📘 যেভাবে স্ত্রীর হৃদয় জয় করবেন > 📄 প্রকাশকের পক্ষ থেকে একটি বার্তা

📄 প্রকাশকের পক্ষ থেকে একটি বার্তা


প্রিয় ভাইগণ! আপনারা যারা দুনিয়া ও আখিরাতে নিজের এবং পরিবারের জন্য সুখ, শান্তি ও কল্যান কামনা করেন, তাদের উচিত উম্মাহর সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষদের অনুসরণ করা। তারা হলেন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবাগণ এবং তাদের পরবর্তী সালাফগণ। রাসুলের অনুসরণে, ইসলাম দিয়ে জীবন সাজাতে এবং আল্লাহকে স্মরণে তারা ছিলেন সবচে' অগ্রগামী।
তাই গ্রন্থের শেষে আমরা সাহাবা এবং সালাফগণের কিছু প্রামাণিক স্টোরি আলোচনা করব। আশা করি এই সব গল্প থেকে আমরা শিক্ষা নিয়ে জীবনকে সুন্দর করে সাজাবো ইনশা আল্লাহ।

📘 যেভাবে স্ত্রীর হৃদয় জয় করবেন > 📄 সালাফদের কিছু শিক্ষণীয় গল্প

📄 সালাফদের কিছু শিক্ষণীয় গল্প


ইবরাহিম ইবনে আদলিয়ানি রহিমাহুল্লাহ'র নিকট এক ব্যক্তি এসে বলেন, “হে আবু ইসহাক! আমি নিজ সত্তার উপর যুলুম করেছি (অর্থাৎ পাপ করেছি)। আমাকে কিছু নসিহত করুন, যা আমাকে গুনাহ থেকে দূরে রাখবে এবং অন্তরকে প্রশান্ত করবে”। ইবরাহিম তাকে বলেন, “যদি তুমি ৫ টি কাজ করো এবং এতে দৃঢ় ও অটল থাকো, তাহলে কোনো কিছু তোমার ক্ষতি করতে পারবে না, গুনাহের আনন্দ তোমাকে ধ্বংস করতে পারবে না।
১. যদি তুমি আল্লাহর অবাধ্য হওয়ার ইচ্ছা রাখো, তাহলে আল্লাহর রিযিকের কোনো কিছু তুমি খাবে না। যে হাত তোমাকে খাবার দেয়, তুমি কী করে ঐ হাতে কামড় দিতে পারো?
২. যদি তুমি আল্লাহর অবাধ্য হতে চাও, তাহলে আল্লাহর মালিকানাধীন কোনো স্থানে তুমি বসবাস করবে না। কী করে তুমি যার খাবার খাও, যার ঘরে থাকো তার অবাধ্য হবে?
৩. তাও যদি তুমি অকৃতজ্ঞ থাকো, এবং আল্লাহর অবাধ্য হতে চাও, তাহলে এমন স্থানে অবাধ্য হও যেখানে আল্লাহ তোমায় দেখতে পাবেন না। আল্লাহ তোমায় দেখছেন এমন অবস্থায় তুমি কী করে পাপ কাজ করতে পারো?
৪. যখন মালাকুল মাউত আসবে, তখন তুমি তাকে বলবে—আমার রূহ কবজ করার পূর্বে আমাকে কিছু সময় দিন, যাতে করে আমি তাওবা করতে পারি এবং আমলে সালেহ (নেক আমল) করতে পারি। মালাকুল মাউত তোমার কথা শুনবে না, তিনি তৎক্ষণাৎ তোমার রূহ কবজ করে তোমাকে বারযাখের (কবরের) জীবনে নিয়ে যাবে। কীভাবে তুমি পালানোর আশা করো?
৫. যখন জাহান্নামের ফেরেশতা তোমাকে জাহান্নামে নিয়ে যেতে আসবে, তখন তুমি তাদের অনুসরণ করবে না, তাদের সাথে যাবে না। আচ্ছা যদি তুমি তাদের প্রতিহত করতে না পারো তাহলে কিভাবে নিজেকে বাচানোর আশা রাখো।
এসব শুনে ব্যক্তিটি বললেন, “থামো, থামো ইবরাহিম। আমি বুঝেছি, আমি এখনই তাওবা করছি।” এরপর ঐ ব্যক্তি ইবরাহিমের সাথেই রয়ে গেলেন, যতক্ষণ না মৃত্যু তাদের পৃথক করল।¹
*****
ফুযাইল ইবনে আয়াদ রহিমাহুল্লাহ হেদায়েত পাওয়ার আগে ডাকাত ছিলেন। মুসাফিরদের কাফেলায় তিনি ডাকাতি করতেন। তিনি একজন যুবতি মেয়েকে অত্যাধিক ভালোবাসতেন। এক রাত্রে তিনি ঐ যুবতির বাসার দেয়াল টপকে ভিতরে ঢুকার চেষ্টা করছিলেন, তখন তিনি একজনকে সুরা হাদিদের নিম্নোক্ত আয়াত তিলাওয়াত করতে শুনতে পান-
"যারা মুমিন, তাদের জন্যে কি আল্লাহর স্মরণে এবং যে সত্য অবর্তীর্ণ হয়েছে, তার কারণে হৃদয় বিগলিত হওয়ার সময় আসেনি?”²
এই আয়াতটি শোনে তার অন্তরে এত প্রভাব পড়ে যে, তিনি সাথে সাথে তাওবা করেন এবং সারা রাত নিকটস্থ একটি পরিত্যক্ত স্থানে কাটিয়ে দেন। কিছুক্ষণ পরে তিনি মুসাফিরদের কথার আওয়াজ শুনতে পান-“সাবধান, সাবধান! সম্ভবত ফুযাইল তোমাদের সামনে আছে। সে তোমাদের লুটে নিবে!”। ফুযাইল তখন চিৎকার করে বললেন, “ফুযাইল তাওবা করেছে!” তিনি মুসাফিরদের নিরাপদে ভ্রমণের আশ্বাস দেন। ফুযাইল ইবনে আয়াদ রহিমাহুল্লাহ পরে মুসলিম উম্মাহর একজন চেতনার বাতিঘরে পরিণত হন, তার শিক্ষাগুলো আজও জীবিত রয়েছে।³
*****
এক দুঃস্বপ্ন ইসলামের মহান মনিষী মালিক ইবনু দিনারকে তাওবার কাছে নিয়ে আসে, তার জীবন বদলে দেয়।
মালিক ইবনু দিনার রহিমাহুল্লাহকে তার ফিরে আসার কথা জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন-
আমি ছিলাম পুলিশের লোক এবং মদ্যপায়ী। আমার এক দাসী ছিল, যে আমার সাথে খুব ভালো আচরণ করতো। তার গর্ভে আমার এক মেয়ের জন্ম হয়, মেয়ের প্রতি ছিল আমার তীব্র অনুরাগ। যখন সে হাঁটতে শিখলো তখন তাঁর প্রতি আমার ভালোবাসা আরো বেড়ে যায়। আমি মদ খেতে গেলে সে এসে মদের গ্লাস ধরে টান দিত, এতে সব আমার কাপড়ের উপর গড়িয়ে পড়ত। যখন তার বয়স দুই বছর, তখন সে মারা যায়। আমি অত্যন্ত ভেঙ্গে পড়েছিলাম।
ঐ বছরের ১৫ই শা'বানের দিন ছিল শুক্রবার। আমি মাতাল অবস্থায় ঘুমিয়ে পড়লাম, জুমার সালাতও পড়িনি। ঘুমে আমি স্বপ্নে দেখলাম কিয়ামত এসে গেছে, শিংগায় ফুঁ দেয়া হয়েছে, কবরগুলোর পুনরুত্থান ঘটেছে। আরো দেখলাম মানুষদের একত্রিত করা হলো। আমিও ছিলাম তাদের মাঝে। পিছন থেকে আমি হিস হিস শব্দ শুনতে পেলাম। পিছনে ঘুরে দেখি একটি নীল-কালো রঙের বিশাল সাপ আমার দিকে তেড়ে আসছে। আমি ভয়ে আতংকে প্রাণপণে দৌড়াতে লাগলাম। দৌড়াতে দৌড়াতে আমি একজন বুড়ো মানুষকে দেখতে পেলাম। তার পরনে ছিল সুন্দর পোশাক, গায়ে সুগন্ধি। আমি তাকে সালাম দিয়ে সাহায্য চাইলাম। এতে তিনি কেঁদে ফেলেন, এবং বললেন, তিনি অনেক দুর্বল, আর সাপটি তার চাইতে অনেক বেশী শক্তিশালী। তিনি আমাকে দৌড়াতে থাকতে বললেন, এই আশায় হয়তো সামনে এমন কাউকে পাব যে আমাকে সাহায্য করতে পারবে। আমি দৌড়াচ্ছিলাম, একটা উঁচু জায়গায় পৌঁছে গেলাম। হঠাৎ করে দেখি আমি আগুনের উপত্যকার শীর্ষে বসে আছি। আগুন দেখে এতটা ভয় হচ্ছিল যে, মনে হলো আমি এই তো আগুনে পড়েই যাচ্ছি। তখন আমি একজনের আওয়াজ শুনতে পাই। কেউ চিৎকার করে বলছিল, "এখান থেকে চলে যাও, এটা তোমার স্থান নয়,” চিৎকার শুনে আমি কিছুটা সাহস ফিরে পাই। আমি দৌড়ানো বন্ধ না করে আরো দৌড়াতে লাগলাম। সাপটি তখন আমার পায়ের গোড়ালির সাথে ছিল। আমি সেই বুড়োকে আবার দেখতে পাই, তাকে আবার আমি সাহায্য করতে বলি। তিনি আগের মত করে কান্না করে বলেন, তিনি দুর্বল, সাপ তার চাইতে অনেক বেশি শক্তিশালী, তিনি কোনো সাহায্য করতে পারবেন না। এরপর তিনি আমাকে একটি পাহাড় দেখিয়ে দিয়ে বলেন, আমি সেখানে হয়তো নিজের জমানো এমন কিছু পাবো, যা আমাকে সাহায্য করতে পারবে। আমি পাহাড়টার দিকে তাকিয়ে দেখলাম, এটি ছিল বৃত্তাকার এবং পুরো পাহাড়টি তৈরি ছিল রূপা দিয়ে। পাহাড়ে ছিল অনেকগুলো ছিদ্র করা জানালা ও তাতে ঝুলছিল পর্দা। প্রতিটি জানালায় ছিল দুইটা সোনার কপাট। প্রতিটা কপাটে ছিল রেশমী পর্দা। আমি দ্রুত সেই পাহাড়ের দিকে দৌড়ে গেলাম। একজন ফেরেশতা বলে উঠলেন, "পর্দা উঠাও। কপাট খুলে দেখো। হয়তো এখানে এই দুর্দশাগ্রস্ত মানুষটির কোন সঞ্চয় আছে, যা তাকে সাহায্য করবে।” আমি তখন অনেকগুলো ছোট শিশুকে দেখতে পেলাম, যাদের চেহারা জানালার ফাঁক দিয়ে ছোট চাঁদের মত উকি দিচ্ছে। তখন তাদের একজন বলে উঠল, 'তোমাদের কি হলো? জলদি আসো, তাঁর শত্রু তাঁকে প্রায় ধরে ফেলেছে।'
