📄 উপার্জনের বিধান ও মহত্ত্ব
এরপর মুহাম্মাদ তাঁর গ্রন্থের শুরুতে বলেন, জ্ঞানান্বেষণ যেভাবে ফরজ, জীবিকা-অন্বেষণও সকল মুসলিমের জন্য সেভাবে ফরজ। ইবনু মাসউদ থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসূল ﷺ বলেন,
طَلَبُ الْكَسْبِ فَرِيضَةٌ عَلَى كُلِّ مُسْلِمٍ
"জীবিকা-অনুসন্ধান প্রত্যেক মুসলিমের জন্য ফরজ।" [১] অপর এক বর্ণনায় নবি ﷺ বলেন,
طَلَبُ الْكَسْبِ بَعْدَ الصَّلَاةِ الْمَكْتُوبَةِ الْفَرِيضَةُ بَعْدَ الْفَرِيضَةِ
"ফরজ সালাতের পর জীবিকা অনুসন্ধান হলো ফরজের পর ফরজ।" [২] নবি ﷺ বলেন,
طَلَبُ الْحَلَالِ كَمُقَارَعَةِ الْأَبْطَالِ وَمَنْ بَاتَ كَالًا مِنْ طَلَبِ الْحَلَالِ بَاتَ مَغْفُوْরًا لَهُ
"হালাল অন্বেষণ যুবকদের লড়াই-সংগ্রামে লিপ্ত থাকার ন্যায়; যার রাত কাটে হালাল অন্বেষণে ক্লান্ত হয়ে, রাতের বেলায়ই তার গোনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়।" [৩]
উমার ইবনুল খাত্তাব (রা) (জীবিকা) উপার্জনের স্তরকে জিহাদের স্তরের উপর স্থান দিতেন; তিনি বলতেন, “আল্লাহর অনুগ্রহ অনুসন্ধানের জন্য পৃথিবীতে সফর করতে করতে আমি আমার বাহনের দু' শিংয়ের মাঝখানে থাকাবস্থায় মারা যাব-এটি আমার কাছে এর চেয়ে বেশি প্রিয় যে, আল্লাহর রাস্তায় জিহাদরত অবস্থায় আমাকে হত্যা করা হবে; কারণ, আল্লাহ তাআলা মুজাহিদদের আগে সেসব লোকের কথা উল্লেখ করেছেন, যারা তাঁর অনুগ্রহ অনুসন্ধানের লক্ষ্যে পৃথিবীতে সফর করে।” আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَآخَرُونَ يَضْرিবُونَ فِي الْأَرْضِ يَبْتَغُونَ مِن فَضْلِ اللَّهِ وَآخَرُونَ يُقَاتِلُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ
“কিছু লোক আল্লাহর করুণার খোঁজে পৃথিবীতে সফর করে, আর কিছু লোক আল্লাহর পথে লড়াই করে।" (সূরা আল-মুয্যাম্মিল ৭৩:২০)
হাদীসে আছে, একদিন আল্লাহর রাসূল ﷺ সাদ ইবনু মুআয (রা)-এর সঙ্গে হাত মেলান। তার হাত দুটি ছিল অত্যন্ত খসখসে ও রুক্ষ প্রকৃতির। নবি ﷺ তাকে এর কারণ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন, 'আমার পরিবারের খরচ যোগান দেওয়ার জন্য আমি লোহার কোদাল ও বেলচা দিয়ে আমার খেজুর বাগানে কাজ করি।' তখন আল্লাহর রাসূল ﷺ তার হাতে চুমু দিয়ে বলেন,
كَفَّانِ يُحِبُّهُمَا اللَّهُ تَعَالَى
"তালু-দুটিকে আল্লাহ তাআলা পছন্দ করেন!"
