📄 ভূমিকা
সকল প্রশংসা মহান আল্লাহ তা'আলার জন্য, যিনি পবিত্র কুর'আনে ইরশাদ করেন-
وَمِنْ آيَاتِهِ أَنْ خَلَقَ لَكُم مِّنْ أَنفُسِكُمْ أَزْوَاجًا لِتَسْكُنُوا إِلَيْهَا وَجَعَلَ بَيْنَكُم مَّوَدَّةً وَرَحْمَةً إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآيَاتٍ لِقَوْمٍ يَتَفَكَّرُونَ.
"আর তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে রয়েছে যে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের থেকেই স্ত্রীদের সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি পাও। আর তিনি তোমাদের মধ্যে ভালবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন। নিশ্চয় এর মধ্যে নিদর্শনাবলী রয়েছে সে কওমের জন্য, যারা চিন্তা করে।”¹
এবং শান্তি ও অনুগ্রহ বর্ষিত হোক আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপর, যিনি ইরশাদ করেছেন, 'তোমাদের মধ্যে উত্তম সে, যে তার স্ত্রীর কাছে উত্তম। আর আমি আমার স্ত্রীদের কাছে উত্তম'। হাদিসটি ইমাম তিরমিযি এবং অন্যান্যরা লিপিবদ্ধ করেছেন।
অতঃপর...
বর্তমানে মানুষের জীবনের দিকে তাকালে আমরা হতাশা ও যন্ত্রণা অনুভব করি, আমরা দেখি চারদিকে হারাম ছড়িয়ে পড়েছে। সারা বিশ্ব পাপে ও দুষ্কর্মে ভয়ে উঠেছে। মানুষের মাঝে প্রচলিত ধারনা, রীতিনীতি পরিবর্তন হয়ে গেছে। উত্তম কাজ এখন মন্দ বলে পরিচয় পাচ্ছে আর মন্দ হয়ে গেছে উত্তম। ঐতিহ্য, অভ্যাস ও শিষ্টাচারেরও পরিবর্তন ঘটেছে।
বস্তুত, পশ্চিমা “সভ্যতা”-র প্রতি মানুষ প্রবল মাত্রায় প্রভাবিত ও আকৃষ্ট হচ্ছে, এবং পাশাপাশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে পশ্চিমার নোংরা অশালীন মুভি ও ফিল্মের মাধ্যমে। এসকল ড্রামায় বিশ্বাসঘাতকতাকে ভালোবাসা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, পারিবারিক সম্পর্ক ভাঙ্গনকে ব্যক্তি স্বাধীনতা বলে তুলে ধরা হয় এবং স্বামীকে সম্মান করা ও স্বামীর প্রতি আনুগত্যকে সেকেলে ও পশ্চাৎপদতা হিসেবে দেখানো হয়। সর্বোপরি স্বামী-স্ত্রী'র একে অপরকে বোঝাপড়াকে উপস্থাপন করা হয় ব্যক্তির দুর্বলতা হিসেবে। ফলস্বরূপ মুসলিম পরিবারগুলোতে ভাঙ্গন দেখা দিচ্ছে। বিভিন্ন বিপদ দুর্দশায় মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠছে, এবং মুসলিমরা হয়ে পড়েছে চিন্তিত। তাই আমরা দেখি-
* স্ত্রী স্বামী'র অধিকারগুলো পূরণ করছে না! * স্বামী স্ত্রী'র অধিকারকে উপেক্ষা করছে, এবং স্ত্রী'র উপর যুলুম করছে! * সন্তানরা পিতা-মাতার অবাধ্য হয়েছে! * পিতা-মাতা সন্তানদের সঠিক শিক্ষা দিতে ব্যর্থ হচ্ছে!
