📘 জীবন বদলে যাবে > 📄 মানুষ বড় হয় স্বপ্নের সমান

📄 মানুষ বড় হয় স্বপ্নের সমান


সাফল্য ব্যক্তিজীবনের গুরুত্বপূর্ণ এক অধ্যায়। জীবন কতটা সুন্দর তা নির্ভর করে অর্জিত সাফল্যের ওপর। প্রত্যেক ব্যক্তির জীবনেই সাফল্যের আলাদা আলাদা গুরুত্ব রয়েছে। ছাত্রজীবনে ভালো রেজাল্ট করে কৃতিত্ব অর্জনের মধ্যে রয়েছে ছাত্রের সফলতা। আবার ব্যবসায়িক জীবনে ব্যবসায় সফল হওয়ার মধ্যেই রয়েছে ব্যবসায়ীর সফলতা- এভাবে চাকরি জীবন, রাজনৈতিক জীবন, সামাজিক জীবন, খেলোয়াড়ি জীবন থেকে শুরু করে উঁচু-নিচু প্রত্যেক স্তরের কর্মতৎপরতায় সাফল্যের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে ব্যক্তির জীবনে ভূমিকা রাখে। এইযে সাফল্যের এত গুরুত্ব সেই সাফল্য হঠাৎ করে অর্জনের কোনো বিষয় নয়। সুন্দর সাফল্য অর্জনের জন্য একটি সুন্দর স্বপ্নও থাকা চাই। যেই সুন্দর স্বপ্নকে আবর্তন করে মানুষ কর্মতৎপর হয়ে সাফল্যের মঞ্জিলে পৌঁছাতে পারে।

বলা হয়ে থাকে যিনি যত বেশি সুন্দর স্বপ্ন দেখেন, যত বেশি সেই স্বপ্নকে লালন করেন তিনি তত সুন্দর সাফল্য অর্জন করেন। যার স্বপ্ন নেই সাফল্যও তার জন্য অধরাই থেকে যায়। যিনি স্বপ্ন দেখতে জানেন না, স্বপ্নের পেছনে ছুটতে জানেন না, সাফল্যও তার পেছনে ছুটে না। আর যিনি সুন্দর স্বপ্ন দেখেন সেই স্বপ্নের পেছনে ছুটে বেড়ান, এক সময় স্বপ্নই তার পেছনে ছুটে তাকে সাফল্যের কাঙ্ক্ষিত মঞ্জিলে পৌঁছতে অনুপ্রেরণা যোগায়। এজন্য সাফল্যের স্বপ্নচূড়ায় আরোহণের জন্য একটি সুন্দর স্বপ্ন লালন করা চাই। বিশ্বমানবতার অগ্রদূত জনাবে মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা) কাফিরদের অত্যাচার নির্যাতন নিপীড়নের শিকার হয় নিজ জন্মভূমি মক্কা থেকে বিতাড়িত হয়ে আল্লাহরই নির্দেশে মদিনায় পাড়ি জমিয়েছিলেন। কিন্তু নিজ জন্মভূমিতে ফেরার একটা স্বপ্ন রাসূল (সা) লালন করতেন। রাসূল (সা) কাবা জিয়ারত করার বাসনা করতেন। একদিন রাসূল (সা) তমসাচ্ছন্ন অবস্থায় স্বপ্ন দেখলেন তিনি মক্কায় কাবাঘর জিয়ারত করছেন। ঘোরের মধ্যে দেখা স্বপ্নকে তিনি বাস্তবে রূপ দিতে চাইলেন। মক্কায় গিয়ে কাবাঘর জিয়ারতের স্বপ্ন লালন শুরু করলেন। ৬ষ্ঠ হিজরীতে ১৪০০ জন সাহাবী নিয়ে মক্কায় জিয়ারতের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেন। হুদাইবিয়া নামক স্থানে মক্কায় কোরাইশকর্তৃক বাধাপ্রাপ্ত হন। সঙ্কট সমাধানের জন্য হজরত ওসমানকে (রা) পাঠালেন কোরাইশদের কাছে। কিন্তু সেখানে ওসমান (রা)-এর হত্যার রব ওঠে। সবাই ওসমান (রা)-এর হত্যার বদলা নেয়ার শপথ নেন। খবর পেয়ে কোরাইশরা হুদাইবিয়ায় সন্ধি স্থাপনে বাধ্য হয়। সন্ধির আলোকে রাসূল (সা) সে বছর ফিরে আসেন এবং পরবর্তী বছর হজ করেন। পরবর্তীতে ৮ম হিজরিতে মক্কা বিজয়ের মাধ্যমে রাসূল (সা) তাঁর স্বপ্ন বাস্তবায়ন করেন।

স্বপ্ন একটি পরীক্ষিত সত্য এবং বড় আশা জাগানিয়া শব্দ। স্বপ্ন শব্দটা খুব ছোট হলেও এর পরিধি যে কত বড় এবং কত ব্যাপক তা স্বপ্ন বাস্তবায়িত হওয়া স্বপ্নবাজ ব্যক্তিদের উপলব্ধি না করলে বোঝা সম্ভব নয়। স্বাভাবিকভাবে আমাদের সারাদিনের কাজকর্মের ব্যতিব্যস্ততার যে দৃশ্যপট, সেগুলো ব্রেনে লোড হিসেবে জমা হতে থাকে। এই লোডগুলোকে অফ লোড করার একটি জৈবিক প্রক্রিয়া হচ্ছে স্বপ্ন, যা আমরা ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে দেখতে পাই। কিন্তু বাস্তবিক স্বপ্ন কি সে সম্পর্কে ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি ও খ্যাতিমান পরমাণু বিজ্ঞানী এপিজে আবদুল কালাম বলেছিলেন "স্বপ্ন তা নয় যা মানুষ ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে দেখে, স্বপ্ন হচ্ছে তা-ই, যা মানুষকে ঘুমাতে দেয় না" অর্থাৎ শয়নে, স্বপনে, জাগরণে যে লক্ষ্যের অনুরণন আপনাকে আমাকে কর্মব্যস্ত করে রাখে তা-ই হলো স্বপ্ন। এই স্বপ্ন দেখে যারা পৃথিবীকে আলোকিত করেছেন, তারা তাদের স্বপ্নটাকে বিশাল করেছেন, সুন্দর করেছেন পরিশ্রমের মাধ্যমে, রক্তকে ঘামে পরিণত করার মাধ্যমে। আর এর ফলেই তাদের সুন্দর স্বপ্নগুলো অঙ্কুরিত হয়েছে সাফল্যের বীজে।

