📘 জীবিকার খোঁজে 📄 উপার্জনের বৈধতার দলিল-প্রমাণ

📄 উপার্জনের বৈধতার দলিল-প্রমাণ


এ প্রসঙ্গে আমাদের দলিল হলো-আল্লাহ তাআলা বলেন:

أَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا

"আল্লাহ বেচা-কেনা বৈধ করেছেন, আর অবৈধ করেছেন সুদি কারবার।" (সূরা আল-বাকারাহ ২:২৭৫)

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا تَدَايَنتُم بِدَيْنٍ إِلَى أَجَلٍ مُّسَمًّى فَاكْتُبُوهُ

"হে ঈমানদাররা! তোমরা যখন নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ঋণচুক্তিতে আবদ্ধ হবে, তখন তা লিখে রেখো।" (সূরা আল-বাকারাহ্ ২:২৮২)

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَأْكُلُوا أَمْوَالَكُم بَيْنَكُم بِالْبَاطِلِ إِلَّا أَن تَكُونَ تِجَارَةً عَن تَرَاضٍ مِّنكُمْ

"হে ঈমানদাররা! পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে ব্যাবসার মাধ্যম ছাড়া, তোমরা একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে খেয়ো না।" (সূরা আন-নিসা ৪:২৯)

إِلَّا أَن تَكُونَ تِجَارَةً حَاضِرَةً تُدِيرُونَهَا بَيْنَكُمْ فَلَيْسَ عَلَيْكُمْ جُنَاحٌ أَلَّا تَكْتُبُوهَا وَأَشْهِدُوا إِذَا تَبَايَعْتُمْ

"তবে তোমাদের মধ্যে নগদ ব্যাবসা হলে, সেক্ষেত্রে তা লিখে না রাখলে তোমাদের কোনও অসুবিধা নেই; তবে বেচা-কেনার সময় সাক্ষী রেখো।" (সূরা আল-বাকারাহ্ ২:২৮২)

এসব আয়াতের কয়েকটিতে (ব্যাবসা-বাণিজ্যের) বৈধতার প্রমাণ রয়েছে, আর কয়েকটিতে ব্যাবসা-বাণিজ্যের ব্যস্ততার প্রশংসা করা হয়েছে। যে-ব্যক্তি বলে ব্যাবসা-বাণিজ্য নিষিদ্ধ, সে এসব আয়াতের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়।

(আইনবিষয়ক একটি মূলনীতি হলো-) সাধারণ অবস্থায় আইনপ্রণেতার শব্দ থেকে এমন অর্থ বের করতে হবে, যে অর্থে গণমানুষ তাদের পারস্পরিক কথাবার্তায় ওই শব্দ ব্যবহার করে থাকে; কারণ আইনপ্রণেতা আমাদেরকে ওই কথাই বলেছেন, যা আমাদের বোধগম্য। বেচা-কেনা শব্দের প্রকৃত অর্থ হলো, উপার্জন-প্রক্রিয়ায় সম্পদের আদান-প্রদান। আর শব্দ বা বাক্যকে তার প্রকৃত অর্থেই ধরে নিতে হয়; সুস্পষ্ট দলিল-প্রমাণ ছাড়া এর প্রকৃত অর্থ বাদ দিয়ে রূপক অর্থ করা যায় না। যেমন, তারা নিম্নোক্ত আয়াত থেকে প্রমাণ দেওয়ার চেষ্টা করেছেন:

إِنَّ اللَّهَ اشْتَرَى مِنَ الْمُؤْمِنِينَ أَنفُسَهُمْ وَأَمْوَالَهُم بِأَنَّ لَهُمُ الْجَنَّةَ يُقَاتِلُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ فَيَقْتُلُونَ وَيُقْتَلُونَ وَعْدًا عَلَيْهِ حَقًّا فِي التَّوْرَاةِ وَالْإِنجِيلِ وَالْقُرْآنِ وَمَنْ أَوْفَى بِعَهْدِهِ مِنَ اللَّهِ فَاسْتَبْشِرُوا بِبَيْعِكُمُ الَّذِي بَايَعْتُم بِهِ وَذَلِكَ هُوَ الْفَوْজُ الْعَظِيمُ

