বরং ছোট হোক কিংবা বড়-প্রতিটি কাজেই সাহসের প্রয়োজন আছে। নিজের মতপ্রকাশেও সাহসিকতার প্রয়োজন হয়। কারণ সাহস না থাকলে সত্য আড়ালে থেকে যায়, ধামাচাপা পড়ে যায়। সাহস করে সত্য কথা বলতে পারা আর চুপ থাকা দুটোর মধ্যে রয়েছে আকাশ-পাতাল পার্থক্য। বরং চুপ থেকে শুধু মনে মনে ঘৃণা করাকে ঈমানের দুর্বলতম স্তর বলে নির্ধারণ করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে একটি প্রসিদ্ধ হাদিস রয়েছে। হযরত আবু সাঈদ খুদরি (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন : আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি তিনি বলেন, “তোমরা কেউ যখন কোনো খারাপ কাজ হতে দেখবে তখন হাত দ্বারা বাধা দেবে, যদি সেই সামর্থ্য না রাখ, তাহলে মুখ দিয়ে নিষেধ করবে, যদি এ সামর্থ্যও না রাখ, তাহলে অন্তর দিয়ে ঘৃণা (প্রতিহত) করবে। আর এটা হচ্ছে ঈমানের দুর্বলতম স্তর” (মুসলিম)।

শুধুমাত্র চুপ থেকে মনে মনে ঘৃণা করে যেমন খারাপ কাজকে বন্ধ করা যায় না, তেমনি সাহস না থাকলে মিথ্যার ওপর সত্যকে বিজয়ীও করা যায় না। পৃথিবীতে সত্য-মিথ্যার দ্বন্দ্ব চিরন্তন। মিথ্যাবাদীরা নির্যাতন নিপীড়ন চালিয়ে সত্যবাদীদের কণ্ঠকে স্তব্ধ করে রাখতে চায়। কিন্তু তারা ব্যর্থ হতে বাধ্য যদি সত্যবাদীরা সাহসী হয়। জুলুম-নির্যাতন আর নিপীড়নকে উপেক্ষা করে সত্যের পথে অবিচল টিকে থাকতে পারে সে, যে সাহসের সাথে হিম্মতের দ্বারা পথ চলতে পারে। তাইতো রাসূল সা: সাহস করে সত্য বলতে পারাকে উত্তম জিহাদ বলেছেন। হযরত আলী (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূল সা: বলেছেন- অত্যাচারী শাসকের সামনে সাহস করে সত্য কথা বলা হচ্ছে উত্তম জিহাদ। (তিরমিজি)

ইসলামের ইতিহাসে অত্যন্ত সাহসী একজন মানুষ ছিলেন দ্বিতীয় খলিফা আমিরুল মোমেনিন হযরত ওমর ফারুক (রা)। তার নির্ভীক সাহসিকতাই তাকে অর্ধ পৃথিবীর শাসক বানিয়েছিল। অর্ধ পৃথিবীর নেতৃত্ব ও রাজত্ব করার সুযোগ তিনি পেয়েছিলেন সাহসের সাথে পথ চলতে পারার কারণেই। ইসলাম গ্রহণের আগে তিনি যেমন সাহসী ছিলেন, ইসলাম গ্রহণ করার পর তার সাহস একটুও কমেনি বরং তা কয়েকগুণ বেড়ে গিয়েছিল। কাফিরদের জুলুম-নির্যাতনের কারণে প্রকাশ্যে যেখানে ইসলাম গ্রহণের কথা প্রকাশ করা সম্ভব হতো না, সেখানে ইসলাম গ্রহণের পর হযরত ওমর (রা)-ই প্রথম কাবার চত্বরে উচ্চস্বরে প্রকাশ্যে জানিয়ে দিলেন তার ইসলাম গ্রহণের কথা। যেটা অন্য কারো পক্ষে বড়ই কঠিন ব্যপার ছিল। শুধু কি তাই? তিনি তার সঙ্গী-সাথীদের নিয়ে মক্কার কোরাইশদের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে পবিত্র কা'বা ঘরে সর্বপ্রথম প্রকাশ্যে নামাজ আদায় করেন। ওমর (রা)-এর এমন সাহসিকতায় মক্কায় ইসলাম প্রচারে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়। হযরত ওমরের ভয়ে পাপিষ্ঠ আর মোনাফিকরা থরথর করে কাঁপত। তার সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলার সাহস কেউ রাখত না। ওমর (রা) মানেই একজন দুঃসাহসী মানুষের নাম। ওমর মানেই নির্ভীকচেতা এক আদর্শ মানব। একমাত্র আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল (সা)-কে ছাড়া তিনি আর কাউকেই পরোয়া করতেন না। ভয় নামক শব্দটিকে যিনি তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিতে জানতেন তিনিই হযরত ওমর (রা)। ভয়ে ভীত না হয়ে ওমর (রা) সাহসিকতার যে পরিচয় দিয়েছিলেন তার প্রতিফলন ঘটেছিল ইসলাম প্রচারে।

