📄 শকসন্দেহ
আল্লাহ বলছেন- فَأَمَّا الَّذِينَ فِي قُلُوبِهِمْ زَيْغٌ فَيَتَّبِعُونَ مَا تَشَابَهَ مِنْهُ ابْتِغَاءَ الْفِتْنَةِ وَابْتِغَاءَ تَأْوِيلِهِ সুতরাং যাদের অন্তরে কুটিলতা রয়েছে, তারা ফেতনা এবং অপব্যাখ্যা উদ্দেশ্যে কুরআনের রূপক বিষয়গুলোর অনুসরণ করে। [সুরা আল ইমরান: ০৭]
আল্লাহ অন্যত্র বলছেন- وَارْتَابَتْ قُلُوبُهُمْ فَهُمْ فِي رَيْبِهِمْ يَتَرَدَّدُونَ তাদের অন্তর সন্দেহগ্রস্ত হয়ে পড়েছে; সুতরাং তারা এখন সন্দেহের আবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছে। [সুরা তওবা: ৪৫]
অন্যত্র বলছেন- لَا يَزَالُ بُنْيَانُهُمُ الَّذِي بَنَوْا رِيبَةً فِي قُلُوبِهِمْ إِلَّا أَنْ تَقَطَّعَ قُلُوبُهُمْ তাদের নির্মিত ঘর সবসময় তাদের অন্তরে সন্দেহ উদ্রেক করতে থাকবে, যে পর্যন্ত তাদের অন্তর বিচূর্ণ হয়ে না যায়। [সুরা তওবা: ১১০]
আল্লাহ বলেছেন- أَفِي قُلُوبِهِمْ مَّرَضٌ أَمِ ارْتَابُوا
তাদের অন্তরে কি রোগ আছে, না কি তারা সন্দেহে নিপতিত। [সুরা নূর: ৫০]
وَإِذْ يَقُولُ الْمُنْفِقُونَ وَالَّذِينَ فِي قُلُوبِهِمْ مَّرَضٌ مَّا وَعَدَنَا اللَّهُ وَرَسُولُهُ إِلَّا غُرُورًا
এবং যখন মুনাফিক ও যাদের অন্তরে রোগ আছে তারা বলছিল, আমাদের কে প্রদত্ত আল্লাহ ও তাঁর রসুলের ওয়াদা প্রতারণা ছাড়া কিছু নয়। [সুরা আহযাব: ১২]
وَلَا يَرْتَابَ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتٰبَ وَ الْمُؤْمِنُونَ وَلِيَقُولَ الَّذِينَ فِي قُلُوبِهِمْ مَّرَضٌ وَالْكُفِرُونَ مَاذَا أَرَادَ اللَّهُ بِهَذَا مَثَلًا যাতে কিতাবীরা এবং মুমিনগণ সন্দেহ না করে। আর যাদের অন্তরে রোগ আছে, তারা এবং কাফেররা বলে যে, আল্লাহ এই উদাহরণ দিকে কী বোঝাতে চেয়েছেন। [সুরা মুদ্দাস্সির: ৩১]
এটা সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ও ধ্বংসাত্মক রোগ। এটা সবসময় মানুষের পিছনে লেগে থাকে এবং শেষে তাকে শির্ক ও কুফরে লিপ্ত করে।
এর চিকিৎসা হচ্ছে বেশি বেশি করে শয়তান থেকে আল্লাহ -এর কাছে পানাহ চাওয়া, অন্তরে উপনীত এই বিষয়কে ঘৃণা করা। আল্লাহর কাছে সাহায্য চেয়ে, আল্লাহ ও তাঁর রসুল -র প্রতি ঈমানের দিকে রুজু করে, জাত ও সিফাতে আল্লাহ এক- একথা স্বীকার করার মাধ্যমে এই প্রবণতা প্রতিহত করতে হবে। হাদীসে এসেছে- لَا يَزَالُ النَّاسُ يَتَسَاءَلُونَ حَتَّى يُقَالَ هَذَا خَلَقَ اللَّهُ الْخَلْقَ فَمَنْ خَلَقَ اللَّهَ فَمَنْ وَجَدَ مِنْ ذَلِكَ شَيْئًا فَلْيَقُلْ آمَنْتُ بِاللَّهِ.
