📄 উপার্জনের প্রকারভেদ ও বিধান
উপার্জন দু' ধরনের: উপকারী ও ক্ষতিকর। উপকারী উপার্জন হলো অপরিহার্য বৈধ জিনিসপত্র লাভ করা; আর ক্ষতিকর উপার্জন হলো এমনকিছু অর্জন করা, যা উপার্জনকারীর জন্য ক্ষতি ডেকে আনে এবং যার মধ্যে গোনাহ জড়িত আছে, যেমন চুরি করা। দ্বিতীয় পদ্ধতির উপার্জন নিষিদ্ধ, এ নিয়ে কারও দ্বিমত নেই। আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَمَن يَكْسِبْ إِثْمًا فَإِنَّمَا يَكْسِبُهُ عَلَى نَفْسِهِ
"যে-ব্যক্তি কোনও গোনাহ অর্জন করে, সে নির্ঘাত নিজের বিপদ ডেকে আনে।" (সূরা আন-নিসা ৪:১১১) আল্লাহ তাআলা (আরও) বলেন,
وَمَن يَكْسِبْ خَطِيئَةً أَوْ إِثْمًا ثُمَّ يَرْمِ بِهِ بَرِيئًا فَقَدِ احْتَمَلَ بُهْتَانًا وَإِثْمًا مُّبِينًا
"যে-ব্যক্তি কোনও অন্যায় বা গোনাহ কামাই করে, এরপর তা নিরপরাধ ব্যক্তির উপর আরোপ করে, সে যেন সুস্পষ্ট অপবাদ ও গোনাহের বোঝা (নিজের পিঠে) চাপিয়ে নিল।" (সূরা আন-নিসা ৪:১১২)
📄 কার্যকারণ অবলম্বন করা তাওয়াক্কুলের পরিপন্থী নয়
আল্লাহ তাআলা মারইয়াম (আ)-কে খেজুর গাছের কাণ্ড ঝাঁকুনি দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন; আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَهُزِّى إِلَيْكِ بِجِذْعِ النَّخْلَةِ تُسَاقِطْ عَلَيْكِ رُطَبًا جَنِيًّا
"খেজুর গাছের কাণ্ডটিকে তোমার দিকে ঝাঁকুনি দাও, তা হলে পাকা খেজুর তোমার কাছে পড়বে।" (সূরা মারইয়াম ১৯:২৫)
অথচ মারইয়াম (আ)-এর ঝাঁকুনি ও তার পক্ষ থেকে কোনও শ্রম দেওয়া ছাড়াই, আল্লাহ তাকে জীবনোপকরণ দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন, যেমনটি তাকে মিহরাবের মধ্যে দিচ্ছিলেন; আল্লাহ তাআলা বলেন,
كُلَّمَا دَخَلَ عَلَيْهَا زَكَرِيَّا الْمِحْرَابَ وَجَدَ عِندَهَا رِزْقًا قَالَ يَا মَرَয়َمُ أَنَّى لَكِ هَذَا هُوَ مِنْ عِندِ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ يَرْزُقُ مَن يَشَاءُ بِغَيْرِ حِسَابٍ
"যাকারিয়্যা যখনই তার কাছে মিহরাবে যেত, তার কাছে কিছু না কিছু পানাহার সামগ্রী পেত। জিজ্ঞেস করত, 'মারইয়াম! এগুলো তোমরা কাছে কোথা থেকে এলো?' সে জবাব দিত, "আল্লাহর কাছ থেকে এসেছে।' আল্লাহ যাকে চান, বেহিসেব জীবনোপকরণ দেন।" (সূরা আল ইমরান ৩:৩৭)
আল্লাহ তাকে এ কাজের নির্দেশ দিয়েছেন, যাতে এ বিষয়টি বান্দাদের জন্য স্পষ্ট হয়ে যায় যে-যদিও তাদের দৃঢ় বিশ্বাস আছে যে, আল্লাহই হলেন জীবিকাদাতা, তারপরও তাদের কার্যকারণ অবলম্বন করা উচিত।
তাঁর সৃষ্টিশক্তির মধ্যেও এর নজির বিদ্যমান। আল্লাহ তাআলাই একমাত্র স্রষ্টা। কখনও তিনি সৃষ্টি করেন পিতা-মাতা উভয়কে বাদ দিয়েই, যেমন তিনি আদম (আ)-কে সৃষ্টি করেছেন; আবার কখনও সৃষ্টি করেন পিতার মধ্যস্থতা ছাড়া কেবল মা থেকেই, যেমন তিনি সৃষ্টি করেছেন ঈসা (আ)-কে; আবার কখনও তিনি সৃষ্টি করেন পিতা-মাতা উভয়ের মাধ্যমে, যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন:
يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنَّا خَلَقْنَاكُم مِّن ذَكَرٍ وَأُنثَى
"ওহে মানবজাতি! আমি তোমাদের সৃষ্টি করেছি একটি পুরুষ ও একটি নারী থেকে।" (সূরা আল-হুজুরাত ৪৯:১৩)