তারা এগিয়ে এলো এবং তাদের জানালার ফাঁক দিয়ে উকি দিয়ে তাকালো। তাঁরা সংখ্যায় শত শত। আমি তখন আমার মৃত মেয়েটির চেহারা দেখতে পেলাম। সেও আমাকে দেখতে পেল, দেখতে পেয়ে সে কান্না করল। এবং বলল, "আল্লাহর কসম! তিনি আমার বাবা,” এরপর সে জানালা দিয়ে এত দ্রুত বেরিয়ে নূরের পুকুরে লাফ দিল, ঠিক যেন ধনুক থেকে বের হওয়া তীর। তারপর সে আমার সামনে এলো, এবং আমার দিকে তাঁর হাত বাড়ালো। আমি তাঁর হাত আঁকড়ে ধরে ঝুলে রইলাম। সে তাঁর আরেকটি হাত দিয়ে সাপটিকে তাড়িয়ে দিল। এরপর সে আমাকে বসালো। আমার কোলের উপর বসে আমার দাড়িতে হাত বুলিয়ে বললো, 'আব্বা! যারা মুমিন তাদের জন্য কি আল্লাহর স্মরণে এবং যে সত্য অবতীর্ণ হয়েছে তার কারণে হৃদয় বিগলিত হবার সময় আসেনি?'
আমি কাঁদতে শুরু করলাম। তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম সে কোথা থেকে কুরআন শিখলো। সে বললো এখানকার শিশুরা পৃথিবীতে যা জানতো তাঁর চাইতে বেশী জানে। আমি তখন আমার পিছনে আসা সাপ সম্পর্কে জানতে চাইলাম। সে জানালো, সেটি হলো আমার খারাপ আমল, যা আমাকে দোযখে নিয়ে যেত। আমি তখন সেই বুড়ো লোকটি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম। আমার মেয়ে বললো, সে হলো আমার ভালো আমল, যা এত দুর্বল যে আমাকে সাপটি থেকে রক্ষা করতে পারলো না। আমি এরপর জানতে চাইলাম, তাঁরা (শিশুরা) পাহাড়ের ভিতরে কি করছে? সে জানালো, এরা সবাই হলো মুসলিমদের মৃত সন্তান। এরা তাদের বাবা-মায়ের সাথে দেখা হবার জন্য অপেক্ষা করছে। তাঁরা কিয়ামতের দিন তাদের বাবা মায়ের জন্য শাফায়াত করবে। মালিক ইবনু দিনার বলেন, আমি আতংকে ঘুম থেকে জেগে উঠলাম। আমি আমার মদের সব বোতল ভেঙ্গে ফেললাম, আর আল্লাহর কাছে তাওবা করলাম। এই হচ্ছে আমার তাওবার কাহিনী।⁴
*****
মালিক ইবনু দিনার রহিমাহুল্লাহ'র আরেকটি ঘটনা বলি।
একবার তিনি বসরা শহরের এক গলি দিয়ে যাচ্ছিলেন, এমন সময় তিনি সেখানে এক রাজকীয় দাসীকে দেখতে পান। দাসীটি ঘোড়ায় বসে ছিল, তার পাশে ছিল কয়েকজন গোলাম। মালিক দাসীকে লক্ষ্য করে বলেন, “হে দাসী! তোমার মুনিব কী তোমাকে বিক্রি করবে?”
'এই বৃদ্ধ মানুষ আমাকে কিনবে?' সে বলল।
'তোমার মুনিব কি তোমাকে বিক্রি করবে?' মালিক আবারো জিজ্ঞেস করলেন।
'যদি তিনি করেন, আমাকে কেনার মত আপনার সামর্থ্য আছে?' মেয়েটির জবাব।
'অবশ্যই আছে! তোমার চাইতে ভালোকে কেনার মত আমার সামর্থ্য আছে।'
সে হাসলো, এবং তার সেবককে বলল, মালিক ইবনু দিনারকে তার বাসায় নিয়ে আসতে। প্রাসাদে এসে দাসী তার মুনিবকে সব কথা জানালো, শুনে তিনিও হাসলেন, এবং মালিককে দেখতে চাইলেন। মালিককে তার সামনে আনা হল, মালিককে দেখেই মুনিব তার প্রতি কিছুটা প্রভাবিত হলেন।
'তুমি কী চাও?' মুনিব মালিককে জিজ্ঞেস করলেন।
'আপনার দাসীকে আমি কিনতে চাই,' মালিক জানালো।
'তাকে কেনার মত তোমার সামর্থ্য আছে কি?'
'সে আমার নিকট নষ্ট হয়ে যাওয়া দুটি খেজুরের বিচির চেয়ে অধিক মূল্যবান নয়।'
রুমে উপস্থিতি সকলে মালিকের এমন কথায় হেসে ফেটে পড়ল।
'কিভাবে তার মূল্য এত কম হতে পারে!' মালিককে ব্যঙ্গ করে সকলে এমন প্রশ্ন করল।
মালিক বললেন, 'কারণ তার মধ্যে অনেক ত্রুটি রয়েছে, তাই তার মূল্য অনেক কম।'
'কী রকম ত্রুটির কথা তুমি বলছ?'
'যদি সে পারফিউম ব্যবহার না করে তাহলে তার শরীর থেকে ঘামের দুর্গন্ধ আসবে।' মালিক বলতে লাগলেন—'যদি সে নিয়মিত দাঁত ব্রাশ না করে তাহলে তা নোংরা ও বিশ্রী দেখাবে। যদি সে চুলের পরিচর্যা না করে তাহলে তা উষ্কখুষ্ক হয়ে যাবে। যদি সে আরো কিছু বছর বেঁচে থাকে তাহলে সে বৃদ্ধা মানুষে পরিণত হবে, এতে তার ত্বকে ভাঁজ এসে যাবে। তার রক্তস্রাব হয়, সে মূত্রত্যাগ করে, তার রয়েছে আরো অনেক ত্রুটি।
সম্ভবত, সে শুধু নিজ স্বার্থে আপনাকে পছন্দ করে। হয়তো সে আপনার প্রতি বিশ্বস্তও নয়, যদি আপনি তার পূর্বে মারা যান, তাহলে সে আপনার মত অন্য কাউকে খুঁজে নিবে এবং পছন্দ করবে।
আপনি যে মূল্য চাচ্ছেন তার চাইতে কমে আমি অনেক ভালো দাসী কিনতে পারি। আমি এমন দাসীর কথা বলছি, যাকে বানানো হয়েছে বিশুদ্ধ কপূর দিয়ে; যদি সে তার মুখের লালা লবণাক্ত ও তিতা পানিতে মিশিয়ে দেয় তাহলে তা মিষ্টি হয়ে যাবে; যদি সে কোনো মৃত ব্যক্তির সাথে কথা বলে তাহলে তার কণ্ঠের সুরে মৃত ব্যক্তিও জিন্দা হয়ে যাবে; যদি সে সূর্যের দিকে ইশারা করে, সূর্য তার আলো হারিয়ে ফেলবে; যদি সে রাতে উপস্থিত হয়, তাহলে রাত আলোকময় হয়ে উঠবে; যদি সে তার কাপড় ও জুয়েলারি এবং সাজ সজ্জার সাথে দিগন্তে উঁকি দেয়, তাহলে পুরো দিগন্ত জুড়ে সেই অবস্থান করবে। সে হল এমন দাসী, যাকে কস্তরি এবং জাফরানের মাঝে প্রতিপালন করা হয়েছে; যে বড় হয়েছে সুন্দর বাগানে, এবং তাসনিমের পানির (জান্নাতের পানির) দ্বারা দুধ পান করেছে। সে সর্বদা আনুগত্য করবে, এবং তার ভালোবাসা কখনো শেষ হবে না। বলুন, এদের মধ্যে কোন দাসীর মূল্য অধিক হওয়া উচিত?'
মুনিব বললেন, 'অবশ্যই আপনি যার বর্ণনা দিয়েছেন তাঁর।'
'তাহলে জেনে রাখুন তাকে পাওয়া অনেক সহজ।' মালিক বললেন।
'তাঁর মূল্য কত? আল্লাহ তোমার উপর রহম করুন।'
'অতি অল্প। রাতের কিছু সময় জেগে থেকে মনোযোগের সাথে দুই রাকাত সালাত পড়ুন। যখন আপনার কাছে খাদ্য আনা হয় তখন ক্ষুধার্ত মানুষের কথা চিন্তা করুন, এবং আপনার খাবারের মধ্য থেকে কিছু তাদের দান করুন। চলাচলের পথে পাথর এবং ক্ষতিকারক বস্তু দেখলে তা সরিয়ে ফেলুন। আপনার বাকি জীবনে শুধু মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে খরচ করুন। দুনিয়ার সকল চিন্তা ফিকির পরিত্যাগ করুণ, যাতে আজ আপনি একজন সংযমী ও মিতব্যয়ীর সম্মান পেতে পারেন, এবং কাল আপনি জান্নাতে মর্যাদার সাথে এবং প্রশান্তিতে বসবাস করতে পারেন।'
মুনিব দাসীর দিকে মাথা ঘুরালেন, এবং বললেন, 'হে দাসী! তুমি কি আমাদের এই বৃদ্ধ ব্যক্তির কথা শুনেছ?'
'হ্যাঁ, শুনেছি।' সে বলল।
'তিনি কি সত্যি কথা বলেছেন, নাকি শুধু বানোয়াট গল্প শুনালেন?'
'না, তিনি সত্য বলেছেন। তিনি খুব উত্তম উপদেশ দিয়েছেন।'
অতঃপর, মুনিব বলেন, 'যদি তাই হয়ে থাকে তাহলে আমি আল্লাহর জন্য তোমাকে মুক্ত করে দিলাম, এবং অমুক অমুক সম্পত্তি তোমাকে দিলাম। আমার পাশে যে সব গোলামরা আছো আমি তোমাদেরও আজাদ করে দিলাম, তোমরা অমুক এবং অমুক সম্পদ নিয়ে নাও। আমার এই প্রাসাদ এবং আমার সব কিছু আল্লাহর রাস্তায় আমি দান করে দিলাম।'
এরপর তিনি ঘরের একটি পর্দা ছিঁড়ে সেটা গায়ে দিলেন এবং নিজের মূল্যবান পরিধান খুলে ফেলে দিলেন। দাসী অনুরোধ করে বলল, 'আমার মুনিব। আপনার ছাড়া আমার কোনো জীবন নেই।' তখন সেও তাঁর পরিধান খুলে জীর্ণশীর্ণ পোশাক পড়ে নিল। মালিক তাদের দেখলেন, তারা এক পথ ধরে চলে গেল, মালিক অন্য পথ ধরে চলে এলেন।⁵
