📄 ষষ্ঠ গুণ: الخطاب (বাগ্মীতা)
وَأَتَيْنَاهُ الْحِكْمَةَ وَفَصْلَ الْخِطَابِ.
"এবং তাকে দান করেছিলাম প্রজ্ঞা ও মীমাংসাকর বাগ্মিতা"
'আল খিতাবাহ' বা 'ভাষণ': এর আভিধানিক উৎপত্তি- خطب - يخطب خطابة وخطبة - فهو خطيب - والمفعول مخطوب.
আর পরিভাষায় 'খিতাবাহ' বলা হয় এমন বক্তব্যকে, যা জনসম্মুখে পেশ করা হয়। অথবা তা বলা হয় এমন কথাকে, যা বক্তা মানুষকে জানানো ও পরিতুষ্ট করার উদ্দেশ্যে মানুষের সামনে পেশ করে। 'বক্তৃতা' বা 'ভাষণ' একটি গুরুত্বপূর্ণ শাস্ত্র। শ্রোতাদের মস্তিস্ক ও হৃদয়ে এর প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ে। জনগণের মস্তিস্ককে পরিতুষ্ট ও আশ্বস্ত করতে এবং তাদের বিবেককে নাড়া দেওয়ার জন্য এটাই প্রধান মাধ্যম। প্রাচ্য থেকে দু'জন লোক আসল রাসূলুল্লাহ ﷺ এর নিকট। তারা এমন খৈ ফুটানো ভাষণ দিল যে, লোকজন মন্ত্রের ন্যায় মুগ্ধ হয়ে গেল। তখন রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন-
إِنَّ مِنَ البَيَانِ لَسِحْرًا.
“নিশ্চয়ই কিছু বক্তৃতা যাদু।” [সহিহ বুখারি- ৫১৪৬]
একারণে নেতাদের জন্য এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তারই সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন লোকজনকে তার আশেপাশে ভেড়ানোর। আর এটা তখনই সম্ভব হবে, যখন জনগণ তার কাজ ও কথাবার্তা সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা রাখবে। তখনই তিনি তাদেরকে নিয়ে যেতে পারবেন আল্লাহর শাসনের দিকে। যেমনিভাবে রাসূলুল্লাহ ﷺ সাহাবায়ে কেরামকে নিয়ে গিয়েছিলেন। স্বয়ং আল্লাহ তা'আলা রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর জীবনে বক্তৃতা বা ভাষণের গুরুত্ব বর্ণনা করেছেন। যেমন তিনি তার নবী মূসা -এর ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন-
قَالَ رَبِّ إِنِّي أَخَافُ أَن يُكَذِّبُونِ. وَيَضِيقُ صَدْرِي وَلَا يَنطَلِقُ لِسَانِي فَأَرْسِلْ إِلَى هَارُونَ.
"মূসা বলল, হে আমার প্রতিপালক! আমার আশংকা, তারা আমাকে মিথ্যাবাদী বলবে। আমার অন্তর সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে এবং আমার জিহ্বা সাচ্ছন্দে চলে না। সুতরাং হারুনের কাছেও নবুওয়াতের বার্তা পাঠান।" [সুরা শুআরা: ১২, ১৩]
তিনি আরও বলেন-
وَأَخِي هَارُونُ هُوَ أَفْصَحُ مِنِّي لِسَانًا فَأَرْسِلْهُ مَعِيَ رِدْءًا يُصَدِّقُنِي إِنِّي أَخَافُ أَن يُكَذِّبُونِ.
"আমার ভাই হারুনের জবান আমার অপেক্ষা বেশি স্পষ্ট। আমার সঙ্গে আমার সাহায্যকারীরূপে তাকেও পাঠিয়ে দিন। যাতে সে আমার সমর্থন করে। আমার আশংকা তারা আমাকে মিথ্যাবাদী বলবে।" [সুরা কাসাস- ৩৪]
আল্লামা ইবনে সা'দী রহ. বলেন- তার জবানে জড়তা ছিল, তার কথা ভালমত বোঝা যেত না। এজন্য তিনি আল্লাহর নিকট দু'আ করেন, যেন আল্লাহ তার জড়তা দূর করে দেন, যাতে মানুষ তার কথা বুঝতে পারে। ফলে বক্তৃতা ও ভাষণের পরিপূর্ণ ফায়দা অর্জিত হয়।
তখন আল্লাহ তায়ালা বলেন-
قَالَ قَدْ أُوتِيتَ سُؤْلَكَ يَا مُوسَى
'হে মুসা! তুমি যা কিছু চেয়েছো, তা তোমাকে দেওয়া হলো।' [সুরা ত্বহা- ৩৬]
وَمَا أَرْسَلْنَا مِن رَّسُولٍ إِلَّا بِلِسَانِ قَوْمِهِ لِيُبَيِّنَ لَهُمْ
"আমি যখনই কোন রাসুল পাঠিয়েছি, তাকে তার স্বজাতির ভাষাভাষী করে পাঠিয়েছি, যাতে সে তাদের সামনে সত্যকে সুস্পষ্টরূপে তুলে ধরতে পারে।” [সুরা ইবরাহীম- ৪]
যেহেতু নবীদেরকে পাঠানো হত তাদের স্ব স্ব কওমের ভাষাভাষী করে। যাতে তাদের নিকট হককে স্পষ্ট করতে পারেন এবং স্পষ্ট কথামালা ও আকর্ষণীয় উপস্থাপনার দ্বারা তাদের উপর প্রমাণ প্রতিষ্ঠিত করতে পারেন। আর তা কেবল সফল ও উন্নত ভাষণের মাধ্যমেই সম্ভব।
