📄 পোশাক-পরিচ্ছদ ও কথা-বার্তায় নারী-পুরুষ পরস্পরের বেশ ধারণ
পুরুষকে আল্লাহ তা'আলা যে পুরুষালী স্বভাবে সৃষ্টি করেছেন তাকে তা বজায় রাখা এবং নারীকে যে নারীত্ব দিয়ে সৃষ্টি করেছেন তাকে তা ধরে রাখাই আল্লাহ্র বিধান। এটা এমনি এক ব্যবস্থা, যা না হলে মানব জীবন ঠিকঠাক চলবে না। পুরুষের নারীর বেশ ধারণ এবং নারীর পুরুষের বেশ ধারণ স্বভাববিরুদ্ধ কাজ। এর ফলে অশান্তির দুয়ার খুলে যায় এবং সমাজে উচ্ছৃংখলতা ও বেলেল্লাপনা ছড়িয়ে পড়ে। শরী'আতে এ জাতীয় কাজকে হারাম গণ্য করা হয়েছে। কোন ব্যক্তিকে যে আমল করার দরুন শারঈ দলীলে অভিশাপ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে সেই দলীলই প্রমাণ করে যে উক্ত কাজ হারাম ও কবীরা গুনাহ। ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত,
لَعَنَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الْمُتَشَبِّهِينَ مِنَ الرِّجَالِ بِالنِّسَاءِ، وَالْمُتَشَبِّهَاتِ مِنَ النِّسَاءِ بِالرِّجَالِ
'রাসূল (ছাঃ) পুরুষদের মধ্যে নারীর বেশ ধারণকারীদের এবং নারীদের মধ্যে পুরুষের বেশ ধারণকারিণীদের অভিশাপ দিয়েছেন'।১৪৬ ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে আরও বর্ণিত আছে,
لَعَنَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الْمُخَنَّثِينَ مِنَ الرِّجَالِ ، وَالْمُتَرَجَلاَتِ مِنَ النِّسَاءِ
'রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) নারীবেশী পুরুষদেরকে এবং পুরুষবেশী নারীদেরকে অভিশাপ দিয়েছেন'।১৪৭
এই অনুকরণ উঠাবসা, চলাফেরা, কথাবার্তা ইত্যাদি বিভিন্ন ক্ষেত্রে হয়ে থাকে। যেমন দৈহিকভাবে মেয়েলী বেশ ধারণ করা, কথাবার্তা ও চলাফেরায় মেয়েলীপনা অবলম্বন করা কিংবা পুরুষের বেশ ধারণ করা ইত্যাদি।
পোশাক ও অলংকার পরিধানেও অনুকরণ রয়েছে। সুতরাং পুরুষের জন্য গলার হার, হাতের চুড়ি, পায়ের মল, কানের দুল পরা চলবে না। অনুরূপভাবে মহিলারাও পুরুষদের জামা, পাজামা, প্যান্ট, শার্ট, পাঞ্জাবী পরতে পারবে না। নারীদের পোশাকের ডিজাইন পুরুষদের থেকে ভিন্নতর হবে। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, لَعَنَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الرَّجُلَ يَلْبَسُ لِبْسَةَ الْمَرْأَةِ وَالْمَرْأَةَ تَلْبَسُ لِبْسَةَ الرَّجُلِ - 'আল্লাহ তা'আলার লা'নত সেই পুরুষের উপর যে মেয়েলী পোশাক পরিধান করে এবং সেই নারীর উপর, যে পুরুষের পোশাক পরিধান করে'।১৪৮
সুতরাং উভয়ের কারো জন্যই স্ব স্ব বেশভূষা বদল করা জায়েয হবে না।
টিকাঃ
১৪৬. বুখারী; মিশকাত হা/৪৪২৯।
