📄 কাজের মাধ্যমে আলস্য দূর করুন
পৃথিবীতে বেকার, অকর্মণ্য ও অনুৎপাদনশীল তারাই, যারা অলস, অনুৎসাহী ও গল্পগুজব করে সময় নষ্ট করে।
رَضُوا بِأَنْ يَكُونُوا مَعَ الْخَوَالِفِ
তারা পিছনে পড়ে থাকা লোকদের সাথে থেকে যেতে পেরে আনন্দিত হয়েছে। [সূরা তাওবা : ৮৭]
কর্মহীন হয়ে বেকার বসে থাকা খুবই খারাপ কথা। এমন ব্যক্তির মস্তিষ্ক এক সময় শয়তানের কারখানায় পরিণত হবে। সে লাগামহীন উটের ন্যায় এদিক-ওদিক উদ্ভ্রান্ত হয়ে ঘুরে বেড়াবে।
যখন আপনি কাজ ছেড়ে অলস হয়ে যাবেন, তখন দুশ্চিন্তা, পেরেশানী ও উদ্বিগ্নতা আপনাকে ঘিরে ধরবে। অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যতের ফাইল আপনার সামনে খুলে যাবে। আপনি তখন মুশকিলে পড়ে যাবেন। আপনার প্রতি আমার আন্তরিক উপদেশ, আপনি আলস্য পরিহার করে কোনো না কোনো ভালো কাজে লেগে যান। বেকার থাকা মানে নিজেকে নিজে জীবন্ত কবর দিয়ে দেওয়া; আত্মহত্যা করা।
আলস্যের উদাহরণ হচ্ছে সেই টর্চার সেলের ন্যায়, যা চীনের কয়েদখানাগুলোতে থাকে। যেখানে বন্দীদেরকে এমন একটি পানির টেপের নীচে রাখা হয়, যেখান থেকে প্রতি মিনিটে একটি করে পানির ফোঁটা পড়ে। ওই এক ফোঁটা পানির অপেক্ষায় থেকে থেকে কয়েদি বেচারারা পাগল হয়ে যায়।
আরামপ্রিয়তা- আলস্য ও উদাসীনতার আরেক নাম। অবসর ও আলস্য এক পেশাদার চোর। আর আপনার মন হচ্ছে তার বলি বা শিকার। সুতরাং, যখন আপনি অবসর থাকেন, তখন সালাতে দাঁড়িয়ে যান। তিলাওয়াত করুন। বই পড়ুন। লেখালেখি করুন। ব্যায়াম করুন। অফিসটাকে পরিপাটি করুন। ঘরবাড়ি পরিষ্কার করুন। অন্যদের কাজ করে দিন। কাজের চাকু দিকে অবসরকে কেটে দিন। বিজ্ঞ ডাক্তার ও চিকিৎসকগণ এর বিনিময়েই আপনাকে পঞ্চাশ ভাগ সুখের গ্যারান্টি দিয়ে থাকেন।
কৃষক, মজুর ও শ্রমিকদের দেখুন! তারা কীভাবে পাখির মতো ফুরফুরে মেজাজে গান গেয়ে যায়। কারণ, তারা সুখী। তারা পরিতৃপ্ত। পক্ষান্তরে আপনি বিছানায় শুয়ে এপাশ-ওপাশ করেন আর চোখের পানি মোছেন। কারণ, আলস্য আপনাকে শেষ করে দিয়েছে।
📄 ফলপ্রসূ কাজে লিপ্ত থাকুন
ওলীদ ইবনে মুগীরা, উমাইয়া ইবনে খালফ এবং আস ইবনে ওয়ায়েল ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে তাদের ধন-সম্পদ অকাতরে খরচ করেছিল।
فَسَيُنْفِقُوْنَهَا ثُمَّ تَكُونُ عَلَيْهِمْ حَسْرَةً ثُمَّ يُغْلَبُونَ *
অতএব, তারা ধন-সম্পদ ব্যয় করতেই থাকবে। অতঃপর তা তাদের মনস্তাপের কারণ হবে। তারপর তারা পরাজিত হবে। [সূরা আনফাল : ৩৬]
অথচ বহু মুসলমান কৃপণতা করে তাদের ধন-সম্পদ সঞ্চয় করছে এবং সেগুলোকে কল্যাণকর কাজে ব্যয় করছে না।
وَمَنْ يَبْخَلُ فَإِنَّمَا يَبْخَلُ عَنْ نَّفْسِهِ আর যে ব্যক্তি কৃপণতা করে, সে তো কার্পণ্য করে নিজেরই প্রতি। [সূরা মুহাম্মাদ : ৩৮]
এ-ই হচ্ছে পাপীদের দৃঢ়তা ও ঈমানদারদের দুর্বলতার উদাহরণ।
