📄 সাদা চুলে কালো খেযাব ব্যবহার করা
সাদা চুলকে কালো রঙে রঞ্জিত করা হারাম। হাদীছে কালো খেযাব সম্পর্কে যে হুঁশিয়ারী উচ্চারিত হয়েছে তাতে একথাই প্রমাণিত হয়। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন,
يَكُونُ قَوْمٌ يَحْضُبُونَ فِي آخِرِ الزَّمَانِ بِالسَّوَادِ كَحَوَاصِلِ الْحَمَامِ لَا يَرِيحُونَ رَائِحَةَ الْجَنَّةِ
'শেষ যামানায় একদল লোক কবুতরের বুকের ন্যায় কাল খেযাব ব্যবহার করবে। তারা জান্নাতের কোন সুগন্ধি পাবে না'।১৪৯
অনেক চুলপাকা ব্যক্তিকে এ কাজ করতে দেখা যায়। তারা কাল রং দ্বারা সাদা চুল রাঙিয়ে নিজেদেরকে যুবক কিংবা অপেক্ষাকৃত কম বয়সী বলে যাহির করে। এতে প্রতারণা, আল্লাহ্র সৃষ্টিকে গোপন করা ও মিথ্যা আত্মতৃপ্তি ব্যতীত আর কিছু হয় না। এর ফলে ব্যক্তিগত চালচলনের উপর নিঃসন্দেহে এক প্রকার কুপ্রভাব পড়ে। অন্য মানুষ তাতে প্রতারিত হয়।
নবী করীম (ছাঃ) পাকা চুল খেযাব করেছেন মেহেদি বা অনুরূপ কোন জিনিস দ্বারা। যাতে হলুদ, লাল ইত্যাদি মৌলিক রং ফুটে ওঠে । তবে কাল রং দিয়ে কখনোই নয় ।
আবুবকর (রাঃ)-এর পিতা আবু কুহাফা (রাঃ)-কে মক্কা বিজয়ের দিন যখন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর সামনে হাযির করা হয় তখন তার চুল-দাড়ি এত সাদা হয়ে গিয়েছিল যে, তা 'ছাগামা' (কাশ) ফুলের ন্যায় ধবধবে দেখাচ্ছিল। তিনি তাকে দেখে বললেন, غَيِّرُوا هَذَا بِشَيْءٍ وَاجْتَنِبُوا السَّوَادَ 'তোমরা কোন কিছু দ্বারা এটা পরিবর্তন করে দাও। তবে কাল রং থেকে বিরত থাকো'।১৫০ নারীদের বিধান পুরুষদের অনুরূপ। তারাও পাকা চুল কালো রঙে রাঙাতে পারবে না।
টিকাঃ
১৪৯. আবুদাঊদ হা/৪২১২; ছহীহুল জামে' হা/৮১৫৩।
১৫০. মুসলিম; মিশকাত হা/৪৪২৪।
📄 ক্যানভাস, প্রাচীর গাত্র, কাগজ ইত্যাদিতে প্রাণীর ছবি অঙ্কন করা
আব্দুল্লাহ বিন মাস'ঊদ (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এরশাদ করেন, إِنَّ أَشَدَّ النَّاسِ عَذَابًا عِنْدَ اللَّهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ الْمُصَوِّرُونَ ‘ক্বিয়ামত দিবসে আল্লাহ্র বিচারে কঠোর শাস্তি প্রাপ্তরা হবে ছবি নির্মাতাগণ'।১৫১
আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, আল্লাহ তা'আলা বলেছেন,
وَمَنْ أَظْلَمُ مِمَّنْ ذَهَبَ يَخْلُقُ كَخَلْقِي ، فَلْيَخْلُقُوا حَبَّةً ، وَلْيَخْلُقُوا ذَرَّةً -
'যারা আমার সৃষ্টির ন্যায় সৃষ্টি করতে তৎপর হয় তাদের থেকে বড় যালেম আর কে আছে? এতই যদি পারে তো তারা একটা শস্য দানা সৃষ্টি করুক কিংবা অণু সৃষ্টি করুক'।১৫২
ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,
كُلُّ مُصَوِّرٍ فِي النَّارِ يَجْعَلُ لَهُ بِكُلِّ صُورَةٍ صَوَّرَهَا نَفْسًا فَتُعَذِّبُهُ فِي جَهَنَّمَ
'প্রত্যেক ছবি নির্মাতা জাহান্নামে যাবে। সে যত ছবি অঙ্কন করেছে তার প্রত্যেকটির বিনিময়ে তার জন্য একটি করে প্রাণী তৈরী করা হবে। সে জাহান্নামে (তাকে) শাস্তি দেবে। ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন, 'তোমাদেরকে যদি ছবি আঁকতেই হয় তাহলে বৃক্ষ ও যার 'রূহ' নেই তার ছবি আঁক'।১৫৩
এ সকল হাদীছ হতে প্রমাণ মেলে যে, মানুষ, পশু ইত্যাকার যে কোন প্রাণীর ছবি আঁকা হারাম। চাই তার ছায়া থাকুক বা না থাকুক, তা ছাপা হৌক, কিংবা খোদাইকৃত হৌক, কিংবা অঙ্কিত হৌক বা ভাষ্কর্য হৌক কিংবা ছাঁচে ঢালাই করা হৌক। কেননা ছবি হারাম সংক্রান্ত হাদীছের আওতায় এ সবই পড়ে। আর যে ব্যক্তি মুসলমান সে তো শরী'আতের কথা অকুণ্ঠচিত্তে মেনে নিবে। সে এ বিতর্ক করতে যাবে না যে, আমি তো উহার পূজা করি না বা উহাকে সিজদা করি না। একজন জ্ঞানী লোক যদি অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে আমাদের যুগে ব্যাপক বিস্তার লাভকারী ছবির মধ্যে নিহিত একটি ক্ষতির কথাও চিন্তা করেন তাহলে শরী'আতে ছবি হারামের তাৎপর্য তিনি অনুধাবন করতে পারবেন। বর্তমানে এমন অনেক ছবি আছে যার কারণে কুপ্রবৃত্তি মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে, কামনার জোয়ার সৃষ্টি হয়। এমনকি ছবির জন্য যিনায় লিপ্ত হওয়াও বিচিত্র নয়।
এছাড়া মুসলমানরা নিজেদের ঘরে প্রাণীর ছবি রাখবে না। কেননা প্রাণীর ছবি থাকলে গৃহে ফেরেশতা প্রবেশ করে না। নবী করীম (ছাঃ) বলেছেন, لَا تَدْخُلُ الْمَلَائِكَةُ بَيْتًا فِيْهِ كَلْبٌ وَلَا تَصَاوِيرُ 'যে বাড়ীতে কুকুর ও ছবি থাকে সেই বাড়ীতে ফেরেশতা প্রবেশ করে না'।১৫৪
কোন কোন বাড়ীতে কাফিরদের দেব-দেবীর ছবি দেখতে পাওয়া যায়। বলা হয় যে, এগুলি আমরা সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য রেখেছি। অন্যান্য ছবির তুলনায় এগুলি আরও কঠোর হারাম। অনুরূপভাবে প্রাচীর গাত্রে টাঙানো ছবিও বেশী ক্ষতিকারক। এসব ছবি কত যে সম্মান পায়, কত যে দুঃখ জাগরুক করে, কত যে গর্ব বয়ে আনে তার কোন ইয়ত্তা নেই।
ছবিকে কখনো স্মৃতি বলা যায় না। কেননা, মুসলিম আত্মীয় ও প্রিয়জনের স্মৃতি তো অন্তরে বিরাজ করে। একজন মুসলমান তাদের জন্য রাব্বুল আলামীনের নিকটে রহমত ও মাগফেরাত কামনা করবে। তাতেই তাদের স্মৃতি জাগরুক থাকবে।
