📄 পাপের ছড়াছড়ি
মুসলিম সমাজ আজ পাপে সয়লাব হয়ে যাচ্ছে, চারদিকে পাপের ছড়াছড়ি, পঙ্কিলতার অতল গহ্বরে আমরা ডুবে যাচ্ছি। অবশ্যই বৈবাহিক সমস্যা তৈরিতেও পাপ এবং নিষিদ্ধ কাজ হল সবচে' বড় কারণ। আল্লাহর কাছে পাপীদের যেমন কোনো গুরুত্ব নেই, সৎ মানুষদের মাঝেও পাপীদের কোনো সম্মান নেই।
ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম রহিমাহুল্লাহ বলেন-
"পাপ কর্মের ফলে অনেক ধরনের শাস্তি নেমে আসে, তার মধ্যে অন্যতম হল বরকত উঠিয়ে নেয়া এবং অন্যান্য দুর্ভাগ্য নেমে আসা। আল্লাহর বান্দারা পাপের কারণে আল্লাহর বরকত হারিয়ে ফেলে, এবং পাপ কর্ম করার সময় সে অভিশপ্ত হয়।”
পাপীরা পাপের কারণে আরো যে সকল শাস্তি পায়-সে আল্লাহর সামনে তার মাকাম ও অবস্থান হারিয়ে ফেলে, কেননা আল্লাহর নিকট ঐ বান্দাই পবিত্র, যে আল্লাহকে সর্বাধিক ভয় করে ঐ বান্দাই আল্লাহর নিকটতর, যে সকল ক্ষেত্রে আল্লাহকে মান্য করে, এবং আল্লাহর নিকট বান্দার মর্যাদা আল্লাহর বিধানের প্রতি বান্দার আত্মসমর্পণের মাধ্যমেই প্রতিষ্ঠা পায়। যদি সে আল্লাহর বিধানকে অমান্য করে, তাহলে সে নিজেকে অনুগত বান্দা হওয়ার স্থান থেকে নামিয়ে ফেলে, এবং আল্লাহও তাকে তার একান্ত অনুগত বান্দার অবস্থান থেকে নিচে নামিয়ে দেন। ফলস্বরূপ সেও দুর্ভাগ্যপূর্ণ, অযোগ্য, অসম্মানজনক, নিঃস্ব ও অসুখী মানুষের কাতারে অন্তর্ভুক্ত হয়ে পড়ে।
কিছু স্ত্রীরা প্রায়শ অভিযোগ করে বলেন, তাদের স্বামীরা আগের মত ব্যবহার করছে না, তারা পরিবর্তন হয়ে গেছে। তারা তাদের পূর্বের সময়ের স্মৃতিচারণ করে-তখন স্বামীরা তাদের প্রতি খুব অনুরাগী ছিল, উত্তম ব্যবহার করত, স্বামী স্ত্রীর মাঝে তখন অনেক ভালোবাসা বিরাজ করছিল, কিন্তু এখন স্বামীরা স্ত্রী-সন্তানের প্রতি তেমন যত্নশীল নয়।
শাইখ আহমাদ আল-কাত্তান রহিমাহুল্লাহ বলেন, "স্বামীর এই আকস্মিক পরিবর্তনের জন্য স্ত্রীরা দায়ি। স্ত্রীর উচিত নিজেকে জিজ্ঞেস করা এবং আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা এই আয়াতে কি বলেছেন তা অনুধাবন করা-
إِنَّ اللَّهَ لَا يُغَيِّرُ مَا بِقَوْمٍ حَتَّى يُغَيِّرُوا مَا بِأَنفُسِهِمْ.