গোল্ড মেয়ার ছিল এক ইহুদী মহিলা। সে তার 'হিংসা-বিদ্বেষ' নামক স্মারক গ্রন্থে লিখেছে, জীবনের একটা সময়ে সে বিরতিহীন ষোল ঘণ্টা কাজ করত। কী উদ্দেশ্যে সে এত পরিশ্রম করত? তার মিথ্যা মূলনীতি ও ভ্রান্ত মতবাদের সেবা ও প্রতিষ্ঠাকল্পে। সে ও বেন গুরিয়ান নিরলস পরিশ্রম করতে করতে অবশেষে একদিন ইহুদী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছিল। যার ইচ্ছা হয় তিনি তার বই পড়ে দেখতে পারেন।
অপর দিকে হাজারো মুসলমান এমন আছে, যারা দিনে এক ঘণ্টাও কাজ করে না। তাদের একমাত্র কাজ হচ্ছে খেল-তামাশা, হাসি-মজাক আর খেয়ে-দেয়ে ঘুমিয়ে সময় নষ্ট করা।
مَا لَكُمْ إِذَا قِيلَ لَكُمُ انْفِرُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ اثَّاقَلْتُمْ إِلَى الْأَرْضِ তোমাদের কী হল, তোমাদেরকে যখন বলা হয় যে, তোমরা আল্লাহর রাস্তায় অভিযানে বের হও, তখন তোমরা ভারাক্রান্ত হয়ে মাটিতে ঝুঁকে পড়? [সূরা তাওবা : ৩৮]
উমর দিন-রাত কাজ করতেন। খুব সামান্য পরিমাণই ঘুমাতেন। একবার তাঁর পরিবারের লোকেরা তাঁকে জিজ্ঞাসা করল, 'আপনি ঘুমান না কেন?' তিনি উত্তর দিলেন, 'আমি যদি [ইবাদত বাদ দিয়ে] রাতে ঘুমিয়ে থাকি, তা হলে আমার আত্মা ধ্বংস হয়ে যাবে, আর যদি দিনে [প্রজাদের খোঁজ-খবর না নিয়ে] ঘুমিয়ে থাকি, তা হলে আমার প্রজারা ধ্বংস হয়ে যাবে।'
ইহুদী গুপ্ত ঘাতক মূশী দাইয়ানের স্মারক গ্রন্থ 'তলোয়ার ও শাসন' থেকে জানা যায়, সে সর্বদাই চলাফেরায় ও কর্মব্যস্ত থাকত। আজ এ দেশে তো কাল আরেক দেশে; আজ এ শহরে তো কাল অপর শহরে। ছুটে বেড়াত। বিভিন্ন মিটিং ও সভায় যোগ দিত। কনফারেন্সে অংশগ্রহণ করত। সর্বদা চুক্তি ও সন্ধি করে বেড়াত। এরই মাঝে সে আবার তার ডায়েরিও লিখত।
আমি মনে মনে বললাম, হায় আফসোস! এক অভিশপ্ত ইহুদী কী পরিশ্রমটাই না করে গেছে! আর মুসলমান কতটা অপারগ ও অকর্মণ্য হয়ে বসে আছে। এ-ও পাপীদের চেষ্টা-মেহনত ও ঈমানদারদের দুর্বলতা ও অপারগতার একটি উদাহরণ।
অলসতা, অকর্মণ্যতা ও বেকার থাকাকে উমর এত বেশি ঘৃণা করতেন যে, যেসব যুবক মসজিদে বাস করত, তিনি তাদেরকে মসজিদ থেকে বের করে দিয়েছিলেন। তিনি তাদেরকে শাস্তি দিয়ে বলেছিলেন, 'যাও! বাইরে গিয়ে রিযিক তালাশ কর। কারণ, আকাশ থেকে সোনা-রূপার বৃষ্টি বর্ষিত হবে না।'
অলসতা, অকর্মণ্যতা ও বেকারত্ব- হতাশা, দুশ্চিন্তা ও বিভিন্ন মানসিক রোগের জন্ম দেয়। পক্ষান্তরে কাজকর্ম তৃপ্তি ও সুখ বয়ে আনে। সমস্ত মানুষই যদি আপন আপন জীবনের দায়িত্ব ও কাজকর্ম আঞ্জাম দিতে থাকে, তা হলে উপরোল্লিখিত যাবতীয় রোগ সমূলে বিনাশ হয়ে যাবে। সমাজ উন্নত, উৎপাদনশীল ও সমৃদ্ধ হবে।
وَقُلِ اعْمَلُوا আর তুমি বলে দাও, তোমরা কাজ করে যাও। [সূরা তাওবা : ১০৫]
فَانْتَشِرُوا فِي الْأَرْضِ ) তোমরা [রিযিক তালাশের জন্য] জমিনে ছড়িয়ে পড়। [সূরা জুমুআ : ১০]
سَابِقُوا إِلَى مَغْفِرَةٍ مِّنْ رَّبِّكُمْ وَجَنَّةٍ তোমরা তোমাদের প্রভুর ক্ষমা ও জান্নাতের জন্য একে অপরের সাথে প্রতিযোগিতা কর। [সূরা হাদীদ: ২১]
রাসূলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন- 'আল্লাহর নবী দাউদ নিজ হাতের উপার্জন খেতেন।'
শায়েখ রাশেদ তাঁর صَنَاعَةُ الْحَيَاةِ নামক কিতাবে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। সেখানে তিনি লিখেছেন, বহু মানুষ তাদের জীবনের যিম্মদারী ও দায়িত্বসমূহ আদায় করে না। কত মানুষ জীবিত থাকা সত্ত্বেও মৃত। তারা জীবনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে সম্পূর্ণরূপে অজ্ঞ। না তারা নিজেদের ভবিষ্যত গড়ে না জাতির জন্য কল্যাণকর কোনো কাজ করে। বরং-
رَضُوا بِأَنْ يَكُونُوا مَعَ الْخَوَالِفِ তারা পেছনে রয়ে যাওয়া লোকদের সঙ্গে থেকে যেতে পেরে আনন্দিত হয়েছে। [সূরা তাওবা : ৮৭]
لَا يَسْتَوِي الْقُعِدُونَ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ غَيْرُ أُولِي الضَّرَرِ وَالْمُجْهِدُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ بِأَمْوَالِهِمْ وَأَنْفُسِهِمْ যেসব মুমিন অক্ষম নয় অথচ ঘরে বসে থাকে এবং যারা আল্লাহর পথে নিজেদের জান-মাল নিয়ে জিহাদ করে, তারা সমান নয়। [সূরা নিসা : ৯৫]
যে কৃষ্ণাঙ্গ নারী মসজিদে নববী পরিষ্কার করত, সে তার জীবনের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য সম্পর্কে অবগত ছিল এবং সাধ্যানুযায়ী সে নিজের কর্তব্য আঞ্জাম দিয়েছিল। বিনিময়ে জান্নাত লাভ করেছিল।
وَلَامَةٌ مُؤْمِنَةٌ خَيْرٌ مِّنْ مُّشْرِكَةٍ وَلَوْ أَعْجَبَتْكُمْ ، অবশ্যই একজন মুমিন দাসী একজন মুশরিক নারী থেকে উত্তম, যদিও মুশরিক নারীর রূপ তোমাদেরকে বিমোহিত করে। [সূরা বাকারা : ২২১]
অনুরূপভাবে যে ছেলেটি নবীজী ﷺ-এর মিম্বার বানিয়ে দিয়েছিল, সে-ও তার সাধ্যানুসারেই অবদান রেখেছিল। কেননা, সে কাঠমিস্ত্রির কাজ করত। সে-ও তার কর্মের প্রতিদান পেয়েছিল।
وَالَّذِينَ لَا يَجِدُونَ إِلَّا جُهْدَهُمْ ) আর যারা তাদের শ্রম ছাড়া অন্য কিছু [আল্লাহর পথে ব্যয় করার মতো] পায় না। [সূরা তাওবা : ৭৯]
১৯৮৫ সালে আমেরিকার সরকার মুসলিম ধর্মপ্রচারকদের জন্য বন্দীদের মাঝে ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে তাদের জেলখানার দরজা খুলে দিয়েছিল। কেননা, আমেরিকা ভালোভাবেই জানত যে, সেসব অপরাধী, মাদক ব্যবসায়ী ও খুনীরা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করলে ভালো মানুষ হয়ে সমাজের উৎপাদনশীল নাগরিকে পরিণত হবে।
﴿اَوَ مَنْ كَانَ مَيْتًا فَأَحْيَيْنٰهُ وَ جَعَلْنَا لَهٗ نُوْرًا يَمْشِيْ بِهٖ فِي النَّاسِ كَمَنْ مَّثَلُهٗ فِي الظُّلُمٰتِ ﴾
যে ব্যক্তি মৃত ছিল [অর্থাৎ আধ্যাত্মিকভাবে মৃত ছিল] পরে আমি তাকে জীবিত করেছি এবং আমি তার জন্য আলো সৃষ্টি করেছি, যার সাহায্যে সে মানুষের মাঝে চলাফেরা করে, সেকি তার মতো যে [কুফরীর] অন্ধকারে নিমজ্জিত? [সূরা আনআম : ১২২]