১৪৭. বুখারী; মিশকাত হা/৪৪২৮।
১৪৮. আবুদাঊদ, মিশকাত হা/৪৪৬৯।
📄 সাদা চুলে কালো খেযাব ব্যবহার করা
সাদা চুলকে কালো রঙে রঞ্জিত করা হারাম। হাদীছে কালো খেযাব সম্পর্কে যে হুঁশিয়ারী উচ্চারিত হয়েছে তাতে একথাই প্রমাণিত হয়। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন,
يَكُونُ قَوْمٌ يَحْضُبُونَ فِي آخِرِ الزَّمَانِ بِالسَّوَادِ كَحَوَاصِلِ الْحَمَامِ لَا يَرِيحُونَ رَائِحَةَ الْجَنَّةِ
'শেষ যামানায় একদল লোক কবুতরের বুকের ন্যায় কাল খেযাব ব্যবহার করবে। তারা জান্নাতের কোন সুগন্ধি পাবে না'।১৪৯
অনেক চুলপাকা ব্যক্তিকে এ কাজ করতে দেখা যায়। তারা কাল রং দ্বারা সাদা চুল রাঙিয়ে নিজেদেরকে যুবক কিংবা অপেক্ষাকৃত কম বয়সী বলে যাহির করে। এতে প্রতারণা, আল্লাহ্র সৃষ্টিকে গোপন করা ও মিথ্যা আত্মতৃপ্তি ব্যতীত আর কিছু হয় না। এর ফলে ব্যক্তিগত চালচলনের উপর নিঃসন্দেহে এক প্রকার কুপ্রভাব পড়ে। অন্য মানুষ তাতে প্রতারিত হয়।
নবী করীম (ছাঃ) পাকা চুল খেযাব করেছেন মেহেদি বা অনুরূপ কোন জিনিস দ্বারা। যাতে হলুদ, লাল ইত্যাদি মৌলিক রং ফুটে ওঠে । তবে কাল রং দিয়ে কখনোই নয় ।
আবুবকর (রাঃ)-এর পিতা আবু কুহাফা (রাঃ)-কে মক্কা বিজয়ের দিন যখন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর সামনে হাযির করা হয় তখন তার চুল-দাড়ি এত সাদা হয়ে গিয়েছিল যে, তা 'ছাগামা' (কাশ) ফুলের ন্যায় ধবধবে দেখাচ্ছিল। তিনি তাকে দেখে বললেন, غَيِّرُوا هَذَا بِشَيْءٍ وَاجْتَنِبُوا السَّوَادَ 'তোমরা কোন কিছু দ্বারা এটা পরিবর্তন করে দাও। তবে কাল রং থেকে বিরত থাকো'।১৫০ নারীদের বিধান পুরুষদের অনুরূপ। তারাও পাকা চুল কালো রঙে রাঙাতে পারবে না।
টিকাঃ
১৪৯. আবুদাঊদ হা/৪২১২; ছহীহুল জামে' হা/৮১৫৩।
১৫০. মুসলিম; মিশকাত হা/৪৪২৪।
📄 ক্যানভাস, প্রাচীর গাত্র, কাগজ ইত্যাদিতে প্রাণীর ছবি অঙ্কন করা
আব্দুল্লাহ বিন মাস'ঊদ (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এরশাদ করেন, إِنَّ أَشَدَّ النَّاسِ عَذَابًا عِنْدَ اللَّهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ الْمُصَوِّرُونَ ‘ক্বিয়ামত দিবসে আল্লাহ্র বিচারে কঠোর শাস্তি প্রাপ্তরা হবে ছবি নির্মাতাগণ'।১৫১
আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, আল্লাহ তা'আলা বলেছেন,
وَمَنْ أَظْلَمُ مِمَّنْ ذَهَبَ يَخْلُقُ كَخَلْقِي ، فَلْيَخْلُقُوا حَبَّةً ، وَلْيَخْلُقُوا ذَرَّةً -
'যারা আমার সৃষ্টির ন্যায় সৃষ্টি করতে তৎপর হয় তাদের থেকে বড় যালেম আর কে আছে? এতই যদি পারে তো তারা একটা শস্য দানা সৃষ্টি করুক কিংবা অণু সৃষ্টি করুক'।১৫২
ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,
كُلُّ مُصَوِّرٍ فِي النَّارِ يَجْعَلُ لَهُ بِكُلِّ صُورَةٍ صَوَّرَهَا نَفْسًا فَتُعَذِّبُهُ فِي جَهَنَّمَ
'প্রত্যেক ছবি নির্মাতা জাহান্নামে যাবে। সে যত ছবি অঙ্কন করেছে তার প্রত্যেকটির বিনিময়ে তার জন্য একটি করে প্রাণী তৈরী করা হবে। সে জাহান্নামে (তাকে) শাস্তি দেবে। ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন, 'তোমাদেরকে যদি ছবি আঁকতেই হয় তাহলে বৃক্ষ ও যার 'রূহ' নেই তার ছবি আঁক'।১৫৩
এ সকল হাদীছ হতে প্রমাণ মেলে যে, মানুষ, পশু ইত্যাকার যে কোন প্রাণীর ছবি আঁকা হারাম। চাই তার ছায়া থাকুক বা না থাকুক, তা ছাপা হৌক, কিংবা খোদাইকৃত হৌক, কিংবা অঙ্কিত হৌক বা ভাষ্কর্য হৌক কিংবা ছাঁচে ঢালাই করা হৌক। কেননা ছবি হারাম সংক্রান্ত হাদীছের আওতায় এ সবই পড়ে। আর যে ব্যক্তি মুসলমান সে তো শরী'আতের কথা অকুণ্ঠচিত্তে মেনে নিবে। সে এ বিতর্ক করতে যাবে না যে, আমি তো উহার পূজা করি না বা উহাকে সিজদা করি না। একজন জ্ঞানী লোক যদি অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে আমাদের যুগে ব্যাপক বিস্তার লাভকারী ছবির মধ্যে নিহিত একটি ক্ষতির কথাও চিন্তা করেন তাহলে শরী'আতে ছবি হারামের তাৎপর্য তিনি অনুধাবন করতে পারবেন। বর্তমানে এমন অনেক ছবি আছে যার কারণে কুপ্রবৃত্তি মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে, কামনার জোয়ার সৃষ্টি হয়। এমনকি ছবির জন্য যিনায় লিপ্ত হওয়াও বিচিত্র নয়।
এছাড়া মুসলমানরা নিজেদের ঘরে প্রাণীর ছবি রাখবে না। কেননা প্রাণীর ছবি থাকলে গৃহে ফেরেশতা প্রবেশ করে না। নবী করীম (ছাঃ) বলেছেন, لَا تَدْخُلُ الْمَلَائِكَةُ بَيْتًا فِيْهِ كَلْبٌ وَلَا تَصَاوِيرُ 'যে বাড়ীতে কুকুর ও ছবি থাকে সেই বাড়ীতে ফেরেশতা প্রবেশ করে না'।১৫৪
কোন কোন বাড়ীতে কাফিরদের দেব-দেবীর ছবি দেখতে পাওয়া যায়। বলা হয় যে, এগুলি আমরা সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য রেখেছি। অন্যান্য ছবির তুলনায় এগুলি আরও কঠোর হারাম। অনুরূপভাবে প্রাচীর গাত্রে টাঙানো ছবিও বেশী ক্ষতিকারক। এসব ছবি কত যে সম্মান পায়, কত যে দুঃখ জাগরুক করে, কত যে গর্ব বয়ে আনে তার কোন ইয়ত্তা নেই।
ছবিকে কখনো স্মৃতি বলা যায় না। কেননা, মুসলিম আত্মীয় ও প্রিয়জনের স্মৃতি তো অন্তরে বিরাজ করে। একজন মুসলমান তাদের জন্য রাব্বুল আলামীনের নিকটে রহমত ও মাগফেরাত কামনা করবে। তাতেই তাদের স্মৃতি জাগরুক থাকবে।