আল্লাহ তাআলা বিয়ের নির্দেশ দিয়েছেন। বিয়ে ও সন্তানলাভের ব্যস্ততা বান্দার ওই দৃঢ় বিশ্বাসকে নাকচ করে দেয় না যে, আল্লাহই হলেন একমাত্র স্রষ্টা। জীবনোপকরণের বিষয়টিও একই ধরনের। সুতরাং, বোঝা গেল-যে-ব্যক্তি মনে করে জীবিকা অন্বেষার চেষ্টা ছেড়ে দেওয়াই হলো প্রকৃত তাওয়াক্কুল, সে মূলত শারীআ'র বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে।
এক ব্যক্তি এসে নবি ﷺ-কে বলে, 'আমি আমার উটটি ছেড়ে রেখে আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করি?' জবাবে নবি ﷺ বলেন, "না; তুমি বরং এটি বেঁধে নাও, তারপর তাওয়াক্কুল করো।" [১] আল্লাহর রাসূল ﷺ-এর এ কথা থেকেও এর সমর্থন পাওয়া যায়।
এর আরেকটি নজির হলো দুআ-আল্লাহর কাছে কিছু চাওয়া। আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَاسْأَلُوا اللَّهَ مِن فَضْلِهِ
"আল্লাহর কাছে তাঁর অনুগ্রহ চাও।" (সূরা আন-নিসা ৪:৩২)
এটি জানা কথা যে, একজনের জন্য যা নির্ধারণ করা হয়েছে, তা তার কাছে আসবেই। (কিন্তু) এর ফলে কোনও ব্যক্তি আল্লাহ তাআলার কাছে চাওয়া ও প্রার্থনা করা বাদ দেয় না। নবিগণ (আল্লাহর কাছে) জান্নাত চাইতেন, অথচ তাঁরা ভালোভাবেই জানতেন যে, আল্লাহ তাআলা তাদেরকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন, (কারণ) ইতঃপূর্বে তিনি তাদেরকে এর ওয়াদা দিয়েছেন, আর 'তিনি ওয়াদা ভঙ্গ করেন না। [২] তাদের পরিণতি শুভ-এটি তাঁরা জানতেন; তারপরও তাঁরা নিজেদের দুআয় আল্লাহর কাছে শুভ পরিণতি চাইতেন।
শিফা বা রোগমুক্তির বিষয়টিও একই পর্যায়ের। আল্লাহ তাআলাই রোগমুক্তি দেন, অথচ তিনি আমাদেরকে ঔষধ সেবনের নির্দেশ দিয়েছেন। নবি ﷺ বলেন,
تَدَاوَوْا عِبَادَ اللهِ فَإِنَّ اللهَ تَعَالَى مَا خَلَقَ دَاءً إِلَّا خَلَقَ لَهُ دَوَاءٌ إِلَّا السَّامَ الْهَرَمَ
"আল্লাহর বান্দাগণ! তোমরা ঔষধ সেবন করো, কারণ আল্লাহ তাআলা এমন কোনও রোগ সৃষ্টি করেননি, যার জন্য তিনি ঔষধ সৃষ্টি করেননি, কেবল মৃত্যু/ বার্ধক্য হলো এর ব্যতিক্রম।" [১]
আল্লাহর রাসূল ﷺ ঊহুদ যুদ্ধের দিন এ নিয়ম অনুসরণ করেছেন; তিনি তাঁর চেহারার ক্ষতস্থানে ঔষধ লাগিয়েছেন। [২]
ঔষধ ব্যবহার করলে যেমন 'আল্লাহ তাআলাই শিফা-দাতা'-এর প্রতি দৃঢ়বিশ্বাসে কোনও কমতি হয় না, তেমনিভাবে জীবিকা খোঁজার পেছনে চেষ্টা-সাধনা করলে তা 'আল্লাহ তাআলাই জীবিকা-দাতা'-এ দৃঢ়বিশ্বাসকে নাকচ করে দেয় না।
সুফিদের আজব কর্মকাণ্ডের একটি হলো—কোনও ব্যক্তি যদি নিজের হাতের উপার্জন ও তার ব্যাবসার লাভ থেকে কোনও খাবার তৈরি করে সুফিদের খাওয়ায়, তখন তারা জেনে-বুঝে ও ওই খাবার খাওয়া থেকে বিরত থাকে না! উপার্জন করা হারাম হলে তো, ওই পন্থায় উপার্জিত সম্পদ খাওয়াও হারাম, কারণ হারাম কর্ম সম্পাদনের মাধ্যমে যা অর্জিত হয়, তাও হারাম; ঠিক যেমন মুসলিমের জন্য মদ বেচা-কেনা হারাম হওয়ায়, এর মূল্য উপভোগ করা হারাম। যেহেতু সুফিদের কেউই (অন্যের উপার্জিত সম্পদ) খাওয়া থেকে বিরত থাকেন না, সেহেতু বোঝা গেল ('জীবিকা-অন্বেষা হারাম' মর্মে) তাদের কথাটি অজ্ঞতা ও অলসতার ফল!
টিকাঃ
[১] ইবনু হিব্বান, সহীহ, ৭৩১।
[২] সূরা আল ইমরান ৩:৯।
[১] আবূ দাউদ, ৪/১৯২; তিরমিযি, ৪/৩৮৩, হাসান সহীহ।
[২] বুখারি, ১/৩৫৪; মুসলিম, ৩/১৪১৬।
📄 কোনটি উত্তম: জীবিকা-অন্বেষায় ব্যস্ততা, নাকি উপাসনার জন্য অবসর?
এর উপর ভিত্তি করে আরেকটি প্রশ্ন সামনে আসে; আর তা হলো, যেটুকু জীবিকা একেবারে না হলেই নয়, ততটুকু উপার্জন করার পর কোনটি উত্তম-উপার্জনে