বিপদ-আপদে, বালা-মসিবতে নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখা ও নিজের যাবতীয় কাজ সুষ্ঠুভাবে আঞ্জাম দেওয়া সংক্রান্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও উপকারী দু’টি দোয়া পবিত্র হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। তার একটি হচ্ছে আলী থেকে বর্ণিত, যেখানে রাসূলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন-
اللَّهُمَّ اهْدِنِي وَ سَدَّدْنِي. হে আল্লাহ! আমাকে হেদায়েত দান করুন এবং সঠিক পথ প্রদর্শন করুন।
দ্বিতীয়টি ইমাম আবু দাউদ বর্ণনা করেছেন, হুছাইন ইবনে উবাইদ থেকে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ তাঁকে বলেছেন-
قُلْ : اللَّهُمَّ أَلْهِمْنِي رُشْدِي ، وَقِنِي شَرَّ نَفْسِي. তুমি বল, হে আল্লাহ! আপনি আমাকে আমার হেদায়েতের দিশা দান করুন এবং আমাকে আমার প্রবৃত্তির অনিষ্ঠ থেকে রক্ষা করুন।
দুনিয়ার জীবনের প্রতি আসক্তি, দীর্ঘ জীবনের আকাঙ্ক্ষা এবং মৃত্যুর ভয়- এগুলি এমন বিষয়, যার ফলে দুশ্চিন্তা, উদ্বিগ্নতা, নিদ্রাহীনতা, হতাশা, অস্থিরতাসহ বিভিন্ন ধরনের মানসিক রোগের জন্ম হয়।
পার্থিব জীবনের প্রতি ইহুদীরে চরম আসক্তির কারণে আল্লাহ তাদের নিন্দা করেছেন। যেমন, পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে-
وَلَتَجِدَنَّهُمْ أَحْرَصَ النَّاسِ عَلَى حَيَاةٍ وَمِنَ الَّذِينَ أَشْرَكُوا يَوَدُّ أَحَدُهُمْ لَوْ يُعَمَّرُ أَلْفَ سَنَةٍ وَمَا هُوَ بِمُزَحْزِحِهِ مِنَ الْعَذَابِ أَنْ يُعَمَّرَ وَاللَّهُ بَصِيرٌ بِمَا يَعْمَلُونَ
তুমি অবশ্যই তাদেরকে [অর্থাৎ ইহুদীদেরকে] জীবনের প্রতি সকল মানুষের চেয়ে বেশি এমনকি মুশরিকদের চেয়েও বেশি লোভী দেখতে পাবে। তাদের প্রত্যেকেই আকাঙ্ক্ষা করে যে, যদি তাকে হাজার বছরের দীর্ঘ জীবন দান করা হত! [তবে কতই না ভালো হত] কিন্তু দীর্ঘ জীবন তো তাদেরকে শাস্তি থেকে রেহাই দিতে পারবে না। আর তারা যা করছে আল্লাহ তাআলা তার সবকিছুই দেখেন। [সূরা বাকারা : ৯৬]
এ আয়াতের কয়েকটি বিষয় গুরুত্বের সাথে লক্ষ্যণীয়। যেমন, প্রথমত, আল্লাহ আয়াতে কারীমায় : حَيَاةٍ [হায়াত] শব্দটিকে نكرة [অনির্দিষ্ট বিশেষ্য] রূপে উল্লেখ করেছেন। যা এ কথা বোঝায় যে, সাধারণ থেকে অতি সাধারণ জীবন, তুচ্ছ থেকে অতি তুচ্ছ এমনকি চতুষ্পদ জন্তু-জানোয়ারদের জীবনের ন্যায় হীন জীবন হলেও সে জীবন ইহুদীরে কাছে খুব প্রিয়।
দ্বিতীয়ত, 'হাজার বছর' কথাটিকে আল্লাহ এজন্য নির্বাচন করেছেন যে, ইহুদীরা একে অপরের সঙ্গে সাক্ষাৎকালে 'হাজার বছর বেঁচে থেকো' বলে অভিবাদন জানাত। এখানে আল্লাহ তাদের সে কথাই উল্লেখ করে বুঝিয়ে দিচ্ছেন যে, তারা এমন দীর্ঘ জীবন কামনা করে! আচ্ছা! যদি তারা হাজার বছরের দীর্ঘ জীবন পেয়েও যায়, তারপর কী হবে? পরিণতি তো সেই জাহান্নامই!
