📄 ইসলামে নেতৃত্বের প্রতিপালন
ইসলামে প্রতিপালনমূলক নেতৃত্ব কোন চাকুরী বা ক্ষমতা নয় বরং এটি জীবনের একটি আদর্শ। জীবন পরিচালনার পদ্ধতি। যার চূড়ান্ত লক্ষ্য হচ্ছে খেলাফত বাস্তবায়ন করা, আল্লাহকে সন্তুষ্ট করা, তার আদেশগুলো পালন করা এবং তার নিষিদ্ধ বিষয়সমূহ পরিত্যাগ করা। এর দ্বারা নেতৃত্বের এই দৃষ্টিভঙ্গি আর পশ্চিমা দৃষ্টিভঙ্গির মাঝে পার্থক্য স্পষ্ট হয়ে যায়। কেননা সেখানে যারা দুনিয়া-আখিরাত উভয়টার জন্য কাজ করে; আর যারা শুধু দুনিয়ার জন্য কাজ করে, এই দুই শ্রেণীর মাঝে বিস্তর ব্যবধান থাকে। এ কারণে প্রত্যেক সংজ্ঞাদানকারীর দৃষ্টিভঙ্গি ও সামগ্রীক পরিবর্তনশীল উপাদানগুলোর কারণে এর সংজ্ঞার মধ্যেও পার্থক্য হবে। যেমন- পারিপার্শ্বিকতা, বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামরিক, সামাজিক, মনস্তাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক উপাদানসমূহ এবং অভিষ্ট লক্ষ্যের ভিত্তিতে সংজ্ঞার মধ্যে পার্থক্য হয়। উম্মাহর জন্য নেতৃত্ব দেহের জন্য আত্মার ন্যায়। এটি এমন জিনিস, যা দেহকে নাড়া দেয়, তাতে আনন্দ ও প্রশান্তির অনুভূতি দেয়। এমন জিনিস, যা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ থেকে অধিক ব্যাথিত হয়। অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে আনন্দ ও উচ্ছাসের অনুভূতি দেয়। তাই উম্মাহ্র নেতৃত্বই হচ্ছে তার দেহের প্রধান পরিচালক। নেতৃত্বই তাকে আশঙ্কাজনক বিষয় থেকে দূরে থাকার দিকনির্দেশ করে এবং দেহকে সম্ভাব্য সর্বোচ্চ রক্ষণাবেক্ষণ করে। যেন উম্মাহ্র জীবন সর্বোত্তমভাবে পরিচালিত হয়।
রাসূল বলেন-
تَرَى الْمُؤْمِنِينَ فِي تَرَاحُمِهِمْ وَتَوَادِهِمْ وَتَعَاطَفِهِمْ، كَمَثَلِ الْجَسَدِ، إِذَا اشْتَكَى عُضْوًا تَدَاعَى لَهُ سَائِرُ جَسَدِهِ بِالسَّهَرِ وَالْحُمَّى.
“পরস্পর দয়া, ভালবাসা ও সহমর্মিতার ক্ষেত্রে মুমিনদেরকে দেখবে একটি দেহের ন্যায়, যার একটি অঙ্গ আক্রান্ত হলে তার জন্য পুরো দেহই অনিদ্রা ও জ্বরে কাটায়।" [সহিহ বুখারি- ৬০১১]
উম্মাহর জন্য আজ আভ্যন্তরীণ ও বহিঃরাজনীতিতে প্রজ্ঞাবান একটি নেতৃত্বের প্রয়োজন। যা প্রতিটি বিষয়কে সঠিক পরিমাণে ও সঠিক স্থানে রাখবে। যেন উম্মাহ্র সন্তানদের মাঝে শরয়ী শাসনব্যবস্থার প্রতি আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে পারে। যা এক শ্রেণীর অজ্ঞদের কর্মকান্ডের কারণে অনেকের কাছেই ভয়ের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। উম্মাহ প্রতীক্ষা করছে, কে তাদেরকে শত্রুদের কবল থেকে এবং উম্মাহর সাথে বিশ্বাসঘাতকতাকারী তাগুত শাসকদের কবল থেকে তাদের হারানো সম্মান ফিরিয়ে দিবে। যারা তাদেরকে যুগ যুগ ধরে শাসন করে আসছে। উম্মাহ অনেক বেশি প্রয়োজনবোধ করছে এমন এক নেতৃত্বের, যা তাদের উপর সহনশীল হবে, তাদের প্রতি কোমল হবে, তাদের সাথে নম্রতা ও ভালবাসার আচরণ করবে এবং তাদের প্রতি দয়াশীল হবে আর তাদের শত্রুদের প্রতি হবে কঠোর। যেমন আল্লাহ বলেন-
مُحَمَّدٌ رَّسُولُ اللهِ وَالَّذِينَ مَعَهُ أَشِدَّاءُ عَلَى الْكُفَّارِ رُحَمَاءُ بَيْنَهُمْ تَرَاهُمْ رُكَّعًا سُجَّدًا يَبْتَغُونَ فَضْلًا مِّنَ اللهِ وَرِضْوَانًا سِيمَاهُمْ فِي وُجُوهِهِم مِّنْ أَثَرِ السُّجُودِ ذَلِكَ مَثَلُهُمْ فِي التَّوْرَاةِ وَمَثَلُهُمْ فِي الْإِنجِيلِ كَزَرْعٍ أَخْرَجَ شَطْأَهُ فَآزَرَهُ فَاسْتَغْلَظَ فَاسْتَوَى عَلَى سُوقِهِ يُعْجِبُ الزُّرَّاعَ لِيَغِيظَ بِهِمُ الْكُفَّارَ وَعَدَ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ مِنْهُم مَّغْفِرَةً وَأَجْرًا عَظِيمًا.
"মুহাম্মাদ ﷺ আল্লাহর রাসূল। তার সঙ্গে যারা আছে, তারা কাফেরদের বিরুদ্ধে কঠোর এবং আপসের মধ্যে একে অন্যের প্রতি দয়ার্দ্র। তুমি তাদেরকে দেখবে (কখনও) রুকুতে, (কখনও) সিজদায়, আল্লাহর অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টি সন্ধানে রত। তাদের আলামত তাদের চেহারায় পরিস্ফুট, সিজদার ফলে। এই হল তাদের সেই গুণাবলী, যা তাওরাতে বর্ণিত আছে। আর ইঞ্জিলে তাদের দৃষ্টান্ত এই, যেন এক শস্যক্ষেত্র, যা তার কুঁড়ি বের করল, তারপর তাকে শক্ত করল। তারপর তা পুষ্ট হল। তারপর তা নিজ কাণ্ডের উপর এভাবে সোজা দাঁড়িয়ে গেল যে, তা কৃষকদেরকে মুগ্ধ করে ফেলে। এটা এইজন্য যে, আল্লাহ ﷻ তাদের (উন্নতি) দ্বারা কাফেরদের অন্তর্দাহ সৃষ্টি করেন। যারা ঈমান এনেছে ও সৎকর্ম করেছে, আল্লাহ তাদেরকে মাগফিরাত ও মহা পুরস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।" [সূরা আল-ফাত্হ: ২৯]
📄 এমন নেতৃত্ব, যা জ্ঞান-বুদ্ধির সম্মান ও মূল্যায়ন করবে তাকে উপহাসের বস্তু বানাবে না
فَبِمَا رَحْمَةٍ مِّنَ اللَّهِ لِنتَ لَهُمْ وَلَوْ كُنتَ فَظًّا غَلِيظَ الْقَلْبِ لَانفَضُّوا مِنْ حَوْلِكَ فَاعْفُ عَنْهُمْ وَاسْتَغْفِرْ لَهُمْ وَشَاوِرْهُمْ فِي الْأَمْرِ فَإِذَا عَزَمْتَ فَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُتَوَكِّلِينَ.
“(হে নবী!) আল্লাহর রহমতেই আপনি তাদের জন্য কোমল হৃদয় হয়েছে পক্ষান্তরে আপনি যদি রূঢ় প্রকৃতির ও কঠোর হৃদয়ের হতেন, তবে তারা আপনার আশপাশ থেকে সরে বিক্ষিপ্ত হয়ে যেত। সুতরাং তাদেরকে ক্ষমা করে দিন, তাদের জন্য মাগফিরাতের দু'আ করুন এবং (গুরুত্বপূর্ণ) বিষয়ে তাদের সাথে পরামর্শ করতে থাকুন। অতঃপর যখন (কোন বিষয়ে) মনস্থির করবেন, তখন আল্লাহর উপর নির্ভর করুন। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাওয়াক্কুলকারীদেরকে ভালবাসেন।” [সুরা আলে ইমরান- ১৫৯]
সকল মানুষের সাথে কোমল আচরণ করা ইসলামের একটি উন্নত বৈশিষ্ট্য। এমন ব্যক্তিই এই গুণে গুণান্বিত হতে পারে, ঈমান যার হৃদয়ের গভীরে প্রবেশ করেছে, চেতনায় ও কর্মে দৃঢ়ভাবে স্থান করে নিয়েছে। যে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেছে যে, কোমলতাই সৌভাগ্য, শ্রেষ্ঠত্ব ও নেতৃত্বের চাবিকাঠি। উম্মাহ আজ কতই না প্রয়োজনবোধ করে এমন একটি নেতৃত্বের, যে তাদের সাথে কোমল আচরণ করবে, তাদেরকে নতুন করে জেগে উঠতে সাহায্য করবে!!
আবুদ্দারদা এর সূত্রে রাসূল থেকে বর্ণিত, রাসূল বলেন-
مَنْ أُعْطِيَ حَظَّهُ مِنَ الرِّفْقِ فَقَدْ أُعْطِيَ حَظَّهُ مِنَ الخَيْرِ، أَثْقَلُ شَيْءٍ فِي مِيزَانِ الْمُؤْمِنِ، يَوْمَ الْقِيَامَةِ، حُسْنُ الْخُلُقِ.
"যাকে তার কোমলতার ভাগ দেওয়া হয়েছে, তাকে তার কল্যাণের ভাগ দেওয়া হল। আর যাকে তার কোমলতার ভাগ থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে, তাকে তার কল্যাণের ভাগ থেকে বঞ্চিত করা হল। কিয়ামতের দিন মুমিনের পাল্লায় সবচেয়ে ভারি বস্তু হবে তার উত্তম চরিত্র।" [সুনানে তিরমিযী- ২০১৩]
ইসলাম আমাদেরকে কোমলতার প্রতি উদ্বুদ্ধ করেছে, তার দিকে আহ্বান করেছে ও উৎসাহিত করেছে। ইসলাম আমাদের নিকট বর্ণনা করেছে, যে ব্যক্তি কার্যগতভাবেই কল্যাণের প্রেমিক ও তার প্রতি আগ্রহী হয়, কোমলতার প্রভাব ও ফলাফল তাকে সকল কর্মকাণ্ডে কোমলতা অনুসন্ধান করতে বাধ্য করবে। সুতরাং কোমলতা হল সকল আমলের সৌন্দর্য ও ঔজ্জ্বল্য। যা তার শ্রেষ্ঠত্বের একটি রহস্যও বটে।
আব্দুল্লাহ ইবনে মুগাফ্ফাল এর সূত্রে রাসূল বলেন-
إِنَّ اللَّهَ رَفِيقٌ يُحِبُّ الرِّفْقَ، وَيُعْطِي عَلَى الرِّفْقِ مَا لَا يُعْطِي عَلَى الْعُنْفِ.
