📘 জীবন বদলে যাবে > 📄 যদি লক্ষ্য থাকে অটুট

📄 যদি লক্ষ্য থাকে অটুট


সাফল্যের অভীষ্টে ছুটে চলা মানুষের সঙ্গী একটি চমৎকার স্বপ্ন। যে চমৎকার স্বপ্নটিকে ধারণ করেই মানুষ সাফল্যের মঞ্জিলে পৌঁছতে চায়। তবে শুধুমাত্র একটি সুন্দর স্বপ্নকে লালন করেই সাফল্যের কাঙ্ক্ষিত মঞ্জিলে পৌঁছা যায় না। যে বিষয়ে স্বপ্নের জাল বোনা হয় সে বিষয়ে একটি লক্ষ্য ঠিক করে নিয়ে তবেই সামনে এগোতে হয়। লক্ষ্যহীন ছুটে চলায় কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জিত হয় না। লক্ষ্য যদি ঠিক না হয়, সুনির্দিষ্ট করা না হয় তাহলে এ ছুটে চলা হবে কূলহারা তরীর মত। কূলহারা তরী যেমন নির্দিষ্ট কোনো লক্ষ্য ছাড়াই ভাসতে থাকে, সময় যায় দিন যায় কিন্তু তীরের সন্ধান পায় না, নির্দিষ্ট কোনো সীমানায় ভিড়তে পারে না। তেমনি লক্ষ্যহীন ব্যক্তিও সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য না থাকায় গন্তব্যহীন কূলহারা তরীর মত লক্ষ্যহীন গন্তব্যে ছুটতে থাকেন। ফলে তিনি শুধু পথ চলতেই থাকেন। দিন ফুরিয়ে যায়, সময় ফুরিয়ে যায় তবু তার গন্তব্য শেষ হয় না।

যাদের কোনো লক্ষ্য নেই তারা কখনো অভীষ্টে পৌঁছতে পারেন না। যারা সাফল্য চান, সফল হতে চান তারা দৃষ্টিকে নিবদ্ধ রাখেন লক্ষ্যের দিকে। জীবনে সফলতার পথে অগ্রসর হতে তারা লক্ষ্য নির্দিষ্ট করে সে দিকে মনোসংযোগ করেন। সাফল্য লাভের জন্য লক্ষ্যকে এমন উঁচুতে তারা নিবদ্ধ করেন যাতে সাফল্য লাভের ব্যাপক সম্ভাবনা তৈরি হয়। সেই সম্ভাবনা অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছতে গতি সঞ্চার করে। ব্যাপক উদ্দীপনা তৈরি করে দেহ ও মনে। পরিশ্রমকে সার্থক করে তোলে।

মানুষের জীবন চলার পথ কখনো কিন্তু সহজ সরল হয় না। চলার পথে অনেক বাঁক থাকে। প্রতিটি বাঁকে মানুষকে অনেক প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হতে হয়। আর এটাই জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। জীবনের এই পথচলায় প্রতিবন্ধকতা, প্রতিকূলতা, ঝড়ঝঞ্ঝা মাড়িয়ে মানুষকে মঞ্জিলে পৌঁছাতে হয়। চলার শুরুতেই যদি প্রত্যেক ব্যক্তি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য স্থির করে এগোতে পারেন তাহলে শত প্রতিবন্ধকতা, প্রতিকূলতা, ঝড়ঝঞ্ঝা মাড়িয়ে তিনি সাফল্যের শিখরে পৌঁছাতে পারেন। 'যদি লক্ষ্য থাকে অটুট' তবে সাফল্য সুনিশ্চিত।

একটি সুন্দর স্বপ্নের বাস্তব রূপ তথা সাফল্য লাভের জন্য একটি কর্মপ্রচেষ্টাসমৃদ্ধ লক্ষ্য থাকা দরকার। কারণ অনেক সময় দক্ষতা থাকলেও লক্ষ্য স্থির না থাকায় কাজে সাফল্য আসে না। মুক্ত বিশ্বকোষ Wikipedia-তে বলা হয়েছে, A goal is an idea of the future or desired result that a person or a group of people envisions, plans and commits to achieve. অর্থাৎ- লক্ষ্য (Goal) হল ভবিষ্যত বা প্রত্যাশিত ফলাফল লাভের এমন একটি ধারনা যা একজন ব্যক্তি বা মানুষের একটি গ্রুপের স্বপ্ন, পরিকল্পনা এবং অর্জনের প্রতিশ্রুতি। সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য না থাকলে পথের নিশানা যেমন পাওয়া যায় না তেমনি কাজেও পাওয়া যায় না সফলতা। আর নিশানা যখন সহজ হয় তখন লক্ষ্যে পৌঁছানোর সম্ভাবনাও থাকে উজ্জ্বল। এ জন্য সাফল্যের ছোঁয়া পেতে লক্ষ্যের গুরুত্ব অনুধাবন করতে হবে। যারা লক্ষ্যের গুরুত্ব অনুধাবন করতে ব্যর্থ হবেন তারা সাফল্য অর্জনেও হবেন ব্যর্থ।

লক্ষ্যের গুরুত্ব যখন এত বেশি তখন আমাদের সমাজে দেখা যায় কিছু মানুষ লক্ষ্যের গুরুত্ব অনুধাবন করতে পারেন না। এর পেছনে কারণও রয়েছে। কেউ লক্ষ্যের গুরুত্ব বুঝেন না, কিংবা কারো এ সংক্রান্ত শিক্ষা নেই। আবার কেউ জানার পরও কাঙ্ক্ষিত সাফল্য পাবেন কি না এই সন্দেহে লক্ষ্য নির্ধারণ করেন না। কারো আত্মবিশ্বাসের অভাব কিংবা কারো সমস্যা সীমাবদ্ধ-চিন্তা। কিন্তু সকলকেই স্পষ্টভাবে বুঝতে হবে লক্ষ্য হচ্ছে ধাপে ধাপে উন্নীত হওয়ার নির্দিষ্ট একটি পদ্ধতির নাম। আর লক্ষ্য স্থির করা মানে হচ্ছে একের পর এক অর্জিত হওয়া কয়েকটি পদ্ধতির সমষ্টি। এ কথা দিবালোকের মতো স্পষ্ট যে সাফল্য লাভের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য থাকতে হবে। তবে এ লক্ষ্যে পৌঁছতে প্রতিদিন কিছু না কিছু কাজ করে প্রাথমিকভাবে প্রতিনিয়ত অভীষ্ট লক্ষ্যে অগ্রসর হতে হবে। তাই প্রতিদিনের জন্যও আলাদা করে কিছু লক্ষ্য স্থির করতে হবে যা অর্জনের মাধ্যমে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যের দিকেই দ্রুত এগিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে। যেমন একজন ছাত্র কেন্দ্রীয় পরীক্ষায় জিপিএ ৫ অর্জনের লক্ষ্য স্থির করলো। এখানে জিপিএ ৫ পাওয়াটা সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য। কিন্তু এই লক্ষ্যে পৌঁছাতে অর্থাৎ জিপিএ ৫ পেতে তাকে কিছু পদ্ধতি গ্রহণ করে সামনে এগোতে হবে। প্রতিদিন কত ঘণ্টা পড়ালেখা করলে সে অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারবে এটি তাকে ঠিক করতে হবে। পাশাপাশি তাকে সিলেবাস প্রণয়ন, অগ্রাধিকার পাঠও নির্ধারণ করতে হবে। প্রতিদিন কতটুকু অভীষ্টে এগোনো সম্ভব হলো তার হিসেবও করতে হবে। আগামীকাল কতটুকু লক্ষ্যে পৌঁছতে হবে তাও ঠিক করতে হবে।

