📘 যেমন হবে উম্মাহর দাঈগণ > 📄 উমার ফারুক ؓ

📄 উমার ফারুক ؓ


তিনি ইসলাম গ্রহণের সাথে সাথেই তার বীরত্ব ও বাহাদুরি প্রকাশ করেন। তার প্রচণ্ড আগ্রহ হল মক্কায় ইসলামকে প্রকাশ্যে ঘোষণা করতে এবং মুশরিকদের মুখোমুখী হতে। অথচ ইতিপূর্বে মুসলিমগণ মানুষের কাছে যেত গোপনে গোপনে। তিনি বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা কেন আমাদের দ্বীনকে গোপন করব, অথচ আমরা হকের উপর আছি, আর তারা হল বাতিল? রাসূলুল্লাহ বললেন- আমরা সংখ্যায় স্বল্প আর আমরা কি পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছি তা তো তুমি দেখেছো। তখন উমার বললেন, সেই প্রভুর শপথ! যিনি আপনাকে সত্য দিয়ে প্রেরণ করেছেন, যত মজলিসে আমি কুফরী নিয়ে বসেছিলাম, এখন আমি প্রতিটি মজলিসে ঈমান নিয়ে বসব। তারপর রাসূল মুসলমানদেরকে দু'টি কাতারবদ্ধ করে কা'বার দিকে রওয়ানা দিলেন। এক কাতারে হামযা, অন্য কাতারে উমার। [ঘটনাটি আবু নুআইম, ইবনে আসাকির ও ইবনুল জাওযী উল্লেখ করেছেন]

তিনি যখন হিজরত করার ইচ্ছা করলেন, তখন কুরাইশের একটি সভার মধ্যে ঘোষণা দিলেন, যে তার মাকে সন্তানহারা করতে চায়, নিজ সন্তানকে ইয়াতীম করতে চায়, সে যেন এই উপত্যকার অপর পাশে আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে। তখন কেউ তার পিছনে যেতে সাহস করেনি। আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ বলেন, যখন থেকে উমার ইসলাম গ্রহণ করল, তখন আমরা সর্বদাই দাপটশালী থেকেছি। [ঘটনাটি ইবনে আসাকির ও ইবনুল আছির উল্লেখ করেছেন]

📘 যেমন হবে উম্মাহর দাঈগণ > 📄 যুননুরাইন উসমান ইবনে আফফান ؓ

📄 যুননুরাইন উসমান ইবনে আফফান ؓ


উসমান-কে সাহাবাদের মধ্যে সবচেয়ে বাহাদুর হিসাবে গণ্য করা হয়। তিনি সবগুলো যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ এর সঙ্গে উপস্থিত হয়েছেন। মুসলমানদের কোন যুদ্ধ থেকেই পিছিয়ে থাকেননি। একমাত্র বদরের যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ তাকে রাসূলুল্লাহ এর কণ্যা রুকাইয়া এর পাশে থাকতে বলেন। কারণ তিনি (রুকাইয়া) অসুস্থ ছিলেন।

