📄 পরিণাম
এই মেসেজের শেষে আমি আপনাদের কাছে কিছু নসিহত করতে চাই। যদি আপনারা তা মানেন তাহলে ইনশা আল্লাহ আপনাদের দাম্পত্যজীবন হবে প্রেম ও আনন্দময়।
১. ধর্ম হল কল্যানকামনা।
২. বিশ্বাসীদের মধ্যে সবচে' উত্তম হল সে, যার আখলাক সুন্দর। আর তোমাদের মধ্যে সবচে' উত্তম হল সে, যে তার স্ত্রীদের মাঝে উত্তম।
৩. কৃপণতা থেকে সাবধান থাকুন।
৪. পুণ্য লাভের আশায় স্ত্রীদের জন্য যা খরচ করবেন তা সাদাকা হিসেবে লিপিবদ্ধ হবে।
৫. দাম্পত্যজীবনে সমস্যার কথা কাউকে জানানো উচিত নয়।
৬. স্ত্রীর আত্মীয়দের সাথে খারাপ ভাষা ব্যবহার করবেন না।
৭. স্ত্রীকে অপমান করবেন না।
৮. স্ত্রীর সামনে সবসময় হাঁসার চেষ্টা করুন।
৯. পরস্পরকে ভালোবাসুন, এবং শান্ত থাকুন।
১০. ইসলামিক নিয়ম অনুসারে সন্তানদের শিক্ষা দিন।
১১. বাজার, শপিং মলে যাওয়া কমিয়ে দিন।
১২. ছবি সম্বলিত কাপড় পরিধান করবেন না।
১৩. সন্তানদের জন্য অশালীন পোশাক কিনবেন না।
১৪. বাসায় পরিবার নিয়ে একটি তালিমের ব্যবস্থা করুন।
১৫. স্ত্রী এবং সন্তানদের সাথে সৎ থাকুন।
১৬. কারণ ছাড়া স্ত্রীকে মারবেন না।
১৭. স্ত্রীর জন্য নিজেকে সাজান।
📄 উত্তমের জন্য উত্তম ব্যতীত কি পুরস্কার থাকতে পারে?
আমার মুসলিম ভাই!
এমনটা নয় যে স্ত্রীর মন জয় করার জন্য স্ত্রীর উপর আপনার অধিকারগুলোকে বিসর্জন দিতে হবে, অথবা তার উপর আপনার অভিভাবকত্ব পরিত্যাগ করতে হবে। যদিও বহু মানুষ খুব শক্তভাবে স্ত্রীর উপর অভিভাবকত্বের অধিকার খাটায়, আবার অনেকে এই দায়িত্ব পালনে অবহেলা করে। উদাহরণস্বরূপ, এক ব্যক্তি গাড়ি কিনতে চাইলে, বা ফার্নিচার অথবা বাসার কালারের পরিবর্তন করতে চাইলে তার স্ত্রীর পরামর্শ নেয় এবং তার পছন্দকে গুরুত্ব দেয়। অন্যদিকে আরেকজন ব্যক্তি ঘরের নিত্য প্রয়োজনীয় বিষয়েও স্ত্রীদের মতামত নেয় না। যাইহোক, এক্ষেত্রে আমাদের অবশ্যই মধ্যমপন্থা অনুসরণ করতে হবে। আমরা সর্বক্ষেত্রে হলাম মধ্যমপন্থী উম্মাহ।
আমি দু'আ করি। হে আল্লাহ, প্রত্যেক মুসলিমের দুনিয়া ও আখিরাত সুন্দর এবং আনন্দময় করে দিন। নিশ্চয় আপনি হলেন সরল পথের পথ প্রদর্শক।
📄 প্রকাশকের পক্ষ থেকে একটি বার্তা
প্রিয় ভাইগণ! আপনারা যারা দুনিয়া ও আখিরাতে নিজের এবং পরিবারের জন্য সুখ, শান্তি ও কল্যান কামনা করেন, তাদের উচিত উম্মাহর সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষদের অনুসরণ করা। তারা হলেন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবাগণ এবং তাদের পরবর্তী সালাফগণ। রাসুলের অনুসরণে, ইসলাম দিয়ে জীবন সাজাতে এবং আল্লাহকে স্মরণে তারা ছিলেন সবচে' অগ্রগামী।
তাই গ্রন্থের শেষে আমরা সাহাবা এবং সালাফগণের কিছু প্রামাণিক স্টোরি আলোচনা করব। আশা করি এই সব গল্প থেকে আমরা শিক্ষা নিয়ে জীবনকে সুন্দর করে সাজাবো ইনশা আল্লাহ।
📄 সালাফদের কিছু শিক্ষণীয় গল্প
ইবরাহিম ইবনে আদলিয়ানি রহিমাহুল্লাহ'র নিকট এক ব্যক্তি এসে বলেন, “হে আবু ইসহাক! আমি নিজ সত্তার উপর যুলুম করেছি (অর্থাৎ পাপ করেছি)। আমাকে কিছু নসিহত করুন, যা আমাকে গুনাহ থেকে দূরে রাখবে এবং অন্তরকে প্রশান্ত করবে”। ইবরাহিম তাকে বলেন, “যদি তুমি ৫ টি কাজ করো এবং এতে দৃঢ় ও অটল থাকো, তাহলে কোনো কিছু তোমার ক্ষতি করতে পারবে না, গুনাহের আনন্দ তোমাকে ধ্বংস করতে পারবে না।
১. যদি তুমি আল্লাহর অবাধ্য হওয়ার ইচ্ছা রাখো, তাহলে আল্লাহর রিযিকের কোনো কিছু তুমি খাবে না। যে হাত তোমাকে খাবার দেয়, তুমি কী করে ঐ হাতে কামড় দিতে পারো?
২. যদি তুমি আল্লাহর অবাধ্য হতে চাও, তাহলে আল্লাহর মালিকানাধীন কোনো স্থানে তুমি বসবাস করবে না। কী করে তুমি যার খাবার খাও, যার ঘরে থাকো তার অবাধ্য হবে?
