📄 মদ্যপান
আল্লাহ তা'আলা এরশাদ করেন, 'নিশ্চয়ই মদ, জুয়া, মূর্তি ও ভাগ্য নির্ণায়ক তীর বা লটারী অপবিত্র শয়তানী কাজ ছাড়া আর কিছু নয়। সুতরাং তোমরা এগুলি থেকে বিরত থাক। আশা করা যায় তোমরা সফলকাম হবে' (মায়েদাহ ৯০)।
মদ্যপান হতে বিরত থাকার আদেশ প্রদান তা হারাম হওয়ার অন্যতম শক্তিশালী দলীল। আল্লাহ তা'আলা অত্র আয়াতে মদের সঙ্গে মূর্তির কথা উল্লেখ করেছেন। মূর্তি কাফেরদের উপাস্য ও দেব-দেবীর সাধারণ নাম। মূর্তি পূজা হারাম হেতু মদ্যপানও হারাম। তাই উক্ত আয়াতে আল্লাহ উল্লিখিত জিনিসগুলো হারাম করেননি বরং বিরত থাকতে বলেছেন বলে এথেকে গা বাঁচানোর কোন উপায় নেই।
মদ্যপান সম্পর্কে হাদীছেও কঠোর সতর্কবাণী উচ্চারিত হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,
إِنَّ عَلَى اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ عَهْدًا لِمَنْ يَشْرَبُ الْمُسْكِرَ أَنْ يَسْقِيَهُ مِنْ طِينَةِ الْخَبَالِ. قَالُوا يَا رَسُولَ اللَّهِ وَمَا طِينَةُ الْخَبَالِ؟ قَالَ : عَرَقُ أَهْلِ النَّارِ أَوْ عُصَارَةُ أَهْلِ النَّارِ -
'যে ব্যক্তি মদ্যপান করে তার জন্য আল্লাহ্র অঙ্গীকার হল, তিনি তাকে 'ত্বীনাতুল খাবাল' পান করাবেন। ছাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহ্র রাসূল (ছাঃ) 'ত্বীনাতুল খাবাল' কি? তিনি বললেন, জাহান্নামীদের ঘাম অথবা পুঁজ-রক্ত'।১১৩
ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, مُدْمِنُ الْخَمْرِ إِنْ مَاتَ لَقِيَ اللَّهَ كَعَابِدِ وَثَنِ ‘স্থায়ী শরাবপায়ীরূপে যে মারা যাবে, (ক্বিয়ামতে) সে একজন মূর্তিপূজকের ন্যায় আল্লাহ্র সাথে সাক্ষাৎ করবে'।১১৪
আমাদের যুগে হরেক রকম মদ ও নেশা জাতীয় দ্রব্যাদি বেরিয়েছে। তাদের নামও আরবী, আজমী বিভিন্ন প্রকার রয়েছে। যেমন- বিয়ার, হুইস্কি, চুয়ানি, তাড়ি, ভদকা, শ্যাম্পেন, কোডিন, মরফিন, প্যাথেড্রিন, হেরোইন, ড্রাগ ইত্যাদি।
নবী করীম (ছাঃ) বলেছেন, لَيَشْرَبَنَّ نَاسٌ مِنْ أُمَّتِي الْخَمْرَ يُسَمُّونَهَا بِغَيْرِ اسْمِهَا ‘নিশ্চয়ই আমার উম্মতের কিছু লোক মদ পান করবে, তারা উহার ভিন্ন নামকরণ করে নেবে'।১১৫
রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী উক্ত নাম পাল্টিয়ে মদ পানকারী মুসলমানও বর্তমান যামানায় প্রকাশ পেয়েছে। তারা উহার নাম দিয়েছে 'রুহানী টনিক' বা 'জীবনী সুধা'। অথচ এটা নিছক মিথ্যার উপর প্রলেপ প্রদান ও প্রতারণা মাত্র। এই সমস্ত প্রতারকদের সম্পর্কে আল্লাহ বলেন,