যেমন নবী মূসা দ্বীনী ও রাজনৈতিক ভাষণের গুরুত্ব উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। একারণে স্বীয় রবের নিকট আবেদন করেছেন, যেন তিনি তার বক্ষ খুলে দেন এবং জবানের জড়তা দূর করে দেন। তারপর তার সাথে তার ভাই হারুনকেও নবী করে প্রেরণ করলেন। কারণ তিনি তার থেকে অধিক সুস্পষ্টভাষী ছিলেন। ফলে আল্লাহ তার আবেদন মঞ্জুর করেন।
আমাদের রাসূলুল্লাহ এর জীবনেও এমন অনেক ঘটনা পাওয়া যায়, যা এ বিষয়টির গুরুত্ব প্রমাণ করে। সম্ভবত বনু তামিমের প্রতিনিধি দলের আগমনের ঘটনায় ইসলামী দাওয়াতের ক্ষেত্রে বক্তৃতার মহা ফলাফলের স্পষ্ট চিত্র রয়েছে।
মুফাস্সির ও ঐতিহাসিকগণ তাদের কিতাবসমূহে ঘটনাটি উল্লেখ করেন- ব্যাপকভাবে প্রতিনিধি দল আগমনের বছর বনু তামিমের প্রতিনিধি দলও মদীনায় আসল। তারপর তারা রাসূলুল্লাহ -কে তাদের দিকে বের হয়ে আসার আহ্বান জানাল। নিম্নোক্ত আয়াতে তাদের কথাই বলা হয়েছে-
إِنَّ الَّذِينَ يُنَادُونَكَ مِن وَرَاءِ الْحُجُرَاتِ أَكْثَرُهُمْ لَا يَعْقِلُونَ
“(হে রাসূল!) তোমাকে যারা কামরার বাইরে থেকে ডাকে, তাদের অধিকাংশেরই বুদ্ধি নেই।” [সুরা হুজরাত-৪]
তিনি তাদের দিকে বের হয়ে আসলে তারা বলল, আমরা এসেছি আমাদের বক্তা ও কবির মাধ্যমে আপনার সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও প্রতিযোগীতা করার জন্য।
রাসূলুল্লাহ বললেন, আমি কবিতা নিয়ে প্রেরিত হইনি। আর আমাকে প্রতিদ্বন্ধিতা করতেও আদেশ করা হয়নি; তবে আপনারা আসুন। তখন যাবারকান ইবনে বদর জনৈক যুবককে বলল, তুমি গর্ব করতে থাক এবং তোমার কওমের শ্রেষ্ঠত্ব বর্ণনা কর। তখন সে বলতে লাগল, সমস্ত প্রশংসা সেই আল্লাহর জন্য, যিনি আমাদেরকে সমস্ত সৃষ্টির সেরা বানিয়েছেন এবং আমাদেরকে দিয়েছেন অঢেল সম্পদ, যার মাধ্যমে আমরা যাচ্ছেতাই করি। তাই আমরা হলাম ভূ-পৃষ্ঠে সর্বশ্রেষ্ঠ। সর্বাধিক জনসংখ্যা, সম্পদ ও অস্ত্রের অধিকারী। তাই যে আমাদের বিরোধিতা করে, সে আমাদের কথা থেকে উত্তম কথা নিয়ে আসুক বা এমন কোন কীর্তি প্রকাশ করুক, যা আমাদের কীর্তি থেকে উত্তম।
তখন রাসূলুল্লাহ তাঁর বক্তা সাবিত ইবনে কায়িস ইবনে শাম্মাসকে বললেন, তুমি দাঁড়াও, তার জবাব দাও! সাবিত ইবনে কায়িস বলতে লাগলেন, "সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য। আমি তার প্রশংসা বর্ণনা করছি এবং তার নিকট সাহায্য প্রার্থনা করছি। তার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করছি, তাঁর উপর ভরসা করছি এবং সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোন উপাস্য নেই। আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ তাঁর বান্দা ও তাঁর রাসূল।"
তিনি মুহাজিরদের মধ্য থেকে তাঁর চাচাত ভাইদেরকে ডাকলেন, যারা ছিলেন সর্বোত্তম চেহারা ও সর্বাধিক জ্ঞানের অধিকারী। তারা তাঁর ডাকে সাড়া দিয়ে বলতে লাগলেন- “সমস্ত প্রশংসা সেই আল্লাহর জন্য, যিনি আমাদেরকে তাঁর দ্বীনের সাহায্যকারী, তাঁর রাসূলের সহকারী ও তাঁর দ্বীনের সম্মান প্রতিষ্ঠাকারী বানিয়েছেন। তাই আমরা মানুষের সাথে যুদ্ধ করি, যে যাবৎ না তারা এই সাক্ষ্য দেয় যে, আল্লাহ ছাড়া কোন উপাস্য নেই এবং মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল। সুতরাং যে তা বলে নিল, সে নিজের প্রাণ ও সম্পদ নিরাপদ করে নিল। আর যে তা অস্বীকার করে, আমরা তাকে হত্যা করি। আর তাঁর দায়ভার আমাদের উপর হালকা। আমি আমার এই কথা বলছি আর তাঁর সাথে আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করছি মুমিন নর-নারীর জন্য।"