******
সুলাইমান ইবনু খালিদ বলেন, একজন বৃদ্ধার একটি তরুণী দাসী ছিল। যার কথা খলিফা হিশাম ইবনু আবদুল মালিকের নিকট একবার বলা হয়। ঐ তরুণী তাঁর সৌন্দর্য, উত্তম চরিত্র, কুর'আন তিলাওয়াত ও কাব্য প্রতিভার জন্য বিখ্যাত ছিল। হিশাম তার কথা শোনার পরে কুফার গভর্নরের নিকট চিঠি পাঠান। তাতে লিখেন, ঐ বৃদ্ধা তরুণী দাসীকে বিক্রির জন্য যত টাকা চাইবে তাকে তা দিয়ে দিতে, এবং দাসীকে সহি সালামতে তার কাছে হাজির করতে। তরুণীর জন্য খলিফা একজন গোলামও পাঠিয়ে দেন।
গভর্নর চিঠি পেয়ে ঐ বৃদ্ধার কাছে দাসী কেনার পস্তাব করল। বৃদ্ধা দাসীকে দুই হাজার দিরহাম এবং একটি খেজুরের বাগানের (যেখানে প্রতিবছর পাঁচশ মিসকাল খেজুর উৎপন্ন হয়) বিনিময়ে দাসীকে বিক্রির কথা বলেন। গভর্নর দাসীকে কিনে রাজকীয় পোশাক পড়িয়ে হিশামের নিকট পাঠিয়ে দেন। হিশাম তাকে নিজের রুমে স্থান দেয়। তাঁর জন্য সেবিকা নির্ধারণ করেন। তাকে অতি মূল্যবান গহনা এবং পোশাক উপহার দেন।
একদিন হিশাম তরুণীর সাথে তার বিলাসবহুল ব্যালকনিতে বসে ছিলেন। সেখানে তাকিয়া রাখা ছিল, সুন্দর খুশবু পরিবেশ মাতাচ্ছিল। তরুণী তখন হিশামকে কিছু কৌতূহলপূর্ণ গল্প শুনাচ্ছিল এবং কবিতা আবৃত্তি করছিল। এমন সময় হিশাম কান্নার আওয়াজ শুনতে পান। হিশাম ব্যালকনি থেকে দেখলেন কিছু লোক একটি জানাজা নিয়ে যাচ্ছে। তাদের পিছনে কিছু মহিলার গ্রুপ ছিল, তারা কেঁদে কেঁদে শোক প্রকাশ করছিল। শোকগীতি গাইছিল। তাদের একজনের আওয়াজ ছিল অনেক উঁচু, সে বলছিল-
'হে তুমি, যাকে জানাযার খাটে বয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে; তুমি, যাকে মৃত্যুর নগরীতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে; তুমি, তোমাকে কবরে নিঃসঙ্গ একা রেখে দেয়া হবে এবং তুমি অপরিচিত অবস্থায় সেখানে থাকবে। হে তুমি! যাকে বহন করা হচ্ছে। আমি তো জানি না, তুমি কি বলছ। হয়তো তুমি তোমার লাশ বহনকারীদের দ্রুত চলতে বলছ, অথবা হয়তো তুমি জিজ্ঞেস করছ, তোমাকে কোথায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, আবার কখনো ফিরিয়ে আনা হবে।'
শোকগাথা শুনে হিশাম কাঁদতে লাগলেন, তিনি সকল বিলাসবহুলতা ত্যাগ করলেন, এবং বললেন, 'ফিরে আসার জন্য মৃত্যুই হল একটি বড় উপদেশ।'
গাদিদ (তরুণী দাসী) বলল, 'এই বিলাপকারী আমার হৃদয় ভেঙ্গে ফেলেছে।'
এরপর হিশাম গোলামকে ডাক দেন এবং ব্যালকনি থেকে নেমে প্রস্থান করেন। গাদিদ সেখানেই বসে রয়ে গেল। রাতে সে একটি স্বপ্ন দেখে। স্বপ্নে এক লোক তাকে এসে বলে-
'তোমার সৌন্দর্যের জন্য মানুষ তোমার প্রশংসা করে, তোমার আকর্ষণীয় রূপ দেখিয়ে তুমি মানুষকে আকৃষ্ট কর। তুমি ভেবে দেখেছ, যখন শেষ ঘণ্টা বেজে উঠবে, শিংগায় ফুঁ দেয়া হবে, আর সকলকে জড়ো করা হবে হাশরের ময়দানে, তখন তোমার কী অবস্থা হবে?'
আতঙ্কগ্রস্থ হয়ে গাদিদ ঘুম থেকে জেগে উঠে। নিজেকে শান্ত করার জন্য কিছু পান করে। আর তার সেবিকাকে আওয়াজ দিয়ে ডেকে আনে। তার গোসলের ব্যবস্থা করতে বলে। গোসলের পর তার পরনে থাকা সকল গহনা এবং দামী পোশাক খুলে ফেলে, মোটা জালাবিয়া (মেয়েদের সাধারণ পোশাক) পড়ে নেয়। সে খুব দ্রুত একটি ব্যাগে কিছু সামান ভরে নেয় এবং হিশামের কামরায় প্রবেশ করে। তার সাধাসিধে পোশাক, সাজ-সজ্জাহীন মুখ দেখে হিশাম প্রথমে চিনতে পারেননি। 'আমি গাদিদ,' সে বলল। 'একজন সতর্ককারী আমার কাছে এসেছিল, তার ওয়ার্নিং আমাকে ভীষণভাবে নাড়িয়ে দিয়েছে। আপনি আমাকে নিয়ে আপনার মনোবাসনা পূর্ণ করেছেন, আমাকে নিয়ে আনন্দ ও উপভোগ করেছেন। এখন আমি আপনার কাছে এসেছি, আপনার কাছে অনুরোধ করছি, আমাকে এই দুনিয়ার গোলামী থেকে আজাদ করুণ।'
'ব্যক্তি থেকে ব্যক্তির মাঝে আনন্দের পার্থক্য রয়েছে। তুমি তোমার আনন্দ খুঁজে পেয়েছো। তুমি এখন যেখানে ইচ্ছে যেতে পারো, আল্লাহর জন্য আমি তোমাকে আজাদ করে দিলাম। আচ্ছা তুমি কোথায় যেতে চাও?'- হিশাম বলেন।
'আমি আল্লাহর ঘর দেখতে চাই'- সে বলল।
'যাও'- হিশাম জবাবে বলেন। 'কেউ তোমার পথ আটকাবে না।'
সে শহর ছেড়ে মক্কায় চলে আসে। দিনের বেলায় সে সিয়াম পালন করত, এবং সারা দিন তার আবাসে লুকিয়ে থাকত। রাতের বেলায় বের হয়ে সে বায়তুল্লাহর তাওয়াফ করত, এবং বলত-
'হে আমার রব! আপনি আমার রিযিক দাতা। আমার আশা আমার থেকে ছিনিয়ে নিবেন না; আমার ইচ্ছা পূরণ করুণ; আমার ফিরে আসাকে সুন্দর করে দিন, এবং আমাকে পুরষ্কার দিতে কার্পণ্য করবেন না।' সে একসময় প্রখ্যাত হয়ে উঠে, এবং ইবাদতরত অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে এই ক্ষণস্থায়ী জীবন ত্যাগ করে।⁶
*****
ইবরাহিম ইবনু আদাম রহিমাহুল্লাহ আল্লাহর একজন ওলি ছিলেন। তিনি সারা জীবন আল্লাহর সন্ধান এবং আল্লাহর বিধানের অনুসরণে কাটিয়ে দেন। একবার তাঁর অনুসারী ইবরাহিম ইবনে বাশশার আল্লাহর সন্ধানের এই যাত্রা তিনি কিভাবে শুরু করেছিলেন তা জিজ্ঞেস করেন। তখন ইবরাহিম বলেন-
'আমার পিতা বলখ রাজ্যের রাজা ছিলেন। আমরা শিকার করতে ভালোবাসতাম। একদিন আমি শিকারের উদ্দেশ্যে ঘোড়ায় চড়ে বের হয়েছিলাম। সাথে আমার শিকারি কুকুরও ছিল। পথে একটি শিয়াল আমার ঘোড়ার উপর আক্রমণ করে বসল। তখন আমি আমার পিছন থেকে একটি শব্দ শুনতে পাই। কেউ বলছে-
"তোমাকে এই উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করা হয়নি; আর তোমাকে শিকার করার খেল তামাশার আদেশও দেয়া হয়নি।"
আমি আমার সামনে নজর দিই, ডানে বামে দেখি, কিন্তু কাউকে দেখতে পাইনি। আমি শয়তানকে অভিশাপ দিলাম এবং সামনে এগোতে লাগলাম। তখন আবার আমার ঘোড়া নড়তে লাগলো এবং আমি একই ধরনের আওয়াজ শুনতে পেলাম। আমি আবারো চারদিকে তাকালাম, কাউকে দেখতে পাইনি। আমি আবার শয়তানকে অভিশাপ দিয়ে সামনে এগোই। কিন্তু আমার ঘোড়ার ঝাঁকুনি বন্ধ হয় নি, তখন আমি আমার নিচ থেকে একই আওয়াজ শুনতে পাই। এবার কেউ আমার নাম ধরে বলছে,
"হে ইবরাহিম! তোমাকে এই উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করা হয়নি; আর তোমাকে শিকার করার খেল তামাশার আদেশও দেয়া হয়নি।”
আমি থেমে যাই, এখন আমি বুঝতে পারি যে, আল্লাহর পক্ষ হতে একজন সতর্ককারী আমাকে এই সব খেল তামাশা থেকে জাগিয়ে দিতে আমার নিকট এসেছে। আমি ঐ দিন শপথ করি যে, আমি আর কখনো আল্লাহর আদেশ অমান্য করব না। পরে আমি পরিবারের নিকট ফিরে আসি।
আমি আমার বাবার একজন মেষপালকের কাছে যাই, এবং তার লম্বা মোটা জামা ও একটি কম্বল নিয়ে আমার জামা তাকে দিয়ে দিই। তারপর আমি বের হয়ে পড়ি। পাহাড় পাড়ি দিই। দীর্ঘ পথ হেঁটে ইরাকে পৌঁছাই। ইরাকে আমি কয়েকদিনের জন্য একটি কাজ করেছিলাম, কিন্তু তার উপার্জন সম্পর্কে আমার মনে সন্দেহ হওয়ায় আমি তা ছেঁড়ে দিই। একজন আলেমকে আমি এই সম্পর্কে জিজ্ঞেস করি, তিনি আমাকে সিরিয়া যেতে বলেন। আমি সিরিয়ার পথ ধরি, সেখানের একটি শহর যা আল-মানসুরা নামে পরিচিত সেখানে পৌঁছি। একটি জব করা শুরু করি, কিন্তু এখানেও উপার্জনের পবিত্রতা নিয়ে আমার মনে সন্দেহ বাধে। আরেকজন আলেম আমাকে তারসুস যাওয়ার নসিহত করেন। তিনি বলেন, সেখানে একদম পবিত্র উপার্জন করার ব্যবস্থা হতে পারে। আমি সেখানে যাই, তখন এক ব্যক্তি আমাকে তার ফল বাগানের তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে নিযুক্ত করেন। বাগানের পরিচর্যা ও রক্ষণাবেক্ষণ ছিল আমার দায়িত্ব।
