📄 সাহাবাগণ আল্লাহকে যেমন ভয় পেতেন
আবু ইমরান আল-জুনি রহিমাহুল্লাহ বলেন, আবু বকর আস-সিদ্দিক রাযিয়াল্লাহু আনহু প্রায়শ বলতেন, 'যদি আমি একজন মু'মিনের একটি পশম হতাম!'¹
হাসান রহিমাহুল্লাহ বলেন, আবু বকর আস-সিদ্দিক রাযিয়াল্লাহু আনহু প্রায়শ বলতেন, 'আমি যদি শুধুমাত্র একটি ঘাস হতাম, যা কেটে ফেলা হয়েছে এবং খেয়ে ফেলা হয়েছে।' ²
আব্দুল্লাহ ইবনু উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলতেন, 'ফুরাত নদীর তীরে যদি একটি ছাগল মারা যায়, আমার ভয় হয় হয়তো এজন্যও আমাকে পাকড়াও করা হবে।' ³
আব্দুল্লাহ ইবনু আমির বলেন, তিনি একবার দেখেন উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু কিছু ঘাসের টুকরো হাতে নিয়ে বলছেন, 'আমি যদি শুধু এই ঘাসের টুকরো হতাম; যদি আমাকে সৃষ্টি করাই না হত; যদি আমার মা আমাকে জন্মই না দিত; যদি আমি ধ্বংস হয়ে যেতাম এবং আমার অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যেত।' ⁴
আব্দুল্লাহ ইবনু ঈসা রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, উমার রাযিয়াল্লাহু আনহুর অধিক ক্রন্ধনের কারণে তাঁর মুখমণ্ডলে দুটি কালো দাগ হয়ে যায়। ⁵
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু আরো বলতেন, 'যদি কেউ ঘোষণা করে, যে একজন ব্যতীত সকল মানুষ জান্নাতে যাবে, তাহলে আমি ভয় পেতাম এটা ভেবে হয়তো আমিই সেই একজন।'⁶
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু যখন আঘাত প্রাপ্ত হয়ে শয্যাশায়ী হন তখন আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে বলেন, 'ইয়া আমিরুল মু'মিনিন! আপনি তখন ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন, যখন অন্যরা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল; আপনি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে সংগ্রাম করেন ও কষ্ট শিকার করেন যখন অন্যরা তাকে পরিত্যাগ করেছিল; রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মৃত্যুর সময় আপনার প্রতি সন্তুষ্ট ছিলেন; কোনো দ্বিতীয় জন আপনার সাথে দ্বিমত পোষণ করে না, আর এখন আপনি একজন শহীদ হিসেবে মৃত্যু বরণ করতে যাচ্ছেন।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু জবাবে বলেন, 'অভিভূত হোক সে, যার তুমি তোষামোদি করছ। আল্লাহর শপথ! যদি দুনিয়ার সকল কিছু আমার কাছে থাকতো তাহলে আমি আমার আসন্ন সময়ের জন্য সব কিছু দিয়ে দিতাম।⁷
আবু মাইসারা রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত হয়েছে, যখন তিনি বিছানায় যেতেন তখন তিনি বলতেন, 'যদি আমার মা আমাকে জন্ম না দিত।' তাঁর স্ত্রী একবার জিজ্ঞেস করেন, আল্লাহ তাকে হেদায়াত দিয়ে ইসলামে প্রবেশ করিয়েছেন তাও কেন তিনি এমন কথা বলেন। তিনি তখন বলেন, 'হ্যাঁ এটা সত্য। কিন্তু তিনি এও বলেছেন, পরে আমরা ফিরে আসি বা না আসি তিনি প্রথমে আমাদের আগুনে প্রবেশ করাবেন।⁸
আব্দুল্লাহ ইবনু মাসউদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, 'যে কুর'আন হিফজ করেছে তাঁর উচিত হল ঐ রাতগুলো চিনে রাখা, যে রাতে সবাই ঘুমিয়ে থাকে; ঐ দিনগুলো চিনে রাখা, যে দিনে মানুষরা রোজা রাখে না; তাঁর দুঃখ ও অতৃপ্ততা, যখন সবাই তৃপ্ত থাকে; তাঁর কান্নায় যখন মানুষ হাঁসতে থাকে; তাঁর নিরবতা, যখন মানুষ কথা বলতে থাকে এবং তাঁর বিনয়তা, যখন সবাই অহংবোধ করে-এই সময় গুলো চিনে রাখা'
'একজন কুর'আন বহনকারীর উচিত উদ্বিগ্ন না থাকা, সহনশীল হওয়া, স্থির ও শান্ত থাকা, ক্ষমাশীল হওয়া। সে অমার্জিত হবে না, অন্যমনস্ক থাকবে না, না উচু আওয়াজে কথা বলবে, না জটিল প্রকৃতির লোক হবে।' ⁹