লক্ষ্যের সাথে নিয়তের রয়েছে গভীর সম্পর্ক। কারণ যাবতীয় কাজের ফলাফল নিয়তের ওপরেই নির্ভর করে। নিয়তের আরেকটি পরিপূরক নামই হলো লক্ষ্য স্থির। কেউ যদি বলে আমি অমুক কাজ করার নিয়ত করলাম। তার মানে তিনি কোনো একটি কাজ করার লক্ষ্য স্থির করলেন। মানুষ কী জন্য সাফল্য অর্জন করতে চায় তার উদ্দেশ্য ঠিক করতে হবে। কারণ কাজের বিশুদ্ধতা নিয়তের শুদ্ধতার ওপর নির্ভর করে। তাই লক্ষ্য স্থির করতে নিয়তের বিশুদ্ধতা প্রয়োজন। মানবতার মহান শিক্ষক রাসূলে কারীম (সা) কাজের শুরুতে নিয়তের তথা লক্ষ্য স্থির করার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। হযরত ওমর (রা) থেকে বর্ণিত একটি প্রসিদ্ধ হাদিস রয়েছে। তিনি বলেন, রাসূল (সা) ইরশাদ করেছেন- যাবতীয় কাজের ফলাফল নিয়তের ওপরেই নির্ভর করে। প্রতিটি লোক তাই পাবে যা সে নিয়ত করেছে। (বোখারি ও মুসলিম)

লক্ষ্য স্থির জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যারা সফলতার ছোঁয়া পেতে চান তাদের জন্য কাজের শুরুতে লক্ষ্য নির্ধারণ করা অবশ্যক। কারণ লক্ষ্য নির্ধারণ না করে যদি কাজ শুরু করে দেয়া হয় তাহলে তাতে সাফল্য জোটার সম্ভাবনা থাকে খুবই ক্ষীণ। একজন নৌকার মাঝি সারাদিন নৌকা বাইতে থাকলেন কিন্তু তিনি লক্ষ্য স্থির করলেন না কোন ঘাটে ভিড়বেন তাহলে তার উদ্দেশ্য ব্যর্থ হতে বাধ্য। তার সারাদিনের নৌকায় বৈঠা চালানো পণ্ডশ্রম ছাড়া আর কিছু নয়।

অনেকেই বড় সাফল্য অর্জনের জন্য লক্ষ্য স্থির করতে সাহস করেন না। ছোট ছোট সাফল্যের পেছনেই ছোটাছুটি করেন। কিন্তু লক্ষ্য যদি স্থির করা যায় তাহলে যেকোনো বড় সাফল্যও ধরা দিতে পারে। রাসূল (সা) যখন পারস্যকে মুসলমানদের পদানত করার লক্ষ্য স্থির করেছিলেন তখন পারস্য সাম্রাজ্য ছিল বিশ্বব্যাপী এক অপরাজেয় শক্তি, আর মুসলমানদের হিসাব করার মতো কোনো শক্তিই ছিল না। তারপরও রাসূল (সা) লক্ষ্য স্থির করেছিলেন পারস্যকে মুসলমানদের পদানত করার। লক্ষ্য স্থির করে দীপ্ত সাহস ও পরিশ্রমের ফলে একদিন সত্যিই পারস্য সাম্রাজ্য মুসলমানদের পদানত হয়েছিল। বিশ্ববিজয়ী বীর জুলিয়াস সিজার বলেছিলেন, "অধিকাংশ মানুষ বড় হতে পারে না কারণ সে সাহস করে আকাশের মতো সূর্যে লক্ষ্য স্থির করে সেদিকে তাকাতে পারে না বলে”। লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্য যদি না থাকে তাহলে অর্জন শূন্য হতে বাধ্য। সাফল্যের পেছনে ছুটতে হলে আপনাকে একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য স্থির করতে হবে। কেননা আপনার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যই আপনাকে সাফল্যের পথে সাহায্য করবে।

তবে লক্ষ্যের মাত্রা এবং উচ্চতার মধ্যে ভারসাম্য থাকা উচিত। ব্যক্তি তার লক্ষ্যকে এমন উচ্চতায় নিবদ্ধ করা উচিত যাতে লক্ষ্য অর্জনে নিজের ভেতর থেকেই স্পৃহা জাগ্রত হয়। অনেকে লক্ষ্য স্থির করতে গিয়েই খেই হারিয়ে ফেলেন। লক্ষ্য স্থির করার আগেই লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারা না পারার দ্বিধাদ্বন্দ্ব্বে ভুগতে থাকেন। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য লক্ষ্যের মানদণ্ড যাচাই করে নেয়া উচিত। তবে এ কথা মনে রাখতে হবে, সাফল্য লাভের জন্য জীবনের সব লক্ষ্য পরস্পরের সাথে সামঞ্জস্য পূর্ণ হওয়া উচিত। নিজের সুন্দর স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে লক্ষ্য স্থির রেখে সুনির্দিষ্ট কর্মতৎপরতার মাধ্যমে কাজে ঝাঁপিয়ে পড়া উচিত। অর্থহীন লক্ষ্য এবং জাতীয় জীবনের সাথে মূল্যবোধহীন লক্ষ্য স্থির ব্যক্তির সফলতার উদ্দেশ্যকে ব্যাহত করে। যত তাড়াতাড়ি জীবনের লক্ষ্য স্থির করা যায় সফলতা অর্জন ততই সহজ হয়। কারণ জীবনের লক্ষ্য স্থির থাকলে তাতে সাফল্য অর্জনের আবেগও থাকবে। আর লক্ষ্য স্থির যখন করবেন তখন দেখবেন আপনার লক্ষ্য পানে এগিয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যের সাথে আবেগ ও উচ্ছ্বাস যুক্ত হয়েছে। এর সাথে শুধু অধ্যবসায় যোগ করে দিতে পারলেই সফলতা অর্জন সম্ভব।

খুব পরিচিত একটি গানের সুরের সাথে মিলিয়ে বলতে হয়, "যদি লক্ষ্য থাকে অটুট, বিশ্বাস হৃদয়ে, হবেই হবেই দেখা, দেখা হবে বিজয়ে"। হ্যাঁ, সত্যিই লক্ষ্য স্থির করে যদি আপনি ছুটতে পারেন, তাহলে বিজয় তথা সাফল্যের দেখা আপনি অবশ্যই পাবেন।