এ থেকে স্পষ্ট বোঝা গেল, অপরিহার্য জীবিকা উপার্জনের মাধ্যমে মানুষ (মর্যাদার) সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছুতে পারে; আর ফরজ দায়িত্ব পালনের মাধ্যমেই সেখানে পৌঁছা সম্ভব হয়।
যেহেতু জীবিকা উপার্জন ছাড়া ফরজ দায়িত্ব পালন করা যায় না, সেহেতু জীবিকা উপার্জন ফরজ; ঠিক যেভাবে সালাত আদায়ের জন্য পবিত্রতা অর্জন ফরজ।
কয়েকটি দিক দিয়ে বিষয়টি ব্যাখ্যা করা যায়। তার মধ্যে একটি হলো, মানুষ তার শারীরিক শক্তি বলে ফরজ দায়িত্বগুলো পালন করতে সক্ষম হয়; আর শারীরিক শক্তি আসে সাধারণত খাবার থেকে। খাবার অর্জন করার আবার কয়েকটি পদ্ধতি আছে—উপার্জন, কিংবা পারস্পরিক লড়াই, অথবা ছিনতাই। ছিনতাই করলে শাস্তি অবধারিত; পারস্পরিক লড়াই বিশৃঙ্খলা ডেকে আনে, "আর আল্লাহ বিশৃঙ্খলা পছন্দ করেন না"; [১] তাই খাবার লাভের একটি পন্থাই (বৈধ) প্রমাণিত হলো; আর তা হলো উপার্জন।
নবি ﷺ বলেছেন,
نَفْسُ الْمُؤْمِنِ مَطِيَّتُهُ فَلْيُحْسِنْ إِلَيْهَا
"মুমিনের (দেহ) সত্তা হলো তার বাহন; সে যেন তার বাহনের সঙ্গে উত্তম আচরণ করে।" [১]
'উত্তম আচরণ' মানে-দেহের যেটুকু প্রয়োজন সেটুকু পূরণে বাধা না দেওয়া। আর এটি করা সম্ভব উপার্জনের মাধ্যমে।
একজন মুমিন পবিত্রতা অর্জন ছাড়া সালাত আদায় করতে পারে না; আবার পবিত্রতা অর্জন করতে গেলে পানি তোলার জন্য একটি পাত্র জরুরি হয়ে পড়ে, অথবা কুয়া থেকে পানি তোলার জন্য একটি বালতি ও রশি অপরিহার্য হয়ে দাঁড়ায়। তেমনিভাবে, সতর না ঢেকে সালাত আদায় করা যায় না, আবার সতর ঢাকার জন্য প্রয়োজন একখণ্ড কাপড়; আর সাধারণত উপার্জন ছাড়া কাপড় লাভ করা যায় না। যা ছাড়া ফরজ আদায় করা যায় না, তাও একটি আলাদা ফরজে পরিণত হয়।
টিকাঃ
[১] দাইলামি, আল-ফিরদাউস বি মা'সূরিল খিতাব, ৩৯১৮। একজন বর্ণনাকারী দুর্বল।
[২] তাবারানি, আল-মু'জামুল কাবীর, ১০/৭৪; বাইহাকি, আস-সুনানুল কুবরা, ৬/ ১২৮; হাইসামি, মাজমাউয যাওয়াইদ, ১০/২৯১। সনদে একজন বর্ণনাকারী দুর্বল।
[৩] তাবারানি, আল-মু'জামুল আওসাত। সনদে কয়েকজন বর্ণনাকারীর অবস্থা অজানা থাকার দরুন এটি দুর্বল।
[১] সূরা আল-বাকারাহ্ ২:২০৫।
[১] এর কাছাকাছি অর্থজ্ঞাপক একটি হাদীস ইমাম আহমাদ বর্ণনা করেছেন। আল-মুসনাদ, ৬৬৩৯। আহমাদ শাকিরের মতে, এর ইসনাদটি সহীহ।
📄 জীবিকা অনুসন্ধান: রাসূলগণের অনুসৃত পথ
উপার্জন হলো রাসূলগণের অনুসৃত পথ। আমাদেরকে তাঁদের (কর্মপন্থা) আঁকড়ে ধরা ও তাঁদের দিকনির্দেশনা অনুসরণ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন,