৩. তাও যদি তুমি অকৃতজ্ঞ থাকো, এবং আল্লাহর অবাধ্য হতে চাও, তাহলে এমন স্থানে অবাধ্য হও যেখানে আল্লাহ তোমায় দেখতে পাবেন না। আল্লাহ তোমায় দেখছেন এমন অবস্থায় তুমি কী করে পাপ কাজ করতে পারো?
৪. যখন মালাকুল মাউত আসবে, তখন তুমি তাকে বলবে—আমার রূহ কবজ করার পূর্বে আমাকে কিছু সময় দিন, যাতে করে আমি তাওবা করতে পারি এবং আমলে সালেহ (নেক আমল) করতে পারি। মালাকুল মাউত তোমার কথা শুনবে না, তিনি তৎক্ষণাৎ তোমার রূহ কবজ করে তোমাকে বারযাখের (কবরের) জীবনে নিয়ে যাবে। কীভাবে তুমি পালানোর আশা করো?
৫. যখন জাহান্নামের ফেরেশতা তোমাকে জাহান্নামে নিয়ে যেতে আসবে, তখন তুমি তাদের অনুসরণ করবে না, তাদের সাথে যাবে না। আচ্ছা যদি তুমি তাদের প্রতিহত করতে না পারো তাহলে কিভাবে নিজেকে বাচানোর আশা রাখো।
এসব শুনে ব্যক্তিটি বললেন, “থামো, থামো ইবরাহিম। আমি বুঝেছি, আমি এখনই তাওবা করছি।” এরপর ঐ ব্যক্তি ইবরাহিমের সাথেই রয়ে গেলেন, যতক্ষণ না মৃত্যু তাদের পৃথক করল।¹
*****
ফুযাইল ইবনে আয়াদ রহিমাহুল্লাহ হেদায়েত পাওয়ার আগে ডাকাত ছিলেন। মুসাফিরদের কাফেলায় তিনি ডাকাতি করতেন। তিনি একজন যুবতি মেয়েকে অত্যাধিক ভালোবাসতেন। এক রাত্রে তিনি ঐ যুবতির বাসার দেয়াল টপকে ভিতরে ঢুকার চেষ্টা করছিলেন, তখন তিনি একজনকে সুরা হাদিদের নিম্নোক্ত আয়াত তিলাওয়াত করতে শুনতে পান-
"যারা মুমিন, তাদের জন্যে কি আল্লাহর স্মরণে এবং যে সত্য অবর্তীর্ণ হয়েছে, তার কারণে হৃদয় বিগলিত হওয়ার সময় আসেনি?”²
এই আয়াতটি শোনে তার অন্তরে এত প্রভাব পড়ে যে, তিনি সাথে সাথে তাওবা করেন এবং সারা রাত নিকটস্থ একটি পরিত্যক্ত স্থানে কাটিয়ে দেন। কিছুক্ষণ পরে তিনি মুসাফিরদের কথার আওয়াজ শুনতে পান-“সাবধান, সাবধান! সম্ভবত ফুযাইল তোমাদের সামনে আছে। সে তোমাদের লুটে নিবে!”। ফুযাইল তখন চিৎকার করে বললেন, “ফুযাইল তাওবা করেছে!” তিনি মুসাফিরদের নিরাপদে ভ্রমণের আশ্বাস দেন। ফুযাইল ইবনে আয়াদ রহিমাহুল্লাহ পরে মুসলিম উম্মাহর একজন চেতনার বাতিঘরে পরিণত হন, তার শিক্ষাগুলো আজও জীবিত রয়েছে।³
*****
এক দুঃস্বপ্ন ইসলামের মহান মনিষী মালিক ইবনু দিনারকে তাওবার কাছে নিয়ে আসে, তার জীবন বদলে দেয়।
মালিক ইবনু দিনার রহিমাহুল্লাহকে তার ফিরে আসার কথা জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন-
আমি ছিলাম পুলিশের লোক এবং মদ্যপায়ী। আমার এক দাসী ছিল, যে আমার সাথে খুব ভালো আচরণ করতো। তার গর্ভে আমার এক মেয়ের জন্ম হয়, মেয়ের প্রতি ছিল আমার তীব্র অনুরাগ। যখন সে হাঁটতে শিখলো তখন তাঁর প্রতি আমার ভালোবাসা আরো বেড়ে যায়। আমি মদ খেতে গেলে সে এসে মদের গ্লাস ধরে টান দিত, এতে সব আমার কাপড়ের উপর গড়িয়ে পড়ত। যখন তার বয়স দুই বছর, তখন সে মারা যায়। আমি অত্যন্ত ভেঙ্গে পড়েছিলাম।
ঐ বছরের ১৫ই শা'বানের দিন ছিল শুক্রবার। আমি মাতাল অবস্থায় ঘুমিয়ে পড়লাম, জুমার সালাতও পড়িনি। ঘুমে আমি স্বপ্নে দেখলাম কিয়ামত এসে গেছে, শিংগায় ফুঁ দেয়া হয়েছে, কবরগুলোর পুনরুত্থান ঘটেছে। আরো দেখলাম মানুষদের একত্রিত করা হলো। আমিও ছিলাম তাদের মাঝে। পিছন থেকে আমি হিস হিস শব্দ শুনতে পেলাম। পিছনে ঘুরে দেখি একটি নীল-কালো রঙের বিশাল সাপ আমার দিকে তেড়ে আসছে। আমি ভয়ে আতংকে প্রাণপণে দৌড়াতে লাগলাম। দৌড়াতে দৌড়াতে আমি একজন বুড়ো মানুষকে দেখতে পেলাম। তার পরনে ছিল সুন্দর পোশাক, গায়ে সুগন্ধি। আমি তাকে সালাম দিয়ে সাহায্য চাইলাম। এতে তিনি কেঁদে ফেলেন, এবং বললেন, তিনি অনেক দুর্বল, আর সাপটি তার চাইতে অনেক বেশী শক্তিশালী। তিনি আমাকে দৌড়াতে থাকতে বললেন, এই আশায় হয়তো সামনে এমন কাউকে পাব যে আমাকে সাহায্য করতে পারবে। আমি