📄 গায়ের মাহরাম মহিলার সাথে নির্জনে অবস্থান
মানুষের মধ্যে ফিতনা ও অশান্তি সৃষ্টি করতে শয়তান সদা তৎপর। কি করে তাদের দ্বারা হারাম কাজ করানো যায় এ চিন্তা তার অহর্নিশ। তাই আল্লাহ তা'আলা আমাদেরকে সতর্ক করতে গিয়ে বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ وَمَنْ يَتَّبِعْ خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ فَإِنَّهُ يَأْمُرُ بِالْفَحْشَاءِ وَالْمُنْكَرِ -
'হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ কর না। যে শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করে তাকে তো সে অশ্লীল ও অন্যায় কাজেরই হুকুম দেয়' (নূর ২১)।
শয়তান মানুষের শিরা-উপশিরায় চলাচল করে।৬২ কোন গায়ের মাহরাম মহিলার সাথে একাকী অবস্থানের সুযোগ সৃষ্টির মাধ্যমে অশ্লীল কাজে লিপ্ত করা শয়তানেরই একটি চক্রান্ত। এজন্যই শরী'আত উক্ত রাস্তা বন্ধ করে দিয়েছে। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,
لا يَخْلُوَنَّ رَجُلٌ بِامْرَأَةِ إِلَّا كَانَ ثَالِثَهُمَا الشَّيْطَانُ
'কোন পুরুষ একজন মহিলার সাথে নির্জনে মিলিত হলে তাদের তৃতীয় সঙ্গী হয় শয়তান'।৬৩ ইবনু ওমর (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,
لاَ يَدْخُلَنَّ رَجُلٌ بَعْدَ يَوْمِي هَذَا عَلَى مُغِيبَةٍ إِلَّا وَمَعَهُ رَجُلٌ أَوِ اثْنَانِ
'আমার আজকের এই দিন থেকে কোন পুরুষ একজন কিংবা দু'জন পুরুষকে সঙ্গে করে ব্যতীত কোন স্বামী থেকে দূরে থাকা মহিলা বা প্রোষিতভর্তৃকার সাথে নির্জনে দেখা করতে পারবে না'।৬৪
সুতরাং স্কুল-কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়েই হোক, আর বাড়ীর কক্ষেই হোক, কিংবা মোটর গাড়ীতেই হোক, কোথাও কোন পুরুষ লোক বিবাহ বৈধ এমন কোন মহিলার সাথে একাকী থাকতে পারবে না। নিজের ভাবী, পরিচারিকা, রুগিনী ইত্যাকার কারও সাথেই নির্জনবাস বৈধ নয়।
অনেক মানুষ আছে যারা আত্মবিশ্বাসের বলে হোক কিংবা দ্বিতীয় পক্ষের উপর নির্ভর করেই হোক উপরোক্ত মহিলাদের সাথে একাকী অবস্থানে খুবই উদার মনোভাব পোষণ করে। তারা এভাবে মেলামেশাকে খারাপ কিছুই মনে করে না। অথচ এরই মধ্য দিয়ে ব্যভিচারের সূত্রপাত হয়, সমাজ দেহ কলুষিত হয় এবং সমাজে অবৈধ সন্তানদের প্রাদুর্ভাব বেড়ে যায়।
টিকাঃ
৬২. মুসলিম হা/২১৭৫।
৬৩. তিরমিযী, মিশকাত হা/৩১১৮।
৬৪. মুসলিম হা/২১৭৩।
📄 বিবাহ বৈধ এমন মহিলার সাথে করমর্দন
আজকের সমাজে নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা অবারিতভাবে চলছে। ফলে অনেক নারী-পুরুষই নিজেকে আধুনিক হিসাবে যাহির করার জন্য শরী'আতের সীমালংঘন করে পরস্পরে মুছাফাহা করছে। তাদের ভাষায় এটা হ্যান্ডশেক বা করমর্দন। আল্লাহ্ নিষেধকে থোড়াই কেয়ার করে বিকৃত রুচি ও নগ্ন সভ্যতার অন্ধ অনুকরণে তারা এ কাজ করছে এবং নিজেদেরকে প্রগতিবাদী বলে যাহির করছে। আপনি তাদেরকে যতই বুঝান না কেন বা দলীল-প্রমাণ যতই দেখান না কেন তারা তা কখনই মানবে না। উল্টো আপনাকে প্রতিক্রিয়াশীল, সন্দেহবাদী, মোহাচ্ছন্ন, আত্মীয়তা ছিন্নকারী ইত্যাদি বিশেষণে আখ্যায়িত করবে।
চাচাত বোন, ফুফাত বোন, মামাত বোন, খালাত বোন, ভাবী, চাচী, মামী প্রমুখ আত্মীয়ের সঙ্গে মুছাফাহা করা তো তাদের নিকট পানি পানের চেয়েও সহজ কাজ। শরী'আতের দৃষ্টিতে কাজটি কত ভয়াবহ তা যদি তারা দূরদৃষ্টি দিয়ে দেখত তাহলে কখনই তারা এ কাজ করত না। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,
لَأَنْ يُطْعَنَ فِي رَأْسِ أَحَدِكُمْ بِمِخْيَطُ مِنْ حَدِيدِ خَيْرٌ لَهُ مِنْ أَنْ يَمَسَّ امْرَأَةً لَا تَحِلُّ لَهُ --