أُولَئِكَ الَّذِينَ هَدَى اللَّهُ ۖ فَبِهُدَاهُمُ اقْتَدِهْ
“আল্লাহ তাদেরকে (সঠিক) পথের দিশা দিয়েছেন। সুতরাং তুমি তাঁদের দিকনির্দেশনা অনুসরণ করো।” (সূরা আল-আনআম ৬:৯০)
সর্বপ্রথম যিনি জীবিকা উপার্জন করেছেন, তিনি হলেন আমাদের পিতা আদম আলাইহিস সালাম। আল্লাহ তাআলা (তাঁকে) বলেছিলেন,
فَلَا يُخْرِجَنَّكُمَا مِنَ الْجَنَّةِ فَتَشْقَى
“সে (অর্থাৎ শয়তান) যেন তোমাদেরকে জান্নাত থেকে বের করে না দেয়; এমন হলে কিন্তু তুমি সমস্যায় পড়ে যাবে।” (সূরা ত্ব-হা ২০:১১৭)
'সমস্যায় পড়ে যাবে' মানে হলো, জীবিকার খোঁজে তোমাকে কষ্ট করতে হবে। এ আয়াতের ব্যাখ্যায় মুজাহিদ বলেন, 'মৃত্যুর আগ পর্যন্ত কাজ না করে তুমি তেল দিয়ে রুটি খেতে পারবে না।' সাহাবি ও তাবিয়িদের বর্ণনায় আছে, আদম (আ)-কে মাটিতে নামিয়ে দেওয়া হলে, জিব্রীল (আ) তাঁর কাছে কিছু গম নিয়ে এসে তাঁকে তা বপন করার নির্দেশ দেন। এরপর তিনি তা বপন করে তাতে পানি দেন। তারপর তা কেটে মাড়াই করে গুঁড়া করেন এবং তা দিয়ে রুটি বানান। এ কাজ শেষ করতে করতে আসরের ওয়াক্ত চলে আসে। তখন জিব্রীল (আ) তাঁর কাছে এসে বলেন, আপনার রব আপনাকে সালাম দিয়ে বলছেন,
"তুমি যদি দিনের বাকি অংশ সাওম পালন করো, তা হলে আমি তোমার ভুলত্রুটি মাফ করে দেবো এবং তোমার সন্তানদের ব্যাপারে তোমাকে সুপারিশ করার সুযোগ দেবো।”
এরপর তিনি সাওম পালন করেন; তবে তিনি ওই খাবার খাওয়ার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে থাকেন; তিনি দেখতে চাচ্ছিলেন, জান্নাতের খাবারে তিনি যে স্বাদ পেতেন, তা ওই খাবারে পান কি না। সেখান থেকেই সাওম পালনকারীরা আসরের পর থেকে খাবারের জন্য অত্যন্ত আগ্রহী হয়ে উঠেন।
একইভাবে, নূহ (আ) ছিলেন একজন কাঠমিস্ত্রী। তিনি নিজে উপার্জন করে খেতেন। ইদ্রীস (আ) ছিলেন দর্জি। ইব্রাহীম (আ) ছিলেন বস্ত্রব্যবসায়ী, যেমনটি নবি ﷺ বলেছেন,
عَلَيْكُمْ بِالْبَزِّ فَإِنَّ أَبَاكُمْ كَانَ بَزَارًا
"তোমরা বস্ত্রের ব্যাবসা কোরো; তোমাদের পিতা (ইবরাহীম খলীল (আ)) ছিলেন বস্ত্রব্যবসায়ী।" [১]