আমীরুল মুমিনীন উসমান এর চূড়ান্ত বীরত্ব প্রকাশ পায় যে সময় তাকে তার নিজ ঘরে অবরুদ্ধ করা হয়। তিনি দু'চোখের সামনে মৃত্যু দেখতে পাচ্ছিলেন। তিনি জানতেন যে, তিনি একটি মাত্র কথার মাধ্যমে এই মৃত্যুকে প্রতিহত করতে পারেন। আর তা হচ্ছে তিনি মুসলিমদের খেলাফত থেকে সরে দাঁড়াবেন। কিন্তু তিনি এটাকে প্রত্যাখ্যান করেন। অথচ তিনি জানেন, মৃত্যু তার জন্য অপেক্ষা করছে। তার পক্ষ থেকে প্রতিহত করারও কেউ নেই। তার কোন প্রহরী বা গোয়েন্দা বাহিনীও নেই। তিনি এমন একটি বিষয় ছাড়তে অস্বীকার করেন, যেটা আল্লাহর আদেশ নয় অথবা আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত কোন বিষয়ও নয়। তিনি নিজ জীবন ও নিজ খেলাফত বহাল রাখার জন্য বা শুধু মাত্র বেঁচে থাকার জন্য কৌশল অবলম্বন করেননি। তাকে মৃত্যুর পূর্বে মারা হয়েছে, জখম করা হয়েছে, কিন্তু তিনি সামান্যও নমনীয় হননি। একই সময়ে মৃত্যু ও পিপাসা তাকে হাতছানি দিতে থাকে, কিন্তু তিনি নমনীয় হননি। তাকে আকস্মিকও হত্যা করা হয়নি; বরং স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে, হয়ত মৃত্যু অথবা খেলাফত ছেড়ে দিতে হবে। কিন্তু তিনি নিজের থেকে বায়আত তুলে নেননি। কাউকে আহ্বানও করেননি তার পক্ষে লড়াই করার জন্য। শুধুমাত্র মুসলমানদের রক্তের হেফাজতের জন্য তিনি নিজেকে কুরবানী করে দেন। আল্লাহর তার প্রতি সন্তুষ্ট হোন।

📘 যেমন হবে উম্মাহর দাঈগণ > 📄 আলী ইবনে আবি তালিব ؓ

📄 আলী ইবনে আবি তালিব ؓ


খায়বার যুদ্ধের আলোচনা প্রসঙ্গে সালামা ইবনুল আকওয়া থেকে বর্ণিত আছে-
كَانَ عَلِيٌّ قَدْ تَخَلَّفَ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فِي خَيْبَرَ وَكَانَ رَمِدًا، فَقَالَ: أَنَا أَتَخَلَّفُ عَنْ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَخَرَجَ عَلِيٌّ فَلَحِقَ بِالنَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَلَمَّا كَانَ مَسَاءُ اللَّيْلَةِ الَّتِي فَتَحَهَا اللهُ فِي صَبَاحِهَا. قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَأُعْطِيَنَّ الرَّايَةَ، أَوْ لَيَأْخُذَنَّ بِالرَّايَةِ غَدًا رَجُلٌ يُحِبُّهُ اللَّهُ وَرَسُولُهُ، أَوْ قَالَ يُحِبُّ اللَّهَ وَرَسُولَهُ، يَفْتَحُ اللَّهُ عَلَيْهِ فَإِذَا نَحْنُ بِعَلِي، وَمَا نَرْجُوهُ. فَقَالُوا هَذَا عَلِيُّ، فَأَعْطَاهُ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الرَّايَةَ. فَفَتَحَ اللَّهُ عَلَيْهِ

“তিনি বলেন, খায়বার যুদ্ধে আলী রাসূলুল্লাহ-এর সাথে ছিলেন না। তার চোখ উঠেছিল। কিন্তু তিনি বললেন, আমি কি রাসূলুল্লাহর -এর পিছনে থেকে যাবো? তাই তিন পরে গিয়ে রাসূলুল্লাহ-এর সঙ্গে মিলিত হন। অতঃপর যখন সেই রাত্রি আসল, যে রাত্রির পরবর্তী সকাল বেলা আল্লাহ তা'আলা বিজয় দান করেছিলেন, তখন রাসূলুল্লাহ বললেন-
আমি আগামীকাল এমন এক ব্যক্তিকে পতাকা দিব (বা এমন ব্যক্তি পতাকা হাতে নিবে), যাকে আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূল ভালবাসেন। অথবা বলেছিলেন, যে আল্লাহ ও তার রাসূলকে ভালবাসে। আল্লাহ তার হাতে বিজয় দান করবেন। তারপর আমরা দেখতে পেলাম 'আলী'। আমরা তাকে ধারণা করেছিলাম না। সবাই বলল, এই তো আলী। তখন রাসূল ﷺ তার হাতে পতাকা দিলেন। কাফের পক্ষের মারহাব বের হয়ে বলতে লাগল- খায়বার জেনে গেছে আমি হলাম মারহাব। সেই সময়ের বাহাদুর, সম্পূর্ণ স্বসস্ত্র ও যুদ্ধাভিজ্ঞ, যখন যুদ্ধের লেলিহান শিখা জ্বলে উঠে। তখন আলী বললেন- আমি হলাম সেই ব্যক্তি, আমার মা আমার নাম রেখেছে হায়দার (সিংহ)। বনের সিংহের ন্যায়, যা দেখতে অসুন্দর। আমি তাদেরকে 'সানদারার' মাপ বুঝিয়ে দিব। বর্ণনাকারী বলেন, অতঃপর আলী মারহাবের মাথায় আঘাত করে তাকে হত্যা করে ফেলেন এবং বিজয় তার হাতেই হয়।" [সহিহ মুসলিম- ২৪০৭]