ইবনু আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহুকে আল্লাহকে ভয়কারী তাকওয়াবানদের সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হয়, তিনি বলেন, 'তাদের অন্তর আল্লাহর ভয়ে পরিপূর্ণ থাকে; তাদের চোখ ক্রন্দন করতে থাকে; এবং তারা বলে, 'কিভাবে আমরা পরিতৃপ্ত ও বেফিকির থাকতে পারি, যখন আমাদের পিছনে মৃত্যু অগ্রসর হচ্ছে, আর আমাদের সামনে কবর অবস্থান করছে; আমাদেরকে বিচার দিবসের প্রতিশ্রুতি দিয়ে দেয়া হয়েছে; জাহান্নাম আমাদের পথে রয়েছে, আর আল্লাহর সামনে আমাদের দন্ডায়মান হতে হবে?' ¹⁰
মাশরুক রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আব্দুল্লাহ ইবনু মাসউদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর সাথে এক লোক ছিল, তিনি বলেন, 'আমি ডান দিকের দলের অন্তর্ভুক্ত হতে চাই না, আমি নৈকট্যপ্রাপ্ত দলের অন্তর্ভুক্ত হতে চাই।' আব্দুল্লাহ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, 'এখানে এমন একজন মানুষ আছে যে পুনরুত্থিত হতে চায় না।' ¹¹
হারিস ইবনু সুয়াইদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, 'আমি নিজের সম্পর্কে যা জানি তা যদি তোমরা জানতে তাহলে আমাকে ডাস্টবিনে নিক্ষেপ করতে।' ¹²
একবার আব্দুল্লাহ ইবনু রাওয়াহ রাযিয়াল্লাহু আনহু তাঁর স্ত্রীর সামনে কান্না করছিলেন, তা দেখে স্ত্রীও কান্না করলেন। স্ত্রীকে কাঁদতে দেখে তিনি জিজ্ঞেস করেন, 'তুমি কাঁদছ কেন?' স্ত্রী বলেন, 'আপনি কাঁদছেন তাই আমিও কাঁদছি।' তিনি তখন তাঁর কান্নার কারণ বলেন। তিনি বলেন, আল্লাহ তাকে জাহান্নামে প্রবেশ করাবেন এই ঘোষণা দিয়েছেন, কিন্তু তাকে পরে বের করার ঘোষণা দেননি, এই ভয়ে তিনি কাঁদছেন।¹³
সাওর ইবনু যায়েদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, যখন মুয়াজ ইবনু জাবাল রাযিয়াল্লাহু আনহু তাহাজ্জুদ সালাত পড়তেন তখন তিনি বলতেন, 'হে আল্লাহ! চক্ষুগুলো ঘুমিয়ে পড়েছে; আকাশের তারাগুলো বিলীন হয়ে যাচ্ছে, শুধুমাত্র আপনি হলেন সর্বদা জাগ্রত ও প্রতিপালক! হে পরওয়ারদেগার! আমার জান্নাতের তালাশ খুবই অপ্রতুল, এবং জাহান্নাম থেকে জান্নাতের দিকে আমার যাত্রা অনেক দুর্বল। হে আল্লাহ! আপনার অফুরন্ত রহমতের মধ্য থেকে আমাকেও রহমত দান করুণ, পথপ্রদর্শন করুন। নিশ্চয় আপনি অঙ্গীকার রক্ষাকারী।' ¹⁴
কাসিম ইবনু বাযযাহ রহিমাহুল্লাহ বলেন, ইবনু উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর তিলাওয়াত শুনেছেন এমন একজন লোক আমাকে বলেছেন, যখন ইবনু উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সুরা মুতাফফিফিন তিলাওয়াতের সময় ৬ নং আয়াতে '... যেদিন মানুষ বিশ্বজগতের প্রতিপালকের সামনে দাঁড়াবে' পৌঁছতেন, তখন তিনি ফুঁপিয়ে উঠতেন এবং এত বেশি কাঁদতেন যে, তিনি আর সামনের আয়াত তিলাওয়াত করতে পারতেন না। ¹⁵
সামির আর-রায়াহী রহিমাহুল্লাহ তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন, একবার ইবনু উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু খানিক ঠান্ডা পানি পান করেন, এবং সাথে সাথে কাঁদতে লাগলেন। 'আপনি কেন এত কাঁদছেন?' তাকে জিজ্ঞেস করা হল। তিনি বলেন, 'কুর'আনের একটি আয়াতের কথা আমার মনে পড়েছে, "এদের এবং এদের কামনার মধ্যে অন্তরাল সৃষ্টি করা হয়েছে।” ¹⁶
আর তখন আমি ভাবলাম জাহান্নামবাসীদের নিকট পানিই হল একমাত্র কামনা। তারা বলে, "আমাদের উপর কিছু পানি ঢেলে দাও অথবা আল্লাহ প্রদত্ত তোমাদের জীবিকা হতে কিছু প্রদান করো।” ¹⁷