দাউদ (আ) নিজে উপার্জন করে খেতেন। বর্ণিত আছে যে, তিনি ছদ্মবেশে বেরিয়ে রাজ্যের লোকদের কাছে নিজের সামগ্রিক জীবন সম্পর্কে জানতে চাইতেন। একদিন জিব্রীল (আ) এক যুবকের বেশে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। দাউদ (আ) তাঁকে জিজ্ঞাসা করেন, “ওহে যুবক! দাউদকে তুমি কেমন জানো?” তিনি বলেন, “হ্যাঁ, দাউদ (আল্লাহর) অত্যন্ত উত্তম বান্দা; তবে তাঁর মধ্যে একটি বিশেষ স্বভাব আছে!” দাউদ (আ) জানতে চান, “কী সেটি?” তিনি বলেন, "তিনি বাইতুল মাল (রাষ্ট্রীয় কোষাগার) থেকে নিজের খাওয়া-খরচ নেন; সর্বোত্তম মানুষ সে-ই, যে নিজে উপার্জন করে খায়।” এরপর দাউদ (আ) নিজের সালাত আদায়ের জায়গায় এসে অত্যন্ত বিনীতভাবে কান্নাজড়িত কণ্ঠে আল্লাহ তাআলাকে বলেন,
"হে আল্লাহ! আমাকে জীবিকা উপার্জনের একটি মাধ্যম শিখিয়ে দাও, যার মাধ্যমে তুমি আমাকে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে অমুখাপেক্ষী করে দেবে।"
এর পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ তাআলা তাঁকে বর্ম বানানোর কৌশল শেখান এবং তাঁর জন্য লোহাকে এত নরম করে দেন যে, লোহা তাঁর হাত হয়ে অন্যদের কাছে গেলে তা আটার খামির মত হয়ে যেত। আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَلَقَدْ آتَيْنَا دَاوُودَ مِنَّا فَضْلًا يَا جِبَالُ أَوْبِي مَعَهُ وَالطَّيْرَ وَأَلَنَّا لَهُ الْحَدِيدَ
"দাউদকে আমি নিজের কাছ থেকে অনুগ্রহ দান করেছি। (আমি হুকুম দিলাম) হে পর্বতমালা! তার সঙ্গে একাত্ম হও! (এবং এ হুকুমটি আমি) পাখিরদের (ও) দিয়েছি। আর আমি তার জন্য লোহাকে নরম করে দিয়েছি।” (সাবা ৩৪:১০)
মহামহিম আল্লাহ বলেন,
وَعَلَّمْنَاهُ صَنْعَةَ لَبُوسٍ لَّكُمْ لِتُحْصِنَكُم مِّن بَأْسِكُمْ
"আর তোমাদের উপকারের জন্য আমি তাকে বর্ম-নির্মাণ-শিল্প শিখিয়েছি, যাতে সে তোমাদেরকে পরস্পরের আঘাত থেকে রক্ষা করতে পারে।” (সূরা আল-আম্বিয়া ২১:৮০)
তিনি বর্ম বানিয়ে প্রত্যেকটিকে বারো হাজারের বিনিময়ে বিক্রি করতেন। উপার্জিত অর্থ থেকে নিজে খেতেন এবং দান-সদাকা করতেন।
সুলাইমান (আ) তালপাতা দিয়ে বড় বড় ঝুড়ি বানিয়ে জীবিকা লাভ করতেন। যাকারিয়া (আ) ছিলেন কাঠমিস্ত্রী। [১] ঈসা (আ) জীবিকা নির্বাহ করতেন তাঁর মায়ের চরকা দিয়ে; আবার কখনও কখনও শস্যের শিষ সংগ্রহ করে খেতেন, এটিও এক ধরনের উপার্জন।
আমাদের নবি ﷺ কখনও কখনও মেষ চরিয়েছেন। বর্ণিত আছে যে, একদিন তিনি তাঁর সাহাবিদের বলেন,
كُنْتُ رَاعِيًا لِعُقْبَةَ بْنِ أَبِي مُعَيْطٍ وَمَا بَعَثَ اللَّهُ تَعَالَى نَبِيًّا إِلَّا اسْتَرْعَاهُ
"আমি ছিলাম উকবা ইবনু আবী মুআইত-এর রাখাল। আল্লাহ তাআলা এমন কোনও রাসূল পাঠাননি, যাকে দিয়ে তিনি রাখালের দায়িত্ব পালন করাননি।" [২]
