📘 জীবিকার খোঁজে 📄 প্রয়োজন অনুপাতে জীবিকা উপার্জন বাধ্যতামূলক হওয়ার দলিল ও বিরোধীদের সংশয় নিরসন

📄 প্রয়োজন অনুপাতে জীবিকা উপার্জন বাধ্যতামূলক হওয়ার দলিল ও বিরোধীদের সংশয় নিরসন


এ ব্যাপারে আমাদের অকাট্য দলিল হলো আল্লাহ তাআলার এই ফরমান:

أَنفِقُوا مِن طَيِّبَاتِ مَا كَسَبْتُمْ

"তোমাদের উপার্জিত পরিচ্ছন্ন জিনিসগুলো থেকে খরচ করো।" (সূরা আল-বাকারাহ ২:২৬৭)

আদেশ বা অনুজ্ঞা দ্বারা মূলত বাধ্যবাধকতা বোঝায়। উপার্জনের পরেই কেবল উপার্জিত জিনিস থেকে খরচের কল্পনা করা যায়। আর যা ছাড়া ফরজ বাস্তবায়ন করা যায় না, তাও ফরজ হয়ে যায়। আল্লাহ তাআলা বলেন:

فَإِذَا قُضِيَتِ الصَّلَاةُ فَانتَشِرُوا فِي الْأَرْضِ وَابْتَغُوا مِن فَضْلِ اللَّهِ وَاذْكُرُوا اللَّهَ كَثِيرًا لَّعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ

"সালাত শেষ হয়ে গেলে পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ো, আল্লাহর অনুগ্রহ অনুসন্ধান করো এবং আল্লাহকে বেশি করে স্মরণ করো, যাতে তোমরা সফল হতে পারো।" (সূরা আল-জুমুআহ্ ৬২:১০)

আল্লাহর অনুগ্রহ অনুসন্ধান মানে জীবিকা অন্বেষণ। (এ আয়াতে আদেশ দেওয়া হয়েছে।) আর আদেশ বা অনুজ্ঞা ব্যবহৃত হয় মূলত বাধ্যবাধকতা বোঝাতে।

যদি বলা হয়, মুজাহিদ ও মাকহুল থেকে তো বর্ণিত হয়েছে যে তারা বলেছেন, (এখানে আল্লাহর অনুগ্রহ অনুসন্ধান দ্বারা) জ্ঞানান্বেষণকে বোঝানো হয়েছে, তখন আমরা বলি-আমরা যে ব্যাখ্যা উল্লেখ করেছি তা আল্লাহর রাসূল ﷺ থেকে বর্ণিত হয়েছে। নবি ﷺ বলেন,

طَلَبُ الْكَسْبِ بَعْدَ الصَّلَاةِ الْمَكْتُوبَةِ الْفَرِيضَةُ بَعْدَ الْفَرِيضَةِ

"ফরজ সালাতের পর জীবিকা অনুসন্ধান হলো ফরজের পর ফরজ।" [১] এরপর নবি ﷺ নিম্নোক্ত আয়াত পাঠ করেন:

فَإِذَا قُضِيَتِ الصَّلَاةُ فَانتَشِرُوا فِي الْأَرْضِ وَابْتَغُوا مِن فَضْلِ اللَّهِ وَاذْكُرُوا اللَّهَ كَথিরًا لَّعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ

"সালাত শেষ হয়ে গেলে পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ো, আল্লাহর অনুগ্রহ অনুসন্ধান করো এবং আল্লাহকে বেশি করে স্মরণ করো, যাতে তোমরা সফল হতে পারো।" (সূরা আল-জুমুআহ ৬২:১০)

সুতরাং মাকহুল ও মুজাহিদ-এর ব্যাখ্যার উদ্ধৃতি দিয়ে নবি ﷺ-এর এ ব্যাখ্যা পরিত্যাগ করা যাবে না।

আমরা যা উল্লেখ করেছি, বাহ্যিক দিক থেকেও এর সমর্থন মেলে। আল্লাহর অনুগ্রহ অনুসন্ধানের নির্দেশ দেওয়ার পর বলা হয়েছে:

