📘 যেমন ছিলেন তাঁরা > 📄 জান্নাতীদের বৈশিষ্ট্য

📄 জান্নাতীদের বৈশিষ্ট্য


সুতরাং একজন মুসলিমের ওপর আবশ্যক- সে উদারতা ও অন্তরের স্বচ্ছতা শিক্ষা গ্রহণ করবে। এটা হচ্ছে জান্নাতীদের বৈশিষ্ট্য। আল্লাহ তাআলা বলেন-
وَنَزَعْنَا مَا فِي صُدُورِهِمْ مِنْ غِلٍّ إِخْوَانًا عَلَى سُرُرٍ مُتَقَابِلِينَ
“তাদের অন্তরে যে হিংসা-বিদ্বেষ থাকবে, তা দূর করে দেব। তারা ভাই-ভাইরূপে সামনাসামনি আসনে বসবে।”

টিকাঃ
৪২. সূরা হিজর: ৪৭

📘 যেমন ছিলেন তাঁরা > 📄 হৃদয়ে স্বচ্ছতা আনয়নের কিছু উপায়

📄 হৃদয়ে স্বচ্ছতা আনয়নের কিছু উপায়


০১. ইখলাস: ইখলাস হচ্ছে আল্লাহর নিকট যা আছে তার জন্য আকাঙ্ক্ষিত হওয়া আর দুনিয়া ও এর চাকচিক্য থেকে নিরাসক্ত হওয়া।
০২. আল্লাহর বণ্টনের ওপর সন্তুষ্টি: ইবনুল কাইয়্যাম রহ. বলেন, আল্লাহর বণ্টনে সন্তুষ্টি হৃদয়ে স্বচ্ছতার দুয়ার খুলে দেয়। তা অন্তরকে ধোঁকা, প্রতারণা ও হিংসা থেকে মুক্ত ও পরিছন্ন করে। কেউ আল্লাহর নিকট মুক্ত অন্তর নিয়ে আসা ব্যতীত আল্লাহর আযাব থেকে মুক্তি পাবে না। আর আল্লাহর ক্রোধ ও অসন্তুষ্টির সাথে হৃদয়ের স্বচ্ছতা অর্জন অসম্ভব। যখনই বান্দা আল্লাহর বণ্টনে সর্বাাধিক সন্তুষ্ট থাকবে, তখন তার হৃদয়ও তত বেশি পরিছন্ন হবে। তাই কেউ আল্লাহর কিতাবে চিন্তা করলে দেখতে পাবে, আল্লাহ তাআলা পূত-পবিত্র হৃদয়ের অধিকারী লোকদের জন্য কী প্রস্তুত করে রেখেছেন। আল্লাহ তো সংকল্পশীলদের গুণ বর্ণনা করেছেন। তাঁরা প্রার্থনা করে, হে আমাদের রব! আমাদের অন্তরে মুমিনদের ব্যাপারে কোনো ধরনের হিংসা-বিদ্বেষ অবশিষ্ট রাখবেন না।
০৩. কুরআন পাঠ ও তাতে চিন্তা করা: এটি সর্বোত্তমের মধ্যে অন্যতম। আর বঞ্চিত সে-ই, যে আল্লাহর কিতাবের চিকিৎসা গ্রহণ করে না। আল্লাহ তাআলা বলেন- قُلْ هُوَ لِلَّذِينَ آمَنُوا هُدًى وَشِفَاءٌ “বলুন, তা ইমানদারদের জন্য পথনির্দেশনা এবং আরোগ্য।”
০৪. হিসাব ও শাস্তিকে স্মরণ করুন: مَا يَلْفِظُ مِنْ قَوْلٍ إِلَّا لَدَيْهِ رَقِيبٌ عَتِيدٌ “মানুষ যে কথাই উচ্চারণ করে, তার জন্য একজন প্রহরী নিযুক্ত আছে, (যে তা লিপিবদ্ধ করার জন্য) সদা প্রস্তুত।”
সুতরাং যে নিশ্চিতভাবে বিশ্বাস করে যে, তাকে প্রত্যেকটি বিষয়ে জিজ্ঞেস করা হবে এবং তার থেকে হিসাব নেওয়া হবে; তার নিকট দুনিয়া তুচ্ছ হয়ে যাবে, দুনিয়ার সব বিষয় থেকে সে নিরাসক্ত হয়ে যাবে এবং ঐ সকল কাজ করতে থাকবে; যা তাকে আল্লাহর নিকট উপকৃত করবে।
৩৯. মুসলমানের জন্য আল্লাহর, নিজের জন্যও এই দুআ করা এবং তার মুসলিম ভাইদের জন্যও এই দুআ করা-
وَالَّذِينَ جَاءُوا مِنْ بَعْدِهِمْ يَقُولُونَ رَبَّنَا اغْفِرْ لَنَا وَلِإِخْوَانِنَا الَّذِينَ سَبَقُونَا بِالْإِيمَانِ وَلَا تَجْعَلْ فِي قُلُوبِنَا غِلًّا لِلَّذِينَ آمَنُوا رَبَّنَا إِنَّكَ رَءُوفٌ رَحِيمٌ
“এবং যারা তাদের পর এসেছে, যারা বলে, হে আমাদের প্রতিপালক! ক্ষমা কর আমাদেরকে এবং আমাদের সেসব ভাইকে; যারা পূর্বে ঈমান এনেছে এবং আমাদের অন্তরে ঈমানদারদের প্রতি কোনো হিংসা-বিদ্বেষ রেখো না। হে আমাদের প্রতিপালক! তুমি অতি মমতাবান, পরম দয়ালু।”