📘 যেমন হবে উম্মাহর দাঈগণ > 📄 বালক সাহাবীগণ ও আব্দুর রহমান ইবনে আউফ ؓ

📄 বালক সাহাবীগণ ও আব্দুর রহমান ইবনে আউফ ؓ


আব্দুর রহমান ইবনে আউফ বলেন- إِنِّي لَفِي الصَّفِّ يَوْمَ بَدْرٍ إِذِ التَفَتْ فَإِذَا عَنْ يَمِينِي وَعَنْ يَسَارِي فَتَيَانِ حَدِيثًا السِّنِّ، فَكَأَنِّي لَمْ آمَنْ بِمَكَانِهِمَا ، إِذْ قَالَ لِي أَحَدُهُمَا سِرًّا مِنْ صَاحِبِهِ: يَا عَمَ أَرِنِي أَبَا جَهْلٍ، فَقُلْتُ: يَا ابْنَ أَخِي وَمَا تَصْنَعُ بِهِ؟ قَالَ: عَاهَدْتُ اللَّهَ إِنْ رَأَيْتُهُ أَنْ أَقْتُلَهُ أَوْ أَمُوتَ دُونَهُ، فَقَالَ لِي الْآخَرُ سِرًّا مِنْ صَاحِبِهِ مِثْلَهُ ، قَالَ : فَمَا سَرَّنِي أَنِّي بَيْنَ رَجُلَيْنِ مَكَانَهُمَا، فَأَشَرْتُ لَهُمَا إِلَيْهِ، فَشَدَّا عَلَيْهِ مِثْلَ الصَّقْرَيْنِ حَتَّى ضَرَبَاهُ، وَهُمَا ابْنَا عَفْرَاءَ

বদর যুদ্ধের দিন আমি যুদ্ধের সারিতে। আমি আমার ডানে ও বামে তাকিয়ে দেখি, স্বল্প বয়স্ক দু'জন বালক। আমার পাশে তাদের অবস্থানের কারণে আমি যেন অনিরাপত্তাবোধ করছিলাম। ইত্যবসরে তাদের একজন অপরজন থেকে লুকিয়ে আমাকে বলল, চাচা! আমাকে আবু জাহেলকে দেখিয়ে দিন। আমি বললাম, ভাতিজা! তুমি তাকে দিয়ে কি করবে? সে বলল, আমি আল্লাহর সাথে শপথ করেছি, আমি যদি তাকে দেখতে পাই, তাহলে হয়ত তাকে হত্যা করবো অথবা আমি নিহত হবো। তারপর তার অপর সাথীও তার থেকে লুকিয়ে আমাকে অনুরূপ কথাই বলল। তখন আমার নিকট মনে হল, তাদের স্থানে দু'জন পুরুষ থাকলেও আমি এতটা খুশি হতাম না। আমি তাদেরকে আবু জাহেলকে দেখিয়ে দিলাম। তৎক্ষণাৎ তারা বাজপাখির মত তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল এবং তাকে আঘাত করে হত্যা করে ফেলল। তারা ছিল আফরা এর দুই ছেলে। [সহিহ বুখারি- ৩৯৮৮]