সুতরাং সর্বপ্রকার প্রাণীর ছবি বাড়ী থেকে সরিয়ে দেওয়া ও নিশ্চিহ্ন করে ফেলা আবশ্যক। হ্যাঁ, যেগুলি নিশ্চিহ্ন করা দুষ্কর ও আয়াসসাধ্য সেগুলি ব্যতিক্রম বলে গণ্য হবে। যেমন সাধারণ্যে প্রচলিত কৌটাবদ্ধ খাদ্যদ্রব্য বা টিনজাত খাদ্য সমগ্রী ও অন্যান্য নানা ধরনের বস্তুতে অঙ্কিত ছবি, অভিধান, রেফারেন্স বুক ও অন্যান্য পাঠ্য বইয়ের ছবি ইত্যাদি। তবে যথাসম্ভব সেগুলি অপসারিত করা গেলে করবে। বিশেষ করে মন্দ ছবি রাখবে না।
পরিচয়পত্রে ব্যবহৃত ছবি হারামের আওতাভুক্ত হবে না। কেননা সফরে উহার প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। এছাড়া কোন কোন বিদ্বানের মতে, যে সব ছবির কুদর নেই; বরং তা পদদলিত করার ন্যায় গণ্য, সে সব ছবি প্রয়োজনে সংরক্ষণ করা যেতে পারে। আল্লাহ বলেছেন, فَاتَّقُوا اللَّهَ مَا اسْتَطَعْتُمْ 'তোমরা সাধ্যমত আল্লাহকে ভয় কর' (তাগাবুন ১৬)।
টিকাঃ
১৫১. বুখারী, মুসলিম; মিশকাত হা/৪৪২৯।
১৫২. বুখারী, মুসলিম; মিশকাত হা/৪৪৯৬।
১৫৩. বুখারী, মুসলিম; মিশকাত হা/৪৪৯৮।
১৫৪. বুখারী, মুসলিম; মিশকাত হা/৪৪৮৯।
📄 মিথ্যা স্বপ্ন বলা
মানুষের মাঝে মর্যাদার আসন লাভ, আলোচনার পাত্র হওয়া, আর্থিক সুবিধা লাভ কিংবা শত্রুকে ভীতচকিত করার মানসে মিথ্যা স্বপ্ন বলার অভ্যাস কিছু মানুষের আছে। জনসাধারণের অনেকেই স্বপ্নে বিশ্বাসী। স্বপ্নের সাথে তাদের সম্পর্ক খুবই নিবিড়। তারা একে বাস্তব মনে করে ও এ মিথ্যা স্বপ্ন দ্বারা প্রতারিত হয়। ফলে এসব মিথ্যা স্বপ্ন যে বলে বেড়ায় তার জন্য কঠোর শাস্তির কথা বর্ণিত হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,
إِنَّ مِنْ أَعْظَمِ الْفِرَى أَنْ يَدَّعِيَ الرَّجُلُ إِلَى غَيْرِ أَبِيهِ، أَوْ يُرِيَ عَيْنَهُ مَا لَمْ تَرَ، أَوْ يَقُولُ عَلَى رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَا لَمْ يَقُلْ-
'সবচেয়ে বড় মনগড়া বা মিথ্যার মধ্যে রয়েছে ঐ ব্যক্তি, যে নিজেকে স্বীয় পিতা ব্যতীত অন্যের সন্তান হিসাবে আখ্যায়িত করে, যে স্বপ্ন সে দেখেনি তা দেখার দাবী করে এবং রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) যা বলেননি তাঁর নামে তা বলা'।১৫৫
তিনি আরও বলেছেন,
مَنْ تَحَلَّمَ بِحُلُمٍ لَمْ يَرَهُ، كُلِّفَ أَنْ يَعْقِدَ بَيْنَ شَعِيرَتَيْنِ، وَلَنْ يَفْعَلَ -
'যে ব্যক্তি স্বপ্নে যা দেখেনি তা দেখার ভান বা দাবী করে তাকে দু'টি চুলে গিরা দিতে বাধ্য করা হবে। কিন্তু সে তা কখনই করতে পারবে না'।১৫৬
দু'টি চুলে গিরা দেওয়া একটি অসাধ্য কাজ। সুতরাং কাজ যেমন হবে তার ফলও তেমন হবে।
টিকাঃ
১৫৫. বুখারী হা/৩৫০৯।
১৫৬. বুখারী; মিশকাত হা/৪৪৯৯।
