📄 আল্লাহর নিকট যাওয়ার প্রস্তুতি
আর এটাই সকল প্রকার সফলতার চাবিকাঠি, আলোর উৎস। তখনই তার অন্তর আল্লাহর সন্তুষ্টির বিষয়গুলো জানার জন্য জেগে উঠবে এবং তা সম্পাদন করার মাধ্যমে আল্লাহ্র নৈকট্য অর্জন করবে। আর আল্লাহ্র অসন্তুষ্টির বিষয়গুলো থেকে বেঁচে থাকবে। আর এটাই তার সদিচ্ছার আলামত।
📄 সালাফের আখিরাত চিন্তার কিছু নমুনা
সুফিয়ান সাওরী রহ. বলেন, আমি সুফিয়ানকে অনেক রাতে দেখেছি, ভীত-সন্ত্রস্ত অবস্থায় জাগ্রত হয়ে চিৎকার করে বলে উঠত- আগুন! আগুন! জাহান্নামের চিন্তা আমাকে ঘুম ও ভোগ-বিলাস থেকে বিরত রেখেছে।
আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাযি. একবার কামারের হাপরের নিকট দিয়ে অতিক্রম করলেন। তখন সেখানে আগুন দেখে তাঁর মনে ভয় জাগল। তিনি প্রায়ই কামারদের পাশ দিয়ে অতিক্রম করতেন। আর জ্বলন্ত লোহা দেখে পরকালের চিন্তায় ক্রন্দন করতেন। এমনই ছিল সাহাবায়ে কেরাম ও আমাদের পূর্বসূরিদের আখিরাতভাবনা।
তাঁরা জীবনের প্রতিটি সময়ে গণীমত মনে করতেন:
দুনিয়া বিরাগিণীগণ বলেন, আমি এমন কারও কথা ভাবতে পারি না, যে জান্নাত-জাহান্নামের কথা শোনার পর তাঁর একটি মুহূর্ত আল্লাহর আনুগত্য তথা যিকির, নামাজ, কুরআন তিলাওয়াত বা ইহসান ব্যতীত কাটাবে। তখন এক ব্যক্তি তাকে বলল, আমি সবচেয়ে বেশি কাঁদি। তিনি বললেন, তুমি নিজ গুনাহের কথা স্বীকার করে হাসোও, তবুও তা মানুষকে নিজের আমল বলে বেড়ানোর পর কাঁদার থেকে ঢের উত্তম। আমল-প্রচারকারী ব্যক্তির আমল তার মাথার উপরেই ওঠে না।
তখন উক্ত লোকটি বলল, আমাকে উপদেশ দিন। তিনি বললেন, তুমি দুনিয়াকে দুনিয়াদারদের জন্য ছেড়ে দাও; যেমন তারা আখিরাতকে আখিরাতকামীদের জন্য ছেড়ে দিয়েছে। দুনিয়াতে তুমি মৌমাছি হয়ে বাস করো, যে কিছু খেলে হালাল খায়, অন্যকে কিছু আহার করালে হালাল আহার করায়; কোনো কিছুর উপর পড়লে তা ভেঙে ফেলে না এবং তার ওপর দাগাও কাটে না।
আল্লাহর নিকট সাক্ষাতের চিন্তা:
তোমার সব চিন্তাকে এক চিন্তায় রূপান্তরিত কর: আর তা হলো, আখিরাতের চিন্তা, আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাতের চিন্তা এবং তাঁর সামনে দণ্ডায়মান হওয়ার চিন্তা।
বান্দা স্মরণ করবে যে, সে আল্লাহর নিকট ফিরে যাবে। আরও স্মরণ করবে যে, প্রত্যেক শুক্রবারে শেষ আছে, মৃত্যুর পর তার তওবার কোনো সুযোগ নেই এবং মৃত্যুর পর জান্নাত-জাহান্নাম ছাড়া কোনো বাসস্থান নেই। সুতরাং মানুষ যখন চিন্তা করবে- জীবন শেষ হয়ে যাবে, ভোগসামগ্রী ধ্বংস হয়ে যাবে এবং এগুলো হলো ধোঁকা ও চোখের পর্দা, তখন আল্লাহ্র শপথ! এ স্মরণই তাকে দুনিয়াকে তুচ্ছজ্ঞান করতে এবং সত্য ও আত্মপ্রকাশিত দুনিয়ার রবের দিকে মনোযোগ সৃষ্টিতে উদ্বুদ্ধ করবে। তখন তার হৃদয় বিগলিত হবে। যখন সে কবরগুলোর দিকে দৃষ্টি দেবে এবং কবরবাসীদের অবস্থা চিন্তা করবে, তখন তার অন্তর ভেঙে যাবে। আর তার অন্তর হবে কঠোরতা ও প্রবঞ্চনা থেকে সব থেকে বেশি মুক্ত। আল্লাহ্র নিকটই একমাত্র আশ্রয়!
