📄 গ্রন্থকার পরিচিতি
মুহাম্মাদ ইবনুল হাসান শাইবানি ইসলামি আইনশাস্ত্রে অত্যন্ত সুপরিচিত নাম। জন্ম ১৩২ হিজরিতে (খ্রি. ৭৪৯), বসরা ও কুফার মাঝখানে অবস্থিত ওয়াসিত শহরে। বেড়ে উঠেছেন তৎকালীন ইসলামি জ্ঞান-গবেষণার অন্যতম কেন্দ্র কুফায়।
ইমাম আবূ হানীফা, আবূ ইউসুফ, মিসআর, মালিক ইবনু মিওয়াল, উমার ইবনু যার, সুফইয়ান সাওরি, আওযায়ি ও ইবনু জুরাইজ সহ সমকালীন বহু বিদ্বানের কাছে তিনি হাদীস ও আইনশাস্ত্রে শিক্ষা লাভ করেন। মুওয়াত্তা-প্রণেতা ইমাম মালিক-এর কাছে তিনি তিন বছর হাদীস অধ্যয়ন করেন।
gভীর অধ্যবসায়ী এ বিদ্বান জ্ঞান-গবেষণায় কতটা নিবিড় ছিলেন, তা ফুটে উঠেছে তার মেয়ের বর্ণনায়: 'তার চারপাশে থাকত বই আর বই। (পড়ার সময়) আমি তাকে কখনও কথা বলতে শুনিনি, কেবল দেখতাম চোখের পাতা বা আঙুলের ইশারায় দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন।'
তিনি রাতকে তিনটি অংশে ভাগ করতেন: একাংশে ঘুম, আরেক অংশে সালাত আদায় আর অপর অংশে পড়াশোনা করতেন। কখনও কখনও তিনি রাতে খুবই কম ঘুমাতেন। জিজ্ঞাসা করা হলো, 'আপনি ঘুমান না কেন?' জবাবে তিনি বলেন,
'আমাদের উপর ভরসা করে মুসলিমদের চোখগুলো ঘুমিয়ে পড়েছে; আমি ঘুমাই কীভাবে!?'
জিজ্ঞাসা করা হলো, 'আপনি গায়ের জামা খুলে রাখেন কেন?' তিনি বলেন, 'উষ্ণতা পেলে ঘুম চলে আসে, আর উষ্ণতার উৎস হলো জামা। (তাই এটি খুলে রাখি।) এরপরও ঘুম চলে আসলে, গায়ে পানি ঢেলে দিই!'
জ্ঞানসাধনার পেছনে তিনি কীভাবে অর্থসম্পদ ব্যয় করেছেন, তা তাঁর নিচের কথা থেকে কিছুটা অনুমান করা যায়:
'আমার পিতা মারা যাওয়ার সময় তিরিশ হাজার দিরহাম রেখে যান। সেখান থেকে আমি পনেরো হাজার দিরহাম খরচ করেছি ব্যাকরণ ও কবিতার পেছনে, আর (বাকি) পনেরো হাজার হাদীস ও আইনশাস্ত্রের পেছনে।'
আল্লাহ-প্রদত্ত অসাধারণ মেধাশক্তি, কঠিন অধ্যবসায়, তীব্র জ্ঞানানুরাগ ও জ্ঞানসাধনায় প্রচুর অর্থ খরচ—এসবের সমন্বিত ফল হিসেবে অতি অল্প বয়সেই তিনি কুরআন, সুন্নাহ্, আইন, আরবি ভাষা, গণিত ও অন্যান্য শাস্ত্রে ব্যাপক পারদর্শী হয়ে উঠেন।
ইমাম আবূ ইউসুফ-এর পর তিনি ইরাক অঞ্চলে ইসলামি আইনশাস্ত্রের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হন। বিশ বছর বয়সে কুফার মাসজিদে পাঠদান শুরু করেন। মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে জ্ঞানপিপাসু ছাত্ররা তাঁর কাছে ভিড় জমাতে থাকে। তাঁর উল্লেখযোগ্য ছাত্রের মধ্যে রয়েছেন ইমাম শাফিয়ি, 'কিতাবুল আমওয়াল'-প্রণেতা আবূ উবাইদ কাসিম ইবনু সাল্লাম ও সিসিলি-বিজেতা আসাদ ইবনুল ফুরাত।
ইবরাহীম হারবি বলেন, 'আমি আহমাদ ইবনু হাম্বাল-কে জিজ্ঞাসা করলাম, "এসব সূক্ষ্ম মাসআলা আপনি কোথায় পেয়েছেন?" জবাবে তিনি বললেন, "মুহাম্মাদ ইবনুল হাসানের বইগুলোতে।"'
