📘 যে সকল হারামকে মানুষ তুচ্ছ মনে করে > 📄 চোগলখুরী করা

📄 চোগলখুরী করা


মানুষের মাঝে ফেতনা-ফাসাদ সৃষ্টি ও সম্পর্কের অবনতি ঘটানোর মানসে একজনের কথা অন্যজনের নিকটে লাগানোকে চোগলখুরী বলে। চোগলখুরীর ফলে মানুষের সম্পর্কে ফাটল ধরে এবং তাদের মাঝে হিংসা-বিদ্বেষ ও শত্রুতার বহ্নিশিখা জ্বলে ওঠে। চোগলখুরীর নিন্দায় আল্লাহ তা'আলা এরশাদ করেন,
وَلَا تُطِعْ كُلَّ حَلَّافٍ مَهِينٍ - هَمَّازٍ مَّشَاءٍ بِنَمِيمٍ -
'যে অধিক শপথ করে, যে লাঞ্ছিত, যে পশ্চাতে নিন্দা করে, একের কথা অন্যের নিকটে লাগায় আপনি তার আনুগত্য করবেন না' (কলম ১০-১১)।
রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, لَاَ يَدْخُلُ الْجَنَّةَ قَتَاتُ 'চাগলখোর ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে না'।১৩০
عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ مَرَّ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِحَائِطِ مِنْ حِيطَانِ الْمَدِينَةِ، فَسَمِعَ صَوْتَ إِنْسَانَيْنِ يُعَذِّبَانِ فِي قُبُورِهِمَا، فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : يُعَذِّبَانِ، وَمَا يُعَذِّبَانِ فِي كَبِيرٍ ، ثُمَّ قَالَ : بَلَى ، وَفِي رِوَايَةٍ : وَإِنَّهُ لَكَبِيرٌ كَانَ أَحَدُهُمَا لَا يَسْتَتِرُ مِنْ بَوْلِهِ، وَكَانَ الْآخَرُ يَمْشِي بِالنَّمِيمَةِ-
ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) একদা মদীনার একটি খেজুর বাগান দিয়ে যাচ্ছিলেন, তথায় তিনি দু'জন লোকের আহাজারী শুনতে পেলেন। তখন তাদেরকে কবরে শাস্তি দেওয়া হচ্ছিল। নবী করীম (ছাঃ) বললেন, 'এ দু'জনকে আযাব দেওয়া হচ্ছে। তবে বড় কোন কারণে নয়। অবশ্য এগুলি কবীরা গুনাহ। তাদের একজন পেশাব থেকে পবিত্রতা অর্জন করত না। অন্যজন চোগলখুরী করে বেড়াত'।১৩১
চোগলখুরীর একটি নিকৃষ্ট প্রক্রিয়া হ'ল, স্বামীর বিরুদ্ধে স্ত্রীকে এবং স্ত্রীর বিরুদ্ধে স্বামীকে ক্ষেপিয়ে তুলে তাদের সম্পর্কে ফাটল ধরানো। অনুরূপভাবে অনেক কর্মজীবি অফিসের বস কিংবা দায়িত্বশীলের নিকট অন্য কোন কর্মজীবির কথা তুলে ধরে। এতে তার উদ্দেশ্য উক্ত কর্মজীবির ক্ষতি সাধন করা এবং নিজেকে উক্ত দায়িত্বশীলের শুভার্থী বা খয়েরখাঁ হিসাবে তুলে ধরা। এসব কাজ চোগলখুরী হিসাবে গণ্য এবং তা হারাম।

টিকাঃ
১২৯. আহমাদ হা/২৭৫৮৩; তিরমিযী হা/১৯৩১।
১৩০. বুখারী, মুসলিম; মিশকাত হা/৪৮২৩।
১৩১. বুখারী হা/৬০৫৫, মুসলিম; মিশকাত হা/৬০৭৫।

📘 যে সকল হারামকে মানুষ তুচ্ছ মনে করে > 📄 অনুমতি ব্যতীত অন্যের বাড়ীতে উঁকি দেওয়া ও প্রবেশ করা

