📘 যে সকল হারামকে মানুষ তুচ্ছ মনে করে > 📄 কবরের উপর বসা, কবর পদদলিত করা ও কবরস্থানে মল-মূত্র ত্যাগ করা

📄 কবরের উপর বসা, কবর পদদলিত করা ও কবরস্থানে মল-মূত্র ত্যাগ করা


আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,
لَأَنْ يَجْلِسَ أَحَدُكُمْ عَلَى جَمْرَةٍ فَتُحْرِقَ ثِيَابَهُ فَتَخْلُصَ إِلَى جِلْدِهِ خَيْرٌ لَهُ مِنْ أَنْ يَجْلِسَ عَلَى قَبْرٍ -
'যদি তোমাদের কারো অঙ্গারের উপর বসার দরুন তার কাপড় পুড়ে দেহের চামড়া পর্যন্ত পৌঁছে যায় তবুও তা তার জন্য কবরের উপর বসা থেকে উত্তম'।১৫৭
কবর পা দিয়ে মাড়ানোর কাজ অনেকেই করে থাকে। তারা যখন নিজেদের কাউকে কবরস্থানে দাফন করতে নিয়ে আসে, তখন দেখা যায় পার্শ্ববর্তী কবরগুলি মাড়াচ্ছে, কখনও আবার জুতা পায়ে মাড়াচ্ছে, কোন পরোয়াই করছে না। অন্যান্য মৃতদের প্রতি যেন তাদের সম্মানবোধই নেই। অথচ এই সকল মৃত ব্যক্তির সম্মানে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,
لَأَنْ أَمْشِيَ عَلَى جَمْرَةٍ أَوْ سَيْفٍ أَوْ أَخْصِفَ نَعْلِى بِرِجْلِي أَحَبُّ إِلَيَّ مِنْ أَنْ أَمْشِيَ عَلَى قَبْرِ مُسْلِمٍ
'আগুনের অঙ্গার কিংবা তরবারির উপর দিয়ে আমার হেঁটে যাওয়া কিংবা আমার পায়ের চামড়া দ্বারা আমার চটি তৈরী করা একজন মুসলমানের কবরের উপর দিয়ে হেঁটে যাওয়া থেকে আমার নিকট অধিক প্রিয়'।১৫৮
সুতরাং যে ব্যক্তি কোন কবরস্থানের মালিক হয়ে সেখানে ব্যবসা কেন্দ্র কিংবা বাড়ী-ঘর গড়ে তোলে তার অবস্থা কি দাঁড়াবে? কিছু লোকের কবরস্থানে পেশাব-পায়খানা করার অভ্যাস আছে। তাদের যখন পেশাব-পায়খানার প্রয়োজন দেখা দেয় তখন তারা কবরস্থানের প্রাচীর টপকিয়ে কিংবা খোলাস্থান দিয়ে ঢুকে পড়ে এবং মল-মূত্রের নাপাকী ও গন্ধ দ্বারা মৃতদের কষ্ট দেয়। কবরের উপর পেশাব-পায়খানা করা প্রসঙ্গে নবী করীম (ছাঃ) বলেছেন,
مَا أُبَالِي أَوَسَطَ الْقَبْرِ قَضَيْتُ حَاجَتِي أَوْ وَسَطَ السُّوقِ -
'কবরস্থানের মাঝে মল-মূত্র ত্যাগ করতে পারলে বাজারের মধ্যস্থলে মল-মূত্র ত্যাগের কোন পরোয়া করি না'।১৫৯
অর্থাৎ কবরস্থানে মল-মূত্র ত্যাগের কদর্যতা আর বাজারের মধ্যে জনগণের সামনে সতর খোলা ও মল-মূত্র ত্যাগের কদর্যতা একই সমান। সুতরাং কবরস্থানে মল-মূত্র ত্যাগ গুনাহ তো বটেই এমনকি তা লোকালয়ে মল-মূত্র ত্যাগের ন্যায় লজ্জাকরও বটে। যারা ইচ্ছে করে কবরস্থানে ময়লা-আবর্জনা ইত্যাকার জিনিস ফেলে তারাও এই ভর্ৎসনায় শামিল হবে। এছাড়া কবর যিয়ারতকালে কবরসমূহের মাঝ দিয়ে যাতায়াতের সময় জুতা খুলে রাখাই আদবের পরিচয়।