“নিশ্চয়ই আল্লাহ কোমল। তিনি কোমলতাকে ভালবাসেন ও পছন্দ করেন। তিনি কোমলতার প্রতিদান হিসাবে এমন বিষয় দান করেন, যা কঠোরতার দ্বারা দান করেন না। [সহিহ মুসলিম- ২৫৯৩]
আমি পূর্বে মুসলিম নেতৃত্বের গুণাবলীর সম্পর্কে একটি কিতাব লিখেছি। এখানে উক্ত কিতাবে উল্লেখিত গুণগুলোর উপর আরো দুইটি গুণ বর্ণনা করবো। গুণ দু'টি হচ্ছে: 'বীরত্ব' ও 'পরামর্শ করা'। আল্লাহর এই মুখাপেক্ষী বান্দার অভিমত হচ্ছে, এই ন'টি গুণ হল এমন গুণ, যা একজন মুক্তিদাতা নেতার (যদি উপাধিটি সঠিক হয়ে থাকে) মাঝে বিদ্যমান থাকা অত্যন্ত জরুরী।
উক্ত গুণগুলো হচ্ছে-
العلم - ইলম,
الحلم - সহনশীলতা,
الحكمة- প্রজ্ঞা,
الحزم - দৃঢ়তা,
الجود - দানশীলতা,
الخطابة - বাগ্মিতা,
الشجاعة - বীরত্ব,
الشوري - পরামর্শ
الصدق - সততা।
যদিও আরো অনেক গুণাবলী রয়েছে, কিন্তু আমি মনে করি, এগুলো হচ্ছে তার মধ্যে সবচে' গুরুত্বপূর্ণ। এই কিতাবের বাঁকে বাঁকে এসকল গুণগুলোর প্রতিটির স্বতন্ত্র বিশ্লেষণ করবো ইনশাআল্লাহ।
📄 প্রথম গুণ: العلم (ইলম)
وَقُل رَّبِّ زِدْنِي عِلْمًا.
"আর বল, হে প্রভু! আমার জ্ঞান বাড়িয়ে দাও"। [সুরা ত্বহা- ১১৪]
ইলম: আভিধানিক অর্থ জানা। যেমন: বলা হয়: علم الشيء يعلمه علما ای عرفه (সে বিষয়টির ইলম অর্জন করেছে বা করবে) অর্থাৎ সে জেনেছে বা জানবে।
পারিভাষিক সংজ্ঞা: 'কোন জিনিসের প্রকৃত তত্ত্ব জানা'। কেউ বলেছেন, 'জ্ঞাত জিনিসের ব্যাপারে অস্পষ্টতা দূর করা'। আর জাহল বা অজ্ঞতা হল তার বিপরীত। কেউ বলেন, এর কোন সংজ্ঞার প্রয়োজন নেই। কেউ বলেন, 'ইলম এমন একটি প্রোথিত গুণ, যার দ্বারা সামগ্রীক ও একক বিষয়সমূহ উপলব্ধি করা যায়'। আমরা সেই ইলমের আলোচনা দিয়ে শুরু করবো, যে ইলমের আলোচনা দিয়ে আল্লাহ তা'আলা তাঁর নবী -এর সঙ্গে কথা শুরু করেছেন-
إِقْرَأْ بِاسْمِ رَبِّكَ الَّذِي خَلَقَ.
“পড় তোমার প্রভুর নামে, যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন।" [সুরা আলাক- ১]
অন্য আয়াতে বলেছেন-
فَاعْلَمْ أَنَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَاسْتَغْفِرْ لِذَنبِكَ وَلِلْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ وَاللَّهُ يَعْلَمُ مُتَقَلَّبَكُمْ وَمَثْوَاكُمْ.
“তাই জেনে রেখ, নিশ্চয়ই আল্লাহ্ ছাড়া কোন উপাস্য নেই। আর নিজের গুনাহের জন্য এবং মুমিন নর-নারীর জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করুন। আল্লাহ্ তোমার গতিবিধি ও অবস্থানস্থল সম্পর্কে জানেন।” [সুরা মুহাম্মদ- ১৯]
হাসান ইবনে ফযল রহ. বলেন- ‘তাই তোমার ইলমের উপর আরো ইলম বৃদ্ধি কর’।
আল্লাহ্ তা’আলার পক্ষ থেকে অবতীর্ণ ওহীর সূচনাই হল ইলম দিয়ে। ইলম হচ্ছে একটি নূর, যার মাধ্যমে আল্লাহ্ তাঁর বান্দাদেরকে সঠিক পথ প্রদর্শন করেন। তাদেরকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে নিয়ে আসেন। যাতে তাদের জীবন তাঁর সন্তুষ্টি মত পরিচালিত হয়। মানুষের ইলম যত বৃদ্ধি পায়, আপন রবের প্রতি, নিজ আত্মার প্রতি এবং স্বীয় দাওয়াত সঠিক ও হক হওয়ার প্রতি তার আস্থা ও বিশ্বাস তত বৃদ্ধি পায় এবং উক্ত দাওয়াত বাস্তবায়নের জন্য দৃঢ়তার সাথে পথ চলার হিম্মতও বৃদ্ধি পায়। যেন সম্ভাব্য সর্বাধিক পরিমাণ বান্দার নিকট আল্লাহর দাওয়াত পৌছে যায়।
ইলম যদি ব্যাপকভাবে সবার জন্য সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ গুণ বলে গণ্য নাও হয়, তথাপি একজন মুসলিম নেতার জন্য অত্যাবশ্যকীয় গুণগুলোর মধ্যে ইলম সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ। এটা অন্যান্য গুণগুলোর সাথেও জড়িত। কেননা কিছু গুণ রয়েছে, যেগুলো ইলম ছাড়া অস্তিত্বেই আসতে পারে না। যেমন সহনশীলতা। এটা ইলমের সাথে পরিমিত হওয়া অনিবার্য। এমনিভাবে দৃঢ়তা ও বীরত্বের গুণদ্বয়ও। এমনিভাবে প্রতিটি গুণই কোনও না কোনভাবে ইলমের সাথে সম্পৃক্ত। সুতরাং ইলম হল সকল গুণগুলোর উৎস ও ভিত্তি। একজন নেতা এক মুহূর্তের জন্যও এ গুণটি হতে অমুখাপেক্ষী থাকতে পারে না।
তাই আল্লাহ্ তা’আলা তাকে যে স্থানে অধিষ্ঠিত করেছেন এবং যে গুরুদায়িত্ব তাকে দিয়েছেন, সে দায়িত্বের জন্য যতটুকু ইলম প্রয়োজন, ততটুকু ইলম অর্জন করা তার উপর ফরজ। আর এই ইলম অর্জন করা হবে আল্লাহর কুরআন ও বিশুদ্ধ হাদিস থেকে। এবং সবশেষে সঠিক উৎস হতে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর জীবনাচার অনুসন্ধানের মাধ্যমে। এছাড়া বিভিন্ন ঘটনায় রাসূল বা সাহাবীদের আমল সম্পর্কে অবগত হওয়া, তাতে চিন্তা করা, অতঃপর আমাদের যামানায় তার অনুরূপ ঘটনাবলীকে তার সাথে কিয়াস করার মাধ্যমেও সমাধান লাভ করা যায়।
কিন্তু এখানেই শেষ নয়। কারণ ইলমের বিষয়টি আরও ব্যাপক। শুধু এগুলোর উপরই ক্ষান্ত থাকা সঠিক নয়। কারণ অনেক সময় আমাদের যামানায় এমন বিষয় সংঘটিত হয়, যার অনুরূপ ঘটনার ক্ষেত্রে রাসূল ﷺ বা সাহাবাগণের অবস্থান দেখলে মনে হয় আমাদের যামানায় এর থেকে ভিন্নটা উত্তম। স্পষ্ট করার জন্য বলি- কখনো কোন লোক কোন একটি ঘটনায় কঠোর আচরণ অবলম্বন করার পক্ষে রাসূল ﷺ এর এমন একটি ঘটনা দিয়ে দলিল দিল, যাতে রাসূল ﷺ কঠোর আচরণ অবলম্বন করেছিলেন। কিন্তু লোকটি উক্ত ঘটনার সময় বোঝেনি। কারণ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কঠোর আচরণ অবলম্বন করেছিলেন মদীনায় হিজরতের পরে। পক্ষান্তরে মক্কায় থাকাকালে এমন ঘটনার ক্ষেত্রে 'ক্ষমা ও মার্জনা'ই ছিল তার একমাত্র কথা। এবং সাহাবায়ে কেরামকেও এরই আদেশ দিতেন। আর উক্ত হুকুমটি আমাদের বর্তমান যামানায় আরো বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ কারো নিকট অস্পষ্ট নয় যে, বর্তমানে শাসন ও ক্ষমতা অমুসলিমদের হাতে।
যা একটা সীমা পর্যন্ত রাসূল ﷺ ও সাহাবায়ে কেরামের মক্কার অবস্থার সাথে সাদৃশ্য রাখে। রাসূল ﷺ সে সময় অন্যায়কে বাঁধা দেওয়ার ক্ষেত্রে কঠোরতা অবলম্বন করতেন না। আমি যা জানি, তাতে এরকম কোন ঘটনা নেই যে, রাসূল ﷺ যুদ্ধের ময়দান ছাড়া কোন কাফেরকে হত্যা করেছেন বা শাস্তি দিয়েছেন। যাই হোক, মক্কী জীবনে রাসূল ﷺ শুধু আল্লাহর দিকে আহ্বান করতেন আর ক্ষমা করে যেতেন। অর্থাৎ সে সময় রাসূলুল্লাহ ﷺ এর একমাত্র কাজ ছিল তার রবের দ্বীনের দাওয়াত দেওয়া, যেহেতু তখন মুসলিমগণ ছিলেন দুর্বল। যাতে কাফেররা রাসূল ﷺ এর পক্ষ থেকে পরিপূর্ণ দলিল পেয়ে যায় এবং পরবর্তীতে রাসূলুল্লাহ ﷺ থেকে তাদের নিকট অপছন্দনীয় বিষয়গুলো দেখলে তার ব্যাপারে দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে না পড়ে। অর্থাৎ তাদের অহংকার ও জুলুমের কারণে যেগুলোকে অপছন্দ করে।