"নিশ্চয় আল্লাহ কোন সম্প্রদায়ের অবস্থা পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না তারা নিজেদের অবস্থা নিজেরা পরিবর্তন করে।” ¹
হয়ত স্ত্রী বা স্বামী কোনো নিষিদ্ধ কাজ করেছে তাই স্বামীর মধ্যে আকস্মিক পরিবর্তন এসেছে।
টিকাঃ
¹সুরা রাদ: ১১।
📄 দাম্পত্যজীবনে সমস্যার আরো কিছু কারণ
* সালাত আদায়ে, যাকাত প্রদানে, রমাযানের সিয়াম পালনে এবং হজ্জ সহ ইত্যাদি আহকামে অবহেলা করা।
* সাবালিকা হওয়ার পরেও কন্যাকে পরিপূর্ণ পর্দায় বাধ্য করতে না পারা।
* সম্পর্কছিন্নকরণ।
* সন্তানদের মন্দ কাজগুলো বাবার কাছে না বলে লুকিয়ে রাখা।
* পরনিন্দা করা।
* সুদের সাথে সম্পৃক্ত হওয়া।
* মুভি দেখা এবং গান শোনা।
* অপ্রয়োজনে চাকর এবং ড্রাইভার রাখা।
* দ্বীনদার ব্যক্তিদের নিয়ে হাঁসি ঠাট্টা করা।
* সিগারেট পান করা, এবং মদপান।
* পিতা-মাতার অবাধ্য হওয়া।
যাইহোক, আমাদের জন্য এটা আবশ্যক যে আমরা সব সময় নিজেদের কর্মের পর্যবেক্ষণ করব, এবং ভুল হলে ঠিক করে নিব, অন্যথায় ইসলামি দায়িত্ব পুরোপুরি পালন করা হবে না। অবশ্যই আমরা নিষিদ্ধ কাজ থেকে বেঁচে থাকব এবং অন্যদেরকেও নসিহত করব। তাহলে ইনশা আল্লাহ আমাদের পরিবারে, আমাদের বাসায় আবার সুখ আনন্দ ও শান্তি ফিরে আসবে।
📄 একটি গুরুত্বপূর্ণ ফাতওয়া
একজন নারী স্বামীর দুর্ব্যবহার নিয়ে একটি প্রশ্ন করেছিলেন, প্রশ্নের জবাব দিয়েছিলেন শাইখ আব্দুল আজিজ ইবনে বায রহিমাহুল্লাহ। তিনি বলেন-
"আপনি বলেছেন, আপনার স্বামী সালাত ত্যাগ করেছে এবং দ্বীনকে অসম্মান করে। যদি ঘটনা সত্যিই এমন হয় তাহলে আপনার স্বামী কাফির হয়ে গেছে, এবং আপনি তার সাথে একই বাসায় অবস্থান করতে পারবেন না। তাই আপনাকে আপনার পরিবারের কাছে বা যেখানে আপনি নিরাপদ মনে করেন এমন স্থানে চলে যেতে হবে। পবিত্র কুর'আনে আল্লাহ তায়ালা বলেন-
لَا هُنَّ حِلٌّ لَّهُمْ وَلَا هُمْ يَحِلُّونَ لَهُنَّ.
"মু'মিনা নারীরা কাফিরদের জন্য বৈধ নয় এবং কাফিরেরা মু'মিনা নারীদের জন্য বৈধ নয়।”¹
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-
بَيْنَ الْعَبْدِ وَبَيْنَ الْكُفْرِ تَرْكُ الصَّلَاةِ.
"(মু'মিন) বান্দাহ ও কুফরের মধ্যে পার্থক্য হলো নামায ত্যাগ করা।”²
অধিকন্তু, দ্বীনকে অসম্মান করা সকল মুসলিমের ঐকমতে একটি বড় কুফর। তাই আপনাকে অবশ্যই আল্লাহর জন্য তাকে ঘৃণা করতে হবে, এবং পৃথক হতে হবে। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا. وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ.