আমাদেরও উচিত, আমাদের সন্তানদেরকে এভাবে প্রতিপালিত করা। আমরা তাদের আত্মমর্যাদাবোধ জাগিয়ে তুলবো নিজেদের দ্বীনের জন্য, তাদের নবীর জন্য এবং মুমিনদের জন্য। তাদের হৃদয়ে আল্লাহর পথে জিহাদের জন্য ভালাবাসার বীজ বপন করবো। আল্লাহ তা'আলা এই প্রস্তুতি গ্রহণের ব্যাপারেই নিম্নোক্ত আয়াতে আমাদেরকে আদেশ করেছেন-

وَأَعِدُّوا لَهُم مَّا اسْتَطَعْتُم مِّن قُوَّةٍ.
“তোমরা তাদের (বিরুদ্ধে যুদ্ধের) জন্য তোমাদের সামর্থ্যমত শক্তি প্রস্তুত কর।" [সুরা আনফাল- ৬০]

এই আয়াতে 'শক্তি' মানে হচ্ছে নিক্ষেপ করা। রাসূলুল্লাহ তার এরূপ তাফসীরই করেছেন। যেমন ইমাম মুসলিম রহ. উকবা ইবনে আমের থেকে বর্ণনা করেন, তিনি রাসূলুল্লাহকে বলতে শুনেছেন, তিনি তখন মিম্বারে ছিলেন, তিনি বলছিলেন-
"তোমরা তাদের জন্য তোমাদের সাধ্যমত শক্তি প্রস্তুত কর”- জেনে রেখ, শক্তি হচ্ছে নিক্ষেপ করা। জেনে রেখ, শক্তি হচ্ছে নিক্ষেপ করা। জেনে রেখ, শক্তি হচ্ছে নিক্ষেপ করা।”

তবে রাসূল এর এ কথা দ্বারা আয়াতে বর্ণিত যেকোন প্রকার শক্তিকে বিশেষ প্রকারের সাথে শর্তযুক্ত করা বুঝা যায় না। বরং হাদিসের অর্থ হচ্ছে- নিক্ষেপ করা হল এ সকল শক্তিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে প্রসিদ্ধ ও বড়। আর সে সময়ের ধনুকের সাহায্যে তীর নিক্ষেপের হুকুমটি বর্তমানে প্রযোজ্য হবে বিভিন্ন আধুনিক যুদ্ধাস্ত্রের সাহায্যে নিক্ষেপ করার উপর। যেগুলোর জন্য সাধারণতঃ দীর্ঘ নিয়মতান্ত্রিক চেষ্টা ও পরিশ্রমের প্রয়োজন হয়। যা অনিবার্যভাবে ব্যাপক আকারে প্রস্তুতি গ্রহণকে দাবি করে। যেমনিভাবে ধনুকের সাহায্যে তীর নিক্ষেপের ক্ষেত্রে প্রয়োজন হত।

বর্তমানে আমরা এর খোঁজেই আছি এবং এটাই আমাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। কারণ উম্মাহ তাদের বর্তমান দুর্দশা থেকে ততক্ষণ পর্যন্ত কিছুতেই উত্তরণের পথ পাবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত তারা তাদের নবী ও তাঁর সাহাবাদের পথে ফিরে না আসবে। আর সাহাবায়ে কেরামের এই ভূমিকা একমাত্র রাসূলুল্লাহ এর উন্নত দীক্ষার কারণেই হয়েছিল। আল্লাহ তা'আলা তাদের মাধ্যমে দ্বীনকে হেফাজত করেছেন এবং অসংখ্য দেশ বিজিত করেছেন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00