আমাদের বর্তমান অবস্থাটিও ঠিক অনুরূপ। কেননা বর্তমানে এমন অনেক অমুসলিম রয়েছে, যাদের ইসলামের ব্যাপারে কোন জ্ঞান নেই, চাই পাশ্চাত্যের হোক বা আমাদের সমাজের খৃষ্টানরাই হোক। এমনকি অনেক মুসলিমও এমন রয়েছে। এক্ষেত্রে ইসলামের বিশুদ্ধ নিদর্শনগুলো থেকে যে যত দূরে, তার অজ্ঞতার পরিমাণও সে স্তরের। একারণে এখন যদি 'নাহি আনিল মুনকার' করতেই হয়, তাহলে নম্রতা থেকে ধাপে ধাপে কঠোরতার দিকে যেতে হবে। অতঃপর এই নম্রতার কথা সমস্ত সৃষ্টির কর্ণকুহরে ও দৃষ্টির সামনে এমনভাবে পৌঁছে দিতে হবে, যেমনিভাবে রাসূলুল্লাহ যখন মক্কায় মানুষকে দাওয়াত দিয়েছিলেন, তখন নিকটের-দূরের প্রতিটি গোত্রই মুশরিকদের প্রতি রাসূল ﷺ এর ক্ষমা ও মার্জনার বিষয়ে ব্যাপকভাবে জেনে গিয়েছিল।
কিন্তু এর বিপরীত করলে এই দ্বীনকে বিকৃতভাবে চিত্রায়িত করা হবে। যা বর্তমানে হয়েছে। 'সন্ত্রাস ও কট্টরপন্থী' তকমা গায়ে লেগেছে। এমনকি যখনই তাদের আলোচনা সামনে আসে, তখনই এই চিত্রটি ভেসে উঠে। আর এটা শুধু সেই অজ্ঞতার কারণে, যা নিজেদেরকে উম্মাহর নেতৃত্বদানের অধিকারী দাবিকারী- কিছু লোককে এমন কাজে লিপ্ত করেছে, যা মানুষকে আল্লাহর দ্বীন ও তার শরীয়ত বাস্তবায়নের ব্যাপারে বীতশ্রদ্ধ করে দিয়েছে।
সুতরাং এ বিষয়টাকে উপদেশ গ্রহণের দৃষ্টিতে দেখা উচিত। কেননা রাসূলুল্লাহ ﷺ হদ কায়েম করা ও হত্যাযোগ্য লোকদেরকে হত্যা করার কাজ তখনই শুরু করেছেন, যখন কাফেররা ও অন্য সবাই এই দ্বীনের ব্যাপারে পূর্ণ দলিল পেয়ে গিয়েছিল। এমনকি তারা একথাও জেনে গিয়েছিল যে, রাসূলুল্লাহ ﷺ এর দয়া, তার কঠোরতার উপর প্রবল এবং তার নিকট কঠোরতা থেকে দয়া ও করুণাই অধিক প্রিয়। ফলে তিনি যখন মদীনায় কঠোরতার আচরণ গ্রহণ করলেন, তখন কাফেরদের কোন ছোট প্রমাণও অবশিষ্ট রইল না। এমন পরিবেশ তিনি একদিনে বা একরাতে প্রস্তুত করেননি।
ইমাম সারাখসী রহ. বলেন- জিহাদ ও কিতালের আদেশ পর্যায়ক্রমে অবতীর্ণ হয়েছে। রাসূলুল্লাহ প্রথমে শুধু রিসালাত পৌছানো আর কাফেরদেরকে এড়িয়ে চলতে আদিষ্ট ছিলেন। তারপর উত্তম পন্থায় বিতর্ক করার আদেশ পান'। তারপর যুদ্ধের অনুমতি দেওয়া হয়। তারপর যুদ্ধের আদেশ করা হয়, যদি কাফেরদের পক্ষ থেকে যুদ্ধের সূচনা হয়। তারপর তাদেরকে হারাম মাসসমূহ অতিক্রম করার শর্তে কিতালের আদেশ দেওয়া হয়। তারপর ব্যাপকভাবে যুদ্ধের আদেশ দেওয়া হয়।
আমি এ বিষয়ে আলোচনা দীর্ঘায়িত করলাম। কারণ, আপনারা জেনেছেন, আমাদের দেশগুলোতে এমন কর্মকাণ্ড শুরু হয়েছে, যেগুলোকে ইসলামী মনে করা হয়, অথচ ইসলাম এগুলো থেকে মুক্ত। একারণেই মুসলিম নেতৃত্বের উপর আবশ্যক ছিল সর্বদা ইলম অর্জনের চেষ্টা করা এবং রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডে নির্ভরযোগ্য, হেদায়াতপ্রাপ্ত ও সত্যবাদী আলেমদের থেকে পরামর্শ নেওয়া। যেন উম্মাহকে উন্নতির দিকে নিয়ে যেতে পারেন, বিভ্রান্তির গোলকধাঁধা থেকে স্পষ্ট সত্যের আলোতে নিয়ে আসতে পারেন। উপরন্তু তার এরূপ দলিলের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকতে হবে, যার দ্বারা তিনি তার বিরুদ্ধাবাদী বাতিলপন্থিদের বিরুদ্ধে প্রমাণ পেশ করতে পারেন। এমনিভাবে তার কর্তব্য হবে, প্রজাদেরকে ইলমে অর্জনে উৎসাহিত করা, এরজন্য অনেক ইলমী মারকায ও বিশ্ববিদ্যালয় খোলা.. ইত্যাদি।
আর শাসক নিজেই তালিবুল ইলমদের ব্যয়ভার বহন করা, তাদের জন্য নিয়মতান্ত্রিক ভাতা ধার্য করা, যা তাদেরকে প্রাত্যাহিক জীবনে সহযোগীতা করবে, আলেমদেরকে তাদের মর্যাদা অনুযায়ী মূল্যায়ন করা, তা'লীমে নিয়োজিতদের জন্য ভাতা নির্ধারণ করা, বহির্দেশ থেকে আলেমদেরকে আমন্ত্রণ জানানো ইত্যাদি তার অত্যাবশ্যকীয় দায়িত্ব। যেন এর মাধ্যমে ইলম প্রসার লাভ করে এবং মুসলিম শহরগুলো ইলমের সৌরভে সুরভিত হয়, উন্নতি লাভ করে। আল্লাহ ও তার রাসূল মুসলিমদেরকে ইলম অন্বেষণ করতে ও আলেমদের অনুসরণ করতে উদ্বুদ্ধ করেছেন।
আল্লাহ ইরশাদ করেছেন-
وَمَا كَانَ الْمُؤْمِنُونَ لِيَنفِرُوا كَافَّةً فَلَوْلَا نَفَرَ مِن كُلِّ فِرْقَةٍ مِّنْهُمْ طَائِفَةٌ لِيَتَفَقَّهُوا فِي الدِّينِ وَلِيُنذِرُوا قَوْمَهُمْ إِذَا رَجَعُوا إِلَيْهِمْ لَعَلَّهُمْ يَحْذَرُونَ.
“মুসলিমদের পক্ষে এটাও সমীচীন নয় যে, তারা (সর্বদা) সকলে এক সঙ্গে (জিহাদে) বের হয়ে যাবে। একটি অংশ কেনো বের হয় না, যাতে (যারা জিহাদে যায়নি) তারা দ্বীনের উপলব্ধি অর্জনের চেষ্টা করে এবং সতর্ক করে তাদের কওম (এর সেই সবলোক)কে, যারা জিহাদে গিয়েছে, যখন তারা তাদের কাছে ফিরে আসবে, ফলে তারা (গুনাহ থেকে) সতর্ক থাকবে।” [সুরা তাওবা- ১২২]
আবুদ্দারদা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন- আমি রাসূল কে বলতে শুনেছি-
مَنْ سَلَكَ طَرِيقًا يَبْتَغِي فِيهِ عِلْمًا سَلَكَ اللَّهُ بِهِ طَرِيقًا إِلَى الْجَنَّةِ، وَإِنَّ الْمَلَائِكَةَ لَتَضَعُ أَجْنِحَتَهَا رِضَاءً لِطَالِبِ العِلْمِ، وَإِنَّ العَالِمَ لَيَسْتَغْفِرُ لَهُ مَنْ فِي السَّمَوَاتِ وَمَنْ فِي الأَرْضِ حَتَّى الحِيتَانُ فِي الْمَاءِ، وَفَضْلُ العَالِمِ عَلَى العَابِدِ، كَفَضْلِ القَمَرِ عَلَى سَائِرِ الكَوَاكِبِ، إِنَّ العُلَمَاءَ وَرَثَةُ الأَنْبِيَاءِ، إِنَّ الأَنْبِيَاءَ لَمْ يُوَرِثُوا دِينَارًا وَلَا دِرْهَمَا إِنَّمَا وَرَّثُوا العِلْمَ، فَمَنْ أَخَذَ بِهِ أَخَذَ بِحَظٍّ وَافِرٍ.
“যে ইলম অন্বেষণের উদ্দেশ্যে পথ চলে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাতের পথ সহজ করে দেন। আর ফেরেশতাগণ ইলম অন্বেষণকারীদের জন্য তাদের ডানাসমূহ বিছিয়ে দেন। আলিমের জন্য আকাশ ও যমীনের অধিবাসীরা- এমনকি সমুদ্রের মাছও ক্ষমা প্রার্থনা করে। আবিদের উপর আলিমের শ্রেষ্ঠত্ব হল, তারকারাজীর উপর চন্দ্রের শ্রেষ্ঠত্বের ন্যায়। নিশ্চয়ই নবীগণ দিনার বা দিরহামের উত্তরাধিকারী বানান না; বরং তারা ইলমের উত্তরাধিকারী বানান। তাই যে এটা গ্রহণ করল, সেই পূর্ণ অংশগ্রহণ করল”। [সুনানে তিরমিযী- ২৬৮২]
মুআবিয়া বর্ণনা করেছেন, নবী বলেন-
مَنْ يُرِدِ اللَّهُ بِهِ خَيْرًا يُفَقِهْهُ فِي الدِّينِ.
