📄 সন্তানদের উপহার প্রদানে সমতা রক্ষা না করা
আমাদের সমাজে এমন অনেক মাতা-পিতা আছেন, যারা এক সন্তানকে 'হেবা' বা উপহার দিলে অন্যান্য সন্তানকে দেন না। নিয়ম হ'ল, সন্তানদের সবাইকে বিশেষ কোন উপহার সমান হারে দিতে হবে; আর না হলে কাউকে দেয়া যাবে না। নিয়ম লংঘন করে সন্তান বিশেষকে দেয়া ও অন্যদের বঞ্চিত করা ঠিক নয়। শারঈ কারণ ব্যতীত এরূপ দান করলে তা হারাম বলে গণ্য হবে। শারঈ কারণ বলতে সন্তানদের একজনের এমন প্রয়োজন দেখা দিয়েছে, যা অন্যদের নেই। যেমন- সে অসুস্থ, কিংবা বেকার, অথবা ছাত্র, কিংবা সংসারে তার সদস্য সংখ্যা অনেক তথা সে পোষ্য ভারাক্রান্ত, অথবা সে কুরআন মুখস্থ করেছে তাই উৎসাহ ধরে রাখতে কিছু দেয়া ইত্যাদি। পিতা এরূপ শারঈ কারণবশতঃ কোন সন্তানকে কিছু দেয়ার সময় নিয়ত করবে যে, অন্য কোন সন্তানের যদি এরূপ প্রয়োজন দেখা দেয় তাহলে তাকেও তিনি তার প্রয়োজন মত দিবেন। এ কথার সাধারণ দলীল আল্লাহ্ বাণী- اِعْدِلُوا هُوَ أَقْرَبُ لِلتَّقْوَى وَاتَّقُوا اللَّهَ ‘তোমরা সুবিচার কর। ইহা আল্লাহভীতির অধিক নিকটবর্তী। আর তোমরা আল্লাহকে ভয় কর' (মায়েদাহ ৮)। আর বিশেষ দলীল হল রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর হাদীছ। একদা নু'মান বিন বাশীর (রাঃ)-এর পিতা তাকে রাসূল (ছাঃ)-এর দরবারে নিয়ে গিয়ে বললেন, 'আমি আমার এই পুত্রকে একটা দাস দান করেছি'। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) একথা শুনে বললেন, 'তোমার সকল সন্তানকে কি তার মত করে দান করেছ? পিতা বললেন, 'না'। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন, 'তাহলে উক্ত দান ফেরত নাও'। অন্য বর্ণনায় আছে, 'তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং তোমাদের সন্তানদের মধ্যে সুবিচার কর'। বর্ণনাকারী বলেন, তিনি বাড়ী ফিরে এসে ঐ দাস ফেরত নেন। অপর এক বর্ণনায় এসেছে, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, فَلاَ تُشْهِدْنِي إِذًا فَإِنِّي لَا أَشْهَدُ عَلَى جَوْرٍ 'তাহলে তুমি আমাকে সাক্ষী করো না। কেননা যুলুমের সাক্ষী আমি হতে পারি না'।১০৪
কোন কোন পিতাদের দেখা যায় যে, তারা সন্তান বিশেষকে অহেতুক অগ্রাধিকার দানে আল্লাহকে ভয় করেন না। এর ফলে সন্তানদের মধ্যে মন কষাকষির সৃষ্টি হয়। তারা একে অপরের প্রতি শত্রু ও বিদ্বেষ ভাবাপন্ন হয়ে ওঠে। কখনো কোন সন্তানকে পিতৃকুলের আকৃতি পাওয়ার জন্য দেওয়া হয়, অন্য সন্তানকে মাতৃকুলের আকৃতি পাওয়ার জন্য বঞ্চিত করা হয়। এক স্ত্রীর সন্তানকে দেওয়া