সাইব (রা) থেকে বর্ণিত, তাঁর পিতা শুরাইক (রা) বলেন, 'আল্লাহর রাসূল ﷺ ছিলেন আমার (কারবারের) অংশীদার; আর তিনি ছিলেন সর্বোত্তম অংশীদার-না তিনি কোনও ঝগড়া করতেন, আর না কোনও গালিগালাজ।' তাকে জিজ্ঞাসা করা হলো, 'আপনারা কোন কারবারে অংশীদার ছিলেন?' তিনি বলেন, 'চামড়ার কারবারে। [১]
আল্লাহর রাসূল ﷺ জুরাখ [২] এলাকায় একটি জমিতে বীজ বপন করেছিলেন, যেমনটি ইমাম মুহাম্মাদ তার (আল-আম্ল গ্রন্থের) চাষাবাদ অধ্যায়ে উল্লেখ করেছেন। এর মাধ্যমে তিনি জানাতে চেয়েছেন যে, উপার্জন করা হলো রাসূলগণের অনুসৃত পথ।
টিকাঃ
[২] ইসলামের নির্দেশ মোতাবেক শরীরের যেসব অঙ্গ ঢেকে রাখতে হয়।
[১] হাকিম, আল-মুস্তাদ্রাক, ২/৫৯৬।
[২] বুখারি, ৪/৩০৩।
[১] মুসলিম, ১৫/১৩৫।
[২] বুখারি, ৪/৪৪১।
[১] আবূ দাউদ, ৫/১৭০; ইবনু মাজাহ, ২/৭৬৮; হাকিম, আল-মুস্তাদ্রাক, ২/৬১। ইসনাদটি সহীহ।
[২] মদীনা থেকে শাম অভিমুখে তিন মাইল দূরত্বে অবস্থিত একটি জায়গা।
📄 উপার্জনের প্রকারভেদ ও বিধান
উপার্জন দু' ধরনের: উপকারী ও ক্ষতিকর। উপকারী উপার্জন হলো অপরিহার্য বৈধ জিনিসপত্র লাভ করা; আর ক্ষতিকর উপার্জন হলো এমনকিছু অর্জন করা, যা উপার্জনকারীর জন্য ক্ষতি ডেকে আনে এবং যার মধ্যে গোনাহ জড়িত আছে, যেমন চুরি করা। দ্বিতীয় পদ্ধতির উপার্জন নিষিদ্ধ, এ নিয়ে কারও দ্বিমত নেই। আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَمَن يَكْسِبْ إِثْمًا فَإِنَّمَا يَكْسِبُهُ عَلَى نَفْسِهِ
"যে-ব্যক্তি কোনও গোনাহ অর্জন করে, সে নির্ঘাত নিজের বিপদ ডেকে আনে।" (সূরা আন-নিসা ৪:১১১) আল্লাহ তাআলা (আরও) বলেন,
وَمَن يَكْسِبْ خَطِيئَةً أَوْ إِثْمًا ثُمَّ يَرْمِ بِهِ بَرِيئًا فَقَدِ احْتَمَلَ بُهْتَانًا وَإِثْمًا مُّبِينًا
"যে-ব্যক্তি কোনও অন্যায় বা গোনাহ কামাই করে, এরপর তা নিরপরাধ ব্যক্তির উপর আরোপ করে, সে যেন সুস্পষ্ট অপবাদ ও গোনাহের বোঝা (নিজের পিঠে) চাপিয়ে নিল।" (সূরা আন-নিসা ৪:১১২)
📄 কার্যকারণ অবলম্বন করা তাওয়াক্কুলের পরিপন্থী নয়
আল্লাহ তাআলা মারইয়াম (আ)-কে খেজুর গাছের কাণ্ড ঝাঁকুনি দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন; আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَهُزِّى إِلَيْكِ بِجِذْعِ النَّخْلَةِ تُسَاقِطْ عَلَيْكِ رُطَبًا جَنِيًّا
"খেজুর গাছের কাণ্ডটিকে তোমার দিকে ঝাঁকুনি দাও, তা হলে পাকা খেজুর তোমার কাছে পড়বে।" (সূরা মারইয়াম ১৯:২৫)