নাফিঈ রহিমাহুল্লাহ বলেন, 'ইবনু উমর যখন এই আয়াত পাঠ করতেন- "যারা ঈমান এনেছে, তাদের হৃদয় কি আল্লাহর স্মরণে এবং যে সত্য নাযিল হয়েছে তার কারণে বিগলিত হওয়ার সময় হয়নি?”¹⁸ তখন এত বেশি কাঁদতেন যে, কান্না তাকে পরাস্ত করত।'¹⁹
আব্দুর রহমান ইবনু আবি লায়লা রাযিয়াল্লাহু আনহু আবু যর রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণনা করেন, “আল্লাহর শপথ! যদি তুমি জানতে আমি যা জানি তাহলে তুমি স্ত্রীর মাঝে কোনো আনন্দ পেতে না, বিছানায় বিশ্রাম নিতে পারতে না। আল্লাহর কসম! আমি কামনা করি আল্লাহ যদি আমাকে একটি গাছ বানাতেন, এমন গাছ যার ফল খেয়ে ফেলা হয়ছে।” ²⁰
আসাদ ইবনু ওয়াদাহ রহিমাহুল্লাহ বলেন, শাহাদাদ ইবনু আউস রাযিয়াল্লাহু আনহু বিছানায় শুয়ে কাত বদল করতেন, কিন্তু ঘুম আসতো না, আর বলতেন, 'হে আল্লাহ! আগুন আমাকে ঘুমাতে দিচ্ছে না।' অতঃপর তিনি উঠে টানা ফজর পর্যন্ত সালাতে নিমগ্ন থাকতেন।²¹
মুজাহিদ রহিমাহুল্লাহ বলেন, ইবনু যুবাইর রাযিয়াল্লাহু আনহু সালাতে এমনভাবে দাঁড়াতেন যে, মনে হতো কোনো লাঠি মাটিতে গেঁথে রাখা হয়েছে। ²²
বকর ইবনু মুযাম রহিমাহুল্লাহ বলেন, যে একবার আবু মুসা আশ'আরি রাযিয়াল্লাহু আনহু বসরায় খুতবা দেন এবং খুতবাতে জাহান্নামের আলোচনা করেন। তখন তিনি এত বেশি কাঁদলেন যে, তার অশ্রুগুলো টপটপ করে মিম্বারের উপর পড়ছিল। সেদিন উপস্থিত সকলেও কেঁদেছিল। ²³
ইমরান ইবনু হুশাম রাযিয়াল্লাহু আনহু প্রায়শ বলতেন, 'আমি যদি কিছু ধুলোবালি হতাম, যা বাতাস উড়িয়ে নিয়ে যায়।' ²⁴
আলি রাযিয়াল্লাহু আনহু আল্লাহর রাসুলের সাহাবাদের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, 'আল্লাহর শপথ, আমি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথিদের দেখেছি, তাদের মত সুন্দর চরিত্রের ব্যক্তি বর্তমানে দেখতে পাই না। তারা এমনভাবে ঘুম থেকে উঠতেন, যেন মনে হত সারারাত তারা রাখালি করে ছাগল চরিয়েছে, তাদের পোশাক এবং চুলগুলো থাকতো এলোমেলো। তারা রাত কাটাতেন রুকু সিজদায়, কুর'আন তিলাওয়াত করে। এবং যখন তারা সকালে জাগ্রত হতেন, তারা আল্লাহকে স্মরণ করতেন এবং এমনভাবে অবস্থান করতেন, মনে হত তারা যেন একটি বৃক্ষ যার ডাল-পালা বাতাসে দুলছে, এবং তাদের চক্ষু হতে এত বেশি অশ্রু ঝরত যে, তাদের পোশাক ভিজে যেত। আর এখন! এখন মানুষ নিশ্চিন্তে ঘুমাতে যায়, ঘুমাতে যায় সম্পূর্ণ অবচেতন ও বেফিকির অবস্থায়।²⁵
হাসান আল-বসরি রহিমাহুল্লাহ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবীদের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, 'তাদের সহনশীলতা এত মাত্রায় ছিল যে জাহিলদের সকল চক্রান্ত তারা বিচক্ষণতার সাথে মোকাবিলা করতেন, এভাবে তারা দিন কাটাতেন। আর রাত কাটাতেন এমন অবস্থায় যে, তাদের চোখ অশ্রু ঝরাতে ঝরাতে দাড়ি ভিজিয়ে দিত, আর তাদের পা দাঁড়িয়ে থাকতো মুসল্লায়, শুধুমাত্র এই আশায় যে, আল্লাহ তাদের ক্ষমা করে দিবেন।
সা'দ ইবনু আল-আহযাম রহিমাহুল্লাহ বলেন, তিনি ইবনে মাসউদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর সাথে ছিলেন, তারা লৌহ ও ইস্পাত শিল্পের দোকানের সামনে দিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন একজন কারিগর চুল্লী থেকে গলিত লোহা বের করছিল। ইবনু মাসউদ রাযিয়াল্লাহু আনহু স্থির দৃষ্টিতে সেখানে তাকান এবং কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন।²⁶