তোমার অন্তর আখিরাতের চিন্তায় ব্যস্ত নয়, নাকি তুমি আখিরাত ভুলে গেছ? ফলে ঐ সকল লোকের মতো হয়ে গেছ; যারা নামাজ পড়েও পড়ে না। কেবল মাথা দিয়ে টোকার মারে; কিন্তু জানে না, সে কী নামাজ পড়ছে? ইমাম কী কেরাআত পাঠ করেছে? সে একটি দিনও এমন স্মরণ করতে পারে না, যাতে কুরআন পাঠই হৃদয়ে প্রকল্পিত হয়েছে।
📄 আখিরাতের চিন্তা লালনকারীদের বৈশিষ্ট্যাবলি
১. আত্মসংশোধন: এটাই দুনিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এ এক আল্লাহ্র ইবাদত করা, তাঁর সাথে কাউকে শরিক না করা। তারা জানে- আল্লাহ্ দয়া করেন, ক্ষমা করেন, মার্জনা করেন; কিন্তু তারা তাঁর ওপর ভরসা করে বসে থাকে না। বরং ছোট থেকে ছোট গুনাহ, ত্রুটি-বিচ্যুতি ও অবহেলা-আলস্যর জন্য অনুতপ্ত হয়। কারণ, তারা জানে- যে সত্তার নাফরমানি করা হচ্ছে; তিনি হচ্ছেন মহান পরাক্রমশালী আল্লাহ্। আপনি তাদেরকে দেখবেন, তারা মুসলিমদের বিপদাপদ ও তাদের ওপর আপতিত জুলুম ও সীমালঙ্ঘনের কারণে চিন্তিত হয়। কারণ, তাদের অন্তরসমূহ পরকালের চিন্তার ফলে মায়ামমতায় ভরে গেছে। যে চিন্তায় তাদের হৃদয়সমূহ ছেয়ে নিয়েছে।
২. সার্বক্ষণিক হিসাব-নিকাশ: পরকালীন চিন্তাসম্পন্ন ব্যক্তিকে দেখতে পাবেন, সর্বদা নিজের প্রতিটি কথা ও কাজের হিসাব নিকাশ করে।
হাসান বসরি রহ. আল্লাহর বাণী- أَنَا أُقْسِمُ بِالنَّفْسِ اللَّوَّامَةِ “এবং শপথ করছি তিরস্কারকারী নফসের।” এর তাফসীরে বলেন, আল্লাহ্র শপথ! এটা হচ্ছে মুমিনের নফস। প্রতিটি মুমিনই নিজেকে ভর্ৎসনা করতে থাকে, আমার এ কথাটির উদ্দেশ্য কী? আমার এ ভাবনাটির উদ্দেশ্য কী? কিন্তু পাপাচারী নিজের হিসাব করে না।
কিন্তু এ চিন্তা ও মুরাকাবা (আত্মসমালোচনা) তাদেরকে এমন শিকলে বেঁধে ফেলে যা যে, মসজিদের কোনায় বা ঘরে বসে শুধু নিজের জন্য কাঁদতে থাকবে আর ভ্রান্ত ও পথভ্রষ্ট লোকদের ব্যাপারে ভাবেবে না, তাদেরকে সংশোধন করবে না, নিজের আশপাশের লোকদের মন্দ কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ করবে না। বরং তাদের অন্তরে যে চিন্তা থাকবে, তা-ই তাদেরকে এ কাজে উদ্বুদ্ধ করবে। ফলে নিজেদেরকে সংশোধন করবে, অন্যদেরকে সংশোধন করবে এবং বিপদাপদ ও কষ্ট-মুসীবত সহ্য করবে।
৩. মৃত লোকদের দৃশ্য ও তাদের অবস্থা দেখে শিক্ষা গ্রহণ: তারা তাদের জীবন্ত অবস্থার কারণে প্রতিটি দুনিয়াবী বিষয়কে আখিরাতের সাথে সম্পৃক্ত করবে। অন্যেরা মৃত্যুতে তাদেরকে নিজেদের মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে আসার কথা স্মরণ করিয়ে দেবে। ফলে তা তাদের পরকালীন আমলের গুরুত্ব বাড়িয়ে তুলবে। তারা পরকালের জন্য আমল সঞ্চয় করতে থাকবে, যা তাদেরকে জান্নাতের উন্নত স্তরে নিয়ে যাবে।