দীর্ঘদিন আমি সেখানে পুরোপুরি একজন গ্রাম্য মালী হিসেবে কাজ করছিলাম, একদিন এক লোক তার বন্ধুবান্ধব সাথে নিয়ে বাগানে এলেন, এবং 'ওই মালী!' বলে চিৎকার করে আমাকে ডাকেন। আমি তার কাছে যাই, সে আমাকে কিছু বড় এবং মিষ্টি ডালিম আনতে বলে। আমি বাগান থেকে খুঁজে বড় ডালিম নিয়ে যাই। সে তা কেটে ডালিমের স্বাদ নেয়, এবং বুঝতে পারে ডালিমটি অনেক টক। তারপর চিৎকার করে আমাকে বলেন, 'মালী! তুমি আমাদের এই ফল বাগানে দীর্ঘ দিন ধরে আছ, আমার ফল খাচ্ছ, কিন্তু তবুও তুমি মিষ্টি ও টক ডালিমের পার্থক্য জানো না। এটাও জানো না কোন গাছের ডালিম বেশি ভালো হয়।' আমি তাকে বললাম, আমি দায়িত্ব নেয়ার সময় থেকে এখন পর্যন্ত আপনার বাগানের ফল খাইনি। ওই লোক তার সাথীদের উদ্দেশ্য করে বলে, 'তোমার কি তার কথা শুনেছো? এখানে ইবরাহিম ইবনু আদহাম থাকলে তিনিও এমনিই বলতেন। সে মসজিদে যায় এবং আমার সম্পর্কে মসজিদে আলোচনা করে। ওখানে একজন আমাকে চিনতে পারলো, তারা ফল বাগানে ফিরে আসে, সাথে নিয়ে আসে অনেক মানুষদের। আমি তা দেখে একটি গাছের পিছনে লুকিয়ে পড়ি। সুযোগ পাওয়া মাত্র আমি সেখানে থেকে পালিয়ে যাই। এটাই ছিল আল্লাহর সন্ধানে বের হওয়ার সূচনা। তখন আমি তারসুস থেকে বের হয়ে মরুভূমির পথ ধরি।⁷
******
আব্দুল্লাহ ইবনু ফারাজ রহিমাহুল্লাহ বলেন, বাসায় টুকিটাকি মেরামত কাজের জন্য একবার তার একজন মেরামতকারীর প্রয়োজন পড়ে। যাকে দিয়ে তিনি সারাদিন কাজ করিয়ে মজুরি দিবেন। এমন লোক খুঁজতে তিনি বাজারে যান। সেখানে তিনি মলিন মুখ ওয়ালা একজন বালককে দেখতে পান। সে পশমি পোশাক পড়ে ছিল। তার কুর্তা কোমরের সাথে পশমের বেল্ট দিয়ে বাঁধা ছিল। তার হাতে ছিল বড় একটি বালতি আর ছিল একটি দড়ি। আব্দুল্লাহ তাকে কাজের প্রস্তাব দেন। বালক রাজি হয় এবং বলে তাকে এক দিরহাম এবং এক দানিক (১/৬ দিরহাম) মজুরি দিতে হবে। সাথে সে এও বলে সারা দিন সে কাজ করবে তবে যোহরের সালাত পড়ার জন্য যোহরের আযানের এবং আসরের জন্য আসরের আযানের পর সে কোনো কাজ করতে পারবে না।
আব্দুল্লাহ তার শর্ত মেনে নেন এবং তাকে বাসায় এনে সকল কাজ বুঝিয়ে দেন। বালক একনাগাড়ে কাজ করতে লাগলো, মাঝে কোনো বিরতি নিলো না। যোহরের আযান হলে সে আব্দুল্লাহকে তার শর্তের কথা মনে করিয়ে দিল এবং সালাতের জন্য বের হয়ে গেল। সালাত শেষে সে ফিরে এসে আসরের আযান পর্যন্ত বিনা বিরতিতে কাজ করল। আসরের সালাতের পর সূর্যাস্ত পর্যন্ত সে কাজ করল। তারপর দিনের মজুরি নিয়ে সে চলে গেল।
কয়দিন পর আব্দুল্লাহর আরো কিছু মেরামতের প্রয়োজন পড়ে। তার স্ত্রী তাকে বলেন আগের বালকের মতই কাউকে যেন খুঁজে আনে, কেননা সে কাজে ছিল খুব দক্ষ, আর আচরণে ছিল সত্যবাদী। আব্দুল্লাহ আবার বাজারে যান, কিন্তু তাকে খুঁজে পাননি। তিনি বালক সম্পর্কে খোঁজখবর নিয়ে জানতে পারেন, বালক শনিবার ব্যতীত অন্য কোনো দিন কাজ করে না। আব্দুল্লাহ শনিবার পর্যন্ত অপেক্ষা করেন, এবং শনিবারে তাকে খুঁজে পেয়ে কাজের প্রস্তাব দেন। সে আগের শর্তে কাজ করতে রাজি হয়। সারাদিন কাজের পর আব্দুল্লাহ তাকে নির্ধারিত মজুরি থেকে কিছু অতিরিক্ত টাকা নেয়ার জন্য প্রস্তাব করেন। এতে সে নাখোশ হয়, এবং আব্দুল্লাহর বাসা থেকে দ্রুত বের হয়ে যায়। আব্দুল্লাহ তার পিছনে দৌড়ে আসেন, আর তাকে কমপক্ষে তার নির্ধারিত টাকা নিতে অনুরোধ করেন। তখন সে নির্ধারিত টাকা নিয়ে চলে যায়।
কিছু দিন পরে আব্দুল্লাহর আরো কিছু মেরামতের প্রয়োজন দেখা দেয়। তাই আব্দুল্লাহ অপেক্ষা করেন এবং শনিবারে বাজারে যান। কিন্তু সেখানে তাকে খুঁজে পাননি। কেউ একজন তাকে ঐ বালকের কথা জানায়। সে কয়েক দিন ধরে অসুস্থ আছে। আব্দুল্লাহ তার বাসার ঠিকানা নিয়ে তাকে দেখতে যান। সে একজন বৃদ্ধার বাসায় থাকে। তিনি বাসায় গিয়ে দেখেন সে ইটের উপর মাথা রেখে ঘুমাচ্ছে। 'তোমার কী কিছু লাগবে?' আব্দুল্লাহ বালককে জিজ্ঞেস করেন।
'হ্যাঁ, যদি আপনি পারেন।'- বালক জবাব দেয়।
আব্দুল্লাহ বলেন, তিনি করবেন।
'যখন আমি মরে যাব,' সে বলতে লাগলো, 'আমার দড়ি বিক্রি করে দিবেন, আমার কোর্তা এবং বেল্ট ধুয়ে পরিষ্কার করে নিবেন এবং তা পড়িয়ে আমাকে কবর দিবেন। আমার কোর্তার ভিতরের পকেটে দেখবেন, সেখানে একটি আংটি আছে। তা নিজের কাছে রেখে অপেক্ষা করবেন। যখন হারুন-আল-রশিদ (তৎকালীন খলিফা) শহরে আসবেন। তখন আপনি তার কাছে গিয়ে ঐ আংটিটি দেখাবেন। মনে রাখবেন আমাকে দাফনের পরেই তাকে আংটি দেখাবেন।' আব্দুল্লাহ তার কথা মেনে নিলেন।
যুবকের মৃত্যু হলে আব্দুল্লাহ তার অন্তিম ইচ্ছা বাস্তবায়ন করলেন। খলিফা হারুনুর রশিদ যখন শহরে এলেন, আব্দুল্লাহ সাক্ষাতের জন্য তার কাছে যান। এমন স্থানে তিনি দাঁড়ান যেখান থেকে খলিফা তাকে দেখতে পারবেন। সেখানে গিয়ে তিনি আংটিটি বাতাসে নাড়ান। হারুন তাকে দেখতে পান, এবং তাকে কাছে ডাকেন। হারুন উপস্থিত সকলকে বেরিয়ে যেতে বলেন। আব্দুল্লাহকে জিজ্ঞেস করেন, সে কে এবং আংটিটি তিনি কোথায় পেলেন। আব্দুল্লাহ তাকে জবাব দেন। আব্দুল্লাহ তাকে বালকের পুরো দাস্তান শুনান। বালকের কাহিনি শুনার সময় খলিফা হারুন প্রচণ্ড কাঁদেন। এত বেশি কান্না করেন যে আব্দুল্লাহ নিজেকে অপরাধী মনে করছিলেন। খলিফাকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, 'হে বিশ্বাসীদের নেতা! ঐ বালকের সাথে আপনার কী সম্পর্ক আছে?'
খলিফা বললেন, 'সে ছিল আমার পুত্র!'
'সে কেন এমনভাবে জীবন যাপন করছিল?'
'আমি খলিফার পদে আসিন হবার পূর্বে তার জন্ম হয়, খুব সুন্দরভাবে তার প্রতিপালন হয়, কুর'আন এবং বিজ্ঞানে সে বেশ শিক্ষিত ছিল। যখন আমাকে খলিফা মনোনীত করা হয়, তখন সে আমাকে ছেড়ে চলে যায় এবং দুনিয়াবী জিনিস থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। সে তার মায়ের খুব আদরের সন্তান ছিল, তাই তাকে দেয়ার জন্য আমি তার মা-কে এই মহামূল্যবান আংটি দিই। অনিচ্ছার সাথে সে আংটিটি গ্রহণ করে। তার মায়ের মৃত্যুর পর আপনিই প্রথম ব্যক্তি, যে তার সম্পর্কে আমাকে খোঁজ জানাচ্ছেন। আপনি আজ রাতে আমাকে তার কবর জিয়ারতে নিয়ে যাবেন।'
আব্দুল্লাহ খলিফা হারুনকে সন্তানের কবর জিয়ারতে নিয়ে যায়। হারুন দীর্ঘক্ষণ সেখানে কান্না করেন, কবরের পাশে দাঁড়িয়ে অশ্রু ঝড়ান। ভোর পর্যন্ত তিনি সেখানে অবস্থান করেন। হারুন আব্দুল্লাহকে কিছুদিন তার সাথে থাকতে অনুরোধ করেন যাতে তিনি রাতে কবর জিয়ারত করতে পারেন। আব্দুল্লাহ আগে জানত না যে সে মেরামতকারী বালক ছিল খলিফা হারুনের পুত্র। সেদিনই তিনি প্রথম এটা জানতে পারেন।⁸