মানুষ মনে মনে প্রশ্নের পর প্রশ্ন করতে থাকে। এক পর্যায়ে তার মনে উদিত হয়, এই সৃষ্টিকে তো আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন, তা হলে আল্লাহকে কে সৃষ্টি করেছেন? এমন কল্পনা কেউ যদি অনুভব করে, তা হলে সে যেন বলে, 'আমি আল্লাহর উপর ঈমান এনেছি।' [সহীহ মুসলিম: হাদীস নং- ৩৬০]
অন্য বর্ণনায় আছে-
فَلْيَسْتَعِذْ بِاللَّهِ وَلْيَنْتَهِ.
তা হলে সে যেন আল্লাহর কাছে পানাহ চায় এবং বিরত হয়। [সহীহ মুসলিম: হাদীস নং- ৩৬২]
📄 কুধারণা
আল্লাহ-র প্রতি কুধারণা অন্তরের অনেক বড় ব্যাধি। এই প্রসঙ্গে ভাবার জন্য, এ থেকে সাবধান হওয়ার জন্য এবং এর ভয়াবহতা বয়ান করার জন্য আসুন, একটু তন্ময় হই।
এমন মানুষ আছে, যারা আল্লাহ-র ব্যাপারে কুধারণা পোষণ করে। আল্লাহ-র ওয়াদা, মুমিন এবং দায়ী মুজাহিদ বান্দাদেরকে তাঁর সাহায্য করার বিষয়ে তারা ভ্রান্ত ধারণা লালন করে।
কিছু কিছু লোক তাদের রবের রিযিক দানের বিষয়ে খারাপ ধারণা পোষণ করে। কাজেই আপনি দেখবেন, তারা আল্লাহ-র কর্তৃত্বাধীন বস্তুর চেয়ে মানুষের হাতে অবস্থিত বস্তুর উপর বেশি নির্ভর করে। তারা ধারণা করে, তাদের জীবিকা প্রশাসনের হাতে, কোম্পানির হাতে, কিম্বা মানুষের হাতে। আপনি দেখবেন, তারা এভাবেই হিসাব-নিকাশ করে এবং তারা ভুলে যায় আল্লাহ-র উপর ভরসা এবং নির্ভর করার কথা। অথচ আল্লাহ বলছেন- وَمَا مِنْ دَابَّةٍ فِي الْأَرْضِ إِلَّا عَلَى اللَّهِ رِزْقُهَا﴾
দুনিয়ার বুকে যত বিচরণশীল প্রাণী আছে, সবার জীবিকার দায়িত্ব আল্লাহর। [সুরা হুদ: ০৬]
যারা আল্লাহ্ সম্পর্কে মন্দ ধারণা পোষণ করে, তিনি তাদের নিন্দা করেছেন এবং তাদের এই কাজকে জাহেলী যুগের কর্ম সাব্যস্ত করেছেন-
يَظُنُّونَ بِاللَّهِ غَيْرَ الْحَقِّ ظَنَّ الْجَاهِلِيَّةِ ) তারা আল্লাহ্ সম্পর্কে পোষণ করে অযথার্থ জাহেলী যুগের ধারণা। [সুরা আল ইমরান: ১৫৪]
আল্লাহ্ আরও বলেছেন- وَزُيِّنَ ذَلِكَ فِي قُلُوبِكُمْ وَظَنَنْتُمْ ظَنَّ السَّوْءِ وَكُنْتُمْ قَوْمًا بُورًا﴾ সেই ধারণা তোমাদের জন্য সুখকর বোধ হয়েছিল। তোমরা মন্দ ধারণা বশবর্তী হয়েছিলে এবং তোমরা ছিলে ধ্বংসন্মুখী এক সম্প্রদায়। [সুরা আল-ফাতহ: ১২]