'সাহস আছে যার সাফল্যের বিজয়মুকুট তার'- এ কথাটি বাস্তবিক অর্থেই সত্য। ৭১২ খ্রিষ্টাব্দে এক সাহসী যুবকের বিজয় অভিযান সে কথারই বাস্তব প্রতিচ্ছবি অঙ্কন করেছিল। সাহসের সাথে লড়াই করে মাত্র ১৭ বছর বয়সেই সিন্ধু বিজয় করে সেই অবিস্মরণীয় বিজয় উপাখ্যান যে যুবক রচনা করেছিলেন তিনি আর কেউ নন, তিনি হলেন তরুণ উমাইয়া সেনাপতি মুহাম্মদ বিন কাসিম। মুহাম্মদ বিন কাসিমের মতো এক তরুণ যুবকের সাহসী বিজয় উপাখ্যান শুধুমাত্র সিন্ধুকেই পদানত করেনি বরং সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশে ইসলামের বিজয়কেতন উড়ানোর শুভ সূচনা করেছিল। অথচ তার আগে কোনো মুসলিম বীর ভারতবর্ষের গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল সিন্ধু অভিযানে সাফল্য অর্জনে সামর্থ্য হয়নি। এক মুহাম্মদ বিন কাসিমের উদ্দীপ্ত সাহসী চেতনা পাল্টে দিয়েছিল বিশাল ভূখন্ডের অগনতি মানুষের জীবনচরিত্রকে। কিশোর কাসিম তাই অকুতোভয় সাহসের জন্য উপাধি পেয়েছিলেন মহাবীরের।

শুধুমাত্র মুহাম্মদ বিন কাসিম কেন? পৃথিবীর প্রান্তরে প্রান্তরে যারাই সাহসের সাথে পথ চলেছেন সাফল্যের বিজয়মুকুট তারাই পরেছেন। কত বেশি নির্ভীক এবং অসীম সাহস থাকলে তারিক বিন জিয়াদের মত একজন সেনাপতি মাত্র গুটিকয়েক নিরস্ত্র সৈন্য নিয়ে রাজা রডরিকের ১ লক্ষ ২০ হাজার সশস্ত্র সৈন্যের বিরুদ্ধে লড়াই করে স্পেনের মত রাজ্য বিজয় করতে পারেন! ৭১১ খ্রিষ্টাব্দের ৯ জুলাই মুসলিম সেনাপতি তারিক বিন জিয়াদ মাত্র ১২ হাজার সৈন্য নিয়ে যে ঐতিহাসিক বিজয় ছিনিয়ে আনেন তা সাফল্যের স্বর্ণশিখরে লিখিত থাকবে কাল থেকে কালান্তর। প্রতিটি বিজয়ই রোমাঞ্চকর। কিন্তু সব বিজয়েই উপাখ্যান রচিত হয় না। স্পেন বিজয় করতে গিয়ে তারিক বিন জিয়াদ যে দুঃসাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন তা শুধুমাত্র ইতিহাসে নয়া উপাখ্যানই রচনা করেনি বরং বিস্মিত করেছে গোটা বিশ্বকে। অত্যাচারী রাজা রডরিকের সৈন্য সংখ্যা তাকে মোটেও বিচলিত করেনি। বরং তিনি ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে সাগর উপকূলে স্পেনের মাটিতে পা রেখেই সব সৈন্যকে নামিয়ে জ্বালিয়ে দিলেন তাদের বয়ে আনা জাহাজগুলো! তারপর সৈন্যদের লক্ষ্য করে এক জ্বালাময়ী ভাষণ দিলেন। তিনি বললেন, প্রিয় বন্ধুগণ, আমাদের পিছু হটবার বা পলায়ন করার কোনো সুযোগ নেই। কারণ সম্মুখে দুশমন আর পশ্চাতে সমুদ্র। আমাদের সামনে এখন স্পেন আর অত্যাচারী রডরিকের বিশাল বাহিনী আর পেছনে ভূমধ্যসাগরের উত্তাল জলরাশি। আমাদের সামনে দু'টি পথ খোলা। হয় লড়তে লড়তে জয়ী হওয়া, শাহাদতের মর্যাদায় সিক্ত হওয়া কিংবা সাগরের উত্তাল তরঙ্গমালায় ঝাঁপিয়ে পড়ে কাপুরুষের মতো মৃত্যুকে আলিঙ্গন করা। সেদিন সাহস দীপ্ত ভাষণে অনুপ্রাণিত তার সাথীরা কাপুরুষোচিত মৃত্যুকে পায়ে ঠেলে শাহাদতের তামান্নায় উজ্জীবিত হয়ে বীরবিক্রমে লড়াই করে বিজয় ছিনিয়ে এনেছিল। তারিক বিন জিয়াদের সেই সাহসী সিদ্ধান্ত গোটা স্পেনে ইসলামের বিজয়কে ত্বরান্বিত করেছিল।