তারপর তাদের কবি দাড়িয়ে আবৃত্তি করল। হাসান ইবনে সাবিত তাঁর জবাব দিলেন। তখন প্রতিনিধি দলের সরদার আকরা ইবনে হাবেস বলল, আল্লাহর শপথ! আমি জানি না, এটা কি জিনিস? আমাদের বক্তা কথা বলল, কিন্তু দেখলাম, তাদের বক্তার কথাই শ্রেষ্ঠ। আমাদের কবি কবিতা আবৃত্তি করল, কিন্তু দেখলাম তাদের কবিই শ্রেষ্ঠ আবৃত্তিকারী ও উত্তম কথা রচনাকারী। অতঃপর রাসূলুল্লাহ এর নিকটবর্তী হয়ে বলল, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোন উপাস্য নেই এবং আপনি আল্লাহর রাসূল। উক্ত প্রতিনিধি দলের ইসলাম গ্রহণে এই ভাষণেরই প্রভাব ছিল।
তবে ভাষণের মধ্যে কিছু শর্ত ও পছন্দনীয় বিষয় আছে, যেগুলো নেতাকে রক্ষা করে চলতে হবে। সেগুলো হল-
১। শব্দ চয়ন করবে যত্ন সহকারে। যথাসম্ভব, তার মনে যেসকল বিষয়গুলো উদিত হয়, তার আলোকেই শব্দ ব্যবহার করবে। আর বক্তা সর্বাধিক সত্যনিষ্ঠ ও নিষ্ঠাবান হওয়ার কোন বিকল্প নেই। কারণ যা অন্তর থেকে বের হয়, তাই অন্তরে পৌঁছে। আর এরজন্য আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে তাকে সম্মানিতও করা হয়। ফলে আল্লাহ তা'আলা তার হৃদয় খুলে দেন। বহু বিষয় তার সামনে অনবদ্যভাবে আসতে থাকে, শব্দের ফল্গুধারা প্রবাহিত হতে থাকে। যেমনটা ইমাম জাহেয বলেছেন।
২। যথাসম্ভব বক্তৃতা সংক্ষিপ্ত করা। কারণ মানুষ অধিক কথায় বিরক্তি বোধ করে।
ইমাম মুসলিম রহ. ওয়াসিল ইবনে হাইয়ান থেকে বর্ণনা করেন- আম্মার আমাদের সামনে ভাষণ দিলেন। তিনি খুব সংক্ষিপ্ত ও তাৎপর্যপূর্ণ ভাষণ দিলেন। তিনি যখন নামলেন, তখন আমরা বললাম, হে আবুল ইয়াকযান! আপনি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও সংক্ষিপ্ত ভাষণ দিয়েছেন। আপনি যদি আরেকটু দীর্ঘ করতেন! তখন তিনি বললেন, আমি রাসূল ﷺ-কে বলতে শুনেছি- নিশ্চয়ই কারো নামায দীর্ঘ হওয়া আর বক্তৃতা সংক্ষিপ্ত হওয়া তার বুদ্ধিমত্তার প্রমাণ। তাই তোমরা নামায দীর্ঘ কর আর বক্তৃতা সংক্ষিপ্ত কর। নিশ্চয়ই কিছু বক্তৃতা যাদু।
৩। এমন রহস্যময় বিষয়াবলী পরিহার করা, যা মানুষ বুঝে না। আলী বলেন-
حَدِّثُوا النَّاسَ بِمَا يَعْرِفُونَ أَيُحِبُّونَ أَنْ يُكَذِّبَ اللَّهُ وَرَسُولُهُ.
মানুষ যে সকল বিষয় বুঝবে, এমন বিষয়ই তাদের নিকট বর্ণনা করো। তোমরা কি চাও, আল্লাহ ও তার রাসূলকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করা হোক? [সহিহ বুখারি- ১২৭]
مَا أَنْتَ بِمُحَدِّثٍ قَوْمًا حَدِيثًا لَا تَبْلُغُهُ عُقُولُهُمْ، إِلَّا كَانَ لِبَعْضِهِمْ فِتْنَةٌ.
তুমি মানুষকে এমন কথা বলবে না, যার পর্যন্ত তাদের জ্ঞান পৌঁছবে না। অন্যথায় এটা তাদের কারো জন্য ফেত্নার কারণ হবে। [সহিহ মুসলিম- ১১]
৪। উচ্চ বিবেচনার সাথে শব্দ চয়ন করা। যাতে অর্থের চেয়ে বেশি কোন কথা এসে না যায়, ফলে প্রত্যেকে নিজ খেয়াল খুশি মত তার ব্যাখ্যা করতে পারে। এখানে দু'টি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উল্লেখ করছি, যা ভাষণের মধ্যে নেতাকে লক্ষ্য রাখতে হবে। তার মধ্যে একটি হচ্ছে আদর্শগত ও রাজনৈতিক এবং অপরটি হল সামরিক ও জিহাদী।
প্রথমতঃ আদর্শগত ও রাজনৈতিক: (দিকনির্দেশনামূলক)
এই ভাষণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে বৈশিষ্ট্যটি নেতার মধ্যে থাকবে, তা হচ্ছে, প্রথম যুগের দিকে ফিরা। নবী-রাসূলগণের নিয়ে আসা, প্রকৃত তাওহীদকে স্পষ্ট করা, সৃষ্টি, প্রতিপালন, উপাসনা, পূর্ণাঙ্গতার গুণাবলী, পরাক্রম, রাজত্ব, শাসন, আনুগত্য, গাম্ভীর্য, প্রভাব, ভয়, আদেশ, সৃষ্টি ও বান্দাদের উপর কর্তৃত্ব ইত্যাদি বিষয়ে আল্লাহর একত্ব প্রকাশ করার ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ ﷺ ও হেদায়াতপ্রাপ্ত খুলাফায়ে রাশিদীনের ভাষণের দিকে লক্ষ্য রাখা। যেহেতু বর্তমানে সমস্ত মানব সমাজে শিরক ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে।