হয়, অন্য স্ত্রীর সন্তানদের দেওয়া হয় না। আবার অনেক সময় তাদের একজনের সন্তানদেরকে বিশেষ ধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করা হয়, কিন্তু অন্যজনের সন্তানদের ক্ষেত্রে অনুরূপ ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। এর কুফল অচিরেই ঐসব মাতা-পিতাকে ভোগ করতে হয়। অনেক ক্ষেত্রেই ঐসব বঞ্চিত সন্তান ভবিষ্যতে তাদের পিতার সঙ্গে সদাচরণ করে না।
সন্তানদের মধ্যে দান-দক্ষিণায় কাউকে বেশী গুরুত্ব দেয়া ব্যক্তি সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, أَلَيْسَ يَسُرُّكَ أَنْ يَكُونُوا إِلَيْكَ فِي الْبِرِّ سَوَاءً 'তোমার সন্তানেরা তোমার সাথে সমান সদাচরণ করুক তা কি তোমাকে আনন্দিত করবে না'?।১০৫ সুতরাং সন্তানদের প্রতি দান-দক্ষিণায় সমতা রক্ষা করা অপরিহার্য।
টিকাঃ
১০৪. মুসলিম হা/১৬২৩; মিশকাত হা/৩০৯০।
📄 ভিক্ষাবৃত্তি
সাহল বিন হানযালিয়াহ (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,
مَنْ سَأَلَ وَعِنْدَهُ مَا يُغْنِيهِ فَإِنَّمَا يَسْتَكْثِرُ مِنْ جَمْرِ جَهَنَّمَ - فَقَالُوا يَا رَسُولَ اللَّهِ وَمَا الْغِنَى الَّذِي لَا تَنْبغِي مَعَهُ الْمَسْأَلَةُ قَالَ : قَدْرُ مَا يُغَدِّيهِ وَيُعَشِّيهِ
'যার নিকট অভাব মোচনের মত সামগ্রী আছে অথচ সে ভিক্ষা করে, সে জাহান্নামের অঙ্গারকেই কেবল বর্ধিষ্ণু করে। ছাহাবীগণ আরয করলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)! কতটুকু সম্পদ থাকলে ভিক্ষা করা উচিৎ নয়? উত্তরে তিনি বললেন, সকাল-সন্ধ্যায় খাওয়া চলে এমন পরিমাণ সম্পদ'।১০৬
ইবনু মাস'ঊদ (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, مَنْ سَأَلَ وَلَهُ مَا يُغْنِيهِ جَاءَتْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ خُمُوسٌ أَوْ خُدُوسٌ أَوْ كُدُوحٌ فِي وَجْهِهِ ‘যার নিকট অভাব মোচনের মত সামর্থ্য আছে অথচ সে ভিক্ষা করে, ক্বিয়ামত দিবসে সে মুখে গোশত শূন্য হয়ে উঠবে'।১০৭
অনেক ভিক্ষুক মসজিদে আল্লাহ্র বান্দাদের সামনে দাঁড়িয়ে তাদের অভাব-অভিযোগের ফিরিস্তি আওড়াতে থাকে। এতে মুছল্লীদের তাসবীহ-তাহলীলে ছেদ পড়ে। অনেকে মিথ্যা বলে এবং ভুয়া কার্ড ও কাগজপত্র দেখায়। অনেকে আবার মনগড়া কাহিনী বলে ভিক্ষা করে। কোন কোন ভিক্ষুক স্বীয় পরিবারের সদস্যদের বিভিন্ন মসজিদ ও জনসমাগম স্থলে ভাগ করে দেয়। দিন শেষে তারা একস্থানে একত্রিত হয়ে নিজেদের আয় গুণে দেখে। এভাবে তারা যে কত ধনী হয়েছে তা আল্লাহ ছাড়া আর কেউ জানে না। যখন তারা মৃত্যুবরণ করে, তখন জানা যায় কি পরিমাণ সম্পদ তারা রেখে গেছে।