'মানুষ বড় হয় তার স্বপ্নের সমান'। 'সফল মানুষের স্বপ্ন বাস্তবায়িত হওয়ার আগে অধিকাংশ বিষয়ই তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকে না। সময় তাদেরকে এগিয়ে নিয়ে যায় লক্ষ্য অর্জনের পথে।' সত্যিকারার্থে সাফল্য অর্জন করতে হলে স্বপ্ন দেখতে হবে, বড় স্বপ্ন, সুন্দর স্বপ্ন। আপনি কতটুকু ছোট তার হিসাব না করে আপনি কত বড়, কত সুন্দর স্বপ্ন দেখতে পারেন তার হিসাব করুন। বিশ্বের সব বিখ্যাত মানুষ সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্মায়নি। এসব সফল মানুষের অনেকেরই জন্ম হয়েছে দরিদ্র পরিবারে। লড়তে হয়েছে অভাবের সঙ্গে, নানা প্রতিকূলতার সঙ্গে। এদের অনেকেই কাজ করেছেন পরিচ্ছন্নতাকর্মী, কাঠুরিয়া, মুচি কিংবা মুদি দোকানদার হিসেবে। দিনযাপন করেছেন ফুটপাথে। কিন্তু শুরুটা যে কর্মেই হোক না কেন, তাদের ছিল লক্ষ্য আর দু'চোখে ছিল বড় হওয়ার সুন্দর স্বপ্ন। সেই স্বপ্ন ও স্বপ্নের পথে অবিচল থাকার কারণেই তারা সাফল্যের উচ্চশিখরে পৌছাতে পেরেছেন।

এক কাঠুরিয়ার ছেলে স্বপ্ন দেখেছিল সে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হবে। কিন্তু লোকজন তাকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করলেও কাঠুরিয়ার ছেলের সেই স্বপ্ন সত্যিই পূরণ হয়েছিল। তিনি আর কেউ নন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট আবরাহাম লিংকন। স্বপ্ন লালন করে এগিয়ে যাওয়ার ফলেই তিনি সাফল্য পেয়েছিলেন। কাঠুরিয়ার ছেলে হয়েও দমে যাননি তিনি। নোবেল পুরস্কার বিজয়ী আইরিশ ব্যক্তি জর্জ বার্নার্ড শ মাত্র ৫ বছর স্কুলে লেখাপড়া করেছেন। দরিদ্রতার কারণে মাত্র ১৫ বছর বয়সে তাকে কেরানির কাজ করে অর্থ জোগাড় করতে হয়েছে। কিন্তু তিনি স্বপ্ন দেখতেন যে তিনি একদিন বড় লেখক হবেন। তাই তিনি কাজের ফাঁকে প্রতিদিন বাধ্যতামূলকভাবে ১০ পৃষ্ঠা পড়তেন। কোন কারণে পড়তে না পারলে পরের দিনের সাথে মিলিয়ে মোট ২০ পৃষ্ঠা পড়তেন। একদিন তার স্বপ্ন সত্যি হয়েছিল। আর তিনি সেই সাহিত্যেই পেয়েছিলেন নোবেল পুরস্কার। দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদবিরোধী কিংবদন্তি নেতা নেলসন ম্যান্ডেলা তীব্র দারিদ্র্যের মধ্যে বেড়ে ওঠেন। ম্যান্ডেলার বাবা যখন মারা যান, তখন তিনি ছিলেন নয় বছরের শিশু। এরপর মা ম্যান্ডেলাকে নিয়ে কুনু গ্রামে চলে আসেন। ক্ষুদ্র একটি কুটিরে বসবাস করতেন। কোনোরকমে শাকসবজি খেয়ে জীবনধারণ করতেন। তখন কে ভেবেছিল, এই ছোট্ট ছেলেটিই একদিন বিশ্বব্যাপী কিংবদন্তি হয়ে উঠবে! নেলসন ম্যান্ডেলা ২৯ বছর কারাবন্দী ছিলেন। এমন প্রকোষ্ঠে তাকে রাখা হলো যেখানে সূর্যের আলো পৌঁছাতো না। মুক্তির পর তাকে জিজ্ঞেস করা হলো, আপনি সেখানে কী করেছেন? তিনি উত্তর দিয়েছেন, 'স্বপ্ন দেখেছি'। মুক্ত দক্ষিণ আফ্রিকার স্বপ্ন দেখেছি। সত্যিই তিনি তার স্বপ্ন পূরণ করেছেন।

イমাম আজম আবু হানিফা (রহ) ছিলেন দরিদ্র পরিবারের সন্তান। ইমাম আবু হানিফার দাদা ছিলেন একজন ইরানি ক্রীতদাস। তার পিতা একজন সামান্য কাপড়ের ব্যবসায়ী থেকে একজন সওদাগরে রূপান্তরিত হয়েছিলেন। তিনি তার পুত্র আবু হানিফার মেধাকে অনুধাবন করতে পেরেছিলেন। তাই তাকে ব্যবসায়ে না লাগিয়ে উচ্চশিক্ষা দানে মনোযোগী হন। কারণ তখন থেকেই তিনি স্বপ্ন দেখেছিলেন আবু হানিফা বড় জ্ঞানী হবে, মুসলিম উম্মাহর জন্য অবিসংবাদিত ব্যক্তি হবে। সেই থেকেই আবু হানিফার পথচলা। খুব অল্প বয়সেই ইমাম আবু হানিফা কুরআনে হাফেজ হন। আরবি ভাষাসাহিত্যে অর্জন করেন অসামান্য দখল। তিনি জ্ঞানের তুলনায় ধনসম্পদ বা পদবিকে কোনোই গুরুত্ব দিতেন না। তার সুনাম শুনে কুফা নগরীর স্বেচ্ছাচারী গভর্নর ইবনে হুরায়রা তাকে কুফার কাজির মতো গুরুত্বপূর্ণ পদ গ্রহণের অনুরোধ করেন। কিন্তু জ্ঞানের পাগল আবু হানিফা তা গ্রহণে অস্বীকৃতি জানান। ইমাম আবু হানিফা (রহ) মুসলিম জুরিসপ্রুডেন্স বা ফিকাহশাস্ত্র তৈরি করেন। মশহুর জার্মান পন্ডিত ভনক্রেমার বলেছেন, এটি ইসলামের সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ ও বুদ্ধির ধারণাতীত ফল।