টিকাঃ
¹মুয়াকিফ মুশরিকাহ ফি হায়াতিস সালাফ : ১৫।
²সুরা হাদিদ: ১৬।
³মুয়াকিফ মুশরিকাহ ফি হায়াতিস সালাফ : ২৪।
⁴মুয়াকিফ মুশরিকাহ ফি হায়াতিস সালাফ : ৪৯।
⁵কিতাবুত তাইবিন মিনাল মুবুক ওয়াস সালাতিন: ১৪১
⁶কিতাবুত তাইবিন মিনাল মুবুক ওয়াস সালাতিন: ২২।
⁷কিতাবুত তাইবিন মিনাল মুবুক ওয়াস সালাতিন : ২৯।
⁸কিতাবুত তাইবিন মিনাল মুবুক ওয়াস সালাতিন: ৩৭।

📘 যেভাবে স্ত্রীর হৃদয় জয় করবেন > 📄 সাহাবাগণ আল্লাহকে যেমন ভয় পেতেন

📄 সাহাবাগণ আল্লাহকে যেমন ভয় পেতেন


আবু ইমরান আল-জুনি রহিমাহুল্লাহ বলেন, আবু বকর আস-সিদ্দিক রাযিয়াল্লাহু আনহু প্রায়শ বলতেন, 'যদি আমি একজন মু'মিনের একটি পশম হতাম!'¹
হাসান রহিমাহুল্লাহ বলেন, আবু বকর আস-সিদ্দিক রাযিয়াল্লাহু আনহু প্রায়শ বলতেন, 'আমি যদি শুধুমাত্র একটি ঘাস হতাম, যা কেটে ফেলা হয়েছে এবং খেয়ে ফেলা হয়েছে।' ²
আব্দুল্লাহ ইবনু উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলতেন, 'ফুরাত নদীর তীরে যদি একটি ছাগল মারা যায়, আমার ভয় হয় হয়তো এজন্যও আমাকে পাকড়াও করা হবে।' ³
আব্দুল্লাহ ইবনু আমির বলেন, তিনি একবার দেখেন উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু কিছু ঘাসের টুকরো হাতে নিয়ে বলছেন, 'আমি যদি শুধু এই ঘাসের টুকরো হতাম; যদি আমাকে সৃষ্টি করাই না হত; যদি আমার মা আমাকে জন্মই না দিত; যদি আমি ধ্বংস হয়ে যেতাম এবং আমার অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যেত।' ⁴
আব্দুল্লাহ ইবনু ঈসা রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, উমার রাযিয়াল্লাহু আনহুর অধিক ক্রন্ধনের কারণে তাঁর মুখমণ্ডলে দুটি কালো দাগ হয়ে যায়। ⁵
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু আরো বলতেন, 'যদি কেউ ঘোষণা করে, যে একজন ব্যতীত সকল মানুষ জান্নাতে যাবে, তাহলে আমি ভয় পেতাম এটা ভেবে হয়তো আমিই সেই একজন।'⁶
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু যখন আঘাত প্রাপ্ত হয়ে শয্যাশায়ী হন তখন আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে বলেন, 'ইয়া আমিরুল মু'মিনিন! আপনি তখন ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন, যখন অন্যরা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল; আপনি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে সংগ্রাম করেন ও কষ্ট শিকার করেন যখন অন্যরা তাকে পরিত্যাগ করেছিল; রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মৃত্যুর সময় আপনার প্রতি সন্তুষ্ট ছিলেন; কোনো দ্বিতীয় জন আপনার সাথে দ্বিমত পোষণ করে না, আর এখন আপনি একজন শহীদ হিসেবে মৃত্যু বরণ করতে যাচ্ছেন।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু জবাবে বলেন, 'অভিভূত হোক সে, যার তুমি তোষামোদি করছ। আল্লাহর শপথ! যদি দুনিয়ার সকল কিছু আমার কাছে থাকতো তাহলে আমি আমার আসন্ন সময়ের জন্য সব কিছু দিয়ে দিতাম।⁷
আবু মাইসারা রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত হয়েছে, যখন তিনি বিছানায় যেতেন তখন তিনি বলতেন, 'যদি আমার মা আমাকে জন্ম না দিত।' তাঁর স্ত্রী একবার জিজ্ঞেস করেন, আল্লাহ তাকে হেদায়াত দিয়ে ইসলামে প্রবেশ করিয়েছেন তাও কেন তিনি এমন কথা বলেন। তিনি তখন বলেন, 'হ্যাঁ এটা সত্য। কিন্তু তিনি এও বলেছেন, পরে আমরা ফিরে আসি বা না আসি তিনি প্রথমে আমাদের আগুনে প্রবেশ করাবেন।⁸
আব্দুল্লাহ ইবনু মাসউদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, 'যে কুর'আন হিফজ করেছে তাঁর উচিত হল ঐ রাতগুলো চিনে রাখা, যে রাতে সবাই ঘুমিয়ে থাকে; ঐ দিনগুলো চিনে রাখা, যে দিনে মানুষরা রোজা রাখে না; তাঁর দুঃখ ও অতৃপ্ততা, যখন সবাই তৃপ্ত থাকে; তাঁর কান্নায় যখন মানুষ হাঁসতে থাকে; তাঁর নিরবতা, যখন মানুষ কথা বলতে থাকে এবং তাঁর বিনয়তা, যখন সবাই অহংবোধ করে-এই সময় গুলো চিনে রাখা'
'একজন কুর'আন বহনকারীর উচিত উদ্বিগ্ন না থাকা, সহনশীল হওয়া, স্থির ও শান্ত থাকা, ক্ষমাশীল হওয়া। সে অমার্জিত হবে না, অন্যমনস্ক থাকবে না, না উচু আওয়াজে কথা বলবে, না জটিল প্রকৃতির লোক হবে।' ⁹
ইবনু আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহুকে আল্লাহকে ভয়কারী তাকওয়াবানদের সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হয়, তিনি বলেন, 'তাদের অন্তর আল্লাহর ভয়ে পরিপূর্ণ থাকে; তাদের চোখ ক্রন্দন করতে থাকে; এবং তারা বলে, 'কিভাবে আমরা পরিতৃপ্ত ও বেফিকির থাকতে পারি, যখন আমাদের পিছনে মৃত্যু অগ্রসর হচ্ছে, আর আমাদের সামনে কবর অবস্থান করছে; আমাদেরকে বিচার দিবসের প্রতিশ্রুতি দিয়ে দেয়া হয়েছে; জাহান্নাম আমাদের পথে রয়েছে, আর আল্লাহর সামনে আমাদের দন্ডায়মান হতে হবে?' ¹⁰
মাশরুক রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আব্দুল্লাহ ইবনু মাসউদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর সাথে এক লোক ছিল, তিনি বলেন, 'আমি ডান দিকের দলের অন্তর্ভুক্ত হতে চাই না, আমি নৈকট্যপ্রাপ্ত দলের অন্তর্ভুক্ত হতে চাই।' আব্দুল্লাহ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, 'এখানে এমন একজন মানুষ আছে যে পুনরুত্থিত হতে চায় না।' ¹¹
হারিস ইবনু সুয়াইদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, 'আমি নিজের সম্পর্কে যা জানি তা যদি তোমরা জানতে তাহলে আমাকে ডাস্টবিনে নিক্ষেপ করতে।' ¹²
একবার আব্দুল্লাহ ইবনু রাওয়াহ রাযিয়াল্লাহু আনহু তাঁর স্ত্রীর সামনে কান্না করছিলেন, তা দেখে স্ত্রীও কান্না করলেন। স্ত্রীকে কাঁদতে দেখে তিনি জিজ্ঞেস করেন, 'তুমি কাঁদছ কেন?' স্ত্রী বলেন, 'আপনি কাঁদছেন তাই আমিও কাঁদছি।' তিনি তখন তাঁর কান্নার কারণ বলেন। তিনি বলেন, আল্লাহ তাকে জাহান্নামে প্রবেশ করাবেন এই ঘোষণা দিয়েছেন, কিন্তু তাকে পরে বের করার ঘোষণা দেননি, এই ভয়ে তিনি কাঁদছেন।¹³
সাওর ইবনু যায়েদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, যখন মুয়াজ ইবনু জাবাল রাযিয়াল্লাহু আনহু তাহাজ্জুদ সালাত পড়তেন তখন তিনি বলতেন, 'হে আল্লাহ! চক্ষুগুলো ঘুমিয়ে পড়েছে; আকাশের তারাগুলো বিলীন হয়ে যাচ্ছে, শুধুমাত্র আপনি হলেন সর্বদা জাগ্রত ও প্রতিপালক! হে পরওয়ারদেগার! আমার জান্নাতের তালাশ খুবই অপ্রতুল, এবং জাহান্নাম থেকে জান্নাতের দিকে আমার যাত্রা অনেক দুর্বল। হে আল্লাহ! আপনার অফুরন্ত রহমতের মধ্য থেকে আমাকেও রহমত দান করুণ, পথপ্রদর্শন করুন। নিশ্চয় আপনি অঙ্গীকার রক্ষাকারী।' ¹⁴
কাসিম ইবনু বাযযাহ রহিমাহুল্লাহ বলেন, ইবনু উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর তিলাওয়াত শুনেছেন এমন একজন লোক আমাকে বলেছেন, যখন ইবনু উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সুরা মুতাফফিফিন তিলাওয়াতের সময় ৬ নং আয়াতে '... যেদিন মানুষ বিশ্বজগতের প্রতিপালকের সামনে দাঁড়াবে' পৌঁছতেন, তখন তিনি ফুঁপিয়ে উঠতেন এবং এত বেশি কাঁদতেন যে, তিনি আর সামনের আয়াত তিলাওয়াত করতে পারতেন না। ¹⁵
সামির আর-রায়াহী রহিমাহুল্লাহ তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন, একবার ইবনু উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু খানিক ঠান্ডা পানি পান করেন, এবং সাথে সাথে কাঁদতে লাগলেন। 'আপনি কেন এত কাঁদছেন?' তাকে জিজ্ঞেস করা হল। তিনি বলেন, 'কুর'আনের একটি আয়াতের কথা আমার মনে পড়েছে, "এদের এবং এদের কামনার মধ্যে অন্তরাল সৃষ্টি করা হয়েছে।” ¹⁶
