📄 পশ্চাৎদ্বার দিয়ে স্ত্রীগমন
দুর্বল ঈমানের কিছু লোক তাদের স্ত্রীদের সাথে পশ্চাৎদ্বার দিয়ে মেলামেশা করতে দ্বিধা করে না। অথচ এটা কবীরা গোনাহ। যারা এ কাজ করে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তাদের উপর অভিসম্পাত করেছেন।
আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, مَلْعُونٌ مَنْ أَتَى امْرَأَةً فِي دُبُرِهَا 'যে পশ্চাৎদ্বার দিয়ে স্ত্রীগমন করে সে অভিশপ্ত'।৫৮
পূর্বেও উল্লিখিত হয়েছে যে, তিনি বলেছেন, 'যে ব্যক্তি কোন ঋতুবতী রমণীর সাথে মিলিত হয় কিংবা পশ্চাৎদ্বারে সঙ্গম করে অথবা কোন গণকের নিকটে যায়, নিশ্চয়ই সে মুহাম্মাদের উপর যা অবতীর্ণ হয়েছে, তা অস্বীকার করে'।৫৯
অবশ্য কিছু সতী-সাধ্বী স্ত্রী তাদের স্বামীদেরকে এ কাজে বাধা দিয়ে থাকে। কিন্তু অনেক স্বামীই তাদের কথা না মানলে তালাকের হুমকি দেয়। আবার যেসকল স্ত্রী আলেমদেরকে জিজ্ঞেস করতে লজ্জাবোধ করে তাদেরকে প্রতারণাচ্ছলে ধারণা দেয় যে, এ জাতীয় কাজ বৈধ। কারণ আল্লাহ বলেন, نِسَاؤُكُمْ حَرْثٌ لَكُمْ فَأْتُوا حَرْثَكُمْ أَنَّى شِئْتُمْ 'তোমাদের স্ত্রীগণ তোমাদের জন্য ক্ষেত স্বরূপ। সুতরাং তোমরা তোমাদের ক্ষেতে যে পন্থায় ইচ্ছা গমন কর' (বাক্বারাহ ২২৩)।
অথচ নবী করীম (ছাঃ) উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেছেন, 'স্বামী স্ত্রীর সামনে দিয়ে, পিছন দিয়ে, যেকোন ভাবে যেতে পারবে, যতক্ষণ তা সন্তান প্রসবের দ্বারের সাথে সংশ্লিষ্ট থাকবে'।৬০ আর এটা অবিদিত নয় যে, পশ্চাৎদ্বার দিয়ে সন্তান প্রসব হয় না। সুতরাং আয়াতে সঙ্গমের বিভিন্ন ক্ষেত্রের কথা বলা হয়নি; বরং একই ক্ষেত্রে বিভিন্ন কৌশল বা পদ্ধতির মধ্যে যেটা ইচ্ছা সেটা অবলম্বনের কথা বলা হয়েছে। এসব অপরাধের মূলে রয়েছে বিবাহিত শালীন জীবনের পাশাপাশি গণিকাগমনের জাহেলী প্রথা, সমকামিতা এবং যত্রতত্র প্রদর্শিত অশ্লীল নীল ছবি। নিঃসন্দেহে এ জাতীয় কাজ হারাম। উভয়পক্ষ রাযী থাকলেও তা হারাম হবে। কেননা পারস্পরিক সম্মতিতে কোন হারাম হালাল হয়ে যায় না।
টিকাঃ
৫৮. আহমাদ, আবুদাউদ; মিশকাত হা/৩১৯৩।
৫৯. তিরমিযী; ছহীহুল জামে' হা/৫৯১৮।
৬০. আবুদাঊদ হা/২১৬৪, সনদ হাসান।
📄 স্ত্রীদের মধ্যে সমতা রক্ষা না করা
আল্লাহ তা'আলা কুরআন মাজীদে পুরুষদেরকে স্ত্রীদের মধ্যে সমতা বিধানের নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহ বলেন,
وَلَنْ تَسْتَطِيعُوا أَنْ تَعْدِلُوا بَيْنَ النِّسَاءِ وَلَوْ حَرَصْتُمْ فَلا تَمِيلُوا كُلَّ الْمَيْلِ فَتَذَرُوهَا كَالْمُعَلَّقَةِ وَإِنْ تُصْلِحُوا وَتَتَّقُوا فَإِنَّ اللَّهَ كَانَ غَفُورًا رَحِيمًا -
'তোমরা যতই আগ্রহ পোষণ কর না কেন তোমরা কখনো স্ত্রীদের প্রতি সমান ব্যবহার করতে পারবে না। তবে তোমরা কোন একজনের দিকে সম্পূর্ণরূপে ঝুঁকে পড় না ও অপরকে ঝুলন্ত অবস্থায় রেখ না। যদি তোমরা নিজেদেরকে সংশোধন কর ও সাবধান হও তবে আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু' (নিসা ১২৯)।