وَلَعَذَابُ الْآخِرَةِ أَخْزَى وَهُمْ لَا يُنْصَرُونَ
আখেরাতের শাস্তি অবশ্যই সবচেয়ে বেশি অপমানকর। আর তাদেরকে কোনোরূপ সাহায্য করা হবে না। [সূরা হা-মীম-সেজদা : ১৬]
নিম্নোক্ত এই আরবী প্রবাদটি কতই না সুন্দর-
لَا هَمَّ وَاللَّهُ يُدْعَى. যখন আল্লাহকে আহ্বান করা হয়, তখন দুশ্চিন্তার কোনো কারণ নেই।
এর অর্থ হচ্ছে আসমানে আল্লাহ আছেন, যিনি বান্দার দোয়া শোনেন; যিনি আহ্বানকারীর আহ্বানে সাড়া দেন। তা হলে কেন আর দুশ্চিন্তা? কেন এত পেরেশানী?
আপনি যদি আপনার যাবতীয় বিষয়াদি আল্লাহ-র কাছে সোপর্দ করে দেন, তা হলে তিনি তার সমাধান করে দিবেন। আপনার দুশ্চিন্তা ও পেরেশানী দূর করে দিবেন।
اَمَّنْ يُجِيبُ الْمُضْطَرَّ إِذَا دَعَاهُ وَيَكْشِفُ السُّوءَ [তোমাদের দেবতাগণ ভালো] না কি তিনি ভালো, যিনি বিপদগ্রস্তের ডাকে সাড়া দেন এবং বিপদ দূর করেন? [সূরা নামল : ৬২]
وَإِذَا سَأَلَكَ عِبَادِي عَنِّي فَإِنِّي قَرِيبٌ أُجِيبُ دَعْوَةَ الدَّاعِ إِذَا دَعَانِ আর আমার বান্দারা যখন তোমার কাছে জিজ্ঞাসা করে আমার ব্যাপারে, বস্তুত আমি রয়েছি সন্নিকটে। যারা প্রার্থনা করে তাদের প্রার্থনা কবুল করি, যখন তারা আমার কাছে প্রার্থনা করে। [সূরা বাকারা : ১৮৬]
একজন আরব কবি বলেছেন- 'ধৈর্যশীল ব্যক্তি কতই না উত্তমরূপে তার উদ্দেশ্য লাভ করতে পারে। আর যে অনবরত দরজায় কড়া নাড়ে, সে কতই না উত্তমরূপে ভিতরে প্রবেশ করতে পারে।'
উমর বলতেন- حَاسِبُوا أَنْفُસَكُمْ قَبْلَ أَنْ تُحَاسَبُوا وَزِنُوا أَنْفُસَكُمْ قَبْلَ أَنْ تُوزَنُوا তোমরা তোমাদের কর্মের হিসাবনিকাশ করো, কেয়ামতের দিন হিসাবের মুখোমুখি হওয়ার আগে। এবং নিজেদের পরিমাপ করো,
কেয়ামতের দিন আমলের পরিমাপ অনুষ্ঠিত হওয়ার আগে। [মুসান্নাফে ইবনে আবি সাইবা]
হাসান বসরী বলেছেন, মুমিন মাত্রকেই দেখবে, সে নিজের মুহাসাবা করছে।
তিনি আরও বলেছেন, বান্দা ততক্ষণই ভালো থাকে, যতক্ষণ তার নিজের ভিতরে উপদেশ দানকারী থাকে এবং সে হিম্মতের সাথে মুহাসাবা করে।
মাইমুন ইবনে মেহরান বলেছেন, একজন প্রকৃতি মুত্তাকী নিজের সাথে এমন শক্ত হিসাব-নিকাশ করে থাকেন, একজন কাঞ্জুস অংশদারও যা করে না।