অথচ মারইয়াম (আ)-এর ঝাঁকুনি ও তার পক্ষ থেকে কোনও শ্রম দেওয়া ছাড়াই, আল্লাহ তাকে জীবনোপকরণ দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন, যেমনটি তাকে মিহরাবের মধ্যে দিচ্ছিলেন; আল্লাহ তাআলা বলেন,
كُلَّمَا دَخَلَ عَلَيْهَا زَكَرِيَّا الْمِحْرَابَ وَجَدَ عِندَهَا رِزْقًا قَالَ يَا মَرَয়َمُ أَنَّى لَكِ هَذَا هُوَ مِنْ عِندِ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ يَرْزُقُ مَن يَشَاءُ بِغَيْرِ حِسَابٍ
"যাকারিয়্যা যখনই তার কাছে মিহরাবে যেত, তার কাছে কিছু না কিছু পানাহার সামগ্রী পেত। জিজ্ঞেস করত, 'মারইয়াম! এগুলো তোমরা কাছে কোথা থেকে এলো?' সে জবাব দিত, "আল্লাহর কাছ থেকে এসেছে।' আল্লাহ যাকে চান, বেহিসেব জীবনোপকরণ দেন।" (সূরা আল ইমরান ৩:৩৭)
আল্লাহ তাকে এ কাজের নির্দেশ দিয়েছেন, যাতে এ বিষয়টি বান্দাদের জন্য স্পষ্ট হয়ে যায় যে-যদিও তাদের দৃঢ় বিশ্বাস আছে যে, আল্লাহই হলেন জীবিকাদাতা, তারপরও তাদের কার্যকারণ অবলম্বন করা উচিত।
তাঁর সৃষ্টিশক্তির মধ্যেও এর নজির বিদ্যমান। আল্লাহ তাআলাই একমাত্র স্রষ্টা। কখনও তিনি সৃষ্টি করেন পিতা-মাতা উভয়কে বাদ দিয়েই, যেমন তিনি আদম (আ)-কে সৃষ্টি করেছেন; আবার কখনও সৃষ্টি করেন পিতার মধ্যস্থতা ছাড়া কেবল মা থেকেই, যেমন তিনি সৃষ্টি করেছেন ঈসা (আ)-কে; আবার কখনও তিনি সৃষ্টি করেন পিতা-মাতা উভয়ের মাধ্যমে, যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন:
يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنَّا خَلَقْنَاكُم مِّن ذَكَرٍ وَأُنثَى
"ওহে মানবজাতি! আমি তোমাদের সৃষ্টি করেছি একটি পুরুষ ও একটি নারী থেকে।" (সূরা আল-হুজুরাত ৪৯:১৩)
আল্লাহ তাআলা বিয়ের নির্দেশ দিয়েছেন। বিয়ে ও সন্তানলাভের ব্যস্ততা বান্দার ওই দৃঢ় বিশ্বাসকে নাকচ করে দেয় না যে, আল্লাহই হলেন একমাত্র স্রষ্টা। জীবনোপকরণের বিষয়টিও একই ধরনের। সুতরাং, বোঝা গেল-যে-ব্যক্তি মনে করে জীবিকা অন্বেষার চেষ্টা ছেড়ে দেওয়াই হলো প্রকৃত তাওয়াক্কুল, সে মূলত শারীআ'র বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে।
এক ব্যক্তি এসে নবি ﷺ-কে বলে, 'আমি আমার উটটি ছেড়ে রেখে আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করি?' জবাবে নবি ﷺ বলেন, "না; তুমি বরং এটি বেঁধে নাও, তারপর তাওয়াক্কুল করো।" [১] আল্লাহর রাসূল ﷺ-এর এ কথা থেকেও এর সমর্থন পাওয়া যায়।