يُخَادِعُونَ اللهَ وَالَّذِينَ آمَنُوا وَمَا يَخْدَعُونَ إِلَّا أَنْفُسَهُمْ وَمَا يَشْعُرُونَ
'তারা আল্লাহ ও ঈমানদারদের সাথে প্রতারণা করে অথচ তারা যে নিজেদের সাথেই প্রতারণা করছে তা তারা অনুধাবন করতে পারছে না' (বাক্বারাহ ৯)।
মদ কি এবং তার বিধান কি হবে শরী'আতে তার পরিপূর্ণ নীতিমালা তুলে ধরা হয়েছে, যাতে ফিত্না ও দ্বন্দ্বের মূলোৎপাটন করা হয়েছে। এই নীতিমালা হ'ল- كُلُّ مُسْكِرٍ خَمْرٌ وَكُلُّ مُسْكِرٍ حَرَامٌ ‘প্রত্যেক নেশার দ্রব্যই 'খামর' বা মদ এবং প্রত্যেক নেশার দ্রব্যই হারাম'।১১৬
সুতরাং যা কিছু মস্তিষ্কের সঙ্গে মিশে জ্ঞান-বুদ্ধিকে নেশাগ্রস্ত করে তোলে তাই হারাম। চাই তা কম হৌক বা বেশী হৌক;১১৭ তরল পদার্থ হৌক কিংবা কঠিন পদার্থ হৌক। এসব নেশার দ্রব্যের নাম যাই হৌক মূলতঃ এগুলো সবই এক এবং এসবের বিধানও এক।
পরিশেষে মদ্যপায়ীদের উদ্দেশ্যে নবী করীম (ছাঃ)-এর একটি উপদেশবাণী তুলে ধরা হল। তিনি বলেছেন,
مَنْ شَرِبَ الْخَمْرَ وَسَكِرَ لَمْ تُقْبَلْ لَهُ صَلَاةٌ أَرْبَعِينَ صَبَاحًا وَإِنْ مَاتَ دَخَلَ النَّارَ فَإِنْ تَابَ تَابَ اللهُ عَلَيْهِ وَإِنْ عَادَ فَشَرِبَ فَسَكِرَ لَمْ تُقْبَلْ لَهُ صَلَاةٌ أَرْبَعِينَ صَبَاحًا فَإِنْ مَاتَ دَخَلَ النَّارَ فَإِنْ تَابَ تَابَ اللهُ عَلَيْهِ وَإِنْ عَادَ فَشَرِبَ فَسَكِرَ لَمْ تُقْبَلْ لَهُ صَلَاةٌ أَرْبَعِينَ صَبَاحًا فَإِنْ مَاتَ دَخَلَ النَّارَ فَإِنْ تَابَ تَابَ اللَّهُ عَلَيْهِ وَإِنْ عَادَ كَانَ حَقًّا عَلَى اللَّهِ أَنْ يَسْقِيَهُ مِنْ رَدْغَةِ الْخَبَالِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ. قَالُوا يَا رَسُولَ اللَّهِ وَمَا رَدْغَةُ الْخَبَالِ؟ قَالَ : عُصَارَةُ أَهْلِ النَّارِ -
'যে ব্যক্তি মদ পান করে ও নেশাগ্রস্ত হয় তার চল্লিশ দিনের ছালাত কবুল হবে না। যদি সে ঐ অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে তাহলে জাহান্নামে যাবে। আর যদি তওবা করে তবে আল্লাহ তার তওবা কবুল করবেন। পুনরায় যদি সে মদ পান করে ও নেশাগ্রস্ত হয় তবে তার চল্লিশ দিনের ছালাত কবুল হবে না। যদি সে ঐ অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে তাহলে জাহান্নামে প্রবেশ করবে। পুনরায় সে যদি মদ পান করে ও নেশাগ্রস্ত হয় তবে তার চল্লিশ দিনের ছালাত কবুল হবে না। যদি সে ঐ অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে তাহলে জাহান্নামে প্রবেশ করবে। পুনরায় যদি সে মদ পান করে তবে তাকে ক্বিয়ামত দিবসে 'রাদগাতুল খাবাল' পান করানো আল্লাহ্ জন্য কর্তব্য হয়ে দাঁড়াবে। ছাহাবীগণ বললেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)! 'রাদগাতুল খাবাল' কি? তিনি বললেন, জাহান্নামীদের দেহ নিঃসৃত পুঁজ-রক্ত'।১১৮