হাসান আল-বসরি রহিমাহুল্লাহ সাহাবাদের বর্ণনা দেন এভাবে- 'আমি এক দল মানুষের সাহচর্য পেয়েছি এবং তাদের প্রত্যক্ষ করেছি, যারা দুনিয়ার কোনো কিছুর গুরুত্ব দিতেন না, তাতে আনন্দ পেতেন না, দুনিয়াবি কিছু না পেলে সেজন্য আফসোসও করতেন না। এমনকি দুনিয়া তাদের নিকট হাঁটার সময় পায়ে মাড়ানো ধুলিবালির তুলনায়ও নিম্নতর ছিল। তারা কাপড় পড়তেন অতি সাধারণ মানের। তারা তাদের জন্য স্ত্রীদের কিছু রান্না করতেও বলতেন না। আমি তাদের কুর'আনের উপর এবং রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সিরাতের উপর চলতে দেখেছি। যখন রাত গভীর হতো, তারা বিছানা থেকে পৃথক হয়ে যেতেন এবং মুসল্লায় দাঁড়িয়ে যেতেন, আর প্রভুর কাছে অশ্রু ঝরাতেন। তারা আল্লাহর কাছে উত্তম প্রতিদান চাইতেন...।²⁷
যদি তারা কোনো উত্তম কাজ করতেন, তখন তারা খুশি হতেন এবং আল্লাহর প্রশংসা করতেন, কবুল করার দু'আ করতেন। আর যদি তাদের দ্বারা কোনো ভুল হয়ে যেত তখন তারা দুঃখ পেতেন, এবং আল্লাহর নিকট ক্ষমার দু'আ করতেন। আল্লাহর কসম! তারা এভাবেই সারাজীবন অতিবাহিত করেন।'²⁸
মুয়ায ইবনু আন রহিমাহুল্লাহ বলেন, তিনি জুবানের পথ দিয়ে যাচ্ছিলেন এবং রিয়াহ আল কায়েশি রাযিয়াল্লাহু আনহুকে ঐ পথ অতিক্রম করতে দেখতে পান। যখন রাস্তা ফাঁকা ছিল তখন তিনি শুনতে পান, রিয়াহ রাযিয়াল্লাহু আনহু অত্যাধিক কান্না করছেন এবং বলছেন, 'হে দিন ও রাত্রি, আর কত দিন ধরে তোমরা আমার জন্য আসতে থাকবে? আমি জানি না এর অর্থ কী। আমরা আল্লাহর জন্য, আমরা আল্লাহর জন্য।' তিনি একই কথা বার বার আবৃত্ত করছিলেন, এক সময় তিনি অদৃশ্য হয়ে যান।
ফুরাত ইবনু সুলাইমান রহিমাহুল্লাহ বলেন হাসান রহিমাহুল্লাহ বলতেন, 'ইমানদার হলো এমন এক জাতি, যারা আচরণে এত বেশি বিনম্র যে, জাহিলরা তাদের অসুস্থ মনে করে। আল্লাহর শপথ, তারা হল অনুভূতি সম্পন্ন একটি জাতি। তোমরা কী দেখনি, আল্লাহ বলেছেন- আর তারা বলবে, 'সকল প্রশংসা আল্লাহর, যিনি আমাদের দুঃখ-কষ্ট দূর করে দিয়েছেন। নিশ্চয় আমাদের রব পরম ক্ষমাশীল, মহাগুণগ্রাহী।'²⁹
আল্লাহর শপথ, দুনিয়ার অধিকাংশ দুঃখ কষ্ট তাদের নিবিষ্ট করে রেখেছে, কিন্তু তারা কখনো অন্যদের দুঃখ দেন না। তারা দুঃখ কষ্ট গ্রহণ করেছেন কেবল মাত্র এই কারণে যে, তারা আল্লাহকে অত্যাধিক ভয় করেন।³⁰
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এক ব্যক্তিকে তাহাজ্জুদে সূরা ত্বরের ৭-৮ নং আয়াত- 'নিশ্চয় তোমার রবের আযাব অবশ্যম্ভাবী। যার কোন প্রতিরোধকারী নেই'-তিলাওয়াত করতে শুনতে পান। তখন তিনি বলেন, 'নিশ্চয় আল্লাহর সত্য প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন,' অতঃপর তিনি বাসায় আসেন এবং অসুস্থ হয়ে পড়েন। প্রায় এক মাস তিনি অসুস্থ থাকেন। মানুষরা তাকে দেখতে আসত, কিন্তু তার অসুস্থতা কী তা জানত না।³¹
কেউ বলেছেন, 'দুঃখ মানুষকে খাদ্য গ্রহণ থেকে পৃথক রাখে, আর আল্লাহর ভয় মানুষকে গুনাহ থেকে পৃথক রাখে।³²
সাদিক ইবনু ইবরাহিম রহিমাহুল্লাহ বলেন, 'দুঃখ এবং ভয় এর চেয়ে উত্তম আর কোনো সঙ্গি হতে পারে না। দুঃখ হবে অতীত পাপের জন্য আর ভয় থাকবে ভবিষ্যতে পাপ না করার জন্য।'
আমির ইবনু কায়েস রহিমাহুল্লাহ বলেন, 'পরকালে সবচে বেশি ঐ লোক খুশী হবে, যে দুনিয়াতে পরকাল নিয়ে সবচে' বেশি সতর্ক থাকতো। পরকালে ঐ লোক সবচে' বেশি হাঁসবে, যে দুনিয়াতে আল্লাহকে সবচে' বেশি ভয় পেত।³³
টিকাঃ
¹সিফাতুস সাফওয়া: ১/২৫১。
²সিফাতুস সাফওয়া: ১/২৫১。
³সিফাতুস সাফওয়া: ১/২৭৫; এছাড়াও এটা হিলইয়াতুল আউলিয়াতে উল্লেখ রয়েছে।
⁴সিফাতুস সাফওয়া: ১/২৭৫。
⁵সিফাতুস সাফওয়া: ১/২৭৫。
⁶তাখওয়িফ: ১৩。
⁷তাম্বিহুল গাফিলিনি: ২/৪১৮。