দৌড়াচ্ছিলাম, একটা উঁচু জায়গায় পৌঁছে গেলাম। হঠাৎ করে দেখি আমি আগুনের উপত্যকার শীর্ষে বসে আছি। আগুন দেখে এতটা ভয় হচ্ছিল যে, মনে হলো আমি এই তো আগুনে পড়েই যাচ্ছি। তখন আমি একজনের আওয়াজ শুনতে পাই। কেউ চিৎকার করে বলছিল, "এখান থেকে চলে যাও, এটা তোমার স্থান নয়,” চিৎকার শুনে আমি কিছুটা সাহস ফিরে পাই। আমি দৌড়ানো বন্ধ না করে আরো দৌড়াতে লাগলাম। সাপটি তখন আমার পায়ের গোড়ালির সাথে ছিল। আমি সেই বুড়োকে আবার দেখতে পাই, তাকে আবার আমি সাহায্য করতে বলি। তিনি আগের মত করে কান্না করে বলেন, তিনি দুর্বল, সাপ তার চাইতে অনেক বেশি শক্তিশালী, তিনি কোনো সাহায্য করতে পারবেন না। এরপর তিনি আমাকে একটি পাহাড় দেখিয়ে দিয়ে বলেন, আমি সেখানে হয়তো নিজের জমানো এমন কিছু পাবো, যা আমাকে সাহায্য করতে পারবে। আমি পাহাড়টার দিকে তাকিয়ে দেখলাম, এটি ছিল বৃত্তাকার এবং পুরো পাহাড়টি তৈরি ছিল রূপা দিয়ে। পাহাড়ে ছিল অনেকগুলো ছিদ্র করা জানালা ও তাতে ঝুলছিল পর্দা। প্রতিটি জানালায় ছিল দুইটা সোনার কপাট। প্রতিটা কপাটে ছিল রেশমী পর্দা। আমি দ্রুত সেই পাহাড়ের দিকে দৌড়ে গেলাম। একজন ফেরেশতা বলে উঠলেন, "পর্দা উঠাও। কপাট খুলে দেখো। হয়তো এখানে এই দুর্দশাগ্রস্ত মানুষটির কোন সঞ্চয় আছে, যা তাকে সাহায্য করবে।” আমি তখন অনেকগুলো ছোট শিশুকে দেখতে পেলাম, যাদের চেহারা জানালার ফাঁক দিয়ে ছোট চাঁদের মত উকি দিচ্ছে। তখন তাদের একজন বলে উঠল, 'তোমাদের কি হলো? জলদি আসো, তাঁর শত্রু তাঁকে প্রায় ধরে ফেলেছে।'
তারা এগিয়ে এলো এবং তাদের জানালার ফাঁক দিয়ে উকি দিয়ে তাকালো। তাঁরা সংখ্যায় শত শত। আমি তখন আমার মৃত মেয়েটির চেহারা দেখতে পেলাম। সেও আমাকে দেখতে পেল, দেখতে পেয়ে সে কান্না করল। এবং বলল, "আল্লাহর কসম! তিনি আমার বাবা,” এরপর সে জানালা দিয়ে এত দ্রুত বেরিয়ে নূরের পুকুরে লাফ দিল, ঠিক যেন ধনুক থেকে বের হওয়া তীর। তারপর সে আমার সামনে এলো, এবং আমার দিকে তাঁর হাত বাড়ালো। আমি তাঁর হাত আঁকড়ে ধরে ঝুলে রইলাম। সে তাঁর আরেকটি হাত দিয়ে সাপটিকে তাড়িয়ে দিল। এরপর সে আমাকে বসালো। আমার কোলের উপর বসে আমার দাড়িতে হাত বুলিয়ে বললো, 'আব্বা! যারা মুমিন তাদের জন্য কি আল্লাহর স্মরণে এবং যে সত্য অবতীর্ণ হয়েছে তার কারণে হৃদয় বিগলিত হবার সময় আসেনি?'
আমি কাঁদতে শুরু করলাম। তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম সে কোথা থেকে কুরআন শিখলো। সে বললো এখানকার শিশুরা পৃথিবীতে যা জানতো তাঁর চাইতে বেশী জানে। আমি তখন আমার পিছনে আসা সাপ সম্পর্কে জানতে চাইলাম। সে জানালো, সেটি হলো আমার খারাপ আমল, যা আমাকে দোযখে নিয়ে যেত। আমি তখন সেই বুড়ো লোকটি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম। আমার মেয়ে বললো, সে হলো আমার ভালো আমল, যা এত দুর্বল যে আমাকে সাপটি থেকে রক্ষা করতে পারলো না। আমি এরপর জানতে চাইলাম, তাঁরা (শিশুরা) পাহাড়ের ভিতরে কি করছে? সে জানালো, এরা সবাই হলো মুসলিমদের মৃত সন্তান। এরা তাদের বাবা-মায়ের সাথে দেখা হবার জন্য অপেক্ষা করছে। তাঁরা কিয়ামতের দিন তাদের বাবা মায়ের জন্য শাফায়াত করবে। মালিক ইবনু দিনার বলেন, আমি আতংকে ঘুম থেকে জেগে উঠলাম। আমি আমার মদের সব বোতল ভেঙ্গে ফেললাম, আর আল্লাহর কাছে তাওবা করলাম। এই হচ্ছে আমার তাওবার কাহিনী।⁴
*****
মালিক ইবনু দিনার রহিমাহুল্লাহ'র আরেকটি ঘটনা বলি।
একবার তিনি বসরা শহরের এক গলি দিয়ে যাচ্ছিলেন, এমন সময় তিনি সেখানে এক রাজকীয় দাসীকে দেখতে পান। দাসীটি ঘোড়ায় বসে ছিল, তার পাশে ছিল কয়েকজন গোলাম। মালিক দাসীকে লক্ষ্য করে বলেন, “হে দাসী! তোমার মুনিব কী তোমাকে বিক্রি করবে?”