৩৯. সুধারণা করা এবং মানুষের কথা ও অবস্থানকে উত্তম বলে বিবেচনা করা: আল্লাহ তাআলা বলেন-
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اجْتَنِبُوا كَثِيرًا مِنَ الظَّنِّ إِنَّ بَعْضَ الظَّنِّ إِثْمٌ
“হে ঈমানদারগণ! তোমরা অনেক ধারণা থেকে বেঁচে থাক। নিশ্চয়ই কতক ধারণা গুনাহ।”
উমর রাযি. বলেন, তুমি তোমার মুসলিম ভাইয়ের কথাকে এ অবস্থায় মন্দ প্রয়োগক্ষেত্রে নিয়ে যেয়ো না, যখন তুমি তার অসংখ্য ভালো প্রয়োগক্ষেত্র পাচ্ছ।
৪০. সালামের প্রসার করা: আবু হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-
لَا تَدْخُلُونَ الْجَنَّةَ حَتَّى تُؤْمِنُوا، وَلَا تُؤْمِنُوا حَتَّى تَحَابُّوا، أَوَلَا أَدُلُّكُمْ عَلَى شَيْءٍ إِذَا فَعَلْتُمُوهُ تَحَابَبْتُمْ؟ أَفْشُوا السَّلَامَ بَيْنَكُمْ
“তোমরা ততক্ষণ পর্যন্ত জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না, যতক্ষণ না ঈমান আনয়ন করবে। আর ততক্ষণ পর্যন্ত ঈমানদার হতে পারবে না, যতক্ষণ না পরস্পরকে ভালোবাসবে। আমি কি তোমাদের এমন জিনিস বলে দেব না, যা তোমাদের পরস্পরের মাঝে ভালোবাসা সৃষ্টি করবে? তোমরা নিজেদের মধ্যে সালামের প্রসার ঘটাও।”
আমিরুল মুমিনীন উমর ইবনুল খাত্তাব রাযি. বলেন- তিনটি জিনিস তোমার প্রতি তোমার ভাইয়ের ভালোবাসা সৃষ্টি করবে। সাক্ষাতে প্রথমে তাকে সালাম দেবে, মজলিসে তার জন্য জায়গা করে দেবে এবং তাকে তার সবচেয়ে পছন্দনীয় নামে ডাকবে।
৪১. মুসলমানের জন্য কল্যাণ কামনা করা: আনাস রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-
لَا يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّى يُحِبَّ لِأَخِيهِ - أَوْ قَالَ: لِجَارِهِ - مَا يُحِبُّ لِنَفْسِهِ
“তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না তার প্রতিবেশীর জন্য অথবা (বলেছেন) তার ভাইয়ের জন্য ঐ জিনিসই পছন্দ করবে; যা সে নিজের জন্য পছন্দ করে।”
মুসলমানদের জন্য কল্যাণ কামনার অন্যতম উপায় হলো, তাদের জন্য দুআ করা।
ইবনুল কায়্যিম রহ. বলেন, যেমনভাবে সে পছন্দ করে, তার মুসলিম ভাই তার জন্য দুআ করুক, তেমনিভাবে তারও উচিত তার মুসলিম ভাইয়ের জন্য দুআ করা। তাই সর্বদাই এ দুআ করতে থাকবে-
رَبِّ اغْفِرْ لِي وَلِوَالِدَيَّ وَلِلْمُسْلِمِينَ وَالْمُسْلِمَاتِ وَالْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ
“হে আল্লাহ! আমাকে, আমার পিতা-মাতাকে এবং সমস্ত মুসলিম-মুসলিমাত ও মুমিন-মুমিনাতকে ক্ষমা করে দাও।”
আমাদের সালাফ সর্বদা প্রত্যেকের জন্য এ দুআ করা পছন্দ করতেন।
আমি আমাদের শায়খ ইবনে তাইমিয়্যা রহ. কে এ দুআটি আলোচনা করতে শুনেছি এবং তিনি এর অনেক ফযীলত ও উপকারিতা বর্ণনা করেছেন; যা এখন আমার মনে নেই। সম্ভবত এ দুআ তাঁর সেসব আযকার অন্তর্ভুক্ত ছিল, যার ব্যাপারে তিনি ত্রুটি করতেন না। আমি তাঁকে এ কথাও বলতে শুনেছি যে, দুই সিজদার মাঝখানেও এটা বলা জায়েয আছে।