নিশ্চয়ই ইসলাম এসেছে রাজা-বাদশাদের প্রভূত্ব এবং মানুষের নীতিকে অকার্যকর করার জন্য, মানুষের জন্য সরল ও সহজ দ্বীন প্রতিষ্ঠা করার জন্য এবং সৃষ্টি, রাজত্ব, প্রভূত্ব, নেতৃত্ব, শাসন, আনুগত্য ও ইবাদতের ক্ষেত্রে আল্লাহর একত্ব বাস্তবায়নের জন্য। সম্ভবত আমাদের যামানায় সর্বজন পরিচিত শিরকের নমুনা হল- শাসনকর্তৃত্বের শিরক, আনুগত্যের শিরক, বিধান প্রণয়নের শিরক, ইবাদতের শিরক ও রাজত্বের শিরক।
নেতাকে তার উত্তম ভাষণের মাধ্যমে এই আদর্শগত বিষয়টি স্পষ্ট করতে হবে। কারণ উম্মাহ্র মাঝে পরস্পরাগতভাবে এমন কতিপয় ধারণা চলে এসেছে, যেগুলোকে তারা স্থিরনীতি মনে করছে। ফলে এই ধারণা তাদেরকে অনেক দ্বীনী ও দুনিয়াবী কল্যাণের পথে এগুতে বাঁধা দিচ্ছে। তার মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য একটি ধারণা হল- "শাসকের জন্য উম্মাহর কল্যাণ-অকল্যাণের বিষয়ে ব্যাপক কর্তৃত্ব চর্চার অধিকার রয়েছে। যদিও তা উম্মাহর দ্বীনী বিষয়েই হোক না কেন"। শুধু এ বিষয়টির ব্যাপারে বিশেষ করে একটি শরয়ী মূলনীতি রয়েছে, তা হচ্ছে- "মানুষের প্রকৃতিগত বৈশিষ্ট্য হল মানুষ স্বাধীন"।
আর ইসলামে মানুষের রাজনৈতিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়েছে। এক্ষেত্রে আরেকটি দাবি করা হয়, তা হচ্ছে- “উম্মাহর অধিকার রয়েছে শাসককে জবাবদিহিতার সম্মুখীন করা"। এটা নববী রাজনৈতিক ভাষণেরও একটি অন্যতম মূলনীতি। যেমন বাইআতের চুক্তির মধ্যে থাকে: “আমরা যেখানেই থাকি, হকের সাথে থাকবো আর আল্লাহর ব্যাপারে ভর্ৎসনাকারীর ভর্ৎসনা ভয় করবো না"।
সুতরাং উম্মাহ্ই নেতাদের জবাবদিহিতাকারী। তাই নেতার আনুগত্য নিঃশর্ত নয় বা তার সত্তার জন্যও নয়; বরং নেতা নিয়োগের উদ্দেশ্য হচ্ছে ইনসাফ ও ন্যায়বিচার বাস্তবায়ন করা। আর নেতার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হল, শরীয়তের মূলনীতি ও বিবেচ্য নীতিমালার আলোকে সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য কাজ করা। এসকল মূলনীতি এখানে উল্লেখ করার সুযোগ নেই। তবে যেমনটা পূর্বেও বলেছি, নেতার অবশ্যই এ ব্যাপারে বুৎপত্তি থাকতে হবে, অতঃপর তিনি স্বীয় ভাষণে এগুলো তুলে ধরবেন।
দ্বিতীয়তঃ জিহাদী বা সামরিক ভাষণ
এই ভাষণে শাসক লক্ষ্য রাখবেন, জিহাদের মূল লক্ষ্যের প্রতি, তা যেন শুধু পারস্পরিক লড়াইয়ের জন্য, গনিমত অর্জনের জন্য, নারী বন্দী লাভের জন্য বা অনেক মানুষকে গোলাম বানানোর জন্য না হয়; বরং জিহাদ হবে বান্দাদেরকে বান্দাদের রবের বান্দায় পরিণত করার জন্য এবং তাদেরকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে অর্থাৎ শিরক ও কুফরের অন্ধকার থেকে তাওহীদের আলোর দিকে নিয়ে আসার জন্য। তাকে তার উক্ত ভাষণে জিহাদের উদ্দেশ্যাবলী স্পষ্টভাবে বর্ণনা করতে হবে। আর তা হল- দেশ ও জনগণের উপর সীমালঙ্ঘন প্রতিহত করা, পৃথিবীর অসহায়দের সাহায্যের জন্য লড়াই করা, সম্পূর্ণ দ্বীন শুধু আল্লাহর জন্য হওয়ার জন্য যুদ্ধ করা।
তাকে তার ভাষণে একথাও অন্তর্ভূক্ত রাখতে হবে যে, জিহাদের মধ্যে যদিও জানের কষ্ট এবং মাল বিসর্জন দিতে হয়, যা মানবীয় স্বভাববশতঃ মন অপছন্দ করে, তথাপি তাতে যে সামগ্রীক লাভ ও মানব সমাজ টিকে থাকার অত্যাবশ্যকীয় উপাদানসমূহ রয়েছে, তার কারণে তার পুরোটাই কল্যাণকর। আর কোন যুগেই মানব সমাজ এমন সব দ্বীনের শত্রু ও অপরাধের প্রধানদের থেকে মুক্ত ছিল না, যারা জনগণকে নির্যাতন করে, শাস্তি দেয়, বিপদাপদের সম্মুখীন করে। আর শাসককে তার এই দৃষ্টিভঙ্গি কার্যতঃ বাস্তবায়ন করতে হবে। তাই তিনি থাকবেন মুজাহিদদের সারিসমূহের অগ্রভাগে। আর এটা ব্যাপকভাবে রাসূলুল্লাহ ﷺ ও সাহাবায়ে কেরামের আমল হিসাবেও বর্ণিত। প্রজা ও সৈন্যদের অন্তরে এই ভাষণের ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। তাই এটা গুরুত্বের শীর্ষে। বিশেষ করে শত্রুর সঙ্গে মুখোমুখি যুদ্ধের সময়।