আল্লাহর বিধানের প্রতি মুসলিমদের অবাধ্যতা ও অমান্যতাই হল উপর্যুক্ত সমস্যাগুলোর একমাত্র কারণ।
একটি আদর্শ মুসলিম ঘর নির্মাণ করার উদ্দেশ্যে আমি এই কিতাব রচনা করেছি। কিতাবটির নাম দিয়েছি-"How to win your wife's Heart"।
এই লেখাটি হল 'সুখী মুসলিম পরিবার' সিরিজের একটি অংশ।
বইটি লেখার প্রধান উদ্দেশ্য হল একটি মজবুত, আন্তরিক এবং পরস্পর বোঝাপড়া ও সহানুভূতিশীল মুসলিম পরিবার নির্মাণ করা। এমন মুসলিম পরিবার-যা পরিচালিত হয়- শ্রদ্ধা, ভালবাসা, সম্মান, অঙ্গীকার, সুখ, মানসিক প্রশান্তির মাধ্যমে।
যার স্লোগান হবে-ধর্ম হল আন্তরিকতা।
যার লক্ষ্য হল-সন্তানদের সঠিক শিক্ষা দেয়া।
যার ভিত্তি হল-কুর'আন, সুন্নাহ এবং সালাফদের নাসিহা।
যার প্রেরণা হল-তাদেরকে বিচার দিবসে আহ্বান করে বলা হবে- اُدْخُلُوا الْجَنَّةَ أَنتُمْ وَأَزْوَاجُكُمْ تُحْبَرُونَ. يُطَافُ عَلَيْهِم بِصِحَافٍ مِّن ذَهَبٍ وَأَكْوَابٍ وَفِيهَا مَا تَشْتهِيهِ الْأَنفُسُ وَتَلَذُّ الْأَعْيُنُ وَأَنتُمْ فِيهَا خَالِدُونَ.
“তোমরা এবং তোমাদের সহধর্মিনীগণ সানন্দে জান্নাতে প্রবেশ কর। স্বর্ণের থালা ও পানপাত্র নিয়ে তাদেরকে প্রদক্ষিণ করা হবে; সেখানে রয়েছে সবকিছু, অন্তর যা চায় এবং নয়ন যা-তে তৃপ্ত হয়। সেখানে তোমরা স্থায়ী হবে।”²
যার আদর্শ হবে-রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, তাঁর সাহাবাগণ এবং তাঁর অনুসারীগণ।
তালাকের সংখ্যা আকস্মিক বৃদ্ধি পাওয়া, জীবনসঙ্গীর অধিকার আদায়ে অবহেলা, কিছু স্বামীর দ্বারা স্ত্রী'র প্রতি অশ্রদ্ধা দেখানো ইত্যাদি কারণগুলো আমাকে এই গ্রন্থ রচনা করতে বাধ্য করেছে। আমাদের সমাজে কিছু এমন মানুষ আছে (আল্লাহ তাদের হেদায়াত দান করুন) যারা স্ত্রী'কে তাদের প্রাপ্য হক দেয় না, স্ত্রী'র প্রতি যত্নশীল হয় না। বিনা কারণে স্ত্রী'র সাথে মন্দ আচরণ করে, উচ্চ শব্দে কথা বলে। ভাল- মন্দ বিষয় আশয় স্ত্রী'র সাথে শেয়ার করে না, এবং পরিবার ও সন্তানদের সাথে সময় কাটানোর চাইতে বন্ধুদের সাথে এবং ভ্রমণে রাত কাটাতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। স্বামীর এই ধরনের দূরব্যবহারে স্ত্রীর জীবন হয়ে উঠে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠাময়। নিদারুণ দুঃখ-দুর্দশায়, যন্ত্রণায় কাটে স্ত্রী'র সাংসারিক জীবন, এতে মন-মানসিক শান্তি ধ্বংস হয়ে যায়। তাই, ঐ সকল মানুষের উদ্দেশ্যে আমি এই বই লিখেছি।
আমার আরজ...