"প্রকৃত ব্যাপার এই যে, আল্লাহ মুমিনদের থেকে তাদের প্রাণ ও ধন-সম্পদ জান্নাতের বিনিময়ে কিনে নিয়েছেন। তারা আল্লাহর পথে লড়াই করে এবং মারে ও মরে। তাদের প্রতি তাওরাত, ইনজীল ও কুরআনে (জান্নাতের ওয়াদা) আল্লাহর জিম্মায় একটি পাকাপোক্ত ওয়াদা বিশেষ। আর আল্লাহর চেয়ে বেশি নিজের ওয়াদা পূরণকারী আর কে আছে? কাজেই তোমরা আল্লাহর সঙ্গে যে কেনা-বেচা করছো, সে জন্য আনন্দ করো। এটিই সবচেয়ে বড় সাফল্য।" (সূরা আত-তাওবাহ্ ৯:১১১)

(উপরিউক্ত আয়াতের ভঙ্গিতেই) সুস্পষ্ট প্রমাণ রয়েছে যে, এখানে 'কিনে নেওয়া' শব্দটি রূপক অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। (আমরা যেসব আয়াত উল্লেখ করেছি) সেখানে অনুরূপ কোনও প্রমাণ নেই; তাই সেসব ক্ষেত্রে (বেচা-কেনা) শব্দটিকে তার প্রকৃত অর্থেই ধরতে হবে।

আল্লাহ তাআলা বলেন,

فَإِذَا قُضِيَتِ الصَّلَاةُ فَانتَشِرُوا فِي الْأَرْضِ وَابْتَغُوا مِن فَضْلِ اللَّهِ وَاذْكُرُوا اللَّهَ كَثِيرًا لَّعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ

"সালাত শেষ হয়ে গেলে পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ো, আল্লাহর অনুগ্রহ অনুসন্ধান করো এবং আল্লাহকে বেশি করে স্মরণ করো, যাতে তোমরা সফল হতে পারো।" (সূরা আল-জুমুআহ্ ৬২:১০)

আল্লাহর অনুগ্রহ মানে ব্যাবসা-বাণিজ্য।

আল্লাহ তাআলা বলেন,

لَيْسَ عَلَيْكُمْ جُنَاحٌ أَن تَبْتَغُوا فَضْلًا مِّن رَّبِّكُمْ

"(হাজ্জের সফরে) তোমরা যদি তোমাদের রবের অনুগ্রহ অনুসন্ধান করো, তাতে তোমাদের কোনও সমস্যা নেই।" (সূরা আল-বাকারাহ্ ২:১৯৮)

অর্থাৎ, হাজ্জের সফরে ব্যাবসা করতে কোনও সমস্যা নেই। নবি ﷺ বলেন,

إِنَّ أَطْيَبَ مَا أَكَلْتُمْ مِنْ كَسْبِ أَيْدِيكُمْ وَإِنَّ أَخِي دَاوُودَ عَلَيْهِ السَّلَامُ كَانَ يَأْكُلُ مِنْ كَسْبِ يَدِهِ

"তোমরা যা খাও, তার মধ্যে সর্বোত্তম হলো ওই খাবার, যা তোমরা নিজের হাতে উপার্জন করো; আমাই ভাই দাউদ নিজের হাতে উপার্জন করে খেতেন।" [১] এর মাধ্যমে নবি ﷺ আল্লাহ তাআলার এ কথার দিকে ইশারা করতে চেয়েছেন:

كُلُوا مِن طَيِّبَاتِ مَا رাজাَقْنَاكُمْ

"আমি তোমাদের যেসব উত্তম জীবনোপকরণ দিয়েছি, তা থেকে খাও।" (সূরা আল-আ'রাফ ৭:১৬০)

(জীবিকা-অনুসন্ধানের বৈধতার ব্যাপারে) আমরা যেসব দলিল-প্রমাণের উপর নির্ভর করি, সেসবের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী দলিলটি হলো—জীবিকা অনুসন্ধান রাসূলগণের অনুসৃত পথ। আর ইতোমধ্যে আমরা সেটি প্রমাণ করেছি।

টিকাঃ
[১] বুখারি, ৪/৩০৩।

📘 জীবিকার খোঁজে 📄 উপার্জনের নিষিদ্ধতা প্রসঙ্গে কিছু সুফির সংশয় নিরসন

📄 উপার্জনের নিষিদ্ধতা প্রসঙ্গে কিছু সুফির সংশয় নিরসন


জীবিকা-অনুসন্ধানের বৈধতার ব্যাপারে তারা ইয়াহইয়া (আ) ও ঈসা (আ)-এর উদাহরণ দিয়ে আমাদের বিরোধিতা করছেন; এটি একটি অর্থহীন বিরোধিতা, কারণ ইতঃপূর্বে আমরা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছি যে, ঈসা (আ) তাঁর মায়ের চরকা দিয়ে আয় করে খেতেন।