তিনি এত উচ্চমানের ভাষাবিদ ছিলেন যে, তাঁর ব্যবহৃত বাক্যকে ব্যাকরণের প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করা হয়। তাঁর গ্রন্থাবলিতে সাড়ে তিন হাজারেরও বেশি হাদীসের উল্লেখ পাওয়া যায়। এসব হাদীস বিশুদ্ধ হাদীস-গ্রন্থাবলিতে বার বার উল্লেখ করা হয়েছে—কখনও তা হুবহু শব্দে শব্দে, কখনও কাছাকাছি শব্দ-সমৃদ্ধ, আবার কখনও কাছাকাছি অর্থজ্ঞাপক।
তাঁর লিখিত গ্রন্থাবলির মধ্যে রয়েছে: আল-জামিউস সগীর, আল-জামিউল কাবীর, আস-সিয়ারুস সগীর, আস-সিয়ারুল কাবীর, আয-যিয়াদাত ও আল-মাবসূত বা কিতাবুল আস্ল ফিল ফুরু'। পরিভাষাগত দিক দিয়ে এসব গ্রন্থকে একত্রে 'যাহিরুর রিওয়ায়াত' নামে অভিহিত করা হয়। এসবের বাইরেও তিনি রচনা করেছেন: আল-মাখারিজ ফিল হিয়াল, কিতাবুল আসার, আল-হুজ্জাহ্ আলা আহলিল মাদীনাহ্, কিতাবুল কাস্ব (বক্ষ্যমাণ গ্রন্থটি এরই অনুবাদ) ও মুওয়াত্তা আল-ইমাম মালিক।
যুদ্ধ ও শান্তি বিষয়ে তাঁর লেখা 'আস-সিয়ারুস সগীর' ও 'আস-সিয়ারুল কাবীর' গ্রন্থ-দুটি আন্তর্জাতিক আইনের অনবদ্য দলিল। গ্রন্থ-দুটির জন্য জার্মানির আইনজ্ঞগণ তাঁকে পাশ্চাত্য-আন্তর্জাতিক আইনের জনক হুগো গ্রোসিয়াসের (Hugo Grotius) সঙ্গে তুলনা করেছেন। অবশ্য বস্তুনিষ্ঠ পর্যালোচনায় বিষয়টি আরও পরিষ্কারভাবে ধরা পড়বে যে—বিষয়-বৈচিত্র্য, বর্ণনার প্রাঞ্জলতা, যুক্তির আসঞ্জনশীলতা (coherence) ও মানবিক সমাধানের বিচারে ইমাম মুহাম্মাদ-এর গ্রন্থ-দুটি হুগো গ্রোসিয়াসের Mare Liberum ও De Jure Belli ac Pacis-এর চেয়ে অনেক উন্নততর।
হারুনুর রশীদের শাসনামলে তিনি বেশ কয়েক বছর রাক্কা’র বিচারক পদেও দায়িত্ব পালন করেন।
৫৮ বছর বয়সে তিনি রাই শহরে ১৮৯ হিজরিতে (খ্রি. ৮০৫) ইন্তেকাল করেন। একই দিন একই স্থানে ইন্তেকাল করেন বিখ্যাত ব্যাকরণবিদ ইমাম কিসাঈ। তৎকালীন শাসক হারুনুর রশীদ আফসোস করে বলেছিলেন, ‘রাই শহরে আইন ও ভাষাতত্ত্ব পাশাপাশি দাফন করে এলাম!’
টিকাঃ
[১] মনে রাখতে হবে, এটি ওই যুগের কথা, যখন ইমাম মালিকের মুওয়াত্তা ছাড়া প্রসিদ্ধ হাদীসগ্রন্থাবলি সংকলনের কাজ শুরুই হয়নি।
[১] দেখুন: Hans Kruse, Die Begründung der islamischen Völkerrechtslehre: Muhammad aš-Šaibānī—,,Hugo Grotius der Moslimen”, Saeculum, Volume 5, Issue JG (1954-12), pp. 221-242।
📄 বহুল ব্যবহৃত চিহ্ন
‘সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম'। আল্লাহ তাঁর উপর করুণা ও শান্তি বর্ষণ করুন! (মুহাম্মাদ ﷺ-এর নামের পর ব্যবহৃত হয়।)
‘আলাইহিস সালাম’। তাঁর উপর শান্তি বর্ষিত হোক! (সাধারণত নবিদের নামের পর ব্যবহৃত হয়।)
‘আলাইহাস সালাম’। তাঁর উপর শান্তি বর্ষিত হোক! (মহীয়সী নারীর নামের পর ব্যবহৃত হয়।)
‘আলাইহিমাস সালাম’। উভয়ের উপর শান্তি বর্ষিত হোক! (দুজন নবির নাম একসাথে এলে, শেষোক্ত নামের পর ব্যবহৃত হয়।)
‘আলাইহিমুস সালাম’। তাঁদের উপর শান্তি বর্ষিত হোক! (দুয়ের অধিক নবির নাম একসাথে এলে, শেষোক্ত নামের পর ব্যবহৃত হয়।)