স্বভাববশত নারী হল দুর্বল, স্নেহপরায়ণ, আবেগী এবং পুরুষের সাথে উচ্চবাক্য বিনিময়ে অক্ষম। তার সব সময় স্বামীর তত্ত্বাবধানের প্রয়োজন হয়। তার প্রয়োজন হল স্নেহ, সহানুভূতি, একটি হাঁসি এবং সত্য ভালবাসার। তার প্রয়োজন হল সুন্দর দিক-নির্দেশনা এবং যথাযথ নসিহতের। সে চায় সুন্দর ও শালীনভাবে, আবেগপ্রবণতার সাথে তাকে আহ্বান করা হোক, কেননা সে হল আপনার সন্তানের জননী। তিনিই তার প্রধান স্কুল। মায়ের সম্পর্কে আমাদেরকে এক সময় বলা হত—
“মা হলেন স্কুল, যদি তুমি তার যথাযথ যত্ন নাও তাহলে তুমি পাবে উন্নত চরিত্রের মানুষ।”
“মা হলো একটি বাগানের মত, যদি তুমি এর যথাযথ পরিচর্যা কর পাতা-পল্লবে ভরা সমৃদ্ধ বাগান তোমায় উপহার দিবে।”
"মা হলেন সকল শিক্ষকের শিক্ষক। তিনি পরিব্যপ্ত হয়ে আছেন তাদের সকল মহিমান্বিত জ্ঞান ও কর্মের মধ্যে।”
আমার এই প্রবন্ধ তাদেরও জন্য-
* যারা চায় সুখ শান্তিময় জীবন যাপন করতে।
* যারা চায় সংসারী ও পারিবারিক জীবনকে সঠিক পথে এবং জান্নাতের দিকে পরিচালনা করতে।
* যারা চায় নিজ বাসাকে বৈবাহিক সুখি জীবনের মডেল হিসেবে গড়ে তুলতে এবং বাসাকে স্কুল হিসেবে গড়ে তুলতে, যেখানে তাদের সন্তান ধার্মিক এবং নিষ্ঠাবান হিসেবে বেড়ে উঠবে।
* যারা চায় তাদের বাসাকে দাওয়াহ্ সেন্টার হিসেবে গড়ে তুলতে, যেখান থেকে আল্লাহর বিধানের অনুসরণের দাওয়াহ দেয়া হবে, উত্তম কাজের আদেশ ও মন্দ কাজের নিষেধ করা হবে।
তাই, অবশ্যই স্ত্রী'র সাথে ব্যবহারের ক্ষেত্রে আমাদের চরিত্রকে উন্নত করতে হবে, এবং স্ত্রীদের যে সকল দায়িত্ব আল্লাহ তায়ালা আমাদের উপর অর্পণ করেছেন আস্থা ও বিশ্বাসের সাথে তা পালন করতে হবে।
আমি দু'আ করি, আল্লাহ তায়ালা যেন আমাদের দুনিয়া এবং আখিরাতের সকল সুখ ও শান্তি দান করুন, এবং শান্তি ও রহমত বর্ষন করুন আমাদের পরম শ্রদ্ধার ও ভালবাসার নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর।
শাইখ ইবরাহিম ইবনু সালেহ আল মাহমুদ
টিকাঃ
¹সুরা রূম: ২১।
²সুরা যুখরুপ: ৭০-৭১।
📄 নারীর প্রতি স্নেহশীল এবং অমায়িক আচরণ
মহান আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন-
وَعَاشِرُوهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ.
“আর নারীদের সাথে সৎভাবে জীবন যাপন কর।”¹
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-
اسْتَوْصُوا بِالنِّسَاءِ، فَإِنَّ المَرْأَةَ خُلِقَتْ مِنْ ضِلَعٍ، وَإِنَّ أَعْوَجَ شَيْءٍ فِي الضَّلَعِ أَعْلَاهُ، فَإِنْ ذَهَبْتَ تُقِيمُهُ كَسَرْتَهُ، وَإِنْ تَرَكْتَهُ لَمْ يَزَلْ أَعْوَجَ، فَاسْتَوْصُوا بِالنِّسَاءِ.
“তোমরা নারিদেরকে উত্তম উপদেশ দিবে। কেননা নারি জাতিকে পাঁজরের হাড় দ্বারা সৃষ্টি করা হয়েছে। আর পাঁজরের হাড়গুলোর হাড়টি অধিক বাঁকা। তুমি যদি তা সোজা করতে যাও, তাহলে তা ভেঙ্গে ফেলবে আর যদি ছেড়ে দাও, তাহলে সব সময় তা বাঁকাই থেকে যাবে। কাজেই নারীদের সাথে উপদেশপূর্ণ কথাবার্তা বলবে।”²
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অন্যত্র বলেন-
اسْتَوْصُوا بِالنِّسَاءِ خَيْرًا، فَإِنَّهُنَّ عِنْدَكُمْ عَوَانٍ، لَيْسَ تَمْلِكُونَ مِنْهُنَّ شَيْئًا غَيْرَ ذَلِكَ، إِلَّا أَنْ يَأْتِينَ بِفَاحِشَةٍ مُبَيِّنَةٍ، فَإِنْ فَعَلْنَ فَاهْجُرُوهُنَّ فِي الْمَضَاجِعِ، وَاضْرِبُوهُنَّ ضَرْبًا غَيْرَ مُبَرِّحٍ، فَإِنْ أَطَعْنَكُمْ فَلَا تَبْغُوا عَلَيْهِنَّ سَبِيلًا، إِنَّ لَكُمْ مِنْ نِسَائِكُمْ حَقًّا،
وَلِنِسَائِكُمْ عَلَيْكُمْ حَقًّا، فَأَمَّا حَقّكُمْ عَلَى نِسَائِكُمْ، فَلَا يُوَطَّتْنَ فُرُشَكُمْ مَنْ تَكْرَهُونَ، وَلَا يَأْذَنَّ فِي بُيُوتِكُمْ لِمَنْ تَكْرَهُونَ، أَلَا وَحَقَّهُنَّ عَلَيْكُمْ أَنْ تُحْسِنُوا إِلَيْهِنَّ فِي كِسْوَتِهِنَّ وَطَعَامِهِنَّ.