'এই বৃদ্ধ মানুষ আমাকে কিনবে?' সে বলল।
'তোমার মুনিব কি তোমাকে বিক্রি করবে?' মালিক আবারো জিজ্ঞেস করলেন।
'যদি তিনি করেন, আমাকে কেনার মত আপনার সামর্থ্য আছে?' মেয়েটির জবাব।
'অবশ্যই আছে! তোমার চাইতে ভালোকে কেনার মত আমার সামর্থ্য আছে।'
সে হাসলো, এবং তার সেবককে বলল, মালিক ইবনু দিনারকে তার বাসায় নিয়ে আসতে। প্রাসাদে এসে দাসী তার মুনিবকে সব কথা জানালো, শুনে তিনিও হাসলেন, এবং মালিককে দেখতে চাইলেন। মালিককে তার সামনে আনা হল, মালিককে দেখেই মুনিব তার প্রতি কিছুটা প্রভাবিত হলেন।
'তুমি কী চাও?' মুনিব মালিককে জিজ্ঞেস করলেন।
'আপনার দাসীকে আমি কিনতে চাই,' মালিক জানালো।
'তাকে কেনার মত তোমার সামর্থ্য আছে কি?'
'সে আমার নিকট নষ্ট হয়ে যাওয়া দুটি খেজুরের বিচির চেয়ে অধিক মূল্যবান নয়।'
রুমে উপস্থিতি সকলে মালিকের এমন কথায় হেসে ফেটে পড়ল।
'কিভাবে তার মূল্য এত কম হতে পারে!' মালিককে ব্যঙ্গ করে সকলে এমন প্রশ্ন করল।
মালিক বললেন, 'কারণ তার মধ্যে অনেক ত্রুটি রয়েছে, তাই তার মূল্য অনেক কম।'
'কী রকম ত্রুটির কথা তুমি বলছ?'
'যদি সে পারফিউম ব্যবহার না করে তাহলে তার শরীর থেকে ঘামের দুর্গন্ধ আসবে।' মালিক বলতে লাগলেন—'যদি সে নিয়মিত দাঁত ব্রাশ না করে তাহলে তা নোংরা ও বিশ্রী দেখাবে। যদি সে চুলের পরিচর্যা না করে তাহলে তা উষ্কখুষ্ক হয়ে যাবে। যদি সে আরো কিছু বছর বেঁচে থাকে তাহলে সে বৃদ্ধা মানুষে পরিণত হবে, এতে তার ত্বকে ভাঁজ এসে যাবে। তার রক্তস্রাব হয়, সে মূত্রত্যাগ করে, তার রয়েছে আরো অনেক ত্রুটি।
সম্ভবত, সে শুধু নিজ স্বার্থে আপনাকে পছন্দ করে। হয়তো সে আপনার প্রতি বিশ্বস্তও নয়, যদি আপনি তার পূর্বে মারা যান, তাহলে সে আপনার মত অন্য কাউকে খুঁজে নিবে এবং পছন্দ করবে।
আপনি যে মূল্য চাচ্ছেন তার চাইতে কমে আমি অনেক ভালো দাসী কিনতে পারি। আমি এমন দাসীর কথা বলছি, যাকে বানানো হয়েছে বিশুদ্ধ কপূর দিয়ে; যদি সে তার মুখের লালা লবণাক্ত ও তিতা পানিতে মিশিয়ে দেয় তাহলে তা মিষ্টি হয়ে যাবে; যদি সে কোনো মৃত ব্যক্তির সাথে কথা বলে তাহলে তার কণ্ঠের সুরে মৃত ব্যক্তিও জিন্দা হয়ে যাবে; যদি সে সূর্যের দিকে ইশারা করে, সূর্য তার আলো হারিয়ে ফেলবে; যদি সে রাতে উপস্থিত হয়, তাহলে রাত আলোকময় হয়ে উঠবে; যদি সে তার কাপড় ও জুয়েলারি এবং সাজ সজ্জার সাথে দিগন্তে উঁকি দেয়, তাহলে পুরো দিগন্ত জুড়ে সেই অবস্থান করবে। সে হল এমন দাসী, যাকে কস্তরি এবং জাফরানের মাঝে প্রতিপালন করা হয়েছে; যে বড় হয়েছে সুন্দর বাগানে, এবং তাসনিমের পানির (জান্নাতের পানির) দ্বারা দুধ পান করেছে। সে সর্বদা আনুগত্য করবে, এবং তার ভালোবাসা কখনো শেষ হবে না। বলুন, এদের মধ্যে কোন দাসীর মূল্য অধিক হওয়া উচিত?'
মুনিব বললেন, 'অবশ্যই আপনি যার বর্ণনা দিয়েছেন তাঁর।'
'তাহলে জেনে রাখুন তাকে পাওয়া অনেক সহজ।' মালিক বললেন।
'তাঁর মূল্য কত? আল্লাহ তোমার উপর রহম করুন।'
'অতি অল্প। রাতের কিছু সময় জেগে থেকে মনোযোগের সাথে দুই রাকাত সালাত পড়ুন। যখন আপনার কাছে খাদ্য আনা হয় তখন ক্ষুধার্ত মানুষের কথা চিন্তা করুন, এবং আপনার খাবারের মধ্য থেকে কিছু তাদের দান করুন। চলাচলের পথে পাথর এবং ক্ষতিকারক বস্তু দেখলে তা সরিয়ে ফেলুন। আপনার বাকি জীবনে শুধু মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে খরচ করুন। দুনিয়ার সকল চিন্তা ফিকির পরিত্যাগ করুণ, যাতে আজ আপনি একজন সংযমী ও মিতব্যয়ীর সম্মান পেতে পারেন, এবং কাল আপনি জান্নাতে মর্যাদার সাথে এবং প্রশান্তিতে বসবাস করতে পারেন।'
মুনিব দাসীর দিকে মাথা ঘুরালেন, এবং বললেন, 'হে দাসী! তুমি কি আমাদের এই বৃদ্ধ ব্যক্তির কথা শুনেছ?'
'হ্যাঁ, শুনেছি।' সে বলল।
'তিনি কি সত্যি কথা বলেছেন, নাকি শুধু বানোয়াট গল্প শুনালেন?'