সুতরাং আমলের আগে মনের সাথে এখলাস ও আনুগত্য নিয়ে বোঝাপড়া করতে হবে। খোঁজ নিতে হবে আল্লাহ -র ভালোবাসা এবং আল্লাহ -র জন্য ভালোবাসা অন্তরে আছে কি না? এর জন্য কোশিশ করতে হবে। আমলের পরও বোঝাপড়া করতে হবে ত্রুটিবিচ্যুতি এবং এখলাসের অভাব কতখানি ঘটল, তা নিয়ে।
সন্দেহ নেই এই দুটি কাজ কলবের রোগব্যাধির চিকিৎসার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। আল্লাহ বলেন- b وَالَّذِينَ جَاهَدُوا فِيْنَا لَنَهْدِيَنَّهُمْ سُبُلَنَا * যারা আমার পথে মুজাহাদা করে, আমি তাদেরকে আমার রাস্তা-গুলো দেখিয়েই দিই। [সুরা আনকাবুত : ৬৯]
📄 নিজের হিসাব রাখুন
আপনার নিজের কাছে একটি ডায়েরি রাখুন এবং এতে নিজের হিসাব রাখুন। ডায়েরিতে আপনার মন্দ অভ্যাসসমূহ, আপনার ব্যক্তিত্ব ও কাজকর্মের জন্য ক্ষতিকর দিকগুলো লিখে রাখুন এবং সেগুলো থেকে নিজেকে মুক্ত করার যথাযথ চেষ্টা করতে থাকুন।
আমরা আমাদের দৈনন্দিন জীবনে তিনটি ভুল বরাবরই করে থাকি। যথা-
১. সময় নষ্ট করা।
২. অনর্থক কথাবার্তা বলা। রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন- 'অনর্থক কথা-কাজ পরিত্যাগ করা ব্যক্তির ইসলামের সৌন্দর্যের অন্তর্ভুক্ত।'
৩. তুচ্ছ, নগণ্য ও গুরুত্বহীন বিষয়ে খুব বেশি মনোযোগ দেওয়া। উদাহরণস্বরূপ, গুজবে কান দেওয়া, দুশ্চিন্তার উদ্রেককারী ও হিম্মত বিনষ্টকারী লোকদের কথা ও ভবিষ্যতবাণী বিশ্বাস করা। এসবের ফলে বুদ্ধিনাশ, দুশ্চিন্তা ও পেরেশানী তো সৃষ্টি হই-ই, তার সাথে সাথে সুখ-শান্তি ও মানসিক প্রশান্তিও হারিয়ে যায়। রাসূলুল্লাহ ﷺ আপন চাচা আব্বাস-কে এমন এক দোয়া শিখিয়ে দিয়েছেন, যা দুনিয়া-আখেরাত উভয় জগতের সুখ-শান্তিকেই শামিল করে নেয়। দোয়াটি এই-
اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ الْعَفْوَ وَالْعَافِيَةَ.
হে আল্লাহ! আমি আপনার নিকট ক্ষমা ও সুস্থতা কামনা করছি।
فَآتَاهُمُ اللَّهُ ثَوَابَ الدُّنْيَا وَحُسْنَ ثَوَابِ الْآخِرَةِ অতএব, আল্লাহ তাদেরকে এ দুনিয়ার প্রতিদান ও পরকালের উত্তম প্রতিদান দিলেন। [সূরা আলে ইমরান: ১৪৮]
فَمَنِ اتَّبَعَ هُدَايَ فَلَا يَضِلُّ وَلَا يَشْقَىٰ অতঃপর যে আমার হেদায়েতের অনুসরণ করবে, সে পথভ্রষ্ট হবে না এবং দুঃখ-কষ্ট ও দুর্দশাগ্রস্তও হবে না। [সূরা ত্ব-হা : ১২৩]