"সাবধান, নারীদের সাথে উত্তম ব্যবহার করবে। কেননা তারা তোমাদের নিকট আবদ্ধ আছে। এর অধিক তাদের উপর তোমাদের কর্তৃত্ব নেই যে, তারা যদি প্রকাশ্যে অশ্লীলতায় লিপ্ত হয়, সত্যিই যদি তারা তাই করে, তবে তোমরা তাদেরকে পৃথক বিছানায় রাখবে এবং আহত হয় না এরূপ হালকা মারধর করবে। অতঃপর তারা তোমাদের অনুগত হয়ে গেলে তাদের উপর আর বাড়াবাড়ি করো না।"³
"আমরা অনেকে ঐ সকল ব্যক্তির ঘটনা জানি, যারা তাদের স্ত্রী'র সাথে অত্যন্ত খারাপ ব্যবহার করত, মনে হত স্ত্রী হল মাজলুম দাসী এবং স্বামী হল যালিম মুনিব। তারা স্ত্রী-দের চরম মাত্রায় অপমান করত এবং যন্ত্রণা দিত। এমনকি স্ত্রী'র মুখে প্রহার করত। এর ফলে বাসা ও পরিবার জাহান্নামে পরিণত হয়েছিল।” কোনো উত্তম চরিত্রের অধিকারী পুরুষ থেকে কখনো এমন আচরণ আশা করা যায় না। ইসলামে এটা নিষিদ্ধ। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শেষ আদেশের মধ্যে একটি ছিল-
"নারীদের সাথে উত্তম ব্যবহার করবে।” ইবনু মু'আবিয়াহ্ আল কুশায়রী রহিমাহুল্লাহ তাঁর পিতা হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন-
أَنَّ رَجُلًا سَأَلَ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَا حَقُّ الْمَرْأَةِ عَلَى الزَّوْجِ؟ قَالَ: أَنْ يُطْعِمَهَا إِذَا طَعِمَ، وَأَنْ يَكْسُوهَا إِذَا اكْتَسَى، وَلَا يَضْرِب الْوَجْهَ، وَلَا يُقَبِّحُ، وَلَا يَهْجُرُ إِلَّا فِي الْبَيْتِ.