وَذَلِكُمْ ظَنُّكُمُ الَّذِي ظَنَنْتُمْ بِرَبِّكُمْ أَرْدُنكُمْ فَأَصْبَحْتُمْ مِّنَ الْخَسِرِينَ ﴾ তোমাদের রব সম্পর্কে যেই ধারণা পোষণ করেছ, সেটাই তোমাদেরকে ধ্বংস করেছে। তোমরা হয়ে গেছ ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত। [সুরা হামিম সিজদাহ: ২৩]
وَإِذْ زَاغَتِ الْأَبْصَارُ وَبَلَغَتِ الْقُلُوبُ الْحَنَاجِرَ وَتَظُنُّونَ بِاللَّهِ الظُّنُونَا ) যখন তোমাদের দৃষ্টিভ্রম হল, প্রাণ কণ্ঠাগত হয়ে গেল এবং তোমরা আল্লাহ্ সম্পর্কে বিরূপ ধারণা পোষণ করতে লাগলে। [সুরা আহযাব: ১০]
وَمَا يَتَّبِعُ أَكْثَرُهُمْ إِلَّا ظَنَّا إِنَّ الظَّنَّ لَا يُغْنِي مِنَ الْحَقِّ شَيْئًا ) মূলত তারা বেশিরভাগ আন্দাজ-অনুমানের উপর চলে; অথচ সত্যের বেলায় আন্দাজ-অনুমান কোনই কাজে আসে না। [সুরা ইউনুস: ৩৬]
الظَّانِّينَ بِاللَّهِ ظَنَّ السَّوْءِ عَلَيْهِمْ دَائِرَةُ السَّوْءِ ) যারা আল্লাহ্ সম্পর্কে মন্দ ধারণা পোষণ করে, তাদের জন্য রয়েছে মন্দ পরিণাম। [সুরা আল-ফাতহ: ০৬]
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اجْتَنِبُوا كَثِيرًا مِّنَ الظَّنِّ إِنَّ بَعْضَ الظَّنِّ إِثْمٌ মুমিনগণ! তোমরা অধিক ধারণা করা বেঁচে থাকো। নিশ্চয় কিছু কিছু ধারণা গুনাহ। [সুরা হুজরাত: ১২]
নবী ﷺ উম্মতকে নসীহত করে বলছেন- إِيَّاكُمْ وَالظَّنَّ فَإِنَّ الظَّنَّ أَكْذَبُ الْحَدِيثِ
তোমরা ধারণা পোষণ থেকে বিরত থাকো। কেননা, ধারণা হচ্ছে প্রকট মিথ্যা। [সহীহ বুখারী: হাদীস নং- ৬০৬৬, সহীহ মুসলিম: হাদীস নং- ৬৭০১]
আমাদের কর্তব্য হবে আল্লাহ্ সম্পর্কে ধারণা সুন্দর করা। আল্লাহ্ বান্দার সাথে বান্দার ধারণা অনুপাতে আচরণ করে থাকেন। হাদীসে আছে, নবী ﷺ আল্লাহর কথা উদৃত করে বলেছেন- أَنَا عِنْدَ ظَنَّ عَبْدِي بِي فَلْيَظُنَّ بِي مَا شَاءَ
বান্দার কাছে আমার অবস্থান তার ধারণামাফিক। অতএব, তার যা ইচ্ছা, তা-ই ধারণা করুক। [মুসনাদ আহমাদ: হাদীস নং- ১৬০১৬]
📄 হিংসা ও বিদ্বেষ
আমাদের মধ্যে কে আছে, যারা হিংসাবিদ্বেষ মুক্ত? শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রহ. বলেন, হিংসা আত্মার ব্যাধিসমূহের অন্যতম। এটা প্রভাব বিস্তারকারী রোগ। খুব বেশি মানুষ এ থেকে নিষ্কৃতি পায় না। এজন্য বলা হয়-
مَا خَلَا جَسَدٌ مِنْ حَسَدٍ. لَكِنَّ اللَّئِيمَ يُبْدِيْهِ، وَالْكَرِيمَ يُخْفِيْهِ.