وَإِذَا رَأَوْا تِجَارَةً أَوْ لَهْوًا انفَضُّوا إِلَيْهَا وَتَرَكُوكَ قَائِمًا قُلْ مَا عِندَ اللَّهِ خَيْرٌ مِّنَ اللَّهْوِ وَمِنَ التِّجَارَةِ وَاللَّهُ خَيْرُ الرَّازِقِينَ

"আর যে সময় তারা ব্যাবসা ও খেল-তামাশার উপকরণ দেখল, তখন তারা তোমাকে দাঁড়ানো অবস্থায় রেখে সেদিকে দৌড়ে গেল। তাদের বলো, আল্লাহর কাছে যা আছে, তা খেল-তামাশা ও ব্যাবসার চেয়ে উত্তম। আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ রিযিকদাতা।" (সূরা আল-জুমুআহ্ ৬২:১১)

নবি ﷺ খুতবা (ভাষণ) দেওয়ার সময় তারা সেদিকে দৌড়ে গিয়েছিলেন। তাই তাদেরকে (সালাতের সময়) ওই কাজ করতে নিষেধ করা হয়েছে এবং সালাত আদায় শেষে ওই কাজ করার আদেশ দেওয়া হয়েছে।

যদি বলা হয়, নিষেধাজ্ঞার পর আদেশ দেওয়া হলে তো ওই আদেশ দ্বারা বৈধতা বোঝায়, তখন আমরা বলব—আদেশ দ্বারা মূলত বাধ্যবাধকতা বোঝায়; যদি বৈধতা ও ছাড় বোঝানো উদ্দেশ্য হতো, তা হলে আল্লাহ বলতেন 'আল্লাহর অনুগ্রহ অনুসন্ধান করলে তোমাদের কোনও সমস্যা হবে না', যেমনটি আল্লাহ তাআলা হাজ্জের সফর প্রসঙ্গে বলেছেন:

لَيْসَ عَلَيْكُمْ جُنَاحٌ أَن تَبْتَغُوا فَضْلًا مِّن رَّبِّكُمْ

"(হাজ্জের সফরে) তোমরা যদি তোমাদের রবের অনুগ্রহ অনুসন্ধান করো, তাতে তোমাদের কোনও সমস্যা নেই।" (সূরা আল-বাকারাহ্ ২:১৯৮)

এ বিষয়ে আরেকটি দলিল হলো, আল্লাহ তাআলা পরিবারের স্ত্রী, সন্তানাদি ও ইদ্দাহ্-পালনরত নারীদের পেছনে খরচ করার নির্দেশ দিয়েছেন; উপার্জন-প্রক্রিয়ায় সম্পদ অর্জনের পরেই কেবল তাদের পেছনে খরচ করা সম্ভব; আর যার মাধ্যমে আবশ্যক কর্ম সম্পাদন সম্ভব হয়ে ওঠে, সেটিও আবশ্যক হিসেবে গণ্য হয়।

বুদ্ধিমত্তা প্রয়োগ করলেও এর অনুকূলে সমর্থন পাওয়া যায়, কারণ জগতের শৃঙ্খলা ও বিশ্ব-ব্যবস্থাপনা উপার্জনের সঙ্গে জড়িত। এ জগতকে চূড়ান্ত ধ্বংসের আগ পর্যন্ত টিকিয়ে রাখা হলো আল্লাহ তাআলার সিদ্ধান্ত। আর তিনি (এ উদ্দেশ্যে) বান্দার উপার্জন-প্রচেষ্টাকে জগতের স্থিতি ও ব্যবস্থাপনার একটি কার্যকারণ বানিয়ে দিয়েছেন; উপার্জন-প্রচেষ্টা পরিত্যাগ করা মূলত বিশ্ব-ব্যবস্থাপনাকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেওয়ার নামান্তর; আর (আল্লাহর আইনে) এ ধরনের কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ।