“হে আল্লাহর রাসুল! স্ত্রীগণ আমাদের ওপর কী অধিকার রাখে? উত্তরে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, তুমি যখন খাও, তখন তাকেও খাওয়াও; তুমি যখন পরিধান কর, তখন তাকেও পরিধান করাও; মুখমণ্ডলে আঘাত করো না, তাকে গালি দিও না, (প্রয়োজনে ঘরে বিছানা পৃথক করতে পার), কিন্তু একাকিনী অবস্থায় রাখবে না।”
হে আমার মুসলিম ভাই, আমি আপনাকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি। আপনারা স্ত্রীর সাথে খুবই নম্র ও স্নেহশীল আচরণ করুন। তাকে সম্মান করুন, বিশেষ করে সন্তানদের সামনে। যদি আপনি তার ব্যক্তিত্বকে অবমূল্যায়ন করেন তাহলে তা আপনার জন্য ভয়ঙ্কর পরিণাম বয়ে আনবে। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-
أَكْمَلَ الْمُؤْمِنِينَ إِيمَانًا أَحْسَنُهُمْ خُلُقًا وَخِيَارُكُمْ خِيَارُكُمْ لِنِسَائِهِمْ
“পূর্ণ মুমিন সে, যার চরিত্র সবচেয়ে সুন্দর। আর তোমাদের মধ্যে উত্তম সে, যে তার স্ত্রীর কাছে উত্তম।”⁵
প্রিয় ভাই, এই ক্ষণস্থায়ী দুনিয়ায় তুমি পরিপূর্ণতার তালাশ করো না, এখানের কেউ পরিপূর্ণ নয়। হ্যাঁ তুমি সর্বাধিক উত্তম কিছু বেছে নিতে পার। তুমি কতটুকু পরিপূর্ণ তা কখনো কী তুমি ভেবে দেখেছো? প্রকৃতপক্ষে আমাদের সকলের অবস্থান অভিন্ন, এখানে অন্যদের থেকে পরিপূর্ণতার আকাঙ্ক্ষা করা উচিত নয়। আমরা নারীদের চাইতে বেশি শক্তিশালী, কিন্তু ভুলে গেলে চলবে না আল্লাহ আমাদের চাইতে শক্তিশালী। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-
لا يَفْرَكْ مُؤْمِنٌ مُؤْمِنَةٌ أَنْكَرِهَ مِنْهَا خُلُقًا رَضِيَ مِنْهَا آخَرَ.
“কোনো মু’মিন পুরুষ যেন কোনো মু’মিন নারীকে ঘৃণা না করে। তার কোনো একটি অভ্যাস তার কাছে খারাপ লাগলেও অপরটি ভালো লাগবে।”⁶
টিকাঃ
¹সুরা নিসা: ১৯।
²সহিহ বুখারি: ৩৩৩১, মুসলিম: ১৪৬৮।
³সুনানু তিরমিযি, ইবনু মাজাহ : ১৮৫১। হাদিস হাসান।
⁵সুনানু তিরমিযি : ১১৬২।
⁶ইবনু মাজাহ : ১৮৫০। সনদ সহিহ।
📄 স্ত্রীর অধিকার
হাসান ইবনুল আলি রহিমাহুল্লাহকে এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করেন, “আমার একটি কন্যা আছে, এবং তার বিয়ের বয়স হয়েছে, আমি কার সাথে তার বিবাহ দিবো? হাসান রহিমাহুল্লাহ বলেন, “তাকে এমন কারোর সাথে বিয়ে দিন, যে আল্লাহকে ভয় করে। এতে সে তাকে (আপনার কন্যাকে) পছন্দ করলে তার প্রতি দয়ালু ও স্নেহশীল থাকবে, এবং সে যদি তাকে অপছন্দ করে তবুও সে তার সাথে অন্যায়মূলক আচরণ করবে না।”¹
স্ত্রীর অধিকার
স্বামীর প্রতি স্ত্রী’র কিছু অধিকার রয়েছে। আল্লাহ তায়ালা কুর’আন কারিমায় বলেন-
وَلَهُنَّ مِثْلُ الَّذِي عَلَيْهِنَّ بِالْمَعْرُوفِ وَلِلرِّجَالِ عَلَيْهِنَّ دَرَجَةً وَاللَّهُ عَزِيزٌ حَكِيمٌ.
“নারীদের তেমনি ন্যায়সংগত অধিকার আছে যেমন আছে তাদের উপর পুরুষদের; এবং তাদের উপর পুরুষদের শ্রেষ্ঠত্ব রয়েছে। আল্লাহ হচ্ছেন মহা পরাক্রান্ত, প্রজ্ঞাময়।”²
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “পুরুষদের অধিকার রয়েছে স্ত্রীদের উপর, এবং স্ত্রীদের অধিকার রয়েছে তোমাদের উপর।”³
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এক সাহাবি তাকে জিজ্ঞেস করেন-
قُلْتُ يا رسول الله، مَا حَقُّ الْمَرْأَةِ عَلَى الزَّوْجِ؟ قَالَ: أَنْ يُطْعِمَهَا إِذَا طَعِمَ، وَأَنْ يَكْسُوَهَا إِذَا اكْتَسَى، وَلَا يَضْرِبُ الْوَجْهَ، وَلَا يُقَبِّحُ، وَلَا يَهْجُرُ إِلَّا فِي الْبَيْتِ.