"আর যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্যে নিষ্কৃতির পথ করে দেবেন। এবং তাকে তার ধারণাতীত জায়গা থেকে রিযিক দেবেন।”³
আমি আল্লাহর নিকট আপনার জন্য দু'আ করি। আল্লাহ আপনাকে সাহায্য করুন, আপনার সকল পেরেশানি দূর করুন। স্বামীর দুর্ব্যবহার হতে আল্লাহ আপনাকে হিফাজত রাখুন। তাকে সরল পথে পরিচালিত করুন, এবং তাওবার সুযোগ দান করুন। অবশ্যই আল্লাহ তায়ালা অতি দয়ালু ও দয়াবান।
টিকাঃ
¹সুরা মুমতাহিনা : ১০।
²ইবনু মাজাহ: ১০৭৮। সনদ সহিহ।
³সুরা তালাক: ২-৩।
📄 আদর্শ জীবনসঙ্গী
আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা বলেন, একবার রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বললেন-
إِنِّي لَأَعْرِفُ غَضَبَكِ وَرِضَاكِ، قَالَتْ: قُلْتُ: وَكَيْفَ تَعْرِفُ ذَاكَ يَا رَسُولَ اللَّهِ؟ قَالَ: إِنَّكِ إِذَا كُنْتِ رَاضِيَةً قُلْتِ: بَلَى وَرَبِّ مُحَمَّدٍ، وَإِذَا كُنْتِ سَاخِطَةً قُلْتِ: لا وَرَبِّ إِبْرَاهِيمَ. قَالَتْ: قُلْتُ: أَجَلْ، لَسْتُ أُهَاجِرُ إِلَّا اسْمَكَ.
'আমি তোমার রাগ ও অনুরাগ বুঝতে পারি।' আমি জিজ্ঞাসা করলাম, 'আল্লাহর রাসুল! কিভাবে বুঝতে পারেন?' তিনি বললেন, 'তুমি যখন আমার উপর সন্তুষ্ট থাক তখন বলে থাক-'বালা ওয়া রাব্বি মুহাম্মাদ' (মুহাম্মাদের রবের কসম!...) আর অসন্তুষ্ট হলে বল-'লা ওয়া রাব্বি ইবরাহীম' (ইবরাহিমের রবের কসম!..।)' আমি বললাম, 'আল্লাহর রাসুল! আপনি ঠিক বলেছেন। তবে আমি শুধু আপনার নামটিই ত্যাগ করি (অন্তর আপনার ভালবাসায় পূর্ণ থাকে।'¹
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একবার আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহার সাথে দৌড় প্রতিযোগিতা করেছিলেন। আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা নিজেই বলেছেন-
فَسَابَقْتُهُ فَسَبَقْتُهُ عَلَى رِجْلَيَّ، فَلَمَّا حَمَلْتُ اللَّحْمَ سَابَقْتُهُ فَسَبَقَنِي فَقَالَ: هَذِهِ بِتِلْكَ السَّبْقَةِ.
“একবার রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার সঙ্গে দৌড় প্রতিযোগিতা করলেন। তখন আমি আগে বেরিয়ে গেলাম (জয়ী হলাম)। পরে যখন আমার শরীর ভারী হয়ে গেল, তখন তিনি আমার সঙ্গে দৌড় প্রতিযোগিতা করে আমাকে হারিয়ে দিলেন। এরপর তিনি বললেন, এবার আগেরবারের বদলা নিলাম।”²
এই ঘটনায় স্বামী স্ত্রীর জন্য শিক্ষা রয়েছে। স্বামী স্ত্রী একে অপরের সঙ্গতা কিভাবে উপভোগ করতে পারে তা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই ঘটনার মাধ্যমে আমাদের শিখিয়েছেন। স্বামী স্ত্রী একই সাথে থাকে, এতে যদি কোনো নতুনত্ব, আনন্দ ও উল্লাস না থাকে তাহলে দীর্ঘ বিবাহ জীবন একঘেয়েমিপূর্ণ হয়ে উঠে। এই বোরিংন্যাস কাটানোর জন্য দম্পতিরা বিভিন্ন নির্মল নিষ্পাপ ফান করতে পারে, গেমস খেলতে পারে, একে অপরকে বিনোদন দিতে পারে। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর স্ত্রীদের খুবই ভালবাসতেন। স্ত্রীদের সঙ্গে তিনি খোশ মেজাজে মিশতেন ও তাদের আবেগের প্রতি লক্ষ্য রাখতেন। এমনকি তিনি স্ত্রীর সাথে একই পাত্রে গোসল করতেন।
টিকাঃ
¹সহিহ বুখারি: ৬০৭৮।
²আবু দাউদ: ২৫৭৮। সনদ সহিহ।