📘 যেভাবে আত্মা শুদ্ধ করবেন > 📄 আত্মার পরীক্ষা

📄 আত্মার পরীক্ষা


إِنَّ الْحَمْدَ للهِ، نَحْمَدُهُ، وَنَسْتَعِيْنُهُ، وَنَسْتَغْفِرُهُ ، وَنَتُوْبُ إِلَيْهِ، وَنَعُوْبُ بِاللَّهِ مِنْ شُرُورِ أَنْفُسِنَا، وَسَيِّئَاتِ أَعْمَالِنَا . مَنْ يَهْدِهِ اللهَ فَلَا مُضِلَّ لَهُ، وَمَنْ يُضْلِلْ فَلَا هَادِيَ لَهُ. وَأَشْهَدُ أَن لا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَحْدَهُ لا شَرِيكَ لَهُ، وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُوْلُهُ ، صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَعَلَى آلِهِ وَصَحْبِهِ وَسَلَّمَ تَسْلِيمًا كَثِيرًا.

يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقْتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنْتُمْ مُّسْلِمُونَ)

أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُوا رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُمْ مِنْ نَفْسٍ وَاحِدَةٍ وَخَلَقَ مِنْهَا زَوْجَهَا وَبَثَّ مِنْهُمَا رِجَالًا كَثِيرًا وَنِسَاءً وَاتَّقُوا اللَّهَ الَّذِي تَسَاءَلُونَ بِهِ وَالْأَرْحَامَ إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلَيْكُمْ رَقِيبًا )

يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَقُولُوا قَوْلًا سَدِيدًا ﴿2﴾ يُصْلِحُ لَكُمْ أَعْمَالَكُمْ ﴾ وَيَغْفِرُ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ وَمَنْ يُطِعِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَقَدْ فَازَ فَوْزًا عَظِيمًا)

আম্মা বাদ!

কলব এবং কলবের পরীক্ষা-নিরীক্ষা প্রসঙ্গে আলোচনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তার কারণ, এখন এক সময় চলছে, যখন বেশিরভাগ মানুষের কলব শক্ত হয়ে গেছে; ঈমান দুর্বল হয়ে গেছে; দুনিয়ার ব্যস্ততা সবাইকে ঘিরে ফেলেছে এবং মানুষ হয়ে পড়েছে আখেরাত বিমুখ।

এই যুগে আমরা দেখতে পাচ্ছি, মানুষের হৃদযন্ত্র-সংক্রমণের চিকিৎসায় অভূতপূর্ব উন্নতি সাধিত হয়েছে। এমন কি সর্বশেষ আমরা শুনতে পাচ্ছি, হৃদযন্ত্রের প্রবৃদ্ধি এবং স্থানান্তরের কথাও। অথচ মানবদেহে সংক্রমিত রোগব্যাধির ক্ষেত্রে হৃদযন্ত্রের রোগ ও চিকিৎসা নির্ণয়ই সবচেয়ে বেশি জটিল। তবে আমরা এখানে দৈহিক রোগব্যাধি এবং হৃদযন্ত্রের প্রত্যক্ষ সংক্রমণ নিয়ে আলোচনা করব না।

আমরা এখানে আলোচনা করব কলবের সেইসব রোগব্যাধি নিয়ে, যেগুলো তাকে আল্লাহ -র দিকে ধাবিত হওয়ার ক্ষেত্রে পরীক্ষা- নিরীক্ষার আকারে আক্রমণ করে। আলোচনা করব কলবের সুস্থতা ও অসুস্থতার আলামত কী কী, তা নিয়ে। এই হৃদয়ের পরীক্ষার ক্ষেত্রগুলো কী কী, তাও তুলে ধরব। [ইনশা আল্লাহ।]

কলব নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে দলিল-প্রমাণ উল্লেখ করব আল্লাহ -র কালাম এবং রসুল -র হাদীস দিয়ে। এটি একটি মুসলমানের স্বভাবগত বিষয়। কেননা, আসল কথা হল কুরআন ও সুন্নাহর উৎসধারা থেকে পানীয় সংগ্রহ করা। আমি একথা পরিষ্কার করে বলছি এজন্য, যাতে কলব নিয়ে আলোচনা সহজও নয় এবং গুরুত্বহীনও নয়- সে কথা যেন সবাই বুঝে ফেলে। কলবের বিবিধ অবস্থা এবং তার সংক্রমিত হওয়ার বিষয়ে কলবের স্রষ্টার চেয়ে অধিক জান্তা কেই নেই।

اَلَا يَعْلَمُ مَنْ خَلَقَ তিনি কি জানেন না, তিনি কাকে সৃষ্টি করেছেন? [সুরা মুল্ক: ১৪]

فَإِنَّهُ يَعْلَمُ السِّرَّ وَأَخْفَى তিনি তো গুপ্ত এবং অধিক গুপ্ত বিষয়ও জানেন। [সুরা ত্বহা: ০৭]

يَعْلَمُ خَائِنَةَ الْأَعْيُنِ وَمَا تُخْفِي الصُّدُورُ তিনি জানেন চোখের চুরি এবং অন্তরের গোপন বিষয়। [সুরা মুমিন: ১৯]