"হে আল্লাহর রাসুল! স্ত্রীগণ আমাদের ওপর কী কী অধিকার রাখেন? উত্তরে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, "তুমি যখন খাও, তখন তাকেও খাওয়াও; তুমি যখন পরিধান কর, তখন তাকেও পরিধান করাও, মুখমণ্ডলে আঘাত করো না, তাকে গালি দিও না, (প্রয়োজনে ঘরে বিছানা পৃথক করতে পার), কিন্তু একাকিনী অবস্থায় রাখবে না।”⁴
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাহিস সাল্লাম বলেছেন, “ন্যায়পরায়ণরা দয়াময় আল্লাহর ডানপাশে নূরের সিংহাসনে অবস্থান করবে। তাঁর দুটি হাতই ডান। যারা ইনসাফ করে বিচারের ক্ষেত্রে, পরিবারের ব্যাপারে এবং অর্পিত দায়িত্ব পালনের সময়।”⁵
ইবনুল আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, “আমি নিজেকে আমার স্ত্রীর জন্য সাজাতে পছন্দ করি, ঠিক যেভাবে আমি চাই আমার স্ত্রী আমার জন্য সাজুক।"
টিকাঃ
¹আল-ইকদুল ফারিদ।
²সুরা বাকারা : ২২৮।
³আত তিরমিযি : ১১৫৯, সনদ সহিহ।
⁴ইবনু মাজাহ : ১৮৫০; মুস্তাদরাকে হাকেম: ২৭৬৪। সনদ সহিহ।
⁵সহিহ মুসলিম : ৪৮২৫।
📄 স্ত্রীর অন্যান্য অধিকার
১. উত্তম সঙ্গী
وَعَاشِرُوهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ.
"আর তোমরা তাদের সাথে সৎভাবে জীবনযাপন করবে।”¹
২. শিক্ষা। একজন নারীকে দীনের প্রয়োজনীয় সকল ইলম শিক্ষা দিতে হবে।
৩. সৎ কাজের আদেশ এবং অসৎ কাজের নিষেধ করতে হবে। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুর'আনে বলেন-
وَأْمُرْأَهْلَكَ بِالصَّلُوةِ وَاصْطَبِرْ عَلَيْهَا.
"আর তোমার পরিবারবর্গকে সালাতের আদেশ দাও এবং তাতে অবিচল থাক."²
يَأَيُّهَا الَّذِينَ ءَامَنُوا قُوا أَنفُسَكُم وَأَهْلِيكُم نَارًا وَقُودُهَا النَّاسِ وَالْحِجَارَةُ.
“হে বিশ্বাস স্থাপনকারীগণ! তোমরা নিজেদেরকে এবং তোমাদের পরিবার পরিজনকে রক্ষা কর অগুন হতে, যার ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর।”³
৪. ঈর্ষার ক্ষেত্রে মধ্যমপন্থা অবলম্বন করা।
৫. দেনমহর। وَآتُوا النِّسَاءَ صَدُقَاتِهِنَّ نِحْلَةً فَإِن طِبْنَ لَكُمْ عَن شَيْءٍ مِّنْهُ نَفْسًا فَكُلُوهُ هَنِيئًا مَّرِيئًا.
"তোমরা নারীদেরকে তাদের মোহর সন্তুষ্ট মনে দিয়ে দাও, পরে তারা খুশী মনে মোহরের কিয়দংশ ছেড়ে দিলে তোমরা তা স্বাচ্ছন্দে ভোগ কর।”⁴
৬. ভরণ-পোষণ। وَعَلَى الْمَوْلُودِ لَهُ رِزْقُهُنَّ وَكِسْوَتُهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ لَا تُكَلِّفُ نَفْسٌ إِلَّا وُسْعَهَا.
"আর পিতার উপর কর্তব্য, বিধি মোতাবেক মা'দের খোর-পোষের দায়িত্ব নেওয়া। সাধ্যের অতিরিক্ত কোন ব্যক্তিকে দায়িত্ব প্রদান করা হয় না।”⁵
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, "খাদ্যের অপচয় করা একজন মহিলার জন্য পাপ হিসেবে যথেষ্ট হবে।”
৭. যদি একাধিক স্ত্রী থাকে তবে ইনসাফপূর্ণ আচরণ করতে হবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-
إِذَا كَانَ عِنْدَ الرَّجُلِ امْرَأَتَانِ فَلَمْ يَعْدِلْ بَيْنَهُمَا جَاءَ يَوْمَ القِيَامَةِ وَشِقُهُ سَاقِطٌ.