বিশ্বমানবতার মুক্তির দূত মানবতার মহান শিক্ষক জনাবে মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁর জন্মের ৬ মাস আগেই পিতা আবদুল্লাহকে হারিয়েছেন। ছয় বছর বয়সে হারিয়েছেন মা আমেনাকে। লালিত পালিত হয়েছেন দুধমাতা হজরত হালিমা সাদিয়া (রা)-এর কোলে। ৮ বছর পর হারিয়েছেন দাদা আবদুল মোত্তালিবকে। ইসলামের দাওয়াত প্রচারের কারণে তায়েফে কাফেরদের পাথরের আঘাতে রক্তাক্ত হয়েছেন। হত্যার জন্য কোরাইশরা বহুবার চেষ্টা করেছে। নিজ জন্মভূমি থেকে বের করে দেয়া হয়েছে তাঁকে। মদিনায় আক্রমণের শিকার হয়ে যুদ্ধে অংশ নিয়েছেন। ওহুদের ময়দানে তাঁর দান্দান মোবারক শহীদ হয়েছে। এত কিছুর পরও রাসূল (সা) সফল ব্যক্তি। তিনি দ্বীনের পূর্ণতা তথা বিজয়ের স্বপ্ন থেকে একচুল পরিমাণ পিছপা হননি। মক্কা বিজয়ের মাধ্যমে তিনি গোটা দুনিয়ায় ইসলামের বিজয় নিশ্চিত করেছেন। তাইতো মহাগ্রন্থ আল কুরআনে রাসূল (সা)-এর জীবনাদর্শকেই অনুকরণীয় সর্বশ্রেষ্ঠ আদর্শ বলা হয়েছে। কুরআনে আল্লাহ বলেছেন, "নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য রাসূলুল্লাহ (সা)-এর জীবনেই রয়েছে সর্বোত্তম আদর্শ” (সূরা আহজাব: ২১)।

📘 জীবন বদলে যাবে > 📄 প্রয়োজন দীপ্ত শপথ আর সুদৃঢ় আকাঙ্ক্ষা

📄 প্রয়োজন দীপ্ত শপথ আর সুদৃঢ় আকাঙ্ক্ষা


সুন্দর স্বপ্ন লালন করে সাফল্যের পেছনে ছুটে চলার ক্ষেত্রে পরবর্তী প্রয়োজন হলো দীপ্তশপথ আর সুদৃঢ় আকাঙ্ক্ষা। দীপ্তশপথ হচ্ছে কাজের সফলতা নিশ্চিত করার ব্যাপারে অঙ্গীকারবদ্ধ হওয়া আর সুদৃঢ় আকাঙ্ক্ষা হচ্ছে শপথ বাস্তবায়নের চালিকাশক্তি; যে আকাঙ্ক্ষার ওপর ভর করে দীপ্তশপথে বলীয়ান হয়ে সাফল্যের পেছনে পূর্ণোদ্যমে ছুটে চলা যায়। সুদৃঢ় আকাঙ্ক্ষাকে প্রতিশ্রুতি বা শপথ রক্ষার ইচ্ছাও বলা চলে। শপথহীন কাজে খাদ থেকে যায়। মনোবাসনা হয় দুর্বল এবং এর ভবিষ্যৎ হয় অনিশ্চিত। কেউ কেউ আছেন শপথবদ্ধ হতে চান না। তাদের বক্তব্য হচ্ছে শপথবদ্ধ হওয়া ছাড়াওতো বহু কাজ করা যায়, বহু কাজে সফলতা অর্জন করা যায়। এদের অনেকে মনে করেন শপথবদ্ধ হওয়া মানে নিজেকে অঙ্গীকারের জালে জড়িয়ে ফেলা, নিজের স্বাধীনতাকে বিসর্জন দেয়া, নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে চলা। আসলে বাস্তবিক কথা হচ্ছে এটা তারাই ভাবেন যারা সাফল্য অর্জনে সুদৃঢ় আকাঙ্ক্ষা পোষণ করেন না এবং দীপ্তশপথেও বলীয়ান হন না। যদি দীপ্তশপথে বলীয়ান হয়ে সুদৃঢ় আকাঙ্ক্ষা লালন করে কাজ শুরু করা যায় তাহলে সাফল্য ছিনিয়ে স্বপ্ন পূরণ করা সম্ভব হয়। মহাগ্রন্থ আল কুরআনের বিভিন্ন স্থানে আল্লাহ বলেছেন, "যারা সুদৃঢ়প্রত্যয়ী তারাই সফলকাম" হুদাইবিয়ার সন্ধির সময় হযরত ওসমান (রা)-এর হত্যার সংবাদে বাবলা গাছের নিচে রাসূল (সা)-এর হাতে হাত রেখে যেসকল সাহাবী শপথ গ্রহণ করেছিলেন আল্লাহ তায়ালা তাদের উপর অনেক বেশি সন্তুষ্ট হয়েছিলেন। এ প্রসঙ্গে আল কুরআনে এসেছে- "হে রাসূল (সা) আল্লাহ মুমিনদের ওপর সন্তুষ্ট হয়েছেন যখন তারা গাছের নিচে আপনার নিকট বাইআত তথা শপথবদ্ধ হচ্ছিল” (সূরা ফাতাহ: ১৮)।

আমাদের সাফল্য দীপ্তশপথ আর সুদৃঢ় আকাঙ্ক্ষা পোষণের সাথে গভীরভাবে জড়িত। দীপ্তশপথ আর সুদৃঢ় আকাঙ্ক্ষা তথা অঙ্গীকারবদ্ধতা কাজের ক্ষেত্রে শক্তি জোগায়। যখন কোন ব্যক্তি সুদৃঢ় আকাঙ্ক্ষা নিয়ে দীপ্তশপথে বলীয়ান হয় তার মনে এ ধারণাই জন্মে, যাই ঘটুক না কেন, যে যাই বলুক না কেন, সাফল্য অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত থেমে থাকা নয়। রাসূল (সা) প্রতিটি যুদ্ধের আগেই সাহাবাদের বাইআত তথা শপথবদ্ধ করাতেন। বদর যুদ্ধে মাত্র ৩১৩ জন প্রায় নিরস্ত্র সৈন্য ১ হাজার সশস্ত্র কোরাইশ সৈন্যের বিরুদ্ধে বিজয়ী হয়েছিলেন। বিজয়ী হওয়ার ক্ষেত্রে যে সকল বিষয় মূল প্রতিপাদ্য ছিল তার মধ্যে শপথবদ্ধতা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বদরের সাহাবারা বাইয়াতের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন সাফল্য অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত তাঁরা থেমে যাবেন না। যিনি দীপ্তশপথ নিয়ে সাফল্য অর্জনে অঙ্গীকারবদ্ধ হতে পারেন সাফল্য তার পদ চুম্বন করবেই। যিনি শপথবদ্ধ হন তিনি অনেক কিছুই ত্যাগের জন্য প্রস্তুত হয়ে যান। তার ত্যাগের এই মানসিকতাই তাকে সাফল্যের শিখরে পৌঁছে দিতে সাহায্য করে। সুদৃঢ় আকাঙ্ক্ষা লালন করা ব্যক্তি কাজের ক্ষেত্রে যখন সমস্যা আসে তার সূচনাতেই পালিয়ে যায় না, হতাশ হয় না বরং দৃঢ় আকাঙ্ক্ষা তাকে সকল প্রতিবন্ধকতা মাড়িয়েও বিজয়ী করে। আর যিনি শপথবদ্ধ হন না তিনি যে কোন সময় মূল কাজ থেকে ছিটকে পড়তে পারেন। ভয়-ভীতি, লোভ-লালসা, ক্ষুধা-দরিদ্রতা, চিন্তার অসারতা তাকে যেকোন সময় সাফল্য অর্জনের পথ থেকে বিচ্যুত করতে পারে।