“আল্লাহ যার ব্যাপারে কল্যাণ চান, তাকে দ্বীনের বুঝ দান করেন”। [সহিহ বুখারি- ৭১]
ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম রহ. বলেন- “এটা প্রমাণ করে যাকে তিনি দ্বীনের ফিকহ বা বুঝ দান করেননি, তার ব্যাপারে কল্যাণের ইচ্ছা করেননি। আর যাকে দ্বীনের বুঝ দান করেছেন, তার ব্যাপারে কল্যাণের ইচ্ছা করেছেন। তবে তখন ফিকহ দ্বারা উদ্দেশ্য হবে এমন ইলম, যার অনিবার্য ফল হচ্ছে আমল। কিন্তু যদি তার দ্বারা নিছক ইলম উদ্দেশ্য হয়, তখন এটা একথা প্রমাণ করবে না যে, যে দ্বীনি বুঝ অর্জন করেছে, তার ব্যাপারে কল্যাণের ইচ্ছা করা হয়েছে। কারণ তখন কল্যাণের ইচ্ছা করার জন্য দ্বীনি বুঝ থাকা হবে শর্ত। আর প্রথমোক্ত অবস্থায় তা হবে ফল। আল্লাহ্ই ভাল জানেন।"
ইবনে বাত্তাল রহ. বলেন- “এর মধ্যে সকল মানুষের উপর আলেমদের শ্রেষ্ঠ হওয়ার এবং অন্য সকল ইলমের উপর দ্বীনি ফিকহ শ্রেষ্ঠ হওয়ার প্রমাণ রয়েছে। আর এর শ্রেষ্ঠ হওয়ার কারণ হল, যেহেতু এটা আল্লাহ্ তা'আলাকে ভয় করতে, তার আনুগত্যে অটল থাকতে ও তার অবাধ্যতা থেকে দূরে থাকতে সাহায্য করে। তাই ইলমের দ্বারাই সমস্ত ইবাদত বিশুদ্ধ ও উপযুক্ত হয়, আর তা না হলে প্রত্যেকের অবস্থানুযায়ী ত্রুটি হতে থাকে। এমনকি কখনো তা গুনাহ-ই পরিণত হয়। ইলমের দ্বারা জাতি উন্নতি লাভ করে আর ইলম ছাড়া পতিত হয়। আর উম্মাহর নেতৃবৃন্দই উক্ত ইলমের সবচেয়ে বেশি মুখাপেক্ষী।"
রাসূল ﷺ এক হাদিসে এমনটিই বর্ণনা করেছেন, যা বর্ণনা করেছেন হযরত আবুদ্দারদা রা., রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন- “নিশ্চয়ই আলেমগণ নবীদের ওয়ারিশ। আর নিশ্চয়ই নবীগণ দিনার বা দিরহামের উত্তরাধিকারী বানিয়ে যান না। বরং তারা ইলমের উত্তরাধিকারী বানান। তাই যে তা গ্রহণ করল, সে পূর্ণ অংশগ্রহণ করল।"
ইলম অর্জন শুধু শরয়ী ইলম পর্যন্তই সীমাবদ্ধ নয়। বরং এটা যেকোন কারিগরি, প্রযুক্তিগত, সামরিক ও অন্যান্য ইলমকেও অন্তর্ভূক্ত করে।
আনাস ইবনে মালেক রা. থেকে বর্ণিত, নবী ﷺ বলেন-
طَلَبُ الْعِلْمِ فَرِيضَةٌ عَلَى كُلِّ مُسْلِمٍ.
"ইলম অন্বেষণ করা প্রতিটি মুসলিমের উপর ফরজ।" [বর্ণনা করেছেন ইমাম বায়হাকি রহ.; শায়খ আলবানী তার 'সহীহুল জামে' কিতাবে এর বিশুদ্ধতা বর্ণনা করেছেন।]
ইমাম বাইহাকী রহ. বলেন-
أراد والله أعلم العلم العام الذي لا يسع البالغ العاقل جهله أو علم ما يطرأ له خاصة، أو أراد أنه فريضة على كل مسلم حتى يقوم به من فيه الكفاية،
"উদ্দেশ্য হচ্ছে এমন ইলম, যা কোন সুস্থ মস্তিস্ক ও প্রাপ্ত বয়স্ক ব্যক্তির অজানা থাকার অবকাশ নেই। অথবা এমন জিনিসের ইলম, যা শুধু তার সামনে উপস্থিত হয়। সে এটা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে জেনে নিবে। অথবা উদ্দেশ্য হচ্ছে, যতক্ষণ পর্যন্ত যথেষ্ট পরিমাণ লোক এই দায়িত্ব পালন না করে, ততক্ষণ পর্যন্ত প্রত্যেক মুসলিমের উপর ফরজ। আল্লাহই ভাল জানেন।"
ইলম ও আলেমদের শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে আরও বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ ﷺ এর নিকট দুই ব্যক্তির আলোচনা করা হল- তাদের একজন আবিদ (শুধু ইবাদতকারী), অপরজন (ইবাদতকারী) আলিম। তখন রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন- "আবিদের উপর আলিমের শ্রেষ্ঠত্ব হল তোমাদের সবচেয়ে নিম্নস্তরের লোকের উপর আমার শ্রেষ্ঠত্বের মত।"
অতঃপর রাসূল ﷺ বলেন- “নিশ্চয়ই আল্লাহ, তার ফেরেশতাগণ এবং আসমান ও যমীনবাসীগণ- এমনকি গর্তের পিপিলিকা ও সমুদ্রের মাছ পর্যন্ত- ঐ ব্যক্তির জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে, যে মানুষকে কল্যাণ শিক্ষা দেয়।"
ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম রহ. বলেন- “যেহেতু তার প্রদত্ত শিক্ষাটিই তাদের মুক্তি, সৌভাগ্য ও আত্মশুদ্ধির কারণ হবে, এ কারণে আল্লাহ তা'আলা তাঁকেও অনুরূপ আমলের সাওয়াব দিবেন। আর তা এভাবে যে- তিনি তার সালাত, ফেরেশতাদের সালাত ও যমীনবাসীদের সালাত থেকে একটি অংশ তার জন্য নির্ধারণ করবেন, যা তার মুক্তি, সৌভাগ্য ও সফলতার কারণ হবে। কারণ যেমনিভাবে মানুষকে কল্যাণ শিক্ষাদাতা আল্লাহর দ্বীন ও তাঁর বিধি-বিধানকে প্রকাশকারী এবং মানুষের নিকট আল্লাহর নাম ও গুণাবলীর পরিচয় দানকারী, অনুরূপ আল্লাহ তা'আলাও নিজের সালাত, আসমানবাসীদের সালাত ও যমীনবাসীদের সালাত তার জন্য নিয়োজিত করবেন, যার ফলে আসমান ও যমীনবাসীদের মাঝে তার প্রশংসা, সম্মান ও স্তুতি গাওয়া হবে।"
ইমাম বদরুদ্দীন ইবনে জামাআহ রহ. বলেন- "জেনে রাখুন! ঐ ব্যক্তির মর্যাদার চেয়ে উচ্চ মর্যাদা কিছু হতে পারে না, যার জন্য দু'আ ও ক্ষমা প্রার্থনায় ফেরেশতাগণ ও অন্যান্য মাখলুকগণ নিয়োজিত হন এবং তার জন্য তাদের ডানা বিছিয়ে দেন।"
একজন নেককার ব্যক্তি বা যার ব্যাপারে সালিহ হওয়ার ধারণা করা হয়, তার থেকে দু'আ নেওয়ার ব্যাপারেই মানুষ প্রতিযোগীতা করে, তাহলে ফেরেশতাদের দু'আর বিষয়টি কত মর্যাদাপূর্ণ! ফেরেশতাদের ডানা বিছানোর অর্থ কি? এ ব্যাপারে বিভিন্ন মত রয়েছে। কেউ কেউ বলেছেন এর অর্থ হল, তার জন্য বিনয়ী হওয়া। কেউ বলেছেন, তার নিকট আসা ও তার সাথে উপস্থিত হওয়া। কেউ বলেছেন, তাকে সম্মান করা। কেউ বলেছেন, এর অর্থ হল, ফেরেশতাগণ তাকে ডানার উপর বহন করে, অতঃপর তাকে গন্তব্যে পৌঁছতে সাহায্য করে। আর পশুপাখিকে তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনার বুঝ দেওয়ার কারণ হিসাবে কেউ কেউ বলেছেন- প্রথমত: যেহেতু এগুলোকে সৃষ্টিই করা হয়েছে মানুষের কল্যাণ ও সুবিধার জন্য। উপরন্তু আলেমগণই এগুলোর মধ্যে কোনটি হালাল, কোনটি হারাম, তা বর্ণনা করেন এবং এদের প্রতি দয়া করা ও এদের ক্ষতি না করার উপদেশ দেন।
📄 তৃতীয় গুণ: الحكمة (প্রজ্ঞা)
يُؤْتِي الْحِكْمَةَ مَن يَشَاءُ وَمَن يُؤْتَ الْحِكْمَةَ فَقَدْ أُوتِيَ خَيْرًا كَثِيرًا وَمَا يَذَّكَّرُ إِلَّا أُولُو الْأَلْبَابِ.
