📘 যে সকল হারামকে মানুষ তুচ্ছ মনে করে > 📄 জাদু ও ভাগ্যগণনা

📄 জাদু ও ভাগ্যগণনা


জাদু ও ভাগ্যগণনা কুফর ও শিরকের পর্যায়ভুক্ত হারাম। জাদু তো পরিষ্কার কুফর এবং সাতটি ধ্বংসাত্মক কবীরা গুনাহ্র অন্যতম। জাদু শুধু ক্ষতিই করে, কোন উপকার করে না। জাদু শিক্ষা করা প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন, وَيَتَعَلَّمُونَ مَا يَضُرُّهُمْ وَلَا يَنفَعُهُمْ 'তারা এমন জিনিস (জাদু) শিক্ষা করে, যা তাদের অপকারই করে, কোন উপকার করে না' (বাক্বারাহ ১০২)।
তিনি আরো বলেন, وَلَا يُفْلِحُ السَّاحِرُ حَيْثُ أَتَى 'জাদুকর যেভাবেই আসুক না কেন সে সফল হবে না' (ত্বোয়াহা ৬৯)।
জাদু চর্চাকারী কাফের। মহান আল্লাহ বলেন,
وَمَا كَفَرَ سُلَيْمَانُ وَلَكِنَّ الشَّيَاطِينَ كَفَرُوا يُعَلِّمُونَ النَّاسَ السِّحْرَ وَمَا أُنزِلَ عَلَى الْمَلَكَيْنِ بِبَابِلَ هَارُوتَ وَمَارُوتَ وَمَا يُعَلِّمَانِ مِنْ أَحَدٍ حَتَّى يَقُولَا إِنَّمَا نَحْنُ فِتْنَةٌ فَلَا تَكْفُرْ -
'সুলায়মান কুফরী করেননি। কিন্তু কুফরী করেছে শয়তানেরা। তারা মানুষকে শিক্ষা দেয় জাদু এবং বাবেলে হারূত-মারূত নামের দু'জন ফেরেশতার উপর যা অবতীর্ণ করা হয়েছিল তা। ঐ ফেরেশতাদ্বয় কাউকে একথা না বলে কিছু শিক্ষা দেয়নি যে, আমরা এক মহাপরীক্ষার জন্য। সুতরাং তুমি (জাদু শিখে) কুফরী করো না' (বাক্বারাহ ১০২)।
ইসলামী বিধানে জাদুকরকে হত্যা করার কথা বলা হয়েছে। জাদুকরের উপার্জন অপবিত্র ও হারাম। জ্ঞানপাপী, অত্যাচারী ও দুর্বল ঈমানের লোকেরা অন্যের সঙ্গে শত্রুতা ও জিঘাংসা চরিতার্থ করার জন্য জাদুকরদের নিকটে যায়।
অনেকে আবার জাদুর ক্রিয়া দূর করার জন্য জাদুকরের শরণাপন্ন হয়। এজন্যে যাওয়াও হারাম। বরং তাদের উচিত ছিল আল্লাহ্র শরণাপন্ন হওয়া এবং আল্লাহ্র কালাম যেমন সূরা নাস, ফালাক্ব ইত্যাদি দিয়ে আরোগ্য লাভের চেষ্টা করা।
গণক ও ভবিষ্যদ্বক্তা উভয়েই আল্লাহ তা'আলাকে অস্বীকারকারী কাফিরদের দলভুক্ত। কারণ তারা উভয়েই গায়েব বা অদৃশ্যের কথা জানার দাবী করে। অথচ আল্লাহ ছাড়া কেউ গায়েব জানে না।
অনেক সময় তারা সরলমনা লোকদের সম্পদ লুটে নেয়ার জন্য তাদেরকে মোহাচ্ছন্ন করে ফেলে। এজন্য তারা বালুর উপর আঁকি-ঝুঁকি, চটা (বাটি বা থালা) চালান, হাতের তালুতে ফুঁক, চায়ের পেয়ালা, কাঁচের গুলী, আয়না ইত্যাদি উপকরণ ব্যবহার করে থাকে। এসব লোকের কথা একটা যদি সত্য হয় তো নিরানব্বইটাই হয় মিথ্যা। কিন্তু গাফিলরা এসব ধোঁকাবাজ-মিথ্যুকদের এক সত্যকেই হাযার সত্য গণ্য করে নিজেদের ভবিষ্যৎ ভাগ্য, বিয়ে-শাদী, ব্যবসা-বাণিজ্যের শুভাশুভ তাদের নিকট জানতে চায়। তারা হারানো জিনিস কোথায় কিভাবে পাওয়া যাবে তা জানার জন্য তাদের নিকটে ছুটে যায়। যারা তাদের কাছে গিয়ে তাদের কথা বিশ্বাস করে, তারা কাফের এবং ইসলাম থেকে বহির্ভূত। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন,
مَنْ أَتَى كَاهِناً أَوْ عَرَّافًا فَصَدَّقَهُ بِمَا يَقُولُ فَقَدْ كَفَرَ بِمَا أُنْزِلَ عَلَى مُحَمَّدٍ -
'যে ব্যক্তি গণক কিংবা ভবিষ্যদ্বক্তার নিকটে যায় এবং সে যা বলে তা বিশ্বাস করে, সে নিশ্চিতভাবেই মুহাম্মাদের উপর যা নাযিল হয়েছে তা অস্বীকার করে'।১২
যে ব্যক্তি তারা গায়েব জানে না বলে বিশ্বাস করে কিন্তু অভিজ্ঞতা কিংবা অনুরূপ কিছু অর্জনের জন্য তাদের নিকটে যায় সে কাফির হবে না বটে, তবে তার চল্লিশ দিনের ছালাত কবুল হবে না। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,
مَنْ أَتَى عَرَّافًا فَسَأَلَهُ عَنْ شَيْءٍ لَمْ تُقْبَلْ لَهُ صَلَاةٌ أَرْبَعِينَ لَيْلَةً
'যে ব্যক্তি কোন ভবিষ্যদ্বক্তার নিকটে যায় এবং তাকে কিছু জিজ্ঞেস করে, তার চল্লিশ দিনের ছালাত কবুল হবে না'।১৩ তবে তাকে ছালাত অবশ্যই আদায় করতে হবে এবং বিশেষভাবে তওবা করতে হবে।