উদাহরণস্বরূপঃ মৃতার যুদ্ধে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা এর ভাষণের কথা স্মরণ করুন। মুসলমান ছিল তিন হাজার। আর তাদের নিকট সংবাদ পৌঁছলো, হিরাক্লিয়াস এক লক্ষ সৈন্য নিয়ে যুদ্ধে নেমেছে, আর তার সাথে আরব খৃষ্টানদেরও পঞ্চাশ হাজার যুক্ত হয়েছে। তখন কিছু সংখ্যক মুসলিম বলল, আমরা শত্রুর সংখ্যার ব্যাপারে অবগত করে রাসূলুল্লাহ ﷺ কে পত্র লিখি। তারপর তিনি আমাদেরকে যেটা আদেশ করেন, আমরা সেটাই করবো। তখন আব্দুল্লাহ রাওয়াহা ভাষণ দিতে দাঁড়ালেন। তিনি বললেন-
يا قوم: ووالله ان كان الذي تكرهون للذي خرجتم تطلبون، انها الشهادة، وما نقاتل الناس بعدد ولا قوة ولا كثرة ما نقاتلهم الا بهذا الدين الذي اكرمنا الله به، فانطلقوا، انها احدى الحسنين، اما ظهور واما شهادة، فقال الناس: قد والله صدق ابن زواحه
“হে আমার সম্প্রদায়! আল্লাহর শপথ! তোমরা যেটার অন্বেষায় বের হয়েছো, সেটাকে অপছন্দ করছো। নিশ্চয়ই তা হল শাহাদাহ। আমরা তো সংখ্যা, শক্তি বা আধিক্যের বলে যুদ্ধ করি না। আমরা তো এই দ্বীনের বলে যুদ্ধ করি, যার দ্বারা আল্লাহ আমাদেরকে সম্মানিত করেছেন। তাই তোমরা চলতে থাক। পরিণাম তো দু'টি কল্যাণের যেকোন একটিই। হয়ত বিজয় নয়ত শাহাদাহ”। তখন সকলে বলে উঠল, আল্লাহর শপথ! ইবনে রাওয়াহা সত্য বলেছে। [তারিখে তাবারী]
নিশ্চয়ই নেতৃত্বশূণ্যতাই উম্মাহর শত্রুদেরকে আমাদের শাসকদের পিছনে পড়ার ও তাদের সুনাম নষ্ট করার সুযোগ করে দিয়েছে। যদিও ঐ সমস্ত শাসকরাও তাদের ছোট-বড় বিভিন্ন ভুলের দ্বারা নিজেদের বিরুদ্ধে শত্রুদের জন্য দলিল করে দিয়েছে, যার ফলে তারা তাদের সুনাম নষ্ট করতে পারছে এবং তাদেরকে সন্ত্রাসী বলে আখ্যা দিতে পেরেছে। এখানে সেসব আলোচনা করার অবকাশ নেই। তাদের হত্যা ও গ্রেপ্তারই অনেক অজ্ঞ লোকদেরকে মুজাহিদদের কাতাসমূহে ঢুকে জিহাদকে তার সেই প্রকৃত অর্থ থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে, যা দিয়ে মুহাম্মাদ ﷺ-কে প্রেরণ করা হয়েছে। আমি একাধিক স্থানে এ কথাটি উল্লেখ করেছি।
📄 নবম গুণ: الصدق (সততা)
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَكُونُوا مَعَ الصَّادِقِينَ
“হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং সত্যবাদীদের সঙ্গে থাক।” [সুরা তাওবা- ১১৯]
আভিধানিকভাবে 'সিদ্ক' অর্থ: সত্য কথা বলা। অতীতকালে হোক, ভবিষ্যৎকালে হোক। শত্রু হোক বা অন্য কেউ হোক। এটা কেবল সংবাদমূলক কথাবার্তায় হয়।
পরিভাষায়- 'সিদ্ক' হল গোপন-প্রকাশ্য ও জাহির-বাতিন একরকম হওয়া। যেন বান্দার অবস্থা তার কাজকে এবং তার কাজ তার অবস্থাকে মিথ্যা প্রমাণিত না করে। সিদক বা সততা প্রকৃত মুমিনের গুণ। আর এতেও কোন সন্দেহ নেই যে, মানুষের মাঝে এ গুণে গুণান্বিত হওয়ার সর্বাধিক উপযুক্ত ব্যক্তি হল নেতা বা শাসক। কারণ আল্লাহ তাকে যে স্থানে অধিষ্ঠিত করেছেন, সে অবস্থানে এর প্রয়োজন অত্যধিক। কারণ আল্লাহর তাওফীক ও সাহায্য ছাড়া তার এক মুহূর্তও চলা সম্ভব নয়। আর কোন মিথ্যাবাদীর পক্ষে আল্লাহ তা'আলার সাহায্য আসাটা সৃষ্টিজীবের ক্ষেত্রে আল্লাহ তা'আলার সুপ্রতিষ্ঠিত নীতির বিরোধী। এমন ব্যক্তির ভাগ্যে তো শুধু আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চনাই জুটবে, যদিও কিছুকাল পরে হয়। সুতরাং যে কাজের মাঝে মিথ্যা অনুপ্রবেশ করেছে, যার কর্তা কথা, কাজ বা নিয়্যতে মিথ্যা অবলম্বন করেছে, কখনো দেখবেন না যে, উক্ত কাজে বরকত লাভ হয়েছে।