যেই সত্তার উপর ওহী নাযিল করা হয়েছিল, তিনি দিল সম্পর্কে বুঝতেন। কারণ, তাঁ ব্যাপারে বলা হয়েছে-
وَمَا يَنْطِقُ عَنِ الْهَوَى ﴿3﴾ إِنْ هُوَ إِلَّا وَحْيٌ يُوحَى তিনি প্রবৃত্তির তাড়নায় কথা বলেন না; তিনি যা বলেন, সেটা ওহী, যা প্রত্যাদেশ করা হয়। [সুরা আন-নাজম: ০৩-০৪]

এখানে আমি কিছু কিছু মানুষের দাবির ভয়াবহতাও তুলে ধরব, যারা দাবি করে থাকেন যে, তারা অন্তরের কর্মকাণ্ডের উদ্দেশ্য বুঝতে পারেন; অথচ এ বিষয়টি আল্লাহ ছাড়া আর কেউ জানেন না।

এসব লোক নিষিদ্ধ বিষয় নিয়ে অবতাড়না করে থাকেন এবং সীমালঙ্ঘন করে কথা বলেন-
وَلَا تَقْرَبُوا مَالَ الْيَتِيمِ إِلَّا بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ حَتَّى يَبْلُغَ أَشُدَّهُ وَأَوْفُوا بِالْعَهْدِ إِنَّ الْعَهْدَ كَانَ مَسْئُولًا
যে বিষয়ে তোমার জ্ঞান নেই, তার পিছনে পোড়ো না; নিশ্চয় কান, চোখ এবং অন্তঃকরণ- এগুলোর প্রত্যেকটি জিজ্ঞাসিত হবে। [সুরা ইসরা: ৩৬]

আমরা কোত্থেকে অন্তরের ভেদ ও তার রহস্য সম্পর্কে অবহিত হব- مُتَطَلِّبُ فِي الْمَاءِ جَذْوَةَ نَارِ وَمُكَلِّفُ الأَشْيَاءِ فَوْقَ طِبَاعِهَا
[যেই সত্তা বস্তুর উপর কার্যবিধি আরোপ করেন, তাঁর অবস্থান বস্তুর স্বভাব-চরিত্রের ঊর্ধ্বে; তিনি ইচ্ছা করলে পানির মধ্যে জ্বলন্ত অঙ্গার কামনা করতে পারেন।]

📘 যেভাবে আত্মা শুদ্ধ করবেন > 📄 অন্তর নিয়ে কেন আলোচনা?

📄 অন্তর নিয়ে কেন আলোচনা?


কলব সম্পর্কে আলোচনা কয়েকটি কারণে অতীব গুরুত্বপূর্ণ। আমি সেগুলো নীচে সংক্ষেপে তুলে ধরছি-

**প্রথমত**
আল্লাহ কলব পবিত্র ও পরিচ্ছন্ন করা হুকুম দিয়েছেন। বরং আল্লাহ নবুয়তে মুহাম্মাদিয়া’র লক্ষই স্থির করেছেন মানুষের তাযকিয়ায়ে নফসকে। অতীব গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার কারণে একে তিনি মানুষকে কিতাব [কুরআন] ও হেকমত [সুন্নাহ] শিক্ষা দেওয়ার বিষয়ের প্রাধান্য দিয়েছেন। আল্লাহ বলেন-

هُوَ الَّذِي بَعَثَ فِي الْأُمِّينَ رَسُولًا مِّنْهُمْ يَتْلُوا عَلَيْهِمْ آيَتِهِ وَيُزَكِّيهِمْ وَ يُعَلِّمُهُمُ الْكِتٰبَ وَالْحِكْمَةَ * وَإِنْ كَانُوا مِنْ قَبْلُ لَفِي ضَلَلٍ مُّبِينٍ ﴾
তিনি সেই সত্তা, যিনি নিরক্ষরদের মধ্য থেকে একজন রসুল প্রেরণ করেছেন। তিনি তাদের কাছে পাঠ করেন তাঁর আয়াতসমূহ; তিনি তাদেরকে পবিত্র করেন এবং তাদেরকে কিতাব ও হেকমত শিক্ষা দেন। নিশ্চয় এর আগে তারা স্পষ্ট গুমরাহীতে লিপ্ত ছিল। [সুরা জুমুআ: ০২]

আল্লামা ইবনুল কায়িম আল্লাহ-র ভাষ্য وَثِيَابَكَ فَطَهِّرْ সম্পর্কে বলেছেন, ‘পূর্ববর্তী এবং পরবর্তী সমস্ত মুফাস্সির একথার উপর একমত যে, এখানে অন্তর পবিত্র করার কথা বলা হয়েছে।
[أَمْرَاضُ الْقُلُوْبِ নামক পুস্তিকার ৫২ পৃষ্ঠা দ্রষ্টব্য।]

আল্লাহ ইহুদী এবং মুনাফিকদের সম্পর্কে বলেন-
أُولَئِكَ الَّذِينَ لَمْ يُرِدِ اللهُ أَنْ يُطَهِّرَ قُلُوبَهُمْ لَهُمْ فِي الدُّنْيَا خِزْيٌ وَلَهُمْ فِي الْآخِرَةِ عَذَابٌ عَظِيمٌ