টিকাঃ
১২. আহমাদ হা/৯৫৩২; সিলসিলা ছহীহাহ হা/৩৩৮৭।
১৩. মুসলিম হা/২২৩০; মিশকাত হা/৪৫৯৫।

📘 যে সকল হারামকে মানুষ তুচ্ছ মনে করে > 📄 রাশিফল ও মানব জীবনের উপর গ্রহ-নক্ষত্রের প্রভাব সম্পর্কিত বিশ্বাস

📄 রাশিফল ও মানব জীবনের উপর গ্রহ-নক্ষত্রের প্রভাব সম্পর্কিত বিশ্বাস


যায়েদ বিন খালিদ আল-জুহানী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হুদায়বিয়াতে এক রাতে আকাশে একটি চিহ্ন পরিলক্ষিত হয়। সেদিন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ফজর ছালাত শেষে লোকদের দিকে ফিরে বসেন এবং বলেন, 'তোমাদের প্রতিপালক কি বলেছেন তা কি তোমরা জান'? তারা বলল, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই অধিক জ্ঞাত। তিনি বললেন, আল্লাহ বলেছেন, 'আমার কিছু বান্দা আমার উপর বিশ্বাসী হয়ে এবং কিছু বান্দা অবিশ্বাসী হয়ে ভোরে ওঠে। যারা বলে, আল্লাহ্র দয়া ও অনুগ্রহে বৃষ্টি হয়েছে তারা আমার প্রতি বিশ্বাসী ও গ্রহ-নক্ষত্রে অবিশ্বাসী। আর যারা বলে, অমুক অমুক গ্রহের প্রভাবে বৃষ্টি হয়েছে তারা আমার প্রতি অবিশ্বাসী ও গ্রহ-নক্ষত্রে বিশ্বাসী'।১৪
গ্রহ-নক্ষত্রের প্রভাবে বৃষ্টি হওয়ার কথা বিশ্বাস করা যেমন কুফরী, তেমনি পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত রাশিফলের আশ্রয় নেওয়াও কুফরী। যে ব্যক্তি রাশিফলের উপর গ্রহ-নক্ষত্রের প্রভাবের কথা বিশ্বাস করবে, সে সরাসরি মুশরিক হয়ে যাবে। পত্র-পত্রিকা ও বই-পুস্তকে রাশিফলের প্রতি বিশ্বাসী হয়ে সেগুলি পাঠ করা শিরক। তবে বিশ্বাস না করে কেবল মানসিক সান্ত্বনা অর্জনের জন্য পড়লে তাতে শিরক হবে না বটে, কিন্তু সে গোনাহগার হবে। কেননা শিরকী কোন কিছু পাঠ করে সান্ত্বনা লাভ করা বৈধ নয়। তাছাড়া শয়তান কর্তৃক তার মনে উক্ত বিশ্বাস জন্মিয়ে দিতে কতক্ষণ? তখন এ পড়াই তার শিরকের মাধ্যম হয়ে দাঁড়াবে।