সাহস থাকলে ছোট্ট কিশোররাও বিজয়মুকুট ছিনিয়ে আনতে পারে। যার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ছোট্ট দুই কিশোর সাহাবী হযরত মুয়াজ বিন আমর (রা) এবং মায়াজ বিন আফরা (রা)। যারা বুকে দুর্দান্ত সাহস নিয়ে বদরের যুদ্ধে ইসলামের চিরশত্রু দুর্ধর্ষ কোরাইশ যোদ্ধা ও কাফিরদের প্রধান সেনাপতি আবু জাহেলকে খতম করেছিলেন। ছোট্ট দু'জন কিশোর মিলে অসীম সাহসিকতার যে পরিচয় বদরের প্রান্তরে সেদিন দিয়েছিলেন তা সত্যিই এক বিস্ময়কর ঘটনা। বুকে সাহস সঞ্চারিত না হলে দুই কিশোর সাহাবীর পক্ষে সেদিন আবু জাহেলের মত দুর্ধর্ষ যোদ্ধাকে খতম করা সম্ভব হতো কি!

দুঃসাহসী আরেক সাহাবীর নাম হযরত আলী (রা)। দুর্দান্ত সাহসিকতার জন্য এই বীরকেশরীকে 'শেরে খোদা' উপাধিতে ভূষিত করা হয়েছিলো। হযরত আলী (রা) যেমন ছিলেন একজন বীরযোদ্ধা তেমনি ছিলেন জ্ঞানী ও বিদ্বান। শৌর্য-বীর্যের জন্য তিনি 'আসাদুল্লাহ' বা 'আল্লাহর সিংহ' উপাধিতে ভূষিত হন। এই বীর সাহসী যোদ্ধা ৩০টি সশস্ত্র জিহাদে বিজয় লাভ করেন। একইভাবে বীরত্বপূর্ণ সাহসিকতার জন্য হযরত খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা)-কে সাইফুল্লাহ বা আল্লাহর তরবারি উপাধি দেওয়া হয়েছিল। খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা) ছিলেন মুসলিম ইতিহাসে ইতিহাস সৃষ্টিকারী এক মহান সেনাপতি। যিনি রণক্ষেত্রে নিজের সাহস ও শক্তি দ্বারা বাতিলের মূলোৎপাটন করে তাওহিদের ঝান্ডাকে বুলন্দ করেছিলেন। মুতার যুদ্ধে তিনজন সেনাপতিকে হারিয়ে মুসলিম বাহিনী যখন কিংকর্তব্যবিমূঢ় তখন খালিদ ইবন ওয়ালিদ (রা)-কে সিপাহসালার নিযুক্ত করা হয়। অতঃপর প্রধান সেনাপতি নিযুক্ত হয়ে খালিদ (রা) অসীম সাহস ও অপূর্ব দক্ষতা প্রদর্শন করে কালিমার বিজয় পতাকা উড্ডীন করেন। এ যুদ্ধে খালিদ (রা)-এর ৯টি তরবারি ভেঙে গিয়েছিল। রাসূল (সা) তাঁর এই তেজস্বিতা ও সাহসের স্বীকৃতিস্বরূপ তাকে সাইফুল্লাহ তথা আল্লাহর তরবারি উপাধিতে ভূষিত করেন। হযরত খালিদ (রা) এমন এক সাহসী যোদ্ধা ছিলেন যে, কোনো যুদ্ধেই তিনি পরাজিত হননি।