আমাদের সমাজে যারা প্রতিনিধি নির্বাচিত কিংবা মনোনীত হন তাদের শপথ বাক্য পাঠ করানো হয়। শপথবদ্ধ ব্যক্তি যিনি শপথের মাধ্যমে অধীনস্থদের কাছে অঙ্গীকারবদ্ধ হন তার জবাবদিহিতা আর শপথহীন ব্যক্তির জবাবদিহিতা সমান নয়। কারণ শপথবদ্ধ ব্যক্তিকে শপথের আলোকেই কর্তব্য পালন করতে হয়। সমাজে যিনি যত গুরুত্বপুর্ণ তার শপথও তত গুরুত্বপূর্ণ। আমরা দেখি সংসদ সদস্য হিসেবে যিনি শপথ নেন তিনি যদি মন্ত্রী বা স্পিকার হন তাকে তখন আবারো শপথ নিতে হয়। বর্তমান বিশ্বে রাষ্ট্র পরিচালনায় শপথ ভঙ্গের জন্য আইনি শাস্তির ব্যবস্থার বিধানও সকল দেশেই সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃত। এতেই প্রতীয়মান হয় শপথের গুরুত্ব কত বেশি। রাষ্ট্র পরিচালনায় বা কোন প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা বা কাজের সফলতার জন্য যদি শপথ বা অঙ্গীকারের গুরুত্ব থাকে তাহলে আমরা যারা জীবনটাকে সঠিকভাবে পরিচালনার মাধ্যমে বদলে দিয়ে সাফল্য ছিনিয়ে আনতে চাই তাদের দীপ্তশপথ আর সুদৃঢ় আকাঙ্ক্ষা ধারণ করা অনেক বেশি জরুরি।

📘 জীবন বদলে যাবে > 📄 অদম্য ইচ্ছাশক্তি সাফল্যের সোপান

📄 অদম্য ইচ্ছাশক্তি সাফল্যের সোপান


মানুষের ভেতর এক বিশাল শক্তি লুকিয়ে আছে যার নাম ইচ্ছাশক্তি। যে শক্তি অফুরন্ত সম্ভাবনার দ্বার। এই অফুরন্ত ইচ্ছাশক্তিকে যদি সত্যিকারার্থে জাগ্রত করা যায় তাহলে সাত সমুদ্র তেরো নদী পাড়ি দিয়ে হলেও বিজয় ছিনিয়ে আনা সম্ভব। অদম্য ইচ্ছাশক্তি সাফল্যের অন্যতম সোপান। অদম্য, অজেয় ইচ্ছাশক্তি যার রয়েছে বিজয়ী হওয়ার সম্ভাবনা তারই সবচেয়ে বেশি। সাফল্যের স্বর্ণশিখরে পৌঁছার জন্য প্রয়োজন ইচ্ছাশক্তিকে শক্তিশালী করা। কিন্তু অনেক সময় মানুষ তার ইচ্ছাশক্তিকে জাগ্রত করে না। নিজের ভেতরের ইচ্ছাশক্তিকে নিজের মাঝেই ঘুম পাড়িয়ে রাখে। নিজেকে ছোট মনে করে। না পারার ভয়কে জাগ্রত করে রাখে। অথচ নিজের ভেতর লুকিয়ে থাকা অদম্য ইচ্ছাশক্তিকে যদি জাগিয়ে তোলা যায় তাহলে যেকোনো সাফল্য অর্জন করা সম্ভব।

একটি প্রসিদ্ধ প্রবাদ বাক্য আছে, Where there's a will, there's a way অর্থ- ইচ্ছে থাকলেই উপায় হয়। সেই আদিকাল থেকেই এ প্রবাদ বাক্যটা মানুষের মুখে মুখে চলে আসছে। ছাত্রছাত্রীরাও তাদের খাতায় এ বিষয়ে অসংখ্যবার ভাবসম্প্রসারণ লিখেছে। শিক্ষকরা শ্রেণিকক্ষে এ বিষয়ে প্রতিনিয়তই পাঠদান করে যাচ্ছেন। কিন্তু বাস্তব সত্য হলো ইচ্ছা নামক এই অফুরন্ত শক্তি প্রত্যেক ব্যক্তির মাঝে লুকিয়ে থাকলেও তার ব্যবহার সব সময় লক্ষ করা যায় না। ইচ্ছাশক্তিকে ব্যবহার করে জীবন পরিচালনার উপায় তথা কাজের সাফল্যে পৌঁছার কোনো তৎপরতা অনেকের মাঝেই অনুপস্থিত থাকে। যদিও সঠিকভাবে কাজ করার ইচ্ছা পোষণ করা এবং সে ইচ্ছাকে শেষ পর্যন্ত ধরে রাখা সত্যিই কষ্টকর ব্যাপার। কিন্তু ইচ্ছাশক্তি প্রবল হলে মানুষ পারে না এমন কোনো কাজ নেই।

ইচ্ছা করলেই মানুষ অসাধ্যকে সাধন করতে পারে। কঠিন অবস্থার মুখোমুখি হয়েও সাফল্যকে ছিনিয়ে আনতে পারে। তার জন্য প্রয়োজন নিজেকে দুর্বল না ভাবা, আত্মবিশ্বাস রাখা, ব্যর্থ হওয়ার চিন্তা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলা। নিজের মাঝে যে বিশাল ইচ্ছাশক্তি লুকিয়ে আছে এর ওপর অনেকেরই বিশ্বাস নেই। অনেকেই ভাবেন 'ইচ্ছা থাকলে উপায় হয়' কথাটি তার জন্য প্রযোজ্য নয়। যারা নিজের জন্য ইচ্ছাশক্তি প্রযোজ্য নয় বলে আলসেমি করেন তারা মূলত তার ভেতর লুকিয়ে থাকা অফুরন্ত শক্তিটাকেই তিলে তিলে শেষ করে দেন, ধামাচাপা দিয়ে রাখেন। অথচ ইচ্ছাশক্তিকে প্রবল করেই কাজে ঝাঁপিয়ে পড়লে ফলাফল বের করে নিয়ে আসা সম্ভব।