এই যদি হয় সাধারণ নেশায় অভ্যস্ত ব্যক্তিদের পরিণতি, তবে ঐ সমস্ত লোকদের পরিণতি কেমন হবে, যারা গুরুতরভাবে নেশার দ্রব্যে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে এবং অবিরতভাবে তা পান করে থাকে।
টিকাঃ
১১২. মদ তথা নেশার দ্রব্যাদি আধুনিক সভ্যতার এক নিদারুণ অভিশাপ। নেশার আবেশে আজকের পৃথিবী তলিয়ে যাচ্ছে। যতই আইন-কানূন করে ও বিরুদ্ধ প্রচার চালিয়ে বন্ধের চেষ্টা করা হচ্ছে, ততই যেন প্রতিনিয়ত তা প্রসার লাভ করছে। বর্তমান সভ্যতার মুখে এ এক নির্লজ্জ চপেটাঘাত। অথচ বহু পূর্বেই ইসলাম শুধু মদ পান করাই হারাম করেনি; বরং এর উৎপাদন ও বেচা-কেনা পর্যন্ত হারাম করেছে এবং পানকারীর জন্য দৈহিক শাস্তি নির্ধারণ করেছে। -অনুবাদক
১১৩. মুসলিম; মিশকাত হা/৩৬৩৯।
১১৪. আহমাদ; মিশকাত হা/৩৬৫৬, সনদ হাসান।
১১৫. আবুদাউদ, ইবনু মাজাহ; মিশকাত হা/৪২৯২।
১১৬. মুসলিম; মিশকাত হা/৩৬৩৮।
১১৭. (مَا أَسْكَرَ كَثِيرُهُ فَقَلِيلُهُ حَرَامٌ) আবুদাউদ; মিশকাত হা/৩৬৪৫।
১১৮. ইবনু মাজাহ হা/৩৩৭৭; ছহীহুল জামে' হা/৬৩১৩।
📄 সোনা-রূপার পাত্র ব্যবহার ও তাতে পানাহার করা
আধুনিক কালে গার্হস্থ্য জিনিসপত্রের এমন কোন দোকান পাওয়া যাবে না, যেখানে সোনা-রূপার পাত্র অথবা সোনা-রূপার প্রলেপযুক্ত পাত্রাদি নেই। ধনীদের গৃহে এমনকি অনেক হোটেলেও এসব পাত্র পরিবেশন করা হয়। এ জাতীয় পাত্র বিভিন্ন অনুষ্ঠানে প্রদত্ত মূল্যবান উপঢৌকনে পরিণত হয়েছে। অনেকে নিজ বাড়িতে সোনা-রূপার পাত্র রাখে না বটে কিন্তু অন্যের বাড়ীতে 'ওয়ালীমা' ইত্যাদি অনুষ্ঠানে পরিবেশিত সোনা-রূপার পাত্র ব্যবহারে কুণ্ঠাবোধ করে না। অথচ নিজ বাড়ীতে হৌক কিংবা অন্যের বাড়ীতে হৌক, শরী'আতে এসব পাত্র ব্যবহার হারাম ঘোষিত হয়েছে। এ জাতীয় পাত্র ব্যবহারে কঠোর শাস্তির কথা হাদীছে এসেছে। উম্মু সালামা (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,
إِنَّ الَّذِي يَأْكُلُ أَوْ يَشْرَبُ فِي آنِيَةِ الْفِضَّةِ وَالذَّهَبِ إِنَّمَا يُجَرْجِرُ فِي بَطْنِهِ نَارَ جَهَنَّمَ
'যে ব্যক্তি রূপা ও সোনার পাত্রে খাবে কিংবা পান করবে তার পেটে জাহান্নামের আগুন ঢক ঢক করে ঢুকিয়ে দেওয়া হবে'।১১৯
