📘 যেমন ছিলেন তাঁরা > 📄 নিফাকের কয়েকটি আলামত

📄 নিফাকের কয়েকটি আলামত


মিথ্যা কথা বলা, আমানতের খেয়ানত করা, ওয়াদা খেলাপ করা, মিথ্যা কসম করা এবং প্রতিশ্রুতি দিলে গাদদারি করা।
ইসলামের মৌলিক-বিষয়াদি তথা কুরআন-সুন্নাহ নিয়ে ঠাট্টা করা এবং নেককার ও উত্তম ব্যক্তিদের নিয়ে ঠাট্টা করা।
নামাজে অলসতা করা: মসজিদের প্রতিবেশী হওয়া সত্ত্বেও মসজিদে না যাওয়া। আর সেখানে নামাজ না পড়ার চেয়ে বড় মুনাফিক্বী আর কী আছে?!
লোক দেখানো আমল করা এবং খ্যাতি কামনা করা।
আল্লাহর যিকির কম করা।
আল্লাহর ক্রোধের বিষয়সমূহকে পছন্দ করা।
আরবি ব্যতীত অন্য ভাষা পছন্দ করা:
শাইখুল ইসলাম রহ. বলেন, যে কোনো উপকারী কারণ ব্যতীতও আরবি ছাড়া অন্য কোনো ভাষা শেখে- সেই ভাষার প্রতি বিমুখতার কারণে এবং আরবি ভাষার ক্ষতি সাধনের উদ্দেশ্যে, এটা তার নিফাকের আলামত। এটা ঈমানের ত্রুটি ও ঈমানকে কম মূল্যায়ন করার ফলে সৃষ্টি হয়।
জিহাদ পরিত্যাগ করা নিফাকের আলামত: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন- مَنْ مَاتَ وَلَمْ يَغْزُ وَلَمْ يُحَدِّثْ بِهِ نَفْسَهُ مَاتَ عَلَى شُعْبَةٍ مِّنْ نِّفَاقٍ “যে ব্যক্তি জিহাদ না করে বা জিহাদের সংকল্পও না করে মৃত্যুবরণ করল, সে নিফাকের একটি শাখার উপরে মৃত্যুবরণ করল।”
ইমাম নববী রহ. বলেন, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো- যারা এমনটা করে, তারা এ বৈশিষ্ট্যের ক্ষেত্রে জিহাদ হতে পশ্চাতে অবস্থানকারী মুনাফিকদের মতো। কারণ, জিহাদ পরিত্যাগ করা নিফাকের একটি অংশ।
আরেকটি নিফাক হলো: নামাজকে সঠিক সময় থেকে বিলম্ব করে পড়া: যারা নামাজকে সঠিক সময় থেকে বিলম্ব করে পড়ে, আল্লাহ তাআলা তাদেরকে ধ্বংসের ও কঠিন শাস্তির সতর্কবার্তা দিয়েছেন।
আল্লাহ তাআলা বলেন- فَوَيْلٌ لِلْمُصَلِّينَ الَّذِينَ هُمْ عَنْ صَلَاتِهِمْ سَاهُونَ “তবে দুর্ভোগ ঐ নামাজীদের; যারা তাদের নামাজে অলসতা করে।”
অর্থাৎ সঠিক সময় থেকে বিলম্ব করে এবং একেবারে সময়ের পর আদায় করে; যেমনটা ইমাম মাসরূক রহ. বলেছেন। এটা মুনাফিকদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। একদল লোক আসরের নামাজ বিলম্ব করে পড়েছিল, দেখুন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের ব্যাপারে বলতেন- تِلْكَ صَلَاةُ الْمُنَافِقِ، تِلْكَ صَلَاةُ الْمُنَافِقِ، تِلْكَ صَلَاةُ الْمُنَافِقِ، يَجْلِسُ يَرْقُبُ الشَّمْسَ حَتَّى إِذَا كَانَتْ بَيْنَ قَرْنَيِ الشَّيْطَانِ قَامَ فَنَقَرَ أَرْبَعًا لَا يَذْكُرُ اللَّهَ فِيهَا إِلَّا قَلِيلًا “এটা মুনাফিকের নামাজ। এটা মুনাফিকের নামাজ। এটা মুনাফিকের নামাজ। সে বসে বসে সূর্যের অপেক্ষা করে। যখন সূর্য শয়তানের দুই শিংয়ের মাঝ বরাবর আসে, তখন নামাজে দাঁড়িয়ে চারটি ঠোকর মেরে চলে যায়; যার মাঝে আল্লাহ্র স্মরণ থাকে অতি সামান্যই।”
আল্লাহর কাজে যারা নিষ্প্রাণ তাদেরও তিরস্কার করা:
ইবনে কাসীর রহ. বলেন, আল্লাহ্র জন্য আমলকারীদেরকে তিরস্কার করা মুনাফিকদের একটি বৈশিষ্ট্য। তাদের বিদ্রোহ এবং তিরস্কার থেকে কখনোই কেউ নিরাপদ থাকে না।
নেককাজে ভয় পেশ করা এবং ইসলাম ও মুসলিমদের উপকারী কাজে প্রতিযোগিতা না করাও মুনাফিকের একটি বৈশিষ্ট্য। আল্লাহ্র শপথ! আমরা নিজেদের ব্যাপারে এবং আমাদের ভাইদের ব্যাপারে এ ভয়ঙ্কর কৃষ্ণভাবের আশঙ্কা করি; যার ব্যাপারে মুসলিমগণ উপলব্ধি করে না।