এরা এমনই যে, আল্লাহ তাদের অন্তরসমূহ পবিত্র করতে চাননি। তাদের জন্য রয়েছে দুনিয়াতে লাঞ্ছনা এবং আখেরাতে ভয়াবহ শাস্তি। [সুরা মায়িদা: ৪১]

**দ্বিতীয়ত**
মানবজীবনে এই কলবের বিরাট প্রভাব রয়েছে। কলব হচ্ছে নিয়ন্ত্রক এবং নির্দেশক; আর অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গ প্রয়োগকারী।
আবু হোরায়রা বলেন- الْقَلْبُ مَلِكُ، وَالأَعْضَاءُ جُنُودُهُ ، فَإِذَا طَابَ الْمَلِكُ طَابَتْ جُنُودُهُ، وَإِذَا خَبُثَ الْقَلْبُ خَبُثَتْ جُنُودُهُ.
কলব হচ্ছে একজন শাসক, আর অঙ্গপ্রত্যঙ্গ হচ্ছে তার সেনাবাহিনী। যখন শাসক ভালো থাকে, তখন তার সৈন্যরাও ভালো থাকে; আর যখন শাসক দুষ্ট হয়ে পড়ে, তখন তার সৈন্যরাও দুষ্ট হয়ে যায়। [আত-তুহফাতুল ইরাকিয়্যা]

**তৃতীয়ত**
এই প্রসঙ্গ আলোচনার মূল কারণ হচ্ছে বেশিরভাগ মানুষের অন্তর সম্পর্কে উদাসীন হওয়া। যেমন, আপনি মাদরাসার অনেক ছাত্রকে দেখবেন, তারা কিছু কিছু সূক্ষ্ম মাসআলা নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ পেশ করে এবং সেই সম্পর্কে বেশ পান্ডিত্বও অর্জন করে। যেমন, তাশাহুদের সময় আঙুলের ইশারা কি সুন্নত? কখন, কীভাবে ইশারা করতে হবে?... এরকম মাসআলা নিয়ে আলোচনা করা অবশ্যই উপকারী এবং এর প্রয়োজনও আছে। কিন্তু যখন মানুষ কলবের কার্যক্রম, তার বিবিধ দশা এবং রোগব্যাধি সম্পর্কে গাফিল, তখন এইটাই অধিক গুরুত্বপূর্ণ।

মানবসমাজে এখন নানা রকম সমস্যা বিরাজমান; বিশেষত ছাত্রসমাজের মধ্যে। এসব সমস্যার কারণ এমনসব রোগব্যাধি, যেগুলো অন্তরে আক্রমণ করে। সেগুলো শরীয়তের মৌলিক বিষয়াদির উপর নির্ভরশীল নয়। এসব সমস্যা মানুষের অন্তরের অবস্থা প্রকাশ করে। প্রকাশ করে দেয় অন্তরের হিংসা, বিদ্বেষ, অহঙ্কার, কুধারণা এবং অন্যকে খাটো করে দেখার মত রোগগুলো। এগুলো থেকে বাঁচতে হলে অন্তরের চিকিৎসা করতে হবে। তা না হলে রোগ কোন না কোন সময় আত্মপ্রকাশ করবেই, যখন রোগের উপসর্গ দেখা দিবে।

সমাজের প্রতি একবার নজর বুলালে, মানুষের সামাজিক বিষয়াদি নিয়ে সৃষ্ট সমস্যা এবং বিষয়সম্পত্তিকে কেন্দ্র করে দায়ের হওয়া মামলা-মোকদ্দমার উপর একবার দৃষ্টিপাত করলেই আমার এই দাবির যথার্থতা প্রমাণিত হয়ে যাবে।

**পঞ্চমত**
কলবের সুস্থতা এবং নিষ্ঠা দুনিয়া ও আখেরাতের সাফল্যের চাবিকাঠি। হিংসা, বিদ্বেষ, শত্রুতা এবং অন্যান্য রোগব্যাধি থেকে অন্তর পবিত্র থাকলে দুনিয়াতে স্বস্তি পাওয়া যাবে এবং আখেরাতে কামিয়াবী লাভ হবে।

يَوْمَ لَا يَنْفَعُ مَالٌ وَلَا بَنُونَ ﴿۸﴾ إِلَّا مَنْ أَتَى اللَّهَ بِقَلْبٍ سَلِيمٍ

যেদিন সম্পদ ও সন্তানসন্তুতি কোন কাজে আসবে না। যে ব্যক্তি আল্লাহর কাছে আসবে সুস্থ অন্তর নিয়ে। [সুরা শুআরা: ৮৮-৮৯]

লক্ষ করুন আবু বকর এবং অন্য যাদেরকে সুস্থ এবং হিংসাবিদ্বেষ ও রোগমুক্ত অন্তর দেওয়া হয়েছে, তাঁদের অবস্থার দিকে।

**ষষ্ঠত**
ইমাম আবদুল্লাহ ইবনে আবু জামরা বলেন, আমরা দিল চায় এমন কিছু ফকীহ তৈরি হোক, যাদের একমাত্র ব্যস্ততা হবে মানুষকে তাদের আমলের উদ্দেশ্য শিক্ষা দেওয়া। কারণ, যারা আমল করে, তারা বেশিরভাগই আমলের উদ্দেশ্য নষ্ট করে ফেলে।