কোন দেহ হিংসামুক্ত নয়; তবে কপট তা প্রকাশ করে বেড়ায়; আর ভদ্রলোক তা গোপন রাখে।
[রিসালাতু আমরাযিল কুলুব ওয়া শিফাউহা লিশাইখিল ইসলাম]
এজন্য আল্লাহ বলেন-
أَمْ يَحْسُدُونَ النَّاسَ عَلَى مَا آتَهُمُ اللَّهُ مِنْ فَضْلِهِ *
না কি আল্লাহ তাদেরকে নিজ অনুগ্রহে যা দিয়েছেন, সে কারণে তারা মানুষকে হিংসা করে? [সুরা নিসা: ৫৪]
আল্লাহ আমাদেরকে হুকুম করেছেন সকাল-সন্ধ্যা হিংসা থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করতে-
وَمِنْ شَرِّ حَاسِدٍ إِذَا حَسَدَ
এবং (আশ্রয় প্রার্থনা করছি) হিংসুক থেকে, যখন সে হিংসা করে। [সুরা ফালাক: ০৫]
ইমাম বুখারী ও মুসলিমের বর্ণনাকৃত হাদীসে আছে-
لَا تَبَاغَضُوا وَلَا تَحَاسَدُوا
তোমরা পরস্পরে দুশমনি কোরো না, হিংসা কোরো না। [সহীহ বুখারী: হাদীস নং- ৬০৬৫, সহীহ মুসলিম: হাদীস নং- ৬৬৯০]
আবু হোরায়রা থেকে বর্ণিত আছে, রসুলুল্লাহ বলেছেন-
إِيَّاكُمْ وَالْحَسَدَ، فَإِنَّ الْحَسَدَ يَأْكُلُ الْحَسَنَاتِ كَمَا تَأْكُلُ النَّارُ الْحَطَبَ، أَوْ قَالَ: الْعُشْبَ
তোমরা হিংসা থেকে বেঁচে থাকো। কেননা, হিংসা নেক আমলকে সেভাবে খেয়ে ফেলে, আগুন যেভাবে জ্বালানী খেয়ে ফেলে। [সুনান আবু দাউদ: হাদীস নং- ৪৯০৫]
হাসান বসরী বলেন, 'হিংসাকে তোমার অন্তরে লুকিয়ে রাখো। তা হলে সে তোমার কোন ক্ষতি করবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত তার কারণে হাত বা জিহ্বা সীমালঙ্ঘন না করবে।' [ رِسَالَةُ أَمْرَاضِ الْقُلُوْبِ وَشِفَاؤُهَا لِشَيْخِ الْإِسْلَامِ ]
এখন আসা যাক হিংসার চিকিৎসা প্রসঙ্গে। শাইখুল ইসলাম হিংসার চিকিৎসা প্রসঙ্গে খুব সুন্দর কথা বলেছেন। তিনি বলছেন, 'যে ব্যক্তি তার অন্তরে অন্যের ব্যাপারে হিংসা অনুভব করবে, তার কর্তব্য হবে তাকওয়া ও সবর অবলম্বন করা। তা হলে আপনা-আপনিই তার অন্তর হিংসাকে ঘৃণা করা শুরু করবে।'
[رِسَالَةُ أَمْرَاضِ الْقُلُوْبِ وَشِفَاؤُهَا لِشَيْخِ الْإِسْلَامِ]
যেহেতু হিংসা থেকে তেমন কেউ রক্ষা পায় না, বিশেষত নারীসমাজ এবং সাধারণ মানুষ মোটেই মুক্ত থাকতে পারে না। এজন্য আমার ইচ্ছা হচ্ছে হিংসা এবং ঈর্ষার মধ্যকার পার্থক্য উল্লেখ করে দিই। প্রথমটি নিন্দনীয়; পরেরটি নয়।
হিংসুক অন্যের সুখের বিলুপ্তি কামনা করে।
আর দ্বিতীয় জন চায় যে, অপর ভাইয়ের সুখ বিলুপ্ত না হয়ে তার-ও হাসিল হোক।
হাদীসে এসেছে- لَا حَسَدَ إِلَّا فِي اثْنَتَيْنِ رَجُلٍ آتَاهُ اللَّهُ مَالًا فَسَلَّطَهُ عَلَى هَلَكَتِهِ فِي الْحَقِّ وَرَجُلٍ آتَاهُ اللَّهُ حِكْمَةٌ فَهُوَ يَقْضِي بِهَا وَيُعَلِّمُهَا
দুইজন বাদে আর কারও সাথে ঈর্ষা করা চলে না; একজনকে আল্লাহ সম্পদ দিয়েছেন এবং তা ন্যায় কাজে ব্যয় করারও তৌফিক দিয়েছেন। আরেক জনকে আল্লাহ দীনের জ্ঞান দান করেছেন, সে তদনুযায়ী বিচার করে এবং অন্যকে শিক্ষা দান করে। [সহীহ বুখারী: হাদীস নং- ১৪০৯, সহীহ মুসলিম: ১৯৩৩]
বুখারী ও মুসলিমের অন্য বর্ণনায় আছে- لَا حَسَدَ إِلا عَلَى اثْنَتَيْنِ رَجُلٌ آتَاهُ اللَّهُ هَذَا الْكِتَابَ فَقَامَ بِهِ آنَاءَ اللَّيْلِ وَآنَاءَ النَّهَارِ وَرَجُلٌ آتَاهُ اللَّهُ مَالاً فَتَصَدَّقَ بِهِ آنَاءَ اللَّيْلِ وَآنَاءَ النَّهَارِ.