সুতরাং সর্বপ্রকার প্রাণীর ছবি বাড়ী থেকে সরিয়ে দেওয়া ও নিশ্চিহ্ন করে ফেলা আবশ্যক। হ্যাঁ, যেগুলি নিশ্চিহ্ন করা দুষ্কর ও আয়াসসাধ্য সেগুলি ব্যতিক্রম বলে গণ্য হবে। যেমন সাধারণ্যে প্রচলিত কৌটাবদ্ধ খাদ্যদ্রব্য বা টিনজাত খাদ্য সমগ্রী ও অন্যান্য নানা ধরনের বস্তুতে অঙ্কিত ছবি, অভিধান, রেফারেন্স বুক ও অন্যান্য পাঠ্য বইয়ের ছবি ইত্যাদি। তবে যথাসম্ভব সেগুলি অপসারিত করা গেলে করবে। বিশেষ করে মন্দ ছবি রাখবে না।
পরিচয়পত্রে ব্যবহৃত ছবি হারামের আওতাভুক্ত হবে না। কেননা সফরে উহার প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। এছাড়া কোন কোন বিদ্বানের মতে, যে সব ছবির কুদর নেই; বরং তা পদদলিত করার ন্যায় গণ্য, সে সব ছবি প্রয়োজনে সংরক্ষণ করা যেতে পারে। আল্লাহ বলেছেন, فَاتَّقُوا اللَّهَ مَا اسْتَطَعْتُمْ 'তোমরা সাধ্যমত আল্লাহকে ভয় কর' (তাগাবুন ১৬)।
টিকাঃ
১৫১. বুখারী, মুসলিম; মিশকাত হা/৪৪২৯।
১৫২. বুখারী, মুসলিম; মিশকাত হা/৪৪৯৬।
১৫৩. বুখারী, মুসলিম; মিশকাত হা/৪৪৯৮।
১৫৪. বুখারী, মুসলিম; মিশকাত হা/৪৪৮৯।
📄 মিথ্যা স্বপ্ন বলা
মানুষের মাঝে মর্যাদার আসন লাভ, আলোচনার পাত্র হওয়া, আর্থিক সুবিধা লাভ কিংবা শত্রুকে ভীতচকিত করার মানসে মিথ্যা স্বপ্ন বলার অভ্যাস কিছু মানুষের আছে। জনসাধারণের অনেকেই স্বপ্নে বিশ্বাসী। স্বপ্নের সাথে তাদের সম্পর্ক খুবই নিবিড়। তারা একে বাস্তব মনে করে ও এ মিথ্যা স্বপ্ন দ্বারা প্রতারিত হয়। ফলে এসব মিথ্যা স্বপ্ন যে বলে বেড়ায় তার জন্য কঠোর শাস্তির কথা বর্ণিত হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,
إِنَّ مِنْ أَعْظَمِ الْفِرَى أَنْ يَدَّعِيَ الرَّجُلُ إِلَى غَيْرِ أَبِيهِ، أَوْ يُرِيَ عَيْنَهُ مَا لَمْ تَرَ، أَوْ يَقُولُ عَلَى رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَا لَمْ يَقُلْ-
'সবচেয়ে বড় মনগড়া বা মিথ্যার মধ্যে রয়েছে ঐ ব্যক্তি, যে নিজেকে স্বীয় পিতা ব্যতীত অন্যের সন্তান হিসাবে আখ্যায়িত করে, যে স্বপ্ন সে দেখেনি তা দেখার দাবী করে এবং রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) যা বলেননি তাঁর নামে তা বলা'।১৫৫
তিনি আরও বলেছেন,
مَنْ تَحَلَّمَ بِحُلُمٍ لَمْ يَرَهُ، كُلِّفَ أَنْ يَعْقِدَ بَيْنَ شَعِيرَتَيْنِ، وَلَنْ يَفْعَلَ -
'যে ব্যক্তি স্বপ্নে যা দেখেনি তা দেখার ভান বা দাবী করে তাকে দু'টি চুলে গিরা দিতে বাধ্য করা হবে। কিন্তু সে তা কখনই করতে পারবে না'।১৫৬
দু'টি চুলে গিরা দেওয়া একটি অসাধ্য কাজ। সুতরাং কাজ যেমন হবে তার ফলও তেমন হবে।
টিকাঃ
১৫৫. বুখারী হা/৩৫০৯।
১৫৬. বুখারী; মিশকাত হা/৪৪৯৯।