📄 অনুমতি ব্যতীত অন্যের বাড়ীতে উঁকি দেওয়া ও প্রবেশ করা


আল্লাহ তা'আলা বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لاَ تَدْخُلُوا بُيُوتًا غَيْرَ بُيُوتِكُمْ حَتَّى تَسْتَأْنِسُوا وَتُسَلِّمُوا عَلَى أَهْلِهَا
'হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা নিজ গৃহ ব্যতীত অন্য গৃহে তার মালিকের অনুমতি ও সালাম প্রদান ব্যতীত প্রবেশ করো না' (নূর ২৭)।
রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) খুব স্পষ্ট করে বলেছেন, إِنَّمَا جُعِلَ الْإِسْتِئْذَانُ مِنْ أَجْلِ الْبَصَرِ 'দৃষ্টিপাতের কারণেই কেবল অনুমতির ব্যবস্থা দেওয়া হয়েছে'।১৩২
আধুনিক কালের বাড়ীগুলি পাশাপাশি গড়ে উঠেছে। তাদের বিল্ডিং বা ঘরগুলি একটা অপরটার সাথে লাগিয়ে, দরজা-জানালাও সামনা-সামনি তৈরী। এমতাবস্থায় এক প্রতিবেশীর সামনে অন্য প্রতিবেশীর সতর প্রকাশিত হয়ে পড়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। কুরআনে মুমিন নর-নারীর চক্ষু সংযত করে রাখার নির্দেশ থাকলেও অনেকে তা মেনে চলে না। অনেকে উপর তলার জানালা কিংবা ছাদ থেকে নীচের অধিবাসীদের সতর ইচ্ছে করে দেখে। নিঃসন্দেহে এটা খিয়ানত, প্রতিবেশীর সম্মানে আঘাত এবং হারাম পথের মাধ্যম। এর ফলে অনেক রকম বিপদাপদ ও ফিত্না দেখা দেয়। এরূপ গোয়েন্দাগিরি যে কত ভয়াবহ তার প্রমাণ হ'ল, শরী'আত ঐ ব্যক্তির চোখ ফুঁড়ে দিতে নির্দেশ দিয়েছে। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,
مَنِ اطَّلَعَ فِي بَيْتِ قَوْمٍ بِغَيْرِ إِذْنِهِمْ فَقَدْ حَلَّ لَهُمْ أَنْ يَفْقَئُوا عَيْنَهُ - وفي رواية - فَفَقَئُوا عَيْنَهُ فَلَا دِيَةَ لَهُ وَلَا قِصَاصَ
'যে ব্যক্তি কারো বাড়ীতে তাদের অনুমতি ব্যতীত উঁকি দেয় তাদের জন্য তার চোখ ফুঁড়ে দেওয়া বৈধ হয়ে যাবে'।১৩০ অন্য বর্ণনায় এসেছে, যদি তারা তার চোখ ফুঁড়ে দেয় তাহলে সেজন্য কোন দিয়াত বা রক্তমূল্য ও ক্বিছাছ দিতে হবে না'।১৩৪

টিকাঃ
১৩২. বুখারী, মুসলিম; মিশকাত হা/৩৫১৫।
১৩৩. মুসলিম হা/২১৫৮।
১৩৪. নাসাঈ হা/৪৮৬০, সনদ ছহীহ।

📘 যে সকল হারামকে মানুষ তুচ্ছ মনে করে > 📄 তৃতীয় জনকে বাদ দিয়ে দু'জনে শলাপরামর্শ করা