দেখুন, এই বুযুর্গ মানুষের আমলের উদ্দেশ্য শিক্ষাদান এবং আমল নষ্টকারী বিষয়াদির ব্যাপারে সতর্ককরণের প্রতি কত গুরুত্ব আরোপ করেছেন। এর কারণ, আমরা যেমন প্রত্যক্ষ করছি যে, যারা ইলমের বিভিন্ন শাখা, যেমন হাদীস, ফেকাহ, তাফসীর, নাহ্, ফারায়েয ইত্যাদি বিষয়ে পারদর্শী হচ্ছেন, তারা এই বিষয়গুলোকে সুদৃঢ় করছেন। তেমনই আমাদের প্রয়োজন এমন কিছু লোক, যারা কলবের অবস্থান, অবস্থা, কার্যক্রম এবং রোগব্যাধি সম্পর্কে পারদর্শী হয়ে অন্য লোকদের সেগুলো শিক্ষা দিবেন এবং মানুষের আমলের উদ্দেশ্য ও নিয়ত দুরস্ত করবেন।

**সপ্তমত**
দুনিয়া ও আখেরাতে আল্লাহ এই কলবকে বিশেষ মর্যাদা দিয়েছেন। আল্লাহ-র কিতাব এবং তদীয় রসুল-র হাদীসের ভাণ্ডারে অজস্র প্রমাণাদি রয়েছে। তার গুটি কয়েক আমি উল্লেখ করছি।

০১. আল্লাহ তাঁর নবী ইবরাহীম-র বযানে বলছেন-

وَ لَا تُخْزِنِي يَوْمَ يُبْعَثُونَ ﴿٨﴾ يَوْمَ لَا يَنْفَعُ مَالٌ وَلَا بَنُونَ ﴿۸﴾ إِلَّا مَنْ أَتَى اللَّهَ بِقَلْبٍ سَلِيمٍ)
যেদিন মানুষের পুনরুত্থান হবে, সেদিন আমাকে অপদস্থ করবেন না। যেদিন সম্পদ ও সন্তানসন্তুতি কোন কাজে আসবে না। তবে যে ব্যক্তি সুস্থ অন্তর নিয়ে আল্লাহর কাছে আসবে। [সুরা শুআরা: ৮৮-৮৯]
সুস্থ অন্তর ছাড়া আল্লাহ-র কাছে উপস্থিত হলে কেয়ামতের দিন কামিয়াব হওয়া যাবে না।

০২. আল্লাহ বলেন-

وَ أُزْلِفَتِ الْجَنَّةُ لِلْمُتَّقِينَ غَيْرَ بَعِيدٍ ﴿٣١﴾ هَذَا مَا تُوعَدُونَ لِكُلِّ أَوَّابٍ حَفِيظٌ مَنْ خَشِيَ الرَّحْمَنَ بِالْغَيْبِ وَ جَاءَ بِقَلْبٍ مُّنِيْبٍ
জান্নাতকে উপস্থিত করা হবে মুত্তাকীদের অদূরে। (বলা হবে,) তোমাদের প্রত্যেক অনুরাগী ও স্মরণকারী এর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। যে দয়াময় সত্তাকে না দেখে ভয় করেছে এবং তওবাকারী অন্তর নিয়ে উপস্থিত হয়েছে। [সুরা ক্বাফ: ৩১-৩৩]

কিন্তু তওবাকারী অন্তর কোথায়? সেই অন্তরের বৈশিষ্ট্য কী কী?

০৩. সহীহ মুসলিমে আবু হোরায়রা থেকে বর্ণিত আছে, রসুল বলেছেন- إِنَّ اللهَ لا يَنْظُرُ إِلَى صُوَرِكُمْ، وَلاَ إِلَى أَجْسَامِكُمْ، وَلَكِنْ يَنْظُرُ إِلَى قُلُوْبِكُمْ وَأَعْمَالِكُمْ. নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা তোমাদের চেহারা এবং শরীরের দিকে দেখেন না; তিনি দেখেন তোমাদের অন্তর এবং আমলের দিকে। [সহীহ মুসলিম: হাদীস নং- ৬৭০৮]

০৪. সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে অবিচ্ছেদ্য সনদে নু'মান ইবনে বশীর থেকে বর্ণিত আছে- أَلَا وَإِنَّ فِي الْجَسَدِ مُضْغَةٌ إِذَا صَلَحَتْ صَلَحَ الْجَسَدُ كُلُّهُ وَإِذَا فَسَدَتْ فَسَدَ الْجَسَدُ كُلُّهُ أَلَا وَهِيَ الْقَلْبُ মনে রেখো, মানবদেহে একটি মাংসপিণ্ড আছে। সেটি যখন সুস্থ থাকে, তখন পুরা দেহ সুস্থ থাকে; আর যখন সেটি অসুস্থ হয়, তখন পুরা দেহ অসুস্থ হয়ে পড়ে। [সহীহ বুখারী: হাদীস নং- ৫২, সহীহ মুসলিম: হাদীস নং- ৪১৭৮]