আর তখন আমি ভাবলাম জাহান্নামবাসীদের নিকট পানিই হল একমাত্র কামনা। তারা বলে, "আমাদের উপর কিছু পানি ঢেলে দাও অথবা আল্লাহ প্রদত্ত তোমাদের জীবিকা হতে কিছু প্রদান করো।” ¹⁷
নাফিঈ রহিমাহুল্লাহ বলেন, 'ইবনু উমর যখন এই আয়াত পাঠ করতেন- "যারা ঈমান এনেছে, তাদের হৃদয় কি আল্লাহর স্মরণে এবং যে সত্য নাযিল হয়েছে তার কারণে বিগলিত হওয়ার সময় হয়নি?”¹⁸ তখন এত বেশি কাঁদতেন যে, কান্না তাকে পরাস্ত করত।'¹⁹
আব্দুর রহমান ইবনু আবি লায়লা রাযিয়াল্লাহু আনহু আবু যর রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণনা করেন, “আল্লাহর শপথ! যদি তুমি জানতে আমি যা জানি তাহলে তুমি স্ত্রীর মাঝে কোনো আনন্দ পেতে না, বিছানায় বিশ্রাম নিতে পারতে না। আল্লাহর কসম! আমি কামনা করি আল্লাহ যদি আমাকে একটি গাছ বানাতেন, এমন গাছ যার ফল খেয়ে ফেলা হয়ছে।” ²⁰
আসাদ ইবনু ওয়াদাহ রহিমাহুল্লাহ বলেন, শাহাদাদ ইবনু আউস রাযিয়াল্লাহু আনহু বিছানায় শুয়ে কাত বদল করতেন, কিন্তু ঘুম আসতো না, আর বলতেন, 'হে আল্লাহ! আগুন আমাকে ঘুমাতে দিচ্ছে না।' অতঃপর তিনি উঠে টানা ফজর পর্যন্ত সালাতে নিমগ্ন থাকতেন।²¹
মুজাহিদ রহিমাহুল্লাহ বলেন, ইবনু যুবাইর রাযিয়াল্লাহু আনহু সালাতে এমনভাবে দাঁড়াতেন যে, মনে হতো কোনো লাঠি মাটিতে গেঁথে রাখা হয়েছে। ²²
বকর ইবনু মুযাম রহিমাহুল্লাহ বলেন, যে একবার আবু মুসা আশ'আরি রাযিয়াল্লাহু আনহু বসরায় খুতবা দেন এবং খুতবাতে জাহান্নামের আলোচনা করেন। তখন তিনি এত বেশি কাঁদলেন যে, তার অশ্রুগুলো টপটপ করে মিম্বারের উপর পড়ছিল। সেদিন উপস্থিত সকলেও কেঁদেছিল। ²³
ইমরান ইবনু হুশাম রাযিয়াল্লাহু আনহু প্রায়শ বলতেন, 'আমি যদি কিছু ধুলোবালি হতাম, যা বাতাস উড়িয়ে নিয়ে যায়।' ²⁴
আলি রাযিয়াল্লাহু আনহু আল্লাহর রাসুলের সাহাবাদের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, 'আল্লাহর শপথ, আমি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথিদের দেখেছি, তাদের মত সুন্দর চরিত্রের ব্যক্তি বর্তমানে দেখতে পাই না। তারা এমনভাবে ঘুম থেকে উঠতেন, যেন মনে হত সারারাত তারা রাখালি করে ছাগল চরিয়েছে, তাদের পোশাক এবং চুলগুলো থাকতো এলোমেলো। তারা রাত কাটাতেন রুকু সিজদায়, কুর'আন তিলাওয়াত করে। এবং যখন তারা সকালে জাগ্রত হতেন, তারা আল্লাহকে স্মরণ করতেন এবং এমনভাবে অবস্থান করতেন, মনে হত তারা যেন একটি বৃক্ষ যার ডাল-পালা বাতাসে দুলছে, এবং তাদের চক্ষু হতে এত বেশি অশ্রু ঝরত যে, তাদের পোশাক ভিজে যেত। আর এখন! এখন মানুষ নিশ্চিন্তে ঘুমাতে যায়, ঘুমাতে যায় সম্পূর্ণ অবচেতন ও বেফিকির অবস্থায়।²⁵
হাসান আল-বসরি রহিমাহুল্লাহ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবীদের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, 'তাদের সহনশীলতা এত মাত্রায় ছিল যে জাহিলদের সকল চক্রান্ত তারা বিচক্ষণতার সাথে মোকাবিলা করতেন, এভাবে তারা দিন কাটাতেন। আর রাত কাটাতেন এমন অবস্থায় যে, তাদের চোখ অশ্রু ঝরাতে ঝরাতে দাড়ি ভিজিয়ে দিত, আর তাদের পা দাঁড়িয়ে থাকতো মুসল্লায়, শুধুমাত্র এই আশায় যে, আল্লাহ তাদের ক্ষমা করে দিবেন।
সা'দ ইবনু আল-আহযাম রহিমাহুল্লাহ বলেন, তিনি ইবনে মাসউদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর সাথে ছিলেন, তারা লৌহ ও ইস্পাত শিল্পের দোকানের সামনে দিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন একজন কারিগর চুল্লী থেকে গলিত লোহা বের করছিল। ইবনু মাসউদ রাযিয়াল্লাহু আনহু স্থির দৃষ্টিতে সেখানে তাকান এবং কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন।²⁶
হাসান আল-বসরি রহিমাহুল্লাহ সাহাবাদের বর্ণনা দেন এভাবে- 'আমি এক দল মানুষের সাহচর্য পেয়েছি এবং তাদের প্রত্যক্ষ করেছি, যারা দুনিয়ার কোনো কিছুর গুরুত্ব দিতেন না, তাতে আনন্দ পেতেন না, দুনিয়াবি কিছু না পেলে সেজন্য আফসোসও করতেন না। এমনকি দুনিয়া তাদের নিকট হাঁটার সময় পায়ে মাড়ানো ধুলিবালির তুলনায়ও নিম্নতর ছিল। তারা কাপড় পড়তেন অতি সাধারণ মানের। তারা তাদের জন্য স্ত্রীদের কিছু রান্না করতেও বলতেন না। আমি তাদের কুর'আনের উপর এবং রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সিরাতের উপর চলতে দেখেছি। যখন রাত গভীর হতো, তারা বিছানা থেকে পৃথক হয়ে যেতেন এবং মুসল্লায় দাঁড়িয়ে যেতেন, আর প্রভুর কাছে অশ্রু ঝরাতেন। তারা আল্লাহর কাছে উত্তম প্রতিদান চাইতেন...।²⁷
যদি তারা কোনো উত্তম কাজ করতেন, তখন তারা খুশি হতেন এবং আল্লাহর প্রশংসা করতেন, কবুল করার দু'আ করতেন। আর যদি তাদের দ্বারা কোনো ভুল হয়ে যেত তখন তারা দুঃখ পেতেন, এবং আল্লাহর নিকট ক্ষমার দু'আ করতেন। আল্লাহর কসম! তারা এভাবেই সারাজীবন অতিবাহিত করেন।'²⁸
মুয়ায ইবনু আন রহিমাহুল্লাহ বলেন, তিনি জুবানের পথ দিয়ে যাচ্ছিলেন এবং রিয়াহ আল কায়েশি রাযিয়াল্লাহু আনহুকে ঐ পথ অতিক্রম করতে দেখতে পান। যখন রাস্তা ফাঁকা ছিল তখন তিনি শুনতে পান, রিয়াহ রাযিয়াল্লাহু আনহু অত্যাধিক কান্না করছেন এবং বলছেন, 'হে দিন ও রাত্রি, আর কত দিন ধরে তোমরা আমার জন্য আসতে থাকবে? আমি জানি না এর অর্থ কী। আমরা আল্লাহর জন্য, আমরা আল্লাহর জন্য।' তিনি একই কথা বার বার আবৃত্ত করছিলেন, এক সময় তিনি অদৃশ্য হয়ে যান।
ফুরাত ইবনু সুলাইমান রহিমাহুল্লাহ বলেন হাসান রহিমাহুল্লাহ বলতেন, 'ইমানদার হলো এমন এক জাতি, যারা আচরণে এত বেশি বিনম্র যে, জাহিলরা তাদের অসুস্থ মনে করে। আল্লাহর শপথ, তারা হল অনুভূতি সম্পন্ন একটি জাতি। তোমরা কী দেখনি, আল্লাহ বলেছেন- আর তারা বলবে, 'সকল প্রশংসা আল্লাহর, যিনি আমাদের দুঃখ-কষ্ট দূর করে দিয়েছেন। নিশ্চয় আমাদের রব পরম ক্ষমাশীল, মহাগুণগ্রাহী।'²⁹
আল্লাহর শপথ, দুনিয়ার অধিকাংশ দুঃখ কষ্ট তাদের নিবিষ্ট করে রেখেছে, কিন্তু তারা কখনো অন্যদের দুঃখ দেন না। তারা দুঃখ কষ্ট গ্রহণ করেছেন কেবল মাত্র এই কারণে যে, তারা আল্লাহকে অত্যাধিক ভয় করেন।³⁰
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এক ব্যক্তিকে তাহাজ্জুদে সূরা ত্বরের ৭-৮ নং আয়াত- 'নিশ্চয় তোমার রবের আযাব অবশ্যম্ভাবী। যার কোন প্রতিরোধকারী নেই'-তিলাওয়াত করতে শুনতে পান। তখন তিনি বলেন, 'নিশ্চয় আল্লাহর সত্য প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন,' অতঃপর তিনি বাসায় আসেন এবং অসুস্থ হয়ে পড়েন। প্রায় এক মাস তিনি অসুস্থ থাকেন। মানুষরা তাকে দেখতে আসত, কিন্তু তার অসুস্থতা কী তা জানত না।³¹
কেউ বলেছেন, 'দুঃখ মানুষকে খাদ্য গ্রহণ থেকে পৃথক রাখে, আর আল্লাহর ভয় মানুষকে গুনাহ থেকে পৃথক রাখে।³²
সাদিক ইবনু ইবরাহিম রহিমাহুল্লাহ বলেন, 'দুঃখ এবং ভয় এর চেয়ে উত্তম আর কোনো সঙ্গি হতে পারে না। দুঃখ হবে অতীত পাপের জন্য আর ভয় থাকবে ভবিষ্যতে পাপ না করার জন্য।'
আমির ইবনু কায়েস রহিমাহুল্লাহ বলেন, 'পরকালে সবচে বেশি ঐ লোক খুশী হবে, যে দুনিয়াতে পরকাল নিয়ে সবচে' বেশি সতর্ক থাকতো। পরকালে ঐ লোক সবচে' বেশি হাঁসবে, যে দুনিয়াতে আল্লাহকে সবচে' বেশি ভয় পেত।³³