‘রদিয়াল্লাহু আনহু’। আল্লাহ তাঁর উপর সন্তুষ্ট হোন! (সাহাবির নামের পর ব্যবহৃত হয়।)
‘রদিয়াল্লাহু আনহা’। আল্লাহ তাঁর উপর সন্তুষ্ট হোন! (মহিলা সাহাবির নামের পর ব্যবহৃত হয়।)
‘রদিয়াল্লাহু আনহুমা’। আল্লাহ উভয়ের উপর সন্তুষ্ট হোন! (দুজন সাহাবির নাম একসাথে এলে, শেষোক্ত নামের পর ব্যবহৃত হয়।)
‘রদিয়াল্লাহু আনহুম’। আল্লাহ তাঁদের উপর সন্তুষ্ট হোন! (দুয়ের অধিক সাহাবির নাম একসাথে এলে, শেষোক্ত নামের পর ব্যবহৃত হয়।)
‘রদিয়াল্লাহু আনহুন্না’। আল্লাহ তাঁদের উপর সন্তুষ্ট হোন! (দুয়ের অধিক মহিলা সাহাবির নাম একসাথে এলে, শেষোক্ত নামের পর ব্যবহৃত হয়।)
📄 শামসুল আইম্মা সারাখ্ন্সি রহ.-এর ভূমিকা
পরম করুণাময় অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে।
সকল প্রশংসা আল্লাহর, যিনি বিশ্বজগতের অধিপতি। আল্লাহ আমাদের নেতা মুহাম্মাদ ﷺ, তাঁর পরিবার ও সাহাবিদের সকলকে তাঁর করুণার চাদরে ঢেকে নিন!
দুনিয়া-বিরাগী ও প্রথিতযশা ইমাম শাইখ সামসুল আইম্মা ফখরুল ইসলাম আবূ বাকর সারাখসি ছাত্রদের লেখার নির্দেশ দিয়ে বলেন: “তোমরা আমার কাছে চেয়েছিলে, আমি যেন মুহাম্মাদ ইবনুল হাসান ﷺ-এর রচনাবলিতে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে, হাকিম শহীদের 'আল-কাফী/ আল-মুখতাসার' গ্রন্থটির ব্যাখ্যা তোমাদের দিয়ে লিখিয়ে নেওয়ার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করি। আমি তোমাদের অনুরোধে সাড়া দিয়েছি। এখন আমি চাই ﷺ-এর সঙ্গে 'কিতাবুল কাস্-ব' গ্রন্থের ব্যাখ্যা জুড়ে দিই, যে গ্রন্থটি মুহাম্মাদ ইবনুল হাসান থেকে মুহাম্মাদ ইবনু সামাআ বর্ণনা করেছেন। লিপিবদ্ধ করার কাজটি অবশ্য তোমাদেরই করতে হবে।
এ গ্রন্থটি ইমাম মুহাম্মাদ ﷺ-এর সামগ্রিক রচনাবলিরই অংশ; তবে এটি খুব বেশি প্রসিদ্ধি লাভ করেনি। এর কারণ হলো, তার কাছ থেকে আবূ হাফ্স ও সুলাইমানের কেউই এ গ্রন্থের বর্ণনা শোনেননি। আর এজন্য হাকিম শহীদও তার 'আল-মুখতাসার' গ্রন্থে এটি উল্লেখ করেননি।
গ্রন্থটিতে জ্ঞানের এমন কিছু বিষয় আছে, যে-ব্যাপারে অজ্ঞ থাকার কোনও সুযোগ নেই; না জেনে বসে থাকারও কোনও উপায় নেই। উপার্জনকারীদের সঙ্গে উপার্জন-কর্মে যোগ দিয়ে, নিজের হাতের উপার্জন থেকে জীবিকা নির্বাহ করার জন্য গ্রন্থটিতে নিঃস্ব লোকদের উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। এ বইয়ে যদি জ্ঞানের এতসব উপকরণ না থেকে শুধু এটুকুই থাকত, তাতেও এ ধরনের জ্ঞান ছড়িয়ে দেওয়া প্রত্যেকের জন্য বাধ্যতামূলক হতো।
আমাদের শিক্ষক ইমাম শামসুল আইম্মা হালওয়ানি পূর্বসূরীদের জ্ঞান উল্লেখ করার অংশ হিসেবে, এ গ্রন্থের কিছু অংশের ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন। তার কাছ থেকে শ্রুত বিষয়ের বরকত হিসেবে, আমি সেগুলো উল্লেখ করব; আর এর সঙ্গে জুড়ে দেবো উসূল-বিশেষজ্ঞগণের বক্তব্য এবং বিভিন্ন শব্দের অর্থ ও তাৎপর্য।”