📄 তৃতীয় জনকে বাদ দিয়ে দু'জনে শলাপরামর্শ করা


আমাদের সভা-সমিতিগুলির জন্য একটা বড় বিপদ হ'ল ব্যক্তি বিশেষকে বাদ দিয়ে অন্য দু'একজন নিয়ে শলাপরামর্শ করা। এতে শয়তানের পদাংক অনুসরণ করা হয়। কেননা এ জাতীয় কাজের ফলে মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি হয় এবং একের প্রতি অন্যের মন বিষিয়ে ওঠে। এরূপ শলাপরামর্শের অবৈধতার বিধান ও কারণ দর্শাতে গিয়ে নবী করীম (ছাঃ) বলেছেন,
إِذَا كُنْتُمْ ثَلاَثَةً فَلا يَتَنَاجَى رَجُلانِ دُونَ الآخَرِ ، حَتَّى تَخْتَلِطُوا بِالنَّاسِ ، أَجْلَ أَنْ يُحْزِنَهُ -
'যখন তোমরা তিনজন হবে তখন যেন দু'জন লোক অন্য একজনকে বাদ রেখে গোপনে কথা না বলে। তবে তোমরা অনেক মানুষের সাথে একাকার হয়ে গেলে ভিন্ন কথা। কারণ তৃতীয় জনকে বাদ দিয়ে কৃত গোপন পরামর্শ ঐ ব্যক্তিকে ব্যথিত করবে'।১৩৫
এভাবে চারজনের মধ্যে একজনকে বাদ রেখে তিন জনে পরামর্শ করাও নিষিদ্ধ। অনুরূপভাবে তৃতীয় জন বোঝে না এমন ভাষায় দু'জনের শলা-পরামর্শ করাও বৈধ নয়। কারণ এক্ষেত্রে তৃতীয় জনকে বাদ দেওয়ায় তার প্রতি এক প্রকার তাচ্ছিল্য ভাব দেখানো হয়। কিংবা তারা দু'জনে যে তার প্রসঙ্গে কোন খারাপ সিদ্ধান্ত নিচ্ছে এরূপ ধারণা তার মনে বদ্ধমূল হতে পারে। সুতরাং কারো মনে ব্যথা না দিয়ে সবাই মিলে পরামর্শ করতে হবে। মোটকথা, একটি সভার কিছু সদস্যকে বাদ রেখে অন্য সদস্যগণের নিয়ে পরামর্শ করা কোন প্রকারেই জায়েয নয়।