⁸তিনি সুরা মারিয়ামের ৭১-৭২ নং আয়াতের দিকে উদ্দেশ্য করেছেন। আল্লাহ এই আয়াতে বলেন, “এবং তোমাদের প্রত্যেকেই ওটা অতিক্রম করবে; ওটা তোমার রবের অনিবার্য সিদ্ধান্ত। পরে আমি মুত্তাকীদেরকে উদ্ধার করব এবং যালিমদের সেখানে নতজানু অবস্থায় রেখে দিব।"
⁹তাম্বিহুল গাফিলিনি: ২/৬১৮。
¹⁰ইহইয়াউ উলুমুদ্দিন : ৪/১৮১。
¹¹সিফাতুস সাফওয়া: ১/৪০৫। (অর্থাৎ আল্লাহর ভয় তাঁর মধ্যে অনেক ছিল, তাই আল্লাহর সম্মুখীন হতে তিনি ভয় পাচ্ছিলেন)।
¹²সিফাতুস সাফওয়া: ১/৪০৫。
¹³হিলইয়াতুল আউলিয়া: ১/১১৮; সিফাতুস সাফওয়া: ১/৪৮৩。
¹⁴সিফাতুস সাফওয়া: ১/৪৯২。
¹⁵সিফাতুস সাফওয়া: ১/৪৯২。
¹⁶সুরা সাবা: ৫৪。
¹⁷সুরা আরাফ: ৫০。
¹⁸সুরা হাদিদ: ১৬。
¹⁹সিফাতুস সাফওয়া: ১/৪৯২。
²⁰সিফাতুস সাফওয়া: ১/৫৯৫。
²¹সিফাতুস সাফওয়া: ১/৭০৯。
²²সিফাতুস সাফওয়া: ১/৭৬৫。
²³তাখওয়িফ: ৩২。
²⁴মিনহাযুস সালিকিন: ৩২৬。
²⁵ইহইয়াউ উলুমুদ্দিন: ৪/১৮০。
²⁶তাখওয়িফ。
²⁷মুসান্নাফে আবু শাইবা: ১৩/৫০৬。
²⁸ইহইয়াউ উলুমুদ্দিন: ৪/৩৯৬; মুসান্নাফে আবু শাইবা: ১৩/৫০৬。
²⁹সুরা ফাতির : ৩৪。
³⁰তাখওয়িফঃ ২০。
³¹তাখওয়িফঃ ২৯。
³²তাম্বিহুল গাফেলিন。
³³তাম্বিহুল গাফেলিন。
📄 সালাফদের মাঝে তাকওয়া চর্চা
আমার প্রিয় মুসলিম ভাই! তোমাকে সালাফদের কিছু গল্প শুনাই। আল্লাহ তাদের প্রতি রহম করুন। তারা সব সময় একে অপরকে তাকওয়াবান হওয়ার উপদেশ দিতেন।¹
আবু বকর রাযিয়াল্লাহু তার খুতবাতে বলতেন, 'আমি তোমাদের উপদেশ দিচ্ছি, তাকওয়া অর্জন করার, এবং আল্লাহর প্রশংসা করার ঠিক সেভাবে, যেভাবে তিনি চান। তোমার আশা আকাঙ্ক্ষার সাথে আল্লাহর ভয়কে যুক্ত করে নাও এবং আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা কর। আল্লাহ যাকারিয়া আলাহিস সালাম এবং তার পরিবারের প্রশংসা করে বলেন-
"তারা সৎকাজে প্রতিযোগিতা করত। আর আমাকে আশা ও ভীতি সহকারে ডাকত। আর তারা ছিল আমার নিকট বিনয়ী।”²
আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু যখন মৃত্যুশয্যায় ছিলেন তখন তিনি উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে ডেকে পাঠালেন এবং আল্লাহকে ভয় করার উপদেশ দিলেন।
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তার সন্তানকে একটি পত্রে লেখেন, 'আমি তোমাকে আল্লাহকে ভয় পাওয়ার উপদেশ দিচ্ছি। যারা আল্লাহকে ভয় পায়, আল্লাহ তাদের হিফাজত করবেন তার শাস্তি থেকে। যে আল্লাহকে ঋণ দেয়, আল্লাহ অবশ্যই সেটার প্রতিদান দেন, এবং যারা তার প্রশংসা করে আল্লাহ তাকে আরো বাড়িয়ে পুরস্কৃত করেন। তাকওয়াকেই তোমার জীবনের প্রধান লক্ষ্য বানাও, এবং অন্তরকে তাকওয়া দিয়ে পরিষ্কার করে নাও।'
আলি রাযিয়াল্লাহু আনহু একজনকে লক্ষ্য করে বলেন, 'আল্লাহকে ভয় পাওয়ার উপদেশ আমি তোমাকে দিচ্ছি। তাকে ভয় পাওয়ার উপদেশ যার সাথে অবশ্যই তোমার সাক্ষাৎ হবে এবং তাকে ছাড়া তোমার আর কোনো গন্তব্য নেই। তিনিই দুনিয়া এবং আখিরাতের নিয়ন্ত্রক।
উমর ইবনু আব্দুল আজিজ রহিমাহুল্লাহ একজন ব্যক্তিকে লেখেন, আমি তোমাকে তাকওয়া অর্জনের উপদেশ দিচ্ছি। ঐ আল্লাহকে ভয় পাওয়ার উপদেশ দিচ্ছি যিনি তাকওয়া ব্যতীত কোনো কিছু গ্রহণ করেন না। তিনি তার অনুগামীদের প্রতি রহমত বর্ষণ করেন, এবং তাঁদের পুরস্কৃত করেন। অনেকে আছে যারা তাকওয়া অর্জনের দাওয়াহ দেয়, কিন্তু কেবলমাত্র কিছু লোক এতে আমল করতে পারে। আল্লাহ আমাদেরকে তাকওয়াবানদের মধ্যে শামিল করুন।
যখন উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু খলিফা নির্বাচিত হন, তখন তিনি একটি খুতবা দেন, এতে তিনি বলেন, 'আমি তোমাদের আল্লাহকে ভয় পাওয়ার এবং উত্তম কাজ করার উপদেশ দিচ্ছি, কেননা তিনি তাঁদের সাথেই থাকেন, যারা তাকে ভয় পায় এবং উত্তম কাজ করে।'
