📄 মিথ্যা স্বপ্ন বলা
মানুষের মাঝে মর্যাদার আসন লাভ, আলোচনার পাত্র হওয়া, আর্থিক সুবিধা লাভ কিংবা শত্রুকে ভীতচকিত করার মানসে মিথ্যা স্বপ্ন বলার অভ্যাস কিছু মানুষের আছে। জনসাধারণের অনেকেই স্বপ্নে বিশ্বাসী। স্বপ্নের সাথে তাদের সম্পর্ক খুবই নিবিড়। তারা একে বাস্তব মনে করে ও এ মিথ্যা স্বপ্ন দ্বারা প্রতারিত হয়। ফলে এসব মিথ্যা স্বপ্ন যে বলে বেড়ায় তার জন্য কঠোর শাস্তির কথা বর্ণিত হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,
إِنَّ مِنْ أَعْظَمِ الْفِرَى أَنْ يَدَّعِيَ الرَّجُلُ إِلَى غَيْرِ أَبِيهِ، أَوْ يُرِيَ عَيْنَهُ مَا لَمْ تَرَ، أَوْ يَقُولُ عَلَى رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَا لَمْ يَقُلْ-
'সবচেয়ে বড় মনগড়া বা মিথ্যার মধ্যে রয়েছে ঐ ব্যক্তি, যে নিজেকে স্বীয় পিতা ব্যতীত অন্যের সন্তান হিসাবে আখ্যায়িত করে, যে স্বপ্ন সে দেখেনি তা দেখার দাবী করে এবং রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) যা বলেননি তাঁর নামে তা বলা'।১৫৫
তিনি আরও বলেছেন,
مَنْ تَحَلَّمَ بِحُلُمٍ لَمْ يَرَهُ، كُلِّفَ أَنْ يَعْقِدَ بَيْنَ شَعِيرَتَيْنِ، وَلَنْ يَفْعَلَ -
'যে ব্যক্তি স্বপ্নে যা দেখেনি তা দেখার ভান বা দাবী করে তাকে দু'টি চুলে গিরা দিতে বাধ্য করা হবে। কিন্তু সে তা কখনই করতে পারবে না'।১৫৬
দু'টি চুলে গিরা দেওয়া একটি অসাধ্য কাজ। সুতরাং কাজ যেমন হবে তার ফলও তেমন হবে।
টিকাঃ
১৫৫. বুখারী হা/৩৫০৯।
১৫৬. বুখারী; মিশকাত হা/৪৪৯৯।
📄 কবরের উপর বসা, কবর পদদলিত করা ও কবরস্থানে মল-মূত্র ত্যাগ করা
আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,
لَأَنْ يَجْلِسَ أَحَدُكُمْ عَلَى جَمْرَةٍ فَتُحْرِقَ ثِيَابَهُ فَتَخْلُصَ إِلَى جِلْدِهِ خَيْرٌ لَهُ مِنْ أَنْ يَجْلِسَ عَلَى قَبْرٍ -
'যদি তোমাদের কারো অঙ্গারের উপর বসার দরুন তার কাপড় পুড়ে দেহের চামড়া পর্যন্ত পৌঁছে যায় তবুও তা তার জন্য কবরের উপর বসা থেকে উত্তম'।১৫৭
কবর পা দিয়ে মাড়ানোর কাজ অনেকেই করে থাকে। তারা যখন নিজেদের কাউকে কবরস্থানে দাফন করতে নিয়ে আসে, তখন দেখা যায় পার্শ্ববর্তী কবরগুলি মাড়াচ্ছে, কখনও আবার জুতা পায়ে মাড়াচ্ছে, কোন পরোয়াই করছে না। অন্যান্য মৃতদের প্রতি যেন তাদের সম্মানবোধই নেই। অথচ এই সকল মৃত ব্যক্তির সম্মানে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,