টিকাঃ
১৪. বুখারী হা/৮৪৬; মিশকাত হা/৪৫৯৬।

📘 যে সকল হারামকে মানুষ তুচ্ছ মনে করে > 📄 স্রষ্টা যেসব বস্তুতে যে কল্যাণ রাখেননি তাতে সে কল্যাণ থাকার আক্বীদা পোষণ করা

📄 স্রষ্টা যেসব বস্তুতে যে কল্যাণ রাখেননি তাতে সে কল্যাণ থাকার আক্বীদা পোষণ করা


আল্লাহ তা'আলা এই বিশ্ব ও তার মধ্যস্থিত যাবতীয় বস্তু সৃষ্টি করেছেন। কিন্তু তিনি যে কল্যাণ যে বস্তুর মধ্যে রাখেননি, ঐ বস্তু সেই উপকারই করতে পারে বলে অনেকে বিশ্বাস করে। এরূপ বিশ্বাস শিরকের পর্যায়ভুক্ত। যেমন, বহু লোক তাবীয- তুমার, শিরকী ঝাড়-ফুঁক, বিভিন্ন প্রকার তাগা ও খনিজ পাথর ব্যবহার করে থাকে। তাদের বিশ্বাস, এতে রোগ-বালাই কাছে ভিড়তে পারে না। আর যদি রোগ হয়েই থাকে তবে এগুলি ব্যবহারে সুস্থতা ফিরে আসে। এগুলি ব্যবহারের পিছনে গণক, জাদুকর প্রমুখ শ্রেণীর পরামর্শ অথবা যুগ পরম্পরায় চলে আসা বিশ্বাস কাজ করে।
অনেকে বদ নযর এড়ানোর জন্য বাচ্চা ও বড়দের গলায় এসব ঝুলিয়ে দেয়, শরীরের অন্যত্রও বেঁধে রাখে (যেমন গলা, হাত ও কোমরে)। গাড়ী-বাড়ীতেও তাবীয ও দো'আ-কালাম লিখিত কাগজ ঝুলিয়ে রাখার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। এতে গাড়ী-বাড়ী দুর্ঘটনার হাত থেকে বেঁচে যায় বলে তাদের বিশ্বাস।
অনেকে আবার রোগের হাত থেকে উদ্ধার পেতে কিংবা রোগ যাতে হতে না পারে সেজন্য কয়েক প্রকার ধাতু নির্মিত আংটি পরে থাকে (যেমন অষ্টধাতুর আংটি প্রভৃতি)। এর ফলে আল্লাহ্ উপর তাওয়াক্কুল বা নির্ভরতা হ্রাস পায় এবং হারাম জিনিস দ্বারা চিকিৎসার প্রতি আগ্রহ বেড়ে যায়।
এসব তাবীযের অনেকগুলিতেই স্পষ্ট শিরকী কথা, জিনের নিকট ফরিয়াদ, সূক্ষ্ম নকশা ও অবোধ্য কথা লেখা থাকে। অনেক জ্ঞানপাপী শিরকী মন্ত্রের সাথে কুরআনের আয়াত মিশিয়ে দেয়। কেউ কেউ নাপাক দ্রব্য, ঋতুস্রাবের রক্ত ইত্যাদি দিয়েও তাবীয লেখে। এ ধরনের তাবীয, তাগা, আংটি ঝুলানো কিংবা বাঁধা স্পষ্ট হারাম। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, مَنْ عَلَّقَ تَمِيمَةً فَقَدْ أَشْرَكَ 'যে ব্যক্তি তাবীয লটকাল নিশ্চয়ই সে শিরক করল'।১৫
তাবীয ব্যবহারকারী যদি বিশ্বাস করে যে, এসব জিনিস আল্লাহ্র ইচ্ছা ছাড়াই উপকার কিংবা অপকার করে, তাহলে সে বড় শিরক করার দোষে দুষ্ট হবে। আর যদি সে বিশ্বাস করে যে, এগুলি উপকার-অপকারের একটি উপকরণ মাত্র। অথচ আল্লাহ তা'আলা এগুলিকে রোগ বিনাশ সংক্রান্ত কোন উপকার বা অপকারের উপকরণ করেননি, সেক্ষেত্রে সে ছোট গুনাহ করার দোষে দুষ্ট হবে। আর তখন এটি কারণ উদ্ভূত শিরকের (شرك الأسباب) পর্যায়ভুক্ত হবে।