এক ব্যক্তি হজ্জের উদ্দেশ্যে বের হওয়ার সময় উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে কিছু উপদেশ চাইলেন, তিনি বলেন, 'আল্লাহকে ভয় কর, যারা তাঁকে ভয় করে তারা কখনো নিঃসঙ্গ হয় না।'
শু'বা বলেন, যখনো তিনি কোনো সফরের জন্য বের হতেন। তিনি হাকামের নিকট যেতেন, আর জিজ্ঞেস করতেন তার কিছু লাগবে কি না। তখন সে বলত, 'আমি তোমাকে ঐ শব্দে উপদেশ দিব, যে শব্দে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুয়ায রাযিয়াল্লাহু আনহুকে উপদেশ দিয়েছিলেন- 'তুমি যেখানেই থাকো না কেন, সর্বদা আল্লাহকে ভয় কর। কোনো ভুল হলে এটা তা মুছে দিবে, এবং মানুষদের সাথে সুন্দর আচরণ করবে।'
একজন সালাফ তার ভাইকে উদ্দেশ্য করে চিঠি লিখে বলেন- 'আল্লাহকে ভয় করার উপদেশ আমি তোমাকে দিচ্ছি, কেননা এটা হল সর্বোত্তম বিষয়, যা তুমি গোপন রাখতে পারো, এটা সবচে' সুন্দর বিষয়, যা প্রচার করতে পার, এটাই সর্ব মুল্যবান সম্পদ, যা তুমি সঞ্চয় করতে পার। আল্লাহ আমাদের উভয়কে এটা অর্জন করার তাওফিক দান করুন।'
আরেকজন সালাফ তার ভাইকে লিখেন-'আমি তোমাকে এবং আমাকে তাকওয়া অর্জনের নসিহত করছি। দুনিয়া এবং আখিরাতের জন্য এটাই হল সর্বোত্তম রিযিক। এটা দিয়ে তুমি প্রত্যেক ভালো কাজের দিকে ধাবিত হও এবং মন্দ কাজ থেকে বেঁচে থাক।'
যখন আলি রাযিয়াল্লাহু আনহু সিফফিন যুদ্ধ থেকে ফিরে আসেন, তিনি কুফা শহরের বাহিরে একটি কবরস্থানের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন তিনি বলেন-'হে তুমি, যে এমন ঘরে বসবাস করছ যা একাকীত্বের জন্য তৈরি করা হয়েছে, এবং দুনিয়া থেকে পৃথক রাখা হয়েছে! হে তুমি, যে অন্ধকার কবরে শুয়ে আছো! হে বিচ্ছিন্ন ও নিঃসঙ্গ মানুষ! তোমরা হলে আমাদের অগ্রবর্তী আর আমরা হলাম তোমাদের পিছনে অনুগামী। তোমাদের বাসা? ভালো, সেখানে এখন অন্যরা বসবাস করে। তোমাদের স্ত্রী? তারা আবার বিয়ে করেছে। তোমাদের সম্পদ? তা বণ্টিত হয়েছে। তোমাদের জন্য এই কিছু খবরই আমাদের কাছে আছে। আচ্ছা আমাদের জন্য তোমাদের কাছে কী খবর আছে? অতঃপর আলি রাযিয়াল্লাহু আনহু সৈন্যসারীর দিকে ঘুরে দাঁড়ান এবং বলেন, 'যদি তারা কথা বলার অনুমতি পেত, তাহলে তারা আমাদের জানাতো, সর্বোত্তম রসদ হল তাকওয়া। '³
টিকাঃ
¹এই অধ্যায়টি নেয়া হয়েছে Taqwa: The provision of Believers, Al-Firdous Ltd, ১৯৯৫ গ্রন্থের তৃতীয় অনুচ্ছেদ থেকে।
²সুরা আম্বিয়া: ৯০।
³নাহযুল বালাগাহ: ১২৬১
📄 তাকওয়াবানদের বৈশিষ্ট্য
আল্লাহ পবিত্র কুর'আনের বিভিন্ন স্থানে তাকওয়াবানদের (মুত্তাকুন) বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করেছেন। তার মধ্যে সবচে' বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে নিম্নোক্ত আয়াতে কারিমায়।
لَّيْسَ الْبِرَّ أَن تُوَلُّوا وُجُوهَكُمْ قِبَلَ الْمَشْرِقِ وَالْمَغْرِبِ وَلَكِنَّ الْبِرَّ مَنْ آمَنَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ وَالْمَلَائِكَةِ وَالْكِتَابِ وَالنَّبِيِّينَ وَآتَى الْمَالَ عَلَى حُبِّهِ ذَوِي الْقُرْبَى وَالْيَتَامَى وَالْمَسَاكِينَ وَابْنَ السَّبِيلِ وَالسَّائِلِينَ وَفِي الرِّقَابِ وَأَقَامَ الصَّلَاةَ وَآتَى الزَّكَاةَ وَالْمُوفُونَ بِعَهْدِهِمْ إِذَا عَاهَدُوا وَالصَّابِرِينَ فِي الْبَأْسَاءِ وَالضَّرَّاءِ وَحِينَ الْبَأْسِ أُولَئِكَ الَّذِينَ صَدَقُوا وَأُولَئِكَ هُمُ الْمُتَّقُونَ.