এখানে কাম্য হ'ল, রাত্রি যাপনে স্ত্রীদের মধ্যে সমতা রক্ষা করা, পর্যায়ক্রমে প্রত্যেকের নিকট এক রাত করে যাপন করা এবং প্রত্যেকের থাকা, খাওয়া ও পরার যথোপযুক্ত বন্দোবস্ত করা। অন্তরের ভালবাসা সবার জন্য সমান হতে হবে এমন বিধান শরী'আত দেয়নি। কেননা তা মানুষের ইখতিয়ার বহির্ভূত।
কিছু মানুষ আছে, যারা তাদের একাধিক স্ত্রীর একজনকে নিয়ে পড়ে থাকে, অন্যজনের দিকে ভ্রুক্ষেপও করে না; একজনের নিকট বেশী বেশী রাত কাটায় কিংবা বেশী খরচ করে, অন্যজনের কোন খোঁজই নেয় না। নিঃসন্দেহে এরূপ একপেশে আচরণ হারাম। ক্বিয়ামত দিবসে তাদের যে অবস্থা দাঁড়াবে তার একটি চিত্র আবু হুরায়রা (রাঃ) বর্ণিত নিম্নোক্ত হাদীছে আমরা পাই। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,
مَنْ كَانَتْ لَهُ امْرَأَتَانِ فَمَالَ إِلَى إِحْدَاهُمَا جَاءَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَشِقُّهُ مَائِلٌ -
'যার দু'জন স্ত্রী আছে, কিন্তু সে তাদের একজনের প্রতি ঝুঁকে পড়ে, ক্বিয়ামত দিবসে সে অর্ধাঙ্গবিহীন অবস্থায় উঠবে'।৬১
টিকাঃ
৬১. আবুদাঊদ হা/২১৩৩, সনদ ছহীহ।
📄 গায়ের মাহরাম মহিলার সাথে নির্জনে অবস্থান
মানুষের মধ্যে ফিতনা ও অশান্তি সৃষ্টি করতে শয়তান সদা তৎপর। কি করে তাদের দ্বারা হারাম কাজ করানো যায় এ চিন্তা তার অহর্নিশ। তাই আল্লাহ তা'আলা আমাদেরকে সতর্ক করতে গিয়ে বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ وَمَنْ يَتَّبِعْ خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ فَإِنَّهُ يَأْمُرُ بِالْفَحْشَاءِ وَالْمُنْكَرِ -
'হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ কর না। যে শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করে তাকে তো সে অশ্লীল ও অন্যায় কাজেরই হুকুম দেয়' (নূর ২১)।
শয়তান মানুষের শিরা-উপশিরায় চলাচল করে।৬২ কোন গায়ের মাহরাম মহিলার সাথে একাকী অবস্থানের সুযোগ সৃষ্টির মাধ্যমে অশ্লীল কাজে লিপ্ত করা শয়তানেরই একটি চক্রান্ত। এজন্যই শরী'আত উক্ত রাস্তা বন্ধ করে দিয়েছে। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,
لا يَخْلُوَنَّ رَجُلٌ بِامْرَأَةِ إِلَّا كَانَ ثَالِثَهُمَا الشَّيْطَانُ
'কোন পুরুষ একজন মহিলার সাথে নির্জনে মিলিত হলে তাদের তৃতীয় সঙ্গী হয় শয়তান'।৬৩ ইবনু ওমর (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,
لاَ يَدْخُلَنَّ رَجُلٌ بَعْدَ يَوْمِي هَذَا عَلَى مُغِيبَةٍ إِلَّا وَمَعَهُ رَجُلٌ أَوِ اثْنَانِ
'আমার আজকের এই দিন থেকে কোন পুরুষ একজন কিংবা দু'জন পুরুষকে সঙ্গে করে ব্যতীত কোন স্বামী থেকে দূরে থাকা মহিলা বা প্রোষিতভর্তৃকার সাথে নির্জনে দেখা করতে পারবে না'।৬৪
সুতরাং স্কুল-কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়েই হোক, আর বাড়ীর কক্ষেই হোক, কিংবা মোটর গাড়ীতেই হোক, কোথাও কোন পুরুষ লোক বিবাহ বৈধ এমন কোন মহিলার সাথে একাকী থাকতে পারবে না। নিজের ভাবী, পরিচারিকা, রুগিনী ইত্যাকার কারও সাথেই নির্জনবাস বৈধ নয়।
অনেক মানুষ আছে যারা আত্মবিশ্বাসের বলে হোক কিংবা দ্বিতীয় পক্ষের উপর নির্ভর করেই হোক উপরোক্ত মহিলাদের সাথে একাকী অবস্থানে খুবই উদার মনোভাব পোষণ করে। তারা এভাবে মেলামেশাকে খারাপ কিছুই মনে করে না। অথচ এরই মধ্য দিয়ে ব্যভিচারের সূত্রপাত হয়, সমাজ দেহ কলুষিত হয় এবং সমাজে অবৈধ সন্তানদের প্রাদুর্ভাব বেড়ে যায়।