ইচ্ছাশক্তির বলে প্রতিবন্ধকতার পাহাড় মাড়িয়ে অনেকেই সাফল্য ছিনিয়ে এনেছেন। আমাদের চারপাশেই এ রকম হাজারো উদাহরণ আছে। ২০১৪ সালে এইচএসসি-তে এক অন্ধ ছেলের গোল্ডেন এ প্লাস পাওয়ার খবরে দেশব্যাপী আলোড়ন তৈরি হয়। প্রশ্ন উঠে জন্মান্ধ ছেলেটি কিভাবে এমন সাফল্য অর্জন করতে পারল। জানা গেল ছেলেটি চোখে না দেখলে কী হবে, তার মমতাময়ী মা তার বইয়ের পড়াগুলো মোবাইলে রেকর্ড করে রাখতেন, আর সে মোবাইলের রেকর্ড শুনে পড়া মুখস্থ করত। যে প্রচেষ্টার মধ্য দিয়ে এইচএসসি ফাইনাল পরীক্ষায় সে গোল্ডেন এ প্লাস পেয়ে গেল। এটি মূলত তার ইচ্ছাশক্তির কারণেই সম্ভব হয়েছিল। ইচ্ছাশক্তি প্রবল থাকলে শুধু চোখের প্রতিবন্ধকতা কেন যেকোনো প্রতিবন্ধকতাকেই জয় করা সম্ভব। এমনই দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার হজরতপুর গ্রামের কৃষক জাহিদ সরওয়ারের ছেলে জুবায়ের হোসাইন। মুখে কলম নিয়েই লেখাপড়া চালিয়ে যাচ্ছে সে। জন্মগতভাবে প্রতিবন্ধী জুবায়ের হাত-পা কাজে লাগাতে না পারায় মুখেই কলম তুলে নেয়। খাতায় লেখালেখি শিখতে বছরখানেক সময় লাগলেও সে এখন স্বাভাবিক মানুষের মতো লিখতে পারে। জুবায়ের প্রাইমারি স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষায় পেয়েছিলো জিপিএ ৪ দশমিক ২৫। জেএসসিতে সে জিপিএ ৫ পায়।

অনেক সময় আমরা ইচ্ছাশক্তির অভাবে নানান ধরনের হতাশা, দুশ্চিন্তা ও মানসিক রোগের দ্বারা আক্রান্ত হয়ে পড়ি। যার ফলে কাজে চলে আসে অনীহা। কাজ করার সময়, বাধাবিপত্তির সময় ইচ্ছাশক্তিকে প্রবল রাখুন, ইচ্ছাশক্তিকে স্থায়ী করার চেষ্টা করুন। কারণ কাজের ইচ্ছা নির্ভর করে কাজের প্রতি আগ্রহের ওপর। কতটা আগ্রহের সাথে কাজ করছেন তার ওপরই নির্ভর করে আপনার ইচ্ছা কতক্ষণ স্থায়ী হবে। মানুষের ইচ্ছাশক্তি বাড়ানোর উপায় বের করতে গবেষকরা বিস্তর গবেষণা করেছেন। পরিশেষে তারা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে, ইচ্ছাশক্তি একটি পেশির ন্যায়, যা বেশি কাজ করার দরুন ক্লান্ত হয়ে পড়ে এবং সে ক্লান্তিকে পুরণ করতে পরিমিত খাদ্য দরকার হয়। গবেষণায় এটাও প্রমাণিত হয়েছে যে, সঠিক পরিচর্যার মাধ্যমে দেহের অন্যান্য পেশির মত ইচ্ছাশক্তির ক্ষমতাও বাড়ানো সম্ভব।

সুস্থ ও শারীরিকভাবে ভালো থাকার অন্যতম মন্ত্র হলো নিজের ইচ্ছে। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় হতাশা, দুশ্চিন্তা ও মানসিক রোগ থেকে মুক্তির অন্যতম মন্ত্র হলো নিজের প্রতি নিজের ইচ্ছে। যার ফলে নিজের ভবিষ্যৎ, ক্যারিয়ার, স্মৃতিশক্তি ও দক্ষতা বাড়াতে মূলমন্ত্র শক্তি হিসেবে কাজ করবে। আপনি হয়ে উঠবেন আগের থেকে অনেক বেশি আতাবিশ্বাসী ও সুস্থ। ইচ্ছাশক্তি প্রবল থাকলে যেকোনো প্রতিবন্ধকতাকে জয় করা সম্ভব। আমরা যারা খারাপ রেজাল্ট করি, তারাও খুব হতাশায় ভুগে থাকি। এর কারণ ইচ্ছাশক্তিকে শক্তিশালী না করা। ছোট বড় সবাই কিছু না কিছু নিয়ে হতাশাতে ভুগছি। হতাশা এক ধরনের মানসিক রোগ। আর আপনি এই রোগে যদি আক্রান্ত হয়ে পড়েন, তাহলে আপনি সাফল্য অর্জনের লক্ষ্য থেকে ধীরে ধীরে দূরে সরে যাবেন। সাফল্য অর্জন তো করতেই পারবেন না, যা অর্জনে থাকবে তাও হারাবেন। যার মধ্যে ইচ্ছাশক্তি থাকে হতাশা তাকে কখনও কাবু করতে পারে না।

ইচ্ছাশক্তির বলে বলীয়ান হয়ে মানুষ অধ্যবসায়ে হয়েছে মনোযোগী, পেয়েছে চিত্তের একাগ্রতা, যা মানুষকে তার সাফল্যের চরম শিখরে পৌঁছে দিয়েছে। ইচ্ছাশক্তি মানুষের মনোবলকে দৃঢ় করে এবং কাজে সাফল্যের রসদ জোগায়। ইচ্ছা না থাকলে এক ধরনের জড়তা কাজ করে মানব-হৃদয়ে। ফলে কোনো আকাঙ্ক্ষাও জাগে না। ইচ্ছাশক্তি প্রচণ্ড শক্তিশালী হলে যেকোনো বাধা তার কাছে নতি স্বীকার করতে বাধ্য হয়। পৃথিবী জয় করার প্রবল ইচ্ছা থেকে নেপোলিয়ন ইউরোপ জয় করেছিলেন, আবরাহাম লিংকন আমেরিকার রাষ্ট্রপতি হতে পেরেছিলেন। স্বাধীন হওয়ার তীব্র ইচ্ছা থেকেই আমরা স্বাধীনতা লাভ করেছি। তাই ইচ্ছাশক্তিই মানুষের কাজের ও সাফল্যের মূল শক্তি। ইচ্ছাহীন জীবন অর্থহীন। ইচ্ছা থেকেই প্রয়োজনের সৃষ্টি হয় আর প্রয়োজন থেকেই বের হয় সাফল্য পাওয়ার উপায়। তাই ইচ্ছাকে সাফল্যের মূলমন্ত্রও বলা হয়।