বুদ্ধিমানদের জন্য এই হাদীসটি উপদেশ ও সতর্কবাণী হিসেবে যথেষ্ট।

**অষ্টমত**
স্বীকারোক্তি ও সত্যায়ন হচ্ছে কলবের কথাবার্তা; আর ভয়, আশা, ভালোবাসা, নির্ভরতা ইত্যাদি হচ্ছে কলবের কর্মকাণ্ড ও গতি। আহলে সুন্নত ওয়াল জামাআতের মতে এগুলোই কিন্তু ঈমানের সবচেয়ে বড় রুকন। এক্ষেত্রে বিঘ্ন ঘটলে ঈমান বিঘ্নিত হয়। দেখুন না, মুনাফিকরা কিন্তু কালিমায়ে শাহাদাত মুখে আওড়ায় এবং বাহ্য কর্মকাণ্ডে মুসলমানদের সাথে তাল মিলায়, কিন্তু তারপরও সত্যায়ন ও স্বীকারোক্তিতে গণ্ডগোল থাকার কারণে তাদের অবস্থান হবে-
فِي الدَّرْكِ الْأَسْفَلِ مِنَ النَّارِ وَلَنْ تَجِدَ لَهُمْ نَصِيرًا

জাহান্নামের তলদেশে এবং আপনি তাদের জন্য সাহায্যকারী খুঁজে পাবেন না। [সূরা নিসা: ১৪৫]

**নবমত**
অনেক লোক তাদের পেশা বানিয়ে নিয়েছে মানুষের কর্মকাণ্ডের উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করাকে। তারা মানুষের উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করে ভিন্নখাতে গড়িয়ে দেয়। এক্ষেত্রে তারা বাহ্য বিষয়কে এড়িয়ে যায় এবং ফতোয়া জারি করে আত্মার কর্মকাণ্ডের গতি ব্যাখ্যা করে। অথচ এ বিষয়টি আলিমুল গায়ব ছাড়া অন্যকেউ জানেই না। আজব ব্যাপার হচ্ছে এখানে এমন লোকও আছে, যারা এই কাজটিকে বুদ্ধিমত্তা, চৌকাস্য এবং বিচক্ষণতা বলে উল্লেখ করে থাকে। অথচ শরীয়তের দৃষ্টিতে এটা মোটেই কোন বিচক্ষণতা নয়। আমরা আদিষ্ট হয়েছি মানুষের বাহ্য অবস্থা বিবেচনা করতে এবং তাদের গোপন ভেদ আল্লাহ-র হাতে ছেড়ে দিতে।

**সর্বশেষ**
যদি এমন হয় কলবের অবস্থান ও গুরুত্ব, তা হলে আমরা কেন নিজেদের অন্তর নিয়ে ভাবি না? আমাদের দেখতে হবে কলবের সাথে আমাদের আমল কেমন; বরং দেখতে হবে কলব আমাদের সাথে কী আচরণ করে?
কতই তো ব্যস্ত থাকি আমাদের দুনিয়া, জীবনোপকরণ এবং পেশাগত বিষয় নিয়ে। একটু সুযোগ হলেই তো সেটুকু দিয়ে দিই বাহ্য কর্মকাণ্ডের জন্য।

কিন্তু এই কলব নিয়ে আমরা খুব কমই ভাবি। এর গুরুত্ব খুব কমই অনুধাবন করি। কলবের গুরুত্ব এবং মানবজীবনে তার প্রভাব সম্পর্কে যেকথাগুলো এইমাত্র উল্লেখ করলাম, হয়তো সেগুলোর মধ্যে এমন আবেদন আছে, যা আমাদেরকে কলব নিয়ে আলোচনা করতে এবং এ প্রসঙ্গে যথাযথ গুরুত্ব দিতে আহ্বান করে।

📘 যেভাবে আত্মা শুদ্ধ করবেন > 📄 আত্মার পরীক্ষার অর্থ

📄 আত্মার পরীক্ষার অর্থ


বন্ধুগণ! সকালসন্ধ্যা আমাদের হৃদয়সমূহের পরীক্ষা হয়ে থাকে। জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে পরীক্ষা হয় হৃদয়ের। আমরা কি এ বিষয়ে অবগত আছি? একটি ভুল এই কলবের জীবন নস্যাৎ করতে পারে এবং বরবাদ করে দিতে পারে যাবতীয় আমল。

আল্লাহ বলেছেন- وَلِيَبْتَلِيَ اللهُ مَا فِي صُدُورِكُمْ وَلِيُمَحِّصَ مَا فِي قُلُوبِكُمْ وَاللَّهُ عَلِيمٌ بِذَاتِ الصُّدُورِ তোমাদের বুকে যাকিছু আছে তা পরীক্ষা করা আল্লাহর ইচ্ছা এবং অন্তরের বিষয় যাচাই করা তাঁর উদ্দেশ্য। আল্লাহ অন্তরের বিষয় জানেন। [সুরা আল ইমরান: ১৫৪]

আল্লাহ আরও বলেছেন- أولَئِكَ الَّذِينَ امْتَحَنَ اللَّهُ قُلُوبَهُمْ لِلتَّقْوَى لَهُمْ مَّغْفِرَةٌ وَأَجْرٌ عَظِيمٌ) তাকওয়ার ব্যাপারে আল্লাহ এদের অন্তরসমূহের পরীক্ষা নিয়েছেন। এদের জন্য রয়েছে মাগফিরাত এবং মহাপুরস্কার। [সুরা হুজরাত: ০২]

এরা কারা, তাকওয়ার ব্যাপারে আল্লাহ যাদের অন্তরসমূহের পরীক্ষা নিয়েছেন?

