📄 ভূমিকা
সাফল্যের ছোঁয়ায় জীবন বদলানোর স্বপ্ন দেখি আমরা সকলেই। আমাদের স্বপ্নগুলো যত বড় জীবন তত বড় নয়। তারপরও ছোট থেকে আমরা বড় হওয়ারই স্বপ্ন দেখি। প্রচলিত একটি কথা আছে, যার স্বপ্ন যত বড় তার অর্জনও তত বড়। আর স্বপ্ন দেখাতো দোষের কিছু নয়। জীবনের গতির সাথে স্বপ্নের গতিও বাড়ে। জীবনকে বদলানোর যে স্বপ্ন আমরা লালন করি সাফল্য অর্জনের ব্যর্থতায় সে স্বপ্নগুলো আলোর মুখ দেখে না। সাফল্য অর্জনের সাথেই জীবন বদলানোর সফলতা ব্যর্থতা জড়িত।
তবে সফলতাই জীবনের সবকিছু নয়। ছলে-বলে-কৌশলে আপনাকে সাফল্য অর্জন করতেই হবে, জীবনটাকে যেকোন মূল্যে বদলাতেই হবে এমনটি ঠিক নয়। এটি জাতীয় চরিত্রবিরোধী এবং সততা ও নৈতিকতার বিপরীত। আলবার্ট আইনস্টাইন (Albert Einstein) বলেছেন, "সফল মানুষ হওয়ার চেষ্টা করার চেয়ে নৈতিকতা সম্পন্ন মানুষ হওয়ার চেষ্টা করো" জীবন একটি প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র, পরীক্ষার ক্ষেত্র। সেই পরীক্ষায় কৃতকার্য হওয়ার জন্য আমরা নানাভাবেই চেষ্টা করি। কিন্তু পরিকল্পিত চেষ্টা না করার ফলে সফলতা আমাদের ধরা দেয় না। জীবনকে পাল্টে দেয়ার জন্য প্রতিটি ক্ষেত্রেই সফলতা প্রয়োজন। সেই সফলতার কতগুলো ধাপ আছে। ব্যক্তি জীবনে প্রতিটি ধাপই গুরুত্বপূর্ণ। সফলতার জন্য সংকল্প, পরিকল্পনা, গতিশীলতা, সময়ানুবর্তিতা, চারিত্রিক দৃঢ়তা, শৃঙ্খলা ও নির্ভরতা এই সাতটি বিষয়ের সমন্বয় প্রয়োজন। এই সাতটি বিষয়ের সমন্বয়ে কৃতকার্য হয়ে সাফল্য ছিনিয়ে আনতে পারলেই সত্যিকার অর্থে জীবনটাকে বদলে দেয়া সম্ভব।
সফলতা অর্জনের প্রথম ধাপ সংকল্প। শুরুতেই যদি সাফল্য অর্জনের সংকল্প করা না হয় তাহলে সাফল্য অর্জনের উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে। একটি সুন্দর স্বপ্ন লালন করা, দীপ্ত শপথ আর সুদৃঢ় আকাঙ্ক্ষা পোষণ করা, ইচ্ছা শক্তিতে বলীয়ান হয়ে আত্মবিশ্বাস ধারণের মাধ্যমে এগিয়ে যাওয়ার প্রচেষ্টাই সংকল্পের মূল প্রতিপাদ্য বিষয়। দৃঢ় সংকল্প নিয়ে ব্যক্তিকে শুরুতেই একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হয়। পরিকল্পনা ছাড়া সফলতা আসে না। কেননা পরিকল্পনা কাজের অর্ধেক। পরিকল্পনা গ্রহণের সময় লক্ষ্যে অটুট থেকে, সকল হতাশাকে, হীনমন্যতাকে ঝেড়ে ফেলে সামনে এগুতে হয়। অনেক সময় সম্ভাবনা তুচ্ছ মনে করায় সামনে অগ্রসর হওয়া সম্ভব হয় না। কিন্তু সম্ভাবনাকে সম্পদ বিবেচনা করে সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে পরিকল্পনা গ্রহণ করতে পারলে সাফল্যের লক্ষ্য পানে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব। এক্ষেত্রে অবশ্যই নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি দূরে ঠেলে ইতিবাচক ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়া জরুরি। সুন্দর স্বপ্ন আর সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা গ্রহণের পরই কাজে নেমে পড়তে হবে। আনতে হবে গতিশীলতা।