কেউ কেউ বলে থাকেন, মহান আল্লাহর ইচ্ছাতেই যেহেতু সবকিছু হয়ে থাকে তাহলে ব্যর্থতার পেছনে ব্যক্তির ইচ্ছা-অনিচ্ছার দায় কোথায়! এখানে সবচেয়ে বড় যে ভুলটা সাধারণত হয় তা হলো, আল্লাহর ইচ্ছাকে মানুষের ইচ্ছার মতো কিছু একটা বিবেচনা করা। বস্তুত আল্লাহর ইচ্ছা হচ্ছে আমাদের জন্য মূল শক্তি, যেই শক্তির বলে আমরা ইচ্ছা করতে পারি। আর আমরা তখনই কেবল ইচ্ছা করতে পারি যখন "আল্লাহর ইচ্ছা” আমাদেরকে ইচ্ছা করার জন্য প্রয়োজনীয় শক্তি সরবরাহ করে। এ ক্ষেত্রে একটি ছোট্ট উদাহরণ দেয়া যেতে পারে। মনে করুন আপনি কোনো পাওয়ার স্টেশন থেকে বিদ্যুৎ নিচ্ছেন এবং সেই বিদ্যুৎ আপনি ইচ্ছামত বিভিন্ন কাজে লাগাচ্ছেন। এখানে বিদ্যুৎ কাজে লাগানোর জন্য আপনি পাওয়ার স্টেশন যিনি চালাচ্ছেন তার ইচ্ছার অধীন। কিন্তু বিদ্যুৎ কোন খাতে ব্যবহার করবেন সেটা আপনার ইচ্ছাধীন। বিদ্যুতের সঠিক ব্যবহার কিংবা অপব্যবহারের দায় আপনার।

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন মহাগ্রন্থ আল কুরআনে বলেছেন, "আল্লাহ কাউকে তার সাধ্যের বাইরে কোনো কাজ চাপিয়ে দেন না। সে যা ভালো কাজ করেছে তার ফল পাবে এবং যা খারাপ করেছে তা তার বিরুদ্ধে যাবে” (সূরা আল বাকারা: ২৮৬)। হজরত আলী (রা) বর্ণনা করেছেন, নবী (সা) বলেছেন যে, আল্লাহ বেহেশতে ও দোজখে প্রত্যেক ব্যক্তির স্থান পূর্ব থেকেই লিপিবদ্ধ করে রেখেছেন। লোকেরা বললেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা)! আমরা কি আমল করা ছেড়ে দেবো এবং পূর্ব থেকেই লিপিবদ্ধ করে রাখা বিষয়ের ওপর ভরসা করে বসে থাকব? রাসূল (সা) বললেন, কেন থাকবে? যে ব্যক্তিকে যে স্থানের জন্য সৃষ্টি করেছেন, তার জন্য সেই কাজ সহজ করে দেবেন। সৎ ব্যক্তির জন্য সৎকাজ করা সহজ হয়ে যাবে। বদ ব্যক্তির জন্য বদকাজ করা সহজ হয়ে যাবে। (বুখারি ও মুসলিম)

📘 জীবন বদলে যাবে > 📄 সাফল্যের জন্য চাই আত্মবিশ্বাস

📄 সাফল্যের জন্য চাই আত্মবিশ্বাস


আত্মচেতনার উজ্জীবনী শক্তির নাম আত্মবিশ্বাস। আত্মবিশ্বাস একটি গুরুত্বপূর্ণ মানসিক শক্তি। ব্যক্তিজীবনে প্রতিটি কাজের জন্য এ শক্তি প্রয়োজন। সফল হতে হলে আত্মবিশ্বাসী হওয়ার কোনো বিকল্প নেই। যার আত্মবিশ্বাস যত বেশি, জীবনের সব ক্ষেত্রে তার সফলতা তত বেশি। আত্মবিশ্বাস মানুষের এমন এক শক্তি যা কাজের ক্ষেত্রে, প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে, সাফল্য অর্জনের ক্ষেত্রে ব্যক্তির বাড়তি প্রেরণা জোগায়। এটি ব্যক্তিকে আলাদা শক্তি জোগায়, সাহস জোগায়, হীনমন্যতা দূর করে অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছতে দৃঢ় থাকতে সহায়তা করে। মনের মধ্যে জমে থাকা যেকোনো ধরনের হীনমন্যতা, সঙ্কীর্ণতা ও হতাশাকে ঝেড়ে ফেলে আত্মবিশ্বাসে বলীয়ান হতে পারলে সাফল্য ধরা দেবে হাতের মুঠোয়। মহাগ্রন্থ আল কুরআনে মহান আল্লাহ তায়ালা এ প্রসঙ্গে বলেন, "যে সকল লোক স্বীয় মনের সঙ্কীর্ণতা থেকে রক্ষা পেয়ে গেল শুধু তারাই সফলকাম" (সূরা তাগাবুন: ১৬)।

আত্মবিশ্বাস হলো জীবনে সফল হওয়ার মূলমন্ত্র। আত্মবিশ্বাসী না হলে জীবনে সফল হওয়া যায় না। জীবনে চলার পথে নানা প্রতিবন্ধকতা থাকতে পারে। কিন্তু যারা আত্মবিশ্বাসে বলীয়ান, তারা সহজে হাল ছাড়ে না। লক্ষ্যে না পৌঁছানো পর্যন্ত চলতেই থাকে তাদের সংগ্রাম। যত বাধাই আসুক কিছুই তাদের থামিয়ে রাখতে পারে না। নিজের বিশ্বাস, ধ্যান-ধারণা, ভাবনা-চিন্তা, জীবনবোধের প্রতি গভীর আস্থাই আত্মবিশ্বাস। সাফল্য অর্জন আর জীবনকে আনন্দময় করতে আত্মবিশ্বাসকে দৃঢ় রেখে এগিয়ে যেতে হবে। প্রতিদিনের নানা ব্যস্ততার সাথে তাল মিলিয়ে ঊর্ধ্বশ্বাসে আমাদের সামনে এগিয়ে যেতে হচ্ছে। এই এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা বা শক্তি জোগায় আত্মবিশ্বাস।

আত্মবিশ্বাসকে সাফল্য অর্জনের হাতিয়ার বলা হয়। এই হাতিয়ার ছাড়া জীবনে সফলতা বয়ে আনা অত্যন্ত দুরূহ। আত্মবিশ্বাসে বলীয়ান হলে জীবনে সফলতা আসবে, আলোর মুখ দেখবে, জীবন থেকে অন্ধকার দূরীভূত হবে। মানুষের জীবনে সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা রয়েছে। জীবনে চলার পথে দুঃখ-বেদনা আসবে, জীবনের গতিকে রুদ্ধ করবে কিন্তু এসবের মাঝেও আত্মবিশ্বাস মানুষকে শক্তি জোগাবে। মনের মধ্যে সকল প্রকার জড়তা, দ্বিধা-দ্বন্দ্ব, কুচিন্তা, কুপ্রবৃত্তি দমন করে আত্মবিশ্বাসী হলে তখন সে সফল হবেই। এ পৃথিবীতে যারা বড় হয়েছেন, পৃথিবীকে মহান কিছু দিতে পেরেছেন তাদের প্রত্যেকেই ছিলেন আত্মবিশ্বাসী। পৃথিবীতে যারা মহান, স্মরণীয়-বরণীয় তাদের প্রত্যেককেই আত্মবিশ্বাস পৌঁছে দিয়েছে সাফল্যের সুউচ্চ শিখরে।