📄 কবরের উপর বসা, কবর পদদলিত করা ও কবরস্থানে মল-মূত্র ত্যাগ করা
আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,
لَأَنْ يَجْلِسَ أَحَدُكُمْ عَلَى جَمْرَةٍ فَتُحْرِقَ ثِيَابَهُ فَتَخْلُصَ إِلَى جِلْدِهِ خَيْرٌ لَهُ مِنْ أَنْ يَجْلِسَ عَلَى قَبْرٍ -
'যদি তোমাদের কারো অঙ্গারের উপর বসার দরুন তার কাপড় পুড়ে দেহের চামড়া পর্যন্ত পৌঁছে যায় তবুও তা তার জন্য কবরের উপর বসা থেকে উত্তম'।১৫৭
কবর পা দিয়ে মাড়ানোর কাজ অনেকেই করে থাকে। তারা যখন নিজেদের কাউকে কবরস্থানে দাফন করতে নিয়ে আসে, তখন দেখা যায় পার্শ্ববর্তী কবরগুলি মাড়াচ্ছে, কখনও আবার জুতা পায়ে মাড়াচ্ছে, কোন পরোয়াই করছে না। অন্যান্য মৃতদের প্রতি যেন তাদের সম্মানবোধই নেই। অথচ এই সকল মৃত ব্যক্তির সম্মানে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,
لَأَنْ أَمْشِيَ عَلَى جَمْرَةٍ أَوْ سَيْفٍ أَوْ أَخْصِفَ نَعْلِى بِرِجْلِي أَحَبُّ إِلَيَّ مِنْ أَنْ أَمْشِيَ عَلَى قَبْرِ مُسْلِمٍ
'আগুনের অঙ্গার কিংবা তরবারির উপর দিয়ে আমার হেঁটে যাওয়া কিংবা আমার পায়ের চামড়া দ্বারা আমার চটি তৈরী করা একজন মুসলমানের কবরের উপর দিয়ে হেঁটে যাওয়া থেকে আমার নিকট অধিক প্রিয়'।১৫৮
সুতরাং যে ব্যক্তি কোন কবরস্থানের মালিক হয়ে সেখানে ব্যবসা কেন্দ্র কিংবা বাড়ী-ঘর গড়ে তোলে তার অবস্থা কি দাঁড়াবে? কিছু লোকের কবরস্থানে পেশাব-পায়খানা করার অভ্যাস আছে। তাদের যখন পেশাব-পায়খানার প্রয়োজন দেখা দেয় তখন তারা কবরস্থানের প্রাচীর টপকিয়ে কিংবা খোলাস্থান দিয়ে ঢুকে পড়ে এবং মল-মূত্রের নাপাকী ও গন্ধ দ্বারা মৃতদের কষ্ট দেয়। কবরের উপর পেশাব-পায়খানা করা প্রসঙ্গে নবী করীম (ছাঃ) বলেছেন,
مَا أُبَالِي أَوَسَطَ الْقَبْرِ قَضَيْتُ حَاجَتِي أَوْ وَسَطَ السُّوقِ -
'কবরস্থানের মাঝে মল-মূত্র ত্যাগ করতে পারলে বাজারের মধ্যস্থলে মল-মূত্র ত্যাগের কোন পরোয়া করি না'।১৫৯
অর্থাৎ কবরস্থানে মল-মূত্র ত্যাগের কদর্যতা আর বাজারের মধ্যে জনগণের সামনে সতর খোলা ও মল-মূত্র ত্যাগের কদর্যতা একই সমান। সুতরাং কবরস্থানে মল-মূত্র ত্যাগ গুনাহ তো বটেই এমনকি তা লোকালয়ে মল-মূত্র ত্যাগের ন্যায় লজ্জাকরও বটে। যারা ইচ্ছে করে কবরস্থানে ময়লা-আবর্জনা ইত্যাকার জিনিস ফেলে তারাও এই ভর্ৎসনায় শামিল হবে। এছাড়া কবর যিয়ারতকালে কবরসমূহের মাঝ দিয়ে যাতায়াতের সময় জুতা খুলে রাখাই আদবের পরিচয়।
টিকাঃ
১৫৭. মুসলিম; মিশকাত হা/১৬৯৯।
১৫৮. ইবনু মাজাহ হা/১৫৭৬, সনদ ছহীহ।
১৫৯. ইবনু মাজাহ হা/১৫৬৭; ছহীহুল জামে' হা/৫০৩৮।