ভালো কাজ এটা নয় যে, তোমরা তোমাদের চেহারা পূর্ব ও পশ্চিম দিকে ফিরাবে; বরং ভালো কাজ হল যে ঈমান আনে আল্লাহ, শেষ দিবস, ফেরেশতাগণ, কিতাব ও নবীগণের প্রতি এবং যে সম্পদ প্রদান করে তার প্রতি আসক্তি সত্ত্বেও নিকটাত্মীয়গণকে, ইয়াতীম, অসহায়, মুসাফির ও প্রার্থনাকারীকে এবং বন্দিমুক্তিতে এবং যে সালাত কায়েম করে, যাকাত দেয় এবং যারা অঙ্গীকার করে তা পূর্ণ করে, যারা ধৈর্যধারণ করে কষ্ট ও দুর্দশায় ও যুদ্ধের সময়ে। তারাই সত্যবাদী এবং তারাই মুত্তাকী।”¹
টিকাঃ
¹সুরা বাকারা: ১৭৭।
📄 আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু'র মুখে তাকওয়াবানদের বৈশিষ্ট্য
হাম্মান ইবনে শুরাইহ-আলি রাযিয়াল্লাহু আনহুর একজন সাথী, তিনি তাঁকে তাকওয়াবান ব্যক্তিদের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেন যাতে করে তিনি ধর্মভীরুদের চিনতে পারেন। আলি রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন-আল্লাহ যখন তাঁর সৃষ্টিকে তৈরি করেন, তখন তিনি তাঁদের আল্লাহর প্রতি আনুগত্য করার অথবা আনুগত্য না করার সম্পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়ে তৈরি করেন। বান্দা আনুগত্য করলে আল্লাহর কোনো লাভ হয় না, আবার বান্দা হঠকারিতা দেখালেও আল্লাহর কোনো ক্ষতি হয় না। অতঃপর তিনি সৃষ্টিদের মাঝে দুনিয়াবী রসদ বণ্টন করে দেন। যে সকল সৃষ্টির মাঝে তাকওয়া রয়েছে, তাঁদের মধ্য কিছু বৈশিষ্ট্য দিয়ে দেন, তারা সর্বদা সত্য বলে; তাঁদের কাপড় হয় মধ্যম মানের; তাঁদের হাঁটা-চলার সময় তাঁরা থাকে বিনয়ী; তাঁরা চোখ নামিয়ে নেয়, যখন তাঁরা এমন কিছু দেখে যা আল্লাহ তাঁদের জন্য দেখা হারাম করেছেন; তাঁরা উত্তম কথা শুনে; সুখে-দুঃখে, নিঃস্বতা-সমৃদ্ধিতে, উভয় অবস্থায় তাঁরা সত্য কথা বলে এবং চারিত্রিক সরলতা বজায় রাখে।
আল্লাহ কি তাঁদের মৃত্যুর সময় লিখে রাখেননি? তাঁদের রূহ অতিরিক্ত এক সেকেন্ডও শরীরে থাকতে পারবে না, বরং তা ব্যাকুল হয়ে উঠবে আল্লাহর অবধারিত পুরস্কার বা শাস্তি পেতে। আল্লাহ তাঁদের চক্ষুকে সবচেয়ে উঁচু মাকামের দিকে আবদ্ধ করে রেখেছেন, তাই দুনিয়ার বাকি সবকিছু তাঁদের কাছে গুরুত্বহীন। তাঁরা জান্নাতে থাকবে, এবং তা তাঁরা দুনিয়াতেও কিছুটা বুঝতে পেরেছে, জান্নাতের উপস্থিতি তাঁরা দুনিয়াতেই উপভোগ করেছে। তাঁদের অন্তরে থাকে নিদারুণ দুঃখ, আর তাঁদের শরীর হয় জীর্ণ-শীর্ণ। তাঁদের চাহিদা কম।
তাঁরা কয়েক দিন ধৈর্য ধরে এবং পরে চিরন্তন স্বস্তি ও শান্তি লাভ করে। এটা হল লাভজনক বিনিময়, তাঁদের রব তাঁদের জন্য বেসুমার আয়োজন করেছেন। দুনিয়া তাঁদের আকৃষ্ট করে, প্রবলভাবে প্রলুব্ধ করে, কিন্তু তাঁরা এই ফাঁদে পা দেয় না। দুনিয়া তাঁদের বন্দি করার চেষ্টা করে, কিন্তু তাঁরা মুক্তিপণের বিনিময়ে মুক্ত হয়ে যায়।
রাতের সময় তাঁরা কাতারে দাঁড়ায়, কুর'আনের কিছু অংশ পাঠ করে। তাঁরা মনোযোগের সাথে তিলাওয়াত করে, যা তাঁদের অন্তরে প্রবেশ করে, তাঁরা তা পান করে যেন কুর'আনের তিলাওয়াত হল একটি ঔষুধ। যখন কোনো আবেগী আয়াত তাঁদের সামনে এসে পড়ে, তাঁরা তখন বিশ্বাস করে সেটাই তাঁদের গন্তব্য। যখন কোনো ভীতিপ্রদর্শন মূলক আয়াত সামনে আসে, তাঁরা আয়াতকে অন্তরের অন্তস্থলে অনুভব করে, এবং বিশ্বাস করে জাহান্নাম। তাঁরা মনে করে জাহান্নাম প্রচন্ড জোরে ভয়ঙ্কর চিৎকার করছে এবং তা তাঁরা কানে শুনতে পাচ্ছে। তারা কপাল এবং হাঁটুর উপর ভর দিয়ে ঘুমাই। (অর্থাৎ তাঁরা এত বেশি রাতের সালাতে মশগুল থাকতেন যে সিজদাহে মাথা ও হাঁটুর উপর ভর দিয়ে মাঝে মাঝে ঘুমিয়ে পড়তেন।)