'নিশ্চয়ই তোমাদের কারো মাথায় লোহার পেরেক ঠুকে দেয়া ঐ মহিলাকে স্পর্শ করা থেকে অনেক শ্রেয়, যে তার জন্য হালাল নয়'।৬৫
নিঃসন্দেহে এটা হাতের যিনা। যেমন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,
الْعَيْنَانِ تَزْنِيَانِ وَالْيَدَانِ تَزْنِيَانِ وَالرِّجْلَانِ تَزْنِيَانِ وَالْفَرْجُ يَزْنِي
'দু'চোখ যিনা করে, দু'হাত যিনা করে, দু'পা যিনা করে এবং লজ্জাস্থানও যিনা করে'।৬৬
রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) থেকে অধিক পবিত্র মনের মানুষ আর কে আছে? অথচ তিনি বলেছেন, إِنِّى لَا أُصَافِحُ النِّسَاءَ 'আমি নারীদের সাথে মুছাফাহা করি না'।৬৭ তিনি আরও বলেছেন, إِنِّي لَا أَمَسُ أَيْدِيَ النِّسَاءِ 'আমি নারীদের হাত স্পর্শ করি না'।৬৮
মা আয়েশা (রাঃ) বলেছেন,
لاَ وَاللهِ مَا مَسَّتْ يَدُ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَدَ امْرَأَةٍ قَطُّ غَيْرَ أَنَّهُ يُبَايِعُهُنَّ بِالْكَلَامِ
'আল্লাহ্ শপথ, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর হাত কখনই কোন বেগানা নারীর হাত স্পর্শ করেনি। তিনি মৌখিক বাক্যের মাধ্যমে তাদের বায়'আত নিতেন'।৬৯
সুতরাং আধুনিক সাজতে গিয়ে যারা নিজেদের বন্ধুদের সাথে মুছাফাহা না করলে স্ত্রীদের তালাক দেয়ার হুমকি দেয় তারা যেন হুঁশিয়ার হয়। জানা আবশ্যক যে, মুছাফাহা কোন আবরণের সাহায্যে হোক বা আবরণ ছাড়া হোক উভয় অবস্থাতেই হারাম।
টিকাঃ
৬৫. তাবারাণী, সিলসিলা ছহীহাহ হা/২২৬।
৬৬. আহমাদ হা/৩৯১২; ছহীহুল জামে' হা/৪১২৬।
৬৭. আহমাদ হা/২৭৫৩; ছহীহাহ হা/২৫০৯।
৬৮. তাবারাণী কাবীর, ২৪/৩৪২; ছহীহুল জামে', হা/৭১৭৭।
৬৯. মুসলিম হা/১৮৬৬।
📄 পুরুষের মাঝে সুগন্ধি মেখে নারীর গমনাগমন
আজকাল আতর, সেন্ট ইত্যাদি নানা প্রকার সুগন্ধি মেখে নারীরা ঘরে-বাইরে পুরুষদের মাঝে চলাফেলা করছে। অথচ মহানবী (ছাঃ) এ বিষয়ে কঠোর সাবধান বাণী উচ্চারণ করেছেন। তিনি বলেন,
أَيُّمَا امْرَأَةٍ اسْتَعْطَرَتْ ثُمَّ مَرَّتْ عَلَى الْقَوْمِ لِيَجِدُوا رِيحَهَا فَهِيَ زَانِيَةٌ -
'পুরুষরা গন্ধ পাবে এমন উদ্দেশ্যে আতর মেখে কোন মহিলা যদি পুরুষদের মাঝে গমন করে তাহলে সে একজন ব্যভিচারিণী বলে গণ্য হবে'।৭০
অনেক মহিলা তো এ ব্যাপারে একেবারে উদাসীন কিংবা তারা বিষয়টিকে লঘুভাবে গ্রহণ করছে। তারা সেজেগুজে সুগন্ধি মেখে ড্রাইভারের সাথে গাড়ীতে উঠছে, দোকানে যাচ্ছে, স্কুল-কলেজে যাচ্ছে, কিন্তু শরী'আতের নিষেধাজ্ঞার দিকে বিন্দুমাত্র ভ্রূক্ষেপ করছে না। নারীদের বাইরে গমনকালে শরী'আত এমন কঠোরতা আরোপ করেছে যে, তারা সুগন্ধি মেখে থাকলে নাপাকী হেতু ফরয গোসলের ন্যায় গোসল করতে হবে। এমনকি যদি মসজিদে যায় তবুও। নবী করীম (ছাঃ) বলেছেন,
أَيُّمَا امْرَأَةٍ تَطَيِّبَتْ ثُمَّ خَرَجَتْ إِلَى الْمَسْجِدِ لِيُوجَدَ رِيحُهَا لَمْ يُقْبَلْ مِنْهَا صَلَاةٌ حَتَّى تَغْتَسِلَ اغْتِسَالَهَا مِنَ الْجَنَابَةِ -
'যে মহিলা গায়ে সুগন্ধি মেখে মসজিদের দিকে বের হয় এজন্য যে, তার সুবাস পাওয়া যাবে, তাহলে তার ছালাত তদবধি গৃহীত হবে না যে পর্যন্ত না সে নাপাকীর নিমিত্ত ফরয গোসলের ন্যায় গোসল করে'।৭১
হাটে-বাজারে, যানবাহনাদিতে, বিয়ে-শাদীর অনুষ্ঠানে, নানা ধরনের মানুষের সমাবেশে তথা সর্বত্র মহিলারা যে সুগন্ধিযুক্ত প্রসাধনী আতর, সেন্ট, আগর, ধূনা, চন্দনকাঠ ইত্যাদি নিয়ে যাতায়াত করছে তার বিরুদ্ধে একমাত্র আল্লাহ্র কাছেই সকল অভিযোগ। আল্লাহ্র নিকটে আমাদের প্রার্থনা, তিনি যেন আমাদের উপর ক্রুদ্ধ না হন। অপগণ্ড নর-নারীর কাজের জন্য সৎ লোকদের পাকড়াও না করেন এবং সবাইকে ছিরাতুল মুস্তাকীমে পরিচালিত করেন। আমীন!
