📄 ফেরেশতাদের ঘোষণা
হযরত আবূ দারদা রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, সূর্য যখন উদয় হয় তখন তার উভয় পার্শ্বে দুই ফেরেস্তা থাকে যারা ঘোষণা দেন, সে ঘোষণা মানুষ ও জ্বিন ব্যতীত সবাইকে শুনায়, লোক সকল, নিজ প্রভুর দিকে দৌড়াও, মনে রেখ, মানুষের অল্প ও যথেষ্ট মাল তার সেই অধিক মাল থেকে উত্তম যা অতিরিক্ত হয় এবং তাকে গাফেল করে দেয়।
আল্লাহ্র দ্বীনের মধ্যে মানুষের জন্য হালাল রিযিক উপার্জনের জন্য সুযোগ দিয়েছেন। সাধারণতঃ শ্রমিক, মজদুর, দোকানদারেরা, জীবিকা অর্জনের জন্য বের হয়। এজন্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের উম্মতকে বলেছেন যে, সে যেন লোভী ও লালসাগ্রস্থ না হয়ে যায়, প্রয়োজনীয় খাদ্যের উপর সন্তুষ্ট থাকে, যাতে হারাম উপার্জন থেকে বাঁচতে পারে এবং আল্লাহ্ তা'আলার অসন্তুষ্টি যেন ক্রয় না করে এবং আল্লাহ্ তা'আলার ইবাদত-বন্দেগী হতে দূরে না সরে যায়। ফেরেস্তাদের এ ঘোষণা বাস্তবও হতে পারে, এটা কোন অসম্ভবও নয়। আর এটা রূপকও হতে পারে। হতে পারে যে, আল্লাহ্ নিয়ম এভাবে চলছে যে, ফেরেস্তাদের ঘোষণা করার হুকুম দেওয়া হয় এবং নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে তা শুনতে পান, কিন্তু মানুষ ও জ্বিন জাতি ব্যতীত অন্য সমস্ত সৃষ্টদের এই ঘোষণা শোনানো হয়। এ দুই জাতিকে ঘোষণা শোনানো হয় না, যাতে ঈমান বিলগায়েব বজায় থাকে এবং পরীক্ষার বিষয়ও অক্ষুন্ন থাকে (কারণ স্বকর্ণে ফেরেশতাদের আওয়াজ শুনে ফেললে আর পরীক্ষা থাকে না)। এটা ঠিক এরকম, যেমন জ্বিন ও মানুষ ব্যতীত প্রত্যেক প্রাণী শুক্রবারে কেয়ামত কায়েম হওয়ার ঘোষণা শুনে থাকে, এমনিভাবে জ্বিন ও মানুষকে মৃত মানুষের আওয়াজ এবং কবরের আযাব শোনানো হয় না।
এখন এ হাদীসের উপর একটা প্রশ্ন জাগে যে, যখন ফেরেশতাদের এই উভয় ঘোষণার আওয়াজ মানুষকে শোনানো হয় না, তাহলে এ ঘোষণার ফায়দা কি? উত্তর এই যে, এ বিষয়ে অবগত হওয়ার জন্য নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই সংবাদ দেওয়াই যথেষ্ট। এর উদ্দেশ্য এই হতে পারে যে, আল্লাহ্ এ কথা সত্য হওয়ার ব্যাপারে অসংখ্য প্রমাণাদি রেখেছেন। এ প্রমাণগুলো এরকম যেমন ফেরেশতারা প্রত্যহ ঘোষণা দেয়, কিন্তু মানুষ গাফলতের ঘুমে আচ্ছন্ন থাকে। তা থেকে একেবারেই গাফেল উদাসীন হয়ে আছে।
ঘটনা এই যে, ধন-সম্পদ যত বেশি হয়, ততই বেশি পরীক্ষা এবং জবাবদিহীতার কারণ হয়। প্রয়োজন মাফিক অল্প মাল ঐ বেশি মাল থেকে শ্রেয়' যে মাল মানুষকে আখেরাত থেকে উদাসীন করে দেয় এবং দুনিয়ার চাকচিক্য এবং হারাম অবৈধ কাজকর্মে ব্যস্ত করে দেয়। সাধারণতঃ এমনই হয় যে, মাল ও দৌলতের প্রাচুর্য আখেরাত থেকে অমনোযোগী ও উদাসীন ও নাফরমান করে দেয়।
كَلَّا إِنَّ الْإِنْسَانَ لَيَطْغَى أَنْ رَآَهُ اسْتَغْنَى (العلق)
“সত্যি সত্যি মানুষ সীমালংঘন করে। এ কারণে যে, সে নিজেকে অভাবমুক্ত মনে করে।”
যখন মানুষের পেট ভরে যায় তখন মানুষ আত্মহারা হয়ে যায়। দৌলত সম্পদ হলে নাফরমান হয়ে যায়। সম্পদের প্রাচুর্য হলে তা আল্লাহ্ থেকে গাফেল করে দেয় এবং দুনিয়াও তাকে ইচ্ছা আকাঙ্ক্ষার দাস বানিয়ে দেয়। এজন্য অল্প পরিমাণ কিন্তু যথেষ্ট সম্পদ সেই অধিক সম্পদ থেকে শ্রেয়, যা গাফেল বানিয়ে দেয়।