টিকাঃ
¹সিফাতুস সাফওয়া: ১/২৫১。
²সিফাতুস সাফওয়া: ১/২৫১。
³সিফাতুস সাফওয়া: ১/২৭৫; এছাড়াও এটা হিলইয়াতুল আউলিয়াতে উল্লেখ রয়েছে।
⁴সিফাতুস সাফওয়া: ১/২৭৫。
⁵সিফাতুস সাফওয়া: ১/২৭৫。
⁶তাখওয়িফ: ১৩。
⁷তাম্বিহুল গাফিলিনি: ২/৪১৮。
⁸তিনি সুরা মারিয়ামের ৭১-৭২ নং আয়াতের দিকে উদ্দেশ্য করেছেন। আল্লাহ এই আয়াতে বলেন, “এবং তোমাদের প্রত্যেকেই ওটা অতিক্রম করবে; ওটা তোমার রবের অনিবার্য সিদ্ধান্ত। পরে আমি মুত্তাকীদেরকে উদ্ধার করব এবং যালিমদের সেখানে নতজানু অবস্থায় রেখে দিব।"
⁹তাম্বিহুল গাফিলিনি: ২/৬১৮。
¹⁰ইহইয়াউ উলুমুদ্দিন : ৪/১৮১。
¹¹সিফাতুস সাফওয়া: ১/৪০৫। (অর্থাৎ আল্লাহর ভয় তাঁর মধ্যে অনেক ছিল, তাই আল্লাহর সম্মুখীন হতে তিনি ভয় পাচ্ছিলেন)।
¹²সিফাতুস সাফওয়া: ১/৪০৫。
¹³হিলইয়াতুল আউলিয়া: ১/১১৮; সিফাতুস সাফওয়া: ১/৪৮৩。
¹⁴সিফাতুস সাফওয়া: ১/৪৯২。
¹⁵সিফাতুস সাফওয়া: ১/৪৯২。
¹⁶সুরা সাবা: ৫৪。
¹⁷সুরা আরাফ: ৫০。
¹⁸সুরা হাদিদ: ১৬。
¹⁹সিফাতুস সাফওয়া: ১/৪৯২。
²⁰সিফাতুস সাফওয়া: ১/৫৯৫。
²¹সিফাতুস সাফওয়া: ১/৭০৯。
²²সিফাতুস সাফওয়া: ১/৭৬৫。
²³তাখওয়িফ: ৩২。
²⁴মিনহাযুস সালিকিন: ৩২৬。
²⁵ইহইয়াউ উলুমুদ্দিন: ৪/১৮০。
²⁶তাখওয়িফ。
²⁷মুসান্নাফে আবু শাইবা: ১৩/৫০৬。
²⁸ইহইয়াউ উলুমুদ্দিন: ৪/৩৯৬; মুসান্নাফে আবু শাইবা: ১৩/৫০৬。
²⁹সুরা ফাতির : ৩৪。
³⁰তাখওয়িফঃ ২০。
³¹তাখওয়িফঃ ২৯。
³²তাম্বিহুল গাফেলিন。
³³তাম্বিহুল গাফেলিন。