টিকাঃ
৭০. আহমাদ, নাসাঈ; মিশকাত হা/১০৬৫।
৭১. আহমাদ ২/৪৪৪; ছহীহুল জামে' হা/২৭০৩।
📄 মাহরাম আত্মীয় ছাড়া স্ত্রীলোকের সফর
ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, لَا تُسَافِرِ الْمَرْأَةُ إِلَّا مَعَ ذِى مَحْرَمٍ 'কোন মহিলা স্থায়ীভাবে বিবাহ হারাম এমন কোন আত্মীয়কে সাথে না নিয়ে যেন ভ্রমণ না করে'।৭২
এই নির্দেশ সকল প্রকার সফরের জন্য সমভাবে প্রযোজ্য; এমনকি হজ্জের সফরের ক্ষেত্রেও। মাহরাম কোন পুরুষ তাদের সাথে না থাকলে দুশ্চরিত্রের লোকদের মনে তাদের প্রতি কুচিন্তা জাগ্রত হওয়া অসম্ভব কিছু নয়। এভাবে তারা তাদের পিছু নিতে পারে। আর নারীরা তো প্রকৃতিগতভাবেই দুর্বল। তারা তাদের মান, ইযযত, আব্রু নিয়ে সামান্যতেই বিব্রত বোধ করে। এমতাবস্থায় দুষ্টলোকেরা তাদের পিছু নিলে বাধা দেওয়া বা আত্মরক্ষামূলক কিছু করা তাদের জন্য কষ্টকর তো বটেই।
অনেক মহিলাকে বিমান কিংবা অন্য যানবাহনে উঠার সময় বিদায় জানাতে দু'একজন মাহরাম নিকটজন হাযির থাকে, আবার তাকে স্বাগত জানাতেও এমন দু'একজন হাযির থাকে। কিন্তু পুরো সফরে তার পাশে থাকে কে? যদি বিমানে কোন ত্রুটি দেখা দেয় এবং তা অন্য কোন বিমানবন্দরে অবতরণে বাধ্য হয়, কিংবা নির্দিষ্ট বিমানবন্দরে অবতরণে বিলম্ব ঘটে বা উড্ডয়নের সময়সূচী পরিবর্তন হয়, তাহলে তখন অবস্থা কি দাঁড়াবে? ট্রেন, বাস, স্টীমার প্রভৃতি সফরেও এরূপ ঘটনা হর-হামেশা ঘটে। তখন কী যে অবস্থার সৃষ্টি হয় তা ভুক্তভোগী ছাড়া বুঝিয়ে বলা কষ্টকর। সুতরাং সাথে একজন মাহরাম পুরুষ থাকা একান্ত দরকার, যে তার পাশে বসবে এবং আপদে-বিপদে ও উঠা-নামায় সাহায্য করবে।
মাহরাম হওয়ার জন্য চারটি শর্ত রয়েছে। যথা- মুসলমান হওয়া, প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া, সুস্থ মস্তিষ্কসম্পন্ন হওয়া ও পুরুষ হওয়া। যেমন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, ... أَبُوهَا أَوِ بْنُهَا أَوْ زَوْجُهَا أَوْ أَخُوهَا أَوْ ذُو مَحْرَمٍ مِنْهَا 'মহিলার পিতা, তার পুত্র, তার স্বামী, তার ভাই অথবা তার কোন মাহরাম পুরুষ তার সঙ্গে থাকবে'।৭৩
টিকাঃ
৭২. বুখারী, মুসলিম, মিশকাত হা/২৫১৫ ‘হজ্জ' অধ্যায়।
৭৩. মুসলিম হা/১৩৪০।