কিন্তু কখনো এদের পক্ষেও কিছু আবর্তন ঘটবে এবং আল্লাহ তা'আলা তার নেককার বান্দাদেরকে যে সকল প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তারাও তার কিছু লাভ করবে বা এ জাতীয় আরও কিছু ঘটবে; কিন্তু তা সাময়িক সময়ের জন্য। আর এটা আল্লাহর বিশেষ হিকমতের কারণে, যা কেবল তিনিই জানেন। যারা সত্যবাদী নয়, আল্লাহ তাদেরকে কোন কল্যাণ বা ক্ষমতা দেন না। তাই সমগ্রীকভাবে এ সকল সত্যবাদীদের জিহাদ ও নেক আমলের কারণেই আল্লাহ তা'আলা দেশ ও মানুষের বহুবিদ কল্যাণকর বিষয়াবলী ঘটান। কখনো তার ফলাফল বহুকাল যাবত অব্যাহতও রাখেন, যেমনটা আমরা আল্লাহ তা'আলার স্থির নীতির মাধ্যমে জানতে পেরেছি। এজন্য নেতাই এই মহান গুণে গুণান্বিত হওয়ার সর্বাধিক উপযুক্ত। নেতাকে প্রথমে তার রবের সাথে সত্যবাদী হতে হবে। আল্লাহর সাথে সততা আর তার প্রতি একনিষ্ঠতা দু'টি ভিন্ন জিনিস। তবে পরস্পরের মাঝে আবশ্যিক সম্পর্ক রয়েছে। সততা হয় আবেদন বা আকাঙ্খার ক্ষেত্রে, আর ইখলাস বা একনিষ্ঠতা হয় কাঙ্খিত বিষয়ের ক্ষেত্রে।
ইবনুল কায়্যিম রহ. বলেন- 'সততা ও ইখলাসের মাঝে পার্থক্য হল, বান্দার কিছু আকাঙ্খা ও কিছু কাঙ্খিত বিষয় থাকে। ইখলাস হল কাঙ্খিত বিষয়টি শুধু আল্লাহর জন্য হওয়া। আর সততা হল আকাঙ্খাটি শুধু আল্লাহর জন্য হওয়া।'
সুতরাং ইখলাস হল কাঙ্খিত বিষয়টি বিভাজ্য না হওয়া। আর সততা হল আকাঙ্খাটি বিভাজ্য না হওয়া। তাই সততা হল চেষ্টা ও পরিশ্রম করা। আর ইখলাস হল কাঙ্খিত লক্ষ্যটি একক হওয়া। একারণে নেতাকে পূর্ণ চেষ্টা করতে হবে এবং সর্বসাধ্য ব্যয় করতে হবে আল্লাহর প্রতিশ্রুতি নিজের মধ্যে বাস্তবায়ন করার ব্যাপারে। এটাই হল আকাঙ্খার মধ্যে সততা। আর এ লক্ষ্যে পৌঁছার জন্য নেতার উচিত, কোন উপকরণের প্রতি ঝুঁকে না পড়া বা তা নিয়ে সন্তুষ্ট হয়ে না পড়া। এটা হল আল্লাহর সাথে সততার দিক। আর আল্লাহই প্রকৃত তাওফীকদাতা। এটাই মূল বিষয়। কেননা বান্দা যদি তার রবের সাথে সততা দেখাতে পারে, তাহলে সে স্বীয় প্রজাদের সাথেও সততা দেখাতে পারবে।
নেতার উচিত স্বীয় কথায় সত্যবাদী হওয়া এবং কাজকর্মে আমানতদার হওয়া। জাতির হিসাবের মধ্যে কারো প্রতি শৈথিল্য না করা। আল্লাহর ব্যাপারে কোন ভর্ৎসনাকারীর ভর্ৎসনাকে ভয় না করা। স্পষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি, মতামত, নীতি ও পথ অবলম্বন করা। তার চরিত্র ও আচার-আচরণই তার সততার প্রমাণ দিবে।
উম্মাহ্র সুবিধার প্রতি লক্ষ্য রাখবে, যদিও এতে তার অনেক সময় ব্যয় করতে হয় ও পরিশ্রম করতে হয়। কাউকে উপেক্ষা করবে না। উম্মাহকে ধোঁকা দিবে না। এমন ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি দিবে না, যার ব্যাপারেও সে নির্বিকার; নিজ প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা চালায় না।
প্রকৃত নেতা সেই, যে স্বীয় উম্মাহ্র সম্মান ও গৌরবোজ্জল ইতিহাস ফিরিয়ে আনে। উম্মাহ্র প্রত্যাশার কেন্দ্রবিন্দু হয়। জনগণ কর্তৃক নেতাকে ভালবাসা এবং তার পাশে ভেড়ার ক্ষেত্রে শাসকের সততার ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। আর এমনটা তো হবেই। যেহেতু তারা দেখছে, সে কখনো তাদের সাথে মিথ্যা বলেনি, তাদেরকে ধোঁকা দেয়নি, প্রতারিত করেনি। আর কোন সন্দেহ নেই যে, এই জনগণই তার সাহায্যকারী হবে এবং তার পিছনে থাকবে। কখনো তাকে সপে দিবে না, তার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করবে না বা তার সহযোগীতা ছেড়ে দিবে না।
পক্ষান্তরে যদি সে মিথ্যার ব্যাপারে পরিচিত হয়, তাহলে ধারণার চেয়েও দ্রুত সময়ে তার রাজত্বের ভীত ক্ষসে পড়বে, যদিও পূর্বোক্ত ছয় বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান থাকে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেন-
أَفَمَنْ أَسَّسَ بُنْيَانَهُ عَلَى تَقْوَى مِنَ اللَّهِ وَرِضْوَانٍ خَيْرٌ أَم مَّنْ أَسَّسَ بُنْيَانَهُ عَلَى شَفَا جُرُفٍ هَارٍ فَانْهَارَ بِهِ فِي نَارِ جَهَنَّمَ وَاللَّهُ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الظَّالِمِينَ.