যদি বলা হয়, বিশ্বের শৃঙ্খলা তো প্রাণীজগতের পারস্পরিক মিলনের সঙ্গে জড়িত, অথচ কেউ তো মিলনক্রিয়াকে বাধ্যতামূলক বলছে না! তখন আমরা বলব—হ্যাঁ, আল্লাহ তাআলা জগতের স্থিতিকে প্রাণীকূলের পারস্পরিক মিলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত করে দিয়েছেন, তবে তিনি তাদের প্রকৃতির ভেতর পরস্পরের প্রতি আকর্ষণ রেখে দিয়েছেন, আর এ আকর্ষণই তাদেরকে ওই কর্মের দিকে উদ্বুদ্ধ করে। ফলে তারা যেন ওই মিলনক্রিয়া পরিত্যাগ না করে এ জন্য এটিকে তাদের উপর বাধ্যতামূলক করে দেওয়ার প্রয়োজন পড়ে না, কারণ প্রকৃতিই তাদেরকে সেদিকে নিয়ে যাবে।

কিন্তু জীবিকা-অন্বেষার শুরুতে থাকে কষ্ট-ক্লেশ; বিশ্বব্যবস্থাপনার স্থিতিও এর সঙ্গে জড়িত। তাই মূলগত দিক দিয়ে জীবিকা-অন্বেষাকে ফরজ করা না হলে, সকল মানুষই এ কাজ পরিত্যাগ করবে, কারণ তাদের প্রকৃতির মধ্যে এমন কিছু নেই, যা তাদেরকে কষ্ট-ক্লেশের দিকে নিয়ে যাবে। ফলে ইসলামি আইন মূলগত দিক দিয়ে জীবিকা-অন্বেষাকে ফরজ করে দিয়েছে, যাতে মানুষ সম্মিলিতভাবে এ কাজ পরিত্যাগ না করে। আর এর মাধ্যমে (বিশ্বব্যবস্থাপনাকে ঠিক রাখার) কাঙ্ক্ষিত উদ্দেশ্য হাসিল হয়ে যায়।

কাব্রামিয়্যা সম্প্রদায় যেসব বিভাজন উল্লেখ করেছে, সেসবের ভ্রান্তি ইমাম মুহাম্মাদ-এর একটি কথা থেকেই স্পষ্ট হয়ে যায়; তিনি বলেছেন-'জীবিকা-অন্বেষা ফরজ, ঠিক যেমন জ্ঞানার্জন ফরজ'। কারণ এ (রকমারি) বিভাজন জ্ঞানের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য; অথচ তা সত্ত্বেও সবাই একমত যে, জ্ঞানার্জন মূলগত দিক দিয়ে ফরজ। জীবিকা-অন্বেষার বিষয়টিও একই পর্যায়ের।

'জীবিকা-অন্বেষা ফরজ' বলতে আমরা শুধু ততটুকু বুঝিয়েছি, যতটুকুর সঙ্গে বিশ্বব্যবস্থাপনার স্থিতি জড়িত। পারস্পরিক অহঙ্কার প্রকাশ ও অধিক ঐশ্বর্যশালী হওয়ার লক্ষ্যে বেশি বেশি জীবিকা উপার্জনের সঙ্গে বিশ্বব্যবস্থাপনার স্থিতির কোনও সম্পর্ক নেই। আল্লাহ তাআলা এ ধরনের প্রতিযোগিতাকে নিন্দনীয় আখ্যায়িত করে বলেন:

اعْلَمُوا أَنَّمَا الْحَيَاةُ الدُّنْيَا لَعِبٌ وَلَهْوٌ وَزِينَةٌ وَتَفَاخُرُ بَيْنَكُمْ وَتَكَاثُرُ فِي الْأَمْوَالِ وَالْأَوْلَادِ

"ভালোভাবে জেনে রাখো-দুনিয়ার জীবন একটা খেলা, হাসি তামাশা, বাহ্যিক চাকচিক্য, তোমাদের পারস্পরিক গৌরব ও অহংকার এবং সন্তানসন্ততি ও অর্থ-সম্পদে পরস্পরকে অতিক্রম করার চেষ্টা ছাড়া আর কিছুই নয়।" (সূরা আল-হাদীদ ৫৭:২০)

টিকাঃ
[১] তাবারানি, আল-মু'জামুল কাবীর, ১০/৭৪; বাইহাকি, আস-সুনানুল কুবরা, ৬/ ১২৮; হাইসামি, মাজমাউয যাওয়াইদ, ১০/২৯১। সনদে একজন বর্ণনাকারী দুর্বল।

ফন্ট সাইজ
15px
17px