📘 যে কথায় পাথর গলে 📄 দুনিয়া ও আখেরাত

📄 দুনিয়া ও আখেরাত


হযরত উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত যে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একবার খুতবা দিচ্ছিলেন এবং খুতবায় বলতেছিলেন, শুনে রাখ, দুনিয়া এ রকম এক ক্ষণস্থায়ী ও বর্তমান আসবাব, যার দ্বারা নেককার ও বদকার উভয়ে ফায়েদা উঠায় এবং আখেরাত এমন এক নির্ধারিত স্থান যে, তা সম্পূর্ণ হক ও সত্য। ঐ দিন এমন এক বাদশাহ মিমাংসা ও ফয়সালা করবেন, যিনি প্রত্যেক জিনিসের উপর ক্ষমতাশালী। শুনে রাখ, সমস্ত কল্যাণ পুরোপুরি বেহেস্তে হবে। অতএব তোমরা আমল কর এবং আল্লাহকে ভয় করতে থাক এবং তোমরা জেনে নাও যে, তোমাদেরকে তোমাদের সমস্ত আমলের সামনে উপস্থিত করা হবে।

فَمَنْ يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ خَيْرًا يَرَهُ وَمَنْ يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ شَرَا يَرَهُ (زلزال)
“অতঃপর কেউ অণু পরিমাণ সৎকর্ম করলে তা দেখতে পাবে এবং অণু পরিমাণ অসৎ কর্ম করলে তাও দেখতে পাবে।”

দুনিয়াকে ধ্বংসশীল জিনিস বলা হয়েছে, ইহা এমন বস্তু যার দ্বারা ক্ষণিকের ফায়দা হাসিল করা যায়। এটা এমন এক উপকরণ যে, কিছুদিন মানুষের ব্যবহারে থাকে, তারপর ভেঙ্গেচুরে শেষ হয়ে যায়। এমন এক জিনিস এই দুনিয়া, যার দ্বারা নেককার, ছালেহ ও তালেহ সকলেই ফায়দা উঠায়, যে চায় সে নিয়ে নেয়, যে চায় সে সংগ্রহ করে ব্যবহার করে। এটাকে আল্লাহ্ সবার জন্য ব্যাপক করে দিয়েছেন। আখেরাতের দিবস সুনিশ্চিত, অবশ্যম্ভাবী। তার আগমন নিশ্চিত সত্য। ঐ দিন নেককার ও বদকারদের মধ্যে এমন এক সত্ত্বা মীমাংসা করবেন, যিনি সমস্ত জিনিসের মালিক ও ক্ষমতাশালী। তাঁকে তার সঠিক ন্যায় বিচার, ফয়সালা থেকে কেউ বাধা দিতে পারবে না। ভাল ও কল্যাণ, নেকী ও সৎকর্মের স্থান হচ্ছে জান্নাত। অতএব যদি জান্নাতে যেতে চাও তবে নেক কাজ কর, ভালকে পছন্দ কর, যাতে তুমিও তাদের সাথে জান্নাতে প্রবেশ করতে পার। পাপ, অন্যায়, মন্দ ও অকল্যাণ সমস্ত কিছুরই স্থান হচ্ছে দোযখ। অতএব তা থেকে দূরে থাক, বেঁচে থাকার চেষ্টা কর, যাতে সে তোমাকে নিয়ে না নিতে পারে। নেক আমলসমূহ করতে থাক এবং আল্লাহ্ তা'আলার পাকড়াওকে ভয় করতে থাক, আর এই দু'আ করতে থাক যেন আল্লাহ্ তা'আলা তোমাদেরকে গোনাহ্, অন্যায়, পাপ থেকে হেফাজত করেন। মনে রেখো, যেমন কর্ম তেমন ফল। কেয়ামতের দিন তোমার আমলসমূহ তোমার সামনে খুলে দেখানো হবে এবং বলা হবে, পাঠ কর তুমি তোমার কিতাব, আজ তোমার হিসাব গ্রহণের জন্য তুমিই যথেষ্ট।

اقْرَأْ كِتَابَكَ كَفَى بِنَفْسِكَ الْيَوْمَ عَلَيْكَ حَسِيبًا (بنی اسرائيل ১৪)
“পাঠ কর তুমি তোমার কিতাব। আজ তোমার হিসাব গ্রহণের জন্য তুমিই যথেষ্ট।” (সূরা বনী ইসরাঈল: ১৪)

يَوْمَئِذٍ تُعْرَضُونَ لَا تَخْفَى مِنْكُمْ خَافِيَةٌ (الحاقة ১৮)
“সেদিন তোমাদেরকে উপস্থিত করা হবে, তোমাদের কোন কিছু গোপন থাকবে না।” (সূরা হাক্কাহঃ ১৮)