“আচ্ছা, সেই ব্যক্তি উত্তম, যে আল্লাহভীতি ও তার সন্তুষ্টির উপর নিজ গৃহের ভিত্তি স্থাপন করেছে, না সেই ব্যক্তি, যে তার গৃহের ভিত্তি স্থাপন করে এক খাদের পতনোন্মুখ কিনারায়। ফলে সেটি তাকে নিয়ে জাহান্নামের আগুনে পতিত হয়। আল্লাহ জালেম সম্প্রদায়কে হেদায়াতপ্রাপ্ত করেন না।” [সুরা তাওবা- ১০৯]
সততা সমাজের বন্ধন দৃঢ় করে, তার মাঝে ভারসাম্যতা আনয়ন করে। ফলে দুনিয়ার কোন কিছুই তাকে টলাতে পারে না। কোন ফেৎনাই তার মাঝে অনুপ্রবেশ করতে পারে না। নিশ্চয়ই সততা হল মানুষকে আল্লাহর দিকে পরিচালনাকারী নবীদের একটি বৈশিষ্ট্য। হেদায়াতের নবী মুহাম্মদ নবুওয়াত লাভের পূর্বেই 'সত্যবাদী ও বিশ্বস্ত' উপাধি লাভ করেছিলেন। ফলে তার জাতি তার আনিত বিষয়ের ব্যাপারে তাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করা সত্ত্বেও অন্য সকল বিষয়ে তাকে বিশ্বাস করতো।
সায়ীদ ইবনে জুবায়ের রহ. ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণনা করেন-
صَعِدَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ذَاتَ يَوْمٍ عَلَى الصَّفَا فَقَالَ يَا صَبَاحَاهُ. فَاجْتَمَعَتْ إِلَيْهِ قُرَيْشُ فَقَالُوا: مَا لَكَ؟ قَالَ: أَرَأَيْتَكُمْ أَنْ لَوْ أَخْبَرْتُكُمْ أَنَّ الْعَدُوَّ مُصَبِّحُكُمْ أَوْ مُمَشِيكُمْ، أَكُنْتُمْ تُصَدِّقُونِي؟ قَالُوا : بَلَى، قَالَ فَإِنِّي نَذِيرٌ لَكُمْ بَيْنَ يَدَيْ عَذَابٍ شَدِيدٍ. فَقَالَ أَبُو لَهَبٍ: تَبًّا لَكَ، أَلِهَذَا دَعَوْتَنَا جَمِيعًا، فَأَنزَلَ اللَّهُ تَعَالَى تَبَّتْ يَدَا أَبِي لَهَبٍ وَتَبَّ إِلَى آخِرِهَا.
"একদা রাসূলুল্লাহ ﷺ সাফা পাহাড়ে আরোহন করলেন। অতঃপর তার কওমকে লক্ষ্য করে বললেন- হায় প্রভাতি আক্রমণ! ফলে কুরাইশের সকল লোক জমা হল। তারা তাকে বলল, আপনার কি হয়েছে? তিনি বললেন, তোমরা বল তো! আমি যদি তোমাদেরকে সংবাদ দেই- তোমাদের শত্রুরা সকাল বেলা বা বিকাল বেলা তোমাদের উপর আক্রমণ করবে, তাহলে কি তোমরা আমাকে বিশ্বাস করবে না? তারা বলল, অবশ্যই। তখন তিনি বললেন, তাহলে আমি তোমাদেরকে আসন্ন আযাবের সম্পর্কে সতর্ক করছি। আবু লাহাব বলে উঠল, ধ্বংস তোমার! তুমি আমাদেরকে এজন্য একত্রিত করেছো?! তখন আল্লাহ আয়াত নাযিল করেছেন: تَبَّتْ يَدَا أَبِي لَهَبٍ وَتَبَّ “আবু লাহাবের দু' হাত ধ্বংস হোক!...” [সুনানে নাসাঈ- ১০৭৫৩]
রাসূলুল্লাহ ﷺ তার কওমকে জিজ্ঞেস করার পর তার কওম যা বলেছিল, আমরা তার মাধ্যমে দলিল পেশ করছি। তিনি জিজ্ঞেস করেছিলেন, তোমরা বল তো, আমি যদি তোমাদেরকে সংবাদ দেই যে, তোমাদের শত্রুরা সকাল বেলা বা বিকাল বেলা তোমাদের উপর আক্রমণ করবে, তাহলে তোমরা আমাকে বিশ্বাস করবে না? আর তারা রাসূলুল্লাহ ﷺ থেকে পূর্বে যেমনটা অভিজ্ঞতা লাভ করেছিল, সে হিসাবেই উত্তর দিয়েছে, হ্যাঁ। অর্থাৎ তারা তার উক্ত কথায় তাকে সত্যায়ন করেছে। নেতাকেও এমন গুণেই সজ্জিত হতে হবে। যেন তার শত্রু-মিত্র সকলেই তাকে সত্যবাদী বলে বিশ্বাস করে। শত্রুরাও কখনো তার থেকে মিথ্যা দেখতে না পায় এবং বন্ধুরাও না।
ফলে তার কথা নির্দ্বিধায় সত্য; মিথ্যার লেশ মাত্র নেই। অতএব সততা হল নববী চরিত্রের একটি মহান বৈশিষ্ট্য। এটি এমন একটি ভিত্তি, যা তাকওয়াকে অবশ্যম্ভাবী করে। সুতরাং যে-ই আল্লাহর দ্বীনের সাহায্যের জন্য কাজ করে, তার জন্য এ বৈশিষ্ট্যে বৈশিষ্টমণ্ডিত হওয়া অত্যাবশ্যক।
قَالَ اللَّهُ هَذَا يَوْمُ يَنفَعُ الصَّادِقِينَ صِدْقُهُمْ لَهُمْ جَنَّاتٌ تَجْرِي مِن تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ خَالِدِينَ فِيهَا أَبَدًا رَّضِيَ اللَّهُ عَنْهُمْ وَرَضُوا عَنْهُ ذَلِكَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ.