সাফল্যের বিজয়মুকুট ছিনিয়ে আনার জন্য প্রয়োজন সাহসিকতা; যেমন সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন ওমর, আলী, খালিদ, মুহাম্মদ বিন কাসিম আর তারিক বিন জিয়াদের মতো দুঃসাহসী মানুষেরা। প্রতিটি সাফল্যেই সাহস ও হিম্মত তাদের পথচলায় গতি সঞ্চার করেছিল। তাই কৃতিত্ব কিংবা সাফল্য অর্জনে সাহসের সাথে পথ চলার বিকল্প নেই। তবে খালি মাঠে গোল দেওয়া যেমন কৃতিত্বের নয় তেমনি নিরস্ত্র নিরীহের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তাকে পরাভূত করে বিজয় ছিনিয়ে আনাকে সাফল্যের বিজয়মুকুট অর্জন বলা যায় না। উত্তাল ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ সমুদ্র পাড়ি দেয়া ছাড়া যেমন একজন নাবিককে দক্ষ ও সাহসী নাবিক বলা যায় না, তেমনি কোনো ধরনের বাধা-বিপত্তির সম্মুখীন হওয়া ছাড়া, বাধা অতিক্রম করা ছাড়া বিজয়ী হওয়াকে সাহসিকতার পরিচয় বলে নির্ণয় করা যায় না। ভয়কে জয় করে অসাধ্যকে সাধন করে বিজয়ী হওয়াই হলো সাহসিকতার মূল পরিচয়।

📘 জীবন বদলে যাবে > 📄 জীবন বদলে যাবে

📄 জীবন বদলে যাবে


মানুষ জীবন বদলাতে কত প্রচেষ্টাই না করে। জীবনকে সাফল্যের কাঙ্ক্ষিত মঞ্জিলে পৌছানোর লক্ষ্যে চলে মানুষের অবিরাম সংগ্রাম। কিন্তু সংগ্রাম অবিরাম চললেও কাঙ্ক্ষিত সাফল্য মানুষ পায় না। এই কাঙ্ক্ষিত সাফল্যে পৌছতে না পারার কারণ বিশ্লেষণ করলে যে কয়টি মূল বিষয় সামনে উঠে আসে তার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হলো সুসম্পন্ন দৃষ্টিভঙ্গির অভাব। একটি সুসম্পন্ন দৃষ্টিভঙ্গিই বদলে দিতে পারে মানুষের জীবন। যারা দিনের পর দিন, মাসের পর মাস অবিরত প্রচেষ্টা চালিয়েও কাঙ্ক্ষিত সাফল্যে পৌছাতে পারেন না তারা যদি সত্যিকারার্থে কাজের শুরুতেই সুসম্পন্ন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কাজ শুরু করতে পারেন তাহলে নিশ্চিতভাবেই বলা যায় সাফল্য তাদের পদতলে আশ্রয় নেবে। ইংরেজি ভাষায় দৃষ্টিভঙ্গি শব্দ একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থ বহন করে। ইংরেজিতে একে বলে 'Attitude'। ব্যক্তিজীবনে সফলতার নিশ্চয়তা এই Attitude। আর সুসম্পন্ন দৃষ্টিভঙ্গির অর্থ হলো কাজের উপযোগী, কর্মস্থলের উপযোগী, জীবিকার উপযোগী Positive দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করা।