পৃথিবীতে যারা শ্রেষ্ঠ হয়েছেন তারা নিজেদের ওপর বিশ্বাসী ছিলেন বলেই শ্রেষ্ঠত্বের আসনে সমাসীন হয়েছেন। কখনো দেখা যায় নিজের ওপর নিজের বিশ্বাস যখন হারিয়ে যায় তখন একজন মানুষের আত্মবিশ্বাস, আত্মশক্তির ভিত্তি হয় দুর্বল। তখন শিক্ষা মানুষকে আত্মবিশ্বাস প্রসারে সাহায্য করে। আত্মবিশ্বাস সকল বাধা-বিপত্তিকে দূর করে দিয়ে জ্ঞানের নান্দনিক পরিশীলনের সুবর্ণ সুযোগ করে দেয়। সাথে যোগ করে দেয় প্রেরণা, যে প্রেরণা সাফল্যকে করায়ত্ত করতে সহায়তা করে। ব্যক্তির সকল যোগ্যতার পূর্ণ বিকাশ ঘটে আত্মবিশ্বাসের মাধ্যমে। ব্যক্তি অনেক বিষয়ে দক্ষ ও যোগ্যতাসম্পন্ন হতে পারে। কিন্তু তার আত্মবিশ্বাসহীন পথচলা তার সাফল্য অর্জনকে ধূলিসাৎ করে দিতে পারে। অনেক সময় দেখা যায় সব ঠিকঠাক থাকলেও আত্মবিশ্বাসের অভাবে সাফল্য হাতছাড়া হয়ে যায়। ক্রিকেট খেলার মাঠে আত্মবিশ্বাসহীন ব্যক্তি যত ভালো খেলোয়াড়ই হোন না কেন ভালো পারফরম করতে পারেন না। মাঝে মধ্যে দেখা যায় খুব জাঁদরেল ব্যাটসম্যানও সাধারণ একটি বলে আউট হয়ে যান। তখন ধারাভাষ্যকার বলতে থাকেন, ব্যাটসম্যান এই শটটি আত্মবিশ্বাস নিয়ে খেলেননি তাই আউট হয়ে গেছেন।

আত্মবিশ্বাস একটি জাতির উন্নতির সোপান। যে জাতির মধ্যে আত্মবিশ্বাস নেই সে জাতি কখনো বড় হতে পারে না। যে জাতি স্বভাবগতভাবেই আত্মবিশ্বাসহীন সে জাতি সবসময়ই দুর্বলই থাকে, উন্নতির শিখরে আরোহণ করতে পারে না। যে জাতির স্বভাব-প্রকৃতিতে হীনমন্যতা আসন গেড়ে বসে, সে জাতি উন্নতি করবে কিভাবে আর কিভাবে সুপ্রতিষ্ঠিত হবে তার আত্মমর্যাদা! সৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজী তাঁর 'সুচিন্তা' নামক গ্রন্থের 'আত্মবিশ্বাস ও জাতীয় প্রতিষ্ঠা' প্রবন্ধে উল্লেখ করেছেন, "সিংহশাবক যে ভেড়া না হইয়া সর্বদাই সিংহ হয়, সে তাহার বিশ্বাসের গুণেই। আর মেষশাবক যে, সিংহশাবক না হইয়া মেষ হয়, সেও তাহার বিশ্বাসের গুণে"

আত্মবিশ্বাসের সাথে যদি সাহস যোগ হয় তাহলে সত্যিকার সফলতা পাওয়া যায়। হযরত আবু বকর (রা)-এর খেলাফতকালে সমগ্র আরবে ভণ্ড নবীদের উৎপাত শুরু হয়। এসময় ভণ্ড নবী মোসায়লামা আল কাজ্জাবের সাথে ইয়ামামার প্রান্তরে মুসলিম বাহিনীর প্রচণ্ড যুদ্ধ হয়। যুদ্ধের একপর্যায়ে মোসায়লামার বাহিনী ধাওয়া খেয়ে উদ্যানে ঢুকে ফটক বন্ধ করে দেয়। প্রখ্যাত সাহাবী বারা ইবনে মালিক (রা) মুহূর্তের মধ্যে গর্জে উঠে বলেন, "ওহে জনমণ্ডলী! আমি বারা ইবনে মালিক, তোমরা আমাকে উদ্যানের অভ্যন্তরে তাদের মাঝে ছুড়ে মারো" লোকেরা বলল, "না, তা কেমন করে হয়" বারা বললেন, "আল্লাহর কসম! আমার দৃঢ় বিশ্বাস তোমরা আমাকে ভেতরে ছুড়ে মারলে আমি অবশ্যই ফটক খুলে দিতে পারব" অতঃপর তাকে উঁচু করে প্রাচীরের ওপর তুলে ধরা হলো। তিনি উঁকি দিয়ে মুহূর্তের মধ্যেই মোসায়লামা বাহিনীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন। ফটকের মুখেই প্রচণ্ড লড়াই হলো। তিনি ফটকের দরজা খুলে দিতে সক্ষম হলেন। অপেক্ষমাণ মুসলিম সৈন্যরা মুহূর্তেই উদ্যানে প্রবেশ করে প্রচণ্ড যুদ্ধে লিপ্ত হলো। অভিশপ্ত মোসায়লামা নিহত ও তার বাহিনী পরাজিত হলো। বারা ইবনে মালিক (রা)-এর দেহ আঘাতে আঘাতে ক্ষত-বিক্ষত হয়ে যায়। তীর, বর্শা ও বল্লমের আশিটিরও বেশি আঘাত লাগে তাঁর শরীরে। এক মাস পর তিনি সুস্থ হয়ে ওঠেন। বারা ইবনে মালিক (রা)- এর সেদিনের প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাস আর সাহস গোটা মুসলিম বাহিনীকে ভণ্ড নবী মোসায়লামা বাহিনীর বিরুদ্ধে সাফল্য এনে দিতে সাহায্য করেছিল।