তারপর আমরা বলি, জীবিকা-অনুসন্ধানের ব্যাপারে নবিগণের অবস্থা অন্যদের মতো নয়; তাঁদের পাঠানো হয়েছে মানবজাতিকে সঠিক জীবনপদ্ধতির দিকে আহ্বান জানানো এবং তা তাদের সামনে স্পষ্টভাবে তুলে ধরার জন্য। ফলে তাদেরকে যে উদ্দেশ্যে পাঠানো হয়েছে, তাঁরা সে উদ্দেশ্য নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন, জীবিকা অন্বেষার পেছনে তাঁরা নিজেদের বেশিরভাগ সময় ব্যয় করেননি; তবে মাঝেমধ্যে জীবিকা উপার্জন করেছেন, যাতে সাধারণ মানুষের জন্য বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যায় যে, জীবিকা অন্বেষার পেছনে সময় ব্যয় করা উচিত এবং তা আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করার পরিপন্থী নয়, যেমনটি এসব মূর্খ ধারণা করে নিয়েছে।

উমার (রা) তাঁর একটি কথায় বিষয়টির ব্যাখ্যা দিয়েছেন। ইবাদাতে মশগুল কিছু লোকের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় তিনি দেখেন, তারা মাথা নুইয়ে বসে আছে। তখন তিনি জানতে চান, 'এরা কারা?' বলা হয়, 'এরা আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুলকারী।' তিনি বলেন,

'না, এরা কিছুতেই আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুলকারী নয়, এরা বরং বসে-বসে খাওয়ার লোক—এরা মানুষের সম্পদ খাচ্ছে! আমি কি তোমাদের বলব না, প্রকৃত তাওয়াক্কুলকারী কে?'

বলা হয়, 'হ্যাঁ!' তখন তিনি বলেন, 'প্রকৃত তাওয়াক্কুলকারী হলো ওই ব্যক্তি, যে জমিনে বীজ বপন করার পর তার মহান রবের উপর তাওয়াক্কুল করে।'

অপর এক বর্ণনায় আছে, এরপর তিনি বলেন, "ওহে ইবাদাতকারীরা! মাথা ওঠাও এবং নিজেদের জীবিকা নিজেরা উপার্জন করো।" [১]

প্রধান সাহাবিগণ জীবিকা উপার্জন করতেন না-মর্মে তারা যে দাবি করেছে, তা একটি ভ্রান্ত দাবি; কারণ, বর্ণিত আছে—আবূ বাকর সিদ্দীক (রা) ছিলেন বস্ত্রব্যবসায়ী; [২] উমার (রা) চামড়ার ব্যাবসা করতেন; উসমান (রা) ছিলেন ব্যবসায়ী, তার কাছে খাদ্যশস্য আনা হতো, আর তিনি তা বিক্রি করতেন; [৩] আলি (রা) নিজে উপার্জন করতেন। একটি দীর্ঘ হাদীসে বর্ণিত আছে যে, তিনি একাধিকবার কায়িক শ্রম দিয়ে উপার্জন করেছেন, এমনকি পারিশ্রমিকের বিনিময়ে তিনি এক ইয়াহুদির কাছেও নিজেকে ভাড়ায় খাটিয়েছেন। [৪]

বিশুদ্ধ হাদীসে প্রমাণিত আছে যে, নবি ﷺ দু' দিরহাম দিয়ে কয়েকটি সিলওয়ার কিনে (মূল্য পরিশোধ করার দায়িত্বে নিয়োজিত) পরিমাপকারীকে বলেছিলেন,

زِنْ وَأَرْجِحْ فَإِنَّ مَعَاشِرَ الْأَنْبِيَاءِ هُكَذَا نَزِنُ

"ওজনে বেশি দাও, কারণ আমরা নবিগণ এভাবেই মেপে দিই।" [৫]

আল্লাহর রাসূল ﷺ বেশি দামে কাঠের একটি বাটি ও পর্যাণের কম্বল বিক্রি করেছিলেন। [১]