আপনারা এ আয়াতটির ব্যাপারে চিন্তা করুন, যেটা বনী সালামা গোত্রের জাদ ইবনে ক্বায়েসের ব্যাপারে নাযিল হয়েছে। একদা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন- হে জাদ! তুমি কি এ বছর রোমান বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে পারবে? সে ওপর পেশ করল, যেমনটা আল্লাহ তাআলা বলেছেন- وَمِنْهُم مَّن يَقُولُ اذَن لِّي وَلَا تَفْتِنِّي ۚ أَلَا فِي الْفِتْنَةِ سَقَطُوا ۗ وَإِنَّ جَهَنَّمَ لَمُحِيطَةٌ بِالْكَافِرِينَ “আর তাদের মধ্যে কেউ বলে, আমাকে অব্যাহতি দিন এবং আমাকে ফেতনায় ফেলেন না। জেনে রেখ, ফেতনায় তারা পড়েই আছে। নিশ্চয়ই জাহান্নাম কাফেরদেরকে বেষ্টন করে রয়েছে।”
আল্লাহ তাআলা বলেন- إِنَّمَا يَسْتَأْذِنُكَ الَّذِينَ لَا يُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ وَارْتَابَتْ قُلُوبُهُمْ فَهُمْ فِي رَيْبِهِمْ يَتَرَدَّدُونَ “তোমার কাছে জিহাদ না করার অনুমতি তো তারা চায়, যারা আল্লাহ ও শেষ দিবসে ঈমান রাখে না এবং তাদের অন্তর সন্দেহে নিপতিত। ফলে তারা নিজেদের সন্দেহের ভেতর দোদুল্যমান।”
আল্লামা তাবারী রহ. এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, এখানে আল্লাহ তাআলা তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে যে মুনাফিকদের আলামত জানিয়ে দিচ্ছেন। যে নিদর্শনের মাধ্যমে তাদেরকে চেনা যাবে: তা হচ্ছে- যখন তাদেরকে অভিযানে বের হওয়ার জন্য বলা হয়, তখন তারা বিভিন্ন মিথ্যা অজুহাত দেখিয়ে রাসূলের কাছে অনুমতি নিয়ে আল্লাহর পথে জিহাদ থেকে পিছু থাকার চেষ্টা করবে।
আল্লাহ তাআলা তাঁর রাসূল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলছেন- হে মুহাম্মাদ! তুমি যখন তোমার শত্রুদের বিরুদ্ধে জিহাদ বের হও, তখন যদি কেউ খবর ব্যতীতও জিহাদ থেকে পিছিয়ে থাকতে তোমার নিকট অনুমতি প্রার্থনা করে; তাহলে তুমি অনুমতি দেবে না। কারণ, এ ব্যাপারে তোমার নিকট অনুমতিও চায় শুধু মুনাফিকরাই; যারা আল্লাহ ও পরকালকে বিশ্বাস করে না।
আমর বিল মা'রূফ ও নাহই আনিল মুনকার বর্জন করা নিফাক্বির আলামত:
আল্লাহ তাআলা বলেন- الْمُنَافِقُونَ وَالْمُنَافِقَاتُ بَعْضُهُمْ مِنْ بَعْضٍ يَأْمُرُونَ بِالْمُنْكَرِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْمَعْرُوفِ وَيَقْبِضُونَ أَيْدِيَهُمْ نَسُوا اللَّهَ فَنَسِيَهُمْ إِنَّ الْمُنَافِقِينَ هُمُ الْفَاسِقُونَ “মুনাফিক পুরুষ ও মুনাফিক নারী সকলেই একে অন্যের মতো। তারা মন্দ কাজের আদেশ করে এবং ভালো ভালো কাজে বাধা দেয় এবং নিজেদের হাত বন্ধ করে রাখে। তারা আল্লাহকে ভুলে গেছে। আল্লাহও তাদেরকে ভুলে গেছেন। নিশ্চয়ই মুনাফিকরা পাপিষ্ঠ।”
মুসলমানদেরকে নিয়ে ঠাট্টা করা: তাদের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো, তারা মুসলমানদেরকে নির্বোধ, স্বল্প জ্ঞানসম্পন্ন ও স্বল্প চিন্তাশীল বলে। আর তারা নিজেদেরকে মনে করে সঠিক চিন্তার অধিকারী। আল্লাহ তাআলা বলেন- وَإِذَا قِيلَ لَهُمْ آمِنُوا كَمَا آمَنَ النَّاسُ قَالُوا أَنُؤْمِنُ كَمَا آمَنَ السُّفَهَاءُ “যখন তাদেরকে বলা হয়, লোকেরা যেরূপ ঈমান এনেছে, তোমরা সেরূপ ঈমান আন, তখন তারা বলে- নির্বোধরা যেরূপ ঈমান এনেছে, আমরা কি সেরূপ ঈমান আনব?”