📄 ফেরেশতা ও মানুষের প্রশ্ন
হযরত আবূ হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণনা করেন যে, হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেনঃ যখন মানুষ মৃত্যুবরণ করে তখন ফেরেস্তারা প্রশ্ন করে, কি আমল আছে যা পূর্ব হতে পাঠিয়েছ? আর মানুষেরা তথা ওয়ারিশরা প্রশ্ন করে, কি মাল দৌলত রেখে গেছ? ফেরেস্তারা পূণ্যের আকাঙ্ক্ষা করে এবং মানুষের প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে থাকেন। এজন্য তারা প্রথমেই নেক আমলের ব্যাপারে প্রশ্ন করেন। নেক আমলের বিনিময়ে ভাল ফল দেওয়া হবে। মন্দ কর্মের বিনিময়ে পাকড়াও ও শাস্তি হয়ে থাকে। যা হোক, ফেরেস্তারা আমলের চিন্তা করেন এবং মানুষ-উত্তরাধিকারীগণ দুনিয়া ও মালের চিন্তা করে যে, মরে যাওয়ায় আপদ দূর হলো। কিন্তু আমাদের জন্য রেখে গেল কি? সম্পত্তির কি পরিমাণ রেখে গেল? এটা জানা দরকার যে, আমল সাথে যায় কিন্তু উত্তরাধিকারীরা ও ধন-সম্পদ কিছুই সাথে যায় না। এজন্য এমন আমল করুন, যা ভালো ফল দান করবে, তাদের সাথে বন্ধুত্ব করুন, যারা আপনাকে কখনো ত্যাগ করবে না।
📄 আখেরাতের নিকটবর্তীতা
ইমাম মালেক (রহঃ) হতে বর্ণিত যে, হযরত লোকমান নিজের ছেলেকে বলতেনঃ বৎস! সকল মানুষ (হিসাব-কিতাব ও পুনরুত্থান থেকে) অনেক দূরে চলে গেছে, তাদের সাথে (যে হিসাব-কিতাবের) ওয়াদা করা হয়েছিল। অথচ তারা আখেরাতের দিকে দ্রুত অগ্রসর হচ্ছে। বৎস! তুমি যেদিন সৃষ্টি হয়েছ, সেদিন থেকে তুমি দুনিয়ার দিকে পিঠ ও আখেরাতের দিকে মুখ করে নিয়েছ এবং সে ঘর যার দিকে তুমি যাচ্ছ, ঐ ঘরের থেকেও বেশি নিকটবর্তী যে ঘর থেকে তুমি বের হয়ে যাচ্ছ। গাফলতের আচ্ছাদন এবং দুনিয়ার টিপ-টপ মানুষকে আখেরাত থেকে গাফেল করে দিয়েছে। তারা দুনিয়ার হাকীকত ও সত্যকে বুঝারও চেষ্টা করে না, তাদের কি এতটুকু কথা জানা নেই যে, তারা অনেক দ্রুত আখেরাতের দিকে ধাবিত হচ্ছে। যে ব্যক্তি দুনিয়াতে পদার্পণ করে সে দুনিয়াতে আসামাত্রই দুনিয়ার দিকে পিঠ দেয় এবং আখেরাতের দিকে মুখ করে নেয়। তার জীবনের যত দিন গত হয়েছে, সে ততই দুনিয়া থেকে দূরে সরে যাচ্ছে এবং আখেরাতের নিকটবর্তী হচ্ছে। অতএব দুনিয়ার সাথে মনকে সংযুক্ত করিও না, আখেরাতের চিন্তা কর। আর এটাই সব কিছু এবং চিরস্থায়ী এবং এটাই আসল ঠিকানা।
📄 জ্ঞানী ও নির্বোধ
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রাযিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করা হয়েছে, সকল মানুষের মধ্যে কোন্ ব্যক্তি উত্তম? ইরশাদ হল যে, প্রত্যেক ঐ ব্যক্তি, যার হৃদয় সহজ সরল, সত্যবাদী। আরয করা হলো, সত্যবাদীকে তো আমরা জানি, সহজ সরল মনের দ্বারা কি উদ্দেশ্য? ইরশাদ হলো, ঐ ব্যক্তি, যার অন্তর পরিষ্কার ও ধার্মিক! ধর্মানুরাগী হয়, যার উপর গোনাহের বোঝাও হয় না, জুলুমের বোঝাও হয় না। আবার হিংসার বোঝাও হয় না।
সত্যি উত্তম ব্যক্তি সেই হয়, যার দিল অন্যের মহব্বত থেকে খালি হয় ও বদ অভ্যাস থেকে পাক পবিত্র হয়। যার কোন উচ্চাশা থাকে না, শত্রুতাও থাকে না, তার মধ্যে শিরকীও থাকে না, বেদআতও থাকে না। আল্লাহ্র ভয় দ্বারা পরিপূর্ণ থাকে, গোনাহ থেকে মুক্ত থাকে। মুখে সত্য কথা বলে। দুর্নাম ও অপবাদ থেকে পবিত্র এমন ব্যক্তি সবচেয়ে উত্তম।