আত্যবিশ্বাস যাদের কম তাদের সাফল্যও কম। প্রকৃত আতাবিশ্বাসী মানুষের সাথে কম আতাবিশ্বাসী মানুষের তাইতো ব্যবধান অনেক। কম আত্মবিশ্বাসী মানুষ সবসময় নিজের নেয়া সিদ্ধান্ত নিয়ে অনুশোচনা করে, কাজের ক্ষেত্রে সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগে। ফলে সে পেছনে পড়ে যায় এবং সাফল্য অর্জনের লক্ষ্য থেকে ছিটকে পড়ে। অনেক সময় দেখা যায় মানুষের সামনে কম আতত্মবিশ্বাসী লোকেরা বক্তব্য দিতে ভয় পান। নিজের মতামত প্রকাশ করতে চান না। তারা সবসময় চিন্তা করতে থাকেন যে, যদি অন্যেরা আমার সঙ্গে একমত না হয়, আমার বিরোধিতা করে, তাহলে কী হবে? যথাযথ আত্যবিশ্বাসী মানুষ যেকোনো পরিস্থিতিতে যেকোনো জায়গায় মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে গুছিয়ে নিঃসংকোচে নিজের বক্তব্য উপস্থাপন করতে পারে। কম আত্মবিশ্বাসী মানুষ মাঝে মধ্যেই মাথা নিচু করে চলাফেরা করে। অপর দিকে আত্মবিশ্বাসী মানুষ তার আচার ব্যবহারের মাধ্যমেই নিজের আত্মবিশ্বাস দেখিয়ে দেন। সব সময় তাদের মাথা উঁচু থাকে এবং তাদের দেখলেই বোঝা যায় যে, তারা অনেক আত্মবিশ্বাসী। কম আত্মবিশ্বাসী মানুষ সবসময় নিজেদের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য থেকে দূরে সরে যায়। বাধা এলে কিংবা অসম্ভব মনে করলে তারা সরে দাঁড়ায়। আত্মবিশ্বাসী মানুষ যত বাধাই আসুক না কেন, যত অসম্ভবই মনে হোক না কেন- তারা সাহসী পদক্ষেপ নিয়ে সামনে এগিয়ে যায়।

আত্মবিশ্বাসী হওয়ার জন্য সর্বপ্রথমে নিজের নেতিবাচক ও ইতিবাচক দিকগুলো জেনে নিন। নিজেকে প্রশ্ন করুন, আপনি কতটুকু আত্মবিশ্বাসী। এই আত্মবিশ্বাসের কারণ কী? খারাপ দিকটি কী ও কেন? সততার সাথে নিজের এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দিন। তাহলে আপনি খুঁজে পাবেন আপনার আত্মবিশ্বাসী হওয়ার পথে ইতিবাচক ও নেতিবাচক দিকগুলো। এবার নেতিবাচক দিকগুলো সংশোধনের চেষ্টা করুন। আর ইতিবাচক দিকগুলো আরো শক্তিশালী করার চেষ্টা করুন। আত্মবিশ্বাসী হয়ে গড়ে ওঠার প্রতিজ্ঞা গ্রহণ করুন। নিজেকে মন থেকে আত্মবিশ্বাসী করে গড়ে তোলার গুরুত্বটা বোঝানোর চেষ্টা করুন। আত্মবিশ্বাসী হতেই হবে- এ প্রতিজ্ঞা করুন। অন্যকে লক্ষ্য করুন। আত্মকেন্দ্রিকতা ভুলে অন্যের কাছ থেকে শেখার চেষ্টা করা আত্মবিশ্বাসী হয়ে গড়ে ওঠার অন্যতম উপায়। জীবনটাকে একটা পরিবর্তনের সুযোগ করে দিন। সুযোগটা কাজে লাগান। একটা নতুন কিছু করুন। হতে পারে সেটি কোনো ছোট্ট একটি কাজ। হতে পারে ভালো কোনো একটা বই পড়া। যা কিছু ভালো এ ধরনের কিছু একটা করুন। এতে আপনার মনের ওপর চাপ কমবে। মনের ওপর বাড়তি চাপ রেখে আত্মবিশ্বাসী হওয়া যায় না। অজু করে দু'রাকাত নামাজ আদায় করুন। যিনি আপনাকে সৃষ্টি করেছেন সেই মহান রবের নিকট সাহায্য প্রার্থনা করুন। জীবনের সকল পঙ্কিলতা দূর করার পাশাপাশি বিগত দিনের ভুল-ত্রুটির জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করুন। নতুন করে আর ভুল না করার প্রতিজ্ঞা করুন দেখবেন আপনি আত্মপ্রত্যয়ী হয়ে উঠবেন।

আমাদের সবার সবসময় মনে রাখা উচিত, কাজ করলে ছোটখাটো ভুল-ভ্রান্তি হতেই পারে এবং সেই ভুল-ভ্রান্তি থেকেই পরবর্তীতে শিক্ষা নিয়ে জীবনের পথে এগিয়ে চলাটাই মূল লক্ষ্য। জীবনের প্রতি আগ্রহমূলক একটা ইতিবাচক মনোভাব রাখাই হলো নিজের আত্মবিশ্বাস গড়ে তোলার প্রথম ধাপ। প্রতিদিন আমাদের জীবনে যা কিছু ঘটে তার বেশির ভাগই আমাদের নিয়ন্ত্রণের মধ্যে থাকে না। এ কারণে সেসব পরিস্থিতি নিয়ে অযথা চিন্তা করারও কোনো মানে হয় না। তবে যে পরিস্থিতি আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারি, সেক্ষেত্রে যতটা সম্ভব নিরপেক্ষভাবে পরিস্থিতি বিচার করার চেষ্টা করুন। অনেক সময়ই হতে পারে, যেকোনো একটি বিশেষ পরিস্থিতিতে আপনি যে সিদ্ধান্ত নিলেন পরে গিয়ে দেখলেন, সেই সিদ্ধান্ত হয়তো পুরোপুরি সঠিক ছিল না। সে ক্ষেত্রেও কখনোই নিজের আত্মবিশ্বাস হারাবেন না। প্রত্যেক মানুষ নিজের ভুল থেকেই শেখে। আর এই ভুল থেকে শিক্ষা নেয়া হলো মূল উদ্দেশ্য। মনে রাখবেন, একবার ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলেই যে জীবনে আপনি কখনো কোনো সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন না অথবা সব সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্যই আপনাকে অন্য কারো সাহায্য নিতে হবে এমন ধারণাও একেবারেই ভুল। কয়েকটি ছোটখাটো জিনিসের দিকে খেয়াল রাখলেই দেখবেন আপনার নিজেকে অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী মনে হচ্ছে।

কাজ করার সময় টেনশন, হতাশা, বাধা-বিপত্তি এসব কিছু যেন আত্মবিশ্বাসকে ধাক্কা না দেয়। মনে রাখতে হবে এসব নেতিবাচক ভাবনাকে আমলে নিলেই জীবনের পথে অনেকটা পিছিয়ে পড়তে হবে। হারাতে হবে আত্মবিশ্বাস। মনে রাখতে হবে সাফল্যের জন্য প্রয়োজন আত্মবিশ্বাস। আর এই আত্মবিশ্বাস নিজের মাঝে তৈরি করার জন্য সবার আগে নিজেকে বদলাতে হবে। নিজেকে বদলাতে পারলেই বদলে যাবে আপনার চারপাশ, সাফল্য আসবে হাতের মুঠোয়। মহাগ্রন্থ আল কুরআনের একটি আয়াত উল্লেখ করছি। মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন, আল্লাহ কোনো জাতির ভাগ্য ততক্ষণ পরিবর্তন করেন না যতক্ষণ না সে জাতি নিজের ভাগ্য নিজে পরিবর্তনে সচেষ্ট হয়" (সূরা আর রা'দ: ১১)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00