এর আরেকটি নজির হলো দুআ-আল্লাহর কাছে কিছু চাওয়া। আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَاسْأَلُوا اللَّهَ مِن فَضْلِهِ
"আল্লাহর কাছে তাঁর অনুগ্রহ চাও।" (সূরা আন-নিসা ৪:৩২)
এটি জানা কথা যে, একজনের জন্য যা নির্ধারণ করা হয়েছে, তা তার কাছে আসবেই। (কিন্তু) এর ফলে কোনও ব্যক্তি আল্লাহ তাআলার কাছে চাওয়া ও প্রার্থনা করা বাদ দেয় না। নবিগণ (আল্লাহর কাছে) জান্নাত চাইতেন, অথচ তাঁরা ভালোভাবেই জানতেন যে, আল্লাহ তাআলা তাদেরকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন, (কারণ) ইতঃপূর্বে তিনি তাদেরকে এর ওয়াদা দিয়েছেন, আর 'তিনি ওয়াদা ভঙ্গ করেন না। [২] তাদের পরিণতি শুভ-এটি তাঁরা জানতেন; তারপরও তাঁরা নিজেদের দুআয় আল্লাহর কাছে শুভ পরিণতি চাইতেন।
শিফা বা রোগমুক্তির বিষয়টিও একই পর্যায়ের। আল্লাহ তাআলাই রোগমুক্তি দেন, অথচ তিনি আমাদেরকে ঔষধ সেবনের নির্দেশ দিয়েছেন। নবি ﷺ বলেন,
تَدَاوَوْا عِبَادَ اللهِ فَإِنَّ اللهَ تَعَالَى مَا خَلَقَ دَاءً إِلَّا خَلَقَ لَهُ دَوَاءٌ إِلَّا السَّامَ الْهَرَمَ
"আল্লাহর বান্দাগণ! তোমরা ঔষধ সেবন করো, কারণ আল্লাহ তাআলা এমন কোনও রোগ সৃষ্টি করেননি, যার জন্য তিনি ঔষধ সৃষ্টি করেননি, কেবল মৃত্যু/ বার্ধক্য হলো এর ব্যতিক্রম।" [১]
আল্লাহর রাসূল ﷺ ঊহুদ যুদ্ধের দিন এ নিয়ম অনুসরণ করেছেন; তিনি তাঁর চেহারার ক্ষতস্থানে ঔষধ লাগিয়েছেন। [২]
ঔষধ ব্যবহার করলে যেমন 'আল্লাহ তাআলাই শিফা-দাতা'-এর প্রতি দৃঢ়বিশ্বাসে কোনও কমতি হয় না, তেমনিভাবে জীবিকা খোঁজার পেছনে চেষ্টা-সাধনা করলে তা 'আল্লাহ তাআলাই জীবিকা-দাতা'-এ দৃঢ়বিশ্বাসকে নাকচ করে দেয় না।
সুফিদের আজব কর্মকাণ্ডের একটি হলো—কোনও ব্যক্তি যদি নিজের হাতের উপার্জন ও তার ব্যাবসার লাভ থেকে কোনও খাবার তৈরি করে সুফিদের খাওয়ায়, তখন তারা জেনে-বুঝে ও ওই খাবার খাওয়া থেকে বিরত থাকে না! উপার্জন করা হারাম হলে তো, ওই পন্থায় উপার্জিত সম্পদ খাওয়াও হারাম, কারণ হারাম কর্ম সম্পাদনের মাধ্যমে যা অর্জিত হয়, তাও হারাম; ঠিক যেমন মুসলিমের জন্য মদ বেচা-কেনা হারাম হওয়ায়, এর মূল্য উপভোগ করা হারাম। যেহেতু সুফিদের কেউই (অন্যের উপার্জিত সম্পদ) খাওয়া থেকে বিরত থাকেন না, সেহেতু বোঝা গেল ('জীবিকা-অন্বেষা হারাম' মর্মে) তাদের কথাটি অজ্ঞতা ও অলসতার ফল!
টিকাঃ
[১] ইবনু হিব্বান, সহীহ, ৭৩১।
[২] সূরা আল ইমরান ৩:৯।
[১] আবূ দাউদ, ৪/১৯২; তিরমিযি, ৪/৩৮৩, হাসান সহীহ।
[২] বুখারি, ১/৩৫৪; মুসলিম, ৩/১৪১৬।