এই আয়াতটি নাযিল হয়েছিল মহান দুইজন সাহাবী, আবু বকর সিদ্দীক এবং উমর ইবনুল খাত্তাব -র ব্যাপারে, যখন তাঁরা রসুলুল্লাহ -র দরবারে নিজেদের আওয়াজ বুলন্দ করে ফেলেছিলেন। ইমাম বুখারী আব্দুল্লাহ ইবনে যুবায়ের থেকে বর্ণনা করেছেন যে, বনী তামীমের একটি প্রতিনিধি দল নবীজী -র দরবারে উপস্থিত হল। তখন আবু বকর বললেন-
কা'কা' ইবনে মা'বাদ ইবনে যুরারাকে এদের আমীর নিযুক্ত করে দিন (ইয়া রসুলাল্লাহ!)।

উমর বলে ফেললেন- না; বরং আকরা' ইবনে হাবিসকে আমীর নিযুক্ত করুন।

তখন আবু বকর উমরকে বললেন- তোমার উদ্দেশ্য আমার বিরোধিতা করা।

উমর বললেন- না; আমার উদ্দেশ্য অমন নয়।

এতে কলহ সৃষ্টি হল এবং তাদের আওয়াজ বড় হয়ে গেল। তখন এই আয়াত নাযিল হল- يَـٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوا۟ لَا تُقَدِّمُوا۟ بَيْنَ يَدَىِ ٱللَّهِ وَرَسُولِهِۦ ۖ وَٱتَّقُوا۟ ٱللَّهَ ۚ إِنَّ ٱللَّهَ سَمِيعٌ عَلِيمٌ

ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রসুলের সামনে অগ্রণী হয়ো না, এবং আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয় আল্লাহ সবকিছু শোনেন এবং জানেন। [সুরা হুজরাত: ০১]

এই আয়াত নাযিল হওয়ার পর কলহ থেমে গেল। [সহীহ বুখারী: হাদীস নং- ৪৩৬৭]

হাঁ, ইসলামে ধর্মে কোন মোসাহেবী নেই- يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوا۟ لَا تَرْفَعُوٓا۟ أَصْوَٰتَكُمْ فَوْقَ صَوْتِ ٱلنَّبِىِّ وَلَا تَجْهَرُوا۟ لَهُۥ بِٱلْقَوْلِ كَجَهْرِ بَعْضِكُمْ لِبَعْضٍ ঈমানদারগণ! নবীর কণ্ঠস্বরের উপর তোমাদের কণ্ঠস্বর উঁচু কোরো না এবং তোমরা নিজেদের মধ্যে যেরকম উচ্চস্বরে কথা বলো, তাঁর সাথে সেরকম উচ্চস্বরে কথা বোলো না। [সুরা হুজরাত: ০২]

এরপর কী বলা হয়েছে?
أَنْ تَحْبَطَ أَعْمَالُكُمْ وَأَنْتُمْ لَا تَشْعُرُونَ)

এতে তোমাদের আমল নিষ্ফল হয়ে যাবে, অথচ তোমরা টেরও পাবে না। [সুরা হুজরাত: ০২]

সুবহানাল্লাহ! কত জটিল কথা। অথচ বেশিরভাগ মানুষ চিন্তাও করে না যে, তাদের আমল নষ্ট হয়ে যেতে পারে।

এই আয়াতে কাদেরকে ধমক দেওয়া হয়েছে? আবু বকরকে, যাঁর ব্যাপারে রসুল বলেছেন-

لَوْ كُنْتُ مُتَّخِذًا خَلِيلًا مِنْ أُمَّتِي لَا تَّخَذْتُ أَبَا بَكْرٍ
আমি যদি উম্মতের কাউকে বন্ধু সাব্যস্ত করতাম, তা হলে আবু বকরকে সাব্যস্ত করতাম। [সহীহ বুখারী: হাদীস নং- ৩৯০৪]

আরেক জন হচ্ছেন উমর, যাঁর ব্যাপারে রসুল বলেছেন-

وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ مَا لَقِيَكَ الشَّيْطَانُ قَطُّ سَالِكًا فَجًّا إِلَّا سَلَكَ فَبًّا غَيْرَ فَجَكَ
সেই সত্তার কসম, যাঁর হাতে আমার প্রাণ! কোন পথে চলতে গিয়ে যদি তোমার সাথে শয়তানের দেখা হয়, তা হলে সে তোমার রাস্তা ছেড়ে অন্য পথ ধরে। [সহীহ বুখারী: হাদীস নং- ৩২৯৪]

কিন্তু তাঁরা দুইজন তওবা করেছিলেন, এস্তেগফার করেছিলেন এবং শপথ কলেছিলেন যে, তারা রসুল-র সাথে কথা বলবেন পরামর্শ দানকারীর মত গুনগুন আওয়াজে।