টিকাঃ
১৫৭. মুসলিম; মিশকাত হা/১৬৯৯।
১৫৮. ইবনু মাজাহ হা/১৫৭৬, সনদ ছহীহ।
১৫৯. ইবনু মাজাহ হা/১৫৬৭; ছহীহুল জামে' হা/৫০৩৮।

📘 যে সকল হারামকে মানুষ তুচ্ছ মনে করে > 📄 পেশাবের পর পবিত্র না হওয়া

📄 পেশাবের পর পবিত্র না হওয়া


মানব প্রকৃতিকে দুরস্ত করার যত উপায়-উপকরণ আছে ইসলাম তার সবই উপস্থাপন করেছে। এটি ইসলামের একটি বড় সৌন্দর্য। নাপাকী দূর করা এসব উপায়ের একটি। এ কারণেই 'ইসতিনজা' বা শৌচকার্য বিধিবদ্ধ করা হয়েছে এবং কিভাবে পাক-পবিত্রতা অর্জিত হবে তার নিয়ম বাতলে দেওয়া হয়েছে।
অনেকে নাপাকী দূরীকরণে অলসতা করে থাকে। যার ফলে তাদের কাপড় ও দেহ অপবিত্র হয়ে যায় এবং ফলশ্রুতিতে তাদের ছালাত হয় না। নবী করীম (ছাঃ) উহাকে কবর আযাবের অন্যতম কারণ বলে উল্লেখ করেছেন। ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, নবী করীম (ছাঃ) মদীনার একটি খেজুর বাগানের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলেন। সেখানে তিনি দু'জন (মৃত) ব্যক্তির কণ্ঠস্বর শুনতে পান। কবরে তাদেরকে শাস্তি দেয়া হচ্ছিল। তা শুনে তিনি বললেন, এই দু'টো লোককে শাস্তি দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু বড় কোন কারণে নয়। অবশ্য গুনাহ হিসাবে এগুলি কবীরা। তাদের একজন পেশাব শেষে পবিত্র হত না আর অন্যজন চোগলখুরী করে বেড়াত'।১৬০ নবী করীম (ছাঃ) বরং এতদূর বলেছেন যে, أَكْثَرُ عَذَابِ الْقَبْرِ فِي الْبَوْلِ ‘বেশীরভাগ কবর আযাব পেশাবের কারণে হয়'।১৬১
পেশাবের ফোঁটা বন্ধ না হতেই যে দ্রুত পেশাব হতে উঠে পড়ে কিংবা এমন কায়দায় বা স্থানে পেশাব করে যেখান থেকে পেশাবের ছিঁটা এসে গায়ে বা কাপড়ে লাগে সেও এ শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত হবে।
কাফেরদের দেখাদেখি আমাদের মধ্যে অনেকস্থানেই দেওয়ালের সঙ্গে সেঁটে টয়লেট তৈরী করা হয়। এগুলি খোলামেলাও হয়। মানুষ কোন লজ্জা-শরম না করেই চলাচলকারী মানুষের সামনে সেখানে দাঁড়িয়ে পেশাব করতে শুরু করে। তারপর পেশাবের নাপাকী সমেতই কাপড় পরে নেয়। এতে দু'টি বিশ্রী হারাম একত্রিত হয়। এক- সে তার লজ্জাস্থানকে মানুষের দৃষ্টি থেকে হেফাযত করে না। দুই- সে পেশাব হতে পবিত্রতা অর্জন করে না।

টিকাঃ
১৬০. বুখারী, মুসলিম; মিশকাত হা/৬০৭৫।
১৬১. আহমাদ হা/৮৩১৩, ছহীহ তারগীব হা/১৫৮।

📘 যে সকল হারামকে মানুষ তুচ্ছ মনে করে > 📄 লোকদের অনীহা সত্ত্বেও গোপনে তাদের আলাপ শ্রবণ করা