"তিনি যাকে চান প্রজ্ঞা দান করেন, আর যাকে প্রজ্ঞা দান করা হল, তার বিপুল পরিমাণে কল্যাণ লাভ হল। উপদেশ তো কেবল তারাই গ্রহণ করে, যারা বুদ্ধির অধিকারী।" [সুরা বাকারা- ২৬৯]
শব্দটি আভিধানিকভাবে حكم يحكم - حكما - وحكمة - فهو حكيم থেকে উদগত। حكم الشخص অর্থ হলো- লোকটি প্রজ্ঞাবান হলো। অর্থাৎ লোকটির কাজ-কর্ম ও কথাবার্তা, চিন্তা-ভাবনা ও সঠিক বিবেচনার সাথে সম্পাদিত হয়। আরেকটি ব্যবহার ابغض بغيضك بغضا رويدا... اذا انت حاولت ان تحكما 'তুমি যদি 'হুকুম' (শাসন) করতে চাও, তবে যে তোমার সাথে শত্রুতা করে, তুমি তার সাথে শত্রুতা কর।' এখানে 'তুমি যদি হুকুম করতে চাও' মানে হচ্ছে, তুমি যদি হাকিম হতে চাও।
'হিকমাহ' এর পারিভাষিক অর্থ: কেউ কেউ বলেছেন- হিকমাহ হল, নবুওয়াত ছাড়া সঠিক কথা বলা।
কেউ বলেন, তা হচ্ছে যেটা রাসূলুল্লাহ ﷺ এর কথায় এসেছে- হে আল্লাহ! তাকে হিকমাহ শিক্ষা দাও।
কেউ বলেন- তা হল দ্বীনের ইলম।
কেউ বলেন- তা হচ্ছে কুরআনের ইলম।
কেউ বলেন- তা হচ্ছে দ্বীনের ফিকহ।
কেউ বলেন- তা হচ্ছে আল্লাহর ভয়।
কেউ বলেন- তা হচ্ছে আল্লাহ তা'আলার আদেশ-নিষেধ বুঝা।
আর এ সবগুলো অর্থই রাসূলুল্লাহ ﷺ এর নিম্নোক্ত বাণীতে প্রযোজ্য- الحكمة يمـانية (হিকমাহ ইয়ামান থেকে আসে)।
এমনিভাবে তার আরেকটি বাণী- (হে আল্লাহ! তাকে হিকমাহ শিক্ষা দাও)। বিশেষত: 'ফিকহ ইয়ামানী' কথাটি।
এটি একটি আল্লাহর দান, তিনি তার বান্দাদের মধ্য থেকে যাকে ইচ্ছা তা দান করেন। যেমনটা আল্লাহ পুর্বোক্ত পবিত্র আয়াতে বলেছেন।
তবে এটা আল্লাহ প্রদত্ত হওয়ার মানে এই নয় যে, তা অর্জনযোগ্য নয়। বরং মূল কথা হচ্ছে তার অনেকগুলো উপায় আছে, যেগুলো অর্জনের জন্য চেষ্টা করতে হবে। যেন আল্লাহর অনুগ্রহ ও দয়ায় তার কিছু অংশ লাভ করা যায়। বিষয়টি আরো স্পষ্ট হবে এটা জানলে যে, এর কতগুলো ভিত্তি বা স্তম্ভ রয়েছে, যখন কোন ব্যক্তি সেগুলোর প্রতি যত্নশীল হবে, তখন উক্ত বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত ব্যক্তি হিকমাহ পাওয়ার জন্য অধিকতর উপযুক্ত হয়।
ইবনুল কায়্যিম রহ. এর বর্ণনায় উক্ত স্তম্ভগুলো হচ্ছে- “ইলম, সহনশীলতা ও ধীরস্থিরতা।”
আর এর জন্য বিপদজনক হল, তার বিপরীত বিষয়গুলো। "অজ্ঞতা, অস্থিরতা ও তড়িৎ প্রবণতা।” সুতরাং অজ্ঞ, অস্থির ও তড়িৎ প্রবণ ব্যক্তির কোন হিকমাহ নেই। আল্লাহই সর্বাধিক জ্ঞাত। কোথাও এ তিনটি স্তম্ভের সাথে আরেকটি যুক্ত করা হয়- "সম্মানের স্থানে প্রকাশ লাভ করাকে অপছন্দ করা।"
কখনো অনেককে শয়তান এই প্রবঞ্চনা দেয় যে, সে এমন হিকমতের অধিকারী, যেমনটা অন্য কারো নেই এবং সে-ই তার সঠিক বিবেচনা দ্বারা যেকোন সম্মানের স্থানে প্রকাশ লাভ করার উপযুক্ত। কখনো তার সামনে বিষয়টিকে এভাবে সুন্দর করে তোলা হয় যে, সে-ই তো মুসলিম উম্মাহর হিতাকাঙ্খি, স্বার্থচিন্তা করাও এ ধরনের কল্যাণের পথে আছে। ফলে সে নিজ জ্ঞান দ্বারা প্রবঞ্চিত হয়। এর কারণে ব্যর্থতা ও বঞ্চনা আসে। কারণ আমরা কুরআন-সুন্নাহ থেকে জেনেছি, আত্মপ্রবঞ্চিত ব্যক্তির আল্লাহর তাওফীক লাভ হয় না। আর যে ব্যাপকভাবে প্রকাশ লাভ করা ও দুনিয়াবী সম্মান লাভ করা থেকে বেঁচে থাকতে আগ্রহী থাকে, তার সাথে আল্লাহর তাওফীক যুক্ত হয়। যদি সঠিকভাবে ব্যক্ত করতে সক্ষম হয়ে থাকি, তবে বিষয়টি এমনই।
ইমাম শাফেয়ী রহ. যখন কোন মাসআলায় কারো সাথে বিতর্ক করতে বাধ্য হতেন, তখন তিনি কামনা করতেন, যাতে প্রতিপক্ষ আল্লাহর তাওফীক ও সাহায্যপ্রাপ্ত হয় এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে তার কথা সঠিক করে দেওয়া হয়। [হিলইয়াতুল আউলিয়া]
তিনি বলতেন, আমার সিদ্ধান্ত সঠিক, কিন্তু ভুলেরও সম্ভাবনা রাখে, আর অন্যদের সিদ্ধান্ত ভুল, কিন্তু সঠিক হওয়ারও সম্ভাবনা রাখে। আর এটা শুধু এই প্রয়োজনেই বলতেন, যা এখন স্পষ্ট করলাম। তবে আমার কথার এটা উদ্দেশ্য নয় যে, একজন লোক তার মত গোপন করবে। বিশেষত: যদি সে এমন নেতা হয়, যার বুদ্ধি-বিবেচনার কথা সকলের জানাশোনা। বরং তার জন্য তিনি যে সিদ্ধান্তকে সঠিক মনে করেন না সেটার অনুসরণ করা দূষণীয়। তাই মূল বিষয় হচ্ছে, প্রকাশ লাভ করাকে অপছন্দ করা এবং নিজের হিকমাতের দ্বারা তুষ্ট না হওয়া। অন্যথায় হিকমতের গুণে গুণান্বিত হওয়া ও সে দাবি মতে কাজ করার জন্য তিনিই অধিক উপযুক্ত। যেহেতু তার জন্য হিকমাহ অনেক বেশি প্রয়োজন। এজন্যই তার জন্য তা অর্জনের জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করা অবশ্য কর্তব্য। যেন যে স্থানে হিকমাহ সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সেখানে তার উপর আল্লাহর তাওফীক ও সংশোধন অবতীর্ণ হয়।
যেমনটা ইবনুল কায়্যিম রহ. হিকমাহ এর সংজ্ঞা প্রসঙ্গে বলেন- “হিকমাহ হচ্ছে, যা যেভাবে করা উচিত, তা সেভাবে সঠিক সময়ে করা। তার উপর এটাও কর্তব্য যে, তিনি প্রতিটি জিনিসকে তার সঠিক মাপে পরিমাপ করার জন্য নিজেকে প্রশিক্ষিত করে তুলবেন, দূরদৃষ্টি ও উদার হৃদয়ের অধিকারী হবেন।”
আর সবগুলোই নিজ উম্মাহ্ ও মামুরদের কল্যাণে নিয়োজিত করবেন। তাদের শান্তির জন্য নিজের জীবন ও সময় ব্যয় করবেন। তার একমাত্র চিন্তাই থাকবে উম্মাহ। ফলে এর বিনিময়ে আল্লাহ তাকে উক্ত হিকমাহ দান করবেন। বর্ণিত আছে, আল্লাহর নবী হযরত ঈসা বলেছেন- "হিকমাহ হচ্ছে প্রত্যেকের অন্তরের নূর।"
হ্যাঁ, এটি একটি নূর, এর মাধ্যমে আল্লাহ তার একনিষ্ঠ বান্দাদের অন্তরকে আলোকিত করেন। যাদেরকে তিনি নির্বাচিত করেন এবং সরল পথের দিকনির্দেশনা দেন। সেই সরল পথ, যা এমন জান্নাতে নিয়ে যায়, যার ব্যাপ্তি আসমান ও যমীন। যা মুত্তাকীদের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে। হিকমাহর মাহাত্ম ও গুরুত্বের কারণে আল্লাহ তাঁর কিতাবে হিকমাহর কথা ২০ বার উল্লেখ করেছেন। হিকমাহর মাধ্যমে নেতা তার জনগণকে অজ্ঞতা ও বর্বরতার অন্ধকার থেকে ভালবাসা, সভ্যতা ও ইলমের নূরের দিকে নিয়ে আসেন। আর তিনি কুরআন-সুন্নাহকে স্বীয় দাওয়াতের নীতিনির্ধারক বানান। যেমনটা আল্লাহ তাঁর নিম্নোক্ত আয়াতে বলেছেন-
ادْعُ إِلَى سَبِيلِ رَبِّكَ بِالْحِكْمَةِ وَالْمَوْعِظَةِ الْحَسَنَةِ وَجَادِلْهُم بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ إِنَّ رَبَّكَ هُوَ أَعْلَمُ بِمَن ضَلَّ عَن سَبِيلِهِ وَهُوَ أَعْلَمُ بِالْمُهْتَدِينَ
“তুমি নিজ প্রতিপালকের পথে মানুষকে ডাকবে হিকমত ও সদুপদেশের মাধ্যমে আর (যদি কখনও বিতর্কের দরকার পড়ে, তবে) তাদের সাথে বিতর্ক করবে উৎকৃষ্ট পন্থায়। নিশ্চয়ই তোমার প্রতিপালক যারা তার পথ থেকে বিচ্যুত হয়েছে, তাদের সম্পর্কে ভালভাবেই জানেন এবং তিনি তাদের সম্পর্কেও পরিপূর্ণ জ্ঞাত, যারা সৎপথে প্রতিষ্ঠিত।” [সুরা নাহল- ১২৫]
এখন আমি মুনাফিক সরদার আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই ইবনে সলুলকে হত্যা না করার ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ -এর যে হিকমাহ ছিল, তা নিয়ে আলোচনা করবো। বিভিন্ন ঘটনায় সে রাসূলুল্লাহ কে কত কষ্ট দিয়েছে! যা স্বস্ব স্থানে জ্ঞাতব্য। তার মধ্যে একটি ঘটনা হল, যা ইমাম বুখারী রহ. জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ থেকে বর্ণনা করেছেন-
"তিনি বলেন- আমরা রাসূলুল্লাহ -এর সঙ্গে যুদ্ধ করলাম। তার সঙ্গে কিছু মুহাজিরও আসলো এবং তাদের সংখ্যা বেশি হয়ে গেল। মুহাজিরদের সাথে হাসি তামাশাকারী এক ব্যক্তি ছিল। সে জনৈক আনসারীকে আঘাত করল। ফলে আনসারীটি ভীষণ রেগে গেল। অবশেষে উভয়েই নিজেদের লোকদেরকে ডাকতে লাগল। আনসারী ডাক দিল, হে আনসারীগণ! মুহাজির ডাক দিল, হে মুহাজিরগণ! নবী বের হয়ে দেখে বললেন, ব্যাপার কি, জাহিলিয়্যাতের ডাক শুনতে পাচ্ছি? অতঃপর বললেন, তাদের কি হয়েছে? তখন তাকে মুহাজির কর্তৃক আনসারীকে আঘাত করার কথা জানানো হল। বর্ণনাকারী বলেন-
فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: دَعُوهَا فَإِنَّهَا خَبِيثَةٌ. وَقَالَ عَبْدُ اللَّهِ بْنُ أَبِي ابْنُ سَلُولَ: أَقَدْ تَدَاعَوْا عَلَيْنَا، لَئِنْ رَجَعْنَا إِلَى المَدِينَةِ لَيُخْرِجَنَّ الْأَعَزُّ مِنْهَا الْأَذَلَّ.
