📄 গীবত বা পরনিন্দা
মুসলমানদের গীবত ও তাদের মান-ইযযতে অহেতুক নাক গলানো এখন একটি জনপ্রিয় বিষয়ে পরিণত হয়েছে। অথচ গীবত করতে আল্লাহ তা'আলা কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন। মানুষ যাতে গীবতকে ঘৃণা করে এবং তাতে নিরুৎসাহ হয় সেজন্য আল্লাহ তা'আলা প্রত্যাদেশ করেছেন। সর্বোপরি তিনি গীবতকে এমন ঘৃণ্যভাবে চিত্রিত করেছেন, যে কোন মনই তার প্রতি বিতৃষ্ণ হবে। তিনি বলেছেন,
وَلَا يَغْتَبْ بَعْضُكُمْ بَعْضًا أَيُحِبُّ أَحَدُكُمْ أَنْ يَأْكُلَ لَحْمَ أَخِيهِ مَيْتًا فَكَرِهْتُمُوهُ -
'তোমরা একে অপরের যেন গীবত না কর। তোমাদের কেউ কি স্বীয় মৃত ভাইয়ের গোশত ভক্ষণ পসন্দ করে? অনন্তর তোমরা তা অপসন্দ কর' (হুজুরাত ১২)।
'গীবত'-এর পরিচয় প্রসঙ্গে নবী করীম (ছাঃ) ছাহাবীগণকে লক্ষ্য করে বলেছেন,
أَتَدْرُونَ مَا الْغِيبَةُ؟ قَالُوا اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَعْلَمُ. قَالَ : ذِكْرُكَ أَخَاكَ بِمَا يَكْرَهُ قِيلَ أَفَرَأَيْتَ إِنْ كَانَ فِي أَخِي مَا أَقُولُ؟ قَالَ : إِنْ كَانَ فِيْهِ مَا تَقُولُ فَقَدِ اغْتَبْتَهُ وَإِنْ لَمْ يَكُنْ فِيْهِ فَقَدْ بَهَتَهُ -
‘তোমরা কি জান ‘গীবত' কী? তাঁরা বললেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই অধিক জ্ঞাত। তিনি বললেন, তোমার ভাই যে কথা অপসন্দ করে তার সম্পর্কে সে কথা বলার নাম গীবত। জিজ্ঞেস করা হ'ল, আমি যা বলছি তা যদি আমার ভাইয়ের মধ্যে থাকে? রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন, তুমি যা বলছ তা যদি তার মধ্যে বিদ্যমান থাকে তবেই তুমি তার 'গীবত' করলে। আর যদি না থাকে তাহলে তুমি তাকে অপবাদ দিলে'।১২৭
সুতরাং মানুষের মধ্যে যে দোষ আছে এবং যার চর্চা সে অপসন্দ করে তা আলোচনা করাই গীবত। চাই সে দোষ তার শরীর সংক্রান্ত হৌক কিংবা দ্বীন ও চরিত্র বিষয়ক হৌক কিংবা আকার-আকৃতি বিষয়ক হৌক। গীবত করার আঙ্গিক বা ধরনও নানারকম রয়েছে। যেমন ব্যক্তির দোষ আলোচনা করা, বিদ্রূপাত্মক ভঙ্গিতে তার কর্মকাণ্ড তুলে ধরা ইত্যাদি।
আল্লাহ পাকের নিকটে গীবত বড়ই কদর্য ও খারাপ কাজ হওয়া সত্ত্বেও মানুষ গীবতের ব্যাপারে খুবই উদাসীনতা দেখিয়ে থাকে। এজন্য গীবতের ভয়াবহতা প্রসঙ্গে নবী করীম (ছাঃ) বলেছেন,
الرِّبَا اثْنَانِ وَسَبْعُونَ بَابًا أَدْنَاهَا مِثْلُ إِثْيَانِ الرَّجُلِ أُمَّهُ وَأَرْبَا الرِّبَا اسْتِطَالَةُ الرَّجُلِ فِي عِرْضِ أَخِيهِ
'সূদের (পাপের) ৭২টি দরজা বা স্তর রয়েছে। তন্মধ্যে নিম্নতম স্তর হচ্ছে স্বীয় মায়ের সাথে ব্যভিচারে লিপ্ত হওয়া তুল্য পাপ এবং ঊর্ধ্বতম স্তর হ'ল কোন ব্যক্তি কর্তৃক তার এক ভাইয়ের মান-সম্ভ্রমের হানি ঘটান তুল্য পাপ'।১২৮
যে মজলিসে কারও গীবত করা হয় সেখানে যে ব্যক্তিই উপস্থিত থাকুক তাকে তা নিষেধ করা ওয়াজিব। যে ভাইয়ের গীবত করা হয় তার পক্ষ নিয়ে সাধ্যমত তাকে সহযোগিতা করাও আবশ্যক। সম্ভব হলে ঐ মজলিসেই গীবতের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। নবী করীম (ছাঃ) বলেছেন,
مَنْ رَدَّ عَنْ عِرْضِ أَخِيهِ رَدَّ اللَّهُ عَنْ وَجْهِهِ النَّارَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ -
'যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের মান-সম্ভ্রমের বিরুদ্ধে কৃত হামলাকে প্রতিহত করবে, ক্বিয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলা তার থেকে জাহান্নামের আগুনকে প্রতিহত করবেন'।১২৯
টিকাঃ
১২৭. মুসলিম; মিশকাত হা/৪৮২৮।
১২৮. তাবারাণী; সিলসিলা ছহীহাহ হা/১৮৭১।
📄 চোগলখুরী করা
মানুষের মাঝে ফেতনা-ফাসাদ সৃষ্টি ও সম্পর্কের অবনতি ঘটানোর মানসে একজনের কথা অন্যজনের নিকটে লাগানোকে চোগলখুরী বলে। চোগলখুরীর ফলে মানুষের সম্পর্কে ফাটল ধরে এবং তাদের মাঝে হিংসা-বিদ্বেষ ও শত্রুতার বহ্নিশিখা জ্বলে ওঠে। চোগলখুরীর নিন্দায় আল্লাহ তা'আলা এরশাদ করেন,
وَلَا تُطِعْ كُلَّ حَلَّافٍ مَهِينٍ - هَمَّازٍ مَّشَاءٍ بِنَمِيمٍ -
'যে অধিক শপথ করে, যে লাঞ্ছিত, যে পশ্চাতে নিন্দা করে, একের কথা অন্যের নিকটে লাগায় আপনি তার আনুগত্য করবেন না' (কলম ১০-১১)।
রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, لَاَ يَدْخُلُ الْجَنَّةَ قَتَاتُ 'চাগলখোর ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে না'।১৩০
عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ مَرَّ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِحَائِطِ مِنْ حِيطَانِ الْمَدِينَةِ، فَسَمِعَ صَوْتَ إِنْسَانَيْنِ يُعَذِّبَانِ فِي قُبُورِهِمَا، فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : يُعَذِّبَانِ، وَمَا يُعَذِّبَانِ فِي كَبِيرٍ ، ثُمَّ قَالَ : بَلَى ، وَفِي رِوَايَةٍ : وَإِنَّهُ لَكَبِيرٌ كَانَ أَحَدُهُمَا لَا يَسْتَتِرُ مِنْ بَوْلِهِ، وَكَانَ الْآخَرُ يَمْشِي بِالنَّمِيمَةِ-
ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) একদা মদীনার একটি খেজুর বাগান দিয়ে যাচ্ছিলেন, তথায় তিনি দু'জন লোকের আহাজারী শুনতে পেলেন। তখন তাদেরকে কবরে শাস্তি দেওয়া হচ্ছিল। নবী করীম (ছাঃ) বললেন, 'এ দু'জনকে আযাব দেওয়া হচ্ছে। তবে বড় কোন কারণে নয়। অবশ্য এগুলি কবীরা গুনাহ। তাদের একজন পেশাব থেকে পবিত্রতা অর্জন করত না। অন্যজন চোগলখুরী করে বেড়াত'।১৩১
চোগলখুরীর একটি নিকৃষ্ট প্রক্রিয়া হ'ল, স্বামীর বিরুদ্ধে স্ত্রীকে এবং স্ত্রীর বিরুদ্ধে স্বামীকে ক্ষেপিয়ে তুলে তাদের সম্পর্কে ফাটল ধরানো। অনুরূপভাবে অনেক কর্মজীবি অফিসের বস কিংবা দায়িত্বশীলের নিকট অন্য কোন কর্মজীবির কথা তুলে ধরে। এতে তার উদ্দেশ্য উক্ত কর্মজীবির ক্ষতি সাধন করা এবং নিজেকে উক্ত দায়িত্বশীলের শুভার্থী বা খয়েরখাঁ হিসাবে তুলে ধরা। এসব কাজ চোগলখুরী হিসাবে গণ্য এবং তা হারাম।
টিকাঃ
১২৯. আহমাদ হা/২৭৫৮৩; তিরমিযী হা/১৯৩১।
১৩০. বুখারী, মুসলিম; মিশকাত হা/৪৮২৩।
১৩১. বুখারী হা/৬০৫৫, মুসলিম; মিশকাত হা/৬০৭৫।
📄 অনুমতি ব্যতীত অন্যের বাড়ীতে উঁকি দেওয়া ও প্রবেশ করা
আল্লাহ তা'আলা বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لاَ تَدْخُلُوا بُيُوتًا غَيْرَ بُيُوتِكُمْ حَتَّى تَسْتَأْنِسُوا وَتُسَلِّمُوا عَلَى أَهْلِهَا
'হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা নিজ গৃহ ব্যতীত অন্য গৃহে তার মালিকের অনুমতি ও সালাম প্রদান ব্যতীত প্রবেশ করো না' (নূর ২৭)।
রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) খুব স্পষ্ট করে বলেছেন, إِنَّمَا جُعِلَ الْإِسْتِئْذَانُ مِنْ أَجْلِ الْبَصَرِ 'দৃষ্টিপাতের কারণেই কেবল অনুমতির ব্যবস্থা দেওয়া হয়েছে'।১৩২
আধুনিক কালের বাড়ীগুলি পাশাপাশি গড়ে উঠেছে। তাদের বিল্ডিং বা ঘরগুলি একটা অপরটার সাথে লাগিয়ে, দরজা-জানালাও সামনা-সামনি তৈরী। এমতাবস্থায় এক প্রতিবেশীর সামনে অন্য প্রতিবেশীর সতর প্রকাশিত হয়ে পড়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। কুরআনে মুমিন নর-নারীর চক্ষু সংযত করে রাখার নির্দেশ থাকলেও অনেকে তা মেনে চলে না। অনেকে উপর তলার জানালা কিংবা ছাদ থেকে নীচের অধিবাসীদের সতর ইচ্ছে করে দেখে। নিঃসন্দেহে এটা খিয়ানত, প্রতিবেশীর সম্মানে আঘাত এবং হারাম পথের মাধ্যম। এর ফলে অনেক রকম বিপদাপদ ও ফিত্না দেখা দেয়। এরূপ গোয়েন্দাগিরি যে কত ভয়াবহ তার প্রমাণ হ'ল, শরী'আত ঐ ব্যক্তির চোখ ফুঁড়ে দিতে নির্দেশ দিয়েছে। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,
مَنِ اطَّلَعَ فِي بَيْتِ قَوْمٍ بِغَيْرِ إِذْنِهِمْ فَقَدْ حَلَّ لَهُمْ أَنْ يَفْقَئُوا عَيْنَهُ - وفي رواية - فَفَقَئُوا عَيْنَهُ فَلَا دِيَةَ لَهُ وَلَا قِصَاصَ
'যে ব্যক্তি কারো বাড়ীতে তাদের অনুমতি ব্যতীত উঁকি দেয় তাদের জন্য তার চোখ ফুঁড়ে দেওয়া বৈধ হয়ে যাবে'।১৩০ অন্য বর্ণনায় এসেছে, যদি তারা তার চোখ ফুঁড়ে দেয় তাহলে সেজন্য কোন দিয়াত বা রক্তমূল্য ও ক্বিছাছ দিতে হবে না'।১৩৪
টিকাঃ
১৩২. বুখারী, মুসলিম; মিশকাত হা/৩৫১৫।
১৩৩. মুসলিম হা/২১৫৮।
১৩৪. নাসাঈ হা/৪৮৬০, সনদ ছহীহ।
📄 তৃতীয় জনকে বাদ দিয়ে দু'জনে শলাপরামর্শ করা
আমাদের সভা-সমিতিগুলির জন্য একটা বড় বিপদ হ'ল ব্যক্তি বিশেষকে বাদ দিয়ে অন্য দু'একজন নিয়ে শলাপরামর্শ করা। এতে শয়তানের পদাংক অনুসরণ করা হয়। কেননা এ জাতীয় কাজের ফলে মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি হয় এবং একের প্রতি অন্যের মন বিষিয়ে ওঠে। এরূপ শলাপরামর্শের অবৈধতার বিধান ও কারণ দর্শাতে গিয়ে নবী করীম (ছাঃ) বলেছেন,
إِذَا كُنْتُمْ ثَلاَثَةً فَلا يَتَنَاجَى رَجُلانِ دُونَ الآخَرِ ، حَتَّى تَخْتَلِطُوا بِالنَّاسِ ، أَجْلَ أَنْ يُحْزِنَهُ -
'যখন তোমরা তিনজন হবে তখন যেন দু'জন লোক অন্য একজনকে বাদ রেখে গোপনে কথা না বলে। তবে তোমরা অনেক মানুষের সাথে একাকার হয়ে গেলে ভিন্ন কথা। কারণ তৃতীয় জনকে বাদ দিয়ে কৃত গোপন পরামর্শ ঐ ব্যক্তিকে ব্যথিত করবে'।১৩৫
এভাবে চারজনের মধ্যে একজনকে বাদ রেখে তিন জনে পরামর্শ করাও নিষিদ্ধ। অনুরূপভাবে তৃতীয় জন বোঝে না এমন ভাষায় দু'জনের শলা-পরামর্শ করাও বৈধ নয়। কারণ এক্ষেত্রে তৃতীয় জনকে বাদ দেওয়ায় তার প্রতি এক প্রকার তাচ্ছিল্য ভাব দেখানো হয়। কিংবা তারা দু'জনে যে তার প্রসঙ্গে কোন খারাপ সিদ্ধান্ত নিচ্ছে এরূপ ধারণা তার মনে বদ্ধমূল হতে পারে। সুতরাং কারো মনে ব্যথা না দিয়ে সবাই মিলে পরামর্শ করতে হবে। মোটকথা, একটি সভার কিছু সদস্যকে বাদ রেখে অন্য সদস্যগণের নিয়ে পরামর্শ করা কোন প্রকারেই জায়েয নয়।
টিকাঃ
১৩৫. বুখারী, মুসলিম; মিশকাত হা/৪৯৬৫।