টিকাঃ
৬২. মুসলিম হা/২১৭৫।
৬৩. তিরমিযী, মিশকাত হা/৩১১৮।
৬৪. মুসলিম হা/২১৭৩।
📄 বিবাহ বৈধ এমন মহিলার সাথে করমর্দন
আজকের সমাজে নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা অবারিতভাবে চলছে। ফলে অনেক নারী-পুরুষই নিজেকে আধুনিক হিসাবে যাহির করার জন্য শরী'আতের সীমালংঘন করে পরস্পরে মুছাফাহা করছে। তাদের ভাষায় এটা হ্যান্ডশেক বা করমর্দন। আল্লাহ্ নিষেধকে থোড়াই কেয়ার করে বিকৃত রুচি ও নগ্ন সভ্যতার অন্ধ অনুকরণে তারা এ কাজ করছে এবং নিজেদেরকে প্রগতিবাদী বলে যাহির করছে। আপনি তাদেরকে যতই বুঝান না কেন বা দলীল-প্রমাণ যতই দেখান না কেন তারা তা কখনই মানবে না। উল্টো আপনাকে প্রতিক্রিয়াশীল, সন্দেহবাদী, মোহাচ্ছন্ন, আত্মীয়তা ছিন্নকারী ইত্যাদি বিশেষণে আখ্যায়িত করবে।
চাচাত বোন, ফুফাত বোন, মামাত বোন, খালাত বোন, ভাবী, চাচী, মামী প্রমুখ আত্মীয়ের সঙ্গে মুছাফাহা করা তো তাদের নিকট পানি পানের চেয়েও সহজ কাজ। শরী'আতের দৃষ্টিতে কাজটি কত ভয়াবহ তা যদি তারা দূরদৃষ্টি দিয়ে দেখত তাহলে কখনই তারা এ কাজ করত না। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,
لَأَنْ يُطْعَنَ فِي رَأْسِ أَحَدِكُمْ بِمِخْيَطُ مِنْ حَدِيدِ خَيْرٌ لَهُ مِنْ أَنْ يَمَسَّ امْرَأَةً لَا تَحِلُّ لَهُ --
'নিশ্চয়ই তোমাদের কারো মাথায় লোহার পেরেক ঠুকে দেয়া ঐ মহিলাকে স্পর্শ করা থেকে অনেক শ্রেয়, যে তার জন্য হালাল নয়'।৬৫
নিঃসন্দেহে এটা হাতের যিনা। যেমন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,
الْعَيْنَانِ تَزْنِيَانِ وَالْيَدَانِ تَزْنِيَانِ وَالرِّجْلَانِ تَزْنِيَانِ وَالْفَرْجُ يَزْنِي
'দু'চোখ যিনা করে, দু'হাত যিনা করে, দু'পা যিনা করে এবং লজ্জাস্থানও যিনা করে'।৬৬
রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) থেকে অধিক পবিত্র মনের মানুষ আর কে আছে? অথচ তিনি বলেছেন, إِنِّى لَا أُصَافِحُ النِّسَاءَ 'আমি নারীদের সাথে মুছাফাহা করি না'।৬৭ তিনি আরও বলেছেন, إِنِّي لَا أَمَسُ أَيْدِيَ النِّسَاءِ 'আমি নারীদের হাত স্পর্শ করি না'।৬৮
মা আয়েশা (রাঃ) বলেছেন,
لاَ وَاللهِ مَا مَسَّتْ يَدُ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَدَ امْرَأَةٍ قَطُّ غَيْرَ أَنَّهُ يُبَايِعُهُنَّ بِالْكَلَامِ
'আল্লাহ্ শপথ, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর হাত কখনই কোন বেগানা নারীর হাত স্পর্শ করেনি। তিনি মৌখিক বাক্যের মাধ্যমে তাদের বায়'আত নিতেন'।৬৯
সুতরাং আধুনিক সাজতে গিয়ে যারা নিজেদের বন্ধুদের সাথে মুছাফাহা না করলে স্ত্রীদের তালাক দেয়ার হুমকি দেয় তারা যেন হুঁশিয়ার হয়। জানা আবশ্যক যে, মুছাফাহা কোন আবরণের সাহায্যে হোক বা আবরণ ছাড়া হোক উভয় অবস্থাতেই হারাম।
টিকাঃ
৬৫. তাবারাণী, সিলসিলা ছহীহাহ হা/২২৬।
৬৬. আহমাদ হা/৩৯১২; ছহীহুল জামে' হা/৪১২৬।
৬৭. আহমাদ হা/২৭৫৩; ছহীহাহ হা/২৫০৯।
৬৮. তাবারাণী কাবীর, ২৪/৩৪২; ছহীহুল জামে', হা/৭১৭৭।
৬৯. মুসলিম হা/১৮৬৬।