“তখন রাসূলুল্লাহ বললেন, তোমরা এগুলো (সাম্প্রদায়িক ডাক) পরিহার করো, কারণ এগুলো নিকৃষ্ট বিষয়। আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই ইবনে সলূল বলল- তারা কি আমাদের বিরুদ্ধে পরস্পরকে ডেকেছে? আমরা মদীনায় ফিরে গেলে অচিরেই সেখানকার সম্মানিতরা নীচুদেরকে বের করে দিবে।" [সহিহ বুখারি- ১৮৪]
এই অভিশপ্তের এর দ্বারা উদ্দেশ্য ছিল মুহাজির ও তাদের ভাই আনসারদের মাঝে বিদ্বেষ সৃষ্টি করা এবং তাদের মাঝে ফেৎনা ও বিভেদ ছড়িয়ে দেওয়া। অতঃপর যখন রাসূল এর নিকট তার এ কথা পৌঁছলো, তখন উমর তার নিকট ছিলেন। উমর বললেন-
أَلا تَقْتُلُ يَا رَسُولَ اللَّهِ هَذَا الخَبِيثَ؟ لِعَبْدِ اللَّهِ، فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: لَا يَتَحَدَّثُ النَّاسُ أَنَّهُ كَانَ يَقْتُلُ أَصْحَابَهُ.
“হে আল্লাহর রাসূল! এই খবীসকে কি হত্যা করে ফেলবো না? নবী বললেন, পাছে লোকে একথা বলে যে, সে তার সাথীদেরকে হত্যা করত।" [সহিহ বুখারি- ১৮৪]
আরেক বর্ণনায় আছে, তখন রাসূল বললেন, তখন কি হবে উমর, যখন লোকে বলবে, মুহাম্মাদ তার সাথীদেরকে হত্যা করে? তাই এটা করো না; বরং যাত্রার ঘোষণা দাও। [সীরাতে ইবনে হিশাম]
রাসূল শুধু তাকে হত্যা ত্যাগ করেই ক্ষান্ত হননি। বরং তার প্রতি কোমল আচরণও করেছেন এবং তাকে উত্তম সাহচর্য দান করেছেন। বিষয়টি স্পষ্ট হয় এই ঘটনা দ্বারা, যখন আব্দুল্লাহ ইবনে উবাইয়ের পুত্র আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই রাসূলুল্লাহ-এর নিকট তার পিতাকে হত্যা করার অনুমতি চাইলেন, তখন রাসূলুল্লাহ বললেন- বরং সে যতদিন আমাদের মাঝে থাকে, ততদিন আমরা তার সাথে কোমল আচরণ করবো এবং উত্তম সাহচর্য দান করবো। [সীরাতে ইবনে হিশাম।
এখানে রাসূলুল্লাহ তাকে হত্যা করার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকটি স্পষ্ট করে দিয়েছেন। তা হচ্ছে, ইবনে উবাইয়ের ব্যাপারে যাদের জানা নেই, তাদের এই ধারণা হতে পারে যে, মুহাম্মাদ তার সাথীদেরকে হত্যা করে। আর এটা তাদেরকে ইসলাম থেকে আরও দূরে সরিয়ে দিবে।
আর তার পক্ষ থেকে উমার-কে অসময়ে যাত্রার ঘোষণা দেওয়ার আদেশ, অতঃপর ক্লান্ত হওয়ার আগ পর্যন্ত ক্রমাগত সফর করার উদ্দেশ্য ছিল মুসলমানদেরকে কাজে ব্যস্ত করে ফেৎনা থেকে ফিরানো। যে ফেৎনা ইবনে উবাই মুহাজির ও আনসারদের মাঝে ছড়িয়েছিল। আর এর উদ্দেশ্য ছিল মুহাজির ও আনসারদের মাঝে ভালবাসা ও ভ্রাতৃত্ব নষ্ট করা। আর রাসূল এর উক্ত হিকমাহ পরে ফল দিয়েছিল।
ফলে একসময় মুনাফিকদের ব্যাপারটিই শেষ হয়ে যায়। ইবনে উবাইয়ের বিষয়ও সকলের সামনে প্রকাশ হয়ে যায়। এমনকি এরপর যখনই সে কোন নতুন কিছু ঘটত, তখন তার কওমই তাকে ভর্ৎসনা করত, জবাবদিহি করত ও শাসাত। যখন তাদের এ অবস্থা রাসূলুল্লাহ এর নিকট পৌঁছলো, তখন রাসূল উমর-কে বলেন, হে উমর! কেমন দেখছো? আল্লাহর শপথ! যে সময় তুমি তাকে হত্যা করতে বলেছো, তখন যদি আমি তাকে হত্যা করতাম, তাহলে তার জন্য অনেকেরই মন কেঁদে উঠত। কিন্তু এখন যদি ঐ সকল লোককেই তাকে হত্যা করতে আদেশ করি, তাহলে তারাই তাকে হত্যা করতে রাজি হবে। উমার বলেন, আল্লাহর শপথ! রাসূলুল্লাহ এর কাজই আমার কাজ অপেক্ষা অধিক বরকতপূর্ণ। [সীরাতে ইবনে হিশাম]
আরেকটি ঘটনায় হযরত জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ বর্ণনা করেন-
لَمَّا قَسَمَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ غَنَائِمَ هَوَازِنَ بَيْنَ النَّاسِ بِالْجِعْرَانَةِ، قَامَ رَجُلٌ مِنْ بَنِي تَمِيمٍ، فَقَالَ اعْدِلْ يَا مُحَمَّدُ، فَقَالَ وَيْلَكَ، وَمَنْ يَعْدِلُ إِذَا لَمْ أَعْدِلْ، لَقَدْ خِبْتُ وَخَسِرْتُ إِنْ لَمْ أَعْدِلْ قَالَ: فَقَالَ عُمَرُ : يَا رَسُولَ اللَّهِ، أَلَا أَقُومُ فَأَقْتُلَ هَذَا الْمُنَافِقَ،
قَالَ: مَعَاذَ اللَّهِ أَنْ تَتَسَامَعَ الْأَمَمُ أَنَّ مُحَمَّدًا يَقْتُلُ أَصْحَابَهُ، ثُمَّ قَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: إِنَّ هَذَا وَأَصْحَابًا لَهُ يَقْرَءُونَ الْقُرْآنَ لَا يُجَاوِزُ تَرَاقِيَهُمْ.
“তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ যখন জিইররানায় বনু হাওয়াযিনের গণিমত বন্টন করলেন, তখন বনু তামিমের এক ব্যক্তি বলল, হে মুহাম্মাদ! ইনসাফ কর, রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, হে হতভাগা! আমি যদি ইনসাফ না করি, তাহলে কে ইনসাফ করবে? আমি যদি ইনসাফ না করি, তাহলে তো আমি ব্যর্থ ও ধ্বংস! তখন উমর (রাঃ) বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমি কি উঠে এই মুনাফিককে হত্যা করে ফেলবো? রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, আল্লাহর পানাহ! অন্যান্য জাতি শুনতে পাবে যে, মুহাম্মাদ তার সাথীদেরকে হত্যা করে। অতঃপর রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, এই ব্যক্তি ও তার কতিপয় সাথী এমন যে, তারা কুরআন পাঠ করে, কিন্তু কুরআন তাদের কণ্ঠনালী অতিক্রম করে না।” [মুসনাদে আহমাদ- ১৪৮২০]
মোটকথা মুনাফিককে হত্যা করা বা তার উপর হদ প্রয়োগ করা কয়েকটি কারণে নিষিদ্ধ, যা ইমাম ইবনে তাইমিয়্যা রহ. সংক্ষেপে বলেছেন এভাবে-
১. তার হদ বা হত্যার বিষয়টি এমন শরয়ী প্রমাণ দ্বারা প্রমাণিত না হওয়া, যা বিশেষ-সাধারণ সবাই বোঝে।
২. বা তার উপর তা কায়েম করতে গেলে সাধারণ লোকজন ইসলামে প্রবেশ করার ব্যাপারে অনাগ্রহী হয়ে উঠবে বা অনেকে মুরতাদ হয়ে যাবে বা কোন কওম এমন যুদ্ধ বা ফেৎনা সৃষ্টি করবে, যা মুনাফিককে হত্যা না করার ফাসাদ থেকে আরও বেশি। যার ফলে তার উপর হদ কায়েম করা সম্ভব হয় না।
অতঃপর শায়খ ইবনে তাইমিয়্যা রহ. বলেন- উপরোক্ত দু'টি কারণ এখনও ধর্তব্য। তবে একটি কারণ এখন নেই, তা হচ্ছে- কখনো এই আশঙ্কা করা হয় যে, মানুষ ধারণা করবে, সে তার সাথীদেরকে অপরাপর রাজা- বাদশাদের মত রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে হত্যা করে। এটা বর্তমানে নেই। তবে বর্তমানকালের অনেক অজ্ঞরা যা করে, তা নয়..। লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লাহ বিল্লাহ..। তারা এমন এমন অজুহাতে সাধারণ মুসলিমদেরকে মুনাফিক ও কাফের সাব্যস্ত করে, যার ব্যাপারে আল্লাহ কোন প্রমাণ অবতীর্ণ করেননি। ফলে মানুষকে বীতশ্রদ্ধ করে তোলে। এমনকি মুসলিমদেরকেও দ্বীন ও শরীয়তের ব্যাপারে অনাগ্রহী করে তোলে। তারা কি তাদের নবীর অনুসরণ করতে পারে না?! ইবনে উবাইকে হত্যা না করার ক্ষেত্রে তিনি যে হিকমত অবলম্বন করেছিলেন তারা কি তা চিন্তা করে না? অথচ তার কপটতা সাধারণ মুসলিমদের মাঝে প্রচারিত হয়ে গিয়েছিল!