'না, তিনি সত্য বলেছেন। তিনি খুব উত্তম উপদেশ দিয়েছেন।'
অতঃপর, মুনিব বলেন, 'যদি তাই হয়ে থাকে তাহলে আমি আল্লাহর জন্য তোমাকে মুক্ত করে দিলাম, এবং অমুক অমুক সম্পত্তি তোমাকে দিলাম। আমার পাশে যে সব গোলামরা আছো আমি তোমাদেরও আজাদ করে দিলাম, তোমরা অমুক এবং অমুক সম্পদ নিয়ে নাও। আমার এই প্রাসাদ এবং আমার সব কিছু আল্লাহর রাস্তায় আমি দান করে দিলাম।'
এরপর তিনি ঘরের একটি পর্দা ছিঁড়ে সেটা গায়ে দিলেন এবং নিজের মূল্যবান পরিধান খুলে ফেলে দিলেন। দাসী অনুরোধ করে বলল, 'আমার মুনিব। আপনার ছাড়া আমার কোনো জীবন নেই।' তখন সেও তাঁর পরিধান খুলে জীর্ণশীর্ণ পোশাক পড়ে নিল। মালিক তাদের দেখলেন, তারা এক পথ ধরে চলে গেল, মালিক অন্য পথ ধরে চলে এলেন।⁵
******
সুলাইমান ইবনু খালিদ বলেন, একজন বৃদ্ধার একটি তরুণী দাসী ছিল। যার কথা খলিফা হিশাম ইবনু আবদুল মালিকের নিকট একবার বলা হয়। ঐ তরুণী তাঁর সৌন্দর্য, উত্তম চরিত্র, কুর'আন তিলাওয়াত ও কাব্য প্রতিভার জন্য বিখ্যাত ছিল। হিশাম তার কথা শোনার পরে কুফার গভর্নরের নিকট চিঠি পাঠান। তাতে লিখেন, ঐ বৃদ্ধা তরুণী দাসীকে বিক্রির জন্য যত টাকা চাইবে তাকে তা দিয়ে দিতে, এবং দাসীকে সহি সালামতে তার কাছে হাজির করতে। তরুণীর জন্য খলিফা একজন গোলামও পাঠিয়ে দেন।
গভর্নর চিঠি পেয়ে ঐ বৃদ্ধার কাছে দাসী কেনার পস্তাব করল। বৃদ্ধা দাসীকে দুই হাজার দিরহাম এবং একটি খেজুরের বাগানের (যেখানে প্রতিবছর পাঁচশ মিসকাল খেজুর উৎপন্ন হয়) বিনিময়ে দাসীকে বিক্রির কথা বলেন। গভর্নর দাসীকে কিনে রাজকীয় পোশাক পড়িয়ে হিশামের নিকট পাঠিয়ে দেন। হিশাম তাকে নিজের রুমে স্থান দেয়। তাঁর জন্য সেবিকা নির্ধারণ করেন। তাকে অতি মূল্যবান গহনা এবং পোশাক উপহার দেন।
একদিন হিশাম তরুণীর সাথে তার বিলাসবহুল ব্যালকনিতে বসে ছিলেন। সেখানে তাকিয়া রাখা ছিল, সুন্দর খুশবু পরিবেশ মাতাচ্ছিল। তরুণী তখন হিশামকে কিছু কৌতূহলপূর্ণ গল্প শুনাচ্ছিল এবং কবিতা আবৃত্তি করছিল। এমন সময় হিশাম কান্নার আওয়াজ শুনতে পান। হিশাম ব্যালকনি থেকে দেখলেন কিছু লোক একটি জানাজা নিয়ে যাচ্ছে। তাদের পিছনে কিছু মহিলার গ্রুপ ছিল, তারা কেঁদে কেঁদে শোক প্রকাশ করছিল। শোকগীতি গাইছিল। তাদের একজনের আওয়াজ ছিল অনেক উঁচু, সে বলছিল-
'হে তুমি, যাকে জানাযার খাটে বয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে; তুমি, যাকে মৃত্যুর নগরীতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে; তুমি, তোমাকে কবরে নিঃসঙ্গ একা রেখে দেয়া হবে এবং তুমি অপরিচিত অবস্থায় সেখানে থাকবে। হে তুমি! যাকে বহন করা হচ্ছে। আমি তো জানি না, তুমি কি বলছ। হয়তো তুমি তোমার লাশ বহনকারীদের দ্রুত চলতে বলছ, অথবা হয়তো তুমি জিজ্ঞেস করছ, তোমাকে কোথায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, আবার কখনো ফিরিয়ে আনা হবে।'
শোকগাথা শুনে হিশাম কাঁদতে লাগলেন, তিনি সকল বিলাসবহুলতা ত্যাগ করলেন, এবং বললেন, 'ফিরে আসার জন্য মৃত্যুই হল একটি বড় উপদেশ।'
গাদিদ (তরুণী দাসী) বলল, 'এই বিলাপকারী আমার হৃদয় ভেঙ্গে ফেলেছে।'
এরপর হিশাম গোলামকে ডাক দেন এবং ব্যালকনি থেকে নেমে প্রস্থান করেন। গাদিদ সেখানেই বসে রয়ে গেল। রাতে সে একটি স্বপ্ন দেখে। স্বপ্নে এক লোক তাকে এসে বলে-
'তোমার সৌন্দর্যের জন্য মানুষ তোমার প্রশংসা করে, তোমার আকর্ষণীয় রূপ দেখিয়ে তুমি মানুষকে আকৃষ্ট কর। তুমি ভেবে দেখেছ, যখন শেষ ঘণ্টা বেজে উঠবে, শিংগায় ফুঁ দেয়া হবে, আর সকলকে জড়ো করা হবে হাশরের ময়দানে, তখন তোমার কী অবস্থা হবে?'