“আল্লাহ বলবেন, এটা সেই দিন, যেদিন সত্যবাদীদেরকে তাদের সততা উপকৃত করবে। তাদের জন্য রয়েছে এমন সব উদ্যান, যার তলদেশে নহর প্রবাহমান। তাতে তারা সর্বদা থাকবে। আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট এবং তারাও আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট। এটাই মহাসাফল্য।” [সুরা মায়িদা- ১১৯]
রাসূলুল্লাহ তাঁর সাহাবীদেরকে সততার প্রতি উৎসাহ দিতেন।
ইবনে মাসউদ থেকে বর্ণিত, তিনি রাসূলূল্লাহ থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ বলেন-
عَلَيْكُمْ بِالصِّدْقِ، فَإِنَّ الصِّدْقَ يَهْدِي إِلَى الْبِرِّ، وَإِنَّ الْبِرَّ يَهْدِي إِلَى الْجَنَّةِ، وَمَا يَزَالُ الرَّجُلُ يَصْدُقُ وَيَتَحَرَّى الصِّدْقَ حَتَّى يُكْتَبَ عِنْدَ اللَّهِ صِدِّيقًا، وَإِيَّاكُمْ وَالْكَذِبَ، فَإِنَّ الْكَذِبَ يَهْدِي إِلَى الْفُجُورِ، وَإِنَّ الْفُجُورَ يَهْدِي إِلَى النَّارِ، وَمَا يَزَالُ الرَّجُلُ يَكْذِبُ وَيَتَحَرَّى الْكَذِبَ حَتَّى يُكْتَبَ عِنْدَ اللَّهِ كَذَّابًا.
"তোমরা সততাকে আঁকড়ে ধর। কেননা সততা নেক কাজের পথ দেখায় আর নেক কাজ জান্নাতের পথ দেখায়। বান্দা সত্য বলতে থাকে এবং সত্যকে অন্বেষণ করতে থাকে, অবশেষে আল্লাহর নিকট সিদ্দীক হিসাবে তার নাম লিখিত হয়। আর তোমরা মিথ্যা থেকে বেঁচে থাক। কারণ মিথ্যা পাপাচারের পথ দেখায়। আর পাপাচার জাহান্নামের পথ দেখায়। বান্দা মিথ্যা বলতে থাকে এবং মিথ্যা অন্বেষণ করতে থাকে। অবশেষে আল্লাহর নিকট তার নাম কায্যাব (মিথ্যাবাদী) হিসাবে লিখিত হয়।" [সহিহ মুসলিম- ২৬০৭]
পরিশেষে সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যিনি জগতসমূহের প্রতিপালক।
সমাপ্ত
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, "তোমাদের মাঝে নবুওয়াত থাকবে, যতদিন আল্লাহ চান তা থাকুক। অতঃপর যখন আল্লাহ তা উঠিয়ে নিতে চাইবেন, তখন তা উঠিয়ে নিবেন। তারপর আসবে খেলাফত আলা মিনহাজিন নবুওয়াহ। যতদিন আল্লাহ চান তা থাকুক, ততদিন তা থাকবে। অতঃপর যখন আল্লাহ তা উঠিয়ে নিতে চাইবেন, তখন উঠিয়ে নিবেন। তারপর আসবে কামড়ে থাকা রাজত্ব। যতদিন আল্লাহ চান তা থাকুক, ততদিন তা থাকবে। অতঃপর যখন তা উঠিয়ে নিতে চাইবেন, তখন উঠিয়ে নিবেন। তারপর আসবে স্বেচ্ছাচারি শাসন। অতঃপর যতদিন আল্লাহ চান তা থাকুক, ততদিন তা থাকবে। অতঃপর যখন আল্লাহ তা উঠিয়ে নিতে চাইবেন, তখন উঠিয়ে নিবেন। তারপর আবার আসবে খেলাফত আলা মিনহাজিন নবুওয়াহ। এই বলে তিনি চুপ রইলেন।"
[মুসনাদে আহমাদ- ১৮৪০৬]