“যদি একজন মানুষের দুইজন স্ত্রী থাকে, এবং সে তাদের মাঝে ইনসাফ রক্ষা করে না, তাহলে পুনরুত্থানের দিন তার এক পাশ ঝুলন্ত অবস্থায় থাকবে।”⁶
৮. মন্দ আচরণ না করা, এবং তার আবেগের সম্মান করা। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সবসময় পরিবারকে সাহায্য করতেন, তিনি নিজের জুতা নিজে সেলাই করতেন, নিজের কাপড় সেলাই করতেন, নিজেই মেঝে পরিষ্কার করতেন। হাদিসে এসেছে-
كَانَ يَخِيطُ ثَوْبَهُ، وَيَخْصِفُ نَعْلَهُ، وَيَعْمَلُ مَا يَعْمَلُ الرِّجَالُ فِي بيوتهم.
“রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কাপড় সেলাই করতেন, জুতাকে তালি লাগাতেন। এছাড়াও অন্যান্য কাজ করতেন, যেগুলো গৃহে অন্যান্য পুরুষেরা করেনা।”⁷
আসওয়াদ রাদিয়াল্লাহু আনহু আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে জিজ্ঞেস করলেন, "রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘরে কি করেন? আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন, তিনি ঘরোয়া কাজকর্মে ব্যস্ত থাকেন, নামাজের সময় হলে নামাজ পড়তে যান। আয়েশা রাদিয়াল্লাহুকে আরো প্রশ্ন করা হলো, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘরে কী করেন? আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন, তিনি তো তোমাদের মতই মানুষ। তিনি নিজ কাপড়ে তালি লাগান। বকরীর দুধ দোহন করেন, এবং নিজের যত্ন নেন।”⁸
৯. তার গোপনীয়তা ফাঁস না করা, এবং তার দোষ ত্রুটি অন্যের নিকট না বলা। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-
إِنَّ مِنْ أَشَرِّ النَّاسِ عِنْدَ اللَّهِ مَنْزِلَةً يَوْمَ الْقِيَامَةِ الرَّجُلَ يُفْضِي إِلَى امْرَأَتِهِ، وَتُفْضِي إِلَيْهِ، ثُمَّ يَنْشُرُ سِرَّهَا.
"বিচার দিবসে আল্লাহর নিকট মানুষদের মধ্যে সবচে' নিকৃষ্ট ঐ মানুষ হবে, যে তার স্ত্রীর সাথে মিলিত হয়, অতঃপর তার (স্ত্রীর) গোপনীয়তা ফাঁস করে।”⁹
১০. তার পিতামাতা, পরিবার এবং প্রতিবেশীদের সাথে দেখা সাক্ষাতের অনুমতি দেয়া।
১১. স্ত্রীকে অসৎ নারীদের সাথে মেলামেশা করতে না দেয়া। যে সকল নারী নোংরা এবং পাপ কাজ করে, তাদের থেকে স্ত্রীকে দূরে রাখা। অশালীন ম্যাগাজিন, বই, নোংরা ও অশ্লীল মুভি ইত্যাদি দেখা, শোনা ও পড়ার অনুমতি না দেয়া।
১২. রাতে অত্যাধিক বিলম্বে বাসায় না ফেরা। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-
وَإِنَّ لِزَوْجِكَ عَلَيْكَ حَقًّا.
"তোমার উপর তোমার স্ত্রীর অধিকার রয়েছে।”¹⁰
১৩. স্ত্রী যদি (দ্বীনের ভিতর সীমাবদ্ধ থেকে) কাজ করে তাহলে তার বেতন না নেয়া, মিরাস সূত্রে যদি সে সম্পদ পায় তাও না নেয়া।
টিকাঃ
¹সুরা নিসা: ১৯।
²সুরা তাহা: ১৩২।
³সুরা আত তাহরিম: ৬।
⁴সুরা নিসা : ৪।
⁵সুরা বাকারা: ২৩৩।
⁶সুনানু তিরমিযি: ১১৪১। সনদ সহিহ।
⁷মুসনাদে আহমাদ: ২৪৯০৩। সনদ সহিহ।
⁸সহিহ বুখারি: ৬৭২।
⁹সহিহ মুসলিম: ১৪৩৭।
¹⁰সহিহ মুসলিম: ৫১৯৯।