📄 আল্লাহ ব্যতীত অন্যের নামে কসম করা
আল্লাহ তা'আলা তাঁর সৃষ্টির মধ্য হতে যার নামে ইচ্ছা কসম করতে পারেন। কিন্তু সৃষ্টির জন্য আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো নামে কসম করা জায়েয নেই। তা সত্ত্বেও অনেক মানুষের মুখেই নির্বিবাদে গায়রুল্লাহ্র নামে কসম উচ্চারিত হয়। কসম মূলতঃ এক প্রকার সম্মান, যা আল্লাহ ছাড়া অন্য কেউ পাওয়ার যোগ্য নয়। ইবনু ওমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,
أَلاَ إِنَّ اللَّهَ يَنْهَاكُمْ أَنْ تَحْلِفُوا بِآبَائِكُمْ، مَنْ كَانَ حَالِفًا بِاللَّهِ فَلْيَحْلِفْ بِاللَّهِ أَوْ لِيَصْمُتْ
'সাবধান! নিশ্চয়ই আল্লাহ তা'আলা তোমাদেরকে তোমাদের পিতৃপুরুষের নামে শপথ করতে নিষেধ করেছেন। কারো যদি শপথ করতেই হয়, তবে সে যেন আল্লাহ্র নামে শপথ করে অথবা চুপ থাকে'।২২
ইবনু ওমর (রাঃ) বর্ণিত আরেকটি হাদীছে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, مَنْ حَلَفَ بِغَيْرِ اللَّهِ فَقَدْ أَشْرَكَ 'যে ব্যক্তি আল্লাহ ব্যতীত অন্যের নামে কসম করল, সে শিরক করল'।২৩
অপর এক হাদীছে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, مَنْ حَلَفَ بِالْأَمَانَةِ فَلَيْسَ مِنَّا 'যে আমানত বা গচ্ছিত দ্রব্যের নামে কসম করে, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়'।২৪
সুতরাং কা'বা, আমানত, মর্যাদা, সাহায্য, অমুকের বরকত, অমুকের জীবন, নবীর মর্যাদা, অলীর মর্যাদা, পিতা-মাতা ও সন্তানের মাথা ইত্যাদি দিয়ে কসম খাওয়া নিষিদ্ধ।
কেউ যদি আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো নামে কসম করে তবে তার কাফফারা হ'ল কালেমা ত্বাইয়েবা 'লা ইলা-হা ইল্লাল্লা-হ' পাঠ করা। যেমন ছহীহ হাদীছে এসেছে-
مَنْ حَلَفَ فَقَالَ فِي حَلِفِهِ بِاللَّاتِ وَالْعُزَّى . فَلْيَقُلْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ -
'যে ব্যক্তি শপথ করতে গিয়ে লাত ও উযযার নামে শপথ করে বসে, সে যেন বলে, 'লা ইলা-হা ইল্লাল্লা-হ'।২৫
উল্লিখিত অবৈধ শপথের ধাঁচে কিছু শিরকী ও হারাম কথা কতিপয় মুসলমানের মুখে উচ্চারিত হ'তে শোনা যায়। যেমন বলা হয়, 'আমি আল্লাহ ও আপনার আশ্রয় প্রার্থনা করছি'। 'আল্লাহ আর আপনার উপরই ভরসা'। 'এটা আল্লাহ ও তোমার পক্ষ হতে হয়েছে'। 'আল্লাহ ও আপনি ছাড়া আমার আর কেউ নেই'। 'আমার জন্য উপরে আল্লাহ আর নীচে আপনি আছেন'। 'উপরে খোদা, নীচে হুদা'। 'আল্লাহ ও অমুক যদি না থাকত'।২৬ 'আমি ইসলাম থেকে মুক্ত বা ইসলামের ধার ধারি না'। 'হায় কালের চক্র, আমার সব শেষ করে দিল'। 'এখন আমার দুঃসময় চলছে'। 'এ সময়টা অলুক্ষণে'। 'সময় বিশ্বাসঘাতকতা করেছে' ইত্যাদি।