টিকাঃ
৪৩. সূরা হা-মীম সাজদা: ৪৪
৪৪. সূরা ক্বফ: ১৮
৪৪. সূরা হাশর: ১০
৪৫. সূরা হুজুরাত: ১২
৪৬. সহীহ মুসলিম: ৫৪
৪৭. সহীহ মুসলিম: ৫৪

📘 যেমন ছিলেন তাঁরা > 📄 নির্মল অন্তর

📄 নির্মল অন্তর


ইবনুল আরাবী রহ. বলেন, হৃদয় নির্মল হতে পারে না, যখন তাতে হিংসা, বিদ্বেষ, আত্মবিমুখতা ও অহংকার বিরাজ করে। কারণ, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঈমানের জন্য শর্ত করেছেন যে, মুমিন তার ভাইয়ের জন্য তা-ই পছন্দ করবে; যা সে নিজের জন্য পছন্দ করে।
ইবনে সিরীন রহ. কে জিজ্ঞেস করা হলো, নির্মল অন্তর কী? তিনি বললেন, “আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য তাঁর সৃষ্টির ব্যাপারে কল্যাণ কামনা করা।”
শাইখুল ইসলাম রহ. বলেন, স্বচ্ছ ও প্রশংসিত হৃদয় হলো- যা শুধু ভালো চায়, মন্দ চায় না। আর তার মধ্যে পূর্ণাঙ্গতা হলো- ভালো-মন্দ বুঝা। যে মন্দটা বুঝে না, তার মাঝে ত্রুটি আছে। সে প্রশংসিত নয়।
৪২. গীবত-অপবাদ না শোনা এবং তাতে লিপ্ত ব্যক্তিদের প্রতিবাদ করা: যাতে করে সকল মানুষ দু’টি মতো মনোয় যায়।

📘 যেমন ছিলেন তাঁরা > 📄 হৃদয়ের স্বচ্ছতার কয়েকটি চিত্তাকর্ষক নমুনা

📄 হৃদয়ের স্বচ্ছতার কয়েকটি চিত্তাকর্ষক নমুনা


ফযল ইবনে আয়াশ রহ. বলেন, আমি ওয়াহাব ইবনে মুনাব্বিহ রহ. এর নিকট বসা ছিলাম। তখন তাঁর নিকট এক ব্যক্তি এসে বলল, আমি অমুকের নিকট দিয়ে যাওয়ার সময় দেখলাম, সে আপনাকে গালি দিচ্ছে। তিনি ক্রোধান্বিত হয়ে বললেন, শয়তান কি তোমাকে ছাড়া কোনো খবরদাতা পেল না? তারপর আমি সেখান থেকে না উঠতেই উক্ত লোকটি (যে গালি দিয়েছিল) সেখানে আসল। সে ওয়াহাব রহ. কে সালাম দিল। তিনি উত্তর দিয়ে হাত বাড়িয়ে মুসাফাহা করলেন এবং তাঁকে তাঁর পাশে বসালেন।
সুফইয়ান ইবনে দিনার রহ. বলেন, আমি আলী রাযি. এর একজন শিয়া আবু বশিরকে বললাম, আমাকে আমাদের পূর্বসূরীদের আমল সম্পর্কে কিছু বলুন। তিনি বললেন, তাঁরা কম আমল করতেন; কিন্তু অধিক বিনিময় লাভ করতেন। আমি বললাম, এটা কীভাবে? তিনি বললেন, তাঁদের হৃদয়ের স্বচ্ছতার কারণে।
যায়িদ ইবনে আসলাম রহ. বলেন, আবু দুজানা রাযি. এর মুমূর্ষু অবস্থায় তাঁর নিকট যাওয়া হলো। তখন তাঁর চেহারা ঝলমল করছিল। তাঁকে বলা হলো, আপনার চেহারা দেখি- উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে? তিনি বললেন, আমি যত আমল করেছি, তার মধ্যে আমার দু’টি আমল অপেক্ষাকৃত নির্ভরযোগ্য আমি কিছু পাইনি।
তার একটি হলো, আমি অনর্থক কথাবার্তা বলতাম না। আরেকটি হলো, আমার অন্তর মুসলমানদের জন্য নির্ভেজাল ও স্বচ্ছ ছিল।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00