দুইজন বাদে আর কারও সাথে ঈর্ষা করা চলে না; একজন আল্লাহ তাআলা এই কিতাব (কুরআন) দান করেছেন, সে দিবারাত্রি তা অধ্যয়ন করে। আরেক জনকে আল্লাহ সম্পদ দিয়েছেন, সে দিবারাত্রি তা সদকা করে। [সহীহ মুসলিম: হাদীস নং- ১৯৩১]
📄 অহংকার, আত্মম্ভরতা, অপরকে তুচ্ছ জ্ঞানকরণ ও বিদ্রূপ করণ
আল্লাহ বলেন- ﴿إِنْ فِي صُدُورِهِمْ إِلَّا كِبْرٌ مَّا هُمْ بِبَالِغِيْهِ﴾ তাদের অন্তরে আছে শুধু আত্মম্ভরিতা, যা অর্জনে তারা সফল হবে না। [সুরা মুমিন: ৫৬]
আল্লাহ অন্যত্র বলেছেন- ﴿سَأَصْرِفُ عَنْ ايْتِيَ الَّذِينَ يَتَكَبَّرُونَ فِي الْأَرْضِ بِغَيْرِ الْحَقِّ﴾ আমি আমার নিদর্শনসমূহ থেকে তাদেরকে ফিরিয়ে রাখি, যারা দুনিয়াতে না-হক অহঙ্কার করে। [সুরা আ'রাফ: ১৪৬]
তিনি আরও বলেছেন- ﴿تِلْكَ الدَّارُ الْآخِرَةُ نَجْعَلُهَا لِلَّذِينَ لَا يُرِيدُونَ عُلُوًّا فِي الْأَرْضِ وَلَا فَسَادًا ۚ وَالْعَاقِبَةُ لِلْمُتَّقِينَ﴾ [পরকালীন (শান্তির) আমি তাদেরকে দান করব, যারা দুনিয়াতে ঔদ্ধত্য প্রকাশ করতে এবং অনর্থ সৃষ্টি করতে চায় না। বস্তুত শুভ পরিণাম মুত্তাকীদের জন্য। [সুরা কাসাস: ৮৩]
অন্যত্র বলেছেন- ﴿كَذلِكَ يَطْبَعُ اللَّهُ عَلَى كُلِّ قَلْبٍ مُتَكَبِّرٍ جَبَّارٍ﴾ এভাবেই আল্লাহ প্রত্যেক অহঙ্কারী স্বৈরাচারীর অন্তরে মোহর এঁটে দেন। [সুরা মুমিন: ৩৫]
আরেক আয়াতে আছে-
إِنَّهُ لَا يُحِبُّ الْمُسْتَكْبِرِينَ নিশ্চয় তিনি অহঙ্কারীদের ভালোবাসেন না। [সুরা নাহল: ২৩]
আল্লাহ বলেছেন-
وَيَوْمَ حُنَيْنٍ إِذْ أَعْجَبَتْكُمْ كَثْرَتُكُمْ فَلَمْ تُغْنِ عَنْكُمْ شَيْئًا আর হোনাইনের দিন, যখন তোমাদের সংখ্যাধিক্য আত্মমুগ্ধ করে ফেলেছিল। কিন্তু তোমাদের সংখ্যাধিক্য কোন উপকারে আসেনি। [সুরা তওবা: ২৫]
লোকমান যে তদীয় পুত্রকে নসিহত করেছিলেন, তার মধ্যে আছে-