এ বিধান খাবারের পাত্র সহ যেকোন ধরনের সোনা-রূপার পাত্রের জন্য প্রযোজ্য। যেমন- প্লেট, ডিস, কাঁটা চামচ, চামচ, ছুরি, মেহমানদারীর জন্য প্রস্তুত খাদ্য প্রদানের পাত্র, বিবাহ ইত্যাদিতে মিষ্টি প্রভৃতি পরিবেশনের ডালা বা বারকোশ ইত্যাদি।
কিছু লোক শোকেসের মধ্যে সোনা-রূপার পাত্র রেখে বলে, এগুলি আমরা ব্যবহার করি না, কেবল সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য রেখে দিয়েছি। হারামের পথ রুদ্ধ করার জন্য তাদের উক্ত কাজও অনুমোদনযোগ্য নয়।
টিকাঃ
১১৯. মুসলিম হা/২০৬৫।
📄 মিথ্যা সাক্ষ্যদান
আল্লাহ তা'আলা বলেছেন,
فَاجْتَنِبُوا الرِّجْسَ مِنَ الْأَوْثَانِ وَاجْتَنِبُوا قَوْلَ الزُّورِ - حُنَفَاءَ لِلَّهِ غَيْرَ مُشْرِكِينَ بِهِ -
‘সুতরাং তোমরা পূতিগন্ধ অর্থাৎ মূর্তি, প্রতিমা থেকে দূরে থাক এবং মিথ্যা কথন থেকে দূরে থাক, আল্লাহ্র প্রতি একনিষ্ঠ হয়ে ও তাঁর সঙ্গে শিরক না করে' (হজ্জ ৩০-৩১)।
হাদীছে এসেছে,
عَنْ عَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ أَبِي بَكْرَةَ عَنْ أَبِيهِ قَالَ : كُنَّا عِنْدَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ: أَلاَ أُنَبِّئُكُمْ بِأَكْبَرِ الْكَبَائِرِ ثَلاثًا - قَالُوا بَلَى يَا رَسُولَ اللَّهِ - قَالَ : الْإِشْرَاكُ بِاللهِ، وَعُقُوقُ الْوَالِدَيْنِ وَجَلَسَ وَكَانَ مُتَّكِيًّا فَقَالَ: أَلَا وَقَوْلُ الزُّورِ وَشَهَادَةُ الزُّورِ - قَالَ فَمَا زَالَ يُكَرِّرُهَا حَتَّى قُلْنَا لَيْتَهُ سَكَتَ
'আবু বাকরা (রাঃ) বলেন, আমরা রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর মজলিসে ছিলাম। এমন সময় তিনি আমাদেরকে লক্ষ্য করে বললেন, 'আমি কি তোমাদেরকে বৃহত্তম কবীরা গুনাহ সম্পর্কে অবহিত করব না? কথাটি তিনি তিনবার বললেন। ছাহাবীগণ বললেন, অবশ্যই বলবেন, হে আল্লাহ্র রাসূল (ছাঃ)! (উত্তরে তিনি বললেন) আল্লাহ্র সঙ্গে শিরক করা, মাতা-পিতার অবাধ্য হওয়া। তিনি হেলান দেওয়া অবস্থায় কথাগুলি বলছিলেন। অতঃপর সোজা হয়ে বসে বললেন, শুনে রাখ! আর মিথ্যা বলা ও মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া। এ কথাটি তিনি এতবার বলতে থাকলেন যে আমরা শেষ পর্যন্ত বলে ফেললাম, যদি তিনি এবার ক্ষান্ত হ'তেন!'১২০
আলোচ্য হাদীছে মিথ্যা সাক্ষ্যের ভয়াবহতা বুঝাতে পুনঃপুনঃ কথাটি বলা হয়েছে। কেননা মানুষ এ বিষয়টিকে হালকাভাবে নিয়ে থাকে। মিথ্যা সাক্ষ্য নিষিদ্ধ হওয়ার পেছনে অনেক কারণও রয়েছে। যেমন শত্রুতা, হিংসা ইত্যাদি। মিথ্যা সাক্ষ্যের ফলে ক্ষয়-ক্ষতিও হয় প্রচুর। মিথ্যা সাক্ষ্যের ফলে কত হক্ব যে বিনষ্ট হয়ে গেছে, কত নির্দোষ লোক যুলুম-নিপীড়নের শিকার হচ্ছে, কত লোক যে জিনিসের উপর তাদের কোন অধিকার নেই তাতে অধিকার প্রতিষ্ঠা করছে, কতজন যে বংশের মানুষ নয় সে বংশের সন্তান গণ্য হচ্ছে- তার কোন ইয়ত্তা নেই।