বর্তমান বিশ্ব জ্ঞানের শক্তিতে বলীয়ান। তাই জ্ঞানার্জনের বিকল্প নেই। জ্ঞানার্জনের পাশাপাশি পরিশ্রম যদি ঢেলে দেয়া না হয় তাহলে সাফল্য অধরাই থেকে যাবে। ভলটেয়ারের মতে, "প্রতিভা বলতে মানুষের মুখ্য কোন জিনিস নেই বরং পরিশ্রম কর, সাধনা কর তাহলে সাফল্য তোমার পদচুম্বন করবেই" সফলতার জন্য কথা ও কাজে ভারসাম্য থাকতে হবে। বাধা বিপত্তির মোকাবেলায় সাহসী হতে হবে। সাহস সঞ্চার করে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি লালন করে কাজে গতিশীলতা আনতে পারলেই জীবনটাকে বদলে দেয়া সম্ভব। জীবনের স্বপ্ন বাস্তবায়নে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সময়ের সদ্ব্যবহার বা সময়ানুবর্তিতা। প্রতিটি দিন প্রতিটি মিনিট প্রতিটি সেকেন্ডই সাফল্য প্রত্যাশী ব্যক্তির জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সময় একবার হারিয়ে গেলে তা কেয়ামত পর্যন্তও আর ফিরে পাওয়া সম্ভব নয়। তাই সময়ের কাজ সময়ের মধ্যেই করতে হবে। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তালিকা করে প্রয়োজনে কাজ এগিয়ে নিতে হবে। মনে রাখতে হবে পৃথিবীর প্রতিটি মানুষই ক্ষতির মধ্যে নিমজ্জিত। তবে তারা ছাড়া যারা সময়ের মূল্য দিয়ে ভাল কাজ করেছে এবং ধৈর্যের মত মহৎ গুণ ধারণ করেছে। সফলতা ধৈর্যশীলদের জন্য অবধারিত।
জীবনকে কল্যাণের ধারায় সাফল্যের ছোয়ায় পাল্টে দিতে হলে কিছু চমৎকার গুণাবলী অর্জন করতে হবে আর কিছু খারাপ অভ্যাস বর্জন করতে হবে। এ জন্য চারিত্রিক দৃঢ়তা, বিনয় নম্রতা ও সততাকে ধারণ করতে হবে। তার পাশাপাশি মস্তিষ্ককে অলস রাখা যাবে না। সার্বক্ষণিক ভাল কাজে নিয়োজিত রাখতে হবে। কারণ অলস মস্তিষ্ক শয়তানের কারখানা। অহংকার দাম্ভিকতা থেকে নিজেকে দূরে রাখতে হবে। কারণ অহংকার পতনের মূল। সাফল্যের জন্য জীবনের প্রতিটি ধাপে শৃঙ্খলা প্রয়োজন, প্রয়োজন পরিচ্ছন্ন জীবন গঠন। জীবনবিধ্বংসী উপাদান রাগ নিয়ন্ত্রণ এবং ক্রোধকে দমন করতে হবে। অধীনস্থ বা সহযোগীদের প্রতি অভিমান, অভিযোগ নয় সহানুভূতির দৃষ্টি প্রসারিত করতে হবে। সফলতার জন্য সদা হাস্যোজ্জ্বল থেকে আচরণেও আন্তরিকতা প্রয়োজন। এসব কাজের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো নিজের প্রতিদিনের কাজের আত্মপর্যালোচনা করা। আত্মপর্যালোচনা ব্যক্তিকে পরিশুদ্ধ করে এবং সঠিক পথে পরিচালিত করে। যেকোন কাজেই মহান আল্লাহর প্রতি ভরসা করতে হবে। তারই কাছে সাহায্য চাইতে হবে। আল্লাহর উপর ভরসা করার পাশাপাশি সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব, সর্বশ্রেষ্ঠ সফল ব্যক্তিত্ব রাসূল (সা)-এর অনুসরণেই সাফল্যের মঞ্জিল খুঁজতে হবে। প্রকৃতপক্ষে সফলতা সোনার হরিণ হলেও দুনিয়ার সফলতাই মূল সফলতা নয় বরং আখেরাতের সফলতাই চূড়ান্ত সফলতা এটি ধারণ করেই সাফল্যের পিছনে ছুটতে হবে। দুনিয়ার জিন্দেগিতে বড় বড় ডিগ্রি, বিশাল সম্মান অর্জন করলাম কিন্তু অবধারিত মৃত্যুর পরবর্তী জিন্দেগিতে জান্নাত অর্জন করতে না পারলে সকল অর্জনই বৃথা। জান্নাত উপযোগী জিন্দেগী গঠনই জীবন বদলে দেয়ার মূল সার্থকতা।