পক্ষান্তরে একদল প্রকৃতই অভাবী রয়েছে। যাদের সংযম দেখে তাদের অবস্থা সম্পর্কে অজ্ঞ লোকেরা তাদেরকে ধনী বলেই মনে করে। তারা কাকুতি-মিনতি করে লোকদের নিকটে চায় না। ফলে তাদের অবস্থা যেমন জানার বাইরে থেকে যায়, তেমনি তাদের কিছু দেওয়াও হয় না।
টিকাঃ
১০৫. ইবনু মাজাহ হা/২৩৭৫; আবুদাঊদ হা/৩৫৪২।
১০৬. আবুদাউদ; মিশকাত হা/১৮৪৮।
১০৭. আবুদাঊদ, মিশকাত হা/১৮৪৭।
📄 ঋণ পরিশোধে অনীহা প্রকাশ করা
মহান রাব্বুল আলামীনের নিকটে বান্দার হক অতীব গুরুত্ববহ। আল্লাহ্র হক নষ্ট করলে তওবার মাধ্যমে ক্ষমা পাওয়া যায়। কিন্তু বান্দার হক নষ্ট করলে সংশ্লিষ্ট বান্দার নিকট থেকে ক্ষমা না পেলে ক্ষমা লাভের কোন উপায় নেই। যেকোন মূল্যে তার হক আদায় করতে হবে ঐদিন আসার পূর্বে যেদিন টাকা-পয়সার কোন কারবার হবে না। সেদিন হকদারের পাপ হক আত্মসাৎকারীকে দেওয়া হবে এবং হক আত্মসাৎকারীর নেকী হকদারকে দেওয়া হবে। আল্লাহ তা'আলা বলেছেন, إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُكُمْ أَنْ تُؤَدُّوا الْأَمَانَاتِ إِلَى أَهْلِهَا ‘নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দিচ্ছেন যে, তোমরা আমানতকে তার প্রাপকের নিকটে অর্পণ করবে' (নিসা ৫৮)।
বর্তমান সমাজে ঋণ গ্রহণ একটি মামুলী ও গুরুত্বহীন বিষয় বলে বিবেচিত। অনেকে অভাবের জন্য নয়; বরং প্রাচুর্য সৃষ্টি ও অন্যের সাথে প্রতিযোগিতা করতে গিয়ে নতুন নতুন বাড়ী, গাড়ী, আসবাবপত্র ইত্যাদি ক্রয়ের জন্য ঋণ নিয়ে থাকে। অনেক সময় এরা কিস্তিতে বেচা-কেনা করে থাকে, যার অনেকাংশই সন্দেহপূর্ণ বা হারাম।
ঋণ পরিশোধকে লঘু বা সাধারণভাবে নিলে প্রায়শই সেখানে টালবাহানা ও গড়িমসি সৃষ্টি হয়। ক্ষেত্রবিশেষে তাতে অপরের সম্পদ বিনষ্ট করা হয়। এর শোচনীয় পরিণতি বর্ণনা করতে গিয়ে নবী করীম (ছাঃ) বলেছেন,
مَنْ أَخَذَ أَمْوَالَ النَّاسِ يُرِيدُ أَدَاءَهَا أَدَّى اللهُ عَنْهُ ، وَمَنْ أَخَذَ يُرِيدُ إِثْلَافَهَا أَتْلَفَهُ اللَّهُ
'যে ব্যক্তি পরিশোধের নিয়তে মানুষের সম্পদ গ্রহণ করে, আল্লাহ তা'আলা তার পক্ষ থেকে তা পরিশোধ করে দেন। আর যে তা বিনষ্ট করার নিয়তে গ্রহণ করে থাকে, আল্লাহ তাকে বিনষ্ট করে দেন'।১০৮
মানুষ ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে বড় উদাসীন। তারা এটাকে খুবই তুচ্ছ মনে করে। অথচ আল্লাহ্র নিকট তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এমনকি আল্লাহ্র রাস্তায় শহীদ ব্যক্তি এতসব মর্যাদা ও অগণিত ছওয়াবের অধীকারী হওয়া সত্ত্বেও ঋণ পরিশোধের দায় থেকে সে অব্যাহতি পায়নি। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,