যদি নেক কাজ করে থাক তবে ভাল ফল পাবে, আর যদি গোনাহ্ কর তবে তার সাজা ও আযাব পাবে। অতএব আখেরাতকে গড়ে নাও এবং সেই দিনের আযাবের আক্রমণ থেকে বেঁচে থাক। গোনাহসমূহ থেকে দূরে থাক, আগামীকাল সমস্ত কিছুই সামনে হাজির হবে। নেক আমল করতে থাক, ছোট থেকে ছোট আমলকেও কখনো ছোট ভেবোনা। কেয়ামতের দিন ঐ সব তোমাদের কাজে লাগবে, জানাতো নেই কোন্ কথার উপর জান্নাত পেয়ে যাবে।

📘 যে কথায় পাথর গলে 📄 আখেরাত একটি সত্য প্রতিশ্রুতি

📄 আখেরাত একটি সত্য প্রতিশ্রুতি


হযরত সাদ্দাদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে একথা বলতে শুনেছি, হে লোক সকল! দুনিয়া উপস্থিত, উপকরণ। তার থেকে নেককার ও বদকার সকলেই ফায়দা উঠায় এবং আখেরাত একটা সত্যের প্রতিশ্রুতি, সেই দিন এক বিচারক শক্তিশালী বাদশাহ ফয়সালা করবেন, সত্যকে সত্য প্রমাণ করবেন, বাতেল (অসতর্ক) কে খতম করে দিবেন। তোমরা আখেরাতের বান্দা হও, দুনিয়ার সন্তান হইও না, এজন্য যে, প্রত্যেক বাচ্চা তার মায়েরই থাকবে।

মানুষ যেমনিভাবে দুনিয়াতে মুখাপেক্ষী হয়, মালের পিছনে ঘুরে, তেমনিভাবে দুনিয়া ও আখেরাত দুটি ঠিকানা, মায়ের মত দুনিয়াদার (মায়ের) আঙ্গুল ধরে তার সাথে সাথে চলে এবং তার পিছে পিছে ঘুরে। তার নিকট সে-ই সব কিছু। তার নিয়ামত ও সফলতাই তার আকাঙ্ক্ষিত মূল লক্ষ্য। তার শেষ উদ্দেশ্য এটাই, এই সমস্ত মানুষই বোকা ও ক্ষতিগ্রস্ত। কিন্তু যারা দুনিয়ার হাকীকত ও মূলতত্ত্বকে জানে, (তারা) দুনিয়া থেকে দূরে সরে যায় এবং তারা আখেরাতের সন্তান হয়। তার অনুসরণ করে এ পর্যন্ত পৌঁছার চেষ্টায় থাকে, সে জানে যে দুনিয়ার সমস্ত জিনিসই ধ্বংসশীল, এটা প্রতারণার ঘর। সে তার আখেরাতের পিছনে পড়ে যায়, তার সন্তান হয়, সে জানে যে, ঐদিন সর্বজ্ঞ ও শক্তিশালী আল্লাহ্ তা'আলা ফয়সালা করবেন, তিনি আহকামুল হাকেমীন। অতএব যারা তাঁর সন্তুষ্টি লাভের জন্য দুনিয়ার আরাম-আয়েশকে কুরবানী করে, আল্লাহ্ তাদের উপর রাজি হন, তারাও আল্লাহ্র উপর রাজি হয়।

📘 যে কথায় পাথর গলে 📄 ফেরেশতাদের ঘোষণা

📄 ফেরেশতাদের ঘোষণা


হযরত আবূ দারদা রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, সূর্য যখন উদয় হয় তখন তার উভয় পার্শ্বে দুই ফেরেস্তা থাকে যারা ঘোষণা দেন, সে ঘোষণা মানুষ ও জ্বিন ব্যতীত সবাইকে শুনায়, লোক সকল, নিজ প্রভুর দিকে দৌড়াও, মনে রেখ, মানুষের অল্প ও যথেষ্ট মাল তার সেই অধিক মাল থেকে উত্তম যা অতিরিক্ত হয় এবং তাকে গাফেল করে দেয়।

আল্লাহ্র দ্বীনের মধ্যে মানুষের জন্য হালাল রিযিক উপার্জনের জন্য সুযোগ দিয়েছেন। সাধারণতঃ শ্রমিক, মজদুর, দোকানদারেরা, জীবিকা অর্জনের জন্য বের হয়। এজন্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের উম্মতকে বলেছেন যে, সে যেন লোভী ও লালসাগ্রস্থ না হয়ে যায়, প্রয়োজনীয় খাদ্যের উপর সন্তুষ্ট থাকে, যাতে হারাম উপার্জন থেকে বাঁচতে পারে এবং আল্লাহ্ তা'আলার অসন্তুষ্টি যেন ক্রয় না করে এবং আল্লাহ্ তা'আলার ইবাদত-বন্দেগী হতে দূরে না সরে যায়। ফেরেস্তাদের এ ঘোষণা বাস্তবও হতে পারে, এটা কোন অসম্ভবও নয়। আর এটা রূপকও হতে পারে। হতে পারে যে, আল্লাহ্ নিয়ম এভাবে চলছে যে, ফেরেস্তাদের ঘোষণা করার হুকুম দেওয়া হয় এবং নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে তা শুনতে পান, কিন্তু মানুষ ও জ্বিন জাতি ব্যতীত অন্য সমস্ত সৃষ্টদের এই ঘোষণা শোনানো হয়। এ দুই জাতিকে ঘোষণা শোনানো হয় না, যাতে ঈমান বিলগায়েব বজায় থাকে এবং পরীক্ষার বিষয়ও অক্ষুন্ন থাকে (কারণ স্বকর্ণে ফেরেশতাদের আওয়াজ শুনে ফেললে আর পরীক্ষা থাকে না)। এটা ঠিক এরকম, যেমন জ্বিন ও মানুষ ব্যতীত প্রত্যেক প্রাণী শুক্রবারে কেয়ামত কায়েম হওয়ার ঘোষণা শুনে থাকে, এমনিভাবে জ্বিন ও মানুষকে মৃত মানুষের আওয়াজ এবং কবরের আযাব শোনানো হয় না।