لَأَنْ أَمْشِيَ عَلَى جَمْرَةٍ أَوْ سَيْفٍ أَوْ أَخْصِفَ نَعْلِى بِرِجْلِي أَحَبُّ إِلَيَّ مِنْ أَنْ أَمْشِيَ عَلَى قَبْرِ مُسْلِمٍ
'আগুনের অঙ্গার কিংবা তরবারির উপর দিয়ে আমার হেঁটে যাওয়া কিংবা আমার পায়ের চামড়া দ্বারা আমার চটি তৈরী করা একজন মুসলমানের কবরের উপর দিয়ে হেঁটে যাওয়া থেকে আমার নিকট অধিক প্রিয়'।১৫৮
সুতরাং যে ব্যক্তি কোন কবরস্থানের মালিক হয়ে সেখানে ব্যবসা কেন্দ্র কিংবা বাড়ী-ঘর গড়ে তোলে তার অবস্থা কি দাঁড়াবে? কিছু লোকের কবরস্থানে পেশাব-পায়খানা করার অভ্যাস আছে। তাদের যখন পেশাব-পায়খানার প্রয়োজন দেখা দেয় তখন তারা কবরস্থানের প্রাচীর টপকিয়ে কিংবা খোলাস্থান দিয়ে ঢুকে পড়ে এবং মল-মূত্রের নাপাকী ও গন্ধ দ্বারা মৃতদের কষ্ট দেয়। কবরের উপর পেশাব-পায়খানা করা প্রসঙ্গে নবী করীম (ছাঃ) বলেছেন,
مَا أُبَالِي أَوَسَطَ الْقَبْرِ قَضَيْتُ حَاجَتِي أَوْ وَسَطَ السُّوقِ -
'কবরস্থানের মাঝে মল-মূত্র ত্যাগ করতে পারলে বাজারের মধ্যস্থলে মল-মূত্র ত্যাগের কোন পরোয়া করি না'।১৫৯
অর্থাৎ কবরস্থানে মল-মূত্র ত্যাগের কদর্যতা আর বাজারের মধ্যে জনগণের সামনে সতর খোলা ও মল-মূত্র ত্যাগের কদর্যতা একই সমান। সুতরাং কবরস্থানে মল-মূত্র ত্যাগ গুনাহ তো বটেই এমনকি তা লোকালয়ে মল-মূত্র ত্যাগের ন্যায় লজ্জাকরও বটে। যারা ইচ্ছে করে কবরস্থানে ময়লা-আবর্জনা ইত্যাকার জিনিস ফেলে তারাও এই ভর্ৎসনায় শামিল হবে। এছাড়া কবর যিয়ারতকালে কবরসমূহের মাঝ দিয়ে যাতায়াতের সময় জুতা খুলে রাখাই আদবের পরিচয়।
টিকাঃ
১৫৭. মুসলিম; মিশকাত হা/১৬৯৯।
১৫৮. ইবনু মাজাহ হা/১৫৭৬, সনদ ছহীহ।
১৫৯. ইবনু মাজাহ হা/১৫৬৭; ছহীহুল জামে' হা/৫০৩৮।
📄 পেশাবের পর পবিত্র না হওয়া
মানব প্রকৃতিকে দুরস্ত করার যত উপায়-উপকরণ আছে ইসলাম তার সবই উপস্থাপন করেছে। এটি ইসলামের একটি বড় সৌন্দর্য। নাপাকী দূর করা এসব উপায়ের একটি। এ কারণেই 'ইসতিনজা' বা শৌচকার্য বিধিবদ্ধ করা হয়েছে এবং কিভাবে পাক-পবিত্রতা অর্জিত হবে তার নিয়ম বাতলে দেওয়া হয়েছে।
অনেকে নাপাকী দূরীকরণে অলসতা করে থাকে। যার ফলে তাদের কাপড় ও দেহ অপবিত্র হয়ে যায় এবং ফলশ্রুতিতে তাদের ছালাত হয় না। নবী করীম (ছাঃ) উহাকে কবর আযাবের অন্যতম কারণ বলে উল্লেখ করেছেন। ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, নবী করীম (ছাঃ) মদীনার একটি খেজুর বাগানের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলেন। সেখানে তিনি দু'জন (মৃত) ব্যক্তির কণ্ঠস্বর শুনতে পান। কবরে তাদেরকে শাস্তি দেয়া হচ্ছিল। তা শুনে তিনি বললেন, এই দু'টো লোককে শাস্তি দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু বড় কোন কারণে নয়। অবশ্য গুনাহ হিসাবে এগুলি কবীরা। তাদের একজন পেশাব শেষে পবিত্র হত না আর অন্যজন চোগলখুরী করে বেড়াত'।১৬০ নবী করীম (ছাঃ) বরং এতদূর বলেছেন যে, أَكْثَرُ عَذَابِ الْقَبْرِ فِي الْبَوْلِ ‘বেশীরভাগ কবর আযাব পেশাবের কারণে হয়'।১৬১
পেশাবের ফোঁটা বন্ধ না হতেই যে দ্রুত পেশাব হতে উঠে পড়ে কিংবা এমন কায়দায় বা স্থানে পেশাব করে যেখান থেকে পেশাবের ছিঁটা এসে গায়ে বা কাপড়ে লাগে সেও এ শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত হবে।
কাফেরদের দেখাদেখি আমাদের মধ্যে অনেকস্থানেই দেওয়ালের সঙ্গে সেঁটে টয়লেট তৈরী করা হয়। এগুলি খোলামেলাও হয়। মানুষ কোন লজ্জা-শরম না করেই চলাচলকারী মানুষের সামনে সেখানে দাঁড়িয়ে পেশাব করতে শুরু করে। তারপর পেশাবের নাপাকী সমেতই কাপড় পরে নেয়। এতে দু'টি বিশ্রী হারাম একত্রিত হয়। এক- সে তার লজ্জাস্থানকে মানুষের দৃষ্টি থেকে হেফাযত করে না। দুই- সে পেশাব হতে পবিত্রতা অর্জন করে না।
টিকাঃ
১৬০. বুখারী, মুসলিম; মিশকাত হা/৬০৭৫।
১৬১. আহমাদ হা/৮৩১৩, ছহীহ তারগীব হা/১৫৮।
📄 লোকদের অনীহা সত্ত্বেও গোপনে তাদের আলাপ শ্রবণ করা
আল্লাহ তা'আলা বলেন, وَلَاَ تَجَسَّسُوا 'তোমরা গোয়েন্দাগিরি করনা' (হুজুরাত ১২)। ইবনু আব্বাস (রাঃ) হ'তে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,
مَنِ اسْتَمَعَ إِلَى حَدِيثِ قَوْمٍ وَهُمْ لَهُ كَارِهُونَ أَوْ يَفِرُّونَ مِنْهُ ، صُبَّ فِي أُذُنِهِ الأَنْكُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ -
'যে ব্যক্তি লোকদের অনীহা বা তার কাছ থেকে পালানো সত্ত্বেও তাদের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনে ক্বিয়ামতের দিন তার দু'কানে গলিত সীসা ঢেলে দেওয়া হবে'।১৬২
আর যদি ক্ষতি করার মানসে তাদের থেকে শোনা কথা তাদের অগোচরে মানুষের নিকট বলে বেড়ায়, তাহ'লে গোয়েন্দাগিরি পাপের সাথে কুটনামির পাপও জড়িত হবে। কেননা নবী করীম (ছাঃ) বলেছেন, لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ فَتَاتُ 'চোগলখোর জান্নাতে প্রবেশ করবে না'।১৬৩
টিকাঃ
১৬২. বুখারী; মিশকাত হা/৪৪৯৯।
১৬৩. বুখারী, মুসলিম; মিশকাত হা/৪৮২৩।