যিনি একজন ছাত্র তার একাডেমিক ক্যারিয়ারে দৃষ্টিভঙ্গি যদি ছাত্রসুলভ না হয় তাহলে তার ক্যারিয়ার কখনো সমৃদ্ধ হতে পারে না। একজন ছাত্রের সুসম্পন্ন দৃষ্টিভঙ্গির অর্থ হবে পড়া পড়া আর পড়া। পড়াশোনা করে হতাশা কাটিয়ে ব্যর্থতা ছাড়িয়ে জ্ঞানের রাজ্যে বিচরণ করে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য ছোঁয়া। তেমনিভাবে একজন শিক্ষকের দৃষ্টিভঙ্গি হবে উত্তম পাঠদানে সুশিক্ষিত জাতি গড়ে তোলা। সেক্ষেত্রে শিক্ষাদানের পরিবেশ যদি ছাত্রদের প্রতি শিক্ষাসুলভ, স্নেহসুলভ এবং প্রয়োজনে শাসনমূলক না হয়, তাহলে তিনি প্রকৃত পাঠদানে ব্যর্থ হবেন। ছাত্ররা বঞ্চিত হবে উপযুক্ত প্রশিক্ষণ থেকে। উন্নত জাতিগঠনের কর্মসূচি চরমভাবে ব্যর্থ হবে। ঠিক এমনিভাবেই কোনো প্রশাসক ভালো প্রশাসক হতে পারেন না যতক্ষণ না তার দৃষ্টিভঙ্গি সুসম্পন্ন হয়। মায়ের দৃষ্টিভঙ্গি যদি মাতৃসুলভ, বাবার দৃষ্টিভঙ্গি যদি পিতৃসুলভ না হয় তাহলে বাবা-মা কাঙ্ক্ষিত ইচ্ছা অনুযায়ী সন্তান গড়ে তুলতে পারেন না। মালিক যদি কর্মচারীদের প্রতি উপযুক্ত দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ না করেন আর কর্মচারীরাও যদি কাজের ক্ষেত্রে সুদৃষ্টি না দেন তাহলে শ্রমিক-মালিকের মাঝে বৈরী সম্পর্ক তৈরি হয়। আর সম্পর্কের ক্ষেত্রে এ ধরনের দৃষ্টিভঙ্গিই সার্বিক উৎপাদন, উপার্জন এবং সাফল্য ধ্বংস করে দিতে বাধ্য। সাংগঠনিক জীবনে একজন সংগঠকের সুসম্পন্ন ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির ওপরই সংগঠনের কাঙ্ক্ষিত সফলতা নির্ভর করে। সমান যোগ্যতা, আন্তরিকতা এবং পরিশ্রম ঢেলে দেয়ার পরও দু'জন দু'রকম সাফল্য পান। এর কারণ হলো কাজের শুরুতে একজন সুসম্পন্ন ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি লালন করেন, আর আরেকজন দৃষ্টিভঙ্গির বিষয়টি আমলেই নিতে চান না। ব্যক্তিজীবনে প্রত্যেক ব্যক্তিই নিজ নিজ ক্ষেত্রে উপযোগী দৃষ্টিভঙ্গি লালন না করলে কাঙ্ক্ষিত সাফল্যে পৌঁছাতে পারেন না। কারণ সাফল্যের মূল ভিত্তি হচ্ছে সুসম্পন্ন দৃষ্টিভঙ্গি। বিশ্ববিখ্যাত হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, শতকরা ৮৫ ভাগ ক্ষেত্রে ব্যক্তি সফলতা পায় তার সুসম্পন্ন দৃষ্টিভঙ্গির কারণে।

সুসম্পন্ন দৃষ্টিভঙ্গি জন্মলব্ধ কোনো বিষয় নয়, এটি মনোভাবের পরিবর্তনের মাধ্যমে ধারণ করে লালনের বিষয়। কেউ কেউ ভাবতে পারেন অমুক বিরাট পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছে, তাই তার দৃষ্টিভঙ্গি তো সুসম্পন্ন হবেই এমনটি ভাবার কোনো কারণ নেই। বরং মানুষ যখন জন্মগ্রহণ করে তখন সমান মনোভাবের (ফিতরাতের) ওপরই জন্মগ্রহণ করে। সবাই হাত, পা, কান ও মাথা নিয়ে মানুষ হিসেবেই জন্মগ্রহণ করে। রাসূল (সা) এ প্রসঙ্গে বলেন, সকল মানুষ একই ফিতরাত বা স্বভাবের ওপরই জন্মগ্রহণ করে, এরপর তার পিতা-মাতা এবং তার পরিবেশ তাকে সে অনুযায়ী পরিচালিত করে। আবার বাহ্যিকভাবে মনে হতে পারে মানুষ মানেই শুধুমাত্র দুটো হাত, দুটো পা কিংবা একটি শরীর গঠনের নাম। বরং হাত পাসহ সমস্ত অঙ্গপ্রত্যঙ্গ, মেধা-মনন মিলিয়েই একজন সম্পূর্ণ মানুষ। এই সব কিছুর সম্মিলিত দৃষ্টিভঙ্গিই একটি সুসম্পন্ন দৃষ্টিভঙ্গি। সত্যিকারার্থেই কোনো মানুষ সুসম্পন্ন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে জন্মায় না বরং তার দেহ, মন চিন্তা চেতনার সম্মিলিত ইতিবাচক যোগফলই সুসম্পন্ন দৃষ্টিভঙ্গির জন্ম দেয়।