سُبْحَانَ اللَّهِ مَاذَا أَنْزَلَ مِنَ التَّشْدِيدِ فِي الدَّيْنِ وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ لَوْ أَنَّ رَجُلًا قُتِلَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ ثُمَّ أُحْيِيَ ثُمَّ قُتِلَ ثُمَّ أُحْيِيَ ثُمَّ قُتِلَ وَعَلِيهِ دَيْنٌ مَا دَخَلَ الْجَنَّةَ حَتَّى يُقْضَى عَنْهُ دَيْنَهُ -
'সুবহানাল্লাহ! ঋণ প্রসঙ্গে কী কঠোর বাণীই না আল্লাহ তা'আলা অবতীর্ণ করেছেন। যার হাতে আমার জীবন তাঁর শপথ, ঋণগ্রস্ত অবস্থায় কেউ যদি আল্লাহ্ পথে শহীদ হয় তারপর জীবিত হয়, তারপর শহীদ হয়, তারপর জীবিত হয়, তারপর আবার শহীদ হয় তবুও ঋণ পরিশোধ না করা পর্যন্ত সে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না'।১০৯ এরপরও কি ঋণ পরিশোধে টালবাহানাকারী মতলববাজদের হুঁশ ফিরবে না?
টিকাঃ
১০৮. বুখারী; মিশকাত হা/২৯১০।
📄 হারাম ভক্ষণ
যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে না সে কোথা থেকে অর্থ উপার্জন করল এবং কোথায় ব্যয় করল তার কোন পরোয়া করে না। তার একটাই ইচ্ছা সম্পদ বৃদ্ধি করা। চাই তা হারাম, অবৈধ যে পথেই হৌক। এজন্য সে ঘুষ, চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, আত্মসাৎ, হারাম দ্রব্য ক্রয়-বিক্রয়, সূদ, ইয়াতীমের মাল ভক্ষণ, জ্যোতিষী, বেশ্যাবৃত্তি, গান-বাজনা ইত্যাদি হারাম কাজের মাধ্যমে অর্থ উপার্জন, এমনকি মুসলমানদের সরকারী কোষাগার কিংবা জনগণের সম্পদ কুক্ষিগত করা, মানুষকে সংকটে ফেলে তার সম্পদ বাগিয়ে নেওয়া, ভিক্ষাবৃত্তি ইত্যাদি যেকোন উপায়ে অর্থ উপার্জন করে। অতঃপর সে ঐ অর্থ হতে খায়, পরিধান করে, গাড়িতে চড়ে, বাড়ী-ঘর তৈরী করে কিংবা বাড়ী ভাড়া নিয়ে দামী আসবাবপত্র দিয়ে সাজায়। এভাবে হারাম দিয়ে তার উদর পূর্তি করে। অথচ নবী করীম (ছাঃ) বলেছেন, كُلِّ لَحْمٍ نَبَتَ مِنْ سُحْتِ إِلَّا كَانَتِ النَّارُ أَوْلَى بِهِ 'শরীরের যতটুকু গোশত হারাম হতে উৎপন্ন হয়েছে, তা জাহান্নামের জন্যই সবচেয়ে বেশী উপযুক্ত'।১১০ আর ক্বিয়ামতের দিনেও তাকে জিজ্ঞেস করা হবে, কোথা থেকে সে ধন-সম্পদ উপার্জন করেছে এবং কোথায় ব্যয় করেছে।১১১ সুতরাং এই শ্রেণীর লোকদের জন্য শুধু ধ্বংসই অপেক্ষা করছে।
টিকাঃ
১০৯. নাসাঈ হা/৪৬৮৪; ছহীহুল জামে' হা/৩৬০০।
১১০. আহমাদ, তিরমিযী; মিশকাত হা/২৭৭২।
১১১. তিরমিযী; মিশকাত হা/৫১৯৭।