📘 যেভাবে স্ত্রীর হৃদয় জয় করবেন > 📄 সালাফদের মাঝে তাকওয়া চর্চা

📄 সালাফদের মাঝে তাকওয়া চর্চা


আমার প্রিয় মুসলিম ভাই! তোমাকে সালাফদের কিছু গল্প শুনাই। আল্লাহ তাদের প্রতি রহম করুন। তারা সব সময় একে অপরকে তাকওয়াবান হওয়ার উপদেশ দিতেন।¹
আবু বকর রাযিয়াল্লাহু তার খুতবাতে বলতেন, 'আমি তোমাদের উপদেশ দিচ্ছি, তাকওয়া অর্জন করার, এবং আল্লাহর প্রশংসা করার ঠিক সেভাবে, যেভাবে তিনি চান। তোমার আশা আকাঙ্ক্ষার সাথে আল্লাহর ভয়কে যুক্ত করে নাও এবং আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা কর। আল্লাহ যাকারিয়া আলাহিস সালাম এবং তার পরিবারের প্রশংসা করে বলেন-
"তারা সৎকাজে প্রতিযোগিতা করত। আর আমাকে আশা ও ভীতি সহকারে ডাকত। আর তারা ছিল আমার নিকট বিনয়ী।”²
আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু যখন মৃত্যুশয্যায় ছিলেন তখন তিনি উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে ডেকে পাঠালেন এবং আল্লাহকে ভয় করার উপদেশ দিলেন।
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তার সন্তানকে একটি পত্রে লেখেন, 'আমি তোমাকে আল্লাহকে ভয় পাওয়ার উপদেশ দিচ্ছি। যারা আল্লাহকে ভয় পায়, আল্লাহ তাদের হিফাজত করবেন তার শাস্তি থেকে। যে আল্লাহকে ঋণ দেয়, আল্লাহ অবশ্যই সেটার প্রতিদান দেন, এবং যারা তার প্রশংসা করে আল্লাহ তাকে আরো বাড়িয়ে পুরস্কৃত করেন। তাকওয়াকেই তোমার জীবনের প্রধান লক্ষ্য বানাও, এবং অন্তরকে তাকওয়া দিয়ে পরিষ্কার করে নাও।'
আলি রাযিয়াল্লাহু আনহু একজনকে লক্ষ্য করে বলেন, 'আল্লাহকে ভয় পাওয়ার উপদেশ আমি তোমাকে দিচ্ছি। তাকে ভয় পাওয়ার উপদেশ যার সাথে অবশ্যই তোমার সাক্ষাৎ হবে এবং তাকে ছাড়া তোমার আর কোনো গন্তব্য নেই। তিনিই দুনিয়া এবং আখিরাতের নিয়ন্ত্রক।
উমর ইবনু আব্দুল আজিজ রহিমাহুল্লাহ একজন ব্যক্তিকে লেখেন, আমি তোমাকে তাকওয়া অর্জনের উপদেশ দিচ্ছি। ঐ আল্লাহকে ভয় পাওয়ার উপদেশ দিচ্ছি যিনি তাকওয়া ব্যতীত কোনো কিছু গ্রহণ করেন না। তিনি তার অনুগামীদের প্রতি রহমত বর্ষণ করেন, এবং তাঁদের পুরস্কৃত করেন। অনেকে আছে যারা তাকওয়া অর্জনের দাওয়াহ দেয়, কিন্তু কেবলমাত্র কিছু লোক এতে আমল করতে পারে। আল্লাহ আমাদেরকে তাকওয়াবানদের মধ্যে শামিল করুন।
যখন উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু খলিফা নির্বাচিত হন, তখন তিনি একটি খুতবা দেন, এতে তিনি বলেন, 'আমি তোমাদের আল্লাহকে ভয় পাওয়ার এবং উত্তম কাজ করার উপদেশ দিচ্ছি, কেননা তিনি তাঁদের সাথেই থাকেন, যারা তাকে ভয় পায় এবং উত্তম কাজ করে।'
এক ব্যক্তি হজ্জের উদ্দেশ্যে বের হওয়ার সময় উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে কিছু উপদেশ চাইলেন, তিনি বলেন, 'আল্লাহকে ভয় কর, যারা তাঁকে ভয় করে তারা কখনো নিঃসঙ্গ হয় না।'
শু'বা বলেন, যখনো তিনি কোনো সফরের জন্য বের হতেন। তিনি হাকামের নিকট যেতেন, আর জিজ্ঞেস করতেন তার কিছু লাগবে কি না। তখন সে বলত, 'আমি তোমাকে ঐ শব্দে উপদেশ দিব, যে শব্দে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুয়ায রাযিয়াল্লাহু আনহুকে উপদেশ দিয়েছিলেন- 'তুমি যেখানেই থাকো না কেন, সর্বদা আল্লাহকে ভয় কর। কোনো ভুল হলে এটা তা মুছে দিবে, এবং মানুষদের সাথে সুন্দর আচরণ করবে।'
একজন সালাফ তার ভাইকে উদ্দেশ্য করে চিঠি লিখে বলেন- 'আল্লাহকে ভয় করার উপদেশ আমি তোমাকে দিচ্ছি, কেননা এটা হল সর্বোত্তম বিষয়, যা তুমি গোপন রাখতে পারো, এটা সবচে' সুন্দর বিষয়, যা প্রচার করতে পার, এটাই সর্ব মুল্যবান সম্পদ, যা তুমি সঞ্চয় করতে পার। আল্লাহ আমাদের উভয়কে এটা অর্জন করার তাওফিক দান করুন।'
আরেকজন সালাফ তার ভাইকে লিখেন-'আমি তোমাকে এবং আমাকে তাকওয়া অর্জনের নসিহত করছি। দুনিয়া এবং আখিরাতের জন্য এটাই হল সর্বোত্তম রিযিক। এটা দিয়ে তুমি প্রত্যেক ভালো কাজের দিকে ধাবিত হও এবং মন্দ কাজ থেকে বেঁচে থাক।'
যখন আলি রাযিয়াল্লাহু আনহু সিফফিন যুদ্ধ থেকে ফিরে আসেন, তিনি কুফা শহরের বাহিরে একটি কবরস্থানের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন তিনি বলেন-'হে তুমি, যে এমন ঘরে বসবাস করছ যা একাকীত্বের জন্য তৈরি করা হয়েছে, এবং দুনিয়া থেকে পৃথক রাখা হয়েছে! হে তুমি, যে অন্ধকার কবরে শুয়ে আছো! হে বিচ্ছিন্ন ও নিঃসঙ্গ মানুষ! তোমরা হলে আমাদের অগ্রবর্তী আর আমরা হলাম তোমাদের পিছনে অনুগামী। তোমাদের বাসা? ভালো, সেখানে এখন অন্যরা বসবাস করে। তোমাদের স্ত্রী? তারা আবার বিয়ে করেছে। তোমাদের সম্পদ? তা বণ্টিত হয়েছে। তোমাদের জন্য এই কিছু খবরই আমাদের কাছে আছে। আচ্ছা আমাদের জন্য তোমাদের কাছে কী খবর আছে? অতঃপর আলি রাযিয়াল্লাহু আনহু সৈন্যসারীর দিকে ঘুরে দাঁড়ান এবং বলেন, 'যদি তারা কথা বলার অনুমতি পেত, তাহলে তারা আমাদের জানাতো, সর্বোত্তম রসদ হল তাকওয়া। '³

টিকাঃ
¹এই অধ্যায়টি নেয়া হয়েছে Taqwa: The provision of Believers, Al-Firdous Ltd, ১৯৯৫ গ্রন্থের তৃতীয় অনুচ্ছেদ থেকে।
²সুরা আম্বিয়া: ৯০।
³নাহযুল বালাগাহ: ১২৬১

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00