টিকাঃ
১১০৭. সহীহ বুখারী: ২৪৫৫; সহীহ মুসলিম: ৫৮
১১০৮. সহীহ মুসলিম: ১৯১০
১১০৯. সূরা মাউন: ৪-৫
১১২০. সহীহ মুসলিম
১১২১. সূরা তাওবা: ৪৯
১১২১. সূরা তাওবা: ৪৫
১১০. সূরা তওবা: ৬৭
১১৪. সূরা বাকারা: ১৩

📘 যেমন ছিলেন তাঁরা > 📄 সালাফে সালেহীন নিফাকির আশঙ্কা করতেন

📄 সালাফে সালেহীন নিফাকির আশঙ্কা করতেন


হাফেজ ইবনে রজব রহ. বলেন, সাহাবাগণ ও তাঁদের পরবর্তী সালাফে সালেহীন নিজেদের ব্যাপারে মুনাফেকীর আশঙ্কা করতেন। এ কারণে তাঁরা প্রচণ্ড চিন্তা ও পেরেশানি অনুভব করতেন। এজন্য একজন মুমিন ব্যক্তি নিজের ওপর ছোট নিফাকির আশঙ্কা করবে এবং এ আশঙ্কা করবে যে, পাছে তা পরিণামে তার ওপর প্রবল হয়ে বড় নিফাকির রূপ ধারণ করে কি না? যেমনটা পূর্বে অতিবাহিত হয়েছে যে, সব মন্দ মন্দের ছিটেফোঁটাই পরিণতিতে মন্দ পরিসমাপ্তির কারণ হয়।
ওমর ইবনুল খাত্তাব রাযি. হুযায়ফা রাযি. কে বলেন, হে হুযায়ফা! আমি তোমাকে আল্লাহর দোহাই দিয়ে বলছি- বলো, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কি তোমার নিকট তাদের (মুনাফিকদের) মধ্যে আমার নামও উল্লেখ করেছেন? তিনি বললেন, না; তবে এরপর আর কাউকে আমি এমনটা বলব না।
হাসান বসরী রহ. বলেন, আমি যদি জানতে পারি যে, আমি নিফাক থেকে মুক্ত, তাহলে এটাই আমার নিকট পুরো পৃথিবী থেকে উত্তম হবে।
ইবনে আবী মুলাইকা রহ. বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ত্রিশজন সাহাবীকে পেয়েছি, প্রত্যেকেই নিজের ব্যাপারে মুনাফিকীর আশঙ্কা করতেন।
হাসান বসরী রহ. বলেন, নিফাক হলো- ভেতর-বাহির বা কথা-কাজে মিল না থাকা।
নিফাক থেকে সবচেয়ে দূরে যে: উফফারার আযাদকৃত গোলাম থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, মানুষের মধ্যে নিফাক থেকে সর্বাধিক দূরে সেই ব্যক্তি, যে নিজের ব্যাপারে সর্বাধিক নিফাকীর ভয় করে। যে মনে করে, তাকে এ থেকে মুনাফিককারী কিছু নেই। আর তার (নিফাকের) সবচেয়ে নিকটবর্তী হলো, যাকে তার মধ্যে অবিদ্যমান গুণের প্রশংসা করা হলো, তার মন খুশি হয় এবং সে তা গ্রহণ করে নেয়।
নিফাকি কান্না: চোখ দিয়ে অশ্রু বের হবে; কিন্তু অন্তর থাকবে শক্ত। সে বিনয় প্রকাশ করবে; কিন্তু সে-ই হবে সর্বাধিক কঠিন অন্তরের অধিকারী।
যদি মুনাফিকরা ধ্বংস হয়ে যেত: হুযায়ফা রাযি. এক ব্যক্তিকে বলতে শুনলেন, হে আল্লাহ! মুনাফিকদেরকে ধ্বংস করুন! তিনি বললেন, হে ভাতিজা! মুনাফিকরা সব যদি ধ্বংস হয়ে যেত; তাহলে তুমি রাস্তায় পথচারী স্বল্পতায় একাকীত্ববোধ করতে।
সত্যবাদী ব্যক্তি নিজের ব্যাপারে নিফাকির আশঙ্কা করে।
মুনাফিকই কেবল নিফাক থেকে নিশ্চিত হয়ে যায়। আর মুমিনই কেবল নিফাকির আশঙ্কা করে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00