তারা কি জানে না, যতক্ষণ পর্যন্ত সাধারণ অমুসলিমরা- বিশেষত: যারা দারুল ইসলামের বাইরে, তারা নেফাক ও মুনাফিক সম্পর্কে কিছু না জানবে এবং যেকোন ইসলামের নামধারীকেই প্রকৃত মুসলিম বলে মনে করবে, ততক্ষণ পর্যন্ত মুনাফিককেও হত্যা করা উচিত নয়, যদিও তার নিফাকী মুসলমানদের জানা শোনা থাকে, যতক্ষণ না উক্ত নিফাকী সকল মানুষের সামনে প্রকাশ্য ও স্পষ্ট হয়ে উঠে।
অতএব যদি এমন ব্যক্তি স্বীয় সম্প্রদায়ের প্রতিরক্ষায় থাকে, আর তার নিফাকী তাদের মাঝে বা অন্যান্য মুসলিমদের মাঝে পরিচিত নয়, তাহলে তার ব্যাপারে সবর করা হবে, যতক্ষণ না তার বিষয়টি তার নিজের থেকেই প্রকাশিত হয়ে পড়ে অথবা তার সম্প্রদায়ের মাঝে ও সকল মানুষের মাঝে তার নিফাকী প্রসিদ্ধি লাভ করে। আর তখনই কেবল নব্য ধর্মের ব্যাপারে ঐ সকল সংশয়গুলো সৃষ্টি হবে না, যা সাধারণতঃ মানুষের মনে এসে থাকে এবং অন্তর ও বিবেক তাতে আচ্ছন্ন হয়ে যায়। বিষয়টি সহজ নয়, কারণ রাসূল ﷺ মুনাফিকদের থেকে অনেক কষ্ট সহ্য করেছেন। তাদের সাথে হিকমতের সাথে কাজ করেছেন, যেমনটা বর্ণনা করেছি। এর মাধ্যমে রাসূল ﷺ অধিকাংশ শত্রুকে এবং কাফেরদের লিডারদেরকে এমন সুযোগ দিয়েছেন যে, তারা ঈমানদারদের লিডারে পরিণত হয়েছে। কিন্তু তুমি যাদেরকে আহ্বান করছো, তারা তো প্রাণহীন। কারণ এরা তো মুনাফিকদেরকেও নয়; মুসলিমদেরকে হত্যা করছে! লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ!! তবে যাদের ব্যাপারে আল্লাহ ভিন্নটা চেয়েছেন তারা ব্যতীত।
মুসলমানদেরকে উন্নত চরিত্রের দিকে আহ্বান করার জন্য রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর একটি হিকমতি পন্থা ছিল, যা ইমাম আহমাদ রহ. তার মুসনাদে আবু উমামা থেকে বর্ণনা করেছেন-
إِنَّ فَتَى شَابًا أَتَى النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ، ائْذَنْ لِي بِالزِّنَا، فَأَقْبَلَ الْقَوْمُ عَلَيْهِ فَزَجَرُوهُ وَقَالُوا مَهُ. مَهُ. فَقَالَ ادْنُهُ، فَدَنَا مِنْهُ قَرِيبًا. قَالَ فَجَلَسَ قَالَ أَتُحِبُّهُ لِأُمِّكَ؟ قَالَ لَا وَاللَّهِ جَعَلَنِي اللَّهُ فِدَاءَكَ. قَالَ وَلَا النَّاسُ يُحِبُّونَهُ لِأُمَّهَاتِهِمْ. قَالَ أَفَتُحِبُّهُ لِابْنَتِكَ؟ قَالَ لَا وَاللَّهِ يَا رَسُولَ اللهِ جَعَلَنِي اللَّهُ فِدَاءَكَ قَالَ وَلَا النَّاسُ يُحِبُّونَهُ لِبَنَاتِهِمْ. قَالَ أَفَتُحِبُّهُ لِأُخْتِكَ؟ قَالَ لَا وَاللَّهِ جَعَلَنِي اللَّهُ فِدَاءَكَ. قَالَ وَلَا النَّاسُ يُحِبُّونَهُ لِأَخَوَاتِهِمْ. قَالَ أَفَتُحِبُّهُ لِعَمَّتِكَ؟ قَالَ لَا وَاللَّهِ جَعَلَنِي اللَّهُ فِدَاءَكَ. قَالَ وَلَا النَّاسُ يُحِبُّونَهُ لِعَمَّاتِهِمْ. قَالَ أَفَتُحِبُّهُ لِخَالَتِكَ؟ قَالَ لَا. وَاللَّهِ جَعَلَنِي اللَّهُ فِدَاءَكَ. قَالَ وَلَا النَّاسُ يُحِبُّونَهُ لِخَالَاتِهِمْ. قَالَ فَوَضَعَ يَدَهُ عَلَيْهِ وَقَالَ اللهُمَّ اغْفِرْ ذَنْبَهُ وَطَهِّرْ قَلْبَهُ، وَحَصِّنْ فَرْجَهُ قَالَ فَلَمْ يَكُنْ بَعْدُ ذَلِكَ الْفَتَى يَلْتَفِتُ إِلَى شَيْءٍ.
“এক যুবক রাসূলুল্লাহ ﷺ এর নিকট আসার পর বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আমাকে যিনার অনুমতি দিন! তখন সবাই তার দিকে তাকালো। তাকে ধমকালো। তারা বলল, আশ্চর্য! আশ্চর্য! রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, কাছে এসো। লোকটি কাছে এসে বসল। তারপর তিনি তাকে বললেন, তুমি কি তোমার মায়ের ব্যাপারে এটা পছন্দ করো? সে বলল, আল্লাহর শপথ! না, আল্লাহ আমাকে আপনার জন্য উৎসর্গিত করুন! সে আরো বলল, কোন মানুষই তো তার মায়ের ব্যাপারে এটা পছন্দ করে না। রাসূল ﷺ বললেন, তাহলে তুমি কি তোমার মেয়ের জন্য এটা পছন্দ করো? সে বলল, আল্লাহর শপথ! না, হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহ আমাকে আপনার জন্য উৎসর্গিত করুন! সে আরো বলল, কোন মানুষই তো তার মেয়ের জন্য এমনটা পছন্দ করে না। রাসূল ﷺ বললেন, তাহলে তুমি কি তোমার বোনের জন্য এটা পছন্দ করো? সে বলল, না হে আল্লাহর রাসূল, আল্লাহর শপথ! আল্লাহ আমাকে আপনার জন্য উৎসর্গিত করুন! সে আরও বলল, কোন মানুষই তো তার বোনের জন্য এটা পছন্দ করে না। রাসূল ﷺ বললেন- তাহলে কি তুমি তোমার ফুফুর জন্য এটা পছন্দ করো? সে বলল, আল্লাহর শপথ! না, হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহ আমাকে আপনার জন্য উৎসর্গিত করুন! তিনি বললেন, তাহলে কি তুমি তোমার খালার জন্য এটা পছন্দ করো? সে বলল, না, আল্লাহর শপথ! হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহ আমাকে আপনার জন্য উৎসর্গিত করুন! সে আরও বলল, কোন মানুষই তো তার খালার জন্য এটা পছন্দ করে না। বর্ণনাকারী সাহাবী বলেন, অতঃপর রাসূল তার উপর তার হাত রেখে বলেন, হে আল্লাহ! তার গুণা ক্ষমা কর! তার অন্তর পবিত্র করে দাও! তার লজ্জাস্থান হেফাজত কর! তারপর থেকে এ যুবক আর কোন দিকে তাকাতো না।” [মুসনাদে আহমাদ- ২২২১১]
আরেকটি হাদিসে ইমাম মুসলিম মুআবিয়া ইবনে হাকাম আস-সুলামী থেকে বর্ণনা করেন-
بَيْنَا أَنَا أُصَلِّي مَعَ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، إِذْ عَطَسَ رَجُلٌ مِنْ الْقَوْمِ، فَقُلْتُ يَرْحَمُكَ اللهُ فَرَمَانِي الْقَوْمُ بِأَبْصَارِهِمْ، فَقُلْتُ وَاتُكُلَ أُمِّيَاهُ؛ مَا شَأْنُكُمْ تَنْظُرُونَ إِلَيَّ؟! فَجَعَلُوا يَضْرِبُونَ بِأَيْدِيهِمْ عَلَى أَفْخَاذِهِمْ، فَلَمَّا رَأَيْتُهُمْ يُصَمِّتُونَنِي، لَكِنِّي سَكَتُ، فَلَمَّا صَلَّى رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَبِأَبِي هُوَ وَأُمِّي؛ مَا رَأَيْتُ مُعَلَّمًا قَبْلَهُ وَلَا بَعْدَهُ أَحْسَنَ تَعْلِيمًا مِنْهُ؛ فَوَ اللَّهِ: مَا كَهَرَنِي، وَلَا ضَرَبَنِي، وَلَا شَتَمَنِي، قَالَ إِنَّ هَذِهِ الصَّلَاةَ لَا يَصْلُحُ فِيهَا شَيْءٌ مِنْ كَلامِ النَّاسِ، إِنَّمَا هُوَ التَّسْبِيحُ وَالتَّكْبِيرُ وَقِرَاءَةُ الْقُرْآنِ.
"আমি রাসূল ﷺ-এর সাথে নামায পড়ছিলাম। ইত্যবসরে লোকদের মধ্যে এক ব্যক্তি হাঁচি দিল। আমি তার উত্তরে বললাম, ইয়ারহামুকাল্লাহ! তখন লোকজন আমার প্রতি তীব্র দৃষ্টি নিক্ষেপ করল। আমি বললাম, ধ্বংস তাদের! তোমাদের কি হয়েছে, আমার দিকে দেখছো! তখন তারা তাদের হাত রানে মারতে লাগল। আমি যখন দেখলাম, তারা আমাকে চুপ করতে বলছে, তখন আমি চুপ করলাম। অতঃপর যখন রাসূল ﷺ নামায শেষ করলেন, আমার পিতা মাতা তার জন্য উৎসর্গিত! আমি তার পূর্বে বা পরে তার থেকে উত্তম শিক্ষক কখনো দেখিনি। তিনি আমাকে ধমকও দিলেন না, মারলেনও না, ভর্ৎসনাও করলেন। তিনি বললেন, এ হল নামায, এর মধ্যে মানুষের কথার মত কথাবার্তা বলা যায় না। এতে শুধু তাসবীহ, তাকবীর ও কুরআন পাঠ করতে হয়।" [সহিহ মুসলিম- ৫৩৭]
তার হিকমতের আরেকটি চিত্র হল, হুদায়বিয়ার সন্ধির সময়ের ঘটনা। দাওয়াতের নতুন একটি পর্যায়ের ভিত্তি স্থাপন করতে দলে দলে মানুষের ইসলামে প্রবেশ করার ক্ষেত্রে, বহু দেশ বিজয় করতে এবং আল্লাহর বান্দাদেরকে বান্দাদের রবের ইবাদতে নিয়ে আসার ক্ষেত্রে এর যে বিরাট ফলাফল ছিল তাও এর অন্তর্ভূক্ত। আমাদের নেতারা কখন তাদের নবী ﷺ এর হিকমত থেকে শিক্ষা গ্রহণ করবে? তারা কখন তার আদর্শের উপর চলবে? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআলা বলেন-
لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ لِمَن كَانَ يَرْجُو اللَّهَ وَالْيَوْمَ الْآخِرَ وَذَكَرَ اللَّهَ كَثِيرًا.