আমাদের মনে রাখতে হবে পরিবেশ, শিক্ষা, অভিজ্ঞতা এবং নিজ প্রচেষ্টার পরিপ্রেক্ষিতেই একটি সুসম্পন্ন দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে উঠতে পারে। উপরিউক্ত চারটি বিষয়ের প্রভাবে অনেক সময় নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি বদলে গিয়ে সুসম্পন্ন দৃষ্টিভঙ্গিতে রূপান্তিরত হয়। বদলে যায় ব্যক্তির পুরো জীবন। পরিবেশ ব্যক্তির সুসম্পন্ন দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। যিনি সুন্দর পরিবেশে বেড়ে ওঠেন তার দৃষ্টিভঙ্গি হয় সুসম্পন্ন আর যার পারিপার্শ্বিক পরিবেশ নেতিবাচক হয় তার দৃষ্টিভঙ্গি সুসম্পন্ন হয় না। এটি সাধারণ নিয়ম হলেও সমাজে এর ব্যতিক্রমও রয়েছে। যারা স্রোতের বিপরীতে চলতে জানেন, যাদের মাঝে অদম্য ইচ্ছা এবং সাহস থাকে তারা নেতিবাচক পরিবেশের মাঝে নিজের সার্বিক প্রচেষ্টায় সুসম্পন্ন দৃষ্টিভঙ্গি লালন করে পুরো জীবনটাকেই বদলে দিতে পারেন। একটি সুন্দর পরিবেশে একজন মানুষ যখন বেড়ে ওঠে তখন তার দৃষ্টিভঙ্গি সুসম্পন্ন হওয়াই বাঞ্ছনীয়। পরিবারের সুন্দর পরিবেশ সুসম্পন্ন দৃষ্টিভঙ্গির সহায়ক। সহপাঠীদের সুন্দর আচরণ একজন ছাত্রকে সুসম্পন্ন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে গড়ে উঠতে সহায়তা করে। কর্মক্ষেত্রে মালিক-শ্রমিকের সুসম্পর্কের পাশাপাশি সহযোগীদের সাথে সুসম্পর্ক এবং কর্মক্ষেত্রের সুন্দর পরিবেশ সুসম্পন্ন দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে উঠতে সহায়তা করে। পরিবেশ যে কতখানি সুসম্পন্ন দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলতে সহায়তা করে তার প্রমাণ আপনাদের আমাদের আশেপাশে অহরহই রয়েছে। পাশাপাশি দু'টি খাবার হোটেলের ক্ষেত্রে দেখা যাবে একটি হোটেলের মালিক কর্মচারী এবং এর কাস্টমারদের আচরণ, দৃষ্টিভঙ্গি অভদ্রজনিত। ঠিক পাশেই আরেকটি হোটেলে দেখা যাবে সেখানকার মালিক কর্মচারী যেমন রুচিশীল ও ভদ্র তাদের কাস্টমাররাও রুচিশীল এবং ভদ্র ধরনের। এটি শুধুমাত্র তাদের সুসম্পন্ন দৃষ্টিভঙ্গির কারণেই হয়েছে আর এই সৌন্দর্য তৈরিতে পরিবেশই তাদের সহায়তা করেছে। একই দেশের দু'টি রাজনৈতিক দলের সাথে তুলনা করলে দেখা যাবে একটি তার প্রতিপক্ষকে নোংরা, হিংসাত্যক এবং নীচ ভাষায় বক্তব্য দিয়ে ঘায়েল করার চেষ্টা করে। এই নোংরা চর্চা দলের নিম্নস্তর থেকে শুরু করে মধ্যস্তরকে পেরিয়ে অনেক সময় দলের প্রধানেরও ভাষা হয়ে যায়! আর আরেকটি দলকে দেখা যায় একই বিষয়ে প্রতিপক্ষকে রুচিশীল কিন্তু তির্যক ভাষায় বক্তব্য দিয়ে মোকাবেলা করতে। এটি সম্ভব হয় দলের প্রধান থেকে শুরু করে সর্বস্তরের নেতাকর্মীর মাঝে সুসম্পন্ন দৃষ্টিভঙ্গি লালনের কারণে।