আতঙ্কগ্রস্থ হয়ে গাদিদ ঘুম থেকে জেগে উঠে। নিজেকে শান্ত করার জন্য কিছু পান করে। আর তার সেবিকাকে আওয়াজ দিয়ে ডেকে আনে। তার গোসলের ব্যবস্থা করতে বলে। গোসলের পর তার পরনে থাকা সকল গহনা এবং দামী পোশাক খুলে ফেলে, মোটা জালাবিয়া (মেয়েদের সাধারণ পোশাক) পড়ে নেয়। সে খুব দ্রুত একটি ব্যাগে কিছু সামান ভরে নেয় এবং হিশামের কামরায় প্রবেশ করে। তার সাধাসিধে পোশাক, সাজ-সজ্জাহীন মুখ দেখে হিশাম প্রথমে চিনতে পারেননি। 'আমি গাদিদ,' সে বলল। 'একজন সতর্ককারী আমার কাছে এসেছিল, তার ওয়ার্নিং আমাকে ভীষণভাবে নাড়িয়ে দিয়েছে। আপনি আমাকে নিয়ে আপনার মনোবাসনা পূর্ণ করেছেন, আমাকে নিয়ে আনন্দ ও উপভোগ করেছেন। এখন আমি আপনার কাছে এসেছি, আপনার কাছে অনুরোধ করছি, আমাকে এই দুনিয়ার গোলামী থেকে আজাদ করুণ।'
'ব্যক্তি থেকে ব্যক্তির মাঝে আনন্দের পার্থক্য রয়েছে। তুমি তোমার আনন্দ খুঁজে পেয়েছো। তুমি এখন যেখানে ইচ্ছে যেতে পারো, আল্লাহর জন্য আমি তোমাকে আজাদ করে দিলাম। আচ্ছা তুমি কোথায় যেতে চাও?'- হিশাম বলেন।
'আমি আল্লাহর ঘর দেখতে চাই'- সে বলল।
'যাও'- হিশাম জবাবে বলেন। 'কেউ তোমার পথ আটকাবে না।'
সে শহর ছেড়ে মক্কায় চলে আসে। দিনের বেলায় সে সিয়াম পালন করত, এবং সারা দিন তার আবাসে লুকিয়ে থাকত। রাতের বেলায় বের হয়ে সে বায়তুল্লাহর তাওয়াফ করত, এবং বলত-
'হে আমার রব! আপনি আমার রিযিক দাতা। আমার আশা আমার থেকে ছিনিয়ে নিবেন না; আমার ইচ্ছা পূরণ করুণ; আমার ফিরে আসাকে সুন্দর করে দিন, এবং আমাকে পুরষ্কার দিতে কার্পণ্য করবেন না।' সে একসময় প্রখ্যাত হয়ে উঠে, এবং ইবাদতরত অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে এই ক্ষণস্থায়ী জীবন ত্যাগ করে।⁶
*****
ইবরাহিম ইবনু আদাম রহিমাহুল্লাহ আল্লাহর একজন ওলি ছিলেন। তিনি সারা জীবন আল্লাহর সন্ধান এবং আল্লাহর বিধানের অনুসরণে কাটিয়ে দেন। একবার তাঁর অনুসারী ইবরাহিম ইবনে বাশশার আল্লাহর সন্ধানের এই যাত্রা তিনি কিভাবে শুরু করেছিলেন তা জিজ্ঞেস করেন। তখন ইবরাহিম বলেন-
'আমার পিতা বলখ রাজ্যের রাজা ছিলেন। আমরা শিকার করতে ভালোবাসতাম। একদিন আমি শিকারের উদ্দেশ্যে ঘোড়ায় চড়ে বের হয়েছিলাম। সাথে আমার শিকারি কুকুরও ছিল। পথে একটি শিয়াল আমার ঘোড়ার উপর আক্রমণ করে বসল। তখন আমি আমার পিছন থেকে একটি শব্দ শুনতে পাই। কেউ বলছে-
"তোমাকে এই উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করা হয়নি; আর তোমাকে শিকার করার খেল তামাশার আদেশও দেয়া হয়নি।"
আমি আমার সামনে নজর দিই, ডানে বামে দেখি, কিন্তু কাউকে দেখতে পাইনি। আমি শয়তানকে অভিশাপ দিলাম এবং সামনে এগোতে লাগলাম। তখন আবার আমার ঘোড়া নড়তে লাগলো এবং আমি একই ধরনের আওয়াজ শুনতে পেলাম। আমি আবারো চারদিকে তাকালাম, কাউকে দেখতে পাইনি। আমি আবার শয়তানকে অভিশাপ দিয়ে সামনে এগোই। কিন্তু আমার ঘোড়ার ঝাঁকুনি বন্ধ হয় নি, তখন আমি আমার নিচ থেকে একই আওয়াজ শুনতে পাই। এবার কেউ আমার নাম ধরে বলছে,
"হে ইবরাহিম! তোমাকে এই উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করা হয়নি; আর তোমাকে শিকার করার খেল তামাশার আদেশও দেয়া হয়নি।”
আমি থেমে যাই, এখন আমি বুঝতে পারি যে, আল্লাহর পক্ষ হতে একজন সতর্ককারী আমাকে এই সব খেল তামাশা থেকে জাগিয়ে দিতে আমার নিকট এসেছে। আমি ঐ দিন শপথ করি যে, আমি আর কখনো আল্লাহর আদেশ অমান্য করব না। পরে আমি পরিবারের নিকট ফিরে আসি।