টিকাঃ
১৫. আহমাদ হা/১৭৪৫৮; সিলসিলা ছহীহাহ হা/৪৯২।

📘 যে সকল হারামকে মানুষ তুচ্ছ মনে করে > 📄 লোক দেখানো ইবাদত

📄 লোক দেখানো ইবাদত


লোক দেখানো ইবাদত (الرياء)
আল্লাহ তা'আলার নিকটে আমল কবুল হওয়ার জন্য রিয়া বা লৌকিকতা মুক্ত এবং কুরআন-সুন্নাহ নির্দেশিত নিয়মে হওয়া অপরিহার্য। যে ব্যক্তি লোক দেখানোর জন্য ইবাদত করবে, সে ছোট শিরক করার দায়ে দোষী সাব্যস্ত হবে এবং তার আমল বরবাদ হয়ে যাবে। যেমন লোক দেখানো ছালাত। আল্লাহ তা'আলা এ সম্পর্কে বলেন, إِنَّ الْمُنَافِقِيْنَ يُخَادِعُوْنَ اللهَ وَهُوَ خَادِعُهُمْ وَإِذَا قَامُوْا إِلَى الصَّلَاةِ قَامُوْا كُسَالَى يُرَاؤُوْنَ النَّاسَ وَلَا يَذْكُرُونَ اللَّهَ إِلَّا قَلِيلاً- ‘নিশ্চয়ই মুনাফিকরা আল্লাহ্র সঙ্গে প্রতারণা করতে চায়। অথচ তিনিও তাদের সাথে প্রতারণা করতে সক্ষম। যখন তারা ছালাতে দাঁড়ায় তখন আলস্যভরে দাঁড়ায়। তারা লোকদের দেখায় যে তারা ছালাত আদায় করছে, কিন্তু আল্লাহকে তারা কমই স্মরণ করে' (নিসা ১৪২)।
স্বীয় কাজের কথা চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ুক এবং লোকেরা শুনে বাহবা দিক এ নিয়তে যে কাজ করবে সে শিরকে নিপতিত হবে। এরূপ বাসনাকারী সম্পর্কে কঠোর হুঁশিয়ারী উচ্চারণ করা হয়েছে। ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত হাদীছে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, مَنْ سَمَّعَ سَمَّعَ اللهُ بِهِ وَمَنْ رَاءَى رَاءَى اللهُ بِهِ ‘যে মানুষকে শুনানোর জন্য কাজ করে আল্লাহ তার বদলে তাকে (কিয়ামতের দিন) শুনিয়ে দিবেন। আর যে লোক দেখানোর জন্য কাজ করে আল্লাহ তার বদলে তাকে (কিয়ামতের দিন) দেখিয়ে দিবেন'।১৬ অর্থাৎ তিনি এসব লোককে কিয়ামতের দিন মানুষের সামনে অপমানিত করবেন এবং কঠোর শাস্তি দিবেন।
যে আল্লাহ ও মানুষ উভয়ের সন্তুষ্টিকল্পে ইবাদত করবে তার আমল বরবাদ হয়ে যাবে। হাদীছে কুদসীতে এসেছে, মহান আল্লাহ বলেন,
أَنَا أَغْنَى الشَّرَكَاءِ عَنِ الشِّرْكِ، مَنْ عَمِلَ عَمَلاً أَشْرَكَ فِيْهِ مَعِي غَيْرِي تَرَكْتُهُ وَشِرْكَهُ
‘আমি অংশীবাদিতা (শিরক) হতে সকল অংশীদারের তুলনায় বেশী মুখাপেক্ষীহীন। যে কেউ কোন আমল করে এবং তাতে অন্যকে আমার সাথে শরীক করে, আমি তাকে ও তার আমল উভয়কেই বর্জন করি'।১৭
তবে কেউ আল্লাহ্র সন্তুষ্টির নিমিত্তে কোন আমল শুরু করার পর যদি তার মধ্যে লোক দেখানো ভাব জাগ্রত হয় এবং সে তা ঘৃণা করে ও তা থেকে সরে আসতে চেষ্টা করে, তাহলে তার ঐ আমল শুদ্ধ হবে। কিন্তু যদি সে তা না করে; বরং লোক দেখানো ভাব মনে উদয় হওয়ার জন্য প্রশান্তি ও আনন্দ অনুভব করে, তাহলে অধিকাংশ আলিমের মতে তার ঐ আমল বাতিল হয়ে যাবে।

টিকাঃ
১৬. বুখারী হা/৬৪৯৯, মুসলিম হা/২৯৮৬; মিশকাত হা/৫৩১৬।
১৭. মুসলিম হা/২৯৮৫, মিশকাত হা/৫৩১৫।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00