কিছু লোক বিচার-ফায়ছালার জন্য অন্য লোককে এই বলে স্বপক্ষে টেনে আনে যে, তুমি আমার পক্ষে অমুক বিষয়ে আদালতে সাক্ষ্য দিবে, তোমার প্রয়োজনে আমিও তোমার পক্ষে সাক্ষ্য দিব। সাক্ষ্য দিতে হলে যেখানে ঘটনা প্রত্যক্ষ করা অপরিহার্য সেখানে হয়ত এই লোকটির সঙ্গে তার কোর্টের বারান্দায় কিংবা বাড়ীর দহলিজে মাত্র দেখা হয়েছে। মূল ঘটনার সময় হয়ত সে আদৌ উপস্থিত ছিল না। তা সত্ত্বেও সে তার পক্ষে সাক্ষ্য প্রদান করে। তার এই মিথ্যা সাক্ষ্যের ফলে কোন ভূমি কিংবা বাড়ীর মালিকানা প্রকৃত মালিকের হাতছাড়া হয়ে যেতে পারে। কিংবা কোন দোষী ব্যক্তি বেকসুর খালাস পেয়ে যেতে পারে। এসব সাক্ষ্য ডাহা মিথ্যা। সুতরাং না দেখে না জেনে কোন প্রকারেই সাক্ষ্য দেওয়া যাবে না। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেছেন, وَمَا شَهِدْنَا إِلَّا بِمَا عَلِمْنَا 'আমরা যা জানি তার বাইরে সাক্ষ্য দিতে পারি না' (ইউসুফ ৮১)।
টিকাঃ
১২০. বুখারী হা/২৬৫৪, ৫৯৭৬; মুসলিম হা/৮৭।
📄 বাদ্যযন্ত্র ও গান
আল্লাহ তা'আলা বলেন, – وَمِنَ النَّاسِ مَنْ يَشْتَرِي لَهْوَ الْحَدِيثِ لِيُضِلُّ عَنْ سَبِيلِ اللهِ 'মানুষের মাঝে কেউ কেউ এমন আছে, যে আল্লাহ্র রাস্তা (ইসলাম) হতে বিচ্যুত করার জন্য অসার কথা খরিদ করে' (লুক্বমান ৬)।
ইবনু মাস'ঊদ (রাঃ) আল্লাহ্র কসম করে বলেছেন, উক্ত আয়াতে 'অসার কথা’ বলতে গানকে বুঝানো হয়েছে।১২২
আবূ আমির ও আবূ মালিক আল-আশ'আরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, لَيَكُونَنَّ مِنْ أُمَّتِي أَقْوَامٌ يَسْتَحِلُّونَ الْحِرَ وَالْحَرِيرَ وَالْخَمْرَ وَالْمَعَازِفَ 'অবশ্যই আমার উম্মতের মধ্যে এমন অনেক গোষ্ঠী হবে, যারা স্বাধীন মানুষের কেনা-বেচা, রেশম ব্যবহার, মদ ও বাদ্যযন্ত্রকে হালাল গণ্য করবে'।১২৩
আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, لَيَكُونَنَّ فِي هَذِهِ الأُمَّةِ حَسْفٌ وَقَدْفٌ وَمَسْخُ وَذَلِكَ إِذَا شَرِبُوا الْخُمُورَ وَاتَّخَذُوا الْقَيْنَاتِ وَضَرَبُوا بِالْمَعَازِفِ 'অবশ্যই এই উম্মতের মধ্যে ভূমিধ্বস, আসমান থেকে নিক্ষিপ্ত গযব ও দৈহিক রূপান্তরের শাস্তির প্রাদুর্ভাব দেখা দিবে। এসব তখনই ঘটবে যখন তারা মদ্যপান শুরু করবে, গায়িকা রাখবে ও বাদ্যযন্ত্র বাজাবে'।১২৪
রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ঢোল-তবলা বাজাতে নিষেধ করেছেন১২৫ এবং বাঁশিকে দুষ্ট লোক ও বোকার কণ্ঠস্বর নামে আখ্যায়িত করেছেন১২৬।
পূর্বসূরি আলেমগণ যেমন ইমাম আহমাদ (রহঃ) প্রমুখ পরিষ্কার ভাষায় বলেছেন, অসার ক্রীড়া-কৌতুক, গান-বাজনা এবং তাতে ব্যবহৃত যন্ত্রাদি হারাম। যেমন সারেঙ্গী, তানপুরা, রাবাব, মন্দিরা, বাঁশি, ফ্রুট বাঁশি, তবলা ইত্যাদি।
আধুনিক বাদ্যযন্ত্রসমূহ নিঃসন্দেহে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর নিষেধ বাণীর আওতায় পড়ে। যেমন- বেহালা, একতারা, দোতারা, হার্প, পিয়ানো, গিটার, ম্যাণ্ডেলিন ইত্যাদি। এই যন্ত্রগুলি বরং হাদীছে নিষিদ্ধ তৎকালীন অনেক যন্ত্র থেকে অনেক বেশী মোহ ও তন্ময়তা সৃষ্টি করে। এমনকি বাদ্যযন্ত্রের নেশা মদের নেশা থেকেও অনেক বড় হয়ে দাঁড়ায়।
আর যদি বাদ্যযন্ত্রের সাথে গান ও সুর সংযোজিত হয় তাহলে পাপের পরিধি বেড়ে যাবে, হারামও কঠিন হবে। সেই সাথে গানের কথাগুলি যদি প্রেম-ভালবাসা, রূপচর্চা, যৌন উদ্দীপনা সৃষ্টিকারী ইত্যাদি বিষয়ে হয় তাহলে তো মুছীবতের কোন শেষ নেই।
এ কারণেই আলেমগণ বলেছেন, গান ব্যভিচারের বার্তাবাহক এবং অন্তরে কপটতা সৃষ্টিকারী। মোটকথা, বর্তমান কালে গানের কথা, সুর ও বাদ্য এক বিরাট ফিত্না হয়ে দাঁড়িয়েছে। মিউজিকের এই সর্বগ্রাসী থাবা এখন শুধু গানেই সীমাবদ্ধ নেই; বরং তা ঘড়ি, ঘণ্টা, ভেঁপু, শিশুখেলনা, কম্পিউটার ও টেলিফোন ও মোবাইলের মাঝেও বিস্তৃত হয়েছে। মনের দৃঢ় সংকল্প না থাকলে এসব থেকে বাঁচা বড়ই দুষ্কর । وَاللَّهُ الْمُسْتَعَانُ 'আল্লাহই সাহায্যস্থল'।
টিকাঃ
১২১. গান-বাজনার সঙ্গে পরিচিত নয় এমন মানুষ পাওয়া দুষ্কর। গানের বিভিন্ন প্রকার রয়েছে। কিন্তু কম্বলের লোম বাছা যেমন কষ্টকর তেমনি অসংখ্য হারাম গানের মধ্য হতে দু'একটি হালাল গান বের করাও কষ্টকর। গান দ্বারা যদি আল্লাহ ও রাসূলের প্রশংসা করা হয়, জিহাদের প্রতি অনুপ্রাণিত করা হয়, ইসলামের অনুশাসন মেনে চলতে উদ্বুদ্ধ করা হয়, চরিত্র গঠনের চেষ্টা করা হয়, পাপ-পংকিলতা থেকে নিরুৎসাহিত করা হয়, তাহলে বাদ্যযন্ত্রবিহীন এ জাতীয় গান বৈধ হবে। উল্লিখিত ও অনুরূপ বিষয় ছাড়া গান হারাম -অনুবাদক।
১২২. তাফসীরে ইবনু কাছীর ৬/৩৩৩ পৃঃ।
১২৩. বুখারী; মিশকাত হা/৫৩৪৩।
১২৪. তিরমিযী হা/২১৮৫; সিলসিলা ছহীহাহ হা/২২০৩।
১২৫. বায়হাক্বী, মিশকাত হা/৪৫০৩; ছহীহুল জামে' হা/১৭৪৭-৪৮।
১২৬. তিরমিযী হা/১০০৫; ছহীহুল জামে' হা/৫১৯৪।