উল্লেখ্য, সময়কে গালি দিলে সময়ের স্রষ্টা আল্লাহকেই গালি দেয়া হয় বলে হাদীছে কুদসীতে এসেছে।২৭ সুতরাং সময়কে গালি দেওয়া নিষিদ্ধ।
আল্লাহ ব্যতীত অন্যের সাথে عبد বা দাস অর্থবোধক শব্দ এ পর্যায়ে পড়ে। যেমন আবদুল মসীহ, আবদুর রাসূল, আবদুন নবী, আবদুল হুসাইন, গোলাম রাসূল ইত্যাদি।
আধুনিক কিছু শব্দ ও পরিভাষাও রয়েছে যা তাওহীদের পরিপন্থী। যেমন ইসলামী সমাজতন্ত্র, ইসলামী গণতন্ত্র, জনগণের ইচ্ছাই আল্লাহ্র ইচ্ছা, দশ যেখানে আল্লাহ সেখানে, দ্বীন আল্লাহ্র দেশ সকল মানুষের, বিপ্লবের নামে শপথ করে বলছি, খাঁটি আরব হওয়ার নামে শপথ করে বলছি ইত্যাদি।
কোন রাজা-বাদশাহকে 'শাহানশাহ' বা 'রাজাধিরাজ' বলাও হারাম (শাহজাহান ও জাহাঙ্গীরও এ পর্যায়ভুক্ত)। একইভাবে কোন মানুষকে 'কাযীউল কুযাত' বা 'বিচারকদের উপরস্থ বিচারক' বলা যাবে না। কেননা 'কাযীউল কুযাত' একমাত্র আল্লাহ।
কোন কাফির বা মুনাফিকের ক্ষেত্রে সম্মানসূচক 'সাইয়িদ' তথা 'জনাব' বা অন্য ভাষার অনুরূপ কোন শব্দ ব্যবহার করাও সিদ্ধ নয়।
টিকাঃ
২২. বুখারী, মুসলিম; মিশকাত হা/৩৪০৭।
২৩. আবুদাঊদ, তিরমিযী, মিশকাত হা/৩৪১৯।
২৪. আবুদাঊদ, মিশকাত হা/৩৪২০।
২৫. বুখারী, মুসলিম, মিশকাত হা/৩৪০৯।
২৬. এসব ক্ষেত্রে অতঃপর শব্দ প্রয়োগ করতে হবে। যেমন আল্লাহ অতঃপর আপনি যা চান (مَا شَاءَ اللَّهُ ثُمَّ شِئْتَ) ইত্যাদি - অনুবাদক।
২৭. বুখারী হা/৬১৮১।
📄 খাতির জমানোর জন্য মুনাফিক ও ফাসিকদের সঙ্গে উঠাবসা করা
দুর্বল ঈমানের অনেক মানুষই পাপাচারী ও দুস্কৃতিকারীদের সঙ্গে স্বেচ্ছায় উঠাবসা করে। এমনকি আল্লাহ্র দ্বীন ও তার অনুসারীদের প্রতি যারা অহরহ ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করে, তাদের সঙ্গেও তারা দহরম-মহরম সম্পর্ক রেখে চলে, তাদের মোসাহেবী করে। অথচ এ কাজ যে হারাম তাতে কোন সন্দেহ নেই। আল্লাহ তা'আলা এরশাদ করেন,
وَإِذَا رَأَيْتَ الَّذِينَ يَخُوضُونَ فِي آيَاتِنَا فَأَعْرِضْ عَنْهُمْ حَتَّى يَخُوضُوا فِي حَدِيثٍ غَيْرِهِ وَإِمَّا يُنْسِيَنَّكَ الشَّيْطَانُ فَلَا تَقْعُدْ بَعْدَ الذِّكْرَى مَعَ الْقَوْمِ الظَّالِمِينَ -
'যখন আপনি তাদেরকে আমার কোন আয়াত বা বিধান সম্পর্কে উপহাসমূলক আলোচনায় মগ্ন দেখতে পান তখন আপনি তাদের থেকে সরে থাকুন, যে পর্যন্ত না তারা অন্য প্রসঙ্গে লিপ্ত হয়। আর যদি শয়তান আপনাকে ভুলিয়ে দেয়, তাহলে স্মরণে আসার পর যালিম সম্প্রদায়ের সঙ্গে আপনি আর বসবেন না' (আন'আম ৬৮)।