وَلَا تَمْشِ فِي الْأَرْضِ مَرَحًا জমীনের উপর তুমি দম্ভ ভরে পদচারণ কোরো না। [সুরা লুকমান: ১৮]
আত্মপ্রশংসা আরেক বালা। কেমন বালা? আল্লাহ বলেন-
فَلَا تُزَكُّوا أَنْفُسَكُمْ هُوَ أَعْلَمُ بِمَنِ اتَّقَى অতএব, তোমরা আত্মপ্রশংসা কোরো না। তিনি ভালো জানেন, সে সংযমী? [সুরা নাজম: ৩২]
তিনি আরও বলেছেন-
أَلَمْ تَرَ إِلَى الَّذِينَ يُرَكُّونَ أَنْفُسَهُمْ بَلِ اللَّهُ يُزَكِّى مَنْ يَشَاءُ তুমি কি তাদেরকে দেখনি, যারা নিজেদেরকে পুতঃপবিত্র বলে থাকে; বরং আল্লাহ পবিত্র করেন, যাকে ইচ্ছা তাকেই। [সুরা নিসা: ৪৯]
আল্লাহ ঠাট্টা-বিদ্রূপ করতে নিষেধ করেছেন-
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا يَسْخَرْ قَوْمٌ مِّنْ قَوْمٍ عَسَى أَنْ يَكُونُوا خَيْرًا مِّنْهُمْ وَلَا نِسَاء مِّنْ نِسَاءٍ عَسَى أَنْ يَكُنَّ خَيْرًا مِّنْهُنَّ মুমিনগণ! কেউ যেন অপরকে উপহাস না করে। কেননা, সে তার চেয়ে উত্তম হতে পারে। কোন নারীও যেন অপর কোন নারীকে উপহাস না করে। কেননা, সে উপহাসকারিণী অপেক্ষা উত্তম হতে পারে। [সুরা হুজরাত: ১১]
উপহাস একটি ধ্বংসাত্মক ব্যাধি- قُلْ أَبِاللهِ وَايْتِهِ وَرَسُولِهِ كُنْتُمْ تَسْتَهْزِءُونَ ﴿۲۵﴾ لَا تَعْتَذِرُوا قَدْ كَفَرْتُمْ بَعْدَ إِيْمَانِكُمْ *
বলুন, তোমরা কি আল্লাহ, তাঁর হুকুম-আহকাম এবং তাঁর রসুলের সাথে বিদ্রূপ করতে? ছলনা কোরো না, তোমরা তো কাফের হয়ে গেছ ঈমান প্রকাশ করার পর। [সুরা তাওবা: ৬৫-৬৬]
إِنَّ الَّذِينَ أَجْرَمُوا كَانُوا مِنَ الَّذِينَ آمَنُوا يَضْحَكُونَ ﴿٣٩﴾ وَإِذَا مَرُّوا بِهِمُ يَتَغَامَزُونَ
যারা অপরাধী, তারা মুমিনদের সাথে উপহাস করত। তারা যখন মুমিনদের কাছ দিয়ে অতিক্রম করত, তখন তারা চোখ টিপে ইশারা করত। [সুরা মুতাফিফীন: ২৯-৩০]
রসুল বলছেন- لا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ مَنْ كَانَ فِي قَلْبِهِ مِثْقَالُ ذَرَّةٍ مِنْ كِبْرٍ.