সুসম্পন্ন দৃষ্টিভঙ্গির জন্য শুধু মাত্র পরিবেশই যে সহায়ক তা কিন্তু নয় বরং এর সাথে শিক্ষার বিষয়টিও গভীরভাবে জড়িত। সুশিক্ষিত একটি পরিবারের সন্তানদের সাথে অশিক্ষিত পরিবারের দৃষ্টিভঙ্গির তুলনা করলে দেখা যায় স্বল্প শিক্ষিতরা যতই সম্পদশালী হোক না কেন তারা উচ্চশিক্ষিত পরিবারের সন্তানদের চেয়ে সুসম্পন্ন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে বেড়ে ওঠেন না। তাদের মাঝে আচরণের পার্থক্য অনেক। তবে শিক্ষিতদের মাঝেও কিছু অথর্ব বা জ্ঞানপাপী থাকেন যারা শিক্ষার পুঁজিকে ঢাল বানিয়ে বড়াই করেন। তখন তাদের দৃষ্টিভঙ্গি স্বল্প শিক্ষিতের নীচুতাকেও হার মানায়। সত্যিকারার্থে তারা জীবনকে বদলাতে পারেন না।

ব্যক্তি যখন পরিবেশ, শিক্ষা এবং অভিজ্ঞতা পুঁজি করে সুসম্পন্ন দৃষ্টিভঙ্গি লালন করেন তখন তার প্রয়োজন হয় আত্মপ্রচেষ্টা। কারণ যতই পরিবেশ সুন্দর হোক না কেন, ব্যক্তির জ্ঞান-গরিমা যতই থাকুক না কেন, অভিজ্ঞতার ঝুলি যত বেশিই হোক না কেন, ব্যক্তি যদি নিজকে পরিবর্তন করার মতো দৃষ্টিভঙ্গি লালন না করেন তাহলে এর মধ্যে কল্যাণ নিহিত থাকে না। এ ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি সুসম্পন্ন দৃষ্টিভঙ্গি হতে পারে না। এ ধরনের প্রচেষ্টা জীবনকে বদলাতে পারে না। জীবনকে বদলাতে প্রয়োজন আত্মপ্রচেষ্টামূলক দৃষ্টিভঙ্গি যা নিজেকে দিয়েই শুরু করতে হয়। মহাগ্রন্থ আল কুরআনের সূরা রা'দের ১১ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, “আল্লাহ কোন জাতির ভাগ্যের (অবস্থার) পরিবর্তন করেন না যতক্ষণ পর্যন্ত জাতির লোকেরা নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তনের চেষ্টা না করে" 'বদলে যাও' বদলে দাও, এটি নতুন কোনো শ্লোগান নয়। বরং সুসম্পন্ন দৃষ্টিভঙ্গির অভাবেই এটা ধামাচাপা পড়েছিল। যারা মনে করেন ইসলাম সেকেলে ধর্ম, ইসলামে কোন আধুনিকতা নেই এটি তাদেরই কারসাজি। অথচ ইসলাম যে কত আধুনিক তার প্রমাণ হচ্ছে বদলে যাওয়ার জন্য আগে নিজেকে দিয়ে বদলানোর অভিযান শুরু করার তাগিদ ইসলাম প্রায় সাড়ে ১৪ শ' বছর আগেই নবী মুহাম্মদ সা.-এর ওপর নাজিলকৃত মহাসত্য গ্রন্থ আল কুরআনের মাধ্যমে ঘোষণা দিয়েছিলেন। সুতরাং এই মহাসত্যকে ধারণ করে সুসম্পন্ন দৃষ্টিভঙ্গি লালন করতে পারলেই জীবনটাকে বদলে দেয়া সম্ভব। একজন মহা মনীষী বলেছেন, সুসম্পন্ন দৃষ্টিভঙ্গি, ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি মানুষের জীবনে পবিত্র অনুভূতি সৃষ্টি করে আর নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পূর্ণতার সুযোগকে নষ্ট করে দেয়। আমাদের প্রতিটি অনুভূতিই হোক পূর্ণতার, দৃষ্টিভঙ্গি হোক ইতিবাচক আর সুসম্পন্ন। বদলে যাক জীবন, পূরণ হোক লালিত স্বপ্নের।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00