📘 জীবন বদলে যাবে > 📄 প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার

📄 প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার


সাফল্যের স্বর্ণদুয়ারে পৌঁছানোর জন্য প্রয়োজন যথার্থ ও সুন্দর পরিকল্পনা। পরিকল্পনাবিহীন কাজ মানেই উদ্দেশ্যবিহীন পথচলা। পরিকল্পনার মাধ্যমে ব্যক্তি ধাপে ধাপে তার লক্ষ্যে পৌঁছার প্রাণান্তকর চেষ্টা করে। অতীত অভিজ্ঞতার আলোকে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ বাস্তবতাকে সামনে রেখে নির্দিষ্ট সময়ের মাঝে কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছানো বা উদ্দেশ্য সাধনের জন্য অগ্রিম কাজের তালিকা প্রণয়ন করাই হল পরিকল্পনা গ্রহণ। পরিকল্পনার আরেকটি ব্যাখ্যা হচ্ছে বিভিন্ন কার্যাবলি উদ্ভাবনের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ সম্পর্কে ধারণা করা এবং তথ্য সংগ্রহ করা। পরিকল্পনা বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সময়ের মধ্যে সেতুবন্ধ রচনা করে আগামীর পথ নির্দেশ করে। তাই পরিকল্পনাকে কাজের সূচনা বা কাজের প্রবেশদ্বার বলা হয়ে থাকে।

সফলতা অর্জনের জন্য, কোন সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছার জন্য শুরুতেই সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা প্রণয়ন জরুরি। পরিকল্পনা যথার্থ হলে তার রেজাল্টও ভাল হবে। আবার পরিকল্পনা সঠিকভাবে নিতে না পারলে কাজের ফলাফল ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে। বলা হয়ে থাকে- If we fail with right scheme, we will take the wrong succeed, অর্থাৎ যদি আমরা পরিকল্পনা করতে ব্যর্থ হই, তাহলে আমরা ব্যর্থ হওয়ার পরিকল্পনাই গ্রহণ করলাম। এমন ধরনের পরিকল্পনা আমাদের করা উচিত নয় যে পরিকল্পনা আমাদের ব্যর্থতার দিকে নিয়ে যাবে। পরিকল্পনা গ্রহণে প্রয়োজন উন্নতমানের বুদ্ধিদীপ্ত প্রক্রিয়া, বিবেচনাপ্রসূত কর্মপন্থা নির্ধারণ এবং উদ্দেশ্য, ঘটনা ও হিসেবের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ। পরিকল্পনা কাজের সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা দেয়, মিতব্যয়িতা অর্জনে সহায়তা করে, পরিবর্তিত অবস্থার মোকাবিলা করার পন্থা বাতলে দেয়, কাজের মান নিয়ন্ত্রণ ও মূল্যায়নে সহায়তা করে। এ ছাড়াও ব্যক্তির পাশাপাশি পরিকল্পনা সংগঠনের উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ, নানাবিধ সমস্যার সমাধান, সীমিত জনশক্তির সঠিক ব্যবহার এবং সার্বিক কাজের সমন্বয়ে সাহায্য করে।

সুষ্ঠু পরিকল্পনা ছাড়া কোনো কাজেই সফলতা আসে না। কী ব্যক্তিজীবনে, কী সমাজে, কী ব্যবসায়ে, কী রাষ্ট্রীয় কাজে সর্বক্ষেত্রেই পরিকল্পনার গুরুত্ব অপরিসীম। নতুন বছরটা কিভাবে পরিচালিত হবে তার জন্য সবার আগে প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা গ্রহণ। পরিকল্পনা হবে দলগত এবং ব্যক্তিগত। পরিকল্পনা হবে আউটপুট-ভিত্তিক। আমাদের মাঝে অনেকেই আছেন যারা বছরের শুরুতে পরিকল্পনা গ্রহণ করেন না। কেউ দলগত তথা সম্মিলিত পরিকল্পনা গ্রহণ করলেও ব্যক্তিগত পরিকল্পনা গ্রহণ করেন না। বছরের মাঝামাঝি কিংবা বছরান্তে যে পর্যালোচনা করা হয় সেখানে কিন্তু দলগত পর্যালোচনার পাশাপাশি ব্যক্তিগত পর্যালোচনাও হয়ে থাকে। তাই শুরুতেই দলগত এবং ব্যক্তিগত দুই ধরনের পরিকল্পনা গ্রহণই জরুরি। কখনো কখনো পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয় ধারণাভিত্তিক কিংবা আন্দাজের ওপর। এ ধরনের পরিকল্পনা কখনো সুফল বয়ে আনে না। বহুল প্রচলিত একটি মূল্যবান বাক্য আছে- Well plan is half done. অর্থাৎ পরিকল্পনা কাজের অর্ধেক। এটি শুধু তাদের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য, যারা সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে কর্মীদের শ্রেণিবিন্যাস, মান, কাজের পরিধি ও পরিসংখ্যানমূলক তথ্য, অর্থনৈতিক অবস্থা, পারিপার্শ্বিক অবস্থা এবং সার্বিক বাধা প্রতিবন্ধকতা পর্যালোচনার ভিত্তিতে পরিকল্পনা গ্রহণ করে থাকেন।

লক্ষ্য নির্ধারণের পর সেই অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছাতে প্রয়োজন একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা গ্রহণের। যেমন- যদি ধরা হয় একজন লোক ঢাকায় পৌঁছানোর টার্গেট বা লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এখানে ঢাকায় পৌঁছানো হল তার লক্ষ্য এই লক্ষ্যে পৌঁছাতে তাকে কিছু সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা হাতে নিতে হবে। যেমন- ঢাকায় যাওয়ার মাধ্যম কি হবে, বিমান, রেল না সড়ক পথ, ২য় হচ্ছে কত অর্থের প্রয়োজন হবে, ৩য় হল কত সময় লাগবে এই মৌলিক বিষয়গুলোতে যদি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা না নিয়ে ঢাকার লক্ষ্যে যাত্রা শুরু করেন তাহলে দেখা যাবে পরিকল্পনা না থাকায় বাহন ঠিক হয়নি, অর্থ না থাকায় বাহনে আরোহণ করা যায়নি ফলে তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যেই পৌঁছা সম্ভব হয়নি।