টিকাঃ
১৩৫. বুখারী, মুসলিম; মিশকাত হা/৪৯৬৫।

📘 যে সকল হারামকে মানুষ তুচ্ছ মনে করে > 📄 টাখনুর নীচে কাপড় পরিধান করা

📄 টাখনুর নীচে কাপড় পরিধান করা


মানুষ যেসব কাজকে লঘু মনে করে অথচ আল্লাহ্র নিকটে সেগুলি খুবই গুরুতর, তন্মধ্যে টাখনুর নীচে কাপড় পরিধান করা একটি। অনেকের কাপড় এত লম্বা যে, তা মাটি স্পর্শ করে। কেউবা আবার পরিধেয় বস্ত্র দ্বারা পিছন থেকে মাটি সমান করতে করতে যায়। টাখনুর নীচে এভাবে কাপড় ঝুলিয়ে পরা হারাম। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,
ثَلَاثَةٌ لا يُكَلِّمُهُمُ اللهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَلاَ يَنْظُرُ إِلَيْهِمْ وَلَا يُزَكِّيهِمْ وَلَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ - الْمُسْبِلُ (وفي رواية إزاره) وَالْمَنَّانُ [ وفي رواية : الَّذِي لَا يُعْطِي شَيْئًا إِلَّا مِنْهُ ] وَالْمُنَفِّقُ سِلْعَتَهُ بِالْحَلِفِ الْكَاذِبِ
'তিন প্রকার লোকের সাথে আল্লাহ তা'আলা কিয়ামতের দিন কথা বলবেন না, তাদের দিকে তাকাবেন না এবং তাদেরকে পবিত্র করবেন না; বরং তাদের জন্য রয়েছে মর্মন্তুদ শাস্তি। তারা হ'ল- টাখনুর নীচে কাপড় (অন্য বর্ণনায় লুঙ্গী) পরিধানকারী, খোঁটাদানকারী (অন্য বর্ণনায় এসেছে, যে খোঁটা না দিয়ে কোন কিছু দান করে না) ও মিথ্যা কসমের মাধ্যমে পণ্য বিক্রয়কারী'।১৩৬
যে বলে, 'আমার টাখনুর নীচে কাপড় পরা অহংকারের প্রেক্ষিতে নয়' তার এ সাফাই গাওয়া গ্রহণযোগ্য নয়। টাখনুর নীচে কাপড় পরিধান করা অহংকার বশেই হৌক, আর এমনিতেই হৌক শাস্তি তাতে সমানই হবে। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, مَا تَحْتَ الْكَعْبَيْنِ مِنَ الْإِزَارِ فَفِي النَّارِ ‘টাখনুর নীচে কাপড়ের যেটুকু থাকবে তা জাহান্নামে যাবে'।১৩৭
এই হাদীছে অহংকার ও নিরহংকারের মধ্যে কোন পার্থক্য করা হয়নি। আর জাহান্নামে গেলে শরীরের কোন অংশবিশেষ যাবে না; বরং সমগ্র দেহই যাবে। অবশ্য অহংকার বশে যে টাখনুর নীচে কাপড় পরবে তার শাস্তি তুলনামূলকভাবে কঠোর ও বেশী হবে। এ কথাই রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর বাণীতে এসেছে,
مَنْ جَرَّ ثَوْبَهُ خُيَلاءَ لَمْ يَنْظُرِ اللَّهُ إِلَيْهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ -
'যে ব্যক্তি অহংকার বশে তার লুঙ্গি মাটির সাথে টেনে নিয়ে বেড়াবে, ক্বিয়ামত দিবসে আল্লাহ তা'আরা তার প্রতি দৃষ্টি দিবেন না'।১৩৮ বেশী শাস্তি এজন্য হবে যে, সে এক সঙ্গে দু'টি হারাম কাজ করেছে। এক- টাখনুর নীচে কাপড় পরা, দুই- অহংকার প্রদর্শন। পরিমিত পরিমাণ থেকে নীচে ঝুলিয়ে যেকোন বস্ত্র পরিধান করাই 'ইসবালে'র আওতাভুক্ত এবং তা হারাম। ইবনু ওমর (রাঃ) বর্ণিত হাদীছে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এরশাদ করেন,
الْإِسْبَالُ فِى الإِزارِ وَالْقَمِيصِ وَالْعِمَامَةِ ، مَنْ جَرَّ مِنْهَا شَيْئًا خُيَلَاءَ لَمْ يَنْظُرِ اللَّهُ إِلَيْهِ يَوْمَ الْقِيَامَة -
'লুঙ্গি, জামা ও পাগড়ীতে ইসবাল (ঝুলিয়ে পরা) রয়েছে। এগুলি থেকে যেকোন একটিকে কোন ব্যক্তি অহংকার বশে টেনে-ছেঁচড়ে নিয়ে বেড়ালে ক্বিয়ামত দিবসে আল্লাহ তার প্রতি সদয় দৃষ্টি দিবেন না'।১৩৯
স্ত্রীলোকদের জন্য পায়ের সতরের সুবিধার্থে এক বিঘত কিংবা এক হাত পরিমাণ ঝুলিয়ে দেবার অবকাশ আছে। কেননা বাতাস বা অন্য কোন কারণে সতর খোলার ভয় থাকলে অতিরিক্ত কাপড়ে তা বহুলাংশে রোধ হবে। তবে সীমালংঘন করা তাদের জন্যও বৈধ হবে না। যেমন বিয়ে-শাদীতে পরিহিত বস্ত্রের ক্ষেত্রে মেয়েদের সীমালংঘন করতে দেখা যায়। সেগুলি পরিমিত পরিমাণ থেকে কয়েক বিঘত এমনকি কয়েক মিটার লম্বা হয়। অনেক সময় পেছন থেকে তা বয়ে নিয়ে যেতে দেখা যায়।

টিকাঃ
১৩৬. মুসলিম হা/১০৬; মিশকাত হা/২৭৯৫।
১৩৭. নাসাঈ হা/৫৩৩০; আহমাদ হা/২০১৮০।
১৩৮. বুখারী হা/৩৬৬৫, মুসলিম; মিশকাত হা/৪৩১১।
১৩৯. আবুদাঊদ, নাসাঈ; মিশকাত হা/৪৩৩২।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00