সুতরাং ফাসিক-মুনাফিকদের সঙ্গে আত্মীয়তার সম্পর্ক যত গভীরই হৌক কিংবা তাদের সাথে সমাজ-সামাজিকতায় যতই মজা লাগুক এবং তাদের কণ্ঠ যতই মধুর হৌক তাদের সঙ্গে উঠাবসা করা বৈধ নয়।
হাঁ, যে ব্যক্তি তাদেরকে ইসলামের দাওয়াত প্রদান করে, তাদের বাতিল আক্বীদার প্রতিবাদ করে কিংবা তাদেরকে অন্যায় থেকে নিষেধ করার জন্য তাদের নিকট গমনাগমন করে সে উক্ত নির্দেশের আওতাভুক্ত হবে না। স্বেচ্ছায়, খুশীমনে ও কোন কিছু না বলে নীরবে তাদের সাথে মিলতাল রাখাতেই সব গোল। অন্যত্র আল্লাহ তা'আলা বলেন,
فَإِنْ تَرْضَوْا عَنْهُمْ فَإِنَّ اللَّهَ لَا يَرْضَى عَنِ الْقَوْمِ الْفَاسِقِينَ
'যদি তোমরা তাদের প্রতি সন্তুষ্ট থাক, তবে (জেনে রেখ) আল্লাহ ফাসিক বা দুষ্কৃতিকারী সম্প্রদায়ের প্রতি সন্তুষ্ট নন' (তওবা ৯৬)।
📄 ছালাতে ধীরস্থিরতা পরিহার করা
সবচেয়ে বড় চুরি হচ্ছে ছালাতে চুরি। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন,
أَسْوَأُ النَّاسِ سَرِقَةً الَّذِي يَسْرِقُ مِنْ صَلَاتِهِ. قَالُوا يَا رَسُولَ اللَّهِ وَكَيْفَ يَسْرِقُ مِنْ صَلَاتِهِ قَالَ : لَا يُتِمُّ رُكُوعَهَا وَلَا سُجُودَهَا -
'সবচেয়ে নিকৃষ্ট চোর সেই ব্যক্তি যে ছালাতে চুরি করে। ছাহাবীগণ বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! সে কিভাবে ছালাতে চুরি করে? তিনি বললেন, সে রুকু-সিজদা পরিপূর্ণভাবে করে না'।২৮
আজকাল অধিকাংশ মুছল্লীকে দেখা যায় যে তারা ছালাতে ধীরস্থির ভাব বজায় রাখে না। ধীরে-সুস্থে রুকু-সিজদা করে না। রুকু থেকে যখন মাথা তোলে তখন পিঠ সোজা করে দাঁড়ায় না এবং দু'সিজদার মাঝে পিঠ টান করে বসে না। খুব কম মসজিদই এমন পাওয়া যাবে যেখানে এ জাতীয় দু'চারজন পাওয়া যাবে না। অথচ ছালাতে ধীরস্থিরতা বজায় রাখা ছালাতের অন্যতম রুকন। স্বেচ্ছায় তা পরিহার করলে কোন মতেই ছালাত শুদ্ধ হবে না। সুতরাং বিষয়টি বেশ গুরুতর। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,
لا تُجْزِئُ صَلَاةُ الرَّجُلِ حَتَّى يُقِيمَ ظَهْرَهُ فِي الرُّكُوعِ وَالسُّجُودِ
'কোন ব্যক্তি যে পর্যন্ত না রুকু-সিজদায় তার পৃষ্ঠদেশ সোজা করবে, সে পর্যন্ত তার ছালাত যথার্থ হবে না'।২৯
কাজটি যে অবৈধ এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। যে মুছল্লী এরূপ করে সে ভর্ৎসনার যোগ্য। আবু আব্দুল্লাহ আশ'আরী (রাঃ) বর্ণিত একটি হাদীছে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) একদা ছাহাবীদের সাথে ছালাত আদায়ের পর তাদের একটি দলের সাথে বসেছিলেন। এমন সময় এক ব্যক্তি এসে ছালাতে দাঁড়াল। সে রুকু করছিল আর সিজদায় গিয়ে ঠোকর মারছিল। তা দেখে নবী করীম (ছাঃ) বললেন, 'তোমরা কি এই লোকটিকে লক্ষ্য করেছ? এভাবে ছালাত আদায় করে কেউ যদি মারা যায়, তবে সে মুহাম্মাদের মিল্লাত থেকে খারিজ হয়ে মারা যাবে। কাক যেমন রক্তে ঠোকর মারে সে তেমনি করে তার ছালাতে ঠোকর মারছে। যে ব্যক্তি রুকু করে আর সিজদায় গিয়ে ঠোকর মারে তার দৃষ্টান্ত সেই ক্ষুধার্ত লোকের ন্যায়, যে একটি দু'টির বেশী খেজুর খেতে পায় না। দু'টি খেজুরে তার কতটুকু ক্ষুধা মিটাতে পারে?'।৩০
টিকাঃ
২৮. আহমাদ, মিশকাত হা/৮৮৫।
২৯. আবুদাঊদ, তিরমিযী, মিশকাত হা/৯৭৮।
৩০. ছহীহ ইবনে খুযায়মা হা/৬৬৫; আলবানী, ছিফাতু ছালাতিন নাবী, পৃঃ ১৩১।
📄 ছালাতে অনর্থক কাজ ও বেশী বেশী নড়াচড়া করা
ছালাতে অনর্থক কাজ ও বেশী বেশী নড়াচড়া করা এমন এক আপদ, যা থেকে অনেক মুছল্লীই বাঁচতে পারে না। কারণ তারা আল্লাহ্ নিম্নোক্ত আদেশ প্রতিপালন করে না- وَقُومُوْا لِلَّهِ قَانِتِينَ ‘তোমরা আল্লাহ্ জন্য অনুগত হয়ে দাঁড়াও' (বাক্বারাহ ২৩৮)।
মহান আল্লাহ বলেন,
قَدْ أَفْلَحَ الْمُؤْمِنُونَ الَّذِينَ هُمْ فِي صَلَاتِهِمْ خَاشِعُونَ
'নিশ্চয়ই সেই সকল মুমিন সফলকাম, যারা নিজেদের ছালাতে বিনীত থাকে' (মুমিনূন ১-২)।
কিন্তু উক্ত লোকেরা আল্লাহ্র এ বাণীর গূঢ়ার্থ বুঝে না। তাই ছালাতে আদবের পরিপন্থী অনেক কিছুই তারা করে থাকে। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে সিজদার মধ্যে মাটি সমান করা যাবে কি-না জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেছিলেন,
لاَ تَمْسَحْ وَأَنْتَ تُصَلَّى فَإِنْ كُنْتَ لاَ بُدَّ فَاعِلاً فَوَاحِدَةً تَسْوِيَةَ الْحَصَى -
'ছালাত অবস্থায় তুমি কিছু মুছতে পারবে না। একান্তই যদি করতেই হয় তাহলে কংকরাদি একবার সমান করতে পারবে'।৩৩
আলেমগণ বলেছেন, ছালাতে নিষ্প্রয়োজনে বেশী মাত্রায় লাগাতারভাবে নড়াচড়া করলে ছালাত বাতিল হয়ে যাবে। সুতরাং যারা ছালাতে নিরর্থক খেলায় লিপ্ত হয় তাদের অবস্থা কেমন হতে পারে? তাদের তো দেখা যায়, তারা আল্লাহ্র সামনে দাঁড়িয়েছে। অথচ ঘড়ির সময় নিরীক্ষণ করছে কিংবা কাপড় সোজা করতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। অথবা আঙ্গুল দিয়ে নাক পরিষ্কার করছে। অনেকে আবার ছালাতে দাঁড়িয়ে ডানে-বামে অথবা উপরের দিকে তাকাতে থাকে। অথচ তাদের চোখ যে উপড়ে ফেলা হতে পারে কিংবা শয়তান ছালাতে তাদের মনোযোগ নষ্ট করে দিতে পারে, সে সম্পর্কে তাদের মনে কোনই উদ্বেগ নেই।৩৪
টিকাঃ
৩৩. আবুদাঊদ হা/৯৪৬; ছহীহুল জামে' হা/৭৪৫২।
৩৪. মুত্তাফাক্ব 'আলাইহ, মুসলিম, মিশকাত হা/৯৮২-৮৩, 'ছালাতে অসিদ্ধ ও সিদ্ধ কর্ম সমূহ' অনুচ্ছেদ-১৯।