এখানেই ফলাফলটা বেরিয়ে আসে-

أُولَئِكَ الَّذِينَ امْتَحَنَ اللهُ قُلُوبَهُمْ لِلتَّقْوَى لَهُمْ مَّغْفِرَةٌ وَأَجْرٌ عَظِيمٌ)
তাকওয়ার ব্যাপারে আল্লাহ এদের অন্তরসমূহের পরীক্ষা নিয়েছেন। এদের জন্য রয়েছে মাগফিরাত এবং মহাপুরস্কার। [সুরা হুজরাত: ০২]
অর্থাৎ তাদের অন্তরগুলোকে আল্লাহ তাকওয়ার জন্য শোধিত করেছেন। এখন সেগুলো শুধু তাকওয়াই লালন করে। [আল্লামা আলুসী এই আয়াতের তাফসীর প্রসঙ্গে লিখেছেন, মানে আল্লাহ তাদের কলবকে তাকওয়ার জন্য পরিশুদ্ধ করে দিয়েছেন; এখন সেখানে তাকওয়া ছাড়া অন্যকিছুর স্থান নেই। কেমন যেন তাদের কলব তাকওয়ার রাজ্য হাসিল করেছে। দেখুন, রুহুল মাআনী: সুরা হুজরাত।]

আমাদের দৃষ্টিতে মুসলিম উম্মাহ্র সর্বশ্রেষ্ঠ দু'জন ব্যক্তি থেকে ঘটে যাওয়া ছোট্ট একটি ঘটনা; তাদের পক্ষ থেকে সংঘটিত সামান্য এক গাফলতকে কেন্দ্র করে একটি সহজ পরীক্ষামাত্র।

কিন্তু আমাদের ব্যাপারে কী বলব?

আমরা যে কত পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়েছি, অথচ আমরা টেরও পাইনি, এর কোন ইয়ত্তা নেই।

এখানে এই আয়াতে অদ্ভুত এক রহস্য আছে, তা হল وَأَنْتُمْ لَا تَشْعُرُونَ [অথচ তোমরা টেরও পাবে না।] তার কারণ, অনেক সময়ই মানুষের আমল নষ্ট হয়, অথচ সে টেরও পায় না। সে কল্পনাও করে না যে, তার অমুক অন্যায়টির কারণে তার আমল ধ্বংস হয়ে যাবে; অথবা তার আমলের কোন ঝুঁকি আছে, একথা সে ভাবেই না।

কত আমল, কত কথা মানুষকে ধ্বংস করে দেয়, অথচ সে তা চিন্তাও করে না।

যদি রসুলুল্লাহ -এর দরবারে উচ্চস্বরে কথা বলা এতদূর গড়ায় যে, আবু বকর, উমর -এর আমল ধ্বংস করে দিবে, তা হলে সেইসব লোকের অবস্থা কী হবে, যারা নিজেদের কণ্ঠ ব্যবহার করে হকের আওয়াজ নির্বাপিত করে? তারা আসলে এমন লোক, যারা তাগুতের বিধিমালাকে আল্লাহ -র শরীয়তের উপর প্রাধান্য দেয়। তারা এমন, যারা সাহায্য করে এবং বন্ধুত্ব করে শয়তানের পথে।

আমরা 'আত্মার পরীক্ষা' কথাটির অর্থ আরও পরিষ্কার করে বুঝবার জন্য একটি মহান হাদীস পড়তে পারি, যেটি হোযায়ফা ইবনুল য়ামান নবী করীম থেকে বর্ণনা করেছেন। নবীজী বলেছেন- تُعْرَضُ الْفِتَنُ عَلَى الْقُلُوبِ كَالْحَصِيرِ عُودًا عُودًا فَأَيُّ قَلْبٍ أُشْرِبَهَا نُكِتَ فِيهِ نُكْتَةٌ سَوْدَاءُ وَ أَيُّ قَلْبٍ أَنْكَرَهَا نُكِتَ فِيهِ نُكْتَةٌ بَيْضَاءُ حَتَّى تَصِيرَ عَلَى قَلْبَيْنِ عَلَى أَبْيَضَ مِثْلِ الصَّفَا فَلا تَضُرُّهُ فِتْنَةٌ مَا دَامَتِ السَّمَوَاتُ وَالْأَرْضُ وَالآخَرُ أَسْوَدُ مُرْبَادًا كَالْكُوزِ مُجَنِّيًا لَا يَعْرِفُ مَعْرُوفًا وَلَا يُنْكِرُ مُنْكَرًا إِلَّا مَا أُشْرِبَ مِنْ هَوَاهُ.

মানুষের অন্তরে ফেতনা পেশ করা হয় চাটাইয়ের বাতার মত একের পর এক। তারপর যেই অন্তরটি তা আকড়ে ধরে গ্রহণ করে, তার মধ্যে একটি কালো দাগ পড়ে। আর যে অন্তরটি তা গ্রহণ করে না, তার মধ্যে সাদা দাগ পড়ে। তারপর উভয় অন্তরের দাগ- সাদাটি হয় একেবারে শ্বেত পাথরের মত। তখন আসমান-জমীন থাকা পর্যন্ত কোন ফেতনা তার ক্ষতিসাধন করতে পারে না। আর অপরটি হয়ে যায় ঘুটঘুটে কালো ভাঙা মগের মত। সে কোন ভালো বিষয় উপলব্ধি করতে পারে না এবং প্রবৃত্তিস্থিত বিষয় বাদে কোন গর্হিত বিষয় অগ্রাহ্য করতে পারে না। [সহীহ মুসলিম: হাদীস নং- ৩৮৬]