আমি আমার বাবার একজন মেষপালকের কাছে যাই, এবং তার লম্বা মোটা জামা ও একটি কম্বল নিয়ে আমার জামা তাকে দিয়ে দিই। তারপর আমি বের হয়ে পড়ি। পাহাড় পাড়ি দিই। দীর্ঘ পথ হেঁটে ইরাকে পৌঁছাই। ইরাকে আমি কয়েকদিনের জন্য একটি কাজ করেছিলাম, কিন্তু তার উপার্জন সম্পর্কে আমার মনে সন্দেহ হওয়ায় আমি তা ছেঁড়ে দিই। একজন আলেমকে আমি এই সম্পর্কে জিজ্ঞেস করি, তিনি আমাকে সিরিয়া যেতে বলেন। আমি সিরিয়ার পথ ধরি, সেখানের একটি শহর যা আল-মানসুরা নামে পরিচিত সেখানে পৌঁছি। একটি জব করা শুরু করি, কিন্তু এখানেও উপার্জনের পবিত্রতা নিয়ে আমার মনে সন্দেহ বাধে। আরেকজন আলেম আমাকে তারসুস যাওয়ার নসিহত করেন। তিনি বলেন, সেখানে একদম পবিত্র উপার্জন করার ব্যবস্থা হতে পারে। আমি সেখানে যাই, তখন এক ব্যক্তি আমাকে তার ফল বাগানের তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে নিযুক্ত করেন। বাগানের পরিচর্যা ও রক্ষণাবেক্ষণ ছিল আমার দায়িত্ব।
দীর্ঘদিন আমি সেখানে পুরোপুরি একজন গ্রাম্য মালী হিসেবে কাজ করছিলাম, একদিন এক লোক তার বন্ধুবান্ধব সাথে নিয়ে বাগানে এলেন, এবং 'ওই মালী!' বলে চিৎকার করে আমাকে ডাকেন। আমি তার কাছে যাই, সে আমাকে কিছু বড় এবং মিষ্টি ডালিম আনতে বলে। আমি বাগান থেকে খুঁজে বড় ডালিম নিয়ে যাই। সে তা কেটে ডালিমের স্বাদ নেয়, এবং বুঝতে পারে ডালিমটি অনেক টক। তারপর চিৎকার করে আমাকে বলেন, 'মালী! তুমি আমাদের এই ফল বাগানে দীর্ঘ দিন ধরে আছ, আমার ফল খাচ্ছ, কিন্তু তবুও তুমি মিষ্টি ও টক ডালিমের পার্থক্য জানো না। এটাও জানো না কোন গাছের ডালিম বেশি ভালো হয়।' আমি তাকে বললাম, আমি দায়িত্ব নেয়ার সময় থেকে এখন পর্যন্ত আপনার বাগানের ফল খাইনি। ওই লোক তার সাথীদের উদ্দেশ্য করে বলে, 'তোমার কি তার কথা শুনেছো? এখানে ইবরাহিম ইবনু আদহাম থাকলে তিনিও এমনিই বলতেন। সে মসজিদে যায় এবং আমার সম্পর্কে মসজিদে আলোচনা করে। ওখানে একজন আমাকে চিনতে পারলো, তারা ফল বাগানে ফিরে আসে, সাথে নিয়ে আসে অনেক মানুষদের। আমি তা দেখে একটি গাছের পিছনে লুকিয়ে পড়ি। সুযোগ পাওয়া মাত্র আমি সেখানে থেকে পালিয়ে যাই। এটাই ছিল আল্লাহর সন্ধানে বের হওয়ার সূচনা। তখন আমি তারসুস থেকে বের হয়ে মরুভূমির পথ ধরি।⁷
******
আব্দুল্লাহ ইবনু ফারাজ রহিমাহুল্লাহ বলেন, বাসায় টুকিটাকি মেরামত কাজের জন্য একবার তার একজন মেরামতকারীর প্রয়োজন পড়ে। যাকে দিয়ে তিনি সারাদিন কাজ করিয়ে মজুরি দিবেন। এমন লোক খুঁজতে তিনি বাজারে যান। সেখানে তিনি মলিন মুখ ওয়ালা একজন বালককে দেখতে পান। সে পশমি পোশাক পড়ে ছিল। তার কুর্তা কোমরের সাথে পশমের বেল্ট দিয়ে বাঁধা ছিল। তার হাতে ছিল বড় একটি বালতি আর ছিল একটি দড়ি। আব্দুল্লাহ তাকে কাজের প্রস্তাব দেন। বালক রাজি হয় এবং বলে তাকে এক দিরহাম এবং এক দানিক (১/৬ দিরহাম) মজুরি দিতে হবে। সাথে সে এও বলে সারা দিন সে কাজ করবে তবে যোহরের সালাত পড়ার জন্য যোহরের আযানের এবং আসরের জন্য আসরের আযানের পর সে কোনো কাজ করতে পারবে না।
আব্দুল্লাহ তার শর্ত মেনে নেন এবং তাকে বাসায় এনে সকল কাজ বুঝিয়ে দেন। বালক একনাগাড়ে কাজ করতে লাগলো, মাঝে কোনো বিরতি নিলো না। যোহরের আযান হলে সে আব্দুল্লাহকে তার শর্তের কথা মনে করিয়ে দিল এবং সালাতের জন্য বের হয়ে গেল। সালাত শেষে সে ফিরে এসে আসরের আযান পর্যন্ত বিনা বিরতিতে কাজ করল। আসরের সালাতের পর সূর্যাস্ত পর্যন্ত সে কাজ করল। তারপর দিনের মজুরি নিয়ে সে চলে গেল।
কয়দিন পর আব্দুল্লাহর আরো কিছু মেরামতের প্রয়োজন পড়ে। তার স্ত্রী তাকে বলেন আগের বালকের মতই কাউকে যেন খুঁজে আনে, কেননা সে কাজে ছিল খুব দক্ষ, আর আচরণে ছিল সত্যবাদী। আব্দুল্লাহ আবার বাজারে যান, কিন্তু তাকে খুঁজে পাননি। তিনি বালক সম্পর্কে খোঁজখবর নিয়ে জানতে পারেন, বালক শনিবার ব্যতীত অন্য কোনো দিন কাজ করে না। আব্দুল্লাহ শনিবার পর্যন্ত অপেক্ষা করেন, এবং শনিবারে তাকে খুঁজে পেয়ে কাজের প্রস্তাব দেন। সে আগের শর্তে কাজ করতে রাজি হয়। সারাদিন কাজের পর আব্দুল্লাহ তাকে নির্ধারিত মজুরি থেকে কিছু অতিরিক্ত টাকা নেয়ার জন্য প্রস্তাব করেন। এতে সে নাখোশ হয়, এবং আব্দুল্লাহর বাসা থেকে দ্রুত বের হয়ে যায়। আব্দুল্লাহ তার পিছনে দৌড়ে আসেন, আর তাকে কমপক্ষে তার নির্ধারিত টাকা নিতে অনুরোধ করেন। তখন সে নির্ধারিত টাকা নিয়ে চলে যায়।