এখন এ হাদীসের উপর একটা প্রশ্ন জাগে যে, যখন ফেরেশতাদের এই উভয় ঘোষণার আওয়াজ মানুষকে শোনানো হয় না, তাহলে এ ঘোষণার ফায়দা কি? উত্তর এই যে, এ বিষয়ে অবগত হওয়ার জন্য নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই সংবাদ দেওয়াই যথেষ্ট। এর উদ্দেশ্য এই হতে পারে যে, আল্লাহ্ এ কথা সত্য হওয়ার ব্যাপারে অসংখ্য প্রমাণাদি রেখেছেন। এ প্রমাণগুলো এরকম যেমন ফেরেশতারা প্রত্যহ ঘোষণা দেয়, কিন্তু মানুষ গাফলতের ঘুমে আচ্ছন্ন থাকে। তা থেকে একেবারেই গাফেল উদাসীন হয়ে আছে।

ঘটনা এই যে, ধন-সম্পদ যত বেশি হয়, ততই বেশি পরীক্ষা এবং জবাবদিহীতার কারণ হয়। প্রয়োজন মাফিক অল্প মাল ঐ বেশি মাল থেকে শ্রেয়' যে মাল মানুষকে আখেরাত থেকে উদাসীন করে দেয় এবং দুনিয়ার চাকচিক্য এবং হারাম অবৈধ কাজকর্মে ব্যস্ত করে দেয়। সাধারণতঃ এমনই হয় যে, মাল ও দৌলতের প্রাচুর্য আখেরাত থেকে অমনোযোগী ও উদাসীন ও নাফরমান করে দেয়।

كَلَّا إِنَّ الْإِنْسَانَ لَيَطْغَى أَنْ رَآَهُ اسْتَغْنَى (العلق)
“সত্যি সত্যি মানুষ সীমালংঘন করে। এ কারণে যে, সে নিজেকে অভাবমুক্ত মনে করে।”

যখন মানুষের পেট ভরে যায় তখন মানুষ আত্মহারা হয়ে যায়। দৌলত সম্পদ হলে নাফরমান হয়ে যায়। সম্পদের প্রাচুর্য হলে তা আল্লাহ্ থেকে গাফেল করে দেয় এবং দুনিয়াও তাকে ইচ্ছা আকাঙ্ক্ষার দাস বানিয়ে দেয়। এজন্য অল্প পরিমাণ কিন্তু যথেষ্ট সম্পদ সেই অধিক সম্পদ থেকে শ্রেয়, যা গাফেল বানিয়ে দেয়।

📘 যে কথায় পাথর গলে 📄 ফেরেশতা ও মানুষের প্রশ্ন

📄 ফেরেশতা ও মানুষের প্রশ্ন


হযরত আবূ হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণনা করেন যে, হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেনঃ যখন মানুষ মৃত্যুবরণ করে তখন ফেরেস্তারা প্রশ্ন করে, কি আমল আছে যা পূর্ব হতে পাঠিয়েছ? আর মানুষেরা তথা ওয়ারিশরা প্রশ্ন করে, কি মাল দৌলত রেখে গেছ? ফেরেস্তারা পূণ্যের আকাঙ্ক্ষা করে এবং মানুষের প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে থাকেন। এজন্য তারা প্রথমেই নেক আমলের ব্যাপারে প্রশ্ন করেন। নেক আমলের বিনিময়ে ভাল ফল দেওয়া হবে। মন্দ কর্মের বিনিময়ে পাকড়াও ও শাস্তি হয়ে থাকে। যা হোক, ফেরেস্তারা আমলের চিন্তা করেন এবং মানুষ-উত্তরাধিকারীগণ দুনিয়া ও মালের চিন্তা করে যে, মরে যাওয়ায় আপদ দূর হলো। কিন্তু আমাদের জন্য রেখে গেল কি? সম্পত্তির কি পরিমাণ রেখে গেল? এটা জানা দরকার যে, আমল সাথে যায় কিন্তু উত্তরাধিকারীরা ও ধন-সম্পদ কিছুই সাথে যায় না। এজন্য এমন আমল করুন, যা ভালো ফল দান করবে, তাদের সাথে বন্ধুত্ব করুন, যারা আপনাকে কখনো ত্যাগ করবে না।

ফন্ট সাইজ
15px
17px