নবি ﷺ এক বেদুইনের কাছ থেকে একটি উট কিনে এর মূল্য পরিশোধ করেন। এরপর সে তা অস্বীকার করে বলে, 'আপনি সাক্ষী নিয়ে আসুন!' নবি ﷺ বলেন, 'আমার অনুকূলে কে সাক্ষ্য দেবে?' তখন খুযাইমা ইবনু সাবিত (রা) বলেন, 'আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আপনি এ বেদুইনকে উটের মূল্য পরিশোধ করে দিয়েছেন।' নবি ﷺ বলেন, 'তুমি তো (ওই সময়) উপস্থিত ছিলে না; তুমি সাক্ষ্য দিচ্ছ কীসের ভিত্তিতে?' তিনি বলেন,

'হে আল্লাহর রাসূল! আপনি আকাশ থেকে যে সংবাদ এনে আমাদের দেন, আমরা ওই ব্যাপারে আপনাকে সত্যবাদী মনে করি; তা হলে উটের মূল্য পরিশোধ নিয়ে যা বলছেন, এ ব্যাপারে আপনাকে সত্যবাদী মনে করব না কেন?'

এর পরিপ্রেক্ষিতে নবি ﷺ বলেন, 'খুযাইমা যার অনুকূলে সাক্ষ্য দেবে, তার জন্য তার (একার) সাক্ষ্যই যথেষ্ট। [২]

"তোমাদের জীবনোপকরণ ও তোমাদের যা প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, তা আকাশে আছে" (সূরা আয-যারিয়াত ৫১:২২)-এ আয়াতে জীবিকা-উপার্জন-বিরোধীদের পক্ষে কোনও প্রমাণ নেই। এ আয়াতে (জীবনোপকরণ দ্বারা) বৃষ্টির কথা বোঝানো হয়েছে, যা আল্লাহ তাআলা আকাশ থেকে বর্ষণ করেন, আর এর ফলে গাছপালা ও তৃণলতা সজীব হয়ে ওঠে। বৃষ্টিকে জীবনোপকরণ নামে অভিহিত করা হয়ে থাকে। পূর্ববর্তী বিদ্বানদের কেউ কেউ বলেছেন,

'ওহে আদম-সন্তান! আল্লাহ তাআলা তোমাকে জীবিকা দেন, তোমার জীবিকাকে জীবিকা দেন এবং তোমার জীবিকার জীবিকাকে জীবিকা দেন।'

অর্থাৎ, তিনি উদ্ভিদের জীবিকা হিসেবে আকাশ থেকে বৃষ্টি বর্ষণ করেন; উদ্ভিদ হলো গবাদিপশুর জীবিকা, আর গবাদিপশু হলো আদম-সন্তানের জীবিকা।

আয়াতটিকে বাহ্যিক অর্থে ধরে নিলেও বলা যায়, আমাদের জীবনোপকরণ আকাশে আছে, যেমনটি আল্লাহ তাআলা (আমাদের) জানিয়েছেন; তবে আমাদেরকে কার্যকারণ অবলম্বনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যাতে ওই অবলম্বনের সময় জীবিকা আমাদের কাছে চলে আসে। নবি ﷺ-এর এ কথা থেকেও এর ব্যাখ্যা পাওয়া যায়, যেখানে তিনি তাঁর মহান রবের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছেন,

عَبْدِي حَرَّكْ يَدَكَ أُنْزِلْ عَلَيْكَ الرِّزْقَ

"ওহে আমার গোলাম! তোমার হাত নাড়াচাড়া করো, তা হলে তোমার উপর জীবনোপকরণ নামিয়ে দেবো।" [১]

টিকাঃ
[১] কানযুল উম্মাল, ৪/১২৯।
[২] ইবনু সাদ, আত-তাবাকাত, ৩/১৮৬।
[৩] ইবনু সাদ, আত-তাবাকাত, ৩/৬০।
[৪] আহমাদ, আল-মুসনাদ, ১/১৩৫; বাইহাকি, আস-সুনান, ৬/১১৯।
[৫] আবূ দাউদ, ৩/৬৩১; তিরমিযি, ৩/৫৮৯, হাসান সহীহ; ইবনু মাজাহ, ২/৭৪৮; নাসাঈ, ৭/২৮৪।
[১] আবূ দাউদ, ২/২৯২; তিরমিযি, ৩/৫২২, হাসান সহীহ।
[২] আবূ দাউদ, ৪/৩১; নাসাঈ, ৭/৩০১।
[১] এ হাদীসের তথ্যসূত্র জানা যায়নি।

ফন্ট সাইজ
15px
17px