📄 লোকদের অনীহা সত্ত্বেও গোপনে তাদের আলাপ শ্রবণ করা


আল্লাহ তা'আলা বলেন, وَلَاَ تَجَسَّسُوا 'তোমরা গোয়েন্দাগিরি করনা' (হুজুরাত ১২)। ইবনু আব্বাস (রাঃ) হ'তে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,
مَنِ اسْتَمَعَ إِلَى حَدِيثِ قَوْمٍ وَهُمْ لَهُ كَارِهُونَ أَوْ يَفِرُّونَ مِنْهُ ، صُبَّ فِي أُذُنِهِ الأَنْكُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ -
'যে ব্যক্তি লোকদের অনীহা বা তার কাছ থেকে পালানো সত্ত্বেও তাদের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনে ক্বিয়ামতের দিন তার দু'কানে গলিত সীসা ঢেলে দেওয়া হবে'।১৬২
আর যদি ক্ষতি করার মানসে তাদের থেকে শোনা কথা তাদের অগোচরে মানুষের নিকট বলে বেড়ায়, তাহ'লে গোয়েন্দাগিরি পাপের সাথে কুটনামির পাপও জড়িত হবে। কেননা নবী করীম (ছাঃ) বলেছেন, لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ فَتَاتُ 'চোগলখোর জান্নাতে প্রবেশ করবে না'।১৬৩