কিছু দিন পরে আব্দুল্লাহর আরো কিছু মেরামতের প্রয়োজন দেখা দেয়। তাই আব্দুল্লাহ অপেক্ষা করেন এবং শনিবারে বাজারে যান। কিন্তু সেখানে তাকে খুঁজে পাননি। কেউ একজন তাকে ঐ বালকের কথা জানায়। সে কয়েক দিন ধরে অসুস্থ আছে। আব্দুল্লাহ তার বাসার ঠিকানা নিয়ে তাকে দেখতে যান। সে একজন বৃদ্ধার বাসায় থাকে। তিনি বাসায় গিয়ে দেখেন সে ইটের উপর মাথা রেখে ঘুমাচ্ছে। 'তোমার কী কিছু লাগবে?' আব্দুল্লাহ বালককে জিজ্ঞেস করেন।
'হ্যাঁ, যদি আপনি পারেন।'- বালক জবাব দেয়।
আব্দুল্লাহ বলেন, তিনি করবেন।
'যখন আমি মরে যাব,' সে বলতে লাগলো, 'আমার দড়ি বিক্রি করে দিবেন, আমার কোর্তা এবং বেল্ট ধুয়ে পরিষ্কার করে নিবেন এবং তা পড়িয়ে আমাকে কবর দিবেন। আমার কোর্তার ভিতরের পকেটে দেখবেন, সেখানে একটি আংটি আছে। তা নিজের কাছে রেখে অপেক্ষা করবেন। যখন হারুন-আল-রশিদ (তৎকালীন খলিফা) শহরে আসবেন। তখন আপনি তার কাছে গিয়ে ঐ আংটিটি দেখাবেন। মনে রাখবেন আমাকে দাফনের পরেই তাকে আংটি দেখাবেন।' আব্দুল্লাহ তার কথা মেনে নিলেন।
যুবকের মৃত্যু হলে আব্দুল্লাহ তার অন্তিম ইচ্ছা বাস্তবায়ন করলেন। খলিফা হারুনুর রশিদ যখন শহরে এলেন, আব্দুল্লাহ সাক্ষাতের জন্য তার কাছে যান। এমন স্থানে তিনি দাঁড়ান যেখান থেকে খলিফা তাকে দেখতে পারবেন। সেখানে গিয়ে তিনি আংটিটি বাতাসে নাড়ান। হারুন তাকে দেখতে পান, এবং তাকে কাছে ডাকেন। হারুন উপস্থিত সকলকে বেরিয়ে যেতে বলেন। আব্দুল্লাহকে জিজ্ঞেস করেন, সে কে এবং আংটিটি তিনি কোথায় পেলেন। আব্দুল্লাহ তাকে জবাব দেন। আব্দুল্লাহ তাকে বালকের পুরো দাস্তান শুনান। বালকের কাহিনি শুনার সময় খলিফা হারুন প্রচণ্ড কাঁদেন। এত বেশি কান্না করেন যে আব্দুল্লাহ নিজেকে অপরাধী মনে করছিলেন। খলিফাকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, 'হে বিশ্বাসীদের নেতা! ঐ বালকের সাথে আপনার কী সম্পর্ক আছে?'
খলিফা বললেন, 'সে ছিল আমার পুত্র!'
'সে কেন এমনভাবে জীবন যাপন করছিল?'
'আমি খলিফার পদে আসিন হবার পূর্বে তার জন্ম হয়, খুব সুন্দরভাবে তার প্রতিপালন হয়, কুর'আন এবং বিজ্ঞানে সে বেশ শিক্ষিত ছিল। যখন আমাকে খলিফা মনোনীত করা হয়, তখন সে আমাকে ছেড়ে চলে যায় এবং দুনিয়াবী জিনিস থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। সে তার মায়ের খুব আদরের সন্তান ছিল, তাই তাকে দেয়ার জন্য আমি তার মা-কে এই মহামূল্যবান আংটি দিই। অনিচ্ছার সাথে সে আংটিটি গ্রহণ করে। তার মায়ের মৃত্যুর পর আপনিই প্রথম ব্যক্তি, যে তার সম্পর্কে আমাকে খোঁজ জানাচ্ছেন। আপনি আজ রাতে আমাকে তার কবর জিয়ারতে নিয়ে যাবেন।'
আব্দুল্লাহ খলিফা হারুনকে সন্তানের কবর জিয়ারতে নিয়ে যায়। হারুন দীর্ঘক্ষণ সেখানে কান্না করেন, কবরের পাশে দাঁড়িয়ে অশ্রু ঝড়ান। ভোর পর্যন্ত তিনি সেখানে অবস্থান করেন। হারুন আব্দুল্লাহকে কিছুদিন তার সাথে থাকতে অনুরোধ করেন যাতে তিনি রাতে কবর জিয়ারত করতে পারেন। আব্দুল্লাহ আগে জানত না যে সে মেরামতকারী বালক ছিল খলিফা হারুনের পুত্র। সেদিনই তিনি প্রথম এটা জানতে পারেন।⁸
টিকাঃ
¹মুয়াকিফ মুশরিকাহ ফি হায়াতিস সালাফ : ১৫।
²সুরা হাদিদ: ১৬।
³মুয়াকিফ মুশরিকাহ ফি হায়াতিস সালাফ : ২৪।
⁴মুয়াকিফ মুশরিকাহ ফি হায়াতিস সালাফ : ৪৯।
⁵কিতাবুত তাইবিন মিনাল মুবুক ওয়াস সালাতিন: ১৪১
⁶কিতাবুত তাইবিন মিনাল মুবুক ওয়াস সালাতিন: ২২।
⁷কিতাবুত তাইবিন মিনাল মুবুক ওয়াস সালাতিন : ২৯।
⁸কিতাবুত তাইবিন মিনাল মুবুক ওয়াস সালাতিন: ৩৭।