“বস্তুত রাসূলের মধ্যে তোমাদের জন্য রয়েছে উত্তম আদর্শ এমন ব্যক্তির জন্য, যে আল্লাহ ও আখেরাত দিবসের আশা রাখে এবং আল্লাহকে অধিক পরিমাণে স্মরণ করে।" [সূরা আহযাব- ২১]
আল্লাহর শপথ! আমি সবচেয়ে বেশি প্রয়োজনবোধ করছি এমন একজন নেতার, যার চিন্তা-চেতনায় মৌলিকভাবে এ গুণগুলো বিদ্যমান থাকবে। আমাদের কত বড় হঠকারিতা ও দুঃসাহসিকতা যে, আমরা এমন কাজে লিপ্ত হই, যা আল্লাহর দ্বীনকে কলঙ্কিত করে! আমি জানি, তাদের মধ্যে অনেক এমন মুসলিম আছে, যারা নম্র অবস্থানকে দুর্বলতা ও শৈথিল্য মনে করে। অনেক সময় একনিষ্ঠ ও দ্বীনের ব্যাপারে আত্মমর্যাদাশীল লোকেরাই এমন হয়, যেমন ছিলেন রাসূলুল্লাহ ﷺ এর সাহাবাগণ।
ইমাম বুখারী রহ. বর্ণনা করেন, নবী ﷺ যখন হুদায়বিয়ার সন্ধির সময় আলী -কে দিয়ে লিখাচ্ছিলেন এবং তাকে বললেন-
فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِسْمِ اللهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ، قَالَ سُهَيْلٌ: أَمَّا الرَّحْمَنُ، فَوَ اللَّهِ مَا أَدْرِي مَا هُوَ وَلَكِنِ اكْتُبْ بِاسْمِكَ اللَّهُمَّ كَمَا كُنْتَ تَكْتُبُ، فَقَالَ المُسْلِمُونَ: وَ الله لا نَكْتُبُهَا إِلَّا بِسْمِ اللهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ، فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: اكْتُبْ بِاسْمِكَ اللَّهُمَّ ثُمَّ قَالَ هَذَا مَا قَاضَى عَلَيْهِ مُحَمَّدٌ رَسُولُ اللَّهِ، فَقَالَ سُهَيْلٌ وَاللَّهِ لَوْ كُنَّا نَعْلَمُ أَنَّكَ رَسُولُ اللَّهِ مَا صَدَدْنَاكَ عَنِ البَيْتِ، وَلَا قَاتَلْنَاكَ، وَلَكِنِ اكْتُبْ مُحَمَّدُ بْنُ عَبْدِ ا الله، فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَاللَّهِ إِنِّي لَرَسُولُ اللَّهِ، وَإِنْ كَذَّبْتُمُونِي، اكْتُبْ مُحَمَّدُ بْنُ عَبْدِ اللهِ.
“লিখ বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম, তখন সুহাইল বলল, রহমান কে! তাকে তো আমরা চিনি না। বরং এভাবে লিখ- বিসমিকা আল্লাহুম্মা। তখন মুসলিমরা বলল, আল্লাহর শপথ! আমরা কিছুতেই বিসমিল্লাহ ছাড়া লিখবো না। তখন নবী ﷺ বললেন, লিখ, বিসমিকা আল্লাহুম্মা। অতঃপর নবীজী বললেন, লিখ, “নিম্নোক্ত বিষয়গুলোর উপর মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সন্ধি করছে”। তখন সুহাইল বলল, আল্লাহর শপথ! আমরা যদি বিশ্বাস করতাম, তুমি আল্লাহর রাসূল, তাহলে তো আমরা তোমাকে বায়তুল্লাহ হতে বাঁধাই দিতাম না, তোমার বিরুদ্ধে যুদ্ধই করতাম না। তাই লিখ মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল্লাহ। নবী বললেন, 'আল্লাহর শপথ! আমি আল্লাহর রাসূল, যদিও তোমরা আমাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন কর। লিখ, মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল্লাহ'।" [সহিহ বুখারি- ২৭৩১]
কিন্তু এই হিকমতই আল্লাহর বিজয়কে তরান্বিত করেছে। আজকে আমাদের কত প্রয়োজন এমন একজন নেতার, যিনি এক্ষেত্রে নবী-এর আদর্শের অনুসরণ করবেন। তার থাকবে বিচক্ষণতা ও দূরদৃষ্টি। সে তড়িৎপ্রবণ হবে না। কারণ যে সময় আসার পূর্বেই কোন জিনিস লাভ করতে চায়, তাকে বঞ্চিত করার মাধ্যমে শাস্তি প্রদান করা হয়।
নিশ্চয়ই মুসলিমদের নেতৃত্ব দেওয়া কোন সহজ বিষয় নয়। এটা কোন সম্মান বা সম্পদের দ্বারা সম্ভব হয় না। বরং এমন প্রজ্ঞাবান লোকদের দ্বারা হয়, যারা নিজেদের কথা ও কাজের পরিণতি বুঝেন। তারা জানবেন, কখন সঠিক সময়ে, সঠিক পদ্ধতিতে একটি সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন। যেমন আবু বকর এর হিকমত ফুটে উঠেছিল, যখন রাসূল ইন্তেকাল করলেন।
ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আবু বকর বের হলেন, তখন উমার লোকদের উদ্দেশ্যে কথা বলছিলেন। আবু বকর বললেন, বসুন, তিনি বসলেন না। তখন আবু বকর শাহাদাত পাঠ করলেন। ফলে সমস্ত মানুষ তার দিকে ঝুঁকে পড়লো। আর উমর কে পরিত্যাগ করল। তারপর তিনি বললেন, আম্মা বা'দ, তোমাদের মধ্যে যে মুহাম্মাদের ইবাদত করত, তার মুহাম্মাদ তো মারা গেছে। আর যে আল্লাহর ইবাদত করত, তার আল্লাহ চিরঞ্জীব, তিনি কখনো মরেন না। আল্লাহ বলেন-
وَمَا مُحَمَّدٌ إِلَّا رَسُولٌ قَدْ خَلَتْ مِن قَبْلِهِ الرُّسُلُ أَفَإِن مَّاتَ أَوْ قُتِلَ انقَلَبْتُمْ عَلَى أَعْقَابِكُمْ وَمَن يَنقَلِبْ عَلَى عَقِبَيْهِ فَلَن يَضُرَّ اللَّهَ شَيْئًا وَسَيَجْزِي اللَّهُ الشَّاكِرِينَ.
“আর মুহাম্মাদ একজন রাসূল ব্যতীত আর কিছুই নন! তাঁর পূর্বে বহু রাসূল গত হয়েছে। তাঁর যদি মৃত্যু হয়ে যায় কিংবা তাকে হত্যা করে ফেলা হয়, তবে কি তোমরা উল্টো দিকে ফিরে যাবে? যে কেউ উল্টো দিকে ফিরে যাবে, সে কখনই আল্লাহর কিছুমাত্র ক্ষতি করতে পারবে না। আর যারা কৃতজ্ঞ বান্দা, আল্লাহ তাদেরকে পুরষ্কার দান করবেন।” [সুরা আলে ইমরান- ১৪৪]
আল্লাহর শপথ! তাদের অবস্থা এমন হল, যেন আবু বকর-এর তিলাওয়াতের পূর্বে তারা জানতই না যে, আল্লাহ এই আয়াত নাযিল করেছিলেন। তখন সমস্ত মানুষ তার থেকে এটা লুফে নিল এবং প্রত্যেককেই এটা তিলাওয়াত করতে শোনা গেল।
নিশ্চয়ই এই কঠিন পরিস্থিতি, যা ইসলামী রাষ্ট্রের ভীত কাঁপিয়ে তুলেছিল এবং আদম এর সৃষ্টি থেকে কিয়ামত পর্যন্ত মানুষের উপর আপতিত বিপদসমূহের মধ্যে সবচেয়ে বড় বিপদ ছিল, এ সময় মুসলমানদের হাল ধরার এবং তাদেরকে ঐক্যবদ্ধ করার জন্য আবু বকর এর অবলম্বনকৃত হিকমাহই ছিল সর্বাধিক কার্যকরী। ইসলামী রাষ্ট্রকে রক্ষা করার ক্ষেত্রে এবং ইসলাম বর্তমান যামানায় আমাদের পর্যন্ত পৌঁছার ক্ষেত্রে এর ভূমিকা ছিল অপরিসীম।
প্রজ্ঞাবান নেতা সে-ই, যে মূখ্য সময়ে উম্মাহ্র জন্য বের হয়ে তার প্রজ্ঞাময় নেতৃত্ব প্রকাশ করে। যে নেতৃত্ব সাহায্য করবে সমাজের মিশ্যাবলী সমাধানে, সমাজকে ঐক্যবদ্ধ করণে, সকলকে এক সূতোয় আবদ্ধ করণে এবং সেই শত্রুদের মোকাবিলায় মুসলিমদের কাতারসমূহ সুদৃঢ় করণে, যারা সর্বদা মুসিলমদেরকে নিশ্চিহ্ন করার জন্য, এবং মুসলিমদের থেকে ও মুসলিমদের একমাত্র রক্ষাকবচ দ্বীনে ইসলাম থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য উপযুক্ত সময়ের অপেক্ষায় থাকে।
নবী এর প্রজ্ঞাময় অবস্থান ও আদর্শ রাজনীতির উদাহরণ হচ্ছে, তিনি মুনাফিক সরদার আব্দুল্লাহ ইবনে উবাইয়ের কষ্ট সহ্য করেছেন, তবু তাকে হত্যা করেননি।
হযরত উমর এর হিকমতের নমুনা হচ্ছে, তিনি তার পরিবারবর্গের ব্যাপারে কঠিন ছিলেন। একারণে যখন তিনি মুসলমানদেরকে কোন কল্যাণ, সফলতা ও সংশোধনের বিষয়ে আদেশ বা নিষেধ করতে চাইতেন, তখন তিনি সর্বপ্রথম তার পরিবারবর্গের মাধ্যমে তা আরম্ভ করতেন, তাদেরকে প্রথমে উপদেশ দিতেন এবং বিপরীত করলে প্রথমে তাদেরকে শাস্তির হুমকি শুনাতেন।
যেমন- সালিম ইবনে আব্দুল্লাহ ইবনে উমার থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, উমার যখন মিম্বারে উঠতেন এবং মুসলমানদেরকে কোন বিষয়ে নিষেধ করতেন, তখন তিনি তার পরিবারবর্গকে জমা করে বলতেন, আমি মানুষকে এই এই বিষয় থেকে নিষেধ করেছি, আর মানুষ তোমাদের দিকে এমনভাবে তাকাচ্ছে, যেমন পাখি গোশতের দিকে তাকিয়ে থাকে। আল্লাহর শপথ! আমি যদি তোমাদের কাউকে এটা করতে দেখি, তাহলে দ্বিগুণ শাস্তি দিব। এটাই হচ্ছে সবচেয়ে বড় হিকমতপূর্ণ অবস্থান। কেননা মানুষ নেতা ও শাসকদের প্রতি লক্ষ্য করে। তাদের নীতি, প্রজাদের পূর্বে নিজ পরিবারের ক্ষেত্রে তাদের অবস্থান এবং তারা যার প্রতি আহ্বান করে, তার কার্যগত ও মৌখিক বাস্তবায়নের প্রতি লক্ষ্য করে। অনুরূপ স্বীয় পরিবার ও অধীনস্তদের ক্ষেত্রে তার বাস্তবায়ন দেখে।