টিকাঃ
১৬২. বুখারী; মিশকাত হা/৪৪৯৯।
১৬৩. বুখারী, মুসলিম; মিশকাত হা/৪৮২৩।

📘 যে সকল হারামকে মানুষ তুচ্ছ মনে করে > 📄 প্রতিবেশীর সাথে অসদাচরণ করা

📄 প্রতিবেশীর সাথে অসদাচরণ করা


প্রতিবেশীদের সাথে সদ্ব্যবহারের প্রতি জোর তাকীদ দিয়ে আল্লাহ তা'আলা এরশাদ করেছেন,
وَاعْبُدُوا اللهَ وَلَا تُشْرِكُوا بِهِ شَيْئًا وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا وَبِذِي الْقُرْبَى وَالْيَتَامَى وَالْمَسَاكِينِ وَالْجَارِ ذِي الْقُرْبَى وَالْجَارِ الْجُنُبِ وَالصَّاحِبِ بِالْجَنْبِ وَابْنِ السَّبِيلِ وَمَا مَلَكَتْ أَيْمَانُكُمْ إِنَّ اللَّهَ لاَ يُحِبُّ مَنْ كَانَ مُخْتَالاً فَخُورًا -
'তোমরা আল্লাহ্ ইবাদত কর, তার সঙ্গে কাউকে শরীক করো না এবং মাতা-পিতার সঙ্গে সদাচরণ কর। আর সদাচরণ কর নিকটাত্মীয়, অনাথ, নিঃস্ব, নিকট প্রতিবেশী, দূর প্রতিবেশী, পার্শ্বস্থিত সঙ্গী, পথিক ও তোমাদের অধিকারভুক্ত দাস-দাসীদের সঙ্গে। নিশ্চয়ই আল্লাহ তা'আলা তাদের ভালবাসেন না যারা গর্বে স্ফীত অহংকারী' (নিসা ৩৬)।
प्रतिবেশীর হক্ব অতীব গুরুত্বপূর্ণ বিধায় তাকে কষ্ট দেওয়া হারাম। আবু শুরাইহ (রাঃ) হতে বর্ণিত, একদা রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন,
وَاللَّهِ لَا يُؤْمِنُ، وَاللَّهِ لَا يُؤْمِنُ، وَاللهِ لَا يُؤْمِنُ. قِيلَ وَمَنْ يَا رَسُولَ اللَّهِ؟ قَالَ الَّذِي لَا يَأْمَنُ جَارُهُ بَوَائِقَهُ -
'আল্লাহ্ শপথ সে মুমিন নয়, আল্লাহ্র শপথ সে মুমিন নয়, আল্লাহ্র শপথ সে মুমিন নয়। জিজ্ঞেস করা হল, কে সে জন ইয়া রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)? তিনি বললেন, যার প্রতিবেশী তার অত্যাচার হতে নিরাপদে থাকতে পারে না'।১৬৪
নবী করীম (ছাঃ) এক প্রতিবেশী কর্তৃক অন্য প্রতিবেশীর প্রশংসা ও নিন্দা করাকে ভাল ও মন্দ আচরণের মাপকাঠি গণ্য করেছেন। এ প্রসঙ্গে ইবনু মাস'ঊদ (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে এক ব্যক্তি বলল, ইয়া রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)! আমি ভাল আচরণ করলাম না মন্দ আচরণ করলাম তা কী করে বুঝব? তিনি বললেন,
إِذَا سَمِعْتَ حِيرَانَكَ يَقُولُونَ قَدْ أَحْسَنْتَ فَقَدْ أَحْسَنْتَ وَإِذَا سَمِعْتَهُمْ يَقُولُونَ : قَدْ أَسَأْتَ فَقَدْ أَسَأْتَ
'যখন তুমি তোমার প্রতিবেশীদেরকে বলতে শুনবে যে, তারা তোমার সম্পর্কে বলাবলি করছে, 'তুমি ভাল আচরণ কর' তখন বুঝবে, তুমি নিশ্চয়ই ভাল আচরণ করছ। আর যখন তাদেরকে বলাবলি করতে শুনবে যে, 'তুমি মন্দ আচরণ কর' তখন বুঝবে, তুমি নিশ্চয়ই মন্দ আচরণ করছ'।১৬৫
প্রতিবেশীর সঙ্গে মন্দ আচরণ নানাভাবে হতে পারে। যেমন- প্রতিবেশীর সাথে যৌথভাবে নির্মিত বাড়ীর প্রাচীরের উপর কাঠ কিংবা বাঁশ পুঁততে বাধা দেওয়া, প্রতিবেশীর অনুমতি না নিয়ে তার বাড়ী হতে নিজ বাড়ীকে উঁচু বা বহুতল করে তার বাড়ীতে আলো-বাতাস চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি করা, প্রতিবেশীর বাড়ী বরাবর জানালা তৈরী করে তার বাড়ীর লোকদের সতর দেখতে চেষ্টা করা, বিরক্তিকর শব্দ দ্বারা তাকে কষ্ট দেওয়া, বিশেষ করে ঘুম ও আরামের সময়ে চেঁচামেচি ও খটখট আওয়াজ করা, প্রতিবেশীর সন্তানদের মারধোর করা কিংবা তার বাড়ীর দরজায় ময়লা-আবর্জনা ফেলা ইত্যাদি।
তাছাড়া প্রতিবেশীর হজ্বের উপর চড়াও হলে পাপের মাত্রা আরো বেড়ে যায়। নবী করীম (ছাঃ) বলেছেন,
لأَنْ يَزْنِيَ الرَّجُلُ بِعَشْرِ نِسْوَةٍ أَيْسَرُ عَلَيْهِ مِنْ أَنْ يَزْنِي بِامْرَأَةِ جَارِهِ. لَأَنْ يَسْرِقَ الرَّجُلُ مِنْ عَشْرَةِ أَبْيَاتٍ أَيْسَرُ عَلَيْهِ مِنْ أَنْ يَسْرِقَ مِنْ جَارِهِ
'কোন ব্যক্তির পক্ষে অন্য দশজন মহিলার সঙ্গে ব্যভিচারে লিপ্ত হওয়া স্বীয় প্রতিবেশীর স্ত্রীর সঙ্গে ব্যভিচারের তুলনায় অনেক সহজ। অনুরূপভাবে অন্য দশ বাড়ীতে চুরি করা কোন ব্যক্তির স্বীয় প্রতিবেশীর বাড়ীতে চুরি করা অপেক্ষা অনেক সহজ'।১৬৬
অনেক অসাধু ব্যক্তি আছে, যারা প্রতিবেশীর অনুপস্থিতির সুযোগে রাতে তাদের গৃহে প্রবেশ করে এবং অপকর্মে লিপ্ত হয়। এসব লোকের জন্য এক বিভীষিকাময় দিনের শাস্তি অপেক্ষা করছে।

টিকাঃ
১৬৪. বুখারী, মুসলিম; মিশকাত হা/৪৯৬২।
১৬৫. ইবনু মাজাহ; মিশকাত হা/৪৯৮৮।
১৬৬. আহমাদ হা/২৩৯০৫; সিলসিলা ছহীহাহ হা/৬৫।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00