যার অন্তরে যারা বরাবর অহঙ্কার আছে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না। [সহীহ মুসলিম: হাদীস নং- ২৭৫]
তিনি আরও বলছেন- بِحَسْبِ امْرِئٍ مِنَ الشَّرِّ أَنْ يَحْقِرَ أَخَاهُ الْمُسْلِمَ
একজন মুসলমানের অন্যায় হিসাবে তার অপর মুসলমান ভাইকে ছোট জ্ঞান করাই যথেষ্ট। [সহীহ মুসরিম: হাদীস নং- ৬৭০৬]
আমাদের এই যামানায় অপরকে ছোট জ্ঞান করা এবং বড়াই ও তাকাব্বরী করা বিষয়টি খুব বৃদ্ধি পেয়েছে। কাজেই আপনি একজনকে দেখবেন, সে আরেক জনকে অবজ্ঞা করছে, কারণ তার লেখাপড়া কম; তার মর্যাদা কম; তার চাকরি ছোট, সে গরীব মানুষ অথবা সে নিম্ন বংশের। আরও কত কারণ আছে।
হাদীসে আছে, নবী বলেছেন-
لا يَزَالُ الرَّجُلُ يَذْهَبُ بِنَفْسِهِ حَتَّى يُكْتَبَ فِي الجَبَّارِين، فَيُصِيبَهُ مَا أَصَابَهُمْ.
মানুষ অহঙ্কার করতে থাকে, একপর্যায়ে তার নাম স্বৈরাচারীদের তালিকায় লেখা হয়। তারপর তাদের ভাগ্যে যা জুটবে, তার ভাগ্যেও তা-ই জোটে। [সুনান তিরমিযী: হাদীস নং- ২০০০]
কিছু কিছু মানুষ তাদের চেয়ে নিচু পদের, অথবা কম মর্যাদার লোকদেরকে ভাই বলে সম্বোধন করতে ইতস্তত করে। বরং বিষয়টি তাদের কাছে শিষ্টাচার, ভদ্রতা বর্হিভূত এবং রুচিবিরুদ্ধ বলে মনে হয়। এগুলো সব হয় প্রভাব-প্রতিপত্তি রক্ষার দোহাই দিয়ে।
এই হতভাগারা কীভাবে বুঝবে যে, যাকে তারা নীচু ভাবছে, সে হয়তো আল্লাহ -র কাছে তাদের প্রিয় এবং হাজার গুণে শ্রেষ্ঠ হতে পারে। রসুল বলছেন-
رُبَّ أَشْعَثَ أَغْبَرَ مَدْفُوعِ بِالأَبْوَابِ لَوْ أَقْسَمَ عَلَى اللَّهِ لأَبَرَّهُ.
অনেক আলুথালু চুল ও ধূসর চেহারার লোক আছে, যাদেরকে দরজা থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়, তারা যদি আল্লাহর নামে কসম করেন, তা হলে আল্লাহ তা পুরা করে দেন। [সহীহ মুসলিম: হাদীস নং- ৬৮৪৮]
এখানে যে বিষয়টি সম্পর্কে সাবধান করা প্রয়োজন, সেটা হচ্ছে নেককারদের সাথে উপহাস করার বিষয়টি। এটি একটি ভয়ানক ব্যাপার।
আল্লাহ বলছেন-
قُلْ أَبِاللهِ وَايْتِهِ وَرَسُولِهِ كُنْتُمْ تَسْتَهْزِعُونَ ﴿۱۵﴾ لَا تَعْتَذِرُوا قَدْ كَفَرْتُمْ بَعْدَ إِيْمَانِكُمْ *
বলুন, তোমরা কি আল্লাহ, তাঁর হুকুম-আহকাম এবং তাঁর রসুলের সাথে বিদ্রূপ করতে? ছলনা কোরো না, তোমরা তো কাফের হয়ে গেছ ঈমান প্রকাশ করার পর। [সুরা তাওবা: ৬৫-৬৬]
ইসলামের নিদর্শন যেমন, দাড়ি, পর্দা এবং পোশাক ইত্যাদি নিয়ে উপহাস করারও একই কথা। এগুলো নিয়ে যে ব্যাক্তি উপহাস করবে, তার মুরতাদ হয়ে যাওয়ার ভয় আছে। নাউযু বিল্লাহ। আমাদের উচিত, এ ব্যাপারে সতর্ক হওয়া এবং ভাইবন্ধুদেরকে সতর্ক করা। বিষয়টি ভয়ঙ্কর।