মহান আল্লাহ তাআলা সর্বশ্রেষ্ঠ পরিকল্পনাকারী। তিনি সুপরিকল্পিতভাবে বিশ্ব চরাচর সৃষ্টি করেছেন এবং পরিকল্পনা মাফিক ধ্বংস করবেন। গভীরভাবে চিন্তা করলে দেখা যায় যে, মানবজাতি পরিকল্পনা বিষয়ক ধারণা মহান সৃষ্টিকর্তার নিকট থেকেই পেয়েছেন। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন, "নিশ্চয়ই তোমাদের প্রতিপালক আল্লাহ, যিনি নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলকে ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর তিনি আরশে সমাসীন হয়েছেন। তিনি দিনকে রাত্রি দ্বারা আচ্ছাদিত করেন, এভাবে যে রাত্রি দিনকে দ্রুত ধরে ফেলে। তিনি সৃষ্টি করেছেন সূর্য, চন্দ্র ও নক্ষত্র নিজ আদেশের অনুগামী। জেনে রেখো, সৃষ্টি করা এবং আদেশ দান করা তাঁরই কাজ। বড় বরকতময় আল্লাহ, যিনি বিশ্বজগতের প্রতিপালক" (সূরা আরাফ: ৫৪)। তিনি সৌরজগৎকে যথাস্থানে স্থাপন করেছেন, দুনিয়ার ভারসাম্য রক্ষার জন্য স্থানে স্থানে নদী-নালা, সাগর, পাহাড়-পর্বত ও বনভূমি স্থাপন করেছেন। আল্লাহ তাআলাই রাত, দিন, সূর্য ও চাঁদকে পয়দা করেছেন, (এদের) প্রত্যেকেই (মহাকালের) কক্ষপথে সাঁতার কেটে যাচ্ছে। এসব কিছুই সুচিন্তিত পরিকল্পনার ফসল। পরিকল্পনা মাফিক আসমান ও জমিনের নীলনকশা তৈরি করে এগুলোকে যথাযথভাবে সৃষ্টি করা হয়েছে। সমগ্র সৃষ্টির প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ করলে সহজেই বুঝা যায় যে, প্রতিটি বস্তুই পরিকল্পনা মোতাবেক তৈরি, যার ফলে প্রকৃতির কোথাও বিশৃঙ্ক্ষলা সৃষ্টির অবকাশ নেই।

পরিকল্পনা গ্রহণের পর নির্দিষ্ট সময়ান্তে এর পর্যালোচনা ও মূল্যায়ন হওয়া জরুরী। অনেকেই আছেন কাজ করতেই থাকেন কিন্তু কাজের কোয়ালিটি কেমন, সময়ের আলোকে কাজ কতটুকু বাস্তবায়িত হল তা মূল্যায়নই করেন না। ফলে কখনো কখনো দেখা যায় পরিকল্পনার বিশাল একটি অংশ কিংবা গুরুত্বপূর্ণ অংশটিই বাদ পড়ে যায়। মাঝে মাঝে পরিকল্পনা পর্যালোচনা না হওয়ায় দেখা যায় মানহীন কাজ পুরো বছর ধরে চলতে থাকে। কাজ শেষে আফসোস করার চাইতে সময়ে সময়ে তার পর্যালোচনা ও মূল্যায়ন করতে পারলে কাজের এবং পরিকল্পনার শতভাগ সফলতা অর্জন করা সম্ভব।

📘 জীবন বদলে যাবে > 📄 হতাশা ঝেড়ে ফেলুন সম্ভাবনাকে সম্পদ মনে করুন

📄 হতাশা ঝেড়ে ফেলুন সম্ভাবনাকে সম্পদ মনে করুন


সফলতার চূড়ায় উঠতে গেলে মাঝে মধ্যে হোঁচট খেতে পারেন, ব্যর্থতার পাল্লায় পড়তে পারেন। কিন্তু তাই বলে কাজের শুরুতেই পরিকল্পনার সময়েই ব্যর্থতার আশঙ্কা করা মোটেই কাম্য নয়। কারণ ব্যর্থতার আশঙ্কা সফলতার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা মারাত্মক আকার ধারণ করে। যারা এ ধরনের মানসিকতা পোষণ করেন তারা শুরুতেই হেরে বসেন। শিশুরা যখন হাঁটতে চেষ্টা করে তখন মাঝে মধ্যেই পড়ে যায়, কখনো পড়ে গিয়ে আহতও হয়। কিন্তু সেই পড়ে যাওয়ার অর্থ হোঁচট খাওয়া নয়। সেই পড়ে যাওয়ার অর্থ এই নয় যে, তারা হাঁটতে শিখবে না কিন্তু যদি শিশু এবং তার পিতা-মাতা এ ব্যাপারে হতাশ হয়ে হাটার প্রচেষ্টাই বন্ধ করে দেন তাহলে তারা কোন দিনই হাঁটতে পারতো না। সফলতার পানে ছুটতে গিয়ে হোঁচট খেলে আবার দাঁড়াতে হবে আবার ছুটতে হবে লক্ষ্য পানে। একদিন ঠিকই এমনি করে পৌঁছা যাবে সাফল্যের শিখরে।

কোন একটি বিষয়ে ব্যর্থ হলে আমাদের মাঝে কিছু ব্যক্তি নিজেকে সব বিষয়েই ব্যর্থ মনে করে হতাশ হয়ে পড়েন। কিন্তু সত্যিকারার্থে তারা এটা বুঝতে ব্যর্থ হন যে কোন একটি বিষয়ের ব্যর্থতাই পূর্ণ ব্যর্থতা নয়। একটি বিষয়ের ব্যর্থতা অন্য বিষয়ের সফলতার পাথেয় হতে পারে যদি হতাশ না হয়ে ভুলগুলো শুধরে নেয়ার উদ্দেশ্যে শিক্ষা গ্রহণ করা যায়। নিজের মধ্যে কখনো যদি কোন দুর্বলতা দেখা দেয় তা বলে বেড়ানোতে বা অন্যের নিকট প্রকাশ করাতে কোনো কল্যাণ নেই। অবস্থা শোচনীয়- এ কথা কাউকে বলার প্রয়োজন নেই। তাতে কোনো লাভও হবে না। বরং হতাশা ঝেড়ে ফেলে সামনে এগিয়ে চললে দেখবেন শোচনীয় অবস্থা কেটে সাফল্যের দুয়ার খুলে গেছে। কেউ হয়তো আপনাকে ছোট বলবে, দুর্বল ভাববে, আপনাকে দেখলে ব্যর্থতার হিসাব কষবে। তাতে কি যায় আসে বরং আপনি এগুলোকে একেবারেই নিজের মধ্যে না নিয়ে দূরে ঠেলে রেখে কাজ করুন, দেখবেন আপনি সফল হবেন। কেউ আপনাকে তুচ্ছজ্ঞান করুক- আপনি যদি কাজে মগ্ন থেকে এটিকে নিয়ে চিন্তাও না করেন তাহলে দেখবেন আপনিই সফল।

হতাশাকে যে লালন করে, অনবরত হা-হুতাশ হায় হায় করে সে মূলত তার দুঃখ কষ্টকেই বর্ধিত করে, ব্যক্তিজীবনে যতই দুঃখ কষ্ট থাকুক না কেন তা যদি আনন্দের সাথে বরণ করে নেয়া যায় তাতেই মূল সার্থকতা। স্কটল্যান্ডের রাজা রবার্ট ব্রুস তার দেশকে স্বাধীন করার লক্ষ্যে শক্তিশালী ব্রিটেনের বিরুদ্ধে পাঁচবার যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়ে প্রতিবারই পরাজিত হন। অতঃপর লজ্জায়, অপমানে এক গুহায় আত্মগোপনে চলে যান। সেখানে তিনি দেখতে পান একটি মাকড়সা জাল বুনতে গিয়ে পাঁচবার ব্যর্থ হয়ে ষষ্ঠবারে সফল হয়। তিনি চিন্তা করলেন খুদে মাকড়সা যদি সফল হতে পারে তাহলে তিনি কেন পারবেন না। ফিরে এলেন গুহা থেকে, আবার যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়ে ব্রিটেনের বিরুদ্ধে জয়লাভ করলেন তিনি।