আল্লাহ আমাদের অন্তরসমূহ সাদা করে দিন এবং গুনাহখাতা, দোষত্রুটি এবং শকসন্দেহ থেকে পবিত্র করে দিন। হাদীসে ফেতনা পেশ করার কথা (تُعْرَضُ) সাধারণ বর্তমানকাল-জ্ঞাপক পদে ব্যক্ত করা হয়েছে। এখানে সেটি বালা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার অবিরামতার প্রতি ইঙ্গিত করছে। এই ফেতনাগুলো একবারে পেশ হয় না; বরং অল্প অল্প করে পেশ হয় এবং কলব পুরো কালো হয়ে যায়। নাউযু বিল্লাহ। অথবা আল্লাহ তাকে নিরাপদ রাখেন এবং সে পরীক্ষায় সফল হয়। তখন কোন ফেতনা আসমান-জমীন থাকা পর্যন্ত তার কোন ক্ষতি করতে পারে না।

📘 যেভাবে আত্মা শুদ্ধ করবেন > 📄 লক্ষণীয়

📄 লক্ষণীয়


শাইখুল আল্লামা ইবনে তাইমিয়া বলছেন, নক্স মানুষকে আহ্বান করে না-ফরমানী এবং দুনিয়ার জীবনকে প্রাধান্য দেওয়ার দিকে; আর আল্লাহ তাঁর বান্দাকে ডাকেন তাঁকে ভয় করা এবং প্রবৃত্তির অনুসরণ থেকে নক্সকে বারণ করার দিকে। কলব এই দুই আহ্বায়কের মাঝে অবস্থান করে থাকে। এটাই হচ্ছে ফেতনা ও পরীক্ষার ক্ষেত্র।

এখানে লক্ষ করার মত একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে। তা হল দাওয়াত এবং ইলম হাসিলের মহানব্রতে নিয়োজিত কিছু কিছু মানুষ ধারণা করে থাকেন যে, চূড়ান্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষা হচ্ছে দৈহিক নির্যাতন- যেমন, জেল, জুলুম, বন্দীত্ব এবং খুন ইত্যাদি। অথবা পরোক্ষা নির্যাতন- যেমন, সমাজের বয়কট, তার ডাকে সাড়া না দেওয়া, ঠাট্টা-বিদ্রূপ ইত্যাদি। এমনটা ধারণা করলে পরীক্ষা-নিরীক্ষার তাৎপর্যকে সীমাবদ্ধ করে ফেলা হয়। কত মানুষ দৈহিক জুলুম-নির্যাতনের পরীক্ষায় সফল হয়; কিন্তু আত্মার পরীক্ষায় তারা ব্যর্থ হয়ে যায়। এজন্য পরিপক্ক ইলমের অধিকারীগণ দোআ করে থাকেন-

رَبَّنَا لَا تُزِغْ قُلُوبَنَا بَعْدَ إِذْ هَدَيْتَنَا وَهَبْ لَنَا مِنْ لَّدُنْكَ رَحْمَةً ۚ إِنَّكَ أَنْتَ الْوَهَّابُ
হে আমাদের রব! আমাদেরকে সত্যপথ দেখানোর পর আমাদের অন্তরসমূহকে সত্য লঙ্ঘনে প্রবৃত্ত কোরো না। তোমার পক্ষ থেকে আমাদেরকে দান করো রহমত। নিশ্চয় তুমি মহান দাতা। [সুরা আল ইমরান: ০৮]

এখানে আমরা 'আত্মার পরীক্ষা' সম্পর্কিত ভূমিকা শেষ করব। তবে এখানে মুমিনদেরকে আল্লাহ -র পক্ষ থেকে সূক্ষ্ম ভয় মিশ্রিত এই দাওয়াতটি পেশ করছি-
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اسْتَجِيبُوا لِلَّهِ وَلِلرَّسُولِ إِذَا دَعَاكُمْ لِمَا يُحْيِيكُمْ وَاعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ يَحُولُ بَيْنَ الْمَرْءِ وَقَلْبِهِ وَأَنَّهُ إِلَيْهِ تُحْشَرُونَ)

ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহ ও রসুলের ডাকে সাড়া দাও, যখন তিনি তোমাদেরকে এমন বিষয়ের দিকে ডাকেন, যার মধ্যে রয়েছে তোমাদের জীবন। জেনে রেখো, আল্লাহ মানুষ ও তার অন্তরের মাঝে অন্তরায় হয়ে থাকেন। বস্তুত তাঁর কাছেই সমবেত হবে। [সুরা আনফাল: ২৪]

আল্লাহ -র কাছে আমরা কামনা করছি, তিনি যেন আমাদেরকে আল্লাহ ও রসুলের ডাকে সাড়া দিতে তৌফীক দেন এবং সাহায্য করেন। তৌফীক দিন যাতে আমাদের জীবন আছে, সেটা কবুল করতে এবং আমাদের ও আমাদের অন্তরের মাঝে যেন অন্তরায় সৃষ্টি না হয়, সে জন্য। তিনি এর মালিক এবং তিনি একাজে সক্ষম।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00