দিনে তাঁদের দেখা যায়, একজন জ্ঞানি, সহনশীল, দয়ালু এবং আল্লাহভীরু হিসেবে। আল্লাহকে ভয় করার প্রভাব তাঁদের দেহের উপর এমনভাবে পড়ত যে, কেউ তাঁদের দেখলে মনে করবে তাঁরা মানুষ নয়, যেন কোনো সোজা দণ্ডায়মান লাঠি। কেউ ধারণা করেন তাঁরা কিংকর্তব্যবিমুঢ় অবস্থায় থাকেন। বাস্তবে আল্লাহর ভয়ের প্রভাবে তাঁদের দেখতে এমন মনে হয়। যদি তাঁদের কাউকে কেউ দ্বীনদার বলে মন্তব্য করে তখন তিনি ভয় পেয়ে যান এবং বলেন-'আমি নিজেকে তোমার চাইতে ভালো করে জানি। আমার রব আমাকে আমার চাইতেও ভালো করে জানেন। হে আল্লাহ! তারা আমার সম্পর্ক যা বলেছে আমি তা থেকে মুক্ত, এবং আমার সম্পর্কে তাঁরা যা ধারণা করে আমাকে তাঁর চাইতেও উত্তম বানিয়ে দিন। আমার যেসকল পাপ সম্পর্কে তাঁরা জানে না তা ক্ষমা করুন।'
তাঁদের নিদর্শন হল-তাঁরা দ্বীনের মধ্যে অটল থাকেন। তাঁদের নম্রতার মাঝেও তারা দৃঢ়সংকল্প থাকেন। তাঁদের বিশ্বাসে অনড় থাকেন। ইলম হাসিলের জন্য তাঁরা ব্যাকুল থাকেন। ঐশ্বর্যে তাঁরা মধ্যমপন্থা অনুসরণ করেন। ক্ষুধার্ত অবস্থায়ও তাঁরা হাসিখুশি থাকেন। অসুস্থ অবস্থায় থাকেন ধৈর্যশীল। হালালের তালাশে থাকেন। সর্বাবস্থায় মানুষদের নসিহত করেন।
তাঁরা উত্তম কাজ করেও তা কবুল না হওয়ার ভয়ে থাকেন। তাঁরা সন্ধ্যা অতিবাহিত করেন আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ থেকে, আর সকাল অতিবাহিত করেন আল্লাহকে স্মরণ করে। তাঁদের নিকট ঘুম হল একটি শঙ্কা, আর জেগে থাকা হল আনন্দ। তারা ইলম এবং সহনশীলতার মধ্যে এবং কথা ও কাজের মধ্যে যোগসূত্র কায়েম করেছেন।
তুমি দেখবে তাঁদের আশা ও আকাঙ্ক্ষা অবাস্তবিক নয়, এবং তাঁদের ভুল অতি অল্প; তাঁদের হৃদয় বিনয়ী থাকে, এবং তাঁরা নিরভিমানী হন। তাঁদের বিষয়াবলি হয় একদম সাধারণ। তাঁদের খোরাক একদম অল্প। তাঁদের দ্বীন সম্পূর্ণ নিরাপদ থাকে। তাঁদের ফাহশা মরে গেছে। তাঁদের রাগ সব সময়ের জন্য প্রশমিত হয়েছে। উত্তম জিনিসই তাঁদের থেকে কাম্য করা যাবে, মন্দ সব কিছু তুমি তাঁদের অবস্থান থেকে দূরে পাবে। যারা তাদের কষ্ট দেয়, তাঁরা তাদের ক্ষমা করে দেন; যারা তাঁদের পরিত্যাগ করে তাঁরা তাদের সাথে দেখা করেন; যারা তাঁদের বঞ্চিত করে বিপদে তাঁরা তাদের সাহায্য করে। তাঁরা কারোর ঘৃণাকে পরওয়া করেন না, আবার কারোর তোষামোদিতেও গলে যান না। তাঁরা কাউকে অভিশাপও দেন না।
নীরবতা তাঁদের নিঃসঙ্গ করে না। তাঁরা হাসলেও শব্দ উঁচু করেন না। যদি তাঁদের সাথে অবিচার করা হয়, তাঁরা তখন ধৈর্য ধরেন। তাঁরা নিজেরা কষ্টে জীবন যাপন করেন, অন্যদিকে তাঁদের সাথীরা আরামে জীবন অতিবাহিত করে। অহংকার ও গর্ব কখনো তাঁদের অন্তরে স্থান পায় না, সরলতা ও নিরভিমানীতা কখনো তাঁদের থেকে পৃথক হয় না।
আল্লাহ তায়ালা আমাদের সকলকে সহিহ দ্বীনের উপর থাকার তাওফিক দান করুক। আমিন।¹
টিকাঃ
¹নাহযুল বালাগাহ: ২৪১।