৫২ বছর বয়সে আবরাহাম লিংকন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। কিন্তু তিনি পূর্বে কতবার ব্যর্থ হয়েছেন তার হিসাব কেউ করে না। ২১ বছর বয়সে আবরাহাম ব্যবসায় ক্ষতিগ্রস্ত হন। ২২ বছর বয়সে আইনসভার নির্বাচনে পরাস্ত হন। পুনরায় ব্যবসায় যোগ দিয়ে ২৪ বছর বয়সে আবারো ক্ষতিগ্রস্ত হন। ২৬ বছর বয়সে প্রিয়তমা স্ত্রী মারা যান। ৩৪ বছর বয়সে কংগ্রেসের নির্বাচনে অংশ নিয়ে পরাস্ত হন। ৪৫ বছর বয়সে সাধারণ নির্বাচনে তার ভরাডুবি হয়। ভাইস প্রেসিডেন্ট হওয়ার চেষ্টা করে ব্যর্থ হন ৪৭ বছর বয়সে। সিনেটর নির্বাচনে আবার হারলেন ৪৯ বছর বয়সে। তার ৫০ বছর পর্যন্ত শুধু ব্যর্থতা আর পরাজয়ের মধ্য দিয়েই কাটে। তিনি তবুও হতাশ হননি। ৫২ বছর বয়সে ঠিকই আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন।

অনেকেই আছেন চারদিকে শুধু অন্ধকার দেখতে পান। আলোর রেখা মনে হয় যেন তাদের থেকে যোজন যোজন দূরেই অবস্থান করে। বাতির চারপাশের অন্ধকারকে তারা গোটা জগতেরই অন্ধকার মনে করে। কিন্তু তাদের মনে রাখা উচিত অন্ধকারের বিপরীতে আলোও আছে। সূর্যের হিসেবেইতো দেখা যায় পৃথিবীর এক প্রান্ত যখন অন্ধকারে অপর প্রান্ত তখন আলোয় উদ্ভাসিত। এটাইতো বিধির নিয়ম। রাত না এলে কখনো কি প্রভাত আসতো? রাত যত গভীর হয় প্রভাত ততই কাছে আসে। রাত গভীর থেকে গভীরতম হওয়া মানে সব শেষ নয়। অন্ধকার নিকষ কালো হওয়া মানেই আঁধারের অতল গহবরে তলিয়ে যাওয়া নয়। বরং রাত পোহালেই ভোর হবে, আলোয় আলোয় ভরে উঠবে জগৎ। আঁধার কেটে গিয়ে দীপ্তিময় সূর্য জ্বলজ্বল করবে- সেই মুহূর্ত বা সেই সময়টুকুর কথা ভেবেই পদক্ষেপ নেয়া উচিত নয় কি? একটি অন্ধকার রজনীই কারো জীবনের শেষ রজনী নয় বরং একটিমাত্র প্রভাতই কারো কারো জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। সাফল্যবঞ্চিত, হতাশাগ্রস্ত কিংবা গভীর রাতে বিপদগ্রস্ত একজন ব্যক্তির জন্য একটি সকাল বা একটি সুবহে সাদিকই বিশাল সম্ভাবনার দ্বার। কিন্তু অনেকেই আছেন যারা সেই সম্ভাবনাকে হিসেবের মধ্যেই আনতে চান না। হাজারো আঁধার রাতের বিপরীতে একটি সকালই পাল্টে দিতে পারে পরিস্থিতি। পাল্টে দিতে পারে জীবনের গতিধারাকে। অমানিশার ঘোর অন্ধকারে সম্ভাবনাময়ী একটি সকালের প্রতীক্ষাই ব্যক্তির জীবন পাল্টে দিতে যথেষ্ট, যদি সেটিকে সম্পদ বিবেচনা করে পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়।

কিছু কিছু হিসাব কাগজে-কলমে থেকে যায়। কখনো কখনো আলোর মুখই দেখে না। সব হিসাবেই যদি সঠিক হতো তাহলে দুনিয়াতে এত উত্থান-পতন হতো না। যত হিসাব-নিকাশ বা পরিকল্পনাই করা হোক না কেন সাফল্য-ব্যর্থতা, জয়-পরাজয় সব কিছু নির্ধারণের মালিক যিনি, তিনি সব বিষয়ে ক্ষমতাবান, তিনি মহাপরাক্রমশালী ও প্রজ্ঞাময়। তিনিই পারেন মাত্র একভাগ সম্ভাবনাকে শতভাগে রূপান্তরিত করতে, নিরানব্বই ভাগ হতাশাকে দূরীভূত করে শতভাগ সাফল্য নিশ্চিত করে দিতে। আবার শতভাগ সম্ভাবনাকে তিনি মুহূর্তেই গুড়িয়ে দিতে পারেন। পৃথিবীতে এরকম বহু উদাহরণ আছে যারা একভাগ সম্ভাবনাকে সম্পদ মনে করে কাজ করেছেন আল্লাহ তাদের প্রচেষ্টাকে শতভাগ সাফল্যে রূপান্তরিত করেছেন। সকাল বেলায় যিনি বাদশাহ তিনি সন্ধ্যা বেলায় ফকির হয়েছেন। আর সকাল বেলার ফকির সন্ধ্যায় বাদশায় পরিণত হয়েছেন। ফকিরের বাদশাহির সম্ভাবনা না থাকলেও তিনি সন্ধ্যায় বাদশাহি পেয়েছেন। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ কুরআনে বলেন, "বলুন, হে আল্লাহ! তুমিই সার্বভৌম শক্তির অধিকারী। তুমি যাকে ইচ্ছা রাজ্য দান কর এবং যার কাছ থেকে ইচ্ছা রাজ্য ছিনিয়ে নাও এবং যাকে ইচ্ছা সম্মান দান কর আর যাকে ইচ্ছা অপমানিত কর। তোমারই হাতে রয়েছে যাবতীয় কল্যাণ। নিশ্চয়ই তুমি সর্ব বিষয়ে ক্ষমতাশীল। তুমি রাতকে দিনে এবং দিনকে রাতে পরিবর্তন কর আর তুমিই মৃত হতে জীবন্তের আবির্ভাব ঘটাও। তুমি যাকে ইচ্ছা অপরিমিত জীবনোপকরণ দান কর" (সূরা আলে ইমরান: ২৬-২৭)।

হতাশার বিপরীত হলো সম্ভাবনা। সম্ভাবনা মানুষের জীবনের এক বিশাল সম্পদ। যারা সম্ভাবনাকে সম্পদ মনে করে পরিকল্পিতভাবে কাজে আত্মনিয়োগ করেছেন পৃথিবীতে তারাই সাফল্যের বিজয়মুকুট অর্জন করেছেন। অনেকেই আছেন সম্ভাবনাকে গুরুত্ব দিতে চান না। হোক সেটা ছোট কিংবা বড় ধরনের সম্ভাবনা, হোক সেটা এক ভাগ কিংবা শতভাগ। আবার কেউ আছেন ছোটখাটো সম্ভাবনাকে একেবারেই উড়িয়ে দেন, শুধুমাত্র তারা নিরানব্বই ভাগ সম্ভাবনাকেই গুরুত্ব দিতে চান, বাকি ছোটখাটো সম্ভাবনাকে তারা এক প্রকার ছুড়েই ফেলে দেন। এ ধরনের লোকজন সাধারণত সফলতা অর্জন করতে ব্যর্থ হন। মনে রাখতে হবে অনেক সময় ছোটখাটো সম্ভাবনাই অনেক বড় সাফল্যের দ্বার উন্মোচিত করে, অনেক বড় অর্জনের ভিত্তি রচনা করে। হুদাইবিয়ার সন্ধির সময় শুধু রাসূল (সা) ছাড়া আর কেউ হুদাইবিয়ার সন্ধিকে সাফল্যের ন্যূনতম সম্ভাবনা হিসেবেও বিবেচনা করেননি। ১৪০০ জন সাহাবী নিয়ে হজ করতে গিয়ে শুধুমাত্র সন্ধি করে ফিরে আসাকেই সবাই বিরাট পরাজয় বলে ধরে নিলেও রাসূলে আকরাম (সা) সেটিকে ভবিষ্যতের বিজয়ের অপার সম্ভাবনাই মনে করেছিলেন। এবং বাস্তবেও তার প্রতিফলন দেখা গেছে। ঐতিহাসিকগণ হুদাইবিয়ার সন্ধিকে মক্কা বিজয়ের ভিত্তি বা সূচনা বলে অভিহিত করেছেন। এটি যে সুস্পষ্ট বিজয় মুসলমানদের জন্য তা উল্লেখ করে মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন, "নিশ্চয় আমি আপনাকে এক প্রকাশ্য বিজয় দান করেছি” (সূরা আল-ফাতহ: ১)।

ভোরে একটি পাখি যখন তার নীড় থেকে খাদ্যের সন্ধানে বের হয় তখন কতটুকু সম্ভাবনা নিয়ে বের হয়? নিশ্চয় খাদ্য পাওয়ার কোনো নিশ্চয়তা তার থাকে না। কিন্তু তারপরও অনিশ্চয়তা নিয়ে বের হওয়া পাখিটি সন্ধ্যায় ঠিকই ভরপেটে নীড়ে ফিরে! ০% সম্ভাবনাকে ১০০% তথা ভরপেটে উন্নীত করতে যিনি ব্যবস্থা করলেন সেই মহান আল্লাহতো সব কিছুই পারেন। মানুষও যদি মহান আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা করতো তাহলে তিনিও মানুষের হতাশাকে সম্ভাবনায় পরিণত করতেন, তিনিও পাখির মতো মানুষের রিজিকের ব্যবস্থা করতেন। এ প্রসঙ্গে হজরত ওমর (রা) থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে রাসূল (সা) বলেছেন, "যদি তোমরা আল্লাহর ওপর ভরসা করার হক আদায় (পূর্ণ ভরসা) করতে তবে তিনি পাখিকে রিজিক দেয়ার মতোই তোমাদেরকেও রিজিক দিতেন। পাখিতো সকালে খালি পেটে বের হয়ে যায় এবং সন্ধ্যায় ভরা পেটে ফিরে আসে" (তিরমিজি)।

সমাজ সংস্কৃতি পরিবর্তনের জন্য যারা কাজ করেন কিংবা ব্যক্তির সার্বিক জীবনের পুনর্বিন্যাস সাধনের লক্ষ্যে যারা দিনরাত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন তারা কতটুকু সম্ভাবনা নিয়ে কাজ করেন? বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় কখনো যার ব্যাপারে শতভাগ সম্ভাবনা নিয়ে কাজ শুরু করা হয়েছিল তিনি ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে গেছেন আর যার ব্যাপারে কোনো সম্ভাবনাই ছিল না তিনি জীবনটাকেই পাল্টে দিয়েছেন। সমাজে এরকম বহু ঘটনার সাক্ষী আমি আপনি। কেউ এমন ঘটনা বাস্তবে দেখেছেন কেউবা শুনেছেন। তাই সম্ভাবনাকে অবহেলা করতে নেই হোক সেটা সিকি ভাগ কিংবা শতভাগ। বরং সম্ভাবনাকে সম্পদ মনে করে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা গ্রহণ করে দৃঢ় পদক্ষেপে এগিয়ে চলুন দেখবেন সাফল্য আসবেই। মহাগ্রন্থ আল কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন, "তোমরা হতাশ হয়ো না, দুঃখ করো না, তোমরাই বিজয়ী হবে, যদি তোমরা সত্যিকার মুমিন হয়ে থাকো” (সূরা আলে ইমরান: ১৩৯)।

📘 জীবন বদলে যাবে > 📄 নেতিবাচক নয় ইতিবাচক ভূমিকায় অবতীর্ণ হোন

📄 নেতিবাচক নয় ইতিবাচক ভূমিকায় অবতীর্ণ হোন


সাফল্য অর্জনের জন্য ইতিবাচক চিন্তা যে একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান এবং তা লালন করা যে অত্যাবশ্যক সে সম্বন্ধে Napoleon Hill-এর Think and Grow Rich বইয়ের মাধ্যমে ইঙ্গিত পাওয়া যায়, যার ইংরেজি প্রকাশকাল ১৯৩৭ সালে। পরবর্তী সময়ে নেপোলিয়ান হিল এবং ডব্লিউ কেমেন্ট স্টোন আরও একটি বই রচনা করেন যাতে সরাসরি ইতিবাচক মানসিক দৃষ্টিভঙ্গিকে সাফল্য অর্জনের জন্য মুখ্য উপাদান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি একজন ব্যক্তিকে সাফল্য অর্জনের লক্ষ্যে পরিকল্পনা বাস্তবায়নে দৃঢ় করে তোলে। ইতিবাচক মানসিক দৃষ্টিভঙ্গি দ্বারা এমন নির্দেশ বোঝায় যার মাধ্যমে আস্থা, সততা, আশা, সাহস, প্রত্যাশা, সৌজন্যতা, ধৈর্য, কৌশল, দয়ার মতো ভালো সাধারণ কিছু অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ ঘটায়। একজন সাধারণ মানুষের জীবনেও সমস্যা থাকে, বাধা, দুঃখ, হতাশা, সম্পদের অভাব থাকে কিন্তু তারপরও ইতিবাচক চিন্তা এবং সেই অনুযায়ী পরিকল্পিতভাবে ইতিবাচক কাজ করে জীবন সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায়। জীবনে সমস্যা থাকবেই কিন্তু সমস্যার কারণে নেতিবাচক চিন্তা করে, ভয়ে ভীত না হয়ে, বসে না থেকে ইতিবাচক দিকগুলোকে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার মধ্যে এনে সামনে এগিয়ে যেতে হবে ইতিবাচক মানসিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে।

মানুষের স্বভাবগত অভ্যাস হলো নেতিবাচক ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়া। সমাজে প্রায়ই লক্ষ করা যায় ইতিবাচক দিকগুলোকেও অনেক সময় নেতিবাচক ভঙ্গিতে উপস্থাপন করা হয়। বিষয় যতই জটিল হোক না কেন প্রত্যেক বিষয়েরই ইতিবাচক দিক থাকে, সেটিকে ফুটিয়ে তুলে নেতিবাচক না বলাই শ্রেয়। কারো সাথে সাক্ষাৎ হলে নিজেকে ইতিবাচক ভূমিকায় উপস্থাপন করা আবশ্যক। সাক্ষাৎ করা ব্যক্তিটির জীবনে নিজের সুন্দর পরিচয়কে তুলে ধরে যার সাথে সাক্ষাৎ হবে তার জীবনে আমি ইতিবাচক ভূমিকায় হাজির হবো- এটাই আমার সাক্ষাতের মূল সার্থকতা। যার সাথে সাক্ষাৎ হবে তার সামনে নিজেকে ইতিবাচক ভূমিকায় উপস্থাপন কার্যকর সহায়ক শক্তি হিসেবে ফল দিতে পারে। অনেক সময় ইতিবাচক এবং নেতিবাচক দুটোই সমান পর্যায়ের হয় তখন ইতিবাচক চর্চা নেতিবাচক বিষয়কে চাপা দিয়ে নেতিবাচকের বিরুদ্ধে বিজয়টা ছিনিয়ে আনা সম্ভব। চিন্তা এবং পরিকল্পনার ক্ষেত্রেও ইতিবাচক চিন্তা কল্যাণ বয়ে আনে। কোনো একটি কাজ করতে গিয়ে কাজের নেতিবাচক দিকগুলোকে প্রাধান্য না দিয়ে ইতিবাচক দিকগুলোকে প্রাধান্য দিয়ে সেগুলোকেই সম্ভাবনা ধরে পরিকল্পিতভাবে সামনে এগোতে পারলে সাফল্য নিশ্চিতভাবেই ধরা দিবে। আর যদি নেতিবাচক চিন্তাই শুধু মনের ভেতর ঘুরপাক খায় তাহলে কাজে সফলতা তো দূরের কথা কাজ শুরু করাই কঠিন হবে। প্রতিটি কাজে কিংবা কাজের শুরুতে ইতিবাচক চিন্তা কাজের ক্ষেত্রে বিরাট আত্মবিশ্বাস তৈরি করে। ইতিবাচক চিন্তা কাজের অর্ধেক আর বাকিটুকু পরিশ্রমের ওপর নির্ভর করে। ইতিবাচক চিন্তা একটি কার্যকর পরিকল্পনা তৈরির নিয়ামক শক্তি। ইতিবাচক চিন্তা ছাড়া যেমন কল্যাণ নিশ্চিত হয় না তেমনি নেতিবাচক চিন্তাকে দূরে ঠেলে দেয়া ছাড়া পরিকল্পনার সুফল পাওয়া যায় না।

একটি বিষয়কে দুই ভাবে উপস্থাপন করা যায়। ইতিবাচক এবং নেতিবাচকভাবে। একটি গ্লাসে অর্ধেক পানি থাকা অবস্থায় ইতিবাচক কিংবা নেতিবাচক দুটো পদ্ধতিতেই তৃষ্ণার্ত ব্যক্তির সামনে গ্লাসটিকে উপস্থাপন করা যায়। যদি বলা হয় অর্ধেক খালি কিংবা অর্ধেক পানিশূন্য গ্লাস টেবিলের ওপর রাখা আছে তাহলে এই খালি এবং শূন্যকে আবর্তন করে তৃষ্ণার্ত ব্যক্তির কাছে নেতিবাচক ধারণার জন্ম হয়। আবার যদি বলা হয় টেবিলে আধা গ্লাস পানি আছে তাহলে এটি পজেটিভ তথা ইতিবাচকই শোনায়। তখন তৃষ্ণার্ত ব্যক্তির সামনে এটি সম্ভাবনার বিষয় হয়ে দেখা দেয় যে অন্তত তৃষ্ণা নিবারণের জন্য তার সামনে আধা গ্লাস পানি রয়েছে। তেমনিভাবে একজন ছাত্র পড়ার টেবিলে বসেও ইতিবাচক চিন্তা লালন করতে পারে। যদি সে চিন্তা করে ৫টি বিষয়ের পড়া আগামীকালের ক্লাসের জন্য তৈরি করতে বসে দু'টি শেষ হয়েছে মাত্র, আরো ৩টি বাকি আছে, তাহলে তার চিন্তায় নেগেটিভিটি জন্ম নিবে। আর যদি সে এটি চিন্তা করে, আলহামদুলিল্লাহ দু'টি বিষয় আদায় হয়ে গেছে ৫টির চাপ থেকে ৩টিতে নেমে এসেছে। তার জন্য বাকি ৩টির পড়াও দ্রুত আদায় করা সম্ভব হবে। একজন পর্বতারোহী সর্বোচ্চ শৃঙ্গে আরোহণ করতে গিয়ে যদি হিসাব করেন ১০০ মাইল উঁচু শৃঙ্গে আরোহণ করতে গিয়ে ৩০ মাইল অতিক্রম করেছি মাত্র। তখন তার জন্য সামনে অগ্রসর হওয়া কঠিন হবে। কারণ আরো ৭০ মাইল পাড়ি দেয়ার নেতিবাচক দৃষ্টি জন্ম নিবে। কিন্তু যদি এটিই হিসাব করেন যে এক শত থেকে ৩০ মাইলের দূরত্ব তিনি কমিয়ে আনতে পেরেছেন তাহলে তার ইতিবাচক এই চিন্তা অবশিষ্ট দূরত্ব অতিক্রম করতে তাকে সাহস জোগাবে। আর যদি চিন্তা করেন এখনো ৭০ মাইল অনেক দূর তাহলে তা তাকে হতাশায়ও ডুবাতে পারে। উদ্দেশ্যকে ব্যর্থ করে দিতে পারে।

বিষয় যতই কঠিন কিংবা দুঃসাধ্য হোক না কেন সাফল্য নির্ভর করে ইতিবাচক চিন্তায় বিষয়টিকে গ্রহণের ওপর। যারা ইতিবাচক চিন্তার লালন করেন তারা সকল বাধা-বিপত্তি ঝড়-ঝঞ্ঝাকে মাড়িয়ে সাফল্যের মঞ্জিলে পৌঁছাতে সক্ষম হন। আর যারা নেতিবাচক বিষয়কে অগ্রাধিকার দেন তাদের কাছে নেতিবাচক যে কোন বাধাই হোক না কেন নেতিবাচক কিছুকে হিসাবে বন্ধক হিসেবে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তাই নেতিবাচক বিষয়গুলোকে সেই অবস্থায়ই কিভাবে প্রতিহত করে সামনে এগিয়ে যাওয়া যায় তার চেষ্টা করতে হবে। কারণ ইতিবাচক মানসিকতা রাখার ওপরই নির্ভর করবে সাফল্য। জীবন চলার পথে ইতিবাচক যতগুলো বিষয় আছে তার প্রতিই বেশি নজর দেয়া দরকার। ইতিবাচক দিক এবং কল্যাণকর গুণাবলিই চলার পথকে সহজ করে দিতে পারে। নেতিবাচক চিন্তা শুধুমাত্র ত্রুটি এবং অকল্যাণকর দিকগুলোকেই সামনে বেশি টেনে নিয়ে আসে। ফলে দোষগুলোই বেশিরভাগ চোখের সামনে ভেসে ওঠে: আড়ালে থেকে যায় কল্যাণকর দিকগুলো। অনেক সময় কল্যাণকর কিংবা ইতিবাচক দিকগুলো নজরেই আসে না। মানুষের মধ্যে, প্রতিটি কাজের ক্ষেত্রে ইতিবাচক এবং নেতিবাচক দুটো দিকই আছে। কিন্তু যাদের স্বভাব শুধুমাত্র নেতিবাচক বিষয় চর্চা করে তারা সুশোভিত ফুলের মধ্যেও কাঁটার যন্ত্রণা খুঁজে বেড়ান। স্বর্গেরও ত্রুটি বের কতে ছাড়েন না তারা।

ইতিবাচক দিকগুলোকে প্রাধান্য দেয়ার অর্থ এই নয় যে নেতিবাচক দিকগুলোকে অগ্রাহ্য অথবা অস্বীকার করা হচ্ছে। বিষয়টি আদৌ সে রকম নয়। বরং নেতিবাচক বিষয়গুলোকে ইতিবাচকে রূপান্তরিত করাই ইতিবাচক দিকগুলোকে প্রাধান্য দেয়ার মূল টার্গেট। আমাদের মধ্যে কেউ কেউ আছেন সারাদিন শুধু নেতিবাচক চিন্তায় নিমজ্জিত থাকেন। এরা প্রতিটি কাজেরই নেতিবাচক খুঁত বের করতে ব্যস্ত। অথচ পুরো দিনকে কাজের সফলতায় সুসজ্জিত করার জন্য ইতিবাচক চিন্তা দিয়ে কাজ শুরু করা প্রয়োজন। সামনে যা আসবে তা থেকে ইতিবাচক বিষয়গুলো নিয়ে এগিয়ে যেতে পারলেই চাপা পড়ে যেতে বাধ্য নেতিবাচক দিকগুলো। কাউকে পৌঁছানোর জন্য আপনার কাছে যদি এমন দু'টি সংবাদ থাকে যার একটি ইতিবাচক আরেকটি নেতিবাচক। তাহলে আপনি আগে কোনটি জানাবেন। নিশ্চয় আগে ইতিবাচক সংবাদটিই জানানো উচিত। শুরুতেই যদি নেতিবাচক সংবাদটি উপস্থাপন করে ব্যক্তির মনমানসিকতাকে দুর্বল করে ফেলেন তাহলে দেখবেন তার কাছে ইতিবাচক সংবাদটির আর মূল্যই থাকবে না। তবে সবচেয়ে ভালো হচ্ছে ইতিবাচক সংবাদটি আগে দিয়ে পরে ইতিবাচক ভূমিকায় নেতিবাচক খবরটিকে উপস্থাপন করা। আপনজনের মৃত্যুর সংবাদের চাইতে সবচেয়ে বেশি নেতিবাচক সংবাদ আর কি হতে পারে। আমরা দেখি কেউ কেউ আপনজনের মৃত্যু সংবাদ তার প্রিয়জনকে সরাসরি বলে দেয়। ফলে হঠাৎ শোনা সবচেয়ে নেতিবাচক এই খবরে কেউ কেউ হার্টফেল তথা হৃদরোগেও আক্রান্ত হয়। কেউ কেউ শোকে বিহ্বল হয়ে মারাও যান। দেখুন নেতিবাচক সংবাদের প্রভাব কেমন মারাত্মক। অথচ নেতিবাচক খবরটিকেও ইতিবাচক ভঙ্গিতে উপস্থাপন করার সুযোগ আছে।

সমাজের চারপাশের পরিবেশ আমাদের প্রভাবিত করে। আমাদের দূরের বা কাছের মানুষের সাথে চলাফেরা, ওঠা-বসা, আচার আচরণ এমনকি কথাবার্তায় আমরা প্রভাবিত হই। অনেক সময় এতটাই প্রভাবিত হই যে, আমরা নিজেদের ভুলে যাই, নিজের চিন্তা-ভাবনার জলাঞ্জলি দেই। ভাবি হয়তো সেটাই সঠিক। প্রকৃতপক্ষে আমরা সবসময় সঠিক এবং নির্ভুল জিনিসটি বুঝতে পারি না। হয়তো পরিবেশই আমাকে সঠিক চিন্তার লালনে বাধা দেয়। আবার অনেক সময় নিজেদের চিন্তা-ভাবনার মাধ্যমেও আমরা প্রভাবিত হই। তাই যত ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি লালন করবো, যত ইতিবাচক চিন্তার লালনকারী মানুষের সাথে আমার চলাফেরা বা চিন্তার বিনিময় হবে ততোই ভালো রেজাল্ট আমরা পাবো। ইতিবাচক চিন্তার ফলে মানুষ নিজেকে কল্যাণের দিকে পরিবর্তন করে। সমাজে একটি বিষয় খুবই প্রকট তা হলো- আমরা অন্যের নেতিবাচক গুণ, আচার-আচরণ এবং চিন্তাগুলোকেই বেশি লক্ষ করি, সেই সাথে তাদেরকে সেই অনুপাতেই বিচার করি। কিন্তু নিজের ভেতর লুকিয়ে রাখা নেতিবাচক চিন্তাগুলোকে ধ্বংস করি না। আমি আপনি যাকে নেতিবাচক দৃষ্টি দিয়ে মূল্যায়ন করি সেই মানুষের মধ্যে অনেক ইতিবাচক এবং ভালো গুণও রয়েছে সেগুলোতে আমরা খুব কমই নজর দিই। আমরা কি পারি না- অন্যের ইতিবাচক গুণগুলোকে মনে করিয়ে তাঁকে উৎসাহ দিতে। কারণ ভালো কাজের কিংবা ইতিবাচক গুণের জন্য যদি কেউ উৎসাহ পায়, তাহলে তাঁর ভেতরে আরও ইতিবাচক গুণের জন্ম হবে।

সম্প্রতি একদল বিজ্ঞানী কিছু তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে এবং বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ পর্যালোচনা করে বলেছেন, তিনটি ইতিবাচক অনুভূতির বিপরীতে একটি নেতিবাচক অনুভূতি রয়েছে। সেই অনুপাতে ৩:১ হয়। এই অনুপাতই আমাদের ভবিষ্যতের চিন্তা-ভাবনার উৎস হিসেবে মনস্তাত্ত্বিকভাবে কাজ করে। মনস্তত্ত্ববিদরা মনে করেন, মানুষের ইতিবাচক অভ্যাসই পারে ইতিবাচক চিন্তা-ভাবনার জন্ম দিতে এবং ভালো কাজ করার মানসিক প্রেরণা দিতে। কিন্তু বেশিরভাগ সময় আমরা অসচেতন থাকি। যার ভেতরে নেতিবাচক দৃষ্টির লালন বেশি হয় তিনিই মূলত অন্যের নেতিবাচক বিষয়গুলোকে নিয়ে